Published on

ওর সাথে পালালাম - ২

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার মোড়। সন্ধ্যা।

রাস্তায় পড়ে আছে ১৯-এ পা দেওয়া এক তরুণী। শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। কাতর কণ্ঠে সাহায্য চাইলো পথচারীদের কাছে। একজন তাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। হঠাৎ করেই দুনিয়ার নির্মম কুৎসিত দিকটা উন্মোচিত হয়ে গেছে তার সামনে। অথচ তিন দিন আগেও সম্পূর্ণ অন্য জীবন ছিল তার।

তামজিদ হোসেন আদর (২২) মেয়েটার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। যাত্রাবাড়িতেই থাকে দুজন। দুজনই আবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। এক বছর তিন মাস ধরে প্রেম করছিল তারা। তিন দিন আগে বিয়ে করবে বলে বাসা থেকে চলে আসে দুজন। রোমাঞ্চকর জীবনের স্বপ্নের আবির নেমেছিল তরুণীর চোখে। তিন দিন তারা বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়ে দেয়। সব শেষ সোমবার বেলা তিনটার দিকে তাকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার একটি হোটেলে নিয়ে যায় তামজিদ।

হোটেল রুমটিতে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল আরো তিন জন। প্রেমিক তামজিদ আশ্বস্ত করে, ‘ওরা বিয়ের সাক্ষী হতে এসেছে, জান’। নিশ্চিন্ত হয় সে। কিন্তু তারপর নরক নেমে আসে হোটেলের সেই রুমে…

…ওরা চারজন মিলে ধর্ষণ করে তাকে। এক পর্যায়ে ভয় দেখায়–কাউকে কিছু জানালে জানে মেরে ফেলবো, আর তোর নগ্ন ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

ধর্ষিত, প্রতারিত, মৃত্যুভয়ে ভীত তরুণী কাউকে কিছু জানাবে না বলে আশ্বস্ত করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাইরে এসে রাস্তায় পড়ে যায় সে।[1]

***

সিলেট। ওসমানীনগর।

মোবাইল ফোনে প্রেমের সম্পর্ক। তারপর প্রেমিককে বিয়ে করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় ১৭ বছরের কিশোরী। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখে প্রেমিক নেই। হতাশ কিশোরীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে গ্যারেজে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে এক সিএনজি চালক।[2]

***

ঘাটাইল উপজেলার গৌরিশ্বর গ্রামের আসকরের ছেলে আল আমিন (২৫) এর সঙ্গে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এক স্কুলছাত্রীর। ঈদুল আযহার সময় প্রেমিকের ফোন পেয়ে ওই কিশোরী নানার বাড়ি থেকে তার সঙ্গে ঘাটাইল উপজেলার চেংটা গ্রামে যায়। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একটি বাড়িতে রেখে একটানা ২৫ দিন ওর সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় প্রেমিক। পরে আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে আসে। বাসস্ট্যান্ডে আল আমিনের বন্ধু, পাচারকারী চক্রের সদস্য ট্রাকচালক মাসুদের ট্রাকে উঠে তাদের গন্তব্যে রওনা হয়।

পরদিন ভোর ৫টার দিকে একটি ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ওই স্কুলছাত্রীকে। সেখানে চার-পাঁচজন মিলে তাকে গণধর্ষণ করে। পরে তাদের আলাপচারিতায় কিশোরী বুঝতে পারে, তাকে ভারতে পাচার করার পরিকল্পনা করছে ওরা। পরে সে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে বেনাপোল বাসস্ট্যান্ড আসে। সেখান থেকে বাড়িতে ফেরে সে।[3]

***

…ধর্ষণ, প্রতারণা, আত্মহত্যা বা খুনের এমন ঘটনা খুবই কমন। তুমি হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। হয়তো ভাববে, ‘আরেহ! আমার সাথে কখনোই এমন কিছু হবে না। ও আমাকে এতো ভালোবাসে, আমাকে করবে ধর্ষণ! আমার সাথে করবে প্রতারণা! এসব বিশ্বাস করতে বলেন আমাকে?’

আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না, তুমি গুগলে ৫/১০ মিনিট একটু সার্চ করে দেখো। ধর্ষণ, খুনের ঘটনা পড়তে পড়তে অসুস্থ হয়ে যাবে। এরাও সবাই তোমার মতো উপেক্ষা করেছিল সকল সতর্ক সংকেত। প্রেমে মোহান্ধ মন আপাদমস্তক বিশ্বাস করেছিল এমন মানুষকে যাদের হাতেই অসংখ্যবার খুন হয়েছে তারা।[4]

সমাজ তথাকথিত আধুনিক, প্রগতিশীল, মুক্তমনা হবার সাথে সাথে ধর্ষণ খুনের মতো ঘটনাগুলোও বাড়ছে হু হু করে। তবে সংবাদ মাধ্যমে আসার চাইতে, না আসা ঘটনার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি ধর্ষিত হয়েছি এটা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতে চায় না অনেকেই।[5] বাড়ি থেকে পালানোর পর প্রেমিকের হাতে, প্রেমিকের বন্ধুদের কাছে বা হোটেলের ম্যানেজার, কর্মচারী, বাসের ড্রাইভার, হেল্পার বা যেখানে বাসা ভাড়া নিয়েছিল সেখানকার কারো হাতে ধর্ষণের শিকার হবার পর, কিংবা প্রেমিক পালানোর পর চুপি চুপি ঘরে ফিরে আসার ঘটনা নেহায়েত কম নয়। মফস্বল বা গ্রামগুলোতে এসব ঘটনা চাপা না থাকলেও ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের স্বার্থপর নাগরিক জীবনে এমন অজস্র ঘটনা চাপা পড়ে থাকে। কেউই হয়তো জানছে না, সামাজিকভাবে লজ্জিত, লাঞ্ছিতও হতে হচ্ছে না, বিয়েও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু থেকে যাচ্ছে দুঃসহ সব স্মৃতি। সারাটা জীবন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বোবা কান্না, গ্লানিবোধ আর বিষাদ কুরে কুরে খাচ্ছে বাকি জীবনটা। কেলেঙ্কারির ভয়ে বিচারও চাওয়া যায় না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো ধর্ষণ বা শারীরিক মিলনের ভিডিও করে রাখার ট্রেন্ড। একবার ভিডিও বা ছবি তুলে রাখার পর সেটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে চলে সিরিজ আকারে ধর্ষণ, গণধর্ষণ। টাকাপয়সা দিয়েও পার পাওয়া যায় না!

আর গ্রাম বা মফঃস্বল হলে কী ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি যে হতে হয়, তা ভূক্তভোগী ছাড়া আর কেউ কল্পনা করতে পারে না। প্রতিনিয়ত প্রতিবেশীদের কাছে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয় পরিবারের সবাইকে। বিয়ে হতে চায় না। পতিতা, বাজারি মেয়ে টাইপের চিরস্থায়ী ট্যাগ লেগে যায়…একটা পরিবার আসলে একদম শেষ হয়ে যায়। ঘরে ফিরে আসলেও জীবনে আর ফেরা হয় না।

আপু, তুমি হয়তো বুঝতে পারবে না তোমার বাবার কাছে, তোমার ভাইয়ের কাছে তোমার স্থান কোথায়। তোমার জন্য কতোটা ভালোবাসা, কতোটা স্নেহ, কতোটা আবেগ জমানো রয়েছে তাদের বুকে! তোমার এক বিন্দু অসম্মান হবে, তোমাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলা দূরে থাক বাজে চিন্তা করবে এটাও তারা মেনে নিতে পারেন না।[6] একজন সত্যিকারের গায়রত সম্পন্ন মুসলিম ভাই বা বাবা তোমার সম্মান রক্ষার জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন। মদীনার এক ইহুদি একজন মুসলিম নারীর সম্মানহানির চেষ্টা করেছিল শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারণ করেন। যুদ্ধের পোশাক পরে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। দূর ভারত মহাসাগরের বুকে মুসলিম বোনের সম্মান রক্ষার জন্য ১৭ বছরের মুহাম্মাদ বিন কাসিম সেনাবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। অত্যাচারী শাসক মুহতাসিম পর্যন্ত মুসলিম বোনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সুবিশাল বাহিনী পাঠান রোমানদের বিরুদ্ধে। এইতো নিকট অতীতেই তৃতীয় উমর নামে পরিচিত মাদ্রাসার এক শিক্ষক ধর্ষিতা বোনের সম্মানের প্রতিশোধ নেবার জন্য বেরিয়ে পড়েন ছাত্রদের নিয়ে। বদলে ফেলেন আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস! এখনো মেয়ের ধর্ষককে খুন করে থানায় আত্মসমর্পণের ঘটনাও মাঝে মাঝেই শোনা যায়!

আর সেই তুমিই নিজে যেচে পড়ে তোমার ইজ্জত অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছো। অন্যরা তোমাকে ব্যবহার করে ছেড়ে দিচ্ছে, তুমি গুমরে গুমরে কাঁদছো, তোমার ভিডিও, ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে অনলাইনে। পত্রিকার শিরোনাম বা সম্পাদকীয়তে তোমাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে, তোমার বিয়ে হচ্ছে না, তুমি ঝুলে পড়ছো ফ্যানের সাথে…এমন পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থাটা কী হয় একবার চিন্তা করো!

