স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত!( তৃতীয় পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত!( তৃতীয় পর্ব)

ছোটবেলা থেকেই বিদেশী মুভি দেখা বা বই পড়ার কারণে বিদেশ (স্পেশালি নর্থ আমেরিকা, ইউরোপ) এবং বিদেশের জীবন নিয়ে একটা ফ্যাসিনেশন থাকে সবার। ওয়েল, সবার থাকে কি না বলতে পারি না, অন্তত আমার ছিল। ওখানকার মানুষদের প্রতি মৃদু ইর্ষাও হত যে তারা ছোটবেলা থেকেই কি চমৎকার পরিবেশে, সুন্দর জায়গায় বড় হচ্ছে, থাকছে। মনে হত কোন মতে ওরকম একটা দেশে যেতে পারলেই কেল্লা ফতে। যতই সময় যাচ্ছে, আমি আল্লাহ্‌র প্রতি ততই কৃতজ্ঞ হচ্ছি যে উনি আমাকে চমৎকার একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন। দিয়েছেন পরিবারের প্রতি সম্পূর্ন নিবেদিত একজন মা এবং স্ত্রী-সন্তানদের সযত্নে আগলে রাখা একজন বাবা।

.. . কানাডায় আমার প্রবাসের প্রায় এক বছর পার হতে চলল। এই এক বছরে এখানকার মানুষদের প্রতি আমার সেই ফ্যাসিনেশনটি করুণায় পরিণত হয়েছে। পড়াশোনা আর অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজরের মানসিক যাঁতাকল নিয়ে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের কষ্টের কথা দেশের অনেকেই মোটামুটি শুনেন/জানেন বলে সেটা নিয়ে এখানে কথা বলবো না। তার চেয়ে বরং চেষ্টা করবো একটু ব্যাখ্যা করার কেন এখানের মানুষগুলো আমার চোখে ফ্যাসিনেশন থেকে করুণার পাত্রে পরিণত হল। তবে প্রথমেই বলে নেই যে এদের একদম সবকিছুই খারাপ না, কিছু কিছু জিনিস আমার ভাল লাগে। ওগুলোও বলবো। . .

.এখানে অনেক ধর্মের এবং অনেক ধরণের মানুষ আছে। আস্তিক, নাস্তিক, ট্রান্সজেন্ডার, হোমোসেক্সুয়াল সবই আছে প্রচুর পরিমাণে। ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায় ইহুদি উপাসনালয়, স্কুল/কলেজ অনেক। আবার নগরের ভিতর জায়গায় জায়গায় খ্রিস্টানদের চার্চ আছে ভালই। “জেহোভার সাক্ষী” (Jehovah’s Witness) হল খ্রিস্টানদের ধর্মীয় দাওয়াত দেওয়ার একটি গ্রুপ। এরা সপ্তাহে একবার-দুইবার সবাই একসাথে বসে বিভিন্ন সোশাল অ্যাকটিভিটি করে (যেমন সবাই মিলে নতুন কোন ভাষা শেখা, বা শিক্ষামূলক ভিডিও দেখা) আর খ্রিস্ট ধর্মের গুণগান করে। মাঝে মাঝে নতুন কাউকে পেলে দাওয়াত দেয়। আমাকেও দুই-তিনবার ভদ্রভাবে দাওয়াত দিয়েছিল ওদের দুইজন। সাদা চামড়ার একজন মানুষ রাস্তায় হঠাত করে আমাকে দাঁড় করিয়ে মোটামুটি শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে আমাকে দাওয়াত দিচ্ছে, বেশ অবাকই হয়েছিলাম। ঐ কাহিনীগুলো আরেকদিনের জন্য তোলা থাক। মসজিদও আছে মোটামুটি ভালই। বাংলাদেশ থেকে আসার পর যে জিনিসগুলো মিস করি, সেগুলোর একটা হল প্রতি ওয়াক্তে আযান শোনা। এখানের নিয়ম হল মসজিদে আযান হলে আযানের শব্দ শুধু মসজিদের ভিতরেই থাকবে, বাইরে যাবে না। তাই সাধারণত ঘড়িতে সময় দেখেই নামাজ পড়া লাগে, আযান শুনে নয় [১]।

আপাতদৃষ্টিতে এরা ধর্মনিরপেক্ষ। সরকার বড় গলায় তা-ই প্রচার করে। কিন্তু হর্তা-কর্তাদের নীতি নির্ধারণী দেখে বোঝা যাবে এরা আসলে অ্যান্টি-মুসলিম ছাড়া কিছুই না। কিছুদিন আগেই নিয়ম করা হয়েছে যে বাসে/ট্রেনে উঠতে হলে মুখ ঢেকে রাখা যাবে না। নিকাব করা যাবেনা। সরকারী কোন অফিসে চাকরি করতে হলে এমন কোন পোষাক পরা যাবে না যেটা দেখে তার ধর্ম বুঝা যায় (হিজাব, নিকাব, টুপি ইত্যাদি)। [২,৩,৪]

.সাধারণ মানুষদের কাছে ধর্ম বেশ সেনসিটিভ বিষয়। প্রফেশনাল ওয়ার্কপ্লেসে কেউ সাধারণত কারো ধর্ম নিয়ে কোন কথা বলে না। কোন মিটিং শেষে কোন নারী হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত এগিয়ে দিলে ভদ্র ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলি যে আমি মুসলিম।. .

.যেহেতু এটা “উন্নত বিশ্ব”, তাই এখানে ট্রান্সজেন্ডার( Transgender বা Transexual এবং হিজড়া কিন্তু এক জিনিস নয়। হিজড়া মানে তো বুঝতেই পারছেন। Transgender বা Transexual হলো এমন একদল মানুষ যারা মনে করে তারা ভুল শরীরে আটকা পড়েছে। জন্মগতভাবে পুরুষ মনে করে যে, সে আসলে নারী কিন্তু পুরুষের শরীরে আটকা পরেছে। ঠিক একইভাবে জন্মগতভাবে নারী মনে করে যে সে আসলে পুরুষ, কিন্তু ভুলে নারীর শরীরে আটকা পড়েছে।-লস্টমডেস্টি), হোমোসেক্সুয়াল এবং হাজারো সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের মানুষের সংখ্যা অসামান্য। রাস্তা ঘাটে অহরহ এরকম কাপল ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। বছরে একবার ঘটা করে LGBT প্রাইডের র‍্যালি হয়।যদিও এখন শুধু LGBTতেই সীমাবদ্ধ নেই, কিছুদিন পর পরই একটা-দুইটা করে লেটার বা সিম্বল যোগ হতে থাকে, দেখা যাবে আমার এই লেখা লিখতে লিখতে আরো লেটার যোগ হয়ে গেছে, তাই শুধু LGBTতেই রেখে দিলাম। (কানাডা হলো বিশ্বের চতুর্থতম দেশ যারা সমলিঙ্গের বিয়েকে বৈধ্যতা দিয়েছে। আমেরিকারও অনেক আগে। সমকামী বিয়ের বৈধতা দানকারী প্রথম তিনটি দেশ হল যথাক্রমে নেদারল্যান্ড,বেলজিয়াম এবং স্পেইন- লস্টমডেস্টি। [৫,৬])

.এবারে একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। কিভাবে একটা সমস্যা থেকে আরো সমস্যা তৈরী হয়, কিভাবে সমস্যা সমাধানের ভান করতে হয়, এগুলো একটু আলোচনা করা যাক। শীতকালে রাস্তা-ঘাটে চলাচল করে একটু শান্তি পাওয়া যায়। ঠান্ডা যত বেশি, তত ভাল। কেন? কারণ, পোশাক। গরমের সময় নারীকূলের পোশাকের অবস্থা এত বাজে থাকে যে রাস্তা-ঘাটে চলাচল করতে গেলে প্রায় পুরোটা সময়ই চোখ মাটির দিকে রাখা ছাড়া উপায় থাকে না। আচ্ছা পোশাকের কথা তো বললাম। এবার এর সাথে “একেবারেই সম্পর্কহীন” আরেকটি জিনিস বলি। যৌন হয়রানি। কেন জানি (!) এসব দেশে যৌন হয়রানি খুবই বেশি।  এবং এরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য খুবই তৎপর (!)। সব অফিসেই বছরে অন্তত একবার যৌন হয়রানি রোধে সেমিনার হবে। আমি রিসার্চ ট্রেইনি হিসাবে একটি সংস্থায় যোগ দেওয়ার কয়েকদিন পর একটি বাধ্যতামূলক সেমিনারের ইনভাইটেশন পেলাম। বিশাল অডিটোরিয়ামে সব কর্মীদের নিয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধমূলক এক সেমিনার। মূলত, কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে, নারী সহকর্মীর সাথে খাজুরে আলাপের সময় কোন কোন কথা বলা যাবে আর কোন কোন কথা বলা যাবে না, স্পর্শ করা যাবে কি যাবে না, এসবই সবাইকে বলা হল ঘণ্টাখানেক ধরে।

.এদের একটা “যেমন খুশি তেমন সাজো” দিবস থাকে প্রতি বছর। আদর করে সেই দিবসকে হ্যালোউইন বলা হয়। হ্যালোউইনে নিজের স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটাতে অনেকেই সর্বনিম্ন পরিমাণের কাপড় পরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে। এই হ্যালোউইনের কয়েকদিন আগে থেকেই দেখলাম ক্যাম্পাসে বেশ কিছু পোস্টার যে হ্যালোউইনে মানুষ যেন যৌন হয়রানি থেকে সাবধান থাকে।

.এদের এই সব ঢং দেখে মনে হয় ব্যাপারটা এরকম- আমি জানি আগুনে হাত দিলে আমার হাত পুড়ে যাবে। আমি তাও আগুনে হাত দিব, কিন্তু চাইবো যে আমার হাত পুড়বে না, হাজার রকমের চেষ্টা করতে থাকবো হাত না পুড়ানোর, শুধু আগুন থেকে হাতটা টেনে বের করা ছাড়া। . কিছুদিন আগে একটা আর্টিকেল পড়লাম যে #metoo মুভমেন্টের কারণে এখন কর্মক্ষেত্রে পুরুষরা তাদের নারী সহকর্মীর সাথে একদম প্রয়োজন ছাড়া অযথা কোন সময় কাটাচ্ছেন না, একসাথে একান্তে লাঞ্চ বা ডিনার করা তো দূরের কথা (যা কি না খুবই প্রচলিত ছিল)। ঐ আর্টিকেলে নারী-পুরুষের এই দূরত্বকে নেতিবাচক জিনিস হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছিল, কিন্তু আমার বরং খুশিই লাগল।

