বদলে ফেলুন নিজেকে… এই রমাদানে (শেষ পর্ব)

বদলে ফেলুন নিজেকে… এই রমাদানে (শেষ পর্ব)

স্মরণ করুন বাইয়াতের রাতের কথা। আনসারদের একটা দল এসেছেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে গোপনে দেখা করতে। কুরাইশরা খবর পেলে কাউকে আস্ত রাখবে না। নবীজিকে মদিনায় নিরাপত্তা দিতে আনসার সাহাবীরা প্রস্তুত। আলোচনার এক পর্যায়ে তাঁরা জানতে চাইলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনাকে রক্ষার বিনিময়ে আমরা কী পাবো?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উত্তরে শুধু বললেন, ‘আল জান্নাহ’। এতটুকুই। আর কোন কিছুর ওয়াদা তিনি দিলেন না।
.
বাইয়াত নিতে আসা ৭০ জন আনসার সেই রাতে এতটুকু ভালমতোই জানতেন যে, প্রবল স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নবীজি এবং মুহাজিরদেরকে আশ্রয় দেয়া মানে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে কুরবানি করে দেয়া। শত্রুতা তৈরি হবে পুরো বিশ্বের সাথে। আন্তর্জাতিক বয়কটে অর্থনৈতিক মন্দার আশংকা তো আছেই, বর্শা-তরবারির আঘাতে যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারে প্রাণ।
এতকিছুর ক্ষতিপূরণ কী? #জান্নাত
.
এবার খেয়াল করুন আনসারদের প্রতিক্রিয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উত্তর শুনে উনারা বললেন- ‘এ তো এক লাভজনক ব্যবসা! আমরা কখনোই এই সুযোগ হাতছাড়া করবো না।’ [1]

কোন পাল্টা প্রশ্ন নেই, না সাহাবীদের কেউ পিছু হটলেন। এত দৃঢ়তা কীভাবে আসলো? জীবন-মরণের দোলাচলে এমন অনিশ্চয়তার পরিস্থিতে থাকলে কি ‘শুধুমাত্র জান্নাতের কথা শুনে’ এমন স্বতঃস্ফূর্ত জবাব বের হতো আমাদের জবান থেকে? ভাবুন প্লিজ।
.
যদি নির্দ্বিধায় নিঃসঙ্কোচে আমাদের ভেতর থেকে উত্তর না আসে, তাহলে কেন আসছে না? কারণ আমরা জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে স্রেফ ‘শুনেছি’ / ‘একসময় পড়েছি’, কিন্তু ‘উপলব্ধি’ করি না, চিন্তা-ফিকিরও নেই। আমাদের ২৪ ঘন্টা কাটে জাগতিক পরিকল্পনা আর আয়োজনে। অন্তরটা বেচে দিয়েছি দুনিয়ার তরে। তাই আর জান্নাতকে ‘উত্তম ব্যবসা’ মনে হয় না। জান্নাতের জন্য নিজেকে #আত্মত্যাগ করার বিষয়টাও ‘লজিকে’ আসে না।
.
সমাধানঃ “সকল ভোগ-উপভোগ বিনাশকারীকে (মৃত্যুকে) তোমরা বেশি বেশি স্মরণ কর।” [2]

#আখিরাতকে_নতুন_করে_উপলব্ধি_করুন
.
“তারা কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে ব্যক্তি রাতে সিজদারত অবস্থায় অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, #আখিরাতকে_ভয়_করে এবং তার প্রতিপালকের রহমত প্রত্যাশা করে? তুমি বল! যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? জ্ঞানবান লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।” (আয-যুমার, ৩৯ঃ ৯)
.
গত পর্বে আলোচনা ছিল যে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলে আমাদেরকে দ্বীনের দাবি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে। ‘ইলম আমার মূর্খতাকে দূর করবে, কোরআন আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে, সীরাহ আমাকে গাইডলাইন দিবে, ইসলামের সেনাপতিরা আমাকে অনুপ্রাণিত করবে। বাতিল-ভন্ডদের ছুড়ে ফেলে আমরা চিনতে পারবো আসল সুপারস্টারদের।

এই পর্বে ইতি টানবো আখিরাতের উপর একটু বিশেষ জোর দিয়ে…

কেন?
.
আমাদের অন্তরটা পাথরের মত শক্ত হয়ে আছে। আল্লাহর হুকুম-আহকামের বিপক্ষে গিয়ে আমরা এতকাল ইবাদত করেছি নিজের খেয়াল-খুশির (প্রবৃত্তি)। তাই অন্তরে মোহর পড়ে গিয়েছে [3]। এ অবস্থায় আমরা কোন হালাল-হারামের তোয়াক্কা করছি না। অন্তঃসারশূন্য, অভিশপ্ত এমন হৃদয়কে বদলে ফেলার একটাই দাওয়াই, পাথুরে অন্তরকে কোমল করা, নরম করা, বিগলিত করা। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন মনের গহীনে জাহান্নামের ‘ভয়’ ও জান্নাতের ‘আশা’ – খুব ভালোভাবে গেঁথে যাবে। তাকওয়া নিয়ে কথা বলেছিলাম প্রথম পর্বে। মনে আছে তো? তাকওয়া বৃদ্ধি করতে মৃত্যু, কবরের আজাব, পুনরুত্থান, বিচার দিবসের পরিস্থিতি, জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে বারবার চিন্তা করা, উপলব্ধি করা খুব সহায়ক।
.
এ পদ্ধতি স্বয়ং আল্লাহ সুবহানওয়াতা’আলা থেকে প্রাপ্ত। নবিজি (ﷺ) এর কাছে নাজিল হওয়া একেবারে শুরুর সময়ের আয়াতগুলোর দিকে নজর দিলেই আমরা বুঝতে পারবো তাতে আখিরাতের বিভিন্ন বর্ণনা কতটা গুরুত্বের সাথে এসেছে। সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত আসার পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে নাজিল হয়েছে আল-মুদাসসিরের আয়াতগুলো [4]। অনুবাদ দেখে নিয়েন। এছাড়া অন্যান্য মাক্কী সূরা, বিশেষ করে আল-কিয়ামাহ থেকে আন-নাজিয়াত – সবগুলোর অনুবাদ পড়ুন, আমাদের কথার সত্যতা খুঁজে পাবেন।
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নবুয়তি জীবনের শুরুর দিকে কুরাইশদের প্রতি দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটিঃ

(১) আল্লাহই একমাত্র রব ও ইলাহ- তাওহীদ এর ঘোষণা।
(২) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল – রিসালাতের সাক্ষ্য।
(৩) পুনরুত্থান, বিচার ও কাজের ফলাফল স্বরূপ জান্নাত বা জাহান্নাম। [5]
.
যখন আমার হৃদয় বিগলিত হয়ে যাবে আল্লাহর বড়ত্বের সামনে, উনার আজাব ও পুরস্কার সম্পর্কে পুরোপুরি জানবো তখন অন্তরে অনেকদিনের গড়া অহংকারের কাল্পনিক প্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে, দাম্ভিকতা মিলে যাবে হাওয়ায়। আমরা বিনয়ী হতে পারবো, পারবো আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিতে। সাহাবীরা পেরেছেন। যখন হুকুম-আহকাম এর বিধানগুলো পরবর্তীতে ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছিল তখন তাঁদের প্রতিক্রিয়া কি ছিল পড়ে নিন ইতিহাসের পাতা থেকে। অধিকাংশ বিধান ছিল উনাদের আগেকার অভ্যস্ত জীবনের বিপরীত। তারপরও সমস্যা হয় নি। কারণ ততদিনে তাঁদের হৃদয় আল্লাহর দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে গিয়েছিল। উনারা ঠিকই বুঝে গিয়েছিলেন এ সাময়িক দুনিয়া পরকালের #অসীম জীবনের কাছে কতটা তুচ্ছ।

সাহাবীরা ‘ইনফিনিটি’র মর্ম অনুধাবন করেছেন। আর আমরা এ ধারনাকে স্রেফ থিওরিতে সীমাবদ্ধ রেখে নিজেদের জ্ঞানী ভাবছি!

এই রমাদানে শুরু করতে পারেন ‘পরকালের পথে যাত্রা’ অডিও লেকচার সিরিজ (https://bit.ly/2RGlAvf) দিয়ে । মৃত্যু থেকে শুরু করে জান্নাত-জাহান্নাম পর্যন্ত গুছানো আছে আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ্ সুবহানওয়াতা’আলা Rain Drops এর ভাইদের উত্তম প্রতিদান দিক। লেকচারগুলো দায়সারা ভাবে শুনে গেলে কাজ হবে না কিন্তু। যখন শুনবেন অন্য কোন কাজ করবেন না। মনোযোগ দিবেন। নোট করবেন।
.
নিজের শেষ পরিণতির কথা ভেবে কাঁদুন। যত গুনাহ করেছেন সবগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন, অসংখ্যবার।

“ইয়া আল্লাহ্‌, মাফ করে দিন। জানা-অজানা সব গুনাহ মাফ করে দিন। অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের সকল কবিরা গুনাহ, সগিরা গুনাহ মাফ করে দিন…”

ভাই, নিজের পাথুরে অন্তরটাকে ভেঙ্গে ফেলুন। এখনই সময়…
.
“যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য সে সময় কি এখনও আসেনি যে আল্লাহর স্মরণে আর যে প্রকৃত সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হয়ে যাবে? আর তারা যেন সেই লোকদের মত না হয়ে যায় যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল, অতঃপর তাদের উপর অতিবাহিত হয়ে গেল বহু বহু যুগ আর তাদের অন্তর কঠিন হয়ে পড়ল। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।” (আল-হাদিদ, আয়াত ১৬)

অনেকদিনের অভ্যাস ছাড়তে কষ্ট হবে এটা স্বাভাবিক। এতকাল নেশার মত পর্ন-মাস্টারবেশন-মুভি-মিউজিক-পরনারী খুঁজেছে এ অন্তর। হুট করে তো সব বাদ দেয়া যায় না। অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। একটা একটা করে ছাড়ুন। লড়াই করতে থাকুন বজ্জাত নফসের সাথে। পাশাপাশি অন্তরে জায়গা করে দিন আল্লাহর কালামকে। বিশ্বাসে, আমলে ডুব দিন ইসলামের মিষ্টতায়। দেখবেন একদিন সত্যিই সফল হবেন। আল্লাহ্ই তা সম্ভব করে দিবেন, যদি আপনার অন্তরে থাকে #দৃঢ়তা আর কাজে থাকে #আন্তরিকতা
.
“শপথ (মানুষের) নফসের এবং যিনি তাকে (সবদিক থেকে) সুবিন্যস্ত করেছেন তাঁর। অতঃপর (তিনি) তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। যে নিজেকে (নফসকে) শুদ্ধ করে, সে-ই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়।” (আশ-শামস, আয়াত ৭-১০)

অর্থাৎ, যে নিজের নফসকে শিরক, আল্লাহর অবাধ্যতা এবং চারিত্রিক অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করবে, সে পরকালে #সফলতা#মুক্তি লাভ করবে। [6]

লিখাটা শুরু করেছিলাম জান্নাতের ঘোষণার ঘটনা দিয়ে। শেষটাও থাকছে তেমনি আরেকটি হাদিস দিয়ে-
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্বার) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিস (যৌনাঙ্গের) (সঠিক ব্যবহারের) নিশ্চয়তা দেবে আমি তার জন্য #জান্নাতের_নিশ্চয়তা দিব।” [7]
.
করবেন ইনভেস্ট এই লাভজনক ব্যবসায় যা কখনো ক্ষতির মুখ দেখবে না?
পেতে চান সফলতা যা আর কখনো ছিনিয়ে নেয়া হবে না?
তাহলে বদলে ফেলুন নিজেকে, এই রমাদানে। ফিরে আসুন, তওবার পথ এখনো খোলা।
ফিরে আসুন, সময় থাকতেই।
আপনাকে গ্রহণ করে নিবেন আসমানের বাসিন্দারা।
আহলান ওয়া সাহলান…
.
রেফারেন্সঃ
[1] সীরাহ, প্রথম খন্ড
[2] তিরমিযী, ২৪০৯
[3] পড়ুন, আল-জাছিয়া, আয়াত ২৩
[4] তাওযীহুল কোরআন, তাফসীর ইবন কাছির
[5] তাফহিমুল কোরআন
[6] আহসানুল বায়ান
[7] বুখারী, ৬৪৭৪, ৬৮০৭; তিরমিযী, ২৪০৮
.

শেয়ার করুনঃ
বদলে ফেলুন নিজেকে… এই রমাদানে (দ্বিতীয় পর্ব)

বদলে ফেলুন নিজেকে… এই রমাদানে (দ্বিতীয় পর্ব)

সফলতা কোনটা?

ক্যাম্পাসের জাতীয় ক্রাশের হৃদয় চুরি করতে পারা? প্রিয়তমার মুখে শোনা সেই কাঙ্ক্ষিত ‘জাতীয় সঙ্গীতের ২য় লাইন’? তার নিষিদ্ধ স্পর্শ?
অবসরে রুম লক করে নিজের প্রবৃত্তির ইবাদত?
মেসি-রোনালদো-সাকিবদের সাথে তোলা সেলফি?
অন্যের হক মেরে আদায় করা জমি-বাড়ি-গাড়ি-কোম্পানির টপ পজিশন?
সুদের থোড়াই কেয়ার করে ফুলে ফেঁপে উঠা ব্যাংক ব্যালেন্স?
ইসলামকে ফোর্থ সাবজেক্ট বানিয়ে দুনিয়ার আকর্ষণে ছুটে চলা?

… একটাও না?
.
উত্তর খুঁজছেন? কষ্ট করার দরকার নেই। আপনাকে চিন্তা করার ক্ষমতা যিনি দিয়েছেন, শরীরের প্রত্যেকটা কোষ যিনি সৃষ্টি করেছেন, এই মহাজগত যাঁর আদেশে চলছে সেই স্রষ্টা মহান আল্লাহ-ই বলে দিয়েছেন এই আমাদের, ইনসানদের জন্য প্রকৃত সফলতা আসলে কী –

“সেই দিন, যে দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। হাশর দিবসে। সেটা এমন দিন, যখন কিছু লোক অন্যদেরকে আক্ষেপের মধ্যে ফেলে দেবে। আর যারা আল্লাহর প্রতি #ঈমান আনে ও #সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার নিচে নহর প্রবাহিত থাকবে। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য।” (আত-তাগাবুন, ৬৪: ৯)

একটা অনুসিদ্ধান্তে আপানারা সবাই একমত হবেন, কোন কাজই পরিকল্পনা-পরিস্থিতি-প্রচেষ্টা ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঠিক না?
.
আমরা অধিকাংশই ফাসেকি পরিবেশে বড় হয়েছি। চাইতেও, না চাইতেও অনেক কিছু দেখেছি, জেনেছি, করেছি। পর্ন-মাস্টারবেশন-চটিগল্প বলুন বা ক্লাসের সুন্দরী মেয়েটাকে পটানো, ডেটিং এ যাওয়া থেকে শুরু করে লিটনের ফ্ল্যাট – অতীতে যাই কুকর্ম করেছি, কোনটাই পরিকল্পনা-পরিস্থিতি-প্রচেষ্টা অনুকূলে থাকা ছাড়া সম্ভব হয়নি। অনুকূলে রাখতে আমরা কি করেছি? স্যাক্রিফাইস। আর্থিক, মানসিক, শারীরিক।
.
স্রষ্টার বিপরীতে গিয়ে সৃষ্টিকে খুশি রাখতে আমরা তো সব উজাড় করে দিলাম। কী পেয়েছি এর বদলে? যা পেয়েছি তা কি আমাকে সুখী রেখেছে? রাখলে, তার স্থায়িত্ব কদিনের? মরবো না? তারপর? আমার প্রবৃত্তি, আমার প্রেমিকা কি সঙ্গ দিবে কবরে? যাঁর বিপরীতে চললাম দম্ভভরে, তাঁর কাছেই কি শেষমেশ চাইতে বা না চাইতেও প্রত্যাবর্তন করবো না?
—-

আমরা জাহেল কিন্তু এখন মুমিনদের দলে ভিড়তে চাই। এতদিন গাফেলতি করেছি এখন আন্তরিকতার সাথে ইসলাম মেনে চলতে চাই। হারাম কাজে সফলতা নেই, আমরা সফল হতে চাই। জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাই। মাইক্রো সেকেন্ডের জন্য হলেও জাহান্নামে যেতে চাই না, সে কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। ঠিক না?
.
বদলে যেতে চান? করবেন প্রত্যাবর্তন আল্লাহর দিকে? এই রমাদানই তাহলে আপনার জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট সময়। বড় শয়তান শিকলবদ্ধ। ‘পরিস্থিতি’ অনেকটাই অনুকূলে। এখন দরকার ‘পরিকল্পনা’ আর ‘প্রচেষ্টা’… আসুন, সুযোগটা কাজে লাগাই।
—-

এই রমাদানে আমাদের কী হাসিল করতে হবে? – আল্লাহর হিদায়াত ও ক্ষমা।
.
আমাদের পক্ষ থেকে কী করনীয়? – অতীতের সমস্ত গুনাহ এর জন্য লজ্জিত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া, আর ভবিষ্যতে করবো না এই ওয়াদা করা।

এটা তো সবাই জানি। তাহলে সমস্যা কোথায়? ভুল কোথায় হয়?

ভুল হয় যখন আমাদের অন্তর আর কথায় মিল থাকে না। মুখে বলছি আর গুনাহ করবো না কিন্তু অন্তর এখনো প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হচ্ছে না।
.
নবীজি (ﷺ) বলে গিয়েছেন, এই দুনিয়ায় থাকো এক মুসাফিরের মতো। অথচ, আমাদের ২৪ ঘন্টা কাটে দুনিয়ার ভাবনাতেই। খুব শীঘ্রই আমাদের সামান গুছিয়ে এক কোনে রাখা হবে। ঘর থেকে বের করে শুইয়ে দেয়া হবে কবরে। যাত্রা শুরু হবে অসীম পরকালের পথে। অথচ আমরা এখনো সিরিয়াস হতে পারলাম না দ্বীন ইসলাম নিয়ে।
.
আমাদের রোল মডেল হচ্ছে দুনিয়ার দাসত্ব করে বেড়ানো মানুষেরা। তাদের চলাফেরা, কথা-বার্তা সবকিছু আমাদের মুগ্ধ করে! তাদের মতো জীবন চাই আমাদের। অথচ চিনলাম না রহমাতুল্লিল ‘আলামিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে, অনুসরন-অনুকরণ তো আরও দূরে।
.
আহ! আমরা উনার উম্মত! উনি আমাদের কথা ভাবতেন, আমাদের চিন্তায় কাঁদতেন। কিয়ামতের দিনে একমাত্র তিনিই আল্লাহর আরশের নিচে সিজদাহতে লুটিয়ে পড়বেন। আমাদেরকে পক্ষে শাফা’আত করতে ! [1] সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমরা সাহাবা আজমাঈনদের চিনিনা। অথচ আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। [2]
.
কিছুই জানি না। ঈমান আমার কাছে কি দাবি করছে না সেটা জানি, না জানি ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাস লিখে যাওয়া সেনাপতিদের। খেয়াল-খুশিকে লাগামছাড়া করে দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি। বেহায়াপনাকে মনে করছি স্বাধীনতা, দিন শেষে এ স্বাধীনতা আমাকে পোড়াচ্ছে অস্থিরতা আর আক্ষেপে।
.
ইসলামকে শুধু স্কুলের একটা চিকন বইয়ের মলাটে আর কিছু ব্যক্তিগত আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করে আমরা আজ হয়েছি গন্তব্যহীন।
.
তাহলে সমাধান কী?
.
#ইলম_অর্জন_করুন
.
“…আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাঁকে ভয় করে…” (ফাতির, ৩৫: ২৮)

আল্লাহর শক্তিমত্তা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ৰোধ, পরাক্রম, সার্বভৌম কর্তৃত্ব-ক্ষমতা ও অন্যান্য গুণাবলী সম্পর্কে যে ব্যক্তি যতবেশী জানবে সে তাঁর নাফরমানী করতে ততবেশী ভয় পাবে। [3]
.
এই রমাদানেই প্রথম নাজিল হয়েছিল কোরআন, প্রথম শব্দটি কী?

ٱقۡرَ ‘পড়ো’ । নবীজি (ﷺ) এর ক্ষেত্রে এই শব্দের উদ্দেশ্য ছিল ‘তিলাওয়াত’। আমাদের জন্য তা হল দ্বীন ও শরীয়তের বিষয়ে জ্ঞান (ইলম) অর্জন।
.
‘প্রত্যেক মুসলিমের উপরে ইলম অন্বেষণ করা ফরয’ [4]। দুনিয়ার সার্টিফিকেট, গোল্ড মেডেল কিছুই কাজে আসবে না যদি আপনার ইলম না থাকে আর সে ইলম অনুযায়ী আপনি না চলেন।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে জাহান্নামীদের আফসোস তুলে ধরেছেন এভাবে-

‘তারা আরও বলবে, যদি আমরা সেদিন (নবীদের কথা) #শুনতাম এবং তা #অনুধাবন করতাম, তাহলে আজ জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না’ (আল মুলক, ৬৭: ১০)
.
ঈমানের পরিচয়ঃ আল্লাহ্কে স্রষ্টা হিসেবে ‘একক’, তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান, এ জগতের সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র ‘এক’ আল্লাহর – অন্তরে গেঁথে নিন। স্বেচ্ছায় নিজেকে আত্মসমর্পণ করুন আল-মালিকের কাছে। বিশ্বাস আনুন আল্লাহর ফেরেশতাদের অস্তিত্বে, নবি- রাসূলদের আগমনে, আখিরাতে ও তাকদীরের ভালো-মন্দে। কথায় ও কাজে দ্বীন ইসলামকে বাস্তবায়ন করুন, যে আদর্শের উপর এসেছিলেন আমাদের রাসূল ()। [5]
.
ঈমান ছাড়া শত আমল বৃথা। তাই আপনাকে ভালো করে ঈমানের পরিচয় জানা থাকতে হবে। ব্যাখা বুঝতে হবে। জানতে হবে ঈমান ভঙ্গের কারণগুলো। এরপর আপনাকে স্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে ইসলামের স্তম্ভ, হালাল-হারামের সীমারেখা, মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য, শেষ পরিনতি সম্পর্কে।
.
বুঝাতে পারবেন কে? একজন ইলমসম্পন্ন আলিম। খুঁজে নিন। আপনি চেষ্টা করুন, আল্লাহ্ মিলিয়ে দিবেন।
.
সাহাবী আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘হায়! তোমাদের আলিমগণ বিদায় নিচ্ছেন কিন্তু তোমাদের বে-ইলম শ্রেণি ইলম অর্জন করছে না। ইলম উঠিয়ে নেওয়ার আগেই ইলম হাসিল কর। ইলম উঠিয়ে নেওয়ার অর্থ আলিমদের প্রস্থান।’ [6]

“যে কেউ ইলমের খোঁজে কোনো পথে চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” [7]
.
কিতাব পড়ুন, এমন কিতাব যা দ্বীনের ভিত্তি গড়তে সাহায্য করবে [8]। তা না হলে ফায়দা পাবেন না। অযথা ইউটিউবে র্যান্ডম ইসলামিক ভিডিও দেখবেন না, বিভ্রান্ত হবেন।

#কোরআন_তিলাওয়াতকারীদের_দলভুক্ত_হয়ে_যান
.
“হে লোকসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে (ব্যাধি) তার #নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য #হিদায়াত ও রহমত”। (ইউনুস, ১০: ৫৭)
.
আমাদের অন্তর আজ অসুস্থ। জঘন্য সব চিন্তা-ভাবনা মাথায় কিলবিল করছে। নিরাময় কী? কোরআন।
.
আমরা হিদায়াত খুঁজছি। হিদায়াত আছে কোরআনে।
.
এত এত গুনাহ করেছি যে হিসাব করতে গেলে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু ভাসছে না। তওবার পাশাপাশি দরকার নেকীর পাল্লা ভারি করা। এখানেও আমাদের বন্ধু হবে কোরআন।

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য সওয়াব রয়েছে। আর সওয়াব হয় তার দশ গুণ। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ’। [9]
.
কিয়ামতের দিন কোরআন আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে।

‘কিয়ামতের দিন কুরআন আবির্ভূত হয়ে বলবে, হে রব, (তিলাওয়াতকারীকে) আপনি সুসজ্জিত করুন। তখন তাকে সম্মানের মুকুট পরানো হবে। তারপর বলবে, হে রব, আপনি আরও বৃদ্ধি করুন। তখন তাকে সম্মানের পোশাক পরানো হবে। অতপর বলবে, হে রব, আপনি তার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়ে যান। তখন আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। তারপর বলবে, তুমি পড় এবং ওপরে উঠো। এভাবে প্রত্যেক আয়াতের বিনিময়ে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে।’ [10]
.
কোরআন তিলাওয়াতকারীরা আল্লাহর ‘বিশেষ’ বান্দা হবার মর্যাদা পায়। [11]
.
আমদের ভেতর যে ভাইয়েরা কোরআন পড়তে পারি না, আসুন এই রমাদানে শিখে ফেলি। সহজ কিন্তু। বয়স হয়ে গেছে আগে শিখেননি এসব ভেবে লজ্জিত হয়ে বসে থাকার কোন মানে হয় না। অতীত নিয়ে না ভেবে আসুন চলমান সময়কে গুরুত্ব দিই।

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কুরআন শেখে এবং (অপরকে) শেখায়।’ [12]
.
কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা অনুবাদ পড়বো, তিলাওয়াত শুনবো।
.
মোটকথা কোরআনকে অবহেলা করা যাবে না। কোন না কোন ভাবে ফায়দা নিতেই হবে।
.
আজ এ পর্যন্ত থাকুক। যারা লিখাটা পড়লেন, শুধু পড়ার জন্য পড়ে স্ক্রল করে চলে যেয়েন না। একটু বুঝুন, একটু কষ্ট করুন আল্লাহর জন্য। অল্প কদিন বাকি। এরপর আর কষ্ট করার সুযোগও পাবো না আমরা কেউ…
.
রেফারেন্সঃ

[1] বুখারী ২/৯৪৯, আহমাদ ১২৫৭৯, মুসলিম ২০২, তিরমিযী ২৪৩৭
[2] সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ১০০; ফাতহুল মাজিদ
[3] তাফসীরে জাকারিয়া
[4] ইবনু মাজাহ ২২৪; মিশকাত ২১৮
[5] পড়ুন, সূরা আত-তাগাবুন এর আয়াত ১-১০ / মুসলিম, হাদিস নং ৮
[6] আদ দারেমী ২৫১
[7]. মুসনাদে আহমদ ১৪/৬৬
[8] কিতাব পরামর্শ-
https://www.alkawsar.com/bn/qa/student-advices/…
https://www.facebook.com/alihasanosama/posts/803740526484168
মুফতী মনসূরুল হক (হাফি.) এর কিতাবসমূহ- https://tinyurl.com/ybssv3k4
[9] তিরমিযী ২৯১০; মিশকাত ২১৩৭
[10] তিরমিযী ৩১৬৪
[11] ইবনু মাজাহ ২১৫; ছহীহুল জামে‘ ২১৬৫
[12] বুখারী: ৫০২৭
.
প্রথম পর্ব- http://lostmodesty.com/2020/05/ramadan1/

শেয়ার করুনঃ
বদলে ফেলুন নিজেকে… এই রমাদানে (প্রথম পর্ব)

বদলে ফেলুন নিজেকে… এই রমাদানে (প্রথম পর্ব)

আসসালামু আলাইকুম। রমাদান মুবারাক। এই রমাদান হোক আপনাদের বদলে যাওয়ার প্রথম রমাদান। যেন পরের বছর রমাদানের এমনি কোনো পবিত্র রাতে আল্লাহর কাছে সিজদাহতে লুটিয়ে শুকরিয়ার অশ্রু বইয়ে দিতে পারেন আর বলতে পারেন, ‘ইয়া আল্লাহ্‌! আপনিই আমাকে গত বছর হিদায়াতের সন্ধান দিয়েছিলেন! আমাকে মুক্ত করেছেন চোরাবালি থেকে…’।

এমন পরিবর্তন আসা সম্ভব, সত্যিই সম্ভব…
.
হয়তো ভাবছেন মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছি। রোজা তো রাখি ঠিকই, কই লাভ তো হয় না!

ভাইরে, রোজা রাখার পাশাপাশি যে সমান তালে চলে মিউজিক/ মুভি/ সিরিজ এটা বলছেন না কেনো? ফেসবুক ইন্সটাগ্রাম স্ন্যাপচ্যাট টিকটক আরো কত সোশ্যাল (!) সাইটে যে নিজের স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে নষ্টামির দুয়ার খুলে রেখেছেন সেটাই বা বাদ যাবে কেনো? জাস্ট-ফ্রেন্ড, গার্ল-ফ্রেন্ডদের কথা আর নাই বা তুলি! এসব দিব্যি চালিয়ে ভাবছেন পর্ন-মাস্টারবেশনের ফাঁদ থেকে বেঁচে যাবেন?
.
যে ভাইয়েরা এটা ভেবে নিয়েছেন যে, স্রেফ উপোস থেকে স্ক্রিনে ললনাদের গিলে দিন পার করে দিবেন আর সামহাউ কোন একটা ‘মিরাকল’ ঘটে উনার পর্ন-মাস্টারবেশন আসক্তি মিটে যাবে, মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে!, তাদের থেকে চোখ নিচু হয়ে যাবে আর হিদায়াতের পথ তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে! – আপনারা #বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন। স্রেফ না খেয়ে থাকলেই আপনি হিদায়াতের সন্ধান পাবেন না। এটা সাওম না, এভাবে রমাদান পার করলে আপনি কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কেউ যদি সওম পালন করেও মিথ্যা বলা ও অপকর্ম ত্যাগ না করে, তাহলে তার পানাহার বর্জন করাতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। [1]
.
বরং এই উদাসীনতা, আল্লাহর হুকুম আহকামকে পাত্তা না দিয়ে গুনাহে নিমজ্জিত থাকা ডেকে আনে #আজাব। এমন আজাবে কষ্ট পায় আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টি।

আল্লাহ্‌ বলেন,

“…নিশ্চিত জেনো, আল্লাহ্ কোনও জাতির অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষন না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে…” (আর-রা’দ, আয়াত ১১)
.
শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী এই আয়াতের ব্যাখায় বলেন, এমনিতে আল্লাহ্ কোন জাতির ভালো অবস্থাকে মন্দ করে দেন না। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর নাফরমানীতে অটল থাকে আর নিজেদের আমল-আখলাক সেরূপে বদলে ফেলে তখন তাদের উপর আল্লাহর আজাব এসে যায়। [2]
.
একই প্রসঙ্গে হাদীসেও এসেছে যে, যখন পাপাচার অধিক পরিমাণে বেড়ে যাবে, কেউই আজাব থেকে রক্ষা পাবে না, মুমিনরাও না। [3]
.
তাহলে করণীয় কী? দেখেন ভাই, দুনিয়াবী জগতের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে যেমন মেহনত দিতে হয়, তেমনি ‘রুহানী’ জগতের ক্ষেত্রেও একই মেকানিজম। আগে আপনি উদ্যোগ নিবেন, এরপর আল্লাহ্ আপনাকে টেনে বের করবেন মুছিবত থেকে।
.
হাদিসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ্ বলেছেন, ‘আমি সেইরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি, যখন যে আমাকে স্মরণ করে। আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অপেক্ষা বেশি খুশী হন, যে তার মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া বাহন ফিরে পায়। আর যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। যে আমার দিকে এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দুই হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। আর সে যখন আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তখন তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।” [4]
.
কিছু বুঝাতে পারলাম কি? আগে আপনি আল্লাহর নিকট এগুবেন- আগে আপনি হারাম থেকে বের হবার সমাধান খুঁজতে আরম্ভ করবেন, আগে আপনি অন্তরকে বোঝাবেন, প্রবৃত্তিকে লাগাম পড়াবেন। এরপর, আপনার মেহনত, নিয়্যাহ এর বদৌলতে আল্লাহ্‌ আপনাকে বাঁচাবেন।
.
যদি বুঝে থাকেন, যদি আপনি আল্লাহর নাখোশ বান্দাদের দলভুক্ত হতে না চান, যদি প্রস্তুত থাকেন ময়লায় আচ্ছাদিত অন্তরকে ধুয়ে সাফ করতে, তাহলে এবার মনোযোগ দিয়ে পড়ুন রমাদানের উদ্দেশ্য-বিধেয়।
.
১.

‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (আল-বাকারা, আয়াত ১৮৩)

আল্লাহ্ সুবহানওয়াতা’আলা রমাদানকে ফরজ করেছেন।

যেন আমরা #তাকওয়া অর্জন করতে পারি।
.
আপনি চাইলেই তো লুকিয়ে কিছু খেয়ে নিতে পারেন, তাই না? তাও সংযম করছেন। কেন? কারণ আপনি জানেন, কেউ না দেখলেও আমাদের রব ঠিকই দেখছেন। উনার ভয়ে আপনার লোভাতুর চোখ ইফতারের প্রহর গুনছে। ওজু করার সময় খুব খেয়াল রাখছেন যেন পানি পেটে না ঢুকে পড়ে! #আল্লাহর_ভয় এবং উনার ভয়ে ‘ভুল-ত্রুটি থেকে সচেতন থাকা’ এটাই হচ্ছে তাকওয়া।
.
শাইখ মূসা জিবরীল উনার Gems of Ramadan লেকচারে সুন্দর বলেছেন, রমাদান হচ্ছে বুট ক্যাম্প এর মতো। এখানে আপনি ‘হালাল’ খাবার থেকে, স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরংগতা থেকে নিজেকে বিরত রাখছেন, আল্লাহর আদেশে। এই ট্রেইনিং থেকে শিক্ষা নিয়ে আপনাকে আগামী ১১ মাস অবশ্যই ‘হারাম’ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

তাকওয়া।
.
আল্লাহ্‌র রসূল (ﷺ) বলেনঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন, সওম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তাঁর নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দেব। সিয়াম #ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন #অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং #ঝগড়া_বিবাদ না করে। যদি কেউ তাঁকে গালি দেয় অথবা তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন সায়িম। [5]

আপনার অন্তরে যত ভালোভাবে #তাকওয়ার_সিলমোহর বসবে, আপনি তত সচেতন থাকবেন।
.
২.

