Published on

মরিবার হলো তার সাধ (দ্বিতীয় পর্ব)

ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার পেছনেও অন্যতম প্রধান কালপ্রিট হলো আত্মহত্যাকে মিডিয়ার রোমান্টিসজমের মোড়কে উপস্থাপন করা। সেট ডিজাইন, লাইট ক্যামেরা এংগেইল, আবহসংগীত, ডায়ালগ, গল্পের স্ক্রিন প্লে, I Quit টাইপের সুইসাইড নোট সবকিছু মিলিয়ে এমন আবেগ ঘন পরিবেশ তৈরি করা হয় যেন দর্শকদের মনে তীব্রভাবে গেথে যায়- আহা আত্মহত্যা করা কতো চমৎকার রোমান্টিক একটা জিনিস। কোনো এক চাদনী পসর রাতে বা ঘোর বর্ষণভরা শ্রাবণ সন্ধ্যায় আমি ঝুলে পড়ব সিলিং এ বা পাখির মতো ডানা মেলে লাফ দিব উচু ২০ তালা বিল্ডিং থেকে …
.
আমার লাশের পাশে চাপা পড়ে থাকবে সুইসাইড নোট। আমার মৃত্যুর পর সে বুঝতে পারবে আমি তাকে কতো ভালোবাসি, আমার জন্য কাঁদবে, কিন্তু আমাকে আর পাবে না, আমাকে কোনোদিন ভুলতে পারবে না সে। সারাজীবন অপরাধবোধে দগ্ধ হবে সে। আমাকে করা তার প্রতিটি অবহেলার প্রতিশোধ নেব এভাবে আমি। আমার বন্ধুরা আমার ওয়ালে আমার প্রোফাইল পিকচার কিংবা পোস্টের কমেন্টে RIP লেখবে, লাশটা আজও তার খুনিকে ভালোবাসে টাইপ পোস্ট লেখবে,আমার কবরের পাশে ফুল দেবে, আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে প্রকৃত একজন প্রেমিক হিসেবে যে শুধু মুখে মুখে ভালোবাসেনি। ভালোবাসার জন্য জীবন দিয়েছে। আমার কবরের উপর সবুজ ঘাস জন্মাবে। ফাগুন হাওয়ায় তিরতির করে কাপবে সাদা সাদা ঘাসফুল...
.
অনেকেই ভাবে আত্মহত্যা করা খুব গভীর অনুভূতি সম্পন্ন কোনো কাজ। মৃত্যুর এই পদ্ধতি তাদের মৃত্যুকে অর্থবহ করবে। মানুষ তাকে নিয়ে ভাবতে কথা বলতে ...তার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে।
.
কিন্তু বাস্তবতা হলো তোমার আত্মহত্যার কানাকড়ি কোনো মূল্য নেই। তেতো সত্যিটা হলো তুমি এভাবে আত্মহত্যা করার ফলে পৃথিবীর কারও কিছুই যায় আসবে না। পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। এরপরেও পৃথিবী চলে। আত্মহত্যা তোমাকে স্পেশাল বানাবে না। তুমি শুধু নিজেকে ধ্বংস করছ। তোমার বাবা মাকে কষ্ট দিচ্ছ। তোমার বন্ধু বান্ধব পরিচিত জনরা হয়ত তোমার ওয়ালে মৃত্যুর পর RIP লেখল, ১/২ দিন তোমার কথা স্মরণ করবে। এরপর ভুলে যাবে। এমনভাবে ভুলে যাবে যেন পৃথিবীতে তোমার অস্তিত্বই ছিলো না। হয়ত হুটহাট মনে পড়বে তোমার কথা। তবে তোমাকে স্মরণ করা হবে একটা কাপুরষ, অবুঝ বোকা ভীতু হিসেবে। যে পরাজিত হয়ে জীবন থেকে পালিয়েছে। অন্যদের উপদেশ দেবে- ঐ ভীতুর মতো যেন কখনো ভুল কাজ না করে।
.
পৃথিবী আগের মতোই চলবে। কোনো কিছুই থেমে থাকবে না তোমার জন্য। আকাশের রঙ আগের মতোই নীল থাকবে, বাবলা বনে চৈতালী হাওয়ার নিস্তব্ধতা খান খান করে অবিশ্রান্ত আর্তনাদের মতো ডেকে যাবে নিঃসঙ্গ কোনো ঘুঘু। তারাভরা আকাশে বুনো হাস ডানা মেলবে। তোমার প্রেমিক বা প্রেমিকা তার নতুন সঙ্গীকে নিয়ে বৃষ্টি বিলাস করবে, জ্যোৎস্না রাতে ফাগুন হাওয়ায় ফিসফিস করে আউড়ে যাবে ভালোবাসার চিরন্তন বাক্যগুলো। তোমার জন্য অপরাধবোধে দগ্ধ হওয়া, তোমার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে আজীবন দুঃখ বয়ে বেড়ানো এসব করার অবকাশ, ইচ্ছে কোনোটাই মিলবে না তার। কষ্ট পাবে তোমার বাবা মা। এই পৃথিবীতে তোমার প্রকৃত আপনজন। যাদেরকে তুমি কষ্ট দিলে এমন একজন মানুষের জন্য যে তোমাকে পুছেও না।
.
ধরো তুমি যেমন প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলা সবাই এসব করলো … কিন্তু তুমি এসব দেখতে পাবে? তোমার প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে মিলন হবে? না কিছুই হবে না। সে তার প্রেমিক/স্বামীকে নিয়ে চিইল করবে। আর এদিকে উল্টো তুমি জাহান্নামের কঠিন আযাব ভোগ করবে। কোনো মানে হয়?
‘যে যেভাবে আত্মহত্যা করবে, তার শাস্তি অনন্তকাল সেভাবেই চলতে থাকবে।’ [১]
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে (অনুরূপভাবে) নিজেকে ফাঁস লাগাতে থাকবে আর যে ব্যক্তি বর্শার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে (অনুরূপভাবে) বর্শা বিদ্ধ হতে থাকবে।’ [২]
.
তুমি জাহান্নামে ফেরেশতাদের হাতে ধোলাই খেতে থাকবা আর এদিকে তোমার প্রেমিক/প্রেমিকা তার বউ বা স্বামীকে বুকে নিয়ে প্রেম করবে। এটা কিছু হইল?এই রোমান্টিসিজম, এই অভিমান, এই প্রতিশোধ নিতে চাওয়ার বিনিময়ে জীবনের সবকিছু হারিয়ে জাহান্নামের আযাব ভোগ করা- কোনো মানে হয়?
.
বাসা থেকে বিয়ে না দেওয়ায় অনেক কাপল একসাথে আত্মহত্যা করে। দেখ,এগুলোও এক ধরণের বোকামি, চূড়ান্ত রকমের নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। আত্মহত্যা করলে কি দুইজনের মিলন ঘটবে? মানে মৃত্যুর পরে তাদের কি মিলন হবে? না, হবে না। তারা একে অন্যকে পাবে না। বরং দুইজনকেই আত্মহত্যার পাপের কারণে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাহলে এভাবে মরে লাভ কি হলো? নিজেদের মিলন হলো না, জাহান্নামের কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে, পাশাপাশি বাবা মা ভাই বোন পরিবার ভুগছে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টে। এখানে লাভ টা কি হচ্ছে? পুরোটাই তো লস!
.

