Published on

পর্নোগ্রাফি যেভাবে জীবন ধ্বংস করেঃ পামেলা পলের সাক্ষাৎকার

পামেলা পল একজন আমেরিকান লেখিকা । পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠস্বর বরাবরই সোচ্চার । তিনি পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতা সম্পর্কে pornfield নামে একটি বই লিখেন । এই বই সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ দিক সম্পর্কে আলোচনা করেন । আমাদের পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকারের কিছু চুম্বকাংশ অনুবাদ করা হল

প্রশ্নঃ আমেরিকান সমাজে পর্নোগ্রাফির প্রসারে কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশী বিস্মিত করেছে?

পামেলা পলঃ সত্যি কথা বলতে কি এই বইটা লিখার পূর্বে আমি কখনোই মনে করিনি পর্নোগ্রাফি এরকম ভয়াবহ একটা ইস্যু । আমি জানতাম আমেরিকাতে পর্নোগ্রাফির প্রচুর ভোক্তা আছে , কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম পর্নোগ্রাফি এমন কোন বিষয় না যে এটা কারো জীবন শেষ করে দিতে পারে । আমার মনে যে প্রশ্নটা জেগেছিল সেটা হচ্ছে ,” এইযে আমাদের সমাজে (আমেরিকান সমাজে) যে বিপুল পরিমাণ পর্নোগ্রাফি দেখা হয় সেটার কোন ইফেক্ট আছে কিনা?

কাজেই গবেষণা করা শুরু করলাম । কেঁচো খুড়তে যেয়ে সাপ বেরিয়ে এল । আমি এমন কতগুলো লোকের সন্ধাণ পেলাম যাদের জীবন পর্নোগ্রাফি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছে । এমনকি এমন কিছু লোকের সন্ধান পেলাম যারা পর্নোগ্রাফিতে পুরোপুরি আসক্ত না , কিন্তু এই পর্নোগ্রাফির প্রভাবে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে , চাকুরী হারিয়ে ফেলেছে । এইসব লোকেরা মাঝে মাঝে অনুধাবন করতে পারে যে তারা আসলে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত । কিন্তু তারা যে বিষয়টা কখনোই উপলব্ধি করতে পারেনা যে এটার পরিনাম কি ।

প্রশ্নঃ কোন স্পেসিফিক উদাহরণ দিতে পারেন ?

পামেলা পলঃ একজন মহিলার সঙ্গে আমার প্রায় আধা ঘন্টার উপর ফোনালাপ হয়ে ছিল । উনি আমাকে বললেন, ‘আমি একসময় প্রচুর পর্ন মুভি দেখতাম । আমি এটাকে নিছক বিনোদন মনে করতাম । আমার হাসব্যান্ডও পর্নে আসক্ত ছিল । কিন্তু আমাদের দাম্পত্য জীবন ছিল খুবই হতাশাজনক । আমরা খুবই অসুখী ছিলাম”।

এই ভদ্র মহিলা পর্নোগ্রাফির বাহ্যিক জৌলুশে মুগ্ধ ছিল , কিন্তু যখন সে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখলো তখন তার মোহ কেটে যেতে সময় লাগলোনা ।

আপনার আসল প্রশ্নে ফিরে আসি । আপনি কয়টা উদাহরণ চান ? আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তারা সবাই পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ পরিনতির শিকার ।

আমি প্রচন্ড বিস্মিত হয়েছি, যখন লোকজন আমাকে বলতে শুরু করল যে পর্নোগ্রাফি তাদেরকে ব্যাপক বিনোদনের জোগান দেয় । কিন্তু একই সঙ্গে তারা এটাও বললো তাদের যৌন জীবনে তারা প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন । তারা তাদের ইরেকশান নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা, তাদের স্ত্রীরা তাদের নিয়ে ভয়াবহ অসুখী এবং তারা স্বাভাবিক যৌনকর্মে তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে । পর্নোগ্রাফি এইসব হতভাগা লোকদের এমনভাবে প্রোগ্রামড করে ফেলেছে যে অনলাইনে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে পর্ন মুভি দেখাতেই তারা আনন্দ পায় ।

প্রশ্নঃ আপনি আপনার বইয়ের এক যায়গায় বলেছেন অনেকেই পর্ন সিরিয়াসলি নেয় না । হালকা ভাবে নেয় , মজা মনে করে। কিন্তু আপনার বইয়ে কিছু লোকের কথা উল্লেখ করেছেন যারা এটা খুব সিরিয়াস বিষয় হিসেবে নেই । তো ,হঠাত হঠাত পর্নমুভি দেখা এই মানুষগুলো কিভাবে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে?

পামেলা পলঃ পর্নোগ্রাফি কিভাবে মানুষের উপর প্রভাব ফেলে এটা নিয়ে আমি পুরো একটা চ্যাপ্টার লিখেছি আমার বইতে । আমার বইয়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আছে । প্রথমত পর্নোগ্রাফি মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলো ধ্বংস করতে থাকে । একবার পর্ন মুভি দেখলে তার মধ্যে বার বার এটা করার প্রবনতা জাগে । সফট পর্ন দেখা একজন লোক কিছুদিনের মধ্যেই এটাতে আর কোন আগ্রহ খুঁজে খুঁজে পায় না । সে নতুন কিছু চায় । আরো বেশি আগ্রাসন , আরো বেশি খোলামেলা । এভাবে কয়েক ধাপ পেরিয়ে সে একসময় নিজেকে আবিষ্কার করে হার্ডকোর পর্ন মুভি, চাইল্ড পর্ন দেখা অবস্থায় ।

আশঙ্কার কথা হল , যারা মাঝে মাঝে পর্ন মুভি দেখে তাদের মধ্যেও ঠিক একই উপসর্গ দেখা যায় (একটু কম মাত্রার) যেগুলো পাওয়া যায় পর্নোগ্রাফিতে আসক্তেদের মধ্যে ।

প্রশ্নঃ কোন নির্দিষ্ট বয়সের বা নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষেরাই কি শুধু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয় ?

পামেলা পলঃ একসময় আমি বিশ্বাস করতাম পর্নোগ্রাফিতে শুধু তারাই আসক্ত হয় যারা অশিক্ষিত,

অসচেতন । এটা শুধুমাত্র অবিবাহিত মানুষদের জন্যই । আমি ভাবতাম , প্রায় প্রত্যেক টিন এজারদের এমন একটা সময় পার করতে হয় , যে সময় তারা প্রচুর পরিমাণ পর্ন মুভি দেখে । পর্নের ব্যাপ্তিটা অনেক ছোট । কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের সমাজের প্রায় সকল বয়সের এবং সকল শ্রেণীর মানুষ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে । টিন এজার বলুন, মধ্যবয়স্কদের কথা বলুন, বৃদ্ধদের কথা বলুন । সবাই পর্ন মুভি দেখে ।

আমি এমন অনেক উচ্চশিক্ষিত ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েটেড লোকের কথা জানি , অনেক বিবাহিত, অবিবাহিত , বাগদান করা , ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চা আছে এমন লোকের কথা জানি যারা নিয়মিত পর্ন মুভি দেখেন । পর্নোগ্রাফি মানুষের বেডরুম , ড্রয়িং রুম থেকে শুরু করে স্কুল কলেজের ক্লাস রুমে , অফিস আদালতে, চার্চে সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে । অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি যারা নিজেদেরকে নিবেদিত প্রাণ খৃষ্টান মনে করেন, তারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত । পর্নোগ্রাফি চার্চেও পৌঁছে গেছে । অনেক সন্যাসীও এতে ভয়াবহ রকমের আসক্ত ।

প্রশ্নঃ আপনার বই এবং আপনার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, ধার্মিক মানুষদের মধ্যে পর্ন মুভি দেখার প্রবনতাটা বেশ বেশি ! কিন্তু ব্যাপারটা একটু খাপছাড়া হয়ে গেল না ?

পামেলা পলঃ আসলে ধার্মিক মানুষেরা এই ব্যাপারটাতে অনেক সৎ । তাদেরকে এই ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করা হলে তারা প্রায় কোন কিছুই লুকোছাপা না করে সত্য কথাটা বলে দেন । সেকুল্যারদের মধ্যে এই জিনিসটার বেশ অভাব ।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান করার সময় যখন ধার্মিক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করা হয় আপনি পর্নোগ্রাফি নিয়ে ভোগান্তিতে আছেন কিনা? তখন তারা সত্য কথাটাই বলে দেন । একটা বিষয় এখানে মাথায় রাখবেন , পর্নোগ্রাফি নিয়ে ভোগান্তিতে থাকা মানেই এটা নয় যে তারা নিয়মিত পর্ন মুভি দেখেন । এর মানে এটাও যে তারা পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে সরে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং একারনেই এটা নিয়ে বেশ ভোগান্তিতে আছেন ।

আমি যেটা মনে করি সেকুল্যারদের চেয়ে ধার্মিক লোকেরাই এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি সচেতন এবং এটার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে বেশি তৎপর ।

প্রশ্নঃ পর্নোগ্রাফির সমস্যাটা দূর করার জন্য সেকুল্যাররা ধার্মিক লোকদের থেকে কি শিক্ষা নিতে পারে ?