(কানাডাতে নারী এবং শিশুদের ভয়ঙ্কর যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়। প্রতি ৩ জন কানাডিয়ান নারীদের মধ্যে ১ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হন। প্রতি ৬ জন পুরুষের মধ্যে ১ জন জীবনে কমপক্ষে একবার হলেও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। ভয়ের ব্যাপার হলো শতকরা ৫ জন তাদের যৌন নিপীড়নের ব্যাপারে মুখ খোলেন। #metoo মুভমেন্টের পর অবশ্য রিপোর্ট করার সংখ্যা বেড়েছে। ৬৭ শতাংশ কানাডিয়ান জানাচ্ছেন তারা কমপক্ষে এমন একজন নারীকে চেনেন যাকে দৈহিক বা যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। ধর্ষণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এলকোহল।[ ৭,৮,৯]

.২০১৪ সালের একটি জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে প্রায় ২৪ লক্ষ কানাডিয়ান শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বহুগুনে বেশি। আমরা আগেই বলেছি যে যৌন নিপীড়নের ব্যাপারে খুবই কম সংখ্যক কানাডিয়ান মুখ খোলেন। [১০]

Canadian Medical Association Journal বলছে এই সংখ্যা আরো বেশি। প্রায় ৩৬ লক্ষ। মানে হলো প্রতি ১০ জনে ১ জন ১৬ বছর বয়স হবার আগেই যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। [১১,১২]

কানাডার কর্মক্ষেত্র-অফিস আদালত নারীদের জন্য স্রেফ দোযখ।

নব্বই শতাংশের কিছু বেশী কানাডিয়ান নারীরা বলেছেন তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে অন্তত একবার কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন । নব্বই শতাংশ পুরুষও স্বীকার করেছেন তারা অন্তত একটি কর্মক্ষেত্রে সংঘটিত যৌন নির্যাতনের কথা জানেন বা নিজে সাক্ষী ছিলেন । কর্মক্ষেত্রের এই যৌন হয়রানীই বোধহয় সেই প্রভাবকগুলোর একটা , যেগুলোর কারণে কানাডিয়ান নারীরা খুব ঘন ঘন চাকুরী পরিবর্তন করেন। [১৩]

Human Resources Professionals Association এর জরিপে উঠে এসেছে যে প্রতি তিন জনে একজন কানাডিয়ান নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের শিকার হন। পুরুষরাও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। প্রতি ১০০ জন পুরুষের ভেতর ১২ জন কর্মক্ষেতের যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এই রিপোর্টেও উঠে এসেছে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের ঘটনার রিপোর্ট করা হয়না। বলাই বাহুল্য #metoo মুভমেন্টের পর এই ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসছে।– লস্টমডেস্টি। [১৪,১৫,১৬] )

.এখানের মানুষ খুবই আত্মকেন্দ্রিক এবং ক্যারিয়ার-ওরিয়েন্টেড। ছেলে-মেয়ে আঠারো-বিশ বছর বয়স হলেই বাবা-মা আশা করে ছেলে-মেয়েরা আলাদা হয়ে যাবে তাদের থেকে। সারা জীবন আত্মকেন্দ্রিক থাকার কারণে বুড়ো বয়সে গিয়ে দেখা যায় এরা একদম একা হয়ে গিয়েছে। হয় ওল্ড হোমে গিয়ে দিন কাটাতে হয়, অথবা নিজের বাড়িতেই প্রায় নিঃসঙ্গ ভাবে শেষ দিন গুলো পার করতে হয়। নিঃসন্তান এক বৃদ্ধাকে চিনি, যার বাবা-মা, স্বামী কেউ বেঁচে নেই, নেই কোন আত্মীয়-স্বজন। তার দিন কাটে একলা অ্যাপার্টমেন্টে। তার নিঃসঙ্গতার কথা চিন্তা করলে দম আটকে আসে আমার।

( প্রতি ৩ জন কানাডিয়ানদের ১ জন ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন।কিশোর কিশোরী তরুণ তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভয়াবহ। ছোট্ট বয়সটাতেই হতাশা,অবসাদ, ক্লেদ জাঁকিয়ে বসেছে এমন  কিশোর কিশোরী তরুণ, তরুণীর সংখ্যা  হুহু করে বাড়ছে। প্রতি পাঁচজনের একজন মনোযাতনায় ভুগছে। এদের সামনে লম্বা একটা সময় পড়ে আছে, জীবনতো শুরুই হয়নি কিন্তু এরই মধ্যে তাদের পৃথিবী  এতোটাই সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে যে অনেকে  আত্মহত্যা করে  পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। এই বয়সের কানাডিয়ানদের মৃত্যুবরণের দ্বিতীয় শীর্ষ কারণ হল আত্মহত্যা।

ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Jean Clinton সতর্ক সঙ্কেত জানিয়ে বলছেন, তরুণ তরুণীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মানসিক সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। অবশ্যই বলতে হবে আমাদের সমাজ  এক মহাসঙ্কটের ভেতর পড়েছে’।–লস্টমডেস্টি [১৭,১৮,১৯]। )

.যেহেতু ধর্মীয় বিধি-নিষেধ নেই, তাই এদের কাছে প্রেম-ভালোবাসার সংজ্ঞাও ভিন্ন। সম্ভাব্য পার্টনারের সাথে প্রথমেই শারীরিক সম্পর্ক করে, তারপর চিন্তা করে দেখে ভালো বাসা যাবে কি না, সম্পর্ক চালালে ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে কি না। ক্যারিয়ার এবং স্বার্থ প্রাধান্য পায় বলে সম্পর্কগুলোও হয় ঠুনকো, ভাংতে সময় লাগে না। . রিসার্চের কাজে আমাকে কয়েক জায়গায় কাজ করার দরকার হয়েছে। এক জায়গার অভিজ্ঞতা বলি। ওখানে আমার সাথে আরো ৩-৪ জন ছেলে কাজ করতো। আমি ওখানে নতুন, আর ঐ ছেলেগুলোকে বেশ ফ্রেন্ডলি মনে হত বলে ভাবতাম এদের সাথে ভাব জমাতে পারলে ভালই হবে। কাজের ফাঁকে ওরা গল্প করতো নিজেরা নিজেরা। একদিন শুনি যে একজন আরেকজনকে এক মেয়ের ব্যাপারে বলছে। মেয়েটার নাম মনে নাই, ধরে নিই লুসি। তো শুনলাম ছেলেটা বলছে, “আরে আমি লুসিকে কোনভাবেই বুঝাতে পারছি না যে ও আমার গার্লফ্রেন্ড না। ও মনে করছে আমরা কাপল। অথচ আমরা কাপল না! মাত্র দুইবার একসাথে রাত কাটিয়েছি আমরা! আর ও কি না মনে করছে আমি ওর বয়ফ্রেন্ড হয়ে গেছি।”

.বলা বাহুল্য, ছেলেটার ভাষা এতটা ভদ্র ছিল না। এই আলাপ শোনার পর ঐ ছেলেগুলোর সাথে আমার খাতির জমানোর শখ ঐ মুহুর্তেই উবে গেছে। . .

.মানুষ সব সময় একটা গোল বা লক্ষ্য মাথায় রেখে আগাতে থাকে। আপনি যখন স্কুলে পড়ছেন, তখন আপনার লক্ষ্য থাকে যে সামনের পরীক্ষাতে ভাল করা, এবং সামনের পরীক্ষাগুলোতে ভাল করলে ভাল একটা কলেজে চান্স পাবেন। একইভাবে কলেজ, ইউনিভার্সিটি, চাকরি, প্রমোশন, বিয়ে, সন্তান, আরো প্রমোশন। কিন্তু তারপর? আল্টিমেট গোল বা চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? আস্তিক আর নাস্তিকের মধ্যে তফাৎটা এখানেই। আস্তিকের পরকালে বিশ্বাস আছে বলে তার অন্য সব লক্ষ্য অর্জন হলেও পরকালের লক্ষ্যটি মাথায় থাকে ঠিকই। কিন্তু নাস্তিক হওয়ার সাইড-ইফেক্টগুলোর একটি হল, কোন চূড়ান্ত লক্ষ্য না থাকা। চাকরি, প্রমোশন ইত্যাদি চলতে চলতে জীবনকে এক পর্যায়ে স্থির মনে হতে থাকে। লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে মানুষ তখন ভাল থাকতে পারে না। যেহেতু “আধুনিক” মানুষ মাত্রই নাস্তিক, তাই এদিকের মানুষের ডিপ্রেশন, মানসিক সমস্যা অত্যন্ত বেশি। আর এই ডিপ্রেশন চরমে পৌঁছে গেলে আত্মহত্যাও করে ফেলে। .

আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে এরা খুবই বিচ্ছিন্ন থাকে একে অপরের থেকে। এর খারাপ দিক আছে, ভাল দিকও আছে। খারাপ দিক হল, এর ফলে ওরা কেমন জানি যান্ত্রিক হয়ে পড়ে এবং নানাবিধ মানসিক সমস্যায় বেশি ভুগে। ভাল দিক হল, কেউ কারো বিষয়ে নাক গলায় না। মানুষে কে কী ভাবলো, তা নিয়েও বেশি চিন্তা করে না। .

.এখানের মানুষদের আরো কিছু ভাল দিক হল তারা সাধারণত বেশ হেল্পফুল। সাহায্য চাইলে যথাসাধ্য সাহায্য করবে, আচার-ব্যবহারে খুবই অমায়িক (বেশির ভাগ সময়েই)। রেসিজম যে একেবারে নাই, তা না, সামান্য পরিমাণে হলেও আছে। কথা-বার্তা বললে সোজা-সাপ্টা কথাই বলে। আমি এখানে আসার পর একজন কানাডিয়ানের সাথে কথা বলতে গেলে যতটা সতর্ক থাকি, তার চেয়ে হাজারগুণে বেশি সতর্ক থাকি কোন বাংলাদেশীর সাথে কথা বলতে গেলে। ব্যাপারটা দুঃখজনক হলেও সত্যি।

. . এখানের ট্রান্সজেন্ডার, হোমোসেক্সুয়ালদের অভয়ারণ্য, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মুসলিম-বিদ্বেষ দেখে গা জ্বালা করে। লক্ষ্যহীন আত্মকেন্দ্রিক নিঃসঙ্গ মানুষগুলোকে দেখে করুণা হয়। বাংলাদেশ অন্য সব দিক দিয়ে একদম পচে গেলেও পারিবারিক বন্ধন আর মানসিক স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে এসব “উন্নত বিশ্বের” চেয়ে ঢের এগিয়ে। .