তোমার বাবার কলিগ, তোমার পাশের বাসার আন্টি–ওরা কি তোমার আব্বু আম্মুকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেবে? টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে আদরের যেই ভাইটাকে তুমি চকলেট কিনে দিতে, সেই ভাইটা স্কুলে যাবে কীভাবে সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছো? যখন আশেপাশের মানুষজন আড়ালে আবডালে তোমাকে পতিতা হিসেবে সম্বোধন করে, যখন তোমাকে নিয়ে রসালো আলোচনা চলে–তোমার ভাই বা বাবা উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা বদলে ফেলে, কলজের মধ্যে ছুরি মারা টিটকিরির রহস্যময় হাসি হাসে, যখন তোমার সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো করে…তখন তাদের অবস্থা কেমন হয়? কীভাবে সহ্য করে তারা?

তুমি এতো স্বার্থপর কেন? বাবার প্রতি, ভাইয়ের প্রতি, পরিবারের প্রতি তোমার ভালোবাসা কোথায়? কোন অধিকারে তুমি তাদের ভালোবাসা তুচ্ছ করছো? এতোদিন ধরে কোলে পিঠে, খেয়ে না খেয়ে তোমাকে মানুষ করেছে তারা। সেই ভালোবাসাকে তুমি কীভাবে অস্বীকার করছো? কোন ভালোবাসা পায়ে ঠেলে কোন ভালোবাসার জন্য ঘর ছাড়ছো তুমি? ভালোবাসার কিছু বোঝো তুমি?

ভাইয়া, একবার ভাবো তোমার বোনের সাথে যদি কেউ এমন করতো, তোমার বোনকে যদি কেউ এভাবে ‘খেয়ে ছেড়ে দিতো’ বা তোমার মেয়েকে যদি কেউ ব্যবহার করে, তোমার কেমন লাগবে? তুমি মেনে নিতে পারতে? জানোয়ারটাকে খুন করে ফেলতে না? তুমি কি চাইবে তোমার বোন কোনো ছেলের সাথে বিছানায় যাক? তাহলে কীভাবে আরেকজনের আদরের মেয়ে, আরেকজনের বোনের সাথে তুমি এমন করার কথা চিন্তা করো?


[1] বিয়ের প্রলোভনে হোটেলে নিয়ে চার বন্ধু মিলে ধর্ষণ, dhakamail.com, মার্চ ০৮, ২০২২- tinyurl.com/bryx2ftp

[2]প্রেমিককে বিয়ে করতে গিয়ে সিএনজি চালকের হাতে ধর্ষিত কিশোরী,gmnewsbd, নভেম্বর ২১, ২০১৭- tinyurl.com/m6k85awy

[3] ৪-৫ জন মিলে কিশোরী প্রেমিকাকে ৩৪ দিন ধরে ধর্ষণ, উদ্দেশ্য ছিল পাচারের, news24bd.tv, অক্টোবর ২২, ২০২১- tinyurl.com/bdhanjz9

[4] লালমনিরহাটে মুসলিম কিশোরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভারতে পাচার করে এক হিন্দু কিশোর। ভারত থেকে সেই কিশোরীর হৃদয়বিদারক কান্না দেখে স্থির থাকা কঠিন- SK media ইউটিউব ভিডিও, Aug 12, 2022-tinyurl.com/24v9tsft

jamuna Tv ইউটিউব ভিডিও, Aug 12, 2022-

tinyurl.com/mur9sxam

প্রেমিককে বিয়ে করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, বাংলাভিশন, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২২

tinyurl.com/ya3hurjb

বিয়ের আশ্বাসে বন্ধুর সাথে হোটেলে উঠে গণধর্ষণের শিকার তরুণী, হোটেল ম্যানেজারসহ গ্রেফতার ৬, 24ghonta.news, অক্টোবর ১২, ২০২০-

tinyurl.com/muec63ar

১৩ ধর্ষণ গণধর্ষণ, দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম, জুলাই ৯, ২০২২-

tinyurl.com/msxv57n9

[5] শুধু বাংলাদেশ না, ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতেও ধর্ষণের ঘটনার রিপোর্ট খুবই কম হয়। সামনে আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।

[6] ধর্ষণের বিচার না পাওয়ায় মেয়েকে নিয়ে বাবার আত্মহত্যা!, ntvbd.com, এপ্রিল ২৯, ২০১৭- tinyurl.com/2mm49zjs তুমি একবার কি বোঝার চেষ্টা করবে তোমার সম্মান তোমার বাবা, ভাই বা পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ?