বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।
.
অন্ধকারে সাতটি বসন্তঃ

কেবল মাত্র বার টপকে তের বয়স। আর দশটা ছেলের মতোই স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করছিলাম। পড়াশোনা,খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা সবকিছুতেই ছিলাম মোটামুটি পারদর্শী। আলহামদুলিল্লাহ ! ভদ্রছেলে হিসাবে সবার কাছে বেশ পরিচিত ছিলাম। চাকরির সুবাদে বাবা-মা দু জনেই ঢাকাতে পাড়ি জমালেন। আমাকে রেখে গেলেন নানার বাসায়। তখন সম্ভবত ক্লাস এইটে পড়ি। নানার বাসায় গিয়েও ভর্তি হলাম ক্লাস এইটে। কারো সাথে দ্রুত বন্ধুত্ব করতে আমি বেশ একটা পটু ছিলাম না। সেই জন্য নানার বাসায় নিজেকে খুবই একলা একলা মনে হত। যাই হোক কথা না বাড়িয়ে মুল টপিকে আসি, বেশ কিছু দিন পর যখন রুমে একা শুয়ে আছি, কেন যেন অজানা কারণে ঘুম আসছিল না। হঠাৎ, মাথায় কুচিন্তা আসলো, গায়ে কেমন যেন একটা জ্বালাতন শুরু হলো। উত্তেজিত হয়ে গেলাম খুবই। আমার এমনটা এর আগে কখনো হয়নি । তারপর পেনিস নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে হলো। করলামও। ব্যাস!! যা হবার তাই হলো,ভাবলাম প্যান্টে হয়তোবা প্রস্রাব করে দিয়েছি। কিন্তু না,আবিষ্কার করলাম অন্য কিছু, পেনিস দিয়ে আঠালো জাতীয় পদার্থ বের হল। অবাক হলাম! সাথে কিছুটা ভয়ও পেলাম। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, ব্যাপার টা আসলে কী ঘটলো। কেননা যৌনতা সম্পর্কে তখনও আমার স্বচ্ছ ধারনা ছিল না। তবে যাই ঘটুকনা কেন, আমি বেশ আনন্দ অনুভব করলাম। যেহেতু আনন্দ পেলাম তাই; পরবর্তীতে কোন একদিন তৈলাক্ত জাতীয় কিছু একটা দিয়ে শুরু করলাম আগের মত পেনিস নিয়ে নাড়াচাড়া। বেশ মজা পেলাম। মজা পাওয়াতে আমি এটা প্রায়ই করতাম। তবে পর্ন বা চটি জাতীয় অশালীন কোন কিছুর সাথে তখনও আমার পরিচয় হয়নি।
.
…এভাবে নিজে থেকেই আমি আসক্ত হয়ে পড়লাম মাস্টারবেশনে। তারপর আমার জীবনের কালো অধ্যায়গুলো রচনা হতে শুরু করল। তখন পর্যন্ত আমি বুঝিনি যে, মাস্টারবেশন করা শারীরিক মানসিক সহ সব দিক দিয়েই ক্ষতিকর। একদিন স্কুলের এক বন্ধুর কাছে শুনি যে এটা ক্ষতিকর!!!
কিন্ত কে শুনে কার কথা। তখন তো আমি মাস্টারবেশনে পুরে দমে আসক্ত এক নরকীট। তারপর আস্তে আস্তে পরিচয় পর্নোগ্রাফির সাথে। তবে পর্নে খুব একটা আসক্ত ছিলাম না। আমার মূল সমস্যা ছিল মাস্টারবেশন। দিনেরাতে মিলে ৫/৬ বারও মাস্টারবেট করতাম।ভাই বলতেও লজ্জা করছে কিন্তু কি আর করবো বলুন; তখন তো আমি শয়তানের দাসে পরিণত হয়েছি।
.