এখানে অনেক কিছু দেখে-শুনে আরো একটা উপলব্ধি হয়েছে। মুসলিম ঘরে জন্মে, মুসলিম হয়ে থাকতে পারাও আল্লাহ্‌র পক্ষ অনেক বড় নিয়ামত। . . . “অতঃপর তোমরা তোমাদের রবের আর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?” [আল ক্বুরআন ৫৫:১৩]

চলবে ইনশা আল্লাহ…

পড়ুন আগের পর্বগুলোঃ

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (প্রথম পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (দ্বিতীয় পর্ব)

আরো পড়ুনঃ

মুখোশ উন্মোচনঃ প্রথম পর্ব

মুখোশ উন্মোচনঃ তৃতীয় পর্ব

নরক –

 

.

লেখকঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। লেখক, কানাডার  কিউবেকে  অধ্যয়নরত।.

রেফারেন্সঃ

[১] Loudspeakers in mosques- https://tinyurl.com/adjew8d

[২] Quebec bans niqab for public services with neutrality law- https://tinyurl.com/yd8swe7r

[৩] Quebec bans Muslim women from wearing face veils on public transport-   https://tinyurl.com/ybk6bpow

[৪] Quebec passes bill banning niqab, burka while receiving public services-https://tinyurl.com/y8b8s39u

[৫] Same-Sex Marriage in Canada- https://tinyurl.com/y9nr336q

[৬] TIMELINE | Same-sex rights in Canada-https://tinyurl.com/yaxq5rwt

[৭] Understanding the prevalence of sexual assault in our community is important, here are some statistics to understand the nature of sexual violence https://tinyurl.com/ycxgj5xd

[৮] One in seven sexual assault cases in 2017 deemed ‘unfounded’: StatsCan https://tinyurl.com/ybjtdl4x

[৯] Police-reported sexual assaults in Canada before and after #MeToo, 2016 and 2017 https://tinyurl.com/yd8kqlbu

[১০] Burczycka, M. and S. Conroy. 2017. “Family Violence in Canada: A Statistical Profile, 2015.” Juristat, Vol. 37, No. 1. Ottawa: Statistics Canada. Cat. No. 85-002-X.

[১১] Afifi, T., MacMillan, H., Boyle, M., Taillieu, T., Cheung, K., and J. Sareen. 2014. “Child Abuse and Mental Disorders in Canada,” Canadian Medical Association Journal, vol. 186, no. 9, pp. 1-9.

[১২] CHILD SEXUAL ABUSE BY K-12 SCHOOL PERSONNEL IN CANADA EXECUTIVE SUMMARY https://tinyurl.com/yalakf3z

[১৩] Sexual Harassment in the Workplace- http://tinyurl.com/ctvwqem

[১৪] Workplace Sexual Harassment An ‘Epidemic’ In Canada: Report- https://tinyurl.com/y9meee8g

[১৫] Workplace Sexual Harassment Poll: Most People Don’t Report Incidents https://tinyurl.com/ycryje2m

[১৬] More than half of adult women in Canada have experienced ‘unwanted sexual pressure,’ online survey suggests- https://tinyurl.com/ycj7dd6r

[১৭] Young Minds: Stress, anxiety plaguing Canadian youth- https://tinyurl.com/ycps7wur

[১৮] Why more Canadian millennials than ever are at ‘high risk’ of mental health issues https://tinyurl.com/ya6uc68p

[১৯] One-third of Canadians at ‘high risk’ for mental health concerns: poll https://tinyurl.com/yazjssqw

 

শেয়ার করুনঃ
‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!'(দ্বিতীয় পর্ব)

‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!'(দ্বিতীয় পর্ব)

কাতাদা সান বেশ আবেগের সাথে কথা বলেন। কথা বলেন আনিমেশান নিয়ে। বলেন তাঁর ভালো লাগার আনিমেশানের কথা, তাঁর এনিমেশানের কর্ম জীবনের দীর্ঘ ৩০ বছরের কথা। জাপানের আনিমেশানের সাফল্যের পাশাপাশি জাপানের অর্থনৈতিক অবনতির কথা। জাপানের উন্নত জীবনের অন্তরালের ভয়াবহ দঃস্বপ্নময় জীবনের কথা।
.
একদিন তিনি বলছিলেন, “টোকিওতে ‘ইয়ামানোতে সেন’ (একটি ট্রেন লাইন) এ চড়লে প্রায়ই একটা ঘোষণা আমরা শুনতে পায়। অমুক সময়ের অমুক ট্রেন অত মিনিট দেরি করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃখিত। দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। …….” তিনি জিজ্ঞেস করলেন “বলুনতো, দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই এর মানে কী?”
.
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। বললাম হয়তো কোনো ছোটখাটো সমস্যাজনিত কারণে ট্রেন লেট করে ফেলেছে তাই এটা বলছে। তিনি বললেন, “না। কারণটা আসলে অনেক বড় এবং কারণটা প্রতিদিন ই ঘটছে এবং দিনে কয়েকবারও ঘটছে, কিন্তু সেটা আবার যন্ত্রের ত্রুটি বা রেল কতৃপক্ষের ত্রুটি জনিত কারণও নয়। আসলে কারণটা ঘটায় সাধারণ মানুষ। বলতে পারবেন কারা?”
আমি বলতে পারলাম না।
তিনি বললেন, “আত্মহত্যাকারীরা”। (জাপানে আত্মহত্যাকারীরা চলন্ত ট্রেনের নীচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।) বলে গানের সুরে সুরে ট্রেনের ঘোষনাটা আবার আওড়াতে থাকলেন। তাকে একটু হতাশ মনে হল।
.
আমি একটু সমবেদনা দেখাবার জন্যে বলতে থাকলাম “সত্যিই। জাপানে এত আত্মহত্যা করে সবাই; আমার খুব খারাপ লাগে।” আমার এক গায়িকা বান্ধবীও যে গত বছর আত্মহত্যা করেছে সে কথাও তাকে বললাম। এছাড়া ওইখানের স্কুল জীবনের কতগুলো হতাশাগ্রস্ত বন্ধু ও বান্ধবীদেরকে নিয়েও যে আমি একটু শঙ্কিত তাও তাকে বললাম। বললাম আসলে টাকা না থাকলে জাপানের জীবন অনেক কঠিন, তাই না? তিনি বললেন, “ঠিক তাই, শিপু ভাই। আপনার যদি টাকা না থাকে তাহলে জাপান হয়ে যাবে আপনার জন্যে দোযখ। না পারবেন ঘুমিয়ে থাকতে, না পারবেন জেগে থাকতে। ২৪ ঘন্টা আপনাকে দৌড়াতে হবে টাকা রোজগারের পিছনে”।