আত্মহত্যার পেছনে যে শুধু রোমান্টিসজম বা মিডিয়ার মগজধোলাই ভূমিকা রাখে এমন না। প্রকৃত আবেগ থেকেও অনেকে আত্মহত্যা করে। ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না, ও ছাড়া কেউই আমাকে বোঝেনা, কেউই আমাকে ওর মতো করে ভালোবাসতে পারবে না, আমি ওকে ছাড়া কিভাবে বাচব? ও অন্যকারও সাথে বিছানায় যাবে আর আমি এটা কিভাবে মেনে নিব? তার চেয়ে আত্মহত্যা করে ফেলি আমার সকল কষ্টের সমাধান হয়ে যাবে - এমন চিন্তা ভাবনাও কাজ করে আত্মঘাতী হবার পেছনে।
.
দেখ ভাইয়া, আপু – তোমার এসব চিন্তাভাবনার কোনোটার সমাধানই আত্মহত্যা না। আত্মহত্যা করলে কোনো কষ্টই শেষ হয়ে যায় না। বরং কবরে আরও ভয়ঙ্কর কষ্টের সূচনা হয়। সে যদি তার বিবাহিত সঙ্গীর সাথে স্বেচ্ছায় বিছানায় যায় [৩], খুশি হয় তাতে তোমার বলার কি আছে? আগেও যেমন আলোচনা করা হয়েছে- তুমি যদি তাকে সত্যিই ভালোবাসতে তাহলে তার এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে। ভালোবাসার মানুষ যেটাতে খুশি হয়, তোমারও সেটাতে খুশি হবার কথা। তাহলে তুমি কষ্ট পাচ্ছো কেন? মদ গাজা সিগারেট খেয়ে শোক পালন করা বা আত্মহত্যা করার কথাই বা চিন্তা করছ কেন? আচ্ছা, সেই একই প্রশ্নটা আবারও করি- তুমি আত্মহত্যা করলে কি তার কোনো কিছু যায় আসবে? সে তোমার শোকে আর অন্য কারও সাথে বিছানা শেয়ার করবে না? এমন কিছুর নিশ্চয়তা সে তোমাকে দিয়েছে? এমন বোকামি করছ কেন?
.
সে তোমার সাথে প্রতারণা করেছে, তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, অন্য কাউকে বিয়ে করে তার সাথে মজা করছে, তুমিও অন্য কাউকে বিয়ে করে মজা করো – ব্যাস, কাটাকাটি হয়ে গেল! এটা তো খুবই সহজ একটা সমীকরণ। এর মধ্যে আত্মহত্যা করা, গাজা মদ খেয়ে টাল হওয়া, হাত কেটে রক্ত বের করা … এগুলো আসছে কেন?

