সফলতা কোনটা?

ক্যাম্পাসের জাতীয় ক্রাশের হৃদয় চুরি করতে পারা? প্রিয়তমার মুখে শোনা সেই কাঙ্ক্ষিত ‘জাতীয় সঙ্গীতের ২য় লাইন’? তার নিষিদ্ধ স্পর্শ?
অবসরে রুম লক করে নিজের প্রবৃত্তির ইবাদত?
মেসি-রোনালদো-সাকিবদের সাথে তোলা সেলফি?
অন্যের হক মেরে আদায় করা জমি-বাড়ি-গাড়ি-কোম্পানির টপ পজিশন?
সুদের থোড়াই কেয়ার করে ফুলে ফেঁপে উঠা ব্যাংক ব্যালেন্স?
ইসলামকে ফোর্থ সাবজেক্ট বানিয়ে দুনিয়ার আকর্ষণে ছুটে চলা?

… একটাও না?
.
উত্তর খুঁজছেন? কষ্ট করার দরকার নেই। আপনাকে চিন্তা করার ক্ষমতা যিনি দিয়েছেন, শরীরের প্রত্যেকটা কোষ যিনি সৃষ্টি করেছেন, এই মহাজগত যাঁর আদেশে চলছে সেই স্রষ্টা মহান আল্লাহ-ই বলে দিয়েছেন এই আমাদের, ইনসানদের জন্য প্রকৃত সফলতা আসলে কী –

“সেই দিন, যে দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। হাশর দিবসে। সেটা এমন দিন, যখন কিছু লোক অন্যদেরকে আক্ষেপের মধ্যে ফেলে দেবে। আর যারা আল্লাহর প্রতি #ঈমান আনে ও #সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার নিচে নহর প্রবাহিত থাকবে। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য।” (আত-তাগাবুন, ৬৪: ৯)

একটা অনুসিদ্ধান্তে আপানারা সবাই একমত হবেন, কোন কাজই পরিকল্পনা-পরিস্থিতি-প্রচেষ্টা ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঠিক না?
.
আমরা অধিকাংশই ফাসেকি পরিবেশে বড় হয়েছি। চাইতেও, না চাইতেও অনেক কিছু দেখেছি, জেনেছি, করেছি। পর্ন-মাস্টারবেশন-চটিগল্প বলুন বা ক্লাসের সুন্দরী মেয়েটাকে পটানো, ডেটিং এ যাওয়া থেকে শুরু করে লিটনের ফ্ল্যাট – অতীতে যাই কুকর্ম করেছি, কোনটাই পরিকল্পনা-পরিস্থিতি-প্রচেষ্টা অনুকূলে থাকা ছাড়া সম্ভব হয়নি। অনুকূলে রাখতে আমরা কি করেছি? স্যাক্রিফাইস। আর্থিক, মানসিক, শারীরিক।
.
স্রষ্টার বিপরীতে গিয়ে সৃষ্টিকে খুশি রাখতে আমরা তো সব উজাড় করে দিলাম। কী পেয়েছি এর বদলে? যা পেয়েছি তা কি আমাকে সুখী রেখেছে? রাখলে, তার স্থায়িত্ব কদিনের? মরবো না? তারপর? আমার প্রবৃত্তি, আমার প্রেমিকা কি সঙ্গ দিবে কবরে? যাঁর বিপরীতে চললাম দম্ভভরে, তাঁর কাছেই কি শেষমেশ চাইতে বা না চাইতেও প্রত্যাবর্তন করবো না?
—-

আমরা জাহেল কিন্তু এখন মুমিনদের দলে ভিড়তে চাই। এতদিন গাফেলতি করেছি এখন আন্তরিকতার সাথে ইসলাম মেনে চলতে চাই। হারাম কাজে সফলতা নেই, আমরা সফল হতে চাই। জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাই। মাইক্রো সেকেন্ডের জন্য হলেও জাহান্নামে যেতে চাই না, সে কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। ঠিক না?
.
বদলে যেতে চান? করবেন প্রত্যাবর্তন আল্লাহর দিকে? এই রমাদানই তাহলে আপনার জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট সময়। বড় শয়তান শিকলবদ্ধ। ‘পরিস্থিতি’ অনেকটাই অনুকূলে। এখন দরকার ‘পরিকল্পনা’ আর ‘প্রচেষ্টা’… আসুন, সুযোগটা কাজে লাগাই।
—-

এই রমাদানে আমাদের কী হাসিল করতে হবে? – আল্লাহর হিদায়াত ও ক্ষমা।
.
আমাদের পক্ষ থেকে কী করনীয়? – অতীতের সমস্ত গুনাহ এর জন্য লজ্জিত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া, আর ভবিষ্যতে করবো না এই ওয়াদা করা।

এটা তো সবাই জানি। তাহলে সমস্যা কোথায়? ভুল কোথায় হয়?