‘…নিশ্চয়ই সালাত বিরত রাখে আল-ফাহশা (সব ধরনের কবীরা গুনাহ, অশ্লীলতা) এবং আল-মুনকার (কুফর, শির্ক ও অন্যান্য শয়তানী কাজ) থেকে।’ (আল-আনকাবুত, আয়াত ৪৫)

আল্লাহ্‌ বলছেন #সালাত আমাদেরকে বাঁচাবে সকল প্রকার ফাহেশাত থেকে। কিন্তু কীভাবে? মাথায় আসে না অনেকের।
.
সালাতে সূরা ফাতিহা তো পড়া লাগেই, তাই না? ফাতিহার ৫ নম্বর আয়াতের অর্থটা দেখুন, আমরা এখানে সাক্ষ্য দিচ্ছি إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ – ‘আমরা আপনারই ইবাদত করি, আপনার কাছেই সাহায্য চাই’। এভাবে আমরা জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগত হয়ে চলার ওয়াদা করছি! এখন কীভাবে এ ওয়াদা ভঙ্গ করা সম্ভব? যখনই কোন গুনাহ করতে ইচ্ছা হবে এই #ওয়াদার কথা মাথায় রাখুন। এভাবেই আপনি রক্ষা পাবেন ফাহেশাত থেকে। [6]
.
রমাদানে সালাতের বিশেষত্ব কী?

এই পবিত্র মাসে আমরা শুধু ৫ ওয়াক্ত ফরজ, সুন্নাতে মুয়াকাদ্দাহ সালাতগুলো পড়ি তা না, এর পাশাপাশি আমরা তারাবীহ পড়ি, তাহাজ্জুতও পড়ি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি। কিয়ামুল লাইলের খাতায় শুধু ২০ রাকাত তারাবীহ যোগ করলে, এই মাসেই প্রতিদিন অন্তত ৫২ রাকাত সালাতে আপনি ৫২ বার সূরা ফাতিহা পড়ছেন বা শুনছেন (ইমামের ইক্তিদা করে)।


এভাবে আল্লাহর দিকেই বারবার রুজু করছেন, আল্লাহর সাথে ওয়াদা করছেন যে, একমাত্র উনার কথামতোই আপনি চলছেন, চলবেন। এই আল্লাহর ভয়, উনার ক্ষমা পাওয়ার জন্য করা আপনার সব ইবাদত, উনারই কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ – আপনাকে #হিদায়াতের_পথ দেখাবে, বিইযনিল্লাহ।
.
অনেক কিছু বলে ফেললাম ভাই। মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছা করে। আমরাও আপনাদের মতোই ইনসান। এক গুনাহগার বান্দা… আল্লাহ্কে নাখোশ করে ফেলি শয়তানের ধোঁকায়। আসেন মিলেমিশে নসীহতের মাধ্যমে দুনিয়ার জিন্দেগিটা পার করি… ঈমান নিয়ে।
.
এ পর্ব শেষ করছি দুটো হাদিস মনে করিয়ে দিয়েঃ

– নবীজি (ﷺ) বলেছেন: ‘‘যখন রমাযান মাসের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও অবাধ্য জীনদেরকে বন্দী করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এর একটিও খোলা রাখা হয় না। এদিকে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। একটিও বন্ধ রাখা হয় না। আহবানকারী (মালাক বা ফেরেশতা) ঘোষণা দেন, হে কল্যাণ অনুসন্ধানকারী! আল্লাহর কাজে এগিয়ে যাও। হে অকল্যাণ ও মন্দ অনুসন্ধানী! (অকল্যাণ কাজ হতে) থেমে যাও। এ মাসে আল্লাহ তা‘আলাই মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন এবং এটা (রমাযান (রমজান) মাসের) প্রত্যেক রাতেই হয়ে থাকে।’’ [7]
.
– জিব্রীল (আ.) দুআ করেছেন, “ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমযান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ হল না।” উত্তরে নবীজি (ﷺ) বললেন, ‘আমীন’। [8]
.
‘ধ্বংস’, নয়তো ‘মুক্তি’…

এই রমাদান শেষে আমাদের পরিণতি হবে এই দুইটার যেকোনো একটা। মাথায় গেঁথে নিন ভালো করে।
.
দ্বিতীয় পর্বে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা থাকবে কিভাবে আপনি এই অসাধারণ দিনগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ব্যয় করতে পারেন।

ইনশাআল্লাহ।
.
রেফারেন্সঃ

[1] http://www.ihadis.com:8080/books/abi-dawud/hadis/2362
[2] তাফসীরে তাওযীহুল কোরআন, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৩১
[3] http://ihadis.com/books/muslim/hadis/7129
[4] http://www.ihadis.com:8080/books/hadis-somvar/hadis/1265
[5] http://ihadis.com/books/bukhari/hadis/1904
[6] তাফসীরে তাওযীহুল কোরআন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫৭৫ এর ভাবার্থ
[7] http://www.ihadis.com/books/mishkatul-masabih/hadis/1960
[8] https://www.alkawsar.com/bn/article/641/

শেয়ার করুনঃ