.
তিনি বলতে থাকলেন… “আজকে আপনারা মনে করছেন যে, জাপানীরা না জানি কত বড়লোক, কত সুখী। কিন্তু না। না। আপনাদের ধারণা সম্পূর্ণভাবে ভুল। সাধারণ জাপানীদের হাতে কোন টাকা নেই, আছে শুধু লোনের বোঝা আর পরিশোধের চাপ। সুখী থাকবে কিভাবে। আপনাদের তো এখনও লোনের বোঝা সেভাবে হয়ে ওঠেনি। আপনারা তো এখনো আমাদের মত তথাকথিত উন্নত জীবন-কারাগারে বন্দী হননি। তাই আপনাদের এখনও প্রতিদিন, এবং মাসের শেষে বিভিন্ন ধরণের বিল পরিশোধের টাকা গুনতে হয়না। আপানারা এখনও স্বাধীন। তাই আপনারা চাইলে মাঠে ঘুমিয়েও ২/৩ বেলা খেয়ে না খেয়েও জীবনটা পার করে দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা জাপানীরা পারবোনা। আমাদের সে সামাজিক স্বাধীনতা নেই। না চাইলেও আমাদের ইমারতের মধ্যেই বসবাস করতে হয় এবং তার জন্য ভাড়া দিতেই হয়। ফ্লাট ভাড়া করতে গিয়ে ইন্স্যুরেন্স, গ্যারান্টি ইত্যাদি বিষয়ক অনেক কাগজ জোগাড় করতে হয়। ভাড়া জোগাড় করতে গিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ করতে হলে খেতে হয়। ৩ বেলা না চাইলেও অন্তত ২ বেলা অবশ্যই খেতে হয় এবং তার জন্য টাকাও গুনতে হয়। কারণ না খেলে কাজ করতে পারবো না। এর পরে আছে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে প্রয়োজনের পাহাড়। পোশাক আশাক আরও কত কি। তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে আপনি সবার চোখে হয়ে যেতে থাকবেন একজন এলিয়েন। যা জাপানে বসবাসের জন্য ভয়াবহ। কারণ জাপানীরা এলিয়েন পছন্দ করেনা। তারা সবাইকে একই রকম দেখতে চায়। এবং আপনি সেভাবে সমাজের সাথে মেলাতে গিয়ে দেখবেন এক সময় আর পেরে উঠছেন না। আপনি রোজগারের জন্যে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় শারীরিকভাবে এবং মানসিক ভাবে ক্লান্ত হতে থাকবেন। আপনি আবিষ্কার করবেন যে, আপনি সামাজিক ভাবে চলতে গিয়ে বিভিন্ন রকম বিল (অধিকাংশ জিনিষই আপনি সেখানে কিস্তিতে কিনতে পারবেন) পরিশোধ করতে গিয়ে আপনার কাজের সময়ের পরিমাণ আরো বাড়াতে হচ্ছে প্রতিদিন। একসময়ে আবিষ্কার করবেন যে, সারাদিন আপনি দাসের মত খাটছেন এবং রোজগারের জন্য যে কাজ করছেন তা আপনার পছন্দের কাজ নয়; এবং আপনি সে কজে আনন্দ তো পাচ্ছেনই না বরং কষ্ট পাচ্ছেন।
.
এরপর যা হবে তা এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মত। আপনার আর কাজে যেতে ইচ্ছে করবেনা, তারপরও বাধ্য হয়ে আপনি যাবেন। কাজে গিয়ে কর্মস্থলের মানুষদেরকে আপনার খারাপ লাগতে শুরু হবে। দোকানদার, পাওনাদারদেরকে আপনার খারাপ লাগতে থাকবে, কিন্তু আপনি এসব কিছুই প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন না বা সে সুযোগও আপনাকে দেয়া হবে না। আপনি হতাশার অতলতায় ক্রমশ ডুবতে থাকবেন। এক সময় হয়ত এমন কিছু ঘটনা আপনার সামনে এসে দাড়াতে থাকবে যে আপনি আর মোকাবেলা করার শক্তিও পাবেন না। আপনি হতাশার ঘোরের মধ্যে আরো তলিয়ে যেতে থাকবেন। নিজের জীবনকে অদৃশ্য করে পালিয়ে বাঁচতে চাইবেন। লাফিয়ে পড়বেন ইয়ামানোতে সেনের ট্রেনের নীচে। তারপর ট্রেনে আরো একটা ঘোষনা হবে…
.
< ...... সময়ের ...... ট্রেন ...... মিনিট দেরি করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। >…….” কথা গুলো বলতে বলতে জাপানের টেলিভিশান এবং সিনেমা হলের জন্য নির্মিত অসংখ্য হৃদয়স্পর্শী গল্পের আনিমেটর কাতাদার চোখ দুটো চিক চিক করে উঠল।
.
আমি বললাম, ‘তাহলে আমরা কী ভালো আছি? আমাদেরও তো এখন ঢাকা শহরে বসবাস করতে অনেক খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমদেরও তো আনেক কাজ করতে হচ্ছে’।
.
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ,আপনাদেরও অনেক খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তবে আমাদের ধারে কাছেও এখনও পৌঁছাতে পারেননি আপনারা। ঢাকা শহরেও আপনারা চাইলে স্বাধীনভাবে অথবা খরচ না করেও জীবন যাপন করতে পারবেন এখনও। আর গ্রামে গেলে তো আরো চাহিদা কম। আপনি চাইলে অল্প কাজ করে, অল্প খেয়ে পরে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করেও আপনার জীবনটাকে পার করে দিতে পারবেন। কিন্তু আপনাদের সমস্যা হচ্ছে, আপনারাও আমাদের মত ভুল করতে শুরু করেছেন। আপনারাও চাইছেন আমাদের মত ব্যায়বহুল জীবনযাপন করতে। আপনারা আমাদের মত দেশের (যেমন জাপান, আমেরিকা, ইউরোপ, ইত্যাদি দেশকে) অনুকরণ করে ঢাকা শহরকে একটা ব্যায়বহুল শহরে পরিণত করে সুখী হতে চাচ্ছেন।
.
কিন্তু আপনারা আসলে আমাদের মতই ভুল করছেন। এখন ঢাকা শহরে অনেক গুলো শপিং মল হয়েছে। ভিতরে ঢুকলে তথাকথিত উন্নত দেশের সাথে এগুলোর তেমন বিশেষ পার্থক্য দেখা যায়না। এর কিছু দিন পরে দেখবেন আপনাদের দেশে Kiosk, Jusco ইত্যাদি আরও সব বড় বড় শপিং মল ঢুকে পড়বে এবং তারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়। এরা আপনাদের সব ছোট ছোট দোকান পাট, ব্যাবসা ইত্যাদিকে খেয়ে ফেলে দিবে। ফলাফল, আস্তে আস্তে আপনাদের সাধারণ মানুষের হাতে আর ব্যবসা থাকবে না। আপনারা ক্রমান্বয়ে হতে থাকবেন শুধু তাদের ব্যবসার জ্বালানির মসলা। আপনারা তাদেরকে মাথায় তুলে রাখার জন্য তথা কথিত উন্নত জীবন যাপনের নামে শুধু তাদের ব্যবহারের বস্তু হয়ে পড়বেন। আপনারা তাদের দ্রব্য তৈরী ও ক্রয় দুটোই করবেন।
.
তবে এখনই আপনাদেরকে ঐ ভয়াবহতার মধ্যে পড়তে হবেনা। এখন বরং আপনারা অনেক সুখী আছেন। কারণ এখন সেই সমাজ গড়ার প্রক্রিয়ার মধে আছেন আপনারা। প্রতিদিন আপনাদের একটু একটু করে রোজগারের টাকার অঙ্ক বাড়ছে, একটু একটু করে একেকটা যন্ত্রের অধিকারী হচ্ছেন। একটা ফ্রিজের, একটা ইলেক্ট্রিক ওভেনের মালিক হচ্ছেন, একটা সুন্দর শপিং মলে তথাকথিত আধুনিক পদ্ধতিতে কেনাকাটা করার সুযোগ পাচ্ছেন, কিছুদিন পরে গাড়ী বাড়ী, রাস্তা ঘাট সব কিছুরই অধিকারী হবেন তাও একটু একটু বুঝতে পারছেন। ফলে আপনাদের স্বপ্ন আছে। এবং সেই স্বপ্নই আপনাদেরকে এখন সুখে রেখেছে।
.
কিন্তু তারপর আসবে সেই সময়, হয়ত আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম অপেক্ষা করছে আপনাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তাদের আর কোন কিছু পাওয়ার স্বপ্ন থাকবেনা, থাকবে শুধু দুঃস্বপ্ন। সবই তারা পেয়ে যাবে। আপনারা যেমন চেয়েছিলেন ঠিক তেমন দেশই তারা পাবে। তাদের গাড়ী, বাড়ী, ওয়াশিং ম্যাশিন, রাস্তা ঘাট সবই থাকবে। গলায় বিদেশীদের মত টাইও থাকবে। কিন্তু সেই টাই হয়ে যাবে তাদের গলার ফাঁস। আপনারা যে জীবনটা পাওয়ার জন্য একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদেরকে সেই জীবনে বসবাস করতে বাধ্য করা হবে। তাদেরকে বাধ্য করা হবে তথাকতিথ আধুনিক ইমারতে বসবাস করতে, তাদেরকে বাধ্য করা হবে তথাকতিথ শপিং মলে কেনাকাটা করতে, এবং সর্বপরি তাদেরকে বাধ্য করা হবে ঐ সবের সমস্ত ব্যায়ভারও বহন করতে। এবং তারপর যা হবে তা ঠিক এখন যেমন হচ্ছে আমাদের মত দেশ গুলোতে…
.
…তাদের আর কাজে যেতে ইচ্ছে করবেনা, তারপরও বাধ্য হয়ে তারা যাবে। কাজে গিয়ে কর্মস্থলের মানুষদেরকে তার খারাপ লাগতে শুরু হবে। দোকানদার, পাওনাদার দেরকে তার খারাপ লাগতে থাকবে, কিন্তু সে এসব কিছুই প্রকাশ করার সুযোগ পাবেনা বা সে সুযোগও তাকে দেয়া হবে না। সে হতাশার অতলতায় ক্রমশ ডুবতে থাকবে। এক সময় হয়ত এমন কিছু ঘটনা তার সামনে এসে দাড়াতে থাকবে যে সে আর মোকাবেলা করার শক্তিও পাবেনা। সে হতাশার ঘোরের মধ্যে আরো তলিয়ে যেতে থাকবে। নিজের জীবনকে অদৃশ্য করে পালিয়ে বাঁচতে চাইবে। লাফিয়ে পড়বে ইয়ামানোতে সেনের মত কোন এক ট্রেনের নীচে। তারপর ট্রেনে একটা ঘোষনা হবে। .
.
< ...... সময়ের ...... ট্রেন ...... মিনিট দেরি করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরি হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। >…….”
.
(ট্রেনের নীচে আত্মহত্যা করলে কোন কষ্ট ছাড়া মৃত্যু হবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। গবেষকদের মতে ট্রেনের নীচে শরীর কেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও সত্যিকারের মৃত্যু হতে কমপক্ষে ২ ঘন্টা সময় লাগে এবং ঐ ২ ঘন্টা কল্পনাতীত যন্ত্রনা ঐ আত্মহত্যাকারীকে সহ্য করতে হয়।)
.
বেশ কিছুক্ষন নীরব হয়ে বসে থাকলেন আনিমেটর কাতাদা। একসময় আবার ছবি আঁকতে শুরু করলেন।

.
আমি ভাবতে থাকলাম; জীবনের উন্নতি, সমাজের উন্নতি, দেশ, নদী নালা, রঙ্গীন ধান ক্ষেত, হলুদ সর্ষের ক্ষেত, ঢাকা শহরের মিশে যাওয়া খাল বিল, শিমুল ফুলের গাছ, রাতের শিয়ালের ডাক, ভর দুপুরের পাখির গান, টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, মুড়ি, সর্ষের তেল আর দেশি পিঁয়াজের ঝাঁঝ, …
.
…আর বাবার কলমের কালি এবং মায়ের সেলাইয়ের সুঁতা দিয়ে স্কুলের খাতার মধ্যে হরেক রকম ডিজাইন তৈরী করে ছোট বোনকে আনন্দ দেয়ার কথা।
.
হঠাৎ করে জানালার ওপাশ থেকে মটর সাইকেলের বিকট শব্দে আমার স্বপ্নের ঘোর কেটে গেল। জানালা খুলতেই দেখলাম অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য গাড়ী। একে অপরকে সরে যেতে বলছে, রিক্সাওয়ালাকে ট্রাফিক পেটাচ্ছে, গাড়ীর ড্রাইভার গাড়ী থেকে নেমে পথচারীর কলার চেপে ধরেছে, ফুটপাথে এক মটর সাইকেল পথচারীদেরকে ধমক দিতে দিতে সামনে এগিয়ে চলেছে। ……
.
…একটি ছোট্ট ছেলে মুখে হাত দিয়ে ফুটপাথে বসে কি যেন ভাবছে ……… …
.
চলবে ইনশা আল্লাহ্‌…
(সংগৃহীত)
.
‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!’প্রথম পর্ব
.
অবশ্যই পড়ুন-
প্রতিযোগিতার দর্শন যেভাবে আত্মহত্যা ডেকে আনে
.
পড়ুন-
কেন জাপানিরা এত আত্মহত্যাপ্রবণ?
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনঃজাপান কেন আত্মহত্যাপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত?