যখন কোথাও বসে থাকতাম, বসা থেকে উঠলে মাথাটা প্রচন্ড যন্রণা করতো, চোখে সব অন্ধকার দেখতাম। স্ব্যাস্থ একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। যে কেউ দেখলে চোখ বুজে বলে দিত পারত এ ব্যাটা নিশ্চিত গান্জাখোর। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে মনে হত, সাহারা মরূভূমি পাড়ি দিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি । হাড্ডিসার বুড়ার মতো দেখাতো আমাকে। রাস্তাঘাটে মেয়েদের দেখলে ভিতরে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যেত। যদিও হাইস্কুলে আমি কোন মেয়ের সাথে কখনো কথা বলিনি। বেশ লজ্জাবোধ কাজ করতো ভিতরে। সেই সুবাদে ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের কাছে ‘ভদ্রছেলের’ খেতাবও পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কেউই জানতো না, দেখতে ভদ্র এই মানুষটার ভেতরে কতটা পশুত্ব লুকিয়ে আছে! ভাবতাম, হয়তো এই দুনিয়ায় আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা মাস্টারবেশনে আসক্ত।
.
আমার মত আসক্ত, কোন ব্যক্তির সাথে আমার তখনও পরিচয় ছিল না। বিশেষ করে এই গ্রুপের মাধ্যমে জানতে পারলাম যুব সমাজের মাস্টারবেশন,পর্ন কতটা ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে। হে আল্লাহ, তুমি আমার ভাইদেরকে রক্ষা কর। বৃষ্টিবিলাস, বিকেলের পড়ন্ত রোদ, সকালের মৃদু হাওয়া , অন্ধকার রাত্রে বসে বসে আকাশে তারার দিকে চেয়ে পৃথিবী বুকে নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব অনুভব, ভোরবেলায় বুক ভরে প্রকৃতির ঘ্রাণ, আমার ছোট্ট পৃথিবীতে এগুলো ছিলো খুব খুব প্রিয়। এগুলো আস্তে আস্তে আমার কাছে অধরা হয়ে গিয়েছিল ততদিনে। পুরো পৃথিবী থেকে আমি যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। সব সময় একলা থাকতে পছন্দ করতাম। কেউ বাসায় আসলে তাদের সামনে যেতে লজ্জা করতো, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম। বড্ড অসহায় লাগতো নিজেকে। এমন অনেক দিন গেছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অঝরে কেঁদেছি। খেতে মন চাইতো না কিছুই। অনেকেই তো আমাকে জিগ্যেস করে বসেছে, যে আমি মাস্টারবেট করি কিনা। লজ্জা আর ভয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। এভাবেই কাটছিল আমার অন্ধকারছন্ন জীবনের দিনগুলি।
.
তারপর যখন কলেজে উঠি তখন শুরু হলো জীবনের আরেকটা কালো অধ্যায়। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পরলাম। একটা মেয়ের প্রেমেও পড়েছিলাম; মাস চারেক পর অবশ্য তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। খারাপ লেগেছিল কিছুটা কিন্তু মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। তবে সিগারেটের আসক্তি দিনদিন বেড়েই চলেছিল। শারীরিক মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ছিলাম। খুবই একা মনে হত নিজেকে। সব থেকেও, যেন মনে হত কিছু নেই আমার। পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছিলাম অনেক আগেই। কিছুই মনে থাকতোনা। ভেতরটা সবসময় হাহাকার করতো।এদিকে ইচ্ছা করলেও মাস্টারবেশন ছাড়তে পারছিলাম না কিছুতেই। যতদূর মনে পড়ে অনেক কষ্টে একবার মাত্র ১৪/১৫ দিনের মত দূরে ছিলাম। কিন্তু এর বেশিদিন পারিনি। পরে আবার আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম।
.

