স্মরণ করুন বাইয়াতের রাতের কথা। আনসারদের একটা দল এসেছেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে গোপনে দেখা করতে। কুরাইশরা খবর পেলে কাউকে আস্ত রাখবে না। নবীজিকে মদিনায় নিরাপত্তা দিতে আনসার সাহাবীরা প্রস্তুত। আলোচনার এক পর্যায়ে তাঁরা জানতে চাইলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনাকে রক্ষার বিনিময়ে আমরা কী পাবো?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উত্তরে শুধু বললেন, ‘আল জান্নাহ’। এতটুকুই। আর কোন কিছুর ওয়াদা তিনি দিলেন না।
.
বাইয়াত নিতে আসা ৭০ জন আনসার সেই রাতে এতটুকু ভালমতোই জানতেন যে, প্রবল স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নবীজি এবং মুহাজিরদেরকে আশ্রয় দেয়া মানে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে কুরবানি করে দেয়া। শত্রুতা তৈরি হবে পুরো বিশ্বের সাথে। আন্তর্জাতিক বয়কটে অর্থনৈতিক মন্দার আশংকা তো আছেই, বর্শা-তরবারির আঘাতে যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারে প্রাণ।
এতকিছুর ক্ষতিপূরণ কী? #জান্নাত
.
এবার খেয়াল করুন আনসারদের প্রতিক্রিয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উত্তর শুনে উনারা বললেন- ‘এ তো এক লাভজনক ব্যবসা! আমরা কখনোই এই সুযোগ হাতছাড়া করবো না।’ [1]

কোন পাল্টা প্রশ্ন নেই, না সাহাবীদের কেউ পিছু হটলেন। এত দৃঢ়তা কীভাবে আসলো? জীবন-মরণের দোলাচলে এমন অনিশ্চয়তার পরিস্থিতে থাকলে কি ‘শুধুমাত্র জান্নাতের কথা শুনে’ এমন স্বতঃস্ফূর্ত জবাব বের হতো আমাদের জবান থেকে? ভাবুন প্লিজ।
.
যদি নির্দ্বিধায় নিঃসঙ্কোচে আমাদের ভেতর থেকে উত্তর না আসে, তাহলে কেন আসছে না? কারণ আমরা জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে স্রেফ ‘শুনেছি’ / ‘একসময় পড়েছি’, কিন্তু ‘উপলব্ধি’ করি না, চিন্তা-ফিকিরও নেই। আমাদের ২৪ ঘন্টা কাটে জাগতিক পরিকল্পনা আর আয়োজনে। অন্তরটা বেচে দিয়েছি দুনিয়ার তরে। তাই আর জান্নাতকে ‘উত্তম ব্যবসা’ মনে হয় না। জান্নাতের জন্য নিজেকে #আত্মত্যাগ করার বিষয়টাও ‘লজিকে’ আসে না।
.
সমাধানঃ “সকল ভোগ-উপভোগ বিনাশকারীকে (মৃত্যুকে) তোমরা বেশি বেশি স্মরণ কর।” [2]

#আখিরাতকে_নতুন_করে_উপলব্ধি_করুন
.
“তারা কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে ব্যক্তি রাতে সিজদারত অবস্থায় অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, #আখিরাতকে_ভয়_করে এবং তার প্রতিপালকের রহমত প্রত্যাশা করে? তুমি বল! যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? জ্ঞানবান লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।” (আয-যুমার, ৩৯ঃ ৯)
.
গত পর্বে আলোচনা ছিল যে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলে আমাদেরকে দ্বীনের দাবি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে। ‘ইলম আমার মূর্খতাকে দূর করবে, কোরআন আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে, সীরাহ আমাকে গাইডলাইন দিবে, ইসলামের সেনাপতিরা আমাকে অনুপ্রাণিত করবে। বাতিল-ভন্ডদের ছুড়ে ফেলে আমরা চিনতে পারবো আসল সুপারস্টারদের।