কাজের চাপে মৃত্যু: জাপানের এক অস্বাভাবিক সমস্যা

আরো পড়ুন-
Japan’s youth suicide rate highest in 30 years
Why is Depression So Prevalent in Japan?

শেয়ার করুনঃ
‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!’ (প্রথম পর্ব)

‘স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত!’ (প্রথম পর্ব)

এক বছরের বেশি হয়ে গেল আমার প্রবাস জীবনের – জার্মানির হামবুর্গ শহরে। হামবুর্গ আন্তর্জাতিক শহর – ১৮০ এর বেশী দেশের মানুষের এখানে বসবাস। এখানে আসার আগে মাত্র একজন বাংলাদেশীকে চিনতাম, তার উপর হামবুর্গে বাংলাদেশীর সংখ্যা হাতেগোনা হয়ার কারনে প্রথম থেকেই বিদেশি বন্ধবান্ধব জুটে জায়, এদের সাথেই উঠাবসা চলে। পূর্বের চায়না থেকে পশ্চিমের আমেরিকা – সবার সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে…ইংলিশটা ভাল হয়ার কারনে অনেক জার্মান বন্ধুও জুটেছে (হাম্বুরগের জার্মানরা তাদের ইংলিশ এর উন্নতির বেপারে খুবই সচেতন :D)….উইকেন্ডের সারা রাত জেগে জীবন ভিত্তিক আড্ডাও হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি বলব গত এক বছর আমার জীবনের সবচেয়ে শিক্ষামূলক সময় কাটিয়েছি – বেশ কিছু জিনিশ উপলব্ধি করেছি….
.
ছোটবেলায় আমার কাজিনের (Tamal vai)কল্যাণে হলিউড মুভি দেখা হয়েছে অনেক। মুভি দেখতাম আর আফসোস করতাম – ইশ!! কেন যে আমেরিকা-ইউরোপে জন্ম হলনা!!! কত সুন্দর বাল্যকাল কাটাতাম!!! স্কুল থেকে প্রতি বছর অন্য দেশে ট্রিপে নিয়ে যেত, সামারে বনেবাদারে ক্যাম্পিং করতাম, শীতকালে উইন্টার স্পোর্ট করতাম, ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে গার্লফ্রেন্ড থাক্ত, ১৬ বছর থেকে পার্টটাইম কাজ শুরু করে টাকা জমায় ২০-২১ বছরে ওয়ার্ল্ড ট্রিপ দিতাম! what a life that would have been……অনেক রাগ ছিল বিধাতার উপর…গরীব দেশে জন্ম দেয়ার কারনে।
.
আজ আমি এক বছর প্রবাস জীবন কাটানোর পর প্রতিদিন একবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায করি, গরীব-মুসলিম দেশে জন্ম দেয়ার কারনে……একটু ব্যাখা করার চেষ্টা করি, কেন এই উপলব্ধি।
.
জার্মানি আসার আগে জার্মানির উপর কিছু আর্টিকেল পড়েছিলাম। এমন একটা আর্টিকেল এ ছিল লাভ ইন জার্মানি এর উপরে। আর্টিকেলের একটা জিনিস বেশ অবাক লাগসে – জার্মানরা “আমি তোমাকে ভালবাসি” – এই কথাটা পারত পক্ষে বলে না। ২-৩ বছরের সম্পরকের পর ও ওরা ভালবাসার কথা এরায় চলে। প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। এখানে এসে জার্মানদের সাথে মিশার পর, বেশ কিছু জার্মান ফ্যামিলির কাছ থেকে দেখার পর ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারসি।
.
এখানে বিয়ে ৪-৫ বছরের বেশি টিকে না। অধিকাংশ ফ্যামিলি বাচ্চা ছোট থাকা অবস্থায় ভেঙ্গে যায়। এর ফলে যেটা হয় যে, বাচ্চা ছোট বয়স থেকেই দেখে যে বাবা-মা দুই জনের কাছেই কয়েক মাস পর পরই গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড আসতেসে…কেউই স্থায়ী হয় না। ছোট বেলা থেকেই একটা শিক্ষা ওরা নিয়ে নেয়, “মানুষ আসবে মানুষ যাবে”। যার কারনে অটমেটিকালি মানসিক আত্মরক্ষা এর কারনে ওরা কোন মানুষের প্রতি ইমশোনাল ডেভেলপমেন্ট করতে পারে না। কারন আনকনশাসলি ওরা এটা ধরেই নেয় যে, কেউই বেশিদিন থাকবে না। তার উপর ১৩-১৪ বয়স থেকেই ফিসিকাল রিলেশনশিপ শুরু করে দেয় – ভালবাশা এর জন্য না, আসলেই ফিসিকাল কিউরিসিটি থেকে এবং প্রতি বছর নতুন নতুন। যার কারনে নারীপুরুষ সম্পর্কের ভিতর ওদের কাছে কোন কিছু বাকি থাকে না। যার ফলে ওরা পুরা নারীপুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে ইন্সেন্সিটিভ হয়ে যায়।
.
একটা এক্সামপল দেই, এখানে ছেলে-মেয়ে বন্ধু (শুধু বন্ধু)একসাথে ঘুমায়…কোনরকম সমস্যা ছাড়া। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞাসা করা, কার সাথে চ্যাট করতেসে, কারসাথে পার্টিতে যাচ্ছে – এগুলো রুড।
রিলেশনশিপ ওদের কাছে নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয়া, নতুন শরীর এর অনুভূতি নেয়া মাত্র……ভালবাসা এর অনুভূতি এক অবাস্তব বিষয়। বলিঊডের মুভি দেখে প্রচণ্ড অবাক হয় – সত্যিই কি ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের মানুষরা এতোটা রোমান্টিক??? এতো অনুভূতি ওদের আসে কোথা থেকে???
.
আরেকটা বিষয় হল কালেক্টিভিসম অ্যান্ড ইন্ডিভিডুয়ালিসম। গরীব দেশের সমাজ কালিক্টিভিস্টিক হয় সারভাইভাল এর জন্য। কারন সরকার সমাজ সবসময় ব্যাসিক নিড ফিলাপ করে না। যার কারনে আমরা ছোটবেলা থেকেই পরিবার, বন্ধু, ভালোবাসার মানুষ এর জন্য স্যাক্রিফাইস করা শিখি…এটাইতো ভালবাসা, অনুভূতির জগতের ব্যাসিক।
.
আর একটা ইন্ডিভিডুয়ালিস্টিক সোসাইটিতে স্যাক্রিফাইস এর কন্সেপ্টটা অচেনা……একানকার মোটো হল – “তোমার জীবন এটা, তাই কর, যেটা শুধু তোমার জীবনের জন্য ভাল”। যার ফলে প্রতিটা মানুষ বাচে শুধু নিজের জন্য-আমাদের জন্য যেটা সায়েন্স ফিকশন, কল্পনার বাইরে। একারণে পরিবার-ভালবাসার মধ্যে এইধরনের প্রশ্ন খুবই কমন – “ও কি আমাকে সুখী করছে? ওকেই কি আমি চাই? আমার বাবা-মা এর সাথে থাকার কারনে আমার বযক্তিগত জীবন কি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে?”- পুরো জীবন জুরেই এইসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে খুজতে চলে যায়…অনুভব আর করা হয় না। ওরা খুবই অবাক হয় শুনে, যখন আমি বলি, আমাদের প্রশ্নগুলো পুরো উল্টো – আমারা চিন্তা করি আমার আমাদের বাব-মাকে সুখী করতে পারছি কিনা, ভালবাসার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারছি কিনা…
.
আর সবথেকে বড় বিষয় হল, গডলেস সোসাইটিতে বড় হবার কারণে শিখে, এই জীবনটাই আসল, এরপর আর কিছু নাই, সব শেষ! সব মানুষের পক্ষে তার এইধরনের বাস্তবতা মেনে নেয়া কঠিন। হার্টে সত্তের অপূর্ণতা থেকেই যায়।
.
মজার একটা বিষয় হল ছোটবেলা থেকেই এতোটা রোবোটিক যে, এখানে আপনি জার্মান কোন বাচ্চাকে কাঁদতে দেখবেন না। রাস্তায় যদি কোন বাচ্চার কান্না শুনেন, তাহলে চোখ বন্ধ করে বুঝে নিবেন টার্কিশ বা আরব বাচ্চা। আমি এখন পর্যন্ত একটা জার্মান বাচ্চাকে কান্তে দেখি নাই…সত্তি!!!!!!!!
.
আমার এই অভিজ্ঞতার পর ছোটবেলার ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের প্রতি হিংসা, ওদের প্রতি করুণায় পরিণত হয়েছে। যতবারই জার্মানদের সাথে এইসব বিষয়ে কথা বলেছি, ততবারই গম্ভীর হযে গেছে, ২-৩ জন কেঁদেও দিয়েছে। আসলেই ওদের মনের ইমোশনাল ভেকেন্সিটা একটু ফিল করতে পারলে ভয় লাগে…কিভাবে এভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব??? উত্তর হল উইকডেতে কাজে ব্যস্ত থাকা, উইকেন্ডে মাতাল হয়ে সব ভুলে যাওয়া…মাঝে মাঝে সাইক্রিটিস্ট ভিসিট করা, এন্টি দিপ্রেসসিভ ড্রাগ নেয়া……নতুন রিলেশনশিপ খোজা, রাস্তায় প্রথম ২-৩ মাস ওপেনে কড়া ভালোবাসা(!) বহিঃপ্রকাশ করা……তারপর আবার প্রথম থেকে শুরু করা…..
.
আসলেই আল্লাহর কাছে অগনিত শুকরিয়া, বাংলাদেশের মত গরিব ও রক্ষণশীল মুসলিম দেশে জন্ম দেয়ার জন্য। যেখানে এমন মা পেয়েছি যে তার, ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করার জন্য। যেখানে বাবা পেয়েছি যে শখ করে নিজের জন্য একটা ঘড়িও কিনেনি – ছেলেমেয়েদের পেছনে খরচ করার জন্য। যেখানে পরিবার পেয়েছি যার কথা ভাবলেই সব দুঃখ কষ্ট ম্লান হয়ে যায়। যেখানে আল্লাহ তোমাকে পেয়েছি – আখিরাতের কথা চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছি……
.
My last word would be my greatest realization in life, „Whatever that sounds good or looks good is not necessarily good “… Dear Generation Y, stop following west blindly. I know that it looks like a joy ride, but it’s all a downhill fall which has almost no way back unless Allah wants. May Allah make us among those upon whom he has bestowed His grace. May Allah guide us all to the right path and make us the grateful of His grace. Ameen

চলবে ইনশা আল্লাহ…

(কালেক্টেড)

আরো পড়ুন-
একেই বলে সভ্যতা (প্রথম পর্ব) !!!: https://tinyurl.com/yaky6j8b
একেই বলে সভ্যতা (দ্বিতীয় পর্ব) !!!: https://bit.ly/2xbpnW5
এরই নাম স্বাধীনতা !!!: https://bit.ly/2xcsUnn
এরই নাম স্বাধীনতা!!! দ্বিতীয় পর্ব – https://bit.ly/2xce9kq
এরই নাম স্বাধীনতা!!! তৃতীয় পর্ব-https://bit.ly/2MxnRna
পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা: https://bit.ly/2p1Irme
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-২: https://bit.ly/2Ms17VA
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব- ৩ https://bit.ly/2p6dopk

শেয়ার করুনঃ
একেই বলে সভ্যতা (প্রথম পর্ব) !!!

