একটা চিঠি লিখছি। চিঠিটা প্রাক্তন এক রোমিওর উদ্দেশ্যে, হ্যা প্রাক্তন, তা এখন অতীত আলহামদুলিল্লাহ… ভাইটা কোন প্লেবয় গোছের কেউ ছিল না যে দুইদিন পরপর গার্লফ্রেন্ড বদলাতো বা বন্ধুদের ভেতর রসিয়ে মেয়ে নিয়ে অশ্লীল আড্ডা দিত, যার কাছে প্রেম কিনা স্রেফ টাইম পাস বা ক্ষণিকের ভোগ। সে ছিল নিপাট নিরীহ এক রোমিও, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কোন এক সময় বন্ধু থেকে প্রেমিকা বনে যাওয়া কাউকে বউ ভেবে ভালোবাসা অপাত্রে দান করেছে, এক অদৃশ্য কমিটমেন্টে নিজেকে জড়িয়ে রঙিন স্বপ্নের বীজ বুনেছে এবং শেষমেশ অন্ধকার গলিতে ঘুরপাক খেতে খেতে কোনোভাবে হেদায়েতের আলো পেয়েছে। এমনই এক অচেনা অজানা রোমিওকে উদ্দেশ্য করে আজ লিখছি যে চিরতরে বিদায় জানাতে পেরেছে এ আকর্ষণকে…হৃদয়কে চুরমার করে দেয়া এক আকর্ষণ। জাহিলিয়াতকে বিদায় জানিয়ে তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে আল্লাহ্‌র মনোনীত দ্বীনে ফিরে আসা সে ভাইকে উদ্দেশ্য করেই কিছু কথা বলবো ইনশাআল্লাহ্‌।

ভাই…তওবা, হিদায়াহ – এ এক অমূল্য রত্ন। দুনিয়া বিক্রি করেও যা কেনা সম্ভব না। তুমি তা পেয়েছো আল্লাহ্‌র দয়ায়। কেন পেয়েছো? হয়তো কোন কল্যাণ ছিল। আল্লাহু আ’লাম। প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছো ঠিকই কিন্তু হয়তো মাঝেমাঝে আল্লাহ্‌র ভয়ে ভেতরটা উশখুশ করতো তোমার, রাতে যখন বিছানায় এলিয়ে চোখ বুজতে, শান্তি পেতে না, অজানা এক ভয় গ্রাস করে বসতো- আচ্ছা, যদি এখন মরে যাই? কি জবাব দিবো? কবরে নাকি অনেক শাস্তি আছে সাপ বিচ্ছু কিলবিল করবে শরীরে, সহ্য করতে পারবো কি?

হয়তো তোমার অন্তরে বক্রতা ছিল না, প্রেম করেছো কিন্তু এথিক্স ঠিক রাখতে চাইতে- এত কথা কিসের ছেলেদের সাথে? ওই ছেলেটা ক্লাসে তোমার পাশে বসলো কেন? এত চ্যাট করার কি আছে? আমার মনে হয় তোমার হিজাব পড়া উচিত…  (যেটাকে আমরা গাইরত বলতে পারি)। তীব্র অপরাধবোধ ঘিরে ধরতো কি যখন তুমি তোমার প্রিয়তমার পাশে বসে রিকশায় ঘুরতে আর মসজিদ থেকে সমবয়সী কাউকে নামাজ পড়ে বের হতে দেখতে? হয়তোবা তুমি বারবার চেয়েছিলে বের হয়ে আসতে চাইতে, আল্লাহ্‌র কাছে মাঝেমাঝে দুয়া করতে কিন্তু ছয় বছরের রিলেশন আর মেয়েটার চোখের পানি ফিরতে দিচ্ছিল না… হয়তো আল্লাহ্‌ তোমার সে দুয়া বা অনুশোচনাবোধ কবুল করে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন আর তুমি চোখ বন্ধ করে উনার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে আজ ফিরে এসেছো। স্বাগতম ভাই তোমায়।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। হিদায়াত তোমার স্বাধীনতা, শয়তানের বিছানো জাল থেকে মুক্তির স্বাধীনতা, কিন্তু এই স্বাধীন হবার সার্টিফিকেট সবসময় তোমার হাতে থাকবে এমনটা ভেবে পায়ের উপর পা তুলে ঘুমালে ভুল করবে। শয়তান সদা তৎপর এই মূল্যবান রত্নকে কেড়ে নিতে। নবীজি (সাঃ) এর সময়েই তো কিছু লোকের হিদায়াত পেয়ে পথভ্রষ্টটার নজির দেখা গেছে। যুগ যুগ ধরে কত আলেম-বুজুর্গরা পা হড়কে স্লিপ কাটলো শয়তানের ধোঁকায়! তাহলে তুমি আমি এত নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছি কিভাবে?