দেখ ভাইয়া, আপু, আত্মহত্যা করলে কোনো কষ্টই শেষ হয়ে যায় না। বরং কবরে আরও ভয়ঙ্কর কষ্টের সূচনা হয়। এই মেয়ে/ছেলেকে হারালে তুমি আর জীবনে বিয়েই করতে পারবে না, পৃথিবীর এরাই একমাত্র ছেলে মেয়ে এমনও তো না। কেন এই বোকামি?
.
তবে আত্মহত্যা করার পেছনের মূল কারণ হলো দুইটি-
১। প্রেমকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও স্বার্থকতা হিসেবে দেখা
২। জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য ও স্বার্থকতা সম্পর্কে বেখেয়াল হওয়া
.
আল্লাহ তোমাকে তাঁর ইবাদাতের জন্য পাঠিয়েছেন, প্রেম করার জন্য নয়। পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফাহ কায়েম করা তোমার দায়িত্ব আর তুমি এভাবে সামান্য প্রেমের জন্য জীবন দিয়ে দিচ্ছ? এই দুটি বিষয়ের বাস্তবতা বুঝলে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করলে কোনোভাবেই আত্মহত্যা করা সম্ভব না তোমার পক্ষে।
‘তোমরা নিজেদের হত্যা করোনা; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।’ [৪]
.
চলবে ইনশা আল্লাহ…

রেফারেন্স ও টীকা:

[1] মুসলিম ও তিরমিজি

[2] বুখারি

[3] তাকে যদি জোর করে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়া হয়, তারপরেও স্বামী স্ত্রীর অন্তরংগতা হয়ে গেলে তোমাকে ভুলতে সময় নিবে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এমনটাই হয়ে আসছে।

[4] সূরা আন-নিসা,৪ : ২৯