ভুল হয় যখন আমাদের অন্তর আর কথায় মিল থাকে না। মুখে বলছি আর গুনাহ করবো না কিন্তু অন্তর এখনো প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হচ্ছে না।
.
নবীজি (ﷺ) বলে গিয়েছেন, এই দুনিয়ায় থাকো এক মুসাফিরের মতো। অথচ, আমাদের ২৪ ঘন্টা কাটে দুনিয়ার ভাবনাতেই। খুব শীঘ্রই আমাদের সামান গুছিয়ে এক কোনে রাখা হবে। ঘর থেকে বের করে শুইয়ে দেয়া হবে কবরে। যাত্রা শুরু হবে অসীম পরকালের পথে। অথচ আমরা এখনো সিরিয়াস হতে পারলাম না দ্বীন ইসলাম নিয়ে।
.
আমাদের রোল মডেল হচ্ছে দুনিয়ার দাসত্ব করে বেড়ানো মানুষেরা। তাদের চলাফেরা, কথা-বার্তা সবকিছু আমাদের মুগ্ধ করে! তাদের মতো জীবন চাই আমাদের। অথচ চিনলাম না রহমাতুল্লিল ‘আলামিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে, অনুসরন-অনুকরণ তো আরও দূরে।
.
আহ! আমরা উনার উম্মত! উনি আমাদের কথা ভাবতেন, আমাদের চিন্তায় কাঁদতেন। কিয়ামতের দিনে একমাত্র তিনিই আল্লাহর আরশের নিচে সিজদাহতে লুটিয়ে পড়বেন। আমাদেরকে পক্ষে শাফা’আত করতে ! [1] সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমরা সাহাবা আজমাঈনদের চিনিনা। অথচ আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। [2]
.
কিছুই জানি না। ঈমান আমার কাছে কি দাবি করছে না সেটা জানি, না জানি ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাস লিখে যাওয়া সেনাপতিদের। খেয়াল-খুশিকে লাগামছাড়া করে দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি। বেহায়াপনাকে মনে করছি স্বাধীনতা, দিন শেষে এ স্বাধীনতা আমাকে পোড়াচ্ছে অস্থিরতা আর আক্ষেপে।
.
ইসলামকে শুধু স্কুলের একটা চিকন বইয়ের মলাটে আর কিছু ব্যক্তিগত আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করে আমরা আজ হয়েছি গন্তব্যহীন।
.
তাহলে সমাধান কী?
.
#ইলম_অর্জন_করুন
.
“…আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাঁকে ভয় করে…” (ফাতির, ৩৫: ২৮)

আল্লাহর শক্তিমত্তা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ৰোধ, পরাক্রম, সার্বভৌম কর্তৃত্ব-ক্ষমতা ও অন্যান্য গুণাবলী সম্পর্কে যে ব্যক্তি যতবেশী জানবে সে তাঁর নাফরমানী করতে ততবেশী ভয় পাবে। [3]
.
এই রমাদানেই প্রথম নাজিল হয়েছিল কোরআন, প্রথম শব্দটি কী?

ٱقۡرَ ‘পড়ো’ । নবীজি (ﷺ) এর ক্ষেত্রে এই শব্দের উদ্দেশ্য ছিল ‘তিলাওয়াত’। আমাদের জন্য তা হল দ্বীন ও শরীয়তের বিষয়ে জ্ঞান (ইলম) অর্জন।
.
‘প্রত্যেক মুসলিমের উপরে ইলম অন্বেষণ করা ফরয’ [4]। দুনিয়ার সার্টিফিকেট, গোল্ড মেডেল কিছুই কাজে আসবে না যদি আপনার ইলম না থাকে আর সে ইলম অনুযায়ী আপনি না চলেন।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে জাহান্নামীদের আফসোস তুলে ধরেছেন এভাবে-

‘তারা আরও বলবে, যদি আমরা সেদিন (নবীদের কথা) #শুনতাম এবং তা #অনুধাবন করতাম, তাহলে আজ জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না’ (আল মুলক, ৬৭: ১০)
.
ঈমানের পরিচয়ঃ আল্লাহ্কে স্রষ্টা হিসেবে ‘একক’, তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান, এ জগতের সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র ‘এক’ আল্লাহর – অন্তরে গেঁথে নিন। স্বেচ্ছায় নিজেকে আত্মসমর্পণ করুন আল-মালিকের কাছে। বিশ্বাস আনুন আল্লাহর ফেরেশতাদের অস্তিত্বে, নবি- রাসূলদের আগমনে, আখিরাতে ও তাকদীরের ভালো-মন্দে। কথায় ও কাজে দ্বীন ইসলামকে বাস্তবায়ন করুন, যে আদর্শের উপর এসেছিলেন আমাদের রাসূল ()। [5]
.
ঈমান ছাড়া শত আমল বৃথা। তাই আপনাকে ভালো করে ঈমানের পরিচয় জানা থাকতে হবে। ব্যাখা বুঝতে হবে। জানতে হবে ঈমান ভঙ্গের কারণগুলো। এরপর আপনাকে স্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে ইসলামের স্তম্ভ, হালাল-হারামের সীমারেখা, মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য, শেষ পরিনতি সম্পর্কে।
.
বুঝাতে পারবেন কে? একজন ইলমসম্পন্ন আলিম। খুঁজে নিন। আপনি চেষ্টা করুন, আল্লাহ্ মিলিয়ে দিবেন।
.
সাহাবী আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘হায়! তোমাদের আলিমগণ বিদায় নিচ্ছেন কিন্তু তোমাদের বে-ইলম শ্রেণি ইলম অর্জন করছে না। ইলম উঠিয়ে নেওয়ার আগেই ইলম হাসিল কর। ইলম উঠিয়ে নেওয়ার অর্থ আলিমদের প্রস্থান।’ [6]

