Published on

অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল - ১

প্রেমের বিয়েতে কি সেই সুখ?

কলাভবনের প্রথম গেটের সামনে চিঠি হাতে দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছে সদ্য প্রেমে পড়া এক তরুণ। গায়ক হিসেবে এর মধ্যে কিছুটা নাম ডাক হয়েছে তার পরিচিত মহলে, কিছু গান প্রকাশিত হয়েছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আর টেনশনে শরীর কিছুটা ক্লান্ত হয়। সব অপেক্ষারই শেষ আছে। এ অপেক্ষারও শেষ হলো। যার জন্য চিঠি লেখা সেই মানুষটা অবশেষে চলে আসল। সেই প্রথম কথা বলল- আরে কি অবস্থা! তরুণ টেনশনের হাসি দিয়ে অনুরোধ করল- চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। .

হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা হল। এক পর্যায়ে সাহস করে তরুণীর হাতে গুঁজে দিল চিঠি। যাতে লেখা ছিল, ‘Some call it love at first sight, some call it infatution. I just ignore it. (কেউ এটাকে বলে প্রথম দেখাতেই ভালোবাসা,কেউ এটাকে বলে মোহ, আমি এগুলো একেবারেই পাত্তা দেই না)’ মনে মনে তরুণকেও পছন্দ করেছিল তরুণী। কিন্তু চিঠির উত্তর দিয়েছিল ফোনে। যার প্রথম বাক্যটি ছিল এমন, ‘এই এটা কী লিখেছ?’

এরপর থেকেই দুজনের ঠোঁট থেকেই ঝরতে থাকল কথার ফুলঝুরি। নিয়ম করে রাতভর চলত ফোনালাপ। শুধুই কি ফোনালাপ! রিকশায় চড়ে চলল ঠিকানাহীন ঘোরাঘুরি।পরিচয়ের সূত্রপাত হয় প্রথম চিঠি দেবার ঠিক আগের দিন।

তরুণীর মুখেই শোনা যাক, ‘আমার এক বন্ধু তার ছোট ভাইয়ের জন্য ওর অটোগ্রাফ নিতে যাচ্ছে। মূলত তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্যই ওর বাড়িতে হাজির হওয়া।’ ওই সময় তরূণীও ওর কিছু গান শুনেছে, কিন্তু ভক্ত হয়নি। তাই প্রথম পরিচয়েই ওর গান নিয়ে অনেক সমালোচনা করে সে। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরূণের মনের ঘরে বাঁধা পড়ে।এর পরের দু বছর চুটিয়ে প্রেম করল তারা। প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে একের পর এক গান লেখল, গাইল তরুণ প্রেমিক। এরপর অবশেষে বিয়ে করে সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি দিল তারা। সময়টা ২০০৬ সালের ৩ আগস্ট।

এরমধ্যেই হয়ত ধরে ফেলেছো তুমি কোন জুটির কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, এতোক্ষণ তাহসান মিথিলার কথা বলছিলাম। একটা সময় যারা ছিল রোমান্টিক কাপলের টেক্সটবুক উদাহরণ। প্রেমের বিয়ে যে কতোটা মধুর হতে পারে তার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো তাহসান মিথিলাকে। আমাদের মনে রঙ আর চোখে ঘোর লাগার বয়সটাতে তাহসান-মিথিলা জুটির প্রভাব কেমন ছিল, অকল্পনীয় এক রোমান্টিক আবেশে বুঁদ করে রেখেছিল সেটা আসলে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

২০১৭ সালের মে মাসে বিচ্ছেদ ঘটে তাদের! [১,২]

লাভ ম্যারেজকে মুভি,নাটক, সিরিজ, সাহিত্য কবিতা … সবজায়গাতেই প্রেমের প্রচন্ড সফল সুখকর এক সমাপ্তি হিসেবে দেখানো হয়। এটার মাধ্যমে ভালোবাসা পূর্ণতা পায়। লাভস্টোরি গুলো শেষ হয় এভাবে… অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিল। অন্যদিকে এরেঞ্জড ম্যারেজকে যতোভাবে সম্ভব দেখানো হয় দাসত্বের প্রতীক হিসেবে। ভালোবাসার অপমান হিসেবে। প্রেমের কারাগার হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা পুরো বিপরীত।