একেই বলে সভ্যতা (প্রথম পর্ব) !!!

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

এক.

উত্তর প্রদেশ ।

ইন্ডিয়া ।

নিরিবিলি এক  আখক্ষেতের  মধ্যে  স্কুল পড়ুয়া এক মেয়ে  বসে  আছে ।

একদঙ্গল কামে উন্মত্ত পুরুষ তাকে ঘিরে ধরে আছে । মেয়েটি অসম্ভব কাপছে ,ফাঁদে পড়া হরিণীর মতো  ভীত চোখে  সে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে । মনে ক্ষীণ আশা, কেউ বুঝি তাকে উদ্ধার করবে এই পশুদের হাত থেকে । কিন্তু না,  শেষ রক্ষা হলো না ।  বুনো শুয়োরের মতো   ঘোত ঘোত করে    একজন হেসে উঠলো ।  মানুষরূপী একটা পশু ঝাঁপিয়ে পড়লো অসহায়  মেয়েটার ওপর ।

বিশ্বাস  করতে প্রচন্ড  কষ্ট হয়,  অসহায়  এক মেয়ের ওপর অত্যাচারের এই জঘন্য ঘটনা কেউ ভিডিও করে অনলাইনে আপ্লোড করে দিবে আর হাজার হাজার মানুষ  সেটা দেখে মনের এবং হাতের সুখ মেটাবে । মানুষের পক্ষে কি  এতটা  নিচে নামা সম্ভব  ? যুগ যুগ ধরে মানবতার জয়গান গেয়ে  লিখা সবগুলো কবিতাই কি মিথ্যে ?

কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশে  প্রতিনিয়ত  এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে  ভারতের উত্তরপ্রদেশের  দোকানগুলোতে  পুলিশ এবং প্রশাসনের নাকের ডগার নিচে অসহায় মেয়েদের  উপর চালানো অত্যাচারের ভিডিও বিক্রী করা হচ্ছে । প্রতিদিন শত শত , আসলে  শত শত নয় হাজার হাজার রেপ ভিডিও বিক্রি করা হচ্ছে যেগুলোর মূল্য ৫০ রুপী থেকে ১৫০ রুপী ।

এক দোকানে একলোক  কেবল গোঁফ উঠতে শুরু করেছে এমন এক ছোকরাকে বলছে, ” জানিস আমি বোধহয়  এই লেটেস্ট, হটেস্ট ভিডিওর এই মেয়েকে চিনি” । ভিডিওটাতে সদ্য বিশের কোঠা পার হওয়া  এক মেয়ের উপর দুইটা পশু অত্যাচার করছে । অসহায় মেয়েটির কন্ঠে আকুতি ঝরে পড়ছে , “ মাফ ক্যারো, মাফ ক্যারো । কমসে কম ভিডিও তো মাত উঠারো” ।

এক সিনিয়র পুলিশের ভাষ্যমতে রেপের দৃশ্য ভিডিও করে রাখা হয় ভিক্টিমকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য । পুলিশের বিভিন্ন উৎস থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে প্রশাসন কোনমতেই এই জঘন্য ঘটনাগুলো বন্ধ করতে পারবে না ।[১]

আল জাজিরার ভিডিও প্রতিবেদন – http://bit.ly/2fsTzmV

যে সব দেশ গুলো থেকে সবচেয়ে বেশী পর্নমুভি দেখা হয় তাদের মধ্যে  ইন্ডিয়া তিন নম্বরে । ইন্ডিয়ান মহিলারও ব্যাপক হারে পর্ন দেখছে ইদানীং [২,৩]  ।

একটা প্রদেশে চালানো জরিপ থেকে দেখা যায় ৪০ শতাংশ পুরুষ “রেপ পর্ন” দেখে [৪] ।

আইটেম সং, ইন্ডিয়ান মুভির, মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণকে তো সবসময় সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছেই ।

ইন্ডিয়াতে প্রতি ২০ মিনিটে একটা করে রেপ হচ্ছে[৫] । বিশ্বের যে দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশী রেপের ঘটনা ঘটে তার প্রথম ১০ টি দেশের মধ্যে ইন্ডিয়া রয়েছে [৬,৭] ।

ইন্ডিয়াতে প্রচুর পরিমান চাইল্ড এবিউজের ঘটনা ঘটে। বিশ্বের অনেক দেশের গনমাধ্যমেই এ ব্যাপারে অনেক রিপোর্ট হয়েছে [৮,৯,১০] । এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বেশী  চাইল্ড এবিউজ হয় এমন পাঁচটা দেশের শর্টলিস্টেও রয়েছে ইন্ডিয়ার নাম [১১]

আর কত মা, বোন  ধর্ষিত  হলে আমরা বুঝবো  নারীস্বাধীনতা আর প্রগতিশীলতার সব বুলি ফাঁপা ?  মিথ্যে , প্রতারনা , ধোঁকা ?

আর কত শিশু যৌন নিপীড়িত হলে   তবে আমাদের হুঁশ ফিরবে ?

আর কত   বোনের ঘর ভাংলে, আর কত বোন আত্মহত্যা করলে  তবে আমরা চিনবো আমাদের আসল শত্রুকে ?

#know_your_enemy

#একেই_বলে_সভ্যতা

#নারী_স্বাধীনতা

দুই.

প্রিয় বন্ধুরা,

আর তিন দিন মাত্র বাকি। তারপরেই আমি  All Boys Private High School থেকে গ্রাজুয়েট করে ফেলব। বলতে গেলে আমি কখনই পর্নমুভির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারিনি। ৪ বছর পূর্বে আমি যখন সবে মাত্র স্কুলে ভর্তি হলাম, তখন বুঝতে পারলাম এটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

সেই দিনের সব কিছুই আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার মা স্কুলের কর্তৃপক্ষের সাথে একটা মিটিং করে ফিরলেন। আমাকে কাছে ডেকে বললেন-“দেখ বাবা, আজ তোমার স্কুলের কর্তৃপক্ষ আমাকে সতর্ক করলেন পর্নমুভির ব্যাপারে।”

আসল সমস্যাটা হল, কোন বাবা-মা’ই বিশ্বাস করতে চাননা তাদের সন্তান পর্ন দেখে। খুব কম বাবা-মা’ই তাদের ১২-১৩ বছরের ছেলের ফোন বা পিসি চেক করেন।

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে স্কুলের কর্তৃপক্ষ মনে করে যে বাচ্চারা  পর্নের ভয়াবহতা ভাল করেই জানে। কিন্তু এটা মোটেও সঠিক নয়।

স্কুলের প্রথম সপ্তাহে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে বসেছিলাম। আমি বরাবরই একটু লাজুক স্বভাবের। চুপচাপ তাদের কথাগুলি শুনছিলাম। “নতুন ভিডিওটা দেখেছিস ? আরে ঐ যে ঐ ভিডিওটা !, জানিস, সেদিন একটা নতুন ওয়েব-সাইট পেয়েছি।”

বুঝতে পারছিলাম না ওরা কি নিয়ে কথা বলছে। এই ধরনের ছেলেদের সাথে আমি আগে কখন ওঠাবসা করিনি।

এই ভাবেই দিন কাটতে থাকল। আড্ডা দিতে বসলেই এই ধরনেরে কথা শুরু হত।

একদিন, একজন আমাকে প্রশ্ন করল, “এই, তোর পছন্দের ওয়েব-সাইট কোনটা ?”

আমি বললাম-“আমি পর্ন দেখিনা”।

সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল পড়ে গেল। একজন মন্তব্য করল,”তুইতো দুধের বাচ্চা। যা বাড়ি গিয়ে আম্মুকে বল ফিডার খাব”। আর একজন হাসি থামিয়ে, সিরিয়াস হয়ে বলল-“যা ব্যাটা চাপা মারিস না। পৃথিবীতে সবাই পর্ন দেখে।”

বুঝলাম- পর্ন শুধু বড়দের সমস্যা নয়, এটা বর্তমানে বিশ্বের প্রয় সবার সমস্যা।

পরের বছরই অবাক হয়ে দেখলাম আমার ঐ বন্ধুগুলা পর্নের প্রভাবে কতটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

তারা তাদের গার্লফ্রেন্ডের সাথে একান্ত মুহূর্তের ছবিগুল সবার সাথে শেয়ার করতে শুরু করল। রসালো , রগরগে মন্তব্য করাও থেমে থাকল না।

গার্লফ্রেন্ডদের  শরীর নিয়েই  তাদের যত আগ্রহ। কেউ ভুলেও প্রশ্ন করেনা যে তাদের  গার্লফ্রেন্ড মানুষ হিসেবে কেমন ? বই পড়তে ভালবাসে কিনা ? ডাকটিকেট জমানর শখ আছে কিনা ?