পামেলা পলঃ সেকুল্যারদের ধর্মভিত্তিক কমিউনিটিদের মত পর্নোগ্রাফির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করতে হবে । আমরা সবাই বলি, অমুক সমাজের এত শতাংশ লোক পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, এত শতাংশ লোক পর্নোগ্রাফির কারণে ভয়াবহ জীবন কাটাচ্ছে , কিন্তু সত্যিকারঅর্থেই পর্নোগ্রাফিকে ভয়াবহ একটি বিষয় হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করার কাজ খুব একটা হয়নি । আমরা কয়জনের সঙ্গে পর্নোগ্রাফির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি ? এই ব্যাপারটাতে ধর্ম ভিত্তিকি কমিউনিটি গুলো অনেক অনেক এগিয়ে আছে । তারা অনেক আগেই পর্নোগ্রাফিকে একটা সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে । এবং এটার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে চলেছে । পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে তাদের এই ক্যাম্পেইন অনেক আগেই শুরু হয়েছে ।

প্রশ্নঃ তো একজন মানুষ কখন বুঝতে পারবেন যে তিনি পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়েছেন?

পামেলা পলঃ দেখেন, এই বিষয়টা এক একজনের ক্ষেত্রে এক একরকম হয় । ­­­­ খুব কম সংখ্যক লোক দ্রুত ব্যাপারটা ধরতে পারে । বেশীরভাগ লোক বছরের পর বছর ধরে পর্নমুভি

দেখে যায় কিন্তু বুঝতেই পারে না তারা এতে ভয়াবহ রকমের আসক্ত হয়ে পড়েছে । এবং মজার ব্যাপার হল, তারা কখনো স্বীকার করতে চায়না যে তারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ।

আমি প্রায় ২ ডজন লোকের সঙ্গে কথা বলেছি যারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত । তাদের যখন জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা কতদিন ধরে পর্নমুভি দেখেন , তারা সবাই উত্তর দিতে লুকোছাপার আশ্রয় নিলেন । সবাই কিছুটা সময় কমিয়ে উত্তর দিলেন । একজনতো আমাকে বলেই বসলেন (যিনি প্রায় কয়েক বছর ধরে প্রত্যেকদিন গভীর রাত পর্যন্ত পর্ন মুভিতে বুঁদ হয়ে থাকেন) আমি পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত না !

তো কখন বুঝবেন আপনি পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ? কয়েকটা বেসিক রুল বলি

মনে করুন, কেউ একজন সফটপর্ন দেখা শুরু করল । কিছুদিন পর সে যদি নিজেকে আবিষ্কার করে চাইল্ড পর্ন বা গে পর্ন দেখা অবস্থায় তাহলে বুঝতে হবে বিপদঘন্টা বেজে গেছে , ঐ লোক পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে ।

আর একটা রুল বলি , এটাকে অবশ্য জেনারালাইজড করলে হবে না , এটা কিছু কিছু মানুষের জন্য । অনেক লোক আছে পর্ন মুভি দেখা শুরু করার কিছু দিন পর পতিতালয়ে যেতে শুরু করে । কেউ কেউ অনলাইনে পতিতাদের সঙ্গে চ্যাট করে । তাইলেই তো এই দুইটা রুল দিয়েই মোটামুটি বুঝতে পারবেন একজন মানুষ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত কিনা ।

প্রশ্নঃ আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনার বই পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করবে?

পামেলা পলঃ আসলে মানুষের জানা দরকার পর্নোগ্রাফি শুধু নিছক বিনোদন নয় । এর সঙ্গে ভয়াবহ ক্ষতি

জড়িত রয়েছে । মানুষজনের এমন লোকদের কথা গ্রহণ করা উচিত যারা একসময় পর্নে আসক্ত ছিল বা এটা নিয়ে পড়াশোনা করেছে । এমন একসময় ছিল যখন চিকিৎসকরা রোগীদের প্রেস্ক্রাইব করত ধূমপান করার জন্য এবং মুভিতে সিগারেটকে বেশ হাইলাইট করে দেখানো হত । সময়টা ছিল এমন যে ‘পুরুষ’ হতে হলে আপনাকে ধূমপান করতেই হবে । কিন্তু যখন সবাই ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো জানতে পারলো, তখন থেকে ধূমপানের মাত্রা কমে যেতে থাকলো । এবং বর্তমানে এটাকে নেতিবাচক দিক হিসেবেই মেইনস্ট্রীম মিডিয়ায় উপস্থাপন করা হয় । আমি বলব পর্নোগ্রাফির ব্যাপারটাও সিগারেটের মতো । আমরা এটা নিয়ে যতবেশি আলোচনা করব, এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানবো ,এটার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে ততোবেশি সচেতনতা সৃষ্টি হবে ।

(ঈষৎ সংক্ষেপিত এবং পরিমার্জিত)

রেফারেন্সঃ

http://www.beliefnet.com/news/2005/10/how-porn-destroys-lives.aspx