তুমি এক দূরতর দ্বীপ (চতুর্থ কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (চতুর্থ কিস্তি)

তো যা বলছিলাম তুমি যে বিয়ে করার উপযুক্ত হয়েছো, ম্যাচিউরড হয়েছো তার অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তুমি ফেইসবুকে বিয়ে নিয়ে অনর্থক লাফালাফি  কম করবে। যারা এরকম করে তাদের নিয়ে মানুষজন হাসাহাসি করে, ইমম্যাচিউরড ভাবে। আর এই ইমম্যাচিউরড ছেলেদের হাতে কোন বাপ তাঁর মেয়েকে, কোন ভাই তার বোনকে তুলে দিবে, বলো? এভাবে ঘন্টায় ঘন্টায় ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলে বিয়ে হয়না।

তোমার নিজের এই লড়াইয়ের কথা মনের মধ্যে গেঁথে নাও ভালোভাবে। ভুলে যেওনা কীভাবে সমাজ তোমাকে নির্বাসন দিয়ে রেখেছে, কতোটা কষ্ট,কতোটা দুঃখ বুকে নিয়ে তুমি দিনপার করছো। ভালোকরে গেঁথে নাও। কক্ষনো ভুলে যেওনা। তোমার অনাগত সন্তানদের এই কষ্টে পড়তে দিওনা। তাদের যৌবনের দুঃসময়ে তুমি বন্ধু হয়ে পাশে থেকো। অধিকাংশ বাবা মা, বাবা-মা হবার পরে নিজেদের  কৈশোর, যৌবনের সংগ্রামরত দিনগুলোর কথা ভুলে যান, একান্ত আপন হয়েও মনের অজান্তেই জল্লাদের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। তুমি এই ভুল কোরোনা। সযত্নে মনে গেঁথো রাখো। যদি কোনো ডায়েরীতে লিখে রাখতে পারো তাহলে খুব ভালো হয়।

হুট করে বাসায় বিয়ের কথা না বলে বরং কিছুটা প্ল্যান করে নাও। মনে মনে কথাগুলো সাজিয়ে নাও। বাবা,মা,  বড়ভাইয়া,বড়আপু যার সঙ্গে নির্ভয়ে, সাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারো, তাঁর কাছে যাও সময় এবং অবস্থা বুঝে। দু’রাকাত নামায পড়ে নিতে পারো। কিছু দান সাদকা করতে পারো। ইস্তেগফার করে নাও। (আস্তাগফিরুল্লাহ পড়া) আলাদা বসিয়ে তাঁকে সব কথা খুলে বলো। তুমি বিয়ে করতে চাও,কেন চাও, কেন বিয়ে করা দরকার ইত্যাদি। মাথা ঠান্ডা রাখবে। তর্কে জড়াবেনা, সবচেয়ে বড় কথা লজ্জা পাবেনা। আসলে বাবা মা’কে যেয়ে নিজের বিয়ের কথা বলা বেশ লজ্জাদায়কই। যে করেই হোক এই লজ্জা কাটিয়ে উঠতে হবে। শুরুর ধাপটাই কঠিন। একবার লজ্জা কাটিয়ে শুধু বিয়ে শব্দটা  বলতে পারলে দেখবে বাকী আলোচনা খুব  সহজেই আগাবে। ঢালু জায়গায়  স্থির বলকে একটু ধাক্কা দিলেই বল গড়িয়ে অনেকদূর চলে যায়।

যদি নিজের বিয়ের কথা বাসার কাউকে বলতে না পারো, তাহলে খালা,ফুপি,মামা,দুলাভাই (মেয়েদের জন্য ভাবী), নানা,নানী,দাদা দাদীর হেল্প নিতে পারো।  পারিবারিক বন্ধু, পাড়াতো চাচা,বড়ভাই এদেরও সাহায্য নিতে পারো। যদি কারো কাছেই মুখ ফুটে নিজের বিয়ের কথা বলতে না পারো তাহলে মেসেজ দিয়ে বলতে পারো। অনেকেরই বাবা মার সামনে বিয়ের কথা বলতে গেলে হাত পা কাঁপাকাপি শুরু হয়ে যায়। গুছিয়ে কথা বলতে পারেনা, তাদের জন্য মেসেজিং (চিঠি টাইপ কিছু হতে পারে) খুব ভালো অপশন। মনের কথা সুন্দরভাবে পৌঁছানো যায় বাবা মার কাছে। আবারো বলি, লজ্জা করবেনা।লজ্জা করে আল্টিমেটলি কোন লাভ নেই। দেরি হয়ে যাবে শুভ কাজে। বিয়ের কথা তো একসময় বলতেই হবে বাসায়, বিয়ে তো  করতেই হবে, নাকি?

 

এরপরেই অবধারিতভাবে তোমার দিকে AK-47 এর  বুলেটের বেগে যে প্রশ্নগুলো ধেয়ে আসবে তার সম্মুখভাগেই থাকবে সেই চিরন্তন প্রশ্ন- বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কী?

দেখ, রিযিকের মালিক আল্লাহ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।  বিয়ে করলে যে আল্লাহ রিযিকে বারাকাহ দেন, সন্দেহ নেই এই ব্যাপারেও। কিন্তু বাবা মা আত্মীয়স্বজনের বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কি প্রশ্নের উত্তরে যদি  তুমি  কুরআনের আয়াত আর উমার (রাঃ) এর উক্তি শুনিয়ে দাও

‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ {সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩২}

উমর ইবন খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুমা বলতেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।’

তুমি যদি বল- রিযিকের মালিক আল্লাহ, আল্লাহই ব্যবস্থা করে দিবেন তাহলে তাদের রাজি করাতে বেগ পেতে হবে। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ বাবা মার ঈমানই এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।  কংক্রিট একটা প্ল্যান অফ একশন তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে তোমাকে।

মেয়েরা সাধারণত তাদের বাবা, বা ভাইয়ের বিশেষ আদরের হয়। মেয়েরা আল্লাহর তরফ থেকে এক বিশেষ মূল্যবান উপহার। দুনিয়ার দুঃখ,কষ্ট থেকে সযত্নে আগলিয়ে রাখেন তারা, যেন এতোটুকু কষ্ট তাদের মেয়ে তাদের বোন না পায়, যেন কোনো ক্লেদ কোনো গ্লানি তাদের স্পর্শ না করে। রাজা হতে না পারুক নিজে, কিন্তু প্রত্যেক বাবার কাছেই তার মেয়ে একজন রাজকন্যা। রাজকন্যাকে তারা কীভাবে কোনো বেকার ছেলের হাতে তুলে দিবেন? চাল নেই চুলো নেই এমন ছেলের হাতে তুলে দিলে তাদের রাজকন্যা কেমন থাকবে এই দুশ্চিন্তায় উদ্বিগ্ন হওয়া তাদের জন্য কী খুব অস্বাভাবিক কিছু? বিশেষ করে আল্লাহ্‌কে ভুলে যাওয়া চরম ভোগবাদী এই সমাজে ? তুমি আমার কথা শুনে অভিমানে গাল ফুলিয়ে বলতে পারো রাসূলুল্লাহর (সাঃ) যুগে কি এমন হয়নি? কপর্দক, কুৎসিত ছেলের সঙ্গে কি অভিজাত সুন্দরী মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়নি?

হয়েছে ভাই। হয়েছে। এতোদূরে যেতে হবেনা, উসমানি খিলাফাতের আমলেও খিলাফাহর পক্ষ থেকেই বেকার যুবকদের বিয়ে দেওয়া হতো। আমাদের দাদা,বাবাদের আমলেও তো বেকার ছেলেদের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে এখনকার অভিভাবকদের মতো কেউ অনাগ্রহ পোষণ করতো না।

কিন্তু ভাই দেখ, সমাজ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে এখন।  ভোগবাদিতা জেঁকে বসেছে, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, পুত পবিত্রতা, শালীনতাবোধ, আল্লাহর আইন সবকিছুকেই জাদুঘরে পাঠিয়ে ইসলামকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, মিডিয়া প্রোপাগ্যান্ডার মাধ্যমে   পাশ্চাত্যের  আবর্জনায় মুসলিমদের মস্তিষ্ক ভরে গিয়েছে (এগুলো নিয়ে পরে একসময় বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশা আল্লাহ)। সমাজ আর আগের মতো নেই।

আগেকার বাবারা নিজ উদ্যোগেই তাদের বেকার যুবকদের  বিয়ে দিয়ে দিতেন, ছেলের বউকে খাওয়ানোর দায়িত্ব ছেলের ওপর এভাবে চাপিয়ে দিতেন না, আগেকার মেয়ের বাবারাও ছেলেদের ওপর এতোটা জুলুম করতেননা, শুধু চাকুরী থাকলেই হবেনা, সরকারি চাকুরী হতে হবে, বিসিএস ক্যাডার,পুলিশ হলে আরো ভালো, ঢাকায় ফ্ল্যাট থাকতে হবে, গাড়ি থাকতে হবে এইসব অদ্ভূত অদ্ভূত শর্তজুড়ে দিয়ে বিয়েকে জটিল করে ফেলতেন না। ছেলের এখন চাকুরী নেই,ছেলে এখন পড়াশোনা করছে তো কী হয়েছে, একদিন নিশ্চয়ই চাকুরী হবে, আর মেয়ে তো আমার না খেয়ে থাকবেনা, মারা যাবেনা, বেয়ায় সাহেব দেখে রাখবেন। ( শ্বশুরবাড়িতে নারী নির্যাতন নিয়ে কিছু কথা আছে। সেগুলো নিয়েও পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে আছে ইনশা আল্লাহ)

তুমি নিজের বাবা মা, এবং মেয়েদের বাবা মার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা বন্ধ করে বরং দেখ কেন বিয়ে কঠিন হয়ে গেল। কীভাবে বিয়েটাকে সহজ করা যায়। যখন তাওহীদ, ঈমানভিত্তিক সমাজ ছিল, যখন খিলাফাহ ছিল, যখন মুসলিমদের একজন নেতা ছিল, যখন মুসলিমরা পাশ্চাত্যের মিডিয়া প্রোপাগ্যান্ডার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলোনা বা পাশ্চাত্য ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারেনি মুসলিমদের সাথে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে, যখন মানুষের বানানো তন্ত্র মন্ত্রের মাদকে মুসলমান বেহুঁশ হয়ে পড়েনি  তখন বিয়ে সহজ ছিল।

ভাই, তুমি গভীরভাবে ভাবো, চিন্তা করো, এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করো। কেন তোমার বুকে আজ বর্ষার হাহাকার? কেন অদেখা তার মুখে শ্রাবণের অন্ধকার? কেন তোমাদের মাঝে এই মানুষের দেয়াল ?

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ‘বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কি’ এই প্রশ্নের একটা কনক্রিট  উত্তর তোমাকে দিতে হবে। সেই সাথে দেন মোহরানার টাকা কোথায় পাবে, কোত্থুকে বিয়ের খরচ জোগাড় করবে সেগুলোর উত্তরও তোমার জানা চায়।

একারণেই আমরা বলি, তুমি ফেইসবুকে সারাদিন হাহুতাশ না করে টাকা রোজগারের হালাল কোন উপায় খুজে বের করার চেষ্টা কর। ‘বিয়ে করতে হবে’ এটুকু তোমার উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কী করা যেতে পারে, গন্তব্য পৌছুতে হলে কী করতে হবে তার প্ল্যান শুরু কর। একটু চোখকান খোলা রাখলেই দেখবে ছোটোখাটো ব্যবসা করার অনেক রাস্তা আছে । আর বেকারের কলিজার টুকরা, অন্ধের যষ্ঠী ‘টিউশনি’ তো আছেই। ব্যবসা করো, টিউশনি করো। বিয়ের জন্য টাকা জমাও।  আমার সাথে দুইজন ছেলে পড়তো। ভার্সিটির চার বছরে তারা টিউশনি করে ব্যাংকে প্রায় লাখ পাঁচেক টাকা জমিয়েছিল।

ভাই দেখ, বাচ্চা পোলাপান বিয়ের উপযুক্ত নয়। এদের একমাত্র কাজ মায়ের আঁচল ধরে কোনো কিছুর জন্য জিদ ধরা। ‘আমি বিয়া করমু, আমার বউ আইনা দাও তোমরা’ বাসার লোকদের কাছে এই যদি হয় তোমার এপ্রোচ, তাহলে আমি বলব, তুমি বিয়ের চিন্তা মাথা থেকে দূর করে দাও। বাজার থেকে ফিডার কিনে এনে ফিডার খাও। বউ কি মেলায় কিনতে পাওয়া কোনো খেলনা, যে বাবা মার কাছে জিদ ধরবা আর তা তোমাকে এনে দিবেন? নিজের বউয়ের সব খরচ বাবার কাছ থেকে নিতে তোমার লজ্জা করা উচিত, তোমার পৌরুষে আঘাত লাগা উচিত।

আল্লাহ্‌র ওয়াদা যে কোনো যুবক যদি নিজের চরিত্র রক্ষার জন্য বিয়ে করতে চাই তাহলে তিনি তাঁকে অবশ্যই সাহায্য করবেন। তুমি টাকা রোযগারের ব্যাপারে আন্তরিক হও, চেষ্টা কর, দেখবে আল্লাহ কীভাবে তোমার রিযিকে বারাকাহ ঢেলে দেন , কীভাবে সবকিছু সহজ করে দেন। আল্লাহ্‌র ওয়াদা সত্য। কিন্তু তোমাকে তো চেষ্টা করতে হবে।

তুমি যদি বাসার মানুষদের সাথে এভাবে শুধু জিদ ধরে থাকো তাহলে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে যে তুমি বিয়ে করতে পারবানা। তারা তোমার কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিবে, তোমার সাথে রাগারাগি করবে, তোমাকে নিয়ে কৌতুক করবে। ভাববে  এটা বোধহয় পিচ্চি ছেলের নতুন কোনো শখের আবদার। কিছুদিন পরে আবার ভুলে যাবে।

যেই সমাজে চাকুরী বা ব্যবসা আছে এমন ছেলেদেরও বিয়ে করা কঠিন হয়ে গিয়েছে, কণ্যার বাপদের মন কিছুতেই গলছে না,  সেই সমাজে  তোমার মতো একজন বেকার,ছাত্রের হাতে কোন ভরসায় একজন বাবা তার মেয়েকে তুলে দিবেন? শুধু আবদার ধরলেই তো হবেনা,জিদ করলেই তো হবেনা, বাস্তবতাও বুঝতে হবে।

ধরো তুমি বিয়ের জন্য টাকা জমাতে লাগলে, টিউশনি, ব্যবসা শুরু করলে তাহলে কী হবে?

এক.  বিয়ের ফান্ডে টাকা জমবে। পরে এটি বেশ কাজে লাগবে। বিয়ের পর বউয়ের খরচ দিতে পারবে।

দুই. তোমার বাবা মা যখন দেখবে যে তুমি এভাবে কষ্ট করছো, সপ্তাহে দুইদিন রোযা রাখছো তখন তাঁরা বুঝতে পারবেন যে না তুমি আসলেই বিয়ে নিয়ে সিরিয়াস। তুমি বিয়ে করতে চাও, অন্তর থেকেই চাও। বাবা-মা, বড় ভাই-বোনদের কাছে তাদের সন্তান, তাদের ভাই কখনো বড় হয়না, সেই গোলগাল নাদুস নুদুস পিচ্চিই থাকে । তোমার এই টিউশনি করা,ব্যসসা করা দেখে তাদের ভুল ভাংবে। তুমি আর সেই পিচ্চিটি নও, তুমি বড় হয়েছো, ম্যাচিউরড হয়েছো সেটা তাঁরা উপলব্ধি করবেন। দেখবে, তারা তোমার বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। সবাই না হলে এক দুইজন অন্ততপক্ষে হবেন। এতেই তোমার বিয়ের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ।

তিন. মেয়ের ফ্যামিলি কিছুটা হলেও তোমার ওপর ভরসা পাবেন। তাঁরাও বুঝতে পারবেন যে তুমি দায়িত্ব নেওয়া শিখেছো, তাদের মেয়ের দায়িত্ব তুমি নিতে পারবে। তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলে তাদের মেয়ে অন্তত জলে ভেসে যাবেনা।

 

চলবে ইনশা আল্লাহ

 

আগের কিস্তিগুলো-

প্রথম কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি

তৃতীয় কিস্তি

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ Early Marriage Campaign ফেইসবুক গ্রুপ

 

শেয়ার করুনঃ
তুমি এক দূরতর দ্বীপ (তৃতীয় কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (তৃতীয় কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

ভাই, দেখ দুনিয়ার নারী,ধন সম্পদ, সন্তানসন্ততি এগুলো একধরণের ফিতনাহ। এগুলো দ্বারা দুনিয়াকে সুশোভিত করে রাখা হয়েছে।

‘জেনে রাখ! তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার বিষয় মাত্র। আল্লাহর কাছে এর চেয়েও মহান প্রতিদান আছে।’ (সূরা আনফাল : ২৮)

‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের প্রতিপত্তি, ধন-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না রাখে। যদি তোমরা গাফেল বা উদাসীন হও তবে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা মুনাফিকুন : ৯)

কতো সৎ মানুষের পদস্খলন হলো নারীর ফিতনায়, দ্বীনের অর্ধেক পূরণ করার জন্য বিয়ে করল, তারপর দ্বীনের বাকি অর্ধেকও হারিয়ে ফেলল, এমন মানুষ সমাজে বহু আছে। আল্লাহ্‌র দ্বীন কায়েমের স্বপ্ন দেখতো যেই যুবকের দু’চোখ, সেই যুবক বউয়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে গিয়ে আর ওসব নিয়ে ভাবার সময়ই পায়না।  বিপ্লবের মৃত্যু ঘটে শুরুর আগেই।

বিয়ে মানে শুধু রোমান্টিসিজমই নয়। বিয়ের পরে তোমার ঘাড়ে অনেক দায়িত্ব, কর্তব্য আসবে। তুমি যদি বিয়েকে শুধু রোমান্টিসিজম ভেবে বসে থাকো তাহলে  বিয়ের পরে  খাপ খাওয়াতে ঝামেলা হবে। মধুমাসের পরে  তোমার মোহভঙ্গ হবে। কঠিন,কঠোর  বাস্তবতা আঘাত হানবে। আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে হয়তো তুমি ভেঙ্গেই পড়বে। কেন যে বিয়ে করলাম, বিয়ের আগেই তো ভালো ছিলাম এই চিন্তাও চলে আসতে পারে মাথাতে।

ভাই দেখ, তোমার এই বয়সে আগুন জ্বলে ওঠে প্রত্যেক শিরা উপশিরায়,সেই উত্তাপে বদলে যায় তোমার দুনিয়া। বদলে যায় দেখার দু’চোখ। নারীকে শুধু আর রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয়না,নারীর মানবীয় বৈশিষ্ট্যের কথা তুমি ভুলে যাও। নারীকে সৌন্দর্য আর  পরিপূর্ণতার এমন পোষাক তুমি পরিয়ে রাখো যার আড়ালে ঢাকা পড়ে নারীর সকল দোষত্রুটি। নারীর কোনো ভুল, কোনো সীমাবদ্ধতা ধরা পড়েনা।  মূর্তি পুজারীর মতো নারীকে বানিয়ে ফেলো কল্যাণের প্রতিমা। মনে প্রাণে পুজো করো তাকে। যেন শুধু নারীর স্পর্শেই তোমার মুক্তি। নারী যেন পরশ পাথর যার ছোঁয়াতে আপাদমস্তক নিজেকে পালটিয়ে নিবে তুমি। কিন্তু পরে যখন আবিষ্কার করো নারীরও সীমাবদ্ধতা আছে, দোষত্রুটি আছে, সেও রক্ত মাংসের একজন মানুষ তখন মোহভঙ্গ হয়। হতাশ হও।

তোমার এই অপরিপক্ক চিন্তাভাবনার পালে জোর হাওয়া লাগায় নাটক,সিনেমা, গান আর পর্ন । অন্তরে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তোমাকে রোমান্টিসিজমে ভাসিয়ে নেয়। আর যৌবনের উত্তাপ ছড়িয়ে দেয় শিরা উপাশিরায়, প্রতিটি লোহিত রক্তকণিকায়।

মুভি আইটেমসং পর্ন হস্তমৈথুন, গার্লফ্রেন্ড জাস্ট ফ্রেন্ড, ফ্রি মিক্সিং এগুলো থেকে শতভাগ দূরে থাকতে হবে। কঠোরভাবে চোখের হেফাযত করতে হবে। এগুলোই তো প্রধান কারণ যার কারণে তুমি অন্ধকার কানাগলিতে মাথা কুটে মরছো। যিনা,ব্যভিচার,বেহায়াপনা,লুচ্চামির হাতছানি উপেক্ষা করতে পারছনা।  বাবা মা, আত্মীয়স্বজন, একান্ত আপন মানুষগুলো তোমার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তুমি ঠাট্টা,তামাশার পাত্রে পরিণত হয়েছো। বিয়ে পাগলা সহ আরো অনেক উপাধি পেয়ে গিয়েছো।। ভাই এগুলো থেকে দূরে থাকো। দেখবে, তোমার অশান্ত হৃদয় অনেকটাই শান্ত হয়ে গিয়েছে। বিয়ের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে এসেছে। তুমি সবর করতে পারছো।  বালেগ হবার পরে তোমার যে শরীরের ক্ষুধা লাগবে সেটা বিয়ে ছাড়া  পুরোপুরি মিটবেনা, কিন্তু কিছুটা তো মিটবে। পুরো পেট না ভরুক, অর্ধেক পেট ভরবে। ক্ষিদের কথা, তীব্রতা কিছুটা ভুলে থাকতে পারবে। মুক্ত বাতাসের খোঁজে  বইটা ভালোমতো পড়ো। সে অনুসারে আমল করো। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। আল্লাহ সহজ করে দিবেন।তাই বলে এটা না যে তুমি বিয়ে করতে দেরি করবে বা বিয়ে করার চেষ্টা থামিয়ে দেবে। বিয়ের চেষ্টা চলবে। পাশাপাশি এগুলোর দিকেও নজর দিবে।

মনে করো তুমি রোযা রেখেছো। ইফতারির অনেক দেরি। বারবার ফ্রিজ খুলে সুস্বাদু খাবার দেখতে থাকো, আম্মা রান্না করছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, তাহলে তোমার ক্ষুধার তীব্রতা,কষ্ট বেড়ে যাবেনা? এখন এটা কী কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে  রোযা রেখে সুস্বাদু খাবারের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো? তাদের ঘ্রাণ নেওয়া? বরং যতো বেশি খাবার থেকে দূরে থাকা যায়, যতো বেশি খাবারের কথা ভুলে থাকা যায় ততো ভালো। তোমার জন্য ইফতারি পর্যন্ত অপেক্ষা করা ততোবেশি সহজ হয়ে যাবে।

ভাই তাহলে চিন্তা করো, শরীরের ক্ষুধা নিয়ে( ক্ষুধা পূরণের হালাল উপায়ও নেই) কেন তুমি এমন কিছু করো  যা তোমাকে বারবার ক্ষুধার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়? কেন তুমি মুভি আর নাটকে  ডুবে থাকো যা প্রতিনিয়ত  তোমার  শরীরের ক্ষুধা, তোমার নিঃসঙ্গতা বাড়িয়ে তোলে? কেন ইউটিউবে একটার পর একটা রোমান্টিক মিউজিক ভিডিও দেখে চলছো?  কেন তুমি জাস্টফ্রেন্ডদের সাথে একই রিকশায় ঘোরো, গায়ে হাত দিয়ে কথা বলো? কেন তুমি শপিংমল,রেস্তোরা, গার্লসস্কুল,কলেজ বা এমন জায়গাগুলোতে ঘোরাফেরা করো যেখানে  সুন্দরী, আকর্ষনীয়  মেয়েদের আনাগোনা? কেন রাস্তায় চোখ নামিয়ে চলোনা? কেন ফেসবুক ইন্সটাগ্রামে লাস্যময়ী,রুপবতী নারীদের ছবি জুম করে দেখ? ট্রল পেইজ বা গ্রুপগুলোতে ‘ফান’ করার নামে অশ্লীল, উত্তেজক কথাবার্তা বলো? রাত জেগে  খোল্লামখোল্লা মেয়েদের লাইভে একটিভ থাকো?

ভাই, তুমি তো রোযা রেখেছো, ইফতারির আগে তো খাবার খাবেনা, তাহলে কেন এভাবে নিজের ক্ষুধা বাড়িয়ে তুলছো? ক্ষুধা বাড়তে বাড়তে একসময় এমন অবস্থা হবে তুমি আর ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারবেনা। হালালের পথ যেহেতু খোলা নেই, তুমি বেছে নিবে হারাম। পর্ন,হস্তমৈথুন, রুম ডেটিং,লিভ টুগেদার, ক্লাসরুমে,পার্কে,বাসে,চিপায় চাপায় বেহায়াপনা। আখিরাত তো নষ্ট হবেই, দুনিয়ার এই জীবনটাও বরবাদ হয়ে যাবে।কখনো  শান্তি পাবেনা। বুক জ্বলে যাবে ভাই, বুক জ্বলে যাবে।  অশান্তি আর অস্থিরতায়। তীব্র হতাশায়।

নারীর সাথে অন্তরংগতার ব্যাপারটিকে তোমরা  অপার্থিব সুখ আর শিহরণের প্যাকেজ ভেবে দিন রাত কল্পনা করো,  তা আসলে খুব সামান্য একটা ব্যাপার। মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিন্তু স্বাভাবিক, সাধারণ একটা ব্যাপার। তোমরা যেরকম ভাবে একে কল্পনা করো, সেটি এর ধারে কাছেও নেই। ভাত খাওয়া, পানি খাওয়ার মতোই সাধারণ ব্যাপার এটি। সেরকম বিশেষত্ব কিছুই নেই।  অথচ এগুলো ভেবেই দিন রাত অস্থিরতা,অশান্তিতে ভোগো তুমি।

হারাম রিলেশন,লুচ্চামি ছেড়ে দাও। ফিরে আসো রবের পথে। যারা ফিরে এসেছে তারা বলেছে, যারা ফেরেনি তারাও বলেছে- ওপথে শান্তি নেই, সুখ নেই। প্রীতি নেই, ভালোবাসা নেই। ভালোবাসা ওপথে নয় , বরং ভালোবাসা তোমার রবের পথে, হ্যাঁ ভালোবাসা তোমার দ্বীনের পথে রয়েছে। চারপাশে ছড়ানো ছিটানো। অবশ্যই পড়- শান্তি পাবো কোথায় গিয়ে

তো যা বলছিলাম বিয়ে কিন্তু সকল সমস্যার সমাধান না। নারী কোনো ম্যাজিক জানেনা, যে চোখের পলকে তোমার জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে দিবে ম্যাজিলওয়ালারা যেমন টুপির ভেতর থেকে কবুতর বের  করে আনে। নারী তোমাকে হয়তো কিছুটা পাপ পঙ্কিলতা থেকে উদ্ধার করবে, কলুষতাময় নিশ্চিত পতন থেকে রক্ষা করবে, জীবনটাকে আরো একটু গুছিয়ে দিবে, কিন্তু সকল সমস্যার সমাধান করে দেবে না।বিয়ে সকল প্রশান্তির উৎসও না। এটা শতোভাগ সত্য যে আল্লাহ (সুবঃ) স্ত্রীদের মধ্যে চোখের শীতলতা রেখেছেন, স্ত্রীদেরকে প্রশান্তির উৎস বানিয়েছেন। কিন্তু  স্ত্রীরাই একমাত্র চোখের শীতলতার কারণ নয়, প্রশান্তি পাবার আশ্রয় স্থল নয়। তাই যদি হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলতেন না , সালাতেই দান করা হয়েছে আমার চক্ষুর শীতলতা। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২২৯৩; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৩৪০

অন্য হাদীসে বেলাল রা.-কে সম্বোধন করে বলেছেন,

সালাতের ব্যবস্থা করে আমাকে শান্তি দাও, হে বেলাল!। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৮৫

একটি বিষয় বোঝার চেষ্টা করি, যদি স্ত্রীই সর্বোচ্চ প্রশান্তির উৎস হতো, তাহলে সাহাবাগণ স্ত্রীর সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। স্ত্রীর উষ্ম স্পর্শ ছেড়ে তাহাজ্জুতে দাঁড়াতেন না; স্ত্রীর মায়াবি আচলের বাধন খুলে দিনের বেলা  জিহাদের ময়দানে নামতেন না।
.

খালিদ বিন ওলীদ (রাঃ) বলতেন না, ‘আমি যেই নারীকে ভালবাসি তার সংগে আমার বিয়েও আমাকে ততটো আনন্দিত করবেনা, আমাকে যদি আমার ঔরসজাত কোন পুত্র সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয় তাহলেও আমি ততোটা খুশি হবনা যতোটা খুশি আমি হব কোন এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সংগে কাফিরদেরকে আক্রমনের জন্য অপেক্ষা করা’

 

ভাই,আমরা তোমাকে বিয়ে করতে নিরুৎসাহিত করছিনা কোনোমতেই শুধু বাস্তবতাটা বোঝানোর চেষ্টা করছি। তুমি দেরি না করে অবশ্যই বিয়ে করে নিবে। বিয়ে তোমাকে অনেক পাপ পঙ্কিলতা থেকে রক্ষা করবে, অগোছালো জীবনটাকে গুছিয়ে দিবে, রিযিকে বারাকাহ দিবে, চোখ শীতল হবে। তবে তুমি এটা ভেবে বসে থেকোনা যে বিয়ের পর তোমরা রূপকথার রাজকন্যা রাজপুত্রদের   মতো ‘সুখে শান্তিতে চিরকাল বসবাস করিতে থাকবে’। কখনো আকাশে ঝড় উঠবেনা।

দাম্পত্য জীবন মানে এই সুখের তুফান তো, এই ঝগড়াঝাটি, মন কষাকষি । কখনো ঝকঝকে রোদ তো কখনো কালো মেঘ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে পর্যন্ত মনোমালিন্য হতো। এখন তুমি যে পরীক্ষা যে কষ্টগুলোর সম্মুখীন হচ্ছো বিয়ের পরে হয়তো এই কষ্টগুলো আর থাকবেনা, কিন্তু তুমি তখন হয়তো অন্য অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, অন্য দিক থেকে কষ্টের মধ্যে পড়বে। কাজেই এই ব্যাপারগুলো তোমার মাথাতে যেন থাকে, তুমি এগুলোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে থাকবে।

আবারো বলছি, আমাদেরকে ভুল বুঝোনা। জলদি বিয়ে করে নাও। একটুকু দেরি করোনা। কিন্তু এই ব্যাপারগুলোও মাথাতে রেখো।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

আগের কিস্তিগুলো-

প্রথম কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি 

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ Early Marriage Campaign ফেইসবুক গ্রুপ

শেয়ার করুনঃ
তুমি এক দূরতর দ্বীপ (দ্বিতীয় কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (দ্বিতীয় কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।
.
মাঝে মাঝেই তোমার মন খারাপ হবে। ছুটির দুপুরগুলো কাটতে চাইবেনা কিছুতেই। ঈদের দিনগুলোতে ভীষণ একা একা লাগবে। খুব স্বাভাবিক ভাই। সবারই এমন হয়। কিন্তু এই মন খারাপ লাগা ফেসবুকে শেয়ার না করাই ভালো।
.
ফেসবুকে তোমার মন খারাপের অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়ে তুমি কখনো শান্তি পাবেনা ভাই, জেনে রেখো। জানি ভাই তোমার বুকে অনেক কষ্ট। লাল কষ্ট নীল কষ্ট। মাল্টিকালারের কষ্ট। বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাসে ভরা কষ্টগুলোর কথা ফেইসবুকে শেয়ার করে তুমি হয়তো নিজেকে কিছুটা হালকা করতে চাচ্ছো। কিন্তু ভাই এভাবে শান্তি পাওয়া যায়না। আমি পাইনি, কেউ কখনো পাইনি, তুমিও পাবেনা।
.
এরচেয়ে বরং তুমি সবর করো। ব্যথিত হৃদয়ে আল্লাহকে স্মরণ করো। মনের কথাগুলো, কষ্টগুলোর কথা তাঁকে বল যিনি এ অবস্থা বদলাতে পারবেন। যিনি এ সবরের বিনিময়ে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। যাদের হৃদয় ভেংগে যায়, তাদের সাথে আল্লাহ থাকেন। তোমার সৃষ্টিকর্তাকে খুলে খুলে দেখাও তোমার মনের সব দুঃখ গুলো। একাকীত্বে, নির্জনতায় কুরআনকে তোমার সংগী বানাও। কান পেতে শোনো তোমার রব তোমাকে কী বলছেন।
.
দেখ ভাই, আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের সবচেয়ে বেশি কষ্টের, সবচেয়ে বেশি ফিতনাহর মধ্যে ফেলেন। ইউসুফ (আঃ) এর কথা ধরো, দাদা নবী ছিলেন, বাবা নবী, নিজেও নবী হবেন। নবীরা নিষ্পাপ। কোনো দোষ ছিলনা তাঁর। হিংসুক ভাইয়েরা খেলতে যাবার নাম করে ছোট্ট ইউসুফকে ফেলে দিল জংগলের ধারে নির্জন অন্ধকূপে। নিজের ভাইদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে সেই অন্ধকার কূয়ার তাঁকে পড়ে থাকতে হলো অনেক সময়। তখন তাঁর মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করো। আপন লোকদের হাতে প্রতারিত হলে কেমন কষ্ট লাগে!
.
তারপর দাস হিসেবে তাঁকে বিক্রী করে দেওয়া হল মিশরের আযিযের কাছে। আযিযের স্ত্রী ইউসুফের (আঃ) রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল। অভিজাত,সুন্দরী সবচেয়ে বড় কথা, কৃতদাস ইউসুফের (আঃ) মালিকের স্ত্রী, ইউসুফকে (আঃ) জিনার আহ্বান করল। নির্জন কক্ষে ইউসুফকে (আঃ) সাথে নিয়ে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দিল।
.
আযিযের স্ত্রী জুলায়খা-রূপবতী,লাস্যময়ী,অভিজাত। নির্জন কক্ষ। হাতছানি দিয়ে একজন সুন্দরী নারী, যুবক ইউসুফ (আঃ) কে এমন এক কাজের জন্য আহ্বান করছে যা যেকোনো পুরুষের স্বপ্ন। পরম আরাধ্য বিষয়। ভাই, তুমি আমি কী এই ফিতনাহর মাঝে পড়েছি? তখন ইউসুফের (আঃ) মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করো একবার। কী ঝড় চলছিল তাঁর মনে!
.
সবাই জানতো জুলেয়খা যা বলছে তা মিথ্যে। ইউসুফ (আঃ) নিষ্পাপ, নিরাপরাধ। যিনার হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি বন্ধ দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন, জুলায়খা পেছন থেকে তাঁর (আঃ) জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল তারপরেও ইউসুফ (আঃ) কে দিয়ে জিনা করাতে পারেনি। কিন্তু তারপরেও জিনার অপবাদ মাথায় নিয়ে তাঁকে কারাগারে কাটাতে হলো সুদীর্ঘ সময়। তুমি কি ইউসুফের (আঃ) চাইতেও বেশি ফিতনাহ, বেশি কষ্টের মধ্যে পড়েছো?
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা চিন্তা করো। তাঁর চেয়ে আল্লাহর নিকট আর প্রিয় ব্যক্তি কে ছিলেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেও কতো কষ্ট করতে হয়েছে। বাবাকে জীবনে চোখেও দেখেননি, মমতাময়ী মাকে হারিয়েছেন ছয় বছর বয়সেই। পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, নিজের লোকেরা এলাকা থেকে উচ্ছেদ করেছে, মাসের পর মাস চলে গিয়েছে চুলায় আগুন জ্বলেনি, খেজুর খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে, নিজ হাতে একে একে কবরে শুইয়েছেন প্রিয়তম সন্তানদের, বন্ধু আর প্রিয়মানুষদের। কাফির মুশরিকদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপতো আছেই।
.
আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়মানুষ, সবচেয়ে শুদ্ধ আত্মাকে যদি এতোটা কষ্ট করতে হয়, তাহলে তুমি আমি কেন একটু কষ্ট সহ্য করতে পারবনা?
.
ভাই, আল্লাহর শোকর আদায় করো। আল্লাহ তোমাকে দ্বীনের বুঝ দিয়েছেন। হাত বাড়ালেই তুমি হারাম রিলেশনের নাগাল পেয়ে যেতে, লিটনের ফ্ল্যাটে গিয়ে নিজেকে শান্ত করতে পারতে। ফিতনায় ভরপুর এই জমানায়ও আল্লাহ তোমাকে কলুষতা থেকে দূরে সরিয়ে পবিত্র রেখেছেন, বা কলুষতার জীবন ছুঁড়ে ফেলে ফিরে যেতে হবে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে – এই বোধ তোমার মধ্যে রেখেছেন। এটি এক বিশাল নিয়ামত! কতো ছেলে অন্ধকার কানা গলিতে সদর্পে হেঁটে বেড়াচ্ছে, মদ, গাজা,ইয়াবা, উদ্দাম যৌনতায় ডুবে আছে আপাদমস্তক। ভুলেও বুঝতে পারছেনা বা চাইছেনা কী ভুল তারা করছে। তুমি তো অন্তত তাদের চাইতে ভালো আছো। নিজের চাহিদা হালাল উপায়ে পূরণ করতে চাচ্ছো।
.
আল্লাহ (সুবঃ) তো এই কষ্টের মধ্যে ফেলে তোমাকে সম্মানিত করছেন। মুসলিমের জীবন যদি সুখ আর স্বাচ্ছ্যন্দ্যে পার হয়, যদি কোনো দুঃখ কষ্ট না আসে, কোনো পরীক্ষা না আসে তাহলে অন্তরের ঈমান, অনুসৃত পথ নিয়ে সন্দিহান হবার সময় চলে আসে। দুনিয়ার জীবনতো মুমীনের জন্য এক কারাগারের জীবন। কারাগারের জীবনে কী দুঃখ কষ্ট পরীক্ষা থাকবেনা, বলো?
.
এ পথ তো সেই পথ! যে পথে চলতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন আদম। ক্রন্দন করেছিলেন নূহ। আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ। যবেহ্ করার জন্য শোয়ানো হয়েছে ইসমাইলকে। খুব স্বল্প মূল্যে বিক্রি করা হয়েছিল ইউসুফকে, কারাগারে কাটাতে হয়েছিল জীবনের দীর্ঘ কয়েকটি বছর। যবেহ্ করা হয়েছে নারী সংশ্রব থেকে মুক্ত ইয়াহইয়াকে। রোগে ভুগেছেন আইয়ূব। দাউদের ক্রন্দন, সীমা অতিক্রম করেছে। নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন ঈসা। আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। নানা দুঃখ-দুর্দশা, কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করেছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ। আর তুমি এখনও খেল-তামাশায় মত্ত?! [১]
.
আর তুমি সেই পথে হেসেখেলে চলবে, ক্ষতবিক্ষত হবেনা তোমার হৃদয়, রক্তাক্ত হবেনা তোমার পা, তা কী করে হয়?
.
তুমি কি ভাবছো, আল্লাহ (সুবঃ) তোমাকে ভুলে গিয়েছেন? তুমি যে এতো দুঃখ,কষ্ট ভোগ করছো, তা আল্লাহ দেখছেননা? ভাই কাবার রবের কসম। আল্লাহ তোমাদের এই কষ্টের উত্তম প্রতিদান দিবেন। এমন উত্তম প্রতিদান যা তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা।
.
‘ সেই মুমিনরাই সফল, যারা তাঁদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে’ (সূরা মুমিনুন,আয়াত ১ও ৪)
.
নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম, নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম। ( সূর মুমিনূন : ১১১)
.
আল্লাহর কাছে সফলতার মানে কী?
.
সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। ( সূরা আলে ইমরান : ১৮৫)
.
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তো তোমাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন। বলেছেন- ‘‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহবা) এবং দু’ পায়ের মধ্যখানের (লজ্জাস্থান) হেফাযতের গ্যারান্টি দিবে, আমি তার জান্নাতের ব্যাপারে গ্যারান্টি দেব’’। [বুখারী]
.
ভাই, এগুলো আল্লাহর চিরন্তন ওয়াদা – আল্লাহর চেয়ে আর কে বেশি ওয়াদা রক্ষাকারী।
.
যারা সবর করে, যারা পরীক্ষার মাঝ দিয়ে যায়, নির্জন মুহূর্তে আল্লাহ্কে ভয় করে, যারা যৌবনের হেফাযত করে, আল্লাহর ইবাদাতে নিজেদের যৌবন পার করে দেয় আল্লাহ তাঁদের ওপর ভোরের শিশিরের মতো রহমত বর্ষণ করেন।
.
ইউসুফ (আঃ) এর কথায় ধরো। ভাইদের কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হওয়া, কূয়াতে নিক্ষেপ, নারীদের ফিতনা, বন্দীত্ব এতোসব ফিতনাহর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।সবর করেছেন।আল্লাহর ওপর আস্থা হারাননি। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাকে মিসরের রাজত্ব দান করেন। অথচ তিনি মিসরে প্রবেশ করেছিলেন একজন ক্রীতদাস হিসেবে।আল্লাহ (সুবঃ) এই দাসকেই দিলেন সুবিশাল রাজত্ব। ক্রীতদাসের মাথায় পরিয়ে দিলেন সম্মানের মুকুট। [২]
.
মুসা (আঃ) ফিরাউনের ভয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। ক্ষুধার্ত, সহায় সম্বল, আশ্রয়হীন। একদিন কুয়োর ধারে এক গাছের নিচে বসেছিলেন। খেয়াল করলেন, সেখানে দুইজন মেয়ে পুরুষদের ভীড়ের কারণে তাদের পশুদের পানি পান করাতে পারছেনা। মুসা (আঃ) তাদের সাথে অত্যন্ত সম্মান দিয়ে কথা বললেন। অত্যন্ত শালীনতার সাথে তাঁদের সাহায্য করলেন। এই শালীনতাবোধ, এই লজ্জাবোধের পুরষ্কার হিসেবে তিনি কি কি পেলেন?
.
সহায় সম্বলহীন, ক্ষুধার্ত মুসা (আঃ) আল্লাহর নবী শোয়াইব (আঃ) এর মেয়েকে পেলেন নিজের স্ত্রী হিসেবে। কাজ জুটলো। জুটলো নিরাপদ আশ্রয়।
.
৫০ হাজার বছর ধরে বিচার চলবে হাশরের ময়দানে। সূর্য থাকবে মানুষের অতি নিকটে। মাথার আড়াই হাত ওপরে। সূর্য আমাদের থেকে কতো কোটি কিলোমিটার দূরে। তারপরেও তার তাপে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই। হাশরের সেই ভয়ঙ্কর দিনের কথা চিন্তা করো। সূর্য থাকবে মানুষের মাথার খুব কাছে। সেদিন কী দুরাবস্থায় পড়তে হবে মানুষদের। ঘামের সাগরে মানুষ হাবুডুবু খাবে, তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবে, ছায়া মিলবেনা। আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবেনা। আল্লাহ (সুবঃ) সেই আরশের ছায়ায় দয়া করে যাদের আশ্রয় দিবেন তাদের একজন হলো সেই যুবক যার যৌবন কেটেছে আল্লাহ্র ইবাদাতে, যাকে পরমাসুন্দরী অভিজাত মহিলার জিনার আহ্বান ফিরিয়ে দিয়ে বলে আমি আল্লাহ্কে ভয় করি।
.
ভাই, হতাশ হয়োনা। যুগে যুগে যারা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করেছে, আল্লাহ তাঁদের এই দুনিয়াতে দু’হাত ভরে দিয়েছেন। আর ওপারের ঐ জীবনটার পুরষ্কারের কথা তো বলায় বাহুল্য। তুমি কি মনে করছো, যেই আল্লাহ ইউসুফকে (আঃ), মূসাকে (আঃ) তাঁদের শালীনতাবোধ, পবিত্রতার জন্য এতো এতো নিয়ামত দিয়েছেন সেই একই আল্লাহ কি তোমাকে বঞ্চিত করবেন ? তোমাকে চিরকাল দুঃখ,কষ্ট ভোগ করাবেন? কক্ষনোই নয়। ভাই, কক্ষনোই নয়।
.
আল্লাহ (সুবঃ) অচিরেই তোমাকে সুসংবাদ দান করবেন। এমন একজন মানুষের সঙ্গে তোমার জোড়া বেঁধে দিবেন যাকে দেখে তোমার চোখ শীতল হবে এবং তোমাকে দেখেও যার চোখ শীতল হবে। তোমাকে সকল ফিতনাহ থেকে রক্ষা করবেন। এই দুনিয়ায় তোমার ঘরেই নামিয়ে আনবেন জান্নাত। তোমাকে সম্মানিত করবেন। দাঁতে দাঁত চেপে আর কয়েকটা দিন লড়ে যাও ভাই। আমাদের জান্নাত ভাই, এই সামনেই।
আর মাত্র কয়েকটা দিনের দূরত্ব।
.
“কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে”। (সূরা ৯৪:আয়াত ৫-৬)
.
“অচিরেই তোমার রব্ব তোমাকে এমন অনুগ্রহ দান করবেন যাতে তুমি সন্তুষ্ট হবে”। (সূরা দুহাঃআয়াত ৫)
.
চলবে ইনশা আল্লাহ …..
.
পড়ুনঃ প্রথম কিস্তি- https://tinyurl.com/yaeyoyjs
.
ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলছে আমাদের সেমিনার প্রতিযোগিতা। সেমিনার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জিতে নেবার সুযোগ থাকছে সর্বমোট ১০ হাজার টাকার ক্যাশ। সেমিনার প্রতিযোগিতার লিংক-https://tinyurl.com/ycsbly2m

রেফারেন্সঃ
[১]আল-ফাওয়ায়িদ, ইবনুল কাইয়্যিম
[২]https:/www.raindropsmedia.org/nobider-jibon/

 

শেয়ার করুনঃ
তুমি এক দূরতর দ্বীপ (প্রথম কিস্তি)

তুমি এক দূরতর দ্বীপ (প্রথম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

ভার্সিটির লাইফ, বিশেষ করে হল লাইফটা মন্দ ছিলনা নাবিলের । ফেসবুকিং করার ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস করা, ক্লাসে বসে ঝিমানো, শর্টপিচ ক্রিকেটে চিতার ক্ষিপ্রতায় ফিল্ডিং করা, মসজিদের বারন্দায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া। কোন চিন্তা নেই কোন ভাবনা নেই, দুনিয়া উলটে যাক তাতে নাবিলের কী… শুধু চিল আর চিল।
.
বাবা-মার নজরদারি যেহেতু ছিলনা কাজেই ছোটবেলা থেকে মেনে আসা সান্ধ্য আইনের থোড়াই কেয়ার করে ইচ্ছেমতো রাত বিরাতে ঘুরে বেড়ানো যেত। কতো গভীর হাওয়ার রাত পামগাছের তলায় বসে কাটিয়ে দিয়েছে সে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো রূপালী চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। সবুজ ঘাসের বুকে শুয়ে পার করে দিয়েছে অজস্র বৈশাখী বিকেল।
.
সবকিছুরই শেষ আছে। একদিন রূপকথা শেষ হয়ে গেল। স্বপ্নভঙ্গ হল। বের হতে হল পৃথিবীর নির্দয় পথে। সময়ের কাছে মানুষ বড় অসহায়।
.
পৃথিবীর রূঢ় রৌদ্রে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হতে হতে, নানা সাইজের নানা গুতো খেতে খেতে নাবিল ঠিক বুঝে গেল কতো ধানে কতো চাল- হাউ ম্যানি রাইস ইন হাউ ম্যানি প্যাডি। রৌদ্রাহত, গুতো খাওয়া,টালমাটাল হৃদয় শান্তি খুঁজে বেড়ায়। শান্তি … দুদন্ড শান্তি।
.
চৈত্রের বিকেলে অশত্থ গাছের পাতায় বাতাসের দাপাদাপি আর কাকের চোখের মতো টলটলে স্বচ্ছ দিঘীর পানির মতো শান্তি। ভাদ্রের ভ্যাঁপসা গরম, শহর পঁচে গেছে। রাজপথে জট লেগেছে লোকাল বাস, সিএনজি, রিকশা। ঘড়ির কাটা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। দরদর করে ঘামছে মানুষ। তারপর হঠাৎ করেই একে একে আসলো অতিথিরা। প্রথমে সুসংবাদবাহী বাতাস, তারপর কালো মেঘ, তারপর বৃষ্টি। অঝোর বৃষ্টি। কান্নার মতো বৃষ্টি। শান্তির বৃষ্টি।
.
বাংলাদেশের জাতীয় রোগে আক্রান্ত হয়ে গেল নাবিল। কিছুই ভালো লাগেনা। কিছুই না। সবকিছু ভাংচুর করতে ইচ্ছে করে।
.
কলিংবেল টিপে অপেক্ষা করা বড় কষ্টের। দরজা খুলেই দুষ্টু ছোটভাইয়ের ওরাংওটাঙের মতো চেহারা দেখা আরো কষ্টের। নাবিলের একজোড়া কালো চোখ দরকার, দরজা খুললেই যেটা নাবিলকে প্রশান্তি দিবে। একজোড়া লতানো হাত দরকার। দুঃখের প্রহরে যে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা জোগাবে। তেলাপোকা দেখে ভয় পেয়ে কেউ একজন দৌড়ে আশ্রয় খুঁজুক নাবিলের কাছে, রাস্তা পার হবার সময় নাবিলের বাম বাহুটা আঁকড়ে ধরুক পরম নির্ভরতা আর নিশ্চিন্ততায়।
.
খুব বেশি কিছুনা, দুআঙ্গুলের ডগায় যতোটুকু লবন আটকে নাবিল ঠিক ততোটুকু ভালোবাসা চায়। বন্ড সই করে হলেও সামান্য হৃদয়ের ঋণ চায়।
.
চারপাশে ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যাওয়া মানুষদের দেখে নাবিলের বড় মন খারাপ হয়। কতো কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে রাখে। কায়মনোবাক্যে দু’আ করে আল্লাহ্‌র কাছে।
.
দু’আ আর অষ্টপ্রহরের মাঝে অচেনা তুমি এক দূরতরো দ্বীপ হয়েই রইলে । আমার দুরু দুরু বুক, ছেঁড়া পাল, গোলমেলে ক্যাম্পাস। ছোঁয়া হলোনা তোমাকে’- সে ভাবে।
.
আল্লাহ (সুবঃ) মানুষকে বানিয়েছেনই এভাবে যে যখন সে বালেগ হবে তখন একজন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর জন্য তার মন আঁকুপাঁকু করবে। সংগীহীনতায়, একাকীত্বে অন্তরে হাহাকার করে উঠবে। যদি এই হাহাকার দূর করার ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে তা একসময় ধ্বংস আর পতনের আহ্বানে পরিণত হবে। এই একাকীত্ব, এই অভাববোধ, শরীরের ক্ষুধা মেটানোর এই সমস্যার সহজ সমাধান দিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ (সুবঃ) – বিয়ে। বাবা-মা’দের আদেশ করেছেন যখন ছেলেমেয়েরা বালেগ হয়ে যাবে তখন তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে। বিয়েকে সহজ করতে বলা হয়েছে। যতো বেশি সহজ করা যায়। যেন সমাজের ভারসাম্য বজায় থাকে। উন্নতি আর প্রগতির কক্ষপথ থেকে সমাজ বিচ্যুত না হয়ে পড়ে।
.
মদীনা সনদে চলা দেশে (!), ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের (!) এই সমাজ এই সহজ সমীকরণ বোঝেনা। এই সভ্যতা, এই সমাজ কতোকিছু বুঝে ফেললো নিমিষেই,বুঝে ফেললো রকেট সায়েন্স, নিউট্রণ বোমা। বুঝলোনা শুধু মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোকে। বুঝলোনা একজন তরুণ কী চায়। মানুষের সহজাত ফিতরাতকে চোখ বুঝে জোর করে অস্বীকার করে ফেলল এই সমাজ। আগাগোড়া পুরো সংজ্ঞাটাই বদলে দিল।
.
যতোবেশিভাবে করা সম্ভব বিয়েকে কঠিন করে দেওয়া হল। অদ্ভূত অদ্ভূত হাস্যকর কিন্তু কঠিন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হল। বিয়ে করতে হলে আগে বড় হতে হবে। কতো বড়? তার কোনো লিমিট নেই। শুধু চাকুরী থাকলেই হবে না সরকারী চাকুরী থাকতে হবে, যেন মানুষকে বড় মুখে বলা যায়, ৪০-৫০ হাজার স্যালারি পেতে হবে মাস মাস, বাড়ি থাকতে হবে গাড়ি থাকতে হবে, লাখ লাখ টাকা দেনমোহর দিতে হবে- মেয়ে গাংগের জলে ভেসে এসেছে নাকি?
.