আমি মোটামোটি শিওর যারা খাস দিলে তওবা করে ফিরে আসে তারা আর কখনোই ওই পথে ফিরে যেতে চায় না। কারন তারা এখন জানে বাইরে থেকে চোখ ধাঁধানো হৃদয় কাপানো সৌন্দর্য আসলে শয়তানের গিলানো এক বিষ। তুমিও নিশ্চয়ই চাও না আবার জাহিলিয়াতে ফিরে যেতে? তাই শোন, তওবা করে ফিরে আসা রোমিও থেকে আবদুল্লাহ বনে যাওয়া ভাই তোমাকেই বলছি, Do not take this gift of Allah for granted. তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন শয়তান তোমার ভেতর কুচিন্তার মেঘ জমা করতে না পারে। যেন সে তোমার ভোলা মন নিয়ে আবার ছিনিমিনি খেলতে না পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সফর তো কেবল শুরু।

প্রেম-ভালোবাসার স্মৃতিকে পুরোপুরি নষ্ট করা যায় না, দমিয়ে রাখতে হয়। দমিয়ে রাখতে হয় অতীতের টুকরো টুকরো গল্পগুলা। যে গল্পগুলো এখন মনে পড়লে আতংক আর প্রশান্তির এক অদ্ভুত অনুভুতি যোগায়। আতংক এই অর্থে যে, তার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো, শিহরণ জাগানো স্পর্শ, আহ্লাদভরা কণ্ঠ, চোখের ভাষায় পড়ে ফেলা অভিমান – সবকিছুই স্রেফ রবের আক্রোশ আর অসন্তুষ্টিই এনেছে। কি করেছি আমি? ছিঃ! ভয় ঘিরে ধরে যখন মনে পড়ে, আমিও তো ওই যিনাকারিদের একজন হতে পারতাম যাদের কবরে আগুনের খনিতে পুড়ানো হচ্ছে শাস্তিস্বরূপ। ঠিক এরপরই আসে প্রশান্তি। আল্লাহ্‌ আমাকে রক্ষা করেছেন! আমি তওবা করে ফিরে এসেছি, ফিরে এসেছি এমন এক বাহুডোর থেকে যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। এই অনুভতির পর আসে শুকরিয়া। আস্তাঘফিরুল্লাহ…আলহামদুলিল্লাহ…

তো যা বলছিলাম ফেলে আসা প্রেমের মুহূর্তগুলোকে এত সহজে ভুলা যায় না, কিন্তু দমিয়ে রাখা যায়। রাখা যায় বললে হবে না, আসলে দমিয়ে রাখতেই হবে, কবরচাপা দিতে হবে। শয়তান যেন সে কবর খুড়তে না পারে। সে যদি এক মুঠ মাটি সরায়, তোমাকে আরও দশ মুঠ ঠেসে দিতে হবে। আমি এখানে কিছু পয়েন্ট তুলে ধরার চেষ্টা করবো, কিছু সিনারিও বা শয়তানের ফাঁদ এবং নিজেকে সে ফাঁদ থেকে ডিফেন্ড করার কিছু কৌশল। হয়তো কিছু ফাঁদ বাদ পড়ে যেতে পারে, তুমি ফিরতি চিঠিতে আমাকে জানিও ইনশাআল্লাহ্‌।