Image may contain: text

কেনইবা আসক্ত হবো না, মন থেকে হয়তো কখনো চাইনি যে,এই অন্ধকার জগত থেকে বের হয়ে মুক্ত বাতাস গ্রহন করবো। এভাবেই চলছিল আমার দিনগুলো। যাক, অবশেষে এলো সেই শুভক্ষণ।
.
ভোরের সোনালি আলোয় সজীবতার ঘ্রাণ-

জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলিতে বেঁচে থাকার আশাটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ, কোন এক পড়ন্ত বিকেল বেলা কেন জানি খুব ইচ্ছা হল একটা খাতা আর কলম নিয়ে নিজের সমস্যা গুলা কলমের খোচায় খাতায় লিখতে। ব্যাস, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। শুরু করলাম লেখা, প্রথমে শরীরের ভেতরে আমার কী কী সমস্যা তাই লিখলাম, যেমন :-গ্যাস্ট্রিক, মাস্টারবেশন, এ ছাড়া আরো কিছু টুকিটাকি। আর শরীরের বাইরের সমস্যা হল :- দেরিতে ঘুমানো, অনেক দেরি করে ঘুম থেকে উঠা, বাজারে অনেক বেশি আড্ডা দেওয়া, ধুমপান করা ইত্যাদি। লেখার পর আনমনে ভাবতে লাগলাম, কিভারে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অবশেষ সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠবো। যদিও অন্যদিন আমি সকাল ১০টার আগে ঘুম থেকে উঠতে পারতাম না।
.
পরেরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলাম, তারপর রাস্তায় একটু হাঁটাহাটি করতে গেলাম। আহহ!!! কতদিন পর যে ভোরবেলার সূর্যটা দেখলাম। মনটা প্রশান্তি তে একদম ভরে গেল। কি যে ভাল লাগছিল আমার তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। এভাবে দুই চারদিন কেটে গেল, ঘুম থেকে উঠে প্রত্যেকদিন হাঁটাহাটি করলাম। তারপর থেকে প্রতিদিন ভোরবেলায় আম্মু ঘুম থেকে ডেকে দিত, ফজরের সালাত পড়ার জন্য। ফজরের সালাত যেহেতু জামা’আতের সাথে পড়া হয়, তাই অন্য ওয়াক্তের সালাত কাযা করতেও ইচ্ছে করত না। যেদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠার পর ফজরের সালাত কাযা না করার প্রতিজ্ঞা করছিলাম…আমার স্পষ্ট মনে আছে, তারপর থেকে আর কখনোই আমি মাস্টারবেট করিনি।
.
আলহামদুলিল্লাহ্‌! কেন যে মাস্টারবেশন আসক্তি একদম কেটে গিয়েছে তার কারণটা আজও অজানা। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে, আমি এমন একটা জঘন্য অভ্যাস এত সহজে ত্যাগ করতে পারব। আস্তে আস্তে আমি সালাতের খুযু খুশুর প্রতি মনোযোগী হলাম। আলহামদুলিল্লাহ্‌। সপ্তাহ দুয়েক পরে আমি ধুমপান করাও ত্যাগ করলাম। এটাও যে কিভাবে সম্ভব হলো তাও আমার কাছে অজানা। হয়তো মন থেকে ভাল হয়ে যেতে চেয়েছিলাম তাই।
.
তবে ধুমপান ত্যাগ করার পিছনে একটা কাহিনী আছে। একদিন এশা বাদ হাদিসের থেকে তালিম দেওয়ার সময় একটা হাদিস শুনছিলাম। তারপর নিয়্যত করলাম আর খাবো না। আর খাইনি। আলহামদুলিল্লাহ্‌! আল্লাহর অশেষ নিয়ামতে এখন ভালো আছি। মনে প্রশান্তি পাই সর্বদা। সব কাজ মন দিয়ে করতে পারি।
.
কিছু কথা-

প্রিয় ভায়েরা আমার, মন থেকে কিছু চাইলে আর নিয়্যত পরিশুদ্ধ করলে আল্লাহ্ সুবাহানু তা’আলা তাঁর বান্দাকে কখনো নিরাশ করেন না।
আল্লাহ্‌ সুবাহানু তা’আলার কাছে চান। মন থেকে দুআ করুন। হেদায়াত চান। ইনশাআল্লাহ, তিনি আপনাকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ দেখাবেন।
পানির ওপর ভেসে থাকা শাওলা যেমন একটুখানি ঢেউ এসে শাওলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি আল্লাহ্ সুবাহানু তা’আলার রহমতের ঢেউও আপনার সকল দুঃখ -কষ্ট কে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
.
অন্ধকার থেকে আলোর পথে ভ্রমণে যা শিখলাম-

১.পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তাকবীরের সাথে প্রথম কাতারে পড়ার চেষ্টা করতে হবে।
২. নফল সালাত বেশি বেশি করে পড়তে হবে।
৩. দৈনন্দিন যিকির- আজকার গুলো করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি হিসনুল মুসলিম এ্যাপ টা ব্যবহার করতে পারেন।
৪. সবসময় অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করতে হবে।
৫. চোখের হেফাযত করতে হবে।মাহরাম-ননমাহরাম মেইন্টেইন করে চলতে হবে।
৬. তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করতে হবে। এই নফল সালাতের অনেক অনেক ফজিলত।
.
নিজের কথাগুলোকে সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি। জানি ভাল হয়নি। কেননা লেখালেখির অভ্যাস আমার নেই। তাই কিছু ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ভুল গুলোকে শুধরে দিবেন। আর আমার জন্য দুআ করবেন। আল্লাহ যেন আমাকে হেদায়াতের ওপর অটল রাখেন। আমীন।

.
চলবে ইনশা আল্লাহ…
(লস্ট মডেস্টি টিম কর্তৃক ঈষৎ পরিমার্জিত)
.
পড়ুন আগের লিখা গুলো-

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

শেয়ার করুনঃ