মেরুদন্ড ভাংগা শিক্ষাব্যবস্থা ২৭-২৮ বছর ধরে ছেলেমেয়েদের ক্লাসরুমে আটকিয়ে রাখে। বের হলেও নিস্তার নেই। চাকুরী সোনার হরিণ। মামা খালু চাচা থাকা ,সঠিক দলের লোক হওয়া আর বস্তা ভর্তি টাকা না থাকলে জীবন যৌবন ব্যায় করে অর্জন করা সার্টিফিকেটের কোনো দামই নেই। বয়স ৩০ এর কোঠা পার হয়ে যায়, মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে যায় কিন্তু বিয়ের যোগ্যতা অর্জন করা আর হয়ে ওঠেনা।
কোটি কোটি বেকার ছেলেমেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটায়। মাদকে ডুবে নিজের দুঃখ কষ্ট ভুলতে চায়। কেউ কেউ বেছে নেয় আত্মহননের পথ।
.
সমাজ না বুঝুক, চোখ বুজে অস্বীকার করুক, এই ছেলেমেয়েদের শরীরে তো যৌবনের ফাগুন আসেই। হালাল উপায়ে ক্ষুধা মেটানোর তো কোনো ব্যবস্থায় নেই। অন্যদিকে হারামের পথ অত্যন্ত সহজ। এই ছেলেমেয়েগুলো কী করবে? কেউই এদের কথা ভাবেনা। এদেরকে আমরা কেন নির্বাসন দিয়ে রেখেছি? এদের কেন ভুলে গিয়েছি?
.
ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদের সামনে থেকে সমাজ যদি খাবার সরিয়ে রাখতো,বা আড়াল করে রাখতো তাহলে ছেলেমেয়েদের কষ্ট কিছুটা কম হতো। নিজেকে সংবরণ করে রাখতে কিছুটা কষ্ট কম হতো। কিন্তু সর্বগ্রাসী বিষাক্ত অশ্লীল বাতাসে প্রকম্পিত এই সভ্যতা। বড় বেশি লোভ,বড় বেশি বিজ্ঞাপন, বড় বেশি চাহিদা- কাম আর লালসার। চতুর্দিকে ভালোবাসার বড্ডো আকাল। নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে এখানে শুধু পণ্যে (আইটেম) পরিণত করা। নারী যেন শুধু আমোদ ফুর্তি করার জমাট একটা মাংসপিন্ড।
.
প্রথম আলো অশ্লীল ছবির অভিনেতা অভিনেত্রীদের ঘরের মানুষ বানিয়ে ছাড়লো, নকশা, অধুনা শিখিয়ে দিল কীভাবে পোশাক পরলে যৌবন জ্বালায় অস্থির ছেলেদের হাতের আংগুলে খেলানো যাবে। ক্লোজআপ কাছে আসার গল্প শেখালো, সারোয়ার ফারুকী ভাই বেরাদর মিলে লিটনের ফ্ল্যাট চেনালো। আইটেম সং, বিজ্ঞাপন, মুভি সিরিয়াল, নাটক, ইউটিউবের মিউজিক ভিডিও,সালমান মুক্তাদির গং, ট্রল পেইজ-গ্রুপ, ফেইসবুক লাইভ, বিলবোর্ড, বিপিএল সব কিছু, সব কিছু তরুণদের উস্কানি দেয়। অবদমিত যৌবনকে ছারখার করে দেয় কামের আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে।
.
এই জেনারেশনের কষ্ট,টানপোড়েন বোধহয় আগের জেনারেশন কখনোই বুঝতে পারবেনা। আসলে ওদের কোনো দোষ নেই। কষ্টগুলো এতোটাই তীব্র, পরীক্ষাগুলো এতোটাই কঠিন যারা এগুলোর মুখোমুখি হননি তাদের পক্ষে কষ্টের তীব্রতা অনুভব করা অত্যন্ত কঠিন।
.
কয়জন শখ করে রিকশায় লুইচ্চামি করে? লিটনের ফ্ল্যাটে যায়? যারা যায় সব দোষ কী একা তাদেরই? সমাজের কোনো দোষ নেই? এই ছেলেমেয়েগুলোর দিকে আংগুল তোলার আগে আমাদের নিজেদের দশবার চিন্তা করা উচিত। আমরা তরুণ তরুণীদের দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত রেখেছি, ক্ষুধার্তদের সামনে আকর্ষনীয়ভাবে লোভনীয় লোভনীয় সব খাবার উপস্থাপন করেছি আর হালাল উপায়ে সে খাবার খাবার সব উপায় দুর্গম গিরি কান্তারের মতো করে রেখেছি। হারামকে করে রেখেছি একদম সহজ। এখন তরুণ তরুনীরা যদি পাপে জড়ায়, জিনা ব্যাভিচার করে তার দোষ যেমন তাদের ঠিক তেমনি এই সমাজের মানুষগুলোরও।
.
এস্টাব্লিশডমেন্ট, সোস্যাল স্ট্যাটাস, লাখ লাখ টাকার দেনমোহর, লৌকিকতা, ওয়েডিং ফটোগ্রাফি, সঙ্গীত সন্ধ্যা, হলদি নাইটসের বেড়াজাল ডিংগিয়ে তরুণ-তরূনীদের প্রতি ভালোবাসা আবার কবে ফিরে আসবে মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে? কবে ভালোবাসা পাবে ভালো রেসাল্ট করেও সিস্টেমের দোষে বেকার বসে থাকা লাখ লাখ যুবক? কবে ভালোবাসা পাবে নিজের চরিত্র রক্ষায় ছাত্র থাকা অবস্থাতেই বিয়ে করতে চাওয়া তরুণ?
.
পুরোনো রঙিন সেই শৈশবের দিনগুলোতে হা হুতাশ করত নাবিল- কবে বড় হবে, কবে স্বাধীনতা পাবে! ভাবতো জীবনের সব সুখ, সব আনন্দ,সব স্বাধীনতা সবই বোধহয় সুদূরের এই বয়সটাতে। বহু আকাঙ্ক্ষিত এই বয়সটাতে এসে অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো সব সুখ,সব আনন্দ শৈশবে ফিরে গিয়ে ভেংচি কাটছে।
.
আবার শিশু হতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে পরাধীন হতে, টেনিস বলে টেপ পেঁচিয়ে অদ্ভূত অদ্ভূত সব আইন বানিয়ে শর্ট পিচ খেলতে , মাগরিবের আযান শোনামাত্র খেলা ফেলে তড়িঘড়ি করে বাসায় ফিরে যেতে। এক টাকার নারিকেল দেওয়া বরফ খেতে।
.
আবার বাবা হাত বাড়িয়ে দেবেন। নাবিল তাঁর কনিষ্ঠ আঙ্গুল শক্ত করে ধরে রাখবে। মানুষের ভীড়ে নাবিল আর হারিয়ে যেতে চায়না।
.
ঈশ! আবার যদি ফিরে পেতাম শৈশবের সেই পবিত্র দিনগুলো। যখন বুনো হলুদ ফুলের মতো নরম স্নিগ্ধ ছিল হৃদয়, এখনকার মতো দাউ দাউ আগুন জ্বলতোনা অষ্টপ্রহর- নাবিল আফসোস করে।
.
ব্যালকনির আলোর দীর্ঘ ছায়া এসে পড়ে অন্ধকার ঘরে। নারিকেলের পাতায় আছড়ে পড়ে ভেজা বাতাস। মাঝে মাঝে পথ ভুলে ঢুকে পড়ে ঘরে। ছুঁয়ে যায় আলো আর অন্ধকার, আশা আর নিরাশা।
নাবিল এক নব্য প্রাচীন যুবক। বিছানায় শুয়ে ছটফট করে।
.
সমীকরণ ধীরে ধীরে জটিল হতে থাকে। যোগ হতে থাকে একের পর এক নতুন ভ্যারিয়েবল। সমাধান করবে কে? আদৌ কি সমাধান আছে না সমাধান অনির্ণীত?
.
আল্লাহ্‌ সুবহানু তা’আলা কোন সমস্যা সৃষ্টি করেছেন আর তার সমাধান দেননি এমনতো হতে পারেনা । তিনি কখনোই মানুষের ওপর জুলুম করেননা ।
মানুষের প্রতি দয়া করাকে তিনি নিজের কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। মানুষের প্রতি তিনি অত্যন্ত দয়াশীল।
তিনিই তালা সৃষ্টি করেছেন আবার সেই তিনিই তো চাবি সৃষ্টি করেছেন।
আধার যতোই ঘনকালো হোকনা কেন আলোর দেখাতো এক সময় মেলেই।

এই সিরিজে আমরা ইনশা আল্লাহ চেষ্টা করব বিয়ে নিয়ে তরুণদের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার। কীভাবে বাবা মাকে বোঝাতে হবে, কীভাবেই বা বিয়ের জন্য আর্থিক সামর্থ্য অর্জন করতে হবে সেই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে আমাদের আলোচনা।
ইনশা আল্লাহ।

শেয়ার করুনঃ
আমার প্রিয় মা!

আমার প্রিয় মা!

এই চিঠিটা তোমাকে উদ্দেশ করে লিখিনি। লিখেছি মূলত বাবার জন্যে। বাবার চিঠি তোমায় লিখছি বলে অবাক হচ্ছো? অবশ্যি অবাক হওয়ার মতোই বিষয়। কী করবো বলো? ছোটোবেলা থেকেই তো সব আবদার তোমার কাছেই পেশ করেছি। রাগ বলো আর অভিমান বলো, সবই তোমাকে দেখিয়েছি। বাবাকে কোনোদিনই সাহস করে কিছু বলতে পারিনি। আসলে বাবাকে একটু ভয় পাই কি না, তাই। বাবার কাছে এবার কী আবদার করবো, সেটা জানতে চাচ্ছো? উত্তরটা একটু পরে দেবো৷ আগে তোমায় কিছু কথা বলবো। তুমি মন দিয়ে সেগুলো পড়বে। আমি জানি, কথাগুলো পড়লেই তুমি উত্তরটা পেয়ে যাবে।
.
তোমার হয়তো মনে আছে, আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার গলার স্বর বদলাতে শুরু করলো। আমার মধ্যে অন্যরকম পরিবর্তন দেখা দিলো। আমি বুঝতে পারলাম, আমি বড়ো হচ্ছি। শৈশব পেরিয়ে কৌশরের দিকে এগোচ্ছি। জীবনের এক ধাপ পেরিয়ে অন্যধাপে পদার্পণ করছি। তখন থেকেই মাঝেমধ্যে মনে হতো, কী যেন নেই আমার! তুমি আছো, বাবা আছে, ছোটো বোন আছে, তবুও কী যেন নেই। কোথাও যেন একটু ফাঁকা রয়েছে। শূন্যতা রয়েছে। বিশ্বাস করো মা, এই সমস্যাটা কেবল তোমার ছেলের নয়। প্রতিটি ছেলেই এমন একাকিত্ব বোধ করে। তুমি বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখো, তিনিও আমার মতোই বলবেন।
.
আমাদের আদিপিতা আদম আ.-এর জান্নাতে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে আছে? আদম আ.-কে বানানোর পর জান্নাতে রাখা হলো৷ জান্নাতের চোখ জুড়ানো নিআমত প্রদান করা হলো। তবুও কোথায় যেন একটা শূন্যতা অনুভব করতে লাগলেন তিনি। তাঁর শূন্যতা কাটানোর জন্যে হাওয়া আ.-কে সৃষ্টি করা হলো। হাওয়া আ.-কে বানানোর পর আল্লাহ তাআলা কিন্তু বলেননি, “হে আদম! হাওয়া তোমার মায়ের মতো। উনার হক আদায় কোরো।” পরন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদম আ.-এর অর্ধাঙ্গিনী বানিয়েছিলেন। নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী বানিয়েছিলেন। দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মতো একজন মানবী হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন।
.
আল্লাহর রাসূল স.-এর নবুয়্যতি জীবনের প্রথম দিকের কথাটা চিন্তা করো। সে কঠিন সময়গুলোতে খাদিজা রা.-এর প্রভাব ছিলো অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। প্রথম যেদিন ওহি নাযিল হলো, সেদিন রাসূল স. অত্যন্ত ভয় পেলেন। হেরা গুহা থেকে সরাসরি খাদিজা রা.-এর কাছে এলেন। কাঁপতে কাঁপতে খাদিজা রা.-কে সব খুলে বললেন৷ খাদিজা রা. তাঁকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে নিলেন। এরপর কপালে হাত বুলিয়ে বললেন, “আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন। অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন। নিঃস্বকে সাহায্য করেন। মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।” (বুখারি : ১/৩) খাদিজা রা.-এর কথা শুনে রাসূল স.-এর ভয় দূর হলো। তিনি দাওয়ার কাজে মনোযোগ দিলেন।
.
মা, তোমার মনে আছে? আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি, বাবা তখন একটু আর্থিক সমস্যায় পড়েছিলেন। সে সময় আমি পড়ার ফাঁকে যখন বেলকোনিতে তাকাতাম, তখন বাবাকে পায়চারি করতে দেখতাম। বাবা যখন পায়চারি করতেন, তখন তুমি চা হাতে বাবার পাশে বসতে। তাকে সান্ত্বনা দিতে। বাবা চুপটি করে চা খেতেন আর তোমার কথা শুনতেন। তোমার কথায় সাহস সঞ্চার করে ঘুমোতে যেতেন। অবশ্যি বাবার মা-ও বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কেন জানি তোমার কথা শোনার পরই বাবার মুখে খানিকটা হাসি ফুটতো। মনে পড়ে মা? আসলে এটা আমাদের ফিতরাত৷ সেই আদম আ. থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত সকল পুরুষকেই এই ফিতরাত দেওয়া হয়েছে। পুরুষরা নিজের দুঃখ-কষ্টগুলো জীবনসঙ্গিনীর সাথে ভাগ করে নিতে চায়। তারা জীবনসঙ্গিনীর সাথে পথ চলায় আনন্দ পায়।
.
তুমি যেদিন সূরা রুমের ২১ নাম্বার আয়াতটি পড়ছিলে, সেদিন ভেবেছিলাম তোমার সাথে একটু কথা বলবো। কিন্তু লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি। এখন তো তুমি সামনে নেই, তাই বলছি। ওই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন, জানো? আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
❝আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে বহু নিদর্শন রয়েছে।❞ (সূরা রুম : ২১)
.
জীবনসঙ্গিনী পুরুষের জন্যে প্রশান্তিকর। কিন্তু সমাজ যখন এই প্রশান্তি পাওয়ার বৈধ পথ রুদ্ধ করে দেয়, তখন মানুষ অবৈধ পথ বেছে নেয়। আমার অনেক সহপাঠীই প্রেম করছে। প্রেমিকাকে নিয়ে ডেটিং করছে, ঘুরতে যাচ্ছে, যিনা করছে। কেন জানো? সেক্যুলার পরিবেশ নারী-পুরুষকে কাছে এনে দিয়েছে। তোমাদের সময়ে নারী-পুরুষের মধ্যে যে দূরত্ব ছিলো, সেটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। যার কারণে একে অন্যকে কাছে পেয়ে উদ্দীপ্ত হচ্ছে। কিন্তু ওদের বাবা-মা যখন বৈধ পন্থায় উদ্দীপনা কমানোর পথকে রুদ্ধ করছে, তখন তারা অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে। এমনসব হারাম কাছে লিপ্ত হচ্ছে, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
.
আসলে খিদে তো সবারই লাগে, তাই না? খিদে লাগার সাথে বুজুর্গির তো কোনো সম্পর্ক নেই। হোক সে বুজুর্গ কিম্বা পাপী, পেটে খাবার না ঢুকলে খিদে তো লাগবেই—এটাই স্বাভাবিক। খিদে লাগাটা যেমন স্বভাবজাত বিষয়, তেমনই রমণীর আকর্ষণটাও স্বভাবজাত বিষয়। আল্লাহ তাআলা এই আকর্ষণ দিয়েই মানুষকে সৃষ্টি করেছে। তাই তো ললনারা পুরুষের সংস্পর্শে এসে তৃপ্তি পায়, আর পুরুষরা ললনাদের। উভয়েই একে অপরকে আপন করে নিতে চায়। যত বড়ো আমলদার কিংবা মুত্তাকিই হোক না কেন, সব মানুষের মধ্যেই এই প্রবণতা আছে। সব মানুই বিপরীত লিঙ্গের সংস্পর্শ চায়। বিপরীত লিঙ্গকে আপন করে পেতে চায়। পরস্পরের কাছে আসতে চায়।
.
সমাজ যখন তাদের কাছে আসার বৈধ পথকে অবরুদ্ধ করে, তখন মানুষ অবৈধ পথেই অগ্রসর হয়। আসলে মৌলিক প্রয়োজগুলো এমনই মা। এগুলো পুরো না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নিশ্চুপ বসে থাকে না। প্রয়োজনের তাগিদে সে অবৈধ পথেই অগ্রসর হয়। তুমি শুনোনি সেই বিখ্যাত লাইন দুটো—ভাত দে হারামজাদা! নইলে মানচিত্র খাবো! তাই তো ছেলেমেয়েরা আজ তৃষ্ণা মেটানোর জন্যে খারাপ পথে অগ্রসর হচ্ছে। লুত আ.-এর কওমের আমলকে জীবিত করছে। ওদেরকে যদি বৈধ পথে তৃষ্ণা নিবারণের সুযোগ দেওয়া হতো, তবে কি ওরা ওসব করতো? করতো না। কাউকে জোর করেও প্রস্রাব খাওয়ানো যায় না। কিন্তু মরুভূমিতে তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে পানি না থাকলে সে ব্যক্তি প্রস্রাব খেতেও দ্বিধা বোধ করে না। তৃষ্ণা বলে কথা। মেটাতে তো হবেই। আচ্ছা মা, তোমার ছেলেও যদি অবৈধ পথে অগ্রসর হয়, তবে কেমন হবে? তোমার ছেলেও যদি অন্যদের মতো ফাঁকি দিয়ে টাকা এনে গার্লফ্রেন্ডের পেছনে খরচ করে, তখন তোমার কেমন লাগবে?
.
আমি জানি তুমি কষ্ট পাবে। তাই তো তোমার ছেলে ও-পথে যায়নি। অনেক কষ্ট করে নিজেকে ওসব থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু এভাবে কত বছর পার করা যায় বলো? তুমি কি এখনও আমাকে ছোট্ট বাবু মনে করো? সেই কবেই তো তোমার ছেলে যৌবনে পদার্পণ করেছে। ১৭ বছরের মুহাম্মাদ বিন কাসিম যখন বিয়ে করে ভারত জয় করে ফেলেছে, তখনও তুমি তোমার ১৮+ ছেলেকে ছোট্ট বাবু ভেবে বসে আছো। বাহ, খুব চমৎকার! তোমার ছেলে তো যে-কোনো সময় ফিতনাগ্রস্ত হতে পারে। সে তো সেক্যুলার পরিবেশে পড়ালেখা করে, তাই না? তুমি হয়তো জানো না, মেয়েলি ফিতনা এখানে কতটা স্বাভাবিক ব্যাপার। চোখের যিনা থেকে দূরে থাকা কতটা কষ্টের ব্যাপার। অন্তরের যিনা থেকে মুক্ত থাকাটা কত সাধনার ব্যাপার। আচ্ছা মা, তোমার ছেলেকে কি এই অবস্থা থেকে বাঁচাতে চাও না? সত্যি করে বলো তো—চাও কি না?
.
একটি পোশাক আছে, যেটি আপন করে নিলেই তোমার ছেলে এসব থেকে বেঁচে যাবে। তোমার ছেলের নজর হিফাজত হবে। সে অন্তরের যিনা থেকে মুক্ত থাকবে। ললনাদের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তাআলা সে পোশাকটির কী নাম দিয