আমেরিকায় বেশীরভাগ বিয়েই হয় প্রেমের কারণে। এবং সেখানকার ডিভোর্স এর শতকরা হার ৪০-৫০ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ৪০-৫০ শতাংশ বিচ্ছেদের মধ্যে এরেঞ্জড ম্যারেজে বিচ্ছেদের হার মাত্র ৪ শতাংশ।[৩] অধ্যাপক, মানুষের মনোজগত নিয়ে কাজ করা আমেরিকা ভিত্তিক বিখ্যাত সংস্থা Psychology Today এর সাবেক প্রধান সম্পাদক, সাড়াজাগানো গ্রন্থপ্রণেতা, আমেরিকার সায়েন্টিফিক ম্যাগাজিন MIND এর সম্পাদক Dr Robert Epstein এর মতে আমেরিকার এই উচ্চ বিচ্ছেদের হারের কারণ হলো ল্যাভ ম্যারেজ।এই বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে এমন মতও এসেছে যে- যে দেশ আমেরিকার মডেল অনুসরণ করবে বিয়ের ক্ষেত্রে, সেই দেশে বিয়ে ততো ব্যর্থ হবে। [৪]

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী সৌল-জুর-ডন এর মাঠ পর্যায়ের একটি গবেষণার ফলাফল হচ্ছে: “যে বিয়ের পাত্র-পাত্রী বিয়ের আগে প্রেমে পড়েনি এমন বিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশী সফল ।”

অপর এক সমাজবিজ্ঞানী ‘আব্দুল বারী’ কর্তৃক ১৫০০ টি পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল হচ্ছে: ৭৫% এর বেশি প্রেমঘটিত বিয়ে তালাকের মাধ্যমে পরিসমাপ্ত হয়েছে। অথচ এরেঞ্জড ম্যারেজের ক্ষেত্রে, তালাকের হার ৫% এর নীচে।[৫]

মুম্বাই হাইকোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে দাবী বলছে- ভারতে এরেঞ্জড ম্যারেজের তুলনায় লাভ ম্যারেজে ডিভোর্সের হার অনেক বেশী।[৬] .

শায়খ আলী তানতাবী রহিমাহুল্লাহর পরিচয় আমরা আগেই দিয়েছি। ২০ হাজারের মতো বৈবাহিক মামলার সমাধান করা এই আলেম বিচারক বলেন, ‘ তোমাদের চোখে তো রঙের ফানুস। তাই, আমার অভিজ্ঞতার কথাগুলো বিশ্বাস করবে কিনা, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। সত্যি কথা হলো এসব (প্রেমের) বিয়ের পরিণতি হলো বিবাদ ও বিচ্ছেদ।[৭]

পর্দায় যা দেখানো হোক না কেন অধিকাংশ প্রেমের বিয়েগুলো সাধারণত টেকে না।সুখের হয় না। দাম্পত্য কলহ অশান্তি , বিচ্ছেদ এগুলো অধিকাংশ প্রেমের বিয়ের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ ঘটনা। মিডিয়ার যারা আমাদের প্রেম শেখায় , ভালোবাসার সবক দেয় যারা আমাদের কাছে আসার গল্প শেখায় মজার ব্যাপার হলো তাদের জীবনেই বিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, অশান্তি বেশী।

বাঙ্গালীর রোমান্টিকতার আদি ও অকৃত্রিম রোল মডেল মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে শুরু করে প্রেমের নিয়ম কানুনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হুমায়ূন আহমেদ, হূমায়ূন ফরিদী (বেচারা হুমায়ূন ফরিদী তো শোকে মদ খেতে খেতে মারাই গেল।), গুরু জেমস, শ্রাবন্তী, জয়া আহসান,এককালের হার্টথ্রব অপি করিম, তারিন, শখ ,সারিকা,বাঁধন , সাকিব খান-অপু বিশ্বাস ভালোবেসে বিয়ে করে সংসার টেকাতে পারেনি কেউই। এটা শুধু বাংলাদেশ ভারত বা উপমহাদেশের ঘটনা না। পাশ্চাত্যের হলিউড, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে প্রেম শেখানো সব ইন্ডাস্ট্রির একই অবস্থা। আরও বেশী ভয়ঙ্কর অবস্থা। আরও বেশী বিচ্ছেদ,হতাশা, আত্মহত্যা । [৮,৯]

চলবে ইনশা আল্লাহ…
#অতঃপর_তাহারা_সুখে_শান্তিতে_বসবাস_করিতে_থাকিল_? (প্রথম পর্ব)।

প্রকাশিতব্য (ইনশা আল্লাহ)বইয়ে একটু অন্যভাবে থাকবে ইনশা আল্লাহ। রেফারেন্স ও নোট কমেন্টে।