ভাই, আমি শুরুতে ধরে নিচ্ছি তুমি সবরকম গুনাহ থেকে আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করে নিয়েছো। তার মানে প্রেমকে বিদায় বলেছো ঠিকই, পাশাপাশি তুমি আর গান শুনো না, দিনকে রাত বানিয়ে আর মুভি-সিরিজ দেখো না, ফ্রি-মিক্সিং থেকে দূরে থাকো, চোখের পর্দা করে চলো। যদি এগুলো না করে থাকো, তাহলে তুমি অনেক বড় বিপদে আছো। তোমাকে সাহায্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না।

ভোগবাদীদের ব্যবসার মূল কেন্দ্রই হচ্ছে ফাহেশাত, অশ্লীলতা, হারাম প্রেম, উদ্দম যৌনতা। তুমি কখনোই ভেবো না শুধু ভালোবাসার মায়া ত্যাগ করা মানেই ফিরে আসা। তোমাকে সবরকম মেয়েঘটিত মায়া (যা হারাম) ত্যাগ করতে হবে। তা না হলে হলিউড-বলিউড-ঢালিউড, আইটেম সং, সিরিজ, পর্নোগ্রাফি, যৌনতার হাতছানি তোমাকে পাগল করে দিবে। বন্ধু বেশে সান্ত্বনা দিতে আসা জাস্ট ফ্রেন্ডদের সাথে মেলামেশায় তুমি হয়ে পড়বে স্মৃতিকাতর, তোমার প্রেমিকার কথা মনে করিয়ে দিবে। নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে হিজাবি-নিকাবিদের সাথে কমিউনিকেট করাকে not a big deal মনে হবে। এভাবে আস্তে আস্তে তুমি আবার শয়তানের আঙ্গুল নাচানো পুতুলে পরিণত হবে। তুমি হয়ে পড়বে দুর্বল। অপরাধকে জাস্টিফাই করে বসবে। এভাবে আবার হারিয়ে যাবে! হারিয়ে যাবে সেই অন্ধকার গলিতে যা থেকে তোমায় বের করে এনেছিলেন আল্লাহ্‌ সুবহান ওয়া তা’লা।

এখন মুল আলোচনা শুরু করা যাক। প্রেমিকার স্মৃতিগুলো ভুলে থাকার জন্য তোমাকে আগে চৌকশ গোয়েন্দার মত আইডেন্টিফাই করতে হবে কেন স্মৃতিগুলো বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখো কী কী তোমাকে ট্রিগার করছে, হারাম মুহূর্তগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিবে। আমি তেমনই শয়তানের কিছু কৌশলের কথা উল্লেখ করছি যা কম-বেশি সবাইকেই পীড়া দেয়।

 