“যে কেউ ইলমের খোঁজে কোনো পথে চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” [7]
.
কিতাব পড়ুন, এমন কিতাব যা দ্বীনের ভিত্তি গড়তে সাহায্য করবে [8]। তা না হলে ফায়দা পাবেন না। অযথা ইউটিউবে র্যান্ডম ইসলামিক ভিডিও দেখবেন না, বিভ্রান্ত হবেন।

#কোরআন_তিলাওয়াতকারীদের_দলভুক্ত_হয়ে_যান
.
“হে লোকসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে (ব্যাধি) তার #নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য #হিদায়াত ও রহমত”। (ইউনুস, ১০: ৫৭)
.
আমাদের অন্তর আজ অসুস্থ। জঘন্য সব চিন্তা-ভাবনা মাথায় কিলবিল করছে। নিরাময় কী? কোরআন।
.
আমরা হিদায়াত খুঁজছি। হিদায়াত আছে কোরআনে।
.
এত এত গুনাহ করেছি যে হিসাব করতে গেলে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু ভাসছে না। তওবার পাশাপাশি দরকার নেকীর পাল্লা ভারি করা। এখানেও আমাদের বন্ধু হবে কোরআন।

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য সওয়াব রয়েছে। আর সওয়াব হয় তার দশ গুণ। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ’। [9]
.
কিয়ামতের দিন কোরআন আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে।

‘কিয়ামতের দিন কুরআন আবির্ভূত হয়ে বলবে, হে রব, (তিলাওয়াতকারীকে) আপনি সুসজ্জিত করুন। তখন তাকে সম্মানের মুকুট পরানো হবে। তারপর বলবে, হে রব, আপনি আরও বৃদ্ধি করুন। তখন তাকে সম্মানের পোশাক পরানো হবে। অতপর বলবে, হে রব, আপনি তার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়ে যান। তখন আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। তারপর বলবে, তুমি পড় এবং ওপরে উঠো। এভাবে প্রত্যেক আয়াতের বিনিময়ে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে।’ [10]
.
কোরআন তিলাওয়াতকারীরা আল্লাহর ‘বিশেষ’ বান্দা হবার মর্যাদা পায়। [11]
.
আমদের ভেতর যে ভাইয়েরা কোরআন পড়তে পারি না, আসুন এই রমাদানে শিখে ফেলি। সহজ কিন্তু। বয়স হয়ে গেছে আগে শিখেননি এসব ভেবে লজ্জিত হয়ে বসে থাকার কোন মানে হয় না। অতীত নিয়ে না ভেবে আসুন চলমান সময়কে গুরুত্ব দিই।

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কুরআন শেখে এবং (অপরকে) শেখায়।’ [12]
.
কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা অনুবাদ পড়বো, তিলাওয়াত শুনবো।
.
মোটকথা কোরআনকে অবহেলা করা যাবে না। কোন না কোন ভাবে ফায়দা নিতেই হবে।
.
আজ এ পর্যন্ত থাকুক। যারা লিখাটা পড়লেন, শুধু পড়ার জন্য পড়ে স্ক্রল করে চলে যেয়েন না। একটু বুঝুন, একটু কষ্ট করুন আল্লাহর জন্য। অল্প কদিন বাকি। এরপর আর কষ্ট করার সুযোগও পাবো না আমরা কেউ…
.
রেফারেন্সঃ

[1] বুখারী ২/৯৪৯, আহমাদ ১২৫৭৯, মুসলিম ২০২, তিরমিযী ২৪৩৭
[2] সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ১০০; ফাতহুল মাজিদ
[3] তাফসীরে জাকারিয়া
[4] ইবনু মাজাহ ২২৪; মিশকাত ২১৮
[5] পড়ুন, সূরা আত-তাগাবুন এর আয়াত ১-১০ / মুসলিম, হাদিস নং ৮
[6] আদ দারেমী ২৫১
[7]. মুসনাদে আহমদ ১৪/৬৬
[8] কিতাব পরামর্শ-
https://www.alkawsar.com/bn/qa/student-advices/…
https://www.facebook.com/alihasanosama/posts/803740526484168
মুফতী মনসূরুল হক (হাফি.) এর কিতাবসমূহ- https://tinyurl.com/ybssv3k4
[9] তিরমিযী ২৯১০; মিশকাত ২১৩৭
[10] তিরমিযী ৩১৬৪
[11] ইবনু মাজাহ ২১৫; ছহীহুল জামে‘ ২১৬৫
[12] বুখারী: ৫০২৭
.
প্রথম পর্ব- http://lostmodesty.com/2020/05/ramadan1/

শেয়ার করুনঃ