আমার মনে হত তারা তাদের গার্লফ্রেন্ডদের ভোগ্য পণ্যের মত ‘ইউজ’ এবং ‘এবিউজ’ করছে। ইচ্ছেমত মজা কর তাদের সাথে তারপর ভাল না লাগলে বা পুরোনো হয়ে গেলে ছুড়ে ফেলে দাও। ভালবাসা তাদের কাছে এতটাই সস্তা।

তাদের এই অধঃপতন এবং নারী জাতির প্রতি এমন মনোভাব একটা জিনিসেরই ফসল আর তা হল ‘পর্নোগ্রাফি আসক্তি’।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল- পর্ন দেখা এবং নারীদের নিয়ে এমন ‘ছিনিমিনি’ খেলা পৌরষের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে যত নিচে নামতে পারবে, যার ‘প্লে-বয়’ ইমেজ যত বেশি সে তত বেশী আসল পুরুষ।

যারা নারীদেরকে আসলেই সম্মান করে, নারীর শরীরটা নয় বরং তার মনটাকেই যারা প্রাধান্য দেয়; আজকাল তাদের নিয়ে রসিকতা করা হয়। নপুংসক,হিজড়া  এরকম হাবিজাবি আরও কত কি বলা হয়। [১২]

তিন.

….রাতে আমার মা যখন অফিসে থাকত তখন আমার পিতা আমাকে খুব খারাপ ভাবে স্পর্শ করত এবং আরো অনেক কিছু করতো । আমি তখন খুব ছোট, মাত্র ১০ বছর বয়স ।

যে দিন জানতাম আমার মা আজ রাতে বাসায় থাকবেনা, সেদিন আমার সারাদিন খুব অস্বস্তিতে কাটত, আতঙ্কে থাকতাম এই ভেবে যা না জানি রাতটা কীভাবে কাটবে !

আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে এতটাই ভীত ছিলাম যে কাওকে কোনদিন এইনিয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি। বাবা আমাকে সবসময় চাপ দিত- যেন আমি  মুখ বন্ধ করে রাখি – মা জানতে পারলে আমাকে বাসা থেকে বের করে দেবে।

স্কুলের এমন কোন বন্ধু ছিলনা যাদের সাথে আমি এটা শেয়ার করতে পারতাম । ৪ বছর ধরে আমি এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করেছি। [১৩]

চার.

যুক্তরাজ্যে কিশোর ভাইয়ের হাতে ধর্ষিতা হয়েছে তার ৮ বছরের বোন। ১৩ বছরের ওই কিশোর বাড়িতে পর্নো ছবি দেখার পর নিজের বোনকে ধর্ষণ করে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় আহত বোনকে চিকিৎসা দেওয়ার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।

ঘটনার দিন তাদের বাবা-মা বাড়িতে ছিলেন না। ওই কিশোর তখন তার এক বন্ধুর সঙ্গে এক্সবক্স গেমস কনসোলে পর্নো ছবি দেখে। ঘটনার পর পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে।

পরে সে পুলিশকে জানায়, অনলাইনে দেখা ছবির কিছু অংশ সে কপি করে রাখে। এরপর সে ছবির নায়ক-নায়িকা যেসব যৌনক্রিয়া করেছিল সেগুলো অনুকরণ করার চেষ্টা চালায় এবং নিজের বোনের ওপর চড়াও হয়। নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলে, বয়স কম হওয়ায় সে তার বোনকেই বেছে নিয়েছিল। আইনগত কারণে ওই কিশোরের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

গত বুধবার ছেলেটিকে ইংল্যান্ডের ব্ল্যাকবার্ন আদালতে হাজির করা হয়। ম্যাজিস্টেটের কাছে সে নিজের দোষ স্বীকার করেছে তবে তাকে তার পরিবারের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর সে বর্তমানে এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছে।

এই ঘটনা গোটা যুক্তরাজ্যে অভিভাবকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন। কেননা ভিডিও গেমস খেলার যন্ত্রের মাধ্যমে শিশুরা সহজেই অনলাইনের পর্নো সাইটগুলোতে যেতে পারে। অনেকে অবশ্য যন্ত্রটি কেনার সময়ই দোকানিদের সহায়তায় পর্নো সাইটগুলো ব্লক করে দেন। তবে এতেও কাজ হচ্ছে না। বাড়িতে থাকা অন্যান্য উপকরণ যেমন এক্সবক্স, প্লে-স্টেশন, আইপড ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিশুদের পক্ষে নিষিদ্ধ সাইটগুলোতে সহজেই প্রবেশ করে ডাউনলোড করা সম্ভব।
সূত্র : দ্য মিরর [১৪]

ঘটনাগুলো  কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পাশ্চাত্যের ঘরে ঘরে এগুলো খুবই সাধারণ ঘটনা। আগ্রহী হলে পড়তে পারেন এই লিংকের  [১৫] লিখাগুলো  ।

পাঁচ.

আমি জানি এই আর্টিকেলের [১৬] সবটুকুই সত্য, কারণ আমি বেড়ে উঠেছি ‘জার্মানিতে’। আমি জানি এই সভ্যতা কতটা পচে গেছে। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন গুলো । আপনি কখনই এই অশ্লীল বিজ্ঞাপন থেকে বাচতে পারবেন না । টিভি,ম্যাগাজিন,নিউজপেপার… কোথায় নেই ? ছোট থেকেই আপনাকে শেখানো  হবে এগুলি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

সিক্সত গ্রেডে পরার সময়কার একটি ঘটনা। ‘সেক্স এডুকেশন’ ক্লাসে টিচার খুব বড় একটা কাগজ নিয়ে এসে, আমাদের বললেন-”  যৌনতা সম্পর্কে যা যা মনে আসে সব এখানে লিখ, যৌনতার নিয়ম কানুন গুলো লিখতে ভুলনা যেন!! লেখ শেষ হলে আমরা এগুলি নিয়ে আলোচনা করব।”

কি ভয়ংকর অবস্থা, তাইনা ? তবে  আমি আপনাকে কখনই বলবনা স্কুলে আমাদের কতটা গ্রাফিক, কতটা অশ্লীল সাহিত্যের বই পড়তে দেয়া হত। ওইসব কথা মনে করতেই আমার রুচিতে বাধে ।

আমি কখনই চাইবো না  আমার ছেলেমেয়েরা জার্মানীতে বেড়ে উঠুক ।

—Sebastian Bradley.

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ ……

#একেই_বলে_সভ্যতা

[লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত]

পড়ুন-

মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-১: https://bit.ly/2OhCeO0
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-২: https://bit.ly/2Ms17VA
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব- ৩ https://bit.ly/2p6dopk
একেই বলে সভ্যতা (দ্বিতীয় পর্ব) !!!: https://bit.ly/2xbpnW5
এরই নাম স্বাধীনতা !!!: https://bit.ly/2xcsUnn
এরই নাম স্বাধীনতা!!! দ্বিতীয় পর্ব – https://bit.ly/2xce9kq
এরই নাম স্বাধীনতা!!! তৃতীয় পর্ব-https://bit.ly/2MxnRna
পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা: https://bit.ly/2p1Irme
নারী যখন পন্য: https://bit.ly/2OilZQH
অভিশপ্তনগরী: https://bit.ly/2MumYeW

“****” ম্যাম গার্ড পড়ছিলঃ বুঝতে পারছিলাম না, প্যান্ট সামলাবো নাকি কলম !!! – https://bit.ly/2x3Krif

রেফারেন্সঃ

[১] http://bit.ly/2azmaGv

[২] http://tinyurl.com/jy5d6zf

[৩] http://tinyurl.com/z2qxzdw

[৪] http://preview.tinyurl.com/jl2ttct

[৫] http://tinyurl.com/hy2xphf

[৬] http://tinyurl.com/zlfdcuw

[৭] http://tinyurl.com/z2x8oz7

[৮] http://tinyurl.com/gwqhbta

[৯] http://tinyurl.com/zgs665u

[১০] http://tinyurl.com/hos7vdl

[১১] http://tinyurl.com/ld4zxd9

[১২] ঘটনাটি www.fightthenewdrug.com  থেকে সংগৃহীত।

[১৩] http://tinyurl.com/hjq2a29

[১৪] http://tinyurl.com/zerbb5v

[১৫] http://www.antipornography.org/harm_stories.html

[১৬] http://fightthenewdrug.org/germanys-legalized-prostitution-industry-looks-like-a-real-life-horror-movie/

 

শেয়ার করুনঃ
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-১

মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-১

আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড  নিজেদেরকে দাবী করে এক মহান সভ্যতার ধারক হিসেবে । যার অন্যতম ফিচার  গনতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা আর নারীদের সমান অধিকার । পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের  তোড়জোড়ের অভাব নেই । war on terror এর নামে তারা মুসলিম দেশ গুলোতে আক্রমণ করতে দুইবার চিন্তা করে না । মুসলিম নারীদের জন্য তাদের মায়াকান্নার শেষ নেই । তারা বলে মুসলিমরা নারীদেরকে বোরখার আড়ালে রেখে,নারীদেরকে  ঘরে বন্দী করে রেখে  তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে , তাদেরকে এক অদৃশ্য দাসত্বের শিকলে বেঁধে রেখেছে । তারা মুসলিম নারীদেরকে বোরখার আড়াল থেকে বের করে এনে, শরীয়া আইনের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেংগে ফেলে  তাদেরকে পুরুষের সমান অধিকার দিতে চায় । অথচ তাদের দেশেই তারা  নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়ে  নারীদেরকে পন্য বানিয়ে ফেলেছে । তারাই পর্ন ইন্ডাস্ট্রি বানিয়েছে,তারাই সেখানে  নারীদের সাথে পশুর মতো আচরণ করছে । বাসায়, স্কুলে, কলেজে, রাস্তাঘাটে, অফিসে, হাসপাতালে , সেনাবাহিনীতে কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়। সবখানেই নারীরা চরম ভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে । আমাদের এই সিরিজে আমরা চেষ্টা করব এই পাশ্চাত্য সভ্যতার ভন্ডামী আপনাদের সামনে তুলে ধরার । আমরা চেষ্টা করব সেই সব  হতভাগ্য বোনদের  বুকফাটা হাহাকার গুলো আপনাদের কাছে পৌঁছে দেবার যারা এই তথাকথিত আধুনিক, মক্তমনা, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সমাজের দ্বারা ভয়ংকর যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ।

.

“আমেরিকান আর্মির  মহিলা সদস্যরা শত্রুদের নিয়ে ততোটা বেশী শংকিত থাকে না ,  যতটা বেশী  শঙ্কিত থাকে তাদের পুরুষ সহকর্মীদের হাতে যৌন নিপীড়িত হবার  ভয়ে  ……”।

.

একটা গভীর  দীর্ঘশ্বাস ছেড়েই এই কথা গুলো বললেন ডোরা হারনান্দেজ যিনি প্রায় দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে কাজ করেছেন আমেরিকান নেভি এবং আর্মি ন্যাশনাল গার্ডএ । ডোরা হারনান্দেজ সহ আরো কয়েকজন প্রবীণ ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা হচ্ছিল যারা  আমেরিকার সামরিক বাহিনীতে  কাজ করেছেন অনেক বছর , ইরাক এবং আফগানিস্থান যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন । এই ফ্রন্টগুলোতে  কোনমতে  তারা সারভাইভ করতে পেরেছেন  কিন্তু পুরো কর্মজীবন জুড়ে তাদেরকে আরোও একটি যুদ্ধ করতে হয়েছে  নীরবে-এবং সেই যুদ্ধে তারা প্রতিনিয়তই পরাজিত হয়েছেন । তাদের সেই নীরব যুদ্ধ ধর্ষণের বিরুদ্ধে ।

পেন্টাগনের নিজেস্ব  রিসার্চ থেকেই  বের হয়ে এসেছে যে আমেরিকান সামরিক বাহিণীর  প্রতি চার জন মহিলা সদস্যের একজন তাদের ক্যারিয়ার জুড়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ।

ডোরা হারনান্দেজ থেমে যাবার পর  মুখ খুললেন সাবিনা র‍্যাংগেল , টেক্সাসে,  এলপাসোর অদূরে তাঁর বাসার ড্রয়িংরুমে বসেই আমাদের কথা হচ্ছিল, “ আমি যখন আর্মির বুট ক্যাম্পে ছিলাম তখন আমি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম এবং যখন নেভিতে গেলাম তখন একেবারে  ধর্ষণের শিকার হলাম” ।

জেমি লিভিংস্টোন ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন  ইউ.এস নেভিতে  তিনি বললেন, আমি জানতাম   ইউ এস আর্মির কালচারটাই এমন যে  সৈনিক এবং অফিসাররা  রেপ করাকে তাদের অধিকার  মনে করে । তাই আমি রেপের ঘটনা গুলো চেপে যেতাম আর আমার বসই আমাকে রেপ করত, কাজেই আমি কাকে রিপোর্ট করব’?

ভদ্রমহিলাগন একে একে আমেরিকান  আর্মিতে তাদের উপর করা যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো বলে চলছিলেন । তারা কেউই পূর্ব পরিচিত ছিলেন না , কিন্তু আমেরিকান আর্মিতে  নিজেদের সহকর্মী এবং বসদের হাতে তারা যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেই  দুঃসহ অভিজ্ঞতাই তাদেরকে একে অপরের কাছে নিয়ে এসেছে । হৃদয়ের সবকটা জানালা খুলে দিয়ে তারা একজন অপরজনের দুঃখগুলো ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলেন ।

পেন্টাগনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে (২০১০ সাল,) ইউ এস আর্মিতে প্রতি বছর উনিশ হাজারের মতো যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে । (২০১১ সালে এটার পরিমাণ ছিল ছাব্বিশ হাজার)ইউ এস আর্মির মহিলা সদস্যরা আমেরিকার বেসামরিক মহিলাদের থেকে অধিক মাত্রায় যৌন নির্যাতনের ঝুকিতে থাকে । পেন্টাগনের  Sexual Assault Prevention and Response office এর প্রধান গ্যারী প্যাটন বলেন , আমাদের অবশ্যই এই কালচারটা পরিবর্তন করতে হবে । যৌন নির্যাতনকে  স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে মেনে নিলে চলবে না ।  ভিক্টিমের ইউনিটের সবাইকে যৌন নির্যাতনের ব্যাপারটিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে ।

সাবিনা র‍্যাংগেল  হাইস্কুল শেষ করেই আর্মিতে  জোগদান করেছিলেন । তার  ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল  আর্মির বুট ক্যাম্পে একদিন ট্রেনিং করার সময় তার  ড্রিল সার্জেন্ট এর দ্বারা । সাবিনা র‍্যাংগেল প্রথমে ভেবেছিলেন তার সার্জেন্ট বোধহয় তাকে  ড্রিল করার ব্যাপারে নির্দেশনা দিচ্ছেন , কিন্তু আসলে  সার্জেন্ট  তার  শরীরে হাত বুলানোর চেষ্টা করছিলেন ।

সাবিনা  র‍্যাংগেল বুট ক্যাম্প শেষ করার পর আর  আর্মি ছেড়ে চলে আসেন । যৌন নির্যাতনের ঘটনা  চেপে যান সবার কাছ থেকে ।

পেন্টাগনের পরিসংখ্যান অনুসারে মাত্র ১৪ শতাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনা রিপোর্ট করা হয় । বাকী ৮৬ শতাংশ ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায় । অনেক ভিক্টিম অভিযোগ করেন তার নির্যাতনকারী তার চেয়ে উঁচু র‍্যাংকের।অনেকে অভিযোগ করেন  যৌন নির্যাতনের শিকার হলে যেই  কর্মকর্তার কাছে রিপোর্ট করতে হবে ,  সেই সব কর্মকর্তাই আমাকে  যৌন নির্যাতন করেছে । র‍্যাংগেলের ক্ষেত্রেও এইরকমটা হয়েছিল ।

র‍্যাংগেল  ২০০০ সালের দিকে আবার ইউ এস  সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন । এইবার তিনি  নেভিতে । এল পাসোতে ইউ এস নেভীর একটা ঘাঁটিতে তিনি  কাজ করার দায়িত্ব পান ।

একবার  তার বেতনের চেকে কিছুটা সমস্যা হলে তিনি তাঁর কমান্ডার এক  সার্জেন্ট মেজরের  সঙ্গে  যোগাযোগ করলেন । সেই  সার্জেন্ট মেজর তাঁকে  তার অফিসে ডেকে পাঠালেন । তবে তিনি র‍্যাংগেলকে এই প্রস্তাবও দিলেন , “ তুমি যদি আমার সঙ্গে হোটেলে দেখা কর তাহলে, আমি তোমাকে খুশি করে দিব” ।

র‍্যাংগেল এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন । কিন্তু সেই সার্জেন্ট মেজর এতে একটুকুও না দমে র‍্যাংগেলকে বিছানায় যাবার প্রস্তাব দিতেই থাকলেন।

আমি যখন তার অফিসে গেলাম তখন আর কোন উপায় না পেয়ে  তার পি.এস (যিনি নিজেও একজন মহিলা) কে বললাম , যখন বস আমাকে ডাকবে এবং আমি যাবার পর ভেতর থেকে দরজা লক করে দিবে , প্লীজ আপনি এই সময়টাতে একটু পর পর দরজায় নক করবেন । তিনি কিছুটা ক্লান্তস্বরে উত্তর দিলেন , “সাবিনা ! শুধু তোমার সাথেই না , বস সবার সাথেই এরকম করে …।

আমরা,সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন বা আছেন এমন অনেক অনেক মহিলার সঙ্গে কথা বলেছি , যারা সবাই একটা ব্যাপারে একমত হয়েছেন – ইউ.এস সামরিক বাহিনীর পুরুষরা , সামরিক বাহিনীর নারীদের ধর্ষণ করাকে তাদের অধিকার মনে করে । সামরিক বাহিনীতে তো একটা কৌতুক প্রচলিতই আছে ,‘পুরুষ সহকর্মী বা অফিসারদের হাতে  ধর্ষিত হওয়া নারী অফিসার বা সৈন্যদের পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে’।

সাবিনা  র‍্যাংগেল একবার এক মিশনের দায়িত্ব পেলেন । সেই মিশনেও এই সার্জেন্ট মেজর ছিলেন  । এই সার্জেন্ট মেজর আর একজন সার্জেন্ট মেজরকে নিয়ে সাবিনা র‍্যাংগেল কে ধর্ষণ করতে থাকেন ।

সাবিনা র‍্যাংগেল বিভিন্ন সময় তার কমান্ডারদের (যাদের মধ্যে একজন মহিলা কমান্ডারও ছিলেন) তার ধর্ষিত হবার ঘটনা জানালে , তারা কোন পদক্ষেপ না নিয়ে সাবিনাকে ঘটনা গুলো চেপে যেতে বললেন । এমনকি কোন কোন অফিসার তাঁকে এই ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে উত্যক্ত করত ।

সাবিনা র‍্যাংগেল আস্তে আস্তে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়লেন । একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন  সামরিক বাহিনী ছেড়ে চলে যাবার – ব্যস অনেক হয়েছে আর এই পাশবিক নির্যাতন সহ্য করা যাবে না । তিনি জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়লেন । ধর্ষিত হবার দুঃসহ  স্মৃতি গুলো তাঁকে সারাক্ষন তাড়া করে বেড়াতে লাগলো । আত্মহত্যার চেষ্টাও করলেন কয়েকবার ……

শরীয়াহ আইনানুসারে, অপরাধ করার কারণে নারীদের দোররা মারলে   আমেরিকার মিডিয়াতে প্রতিবাদের ঝড় উঠে ,মুসলিমদের তুলোধুনো করে দেওয়া হয় , নারীবাদীরা মায়া কান্না কাঁদে,  হই চই শুরু করে দেয় – মুসলিমরা বর্বর, মধ্যযুগীয়, মুসলিমরা নারী স্বাধীনতার বিরোধী   ব্লা ব্লা ব্লা …

অথচ তাদের নিজেদের দেশের আর্মিতেই যে ভয়াবহ নারী নির্যাতন হয় সে ব্যাপারে  তারা চুপ  । কোথায়  তাদের মানবাধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, কোথায়  নারী স্বাধীনতা ?

#ডাবলস্ট্যান্ডার্ড

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌  ……

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনুবাদিত )

পড়ুন-

মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-২ http://lostmodesty.blogspot.com/2015/10/blog-post_25.html

মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-৩  http://lostmodesty.blogspot.com/2015/12/blog-post_29.html

পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা – http://lostmodesty.blogspot.com/2015/12/blog-post_17.html

রেফারেন্স-

১) http://www.npr.org/2013/03/20/174756788/off-the-battlefield-military-women-face-risks-from-male-troops

২)http://www.protectourdefenders.com/factsheet/

৩) http://www.globalresearch.ca/sexual-assault-against-women-in-the-us-armed-forces/5374784

শেয়ার করুনঃ