এই পর্বে ইতি টানবো আখিরাতের উপর একটু বিশেষ জোর দিয়ে…

কেন?
.
আমাদের অন্তরটা পাথরের মত শক্ত হয়ে আছে। আল্লাহর হুকুম-আহকামের বিপক্ষে গিয়ে আমরা এতকাল ইবাদত করেছি নিজের খেয়াল-খুশির (প্রবৃত্তি)। তাই অন্তরে মোহর পড়ে গিয়েছে [3]। এ অবস্থায় আমরা কোন হালাল-হারামের তোয়াক্কা করছি না। অন্তঃসারশূন্য, অভিশপ্ত এমন হৃদয়কে বদলে ফেলার একটাই দাওয়াই, পাথুরে অন্তরকে কোমল করা, নরম করা, বিগলিত করা। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন মনের গহীনে জাহান্নামের ‘ভয়’ ও জান্নাতের ‘আশা’ – খুব ভালোভাবে গেঁথে যাবে। তাকওয়া নিয়ে কথা বলেছিলাম প্রথম পর্বে। মনে আছে তো? তাকওয়া বৃদ্ধি করতে মৃত্যু, কবরের আজাব, পুনরুত্থান, বিচার দিবসের পরিস্থিতি, জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে বারবার চিন্তা করা, উপলব্ধি করা খুব সহায়ক।
.
এ পদ্ধতি স্বয়ং আল্লাহ সুবহানওয়াতা’আলা থেকে প্রাপ্ত। নবিজি (ﷺ) এর কাছে নাজিল হওয়া একেবারে শুরুর সময়ের আয়াতগুলোর দিকে নজর দিলেই আমরা বুঝতে পারবো তাতে আখিরাতের বিভিন্ন বর্ণনা কতটা গুরুত্বের সাথে এসেছে। সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত আসার পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে নাজিল হয়েছে আল-মুদাসসিরের আয়াতগুলো [4]। অনুবাদ দেখে নিয়েন। এছাড়া অন্যান্য মাক্কী সূরা, বিশেষ করে আল-কিয়ামাহ থেকে আন-নাজিয়াত – সবগুলোর অনুবাদ পড়ুন, আমাদের কথার সত্যতা খুঁজে পাবেন।
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নবুয়তি জীবনের শুরুর দিকে কুরাইশদের প্রতি দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটিঃ

(১) আল্লাহই একমাত্র রব ও ইলাহ- তাওহীদ এর ঘোষণা।
(২) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল – রিসালাতের সাক্ষ্য।
(৩) পুনরুত্থান, বিচার ও কাজের ফলাফল স্বরূপ জান্নাত বা জাহান্নাম। [5]
.
যখন আমার হৃদয় বিগলিত হয়ে যাবে আল্লাহর বড়ত্বের সামনে, উনার আজাব ও পুরস্কার সম্পর্কে পুরোপুরি জানবো তখন অন্তরে অনেকদিনের গড়া অহংকারের কাল্পনিক প্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে, দাম্ভিকতা মিলে যাবে হাওয়ায়। আমরা বিনয়ী হতে পারবো, পারবো আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিতে। সাহাবীরা পেরেছেন। যখন হুকুম-আহকাম এর বিধানগুলো পরবর্তীতে ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছিল তখন তাঁদের প্রতিক্রিয়া কি ছিল পড়ে নিন ইতিহাসের পাতা থেকে। অধিকাংশ বিধান ছিল উনাদের আগেকার অভ্যস্ত জীবনের বিপরীত। তারপরও সমস্যা হয় নি। কারণ ততদিনে তাঁদের হৃদয় আল্লাহর দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে গিয়েছিল। উনারা ঠিকই বুঝে গিয়েছিলেন এ সাময়িক দুনিয়া পরকালের #অসীম জীবনের কাছে কতটা তুচ্ছ।

সাহাবীরা ‘ইনফিনিটি’র মর্ম অনুধাবন করেছেন। আর আমরা এ ধারনাকে স্রেফ থিওরিতে সীমাবদ্ধ রেখে নিজেদের জ্ঞানী ভাবছি!

