নারীপুরুষের মেলামেশার সীমানা কেমন হওয়া উচিত? প্রশ্নটা নিয়ে ভালোই বিতর্ক শুরু হলো ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে। মন পরিষ্কার থাকা, ভালো নিয়্যাত থাকা, উদ্দেশ্য ভালো হওয়া কি যথেষ্ট? নাকি শরীয়াহর দিকনির্দেশনা আর সীমারেখাও মেনে চলতে হবে? ‘আমাদের বয়স তো এখনো কম’, একজনকে বলতে শোনা গেল। ‘কোন বয়সটা কম, কোনটা বেশি, সেটা কিসের ভিত্তিতে ঠিক হবে? ম্যাচিউরিটি এসেছে কি না সেটার মাপার মাপকাঠি কী? বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখন শরীয়াহর দৃষ্টিতে দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন? বালেগা?’ ‘যদি মন পরিষ্কার থাকে তাহলে ছেলেমেয়ের মেলামেশায় সমস্যা কী? এটা তো কোনো পাপ না! ’ ঠিক-বেঠিক কে ঠিক করবে? সমাজ, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র? নাকি শরীয়াহ? ‘আরে তুই তো হুজুরনীদের মতো কথা বলছিস!’ . বিতর্ক চলতেই থাকল। বিষয়টা স্কুল প্রিন্সিপালের কানে গেল। তিনি ক্লাসে আসলেন। তবে আসার কারণ ওদের বললেন না। ধীর পায়ে ক্লাসে ঢুকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, . ‘আচ্ছা মেয়েরা বলো তো, এই টেবিলটা বড় না ছোট?’ ‘ছোট!’, বলল একজন। ‘না, বড়!’ ওর কথার রেশ মিলিয়ে যাবার আগেই আরেকজন চেঁচিয়ে বলল । ‘আরে না, টেবিলটা মাঝারি সাইজের’, সবজান্তার সুরে বলে উঠল তৃতীয়জন। মুচকি হেসে প্রিন্সিপাল এবার প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা দেখি এখানেও একমত হতে পারছ না। একমত হতে হলে কী দরকার বলো তো?’ ‘ছোট আর বড়-র সংজ্ঞা। কতটুকু হলে ছোট, কতটুকু হলে বড়, সেটা জানতে হবে।’ ‘চমৎকার। আর সংজ্ঞার জানার পর কী দরকার?’ ‘একটা মাপকাঠি। যা দিয়ে মাপা যাবে, তুলনা করা যাবে।’ ‘সুন্দর বলেছ। এই কথাগুলো শুধু টেবিলের জন্য না; বরং আমাদের জীবনের সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদি কোনো সংজ্ঞা ঠিক করা না থাকে, কোনো পার্থক্যকারী না থাকে এবং কোনো মাপকাঠি না থাকে, তাহলে কোনোদিন, কোনো কিছুতেই আমরা একমত হতে পারব না। এখন প্রশ্ন হলো, কোন সেই মাপকাঠি, যা দিয়ে আমরা বিচার করব? মাপব?’ ‘সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি’, ‘কিন্ত যখন সংস্কৃতি আর সমাজের রীতিনীতি বদলে যাবে?’ জবাব দিল না মেয়েটা। ‘আমাদের বাবা-মা যা করবেন, যা শেখাবেন সেটাই আমাদের মাপকাঠি’, আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল আরেকজন। ‘কিন্তু বাবা-মা যদি একমত হতে না পারে? যদি তারাও তোমাদের মতো তর্ক শুরু করে?’ দ্বিতীয় মেয়েটাও চুপ হয়ে গেল। ‘বিবেক।’ ‘সব মানুষের বিবেক কি একরকম?’ ‘না।’ ‘তাহলে কার বিবেককে আমরা মাপকাঠি হিসেবে নেব?’ এবার তৃতীয় মেয়েটাও চুপ। ‘যুক্তি?’, ঠিক উত্তর না, অনেকটা প্রশ্নের মতো শোনাল এবার। ‘কিন্তু যেটা তোমার কাছে যৌক্তিক সেটা তো আরেকজনের কাছে যুক্তিসম্মত নাও মনে হতে পারে, তাই না?’ ‘হ্যাঁ।’ . ‘আচ্ছা এই যে তোমরা বলছ, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি, পিতামাতা, বিবেক, যুক্তি ইত্যাদিকে মাপকাঠি হিসেবে নিতে, তোমরা কি নিশ্চিত এগুলো তোমাকে সঠিক উত্তরটা দিতে পারবে?’ এবার পিনপিতন নীরবতা নেমে এল ক্লাসে। সবাই ভাবছে। যে মেয়েটাকে হুজুরণী বলা হচ্ছিল এবার সে মুখ খুলল। অনুচ্চ, শান্ত কিন্তু নিশ্চিত গলায় বলল, ‘শরীয়াহ। মাপকাঠি হবে আল্লাহর দেয়া শরীয়াহ।’ ‘ঠিক! মাপকাঠি হলো শরীয়াহ। শোনো মেয়েরা, আমরা মুসলিম। আর মুসলিম হবার অর্থ কী? এর অর্থ হলো আমরা প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে নিজেদের সমর্পণ করি। আল্লাহ বলেছেন, وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّـهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَن يَعْصِ اللَّـهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারী উক্ত নির্দেশের ভিন্নতা করার কোনো অধিকার রাখে না। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে সে স্পষ্টতই সত্য পথ হতে দূরে সরে পড়ল। [তরজমা, সূরা আল-আহযাব, ৩৬] . এবং তিনি বলেন, وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّـهِ ۚ ذَٰلِكُمُ اللَّـهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ আর যেকোনো বিষয়েই তোমরা মতবিরোধ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তাঁরই ওপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই। [তরজমা, সূরা আশ-শূরা, ১০] এবং তিনি বলেন, فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সেই বিষয়কে আল্লাহ এবং রাসূলের (নির্দেশের) দিকে ফিরিয়ে দাও যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো; এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম মর্মকথা। [তরজমা, সূরা আন-নিসা, ৫৯] . শোনো মেয়েরা, মানুষ ভুল করে। আমাদের ভুল হয়ে যায়। আমরা হয়তো সব সময় শরীয়াহর বিধান মেনে চলতে পারি না। ভুল হওয়াটা সমস্যা না। কিন্তু আমাদের স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে আমরা যা করছি সেটা ভুল। শরীয়াহর বিধান সঠিক। আমি হয়তো কোনো একটা ক্ষেত্রে সেটা পালন করতে পারিনি, কিন্তু আমার স্বীকার করতে হবে যে আমি যা করছি সেটা ভুল। শরীয়াহ যা ঠিক করে দিয়েছে সেটাই ঠিক।’... . আল্লাহ এই উম্মাহর মধ্যে এমন শিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে দিন, যারা আমাদের সন্তানদের শরীয়াহর কর্তৃত্ব সম্পর্কে শেখাবে এবং শরীয়াহকে গ্রহণ করতে শেখাবে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে। . বই: আয়নাঘর লেখক: ড. ইয়াদ আল-কুনাইবি