তাহারেই পড়ে মনে…

  • প্রেমিকার দেয়া গিফট, চিঠি, খুদে বার্তা – আল্লাহ্‌র নামে চিঠিগুলা পুড়িয়ে বা বাথরুমে নিয়ে ফ্লাশ করে দাও। প্রেমিকার নাম্বার, তার বাপ-মা-ভাই-বোনের নাম্বার সব ব্লক করে দিতে হবে, দরকার হলে সিম বদলে ফেলো। গিফটগুলা নষ্ট করে ফেলো বা কাউকে দান করে দাও। যত দামিই হোক না কেন। টি-শার্ট/ঘড়ি/মানিব্যাগ/নোটবুক যাই হোক না কেন কোনটাই আর নিজের কাছে রাখবে না, ব্যবহার করবে না। প্রেমিকা মোবাইল দিয়েছিল? (রেয়ার কেস যদিও), তাও রাখা যাবে না। দোকানে বিক্রি করে ওই টাকাটা কোনো মিসকিনকে দান করে দাও। আইডিয়া বুঝলে তো? তাতেই হবে।
    .
  • সোশ্যাল মিডিয়ায়- তাকে ব্লক করে দিতে হবে, মেসেজগুলা ডিলেট করে দিতে হবে। নিজের পুরানো পোস্টগুলা ডিলেট দিয়ে দিও। দরকার হলে আইডিই ডিলেট দিয়ে নতুন করে খুলো। পুরানো আইডিতে প্রেমিকার সাথে কত কথা, কত ছবি, কত স্মৃতি! এখন তো তওবা করেছো, কি দরকার পুরানো পাপগুলাকে ওপেন প্লেসে ছড়িয়ে রাখার?
    .
  • Meeting Place- যতটুকু সম্ভব ওই গলি, রাস্তা, ফাস্ট ফুড বা কফিশপের দোকানগুলা এভয়েড করতে হবে যা তোমাকে পুরানো দিনের কথা মনে করিয়ে দিবে। একান্তই এভয়েড করতে না পারলে তওবা করো, আল্লাহ্‌র নিয়ামতের কথা স্মরণ করে শুকরিয়া আদায় করো। আর ভুলেও ভালেন্টাইন্স ডে, নববর্ষ, নিউ ইয়ার বা হাবিজাবি যত দিন আছে এসব দিনে কাজ না থাকলে বাহিরে বের হবে না, কাপলদের আড্ডাখানায় যাবে না, ভার্সিটির ক্লাস শেষেই চলে আসবে। হারামকে ঘৃণা করতে শেখো। আফসোস নিজের জন্য না, তাদের জন্য করো যারা এখনো আল্লাহ্‌কে চিনতে পারলো না, উনাকে ভালোবেসে ফিরে আসতে পারলো না। পড়ে ফেল এই লিখাটি- https://tinyurl.com/y232rv6a
    .
  • ফ্রেন্ড সার্কেল – আরেকটা ফিতনাহ। তোমার চার-পাঁচ বছরের রিলেশন। বন্ধুরা জানবে না এটা সম্ভব না। এখন তো তুমি তওবা করেছো, রিলেশন নেই, কবিরা গুনাহগুলা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছো, ফ্রি-মিক্সিং আড্ডায় যাও না। তারপরও ওরা ঠিকই কথায় কথায় তোমার প্রেমিকার কথা তুলবে, জানিস ওর তো বিয়ের কথা চলছে… আরেহ দোস্ত অনেকদিন পর দেখা তোর সাথে? কেমন আছিস? তোর রিলেশন কেমন চলতেছে? তুমি এগুলা শুনবে আর ভেতরে ভেতরে কষ্টে দগ্ধ হবে। তারচেয়ে বরং তওবা করা নিয়ে একটা Personal Statement লিখে ফেলো। এরপর তোমার ফ্রেন্ড সার্কেলের যারা জানতো এই রিলেশনের ব্যাপারে সবাইকে ফরোয়ার্ড করে দাও। যাতে আর কেউ কখনো দেখা হলে বা কথা প্রসঙ্গে অতীতের জাহিলিয়াতের কথা মনে করিয়ে না দেয়, ঠাট্টা না করে, খোঁটা না দেয়। দরকার হলে ফ্রেন্ডসার্কেলের পরিধি ছোট করে নিয়ে আসো। জাহেল বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট না করে বরং দ্বীনি বন্ধু বা মজলিসে সময় দাও। আল্লাহ্‌র কাছে দুয়া করো যেন এমন বন্ধু বা সাথী জুটিয়ে দেয় যে কিনা জান্নাতে গিয়ে তোমার কথা স্মরণ করবে, তোমার হালত জানতে চাইবে, তোমাকে না দেখতে পেলে আল্লাহ্‌র কাছে ফরিয়াদ করবে যেন তোমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন তিনি। (তোমার পরিবারেও যদি রিলেশনের কথা জেনে থাকে, স্পষ্ট বলে দাও- তা এখন অতীত।)