এই রমাদানে শুরু করতে পারেন ‘পরকালের পথে যাত্রা’ অডিও লেকচার সিরিজ (https://bit.ly/2RGlAvf) দিয়ে । মৃত্যু থেকে শুরু করে জান্নাত-জাহান্নাম পর্যন্ত গুছানো আছে আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ্ সুবহানওয়াতা’আলা Rain Drops এর ভাইদের উত্তম প্রতিদান দিক। লেকচারগুলো দায়সারা ভাবে শুনে গেলে কাজ হবে না কিন্তু। যখন শুনবেন অন্য কোন কাজ করবেন না। মনোযোগ দিবেন। নোট করবেন।
.
নিজের শেষ পরিণতির কথা ভেবে কাঁদুন। যত গুনাহ করেছেন সবগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন, অসংখ্যবার।

“ইয়া আল্লাহ্‌, মাফ করে দিন। জানা-অজানা সব গুনাহ মাফ করে দিন। অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের সকল কবিরা গুনাহ, সগিরা গুনাহ মাফ করে দিন…”

ভাই, নিজের পাথুরে অন্তরটাকে ভেঙ্গে ফেলুন। এখনই সময়…
.
“যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য সে সময় কি এখনও আসেনি যে আল্লাহর স্মরণে আর যে প্রকৃত সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হয়ে যাবে? আর তারা যেন সেই লোকদের মত না হয়ে যায় যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল, অতঃপর তাদের উপর অতিবাহিত হয়ে গেল বহু বহু যুগ আর তাদের অন্তর কঠিন হয়ে পড়ল। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।” (আল-হাদিদ, আয়াত ১৬)

অনেকদিনের অভ্যাস ছাড়তে কষ্ট হবে এটা স্বাভাবিক। এতকাল নেশার মত পর্ন-মাস্টারবেশন-মুভি-মিউজিক-পরনারী খুঁজেছে এ অন্তর। হুট করে তো সব বাদ দেয়া যায় না। অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। একটা একটা করে ছাড়ুন। লড়াই করতে থাকুন বজ্জাত নফসের সাথে। পাশাপাশি অন্তরে জায়গা করে দিন আল্লাহর কালামকে। বিশ্বাসে, আমলে ডুব দিন ইসলামের মিষ্টতায়। দেখবেন একদিন সত্যিই সফল হবেন। আল্লাহ্ই তা সম্ভব করে দিবেন, যদি আপনার অন্তরে থাকে #দৃঢ়তা আর কাজে থাকে #আন্তরিকতা
.
“শপথ (মানুষের) নফসের এবং যিনি তাকে (সবদিক থেকে) সুবিন্যস্ত করেছেন তাঁর। অতঃপর (তিনি) তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। যে নিজেকে (নফসকে) শুদ্ধ করে, সে-ই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়।” (আশ-শামস, আয়াত ৭-১০)

অর্থাৎ, যে নিজের নফসকে শিরক, আল্লাহর অবাধ্যতা এবং চারিত্রিক অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করবে, সে পরকালে #সফলতা#মুক্তি লাভ করবে। [6]

লিখাটা শুরু করেছিলাম জান্নাতের ঘোষণার ঘটনা দিয়ে। শেষটাও থাকছে তেমনি আরেকটি হাদিস দিয়ে-
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্বার) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিস (যৌনাঙ্গের) (সঠিক ব্যবহারের) নিশ্চয়তা দেবে আমি তার জন্য #জান্নাতের_নিশ্চয়তা দিব।” [7]
.
করবেন ইনভেস্ট এই লাভজনক ব্যবসায় যা কখনো ক্ষতির মুখ দেখবে না?
পেতে চান সফলতা যা আর কখনো ছিনিয়ে নেয়া হবে না?
তাহলে বদলে ফেলুন নিজেকে, এই রমাদানে। ফিরে আসুন, তওবার পথ এখনো খোলা।
ফিরে আসুন, সময় থাকতেই।
আপনাকে গ্রহণ করে নিবেন আসমানের বাসিন্দারা।
আহলান ওয়া সাহলান…
.
রেফারেন্সঃ
[1] সীরাহ, প্রথম খন্ড
[2] তিরমিযী, ২৪০৯
[3] পড়ুন, আল-জাছিয়া, আয়াত ২৩
[4] তাওযীহুল কোরআন, তাফসীর ইবন কাছির
[5] তাফহিমুল কোরআন
[6] আহসানুল বায়ান
[7] বুখারী, ৬৪৭৪, ৬৮০৭; তিরমিযী, ২৪০৮
.

শেয়ার করুনঃ