 

শুন্যতা ও অবসর

অবসর সময় যেমন নিয়ামত- যদি কাজে লাগানো যায়, তেমনি ফিতনাহর কারণও বটে। একাকী অবসরের মুহূর্তগুলা ফ্ল্যাশব্যাক করাবে অতীতের দিনগুলার কথা। আফসোস জেঁকে বসবে, না চাইতেও অনেক কিছু ফিরে পেতে ইচ্ছে করবে। শয়তানের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই একাকী কাটানো বেকার সময়গুলো। সাবধান। ফাঁদে পা দিও না। নিজেকে কোন না কোন প্রডাক্টিভ কাজে ব্যস্ত রাখো।

আচ্ছা তুমি তো জাহেল ছিলে, দুনিয়ার রং তামাশায় মত্ত ছিলে তুমি! কোরআন পড়তে পারো? ছোটবেলায় শিখেছিলে এখন ভুলে গেছো? তাহলে কেন নতুন করে শিখছো না? এই অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার কেন করছো না? কোরআন পড়া শিখো। এখন তো অনলাইনেই ওস্তাদরা শিখান মাশাআল্লাহ। আরেকটা কাজ করবে… মন খারাপ থাকলে ‘রিয়াজুস সালেহীন’ বইটা পড়া শুরু করবে। মন ভালো করে দিবে চমৎকার হাদিসগুলো। পরকাল নিয়ে ভাবো। ‘পরকালের পথে যাত্রা’ অডিও সিরিজ অবশ্যই শুনবে। নবীজি (সাঃ) এর জীবনী পড়। আল্লাহ্‌র জন্য, নবীজির ভালোবাসায় সাহাবীদের আত্মত্যাগের কথা চিন্তা কর। তোমার এই প্রেম-বিসর্জন কিন্তু খুবই সামান্য উনাদের ত্যাগের কাছে। বেশি বেশি বই পড়বে। এতদিন তো গাফেল ছিলে, এখন ভালোভাবে ইসলাম, ইমান, আখলাক, হারাম-হালালের সীমারেখা এ সব বিষয়ে বিশুদ্ধ সূত্র থেকে জেনে নাও।  দেখলে কত কাজ বাকি? আর তুমি হাপিত্যেশ করে মরছো তুচ্ছ মোহে? আর সম্ভব হলে খুব দ্রুত বিয়ে করে নাও। একাকীত্বের যন্ত্রণা দূর হয়ে যাবে। বাসায় বিয়ের কথা কীভাবে বলবে,কীভাবেই বা নিজেকে বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে তার জন্য ফলো করতে পারো এই সিরিজটি- তুমি এক দূরতর দ্বীপ (প্রথম কিস্তি , দ্বিতীয় কিস্তি, তৃতীয় কিস্তি, চতুর্থ কিস্তি)।

  • অবসরে এমন কোন বই পড়া যাবে না যা যৌন সুড়সুড়ি মার্কা প্রেমের জয়গান গেয়ে বেড়ায়। প্রেম উপন্যাস/ ছোট গল্প – সব বাদ। এগুলা মনে হাহাকার তৈরি করবে, শয়তানের কাজকে সহজ করে দিবে। হারামকে নর্মালাইজ করে এমন কোন কিছুই পড়বে না, দেখবে না, শুনবে না। তাদের প্রমোট করবে না।
    .
  • ফেসবুক জগতকে ফিল্টার করে রাখো। এমন সব বন্ধু, পেজ, গ্রুপ সব ফিল্টার করে রাখো (আনফলো, আনফ্রেন্ড, আনলাইক) যারা মেয়েদের ছবি/ভিডিও/ভয়েস আপ্লোড দেয় (হোক তা হিজাব, নিকাব- সবই তোমার জন্য ফিতনা, দূরে থাকো এসব থেকে)। গাইরে মাহরাম কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে রাখবে না, চ্যাট করবে না। ভুলে যেও না, তুমি তওবা করেছো সবরকম হারাম থেকে। ফ্রেন্ডলিস্টে এমন কাউকে ফলো করবে না যারা তাদের প্রেমিকা বা বউ এর সাথে ছবি আপ্লোড দেয়, চেক-ইন দেয়, খুনসুটির গল্প শেয়ার করে। এগুলা তোমার বুকের বাম পাশের চিনচিনে ব্যাথা আরও বাড়িয়েই দিবে। আমি তো অবাক হই কিছু ভাই-বোনদের কান্ড দেখলে, যারা ইউটিউব চ্যানেল খুলে হাসবেন্ড-ওয়াইফ এর খুনসুটি মার্কা ভিডিও শেয়ার করছে আর দেদারসে লাইক কামাচ্ছে। এগুলা বেহায়াপনার নিত্য নতুন ভার্শন। এগুলো থেকে দূরে থাকবে। তুমিও যখন একসময় বিয়ে করবে, যত ইচ্ছা খুনসুটি করবে তোমার জীবনসঙ্গিনীর সাথে, তা করা বরং উত্তম, কিন্তু একান্তে। কিন্তু কখনোই এগুলা পাবলিক প্লেসে আনবে না। সীমালঙ্ঘন করো না।
    .
  • সদ্য হারাম রিলেশন থেকে বের হয়ে আসলে বিয়ে নিয়ে চিন্তা করতে একদমই ইচ্ছে করে না, ওসব কিছুই ভালো লাগবে না, কিন্তু তা সাময়িক। কিছু সময় পার হলে দেখবে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠছো। বিয়ে করতে পারলে তো খুবই ভালো। আর করতে না পারলে কান্নাকাটি বাদ দাও। বিয়ে/প্রেম নিয়ে গল্প-কবিতা পড়া, শেয়ার দেয়া এসব বন্ধ কর। সবর কর, রোজা রাখো। যেখানে যার সাথে কথা বললে বিয়ে করা সহজ হবে সেখানে তার সাথে আলাপ করো। বিয়ের জন্য নিজেকে শারীরিক-মানসিক-আর্থিকভাবে প্রস্তুত করে নাও।
    .
  • শরীর ও মনকে চাঙ্গা রাখতে হবে, ফুরফুরে রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই বিষণ্ণতা পেয়ে না বসে। মসজিদে গিয়ে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়লে মন ফ্রেশ হয়ে যাবে। ফজরের নামাজ জামাআতে আদায় করে সরাসরি বাসায় না ঢুকে একটু হাঁটো বা দৌড়াও। সে সময়ের বাতাস দিনের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে পবিত্র থাকে। ছোটো ভাইবোন কাজিনদের সাথে ( অবশ্যই ছেলে কাজিন) সময় কাটাতে হবে। বাবা মার সাথে সময় কাটাও। দেখো কতো ভালোবাসা নিয়ে বসে আছেন তাঁরা তোমার জন্য।বাসা থেকে দূরে থাকলে কথা বল ফোনে। দুপরে একটু ঘুমিয়ে বিকেলের দিকে খেলতে যাও মাঠে। সমাজসেবা মূলক কাজে সাহায্য করা, ছাদে বাগান করা, বিড়াল,পাখি, খরগোশ পোষা মানে হবি টাইপের কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। সপ্তাহে একদিন কোথাও থেকে ঘুরে আসো নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে সবসময়। যেন ওইসব ছাইপাঁশ প্রেমের স্মৃতি তোমার আশেপাশেও ভিড়তে না পারে।
    .
  • কোন দাওয়াই খেয়ে কাজ না করলে স্রেফ তোমার জান্নাতী স্ত্রীদের কথা ভাববে যখন অতীতের প্রেম বেয়াড়ার মত কড়া নাড়বে মনের পর্দায়। কেনই বা ভাববে না? তোমার জান্নাতি স্ত্রীগণ, মুক্তার ন্যায় উজ্জ্বল যাদের সৌন্দর্য, যাদের কোন জিন আর মানুষ স্পর্শ করেনি, তারা যে প্রতিনিয়ত তোমার কথা ভাবে, তোমার অপেক্ষায় থাকে তা কি তুমি জানো না? রসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: যখন কোন মহিলা তার স্বামীকে কোন কষ্ট দেয়, তখন আয়তনয়না হুরদের মধ্য থেকে মুমিন স্ত্রী বলবে যে, আল্লাহ তোমকে ধ্বংস করুন, তাকে কষ্ট দিও না। সে অল্প দিনের জন্য তোমার নিকট আছে অতি শীঘ্রই সে তোমাদেরকে ছেড়ে চলে আসবে । (ইবনে মাযাহ, আলবানী ,১ম খন্ড, হা: নং১৬৩৭)। ভাই, তুমি কি এমন পবিত্র রমণীদের কথা ভাববে না যারা তোমাকে ছাড়া আর কারও দিকে চোখ তুলেও তাকাবে না? যারা তোমারই সমবয়সী হবে, কখনও মুটিয়ে যাবে না, কখনও তার আকর্ষণ হারাবে না, বরং বৃদ্ধিই পাবে দিনকে দিন? তুমি কি এমন কারো সাথেই থাকতে চাও না? অনন্তকাল…

 

অনেক বড় বড় উপদেশ দিয়ে ফেললাম! মন খারাপ করো না। আমি জানি এত ‘মানতে হবে’, ‘করতে হবে’ তোমার জন্য কত কঠিন… মাত্রই তো ফিরে এসেছো। আমি এজন্যই শুরুতে বলেছি, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির পথে যাত্রা কেবল শুরু। কখনো ধৈর্য হারা হবে না, কখনো ভাববে না ‘আমি পারবো না’। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাও, দেখবে আল্লাহ্‌ সাহায্য করবে। আল্লাহ্‌ যে সাহায্য করেন, অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেন- তুমি এ কথা কিন্তু খুব ভালোভাবেই বিশ্বাস কর এখন, তাইনা? দুনিয়া তো আমাদের জন্য কারাগার, কারাগারে কি সুখে থাকা যায় ভাই? এখানে পদে পদে পরীক্ষা থাকবে, কষ্ট থাকবে, না পাওয়ার বেদনা থাকবে। এগুলো মেনে নাও। আল্লাহ্‌র জন্য, উনাকে ভালোবেসে, উনার সন্তুষ্টির আশায়। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি মানেই তো জান্নাত। সব না-পাওয়ার আবদার না হয় জান্নাতে গিয়েই কইরো।

জাহান্নাম থেকে একেবারে শেষে যে মুসলিম ব্যক্তি বের হবে সাজাভোগ শেষে তাকে যখন জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তখন আল্লাহ্‌ বলবেন, ‘চাও।’ সে চাইতে থাকবে। কিছু চাইতে ভুলে গেলে স্বয়ং আল্লাহ তাকে বিভিন্ন জিনিসের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন! আর বলবেন, ‘এটা চাও, ওটা চাও।’ এভাবে আল্লাহ তাকে স্মরণ করাতে থাকবেন, আর লোকটি চাইতে থাকবে। অবশেষে আর কিছুই থাকবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, ‘তোমার সব ইচ্ছা পূর্ণ করা হলো। তার সাথে আরও দশগুণ (তোমাকে দেয়া হলো)’। [বুখারী, আযান অধ্যায়, ১/৭৬৯; ইসলামিক ফাউণ্ডেশন]

অপূর্ণতায়, নষ্ট কষ্টে কয়েকটা দিন না হয় যাক, জান্নাতের প্রথম পদক্ষেপই তো বৈশাখী ঝড়ো হাওয়ার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাব সকল দুঃখ, ভুলিয়ে দিবে সকল অপ্রাপ্তির বেদনা।

তাইনা ?

শেয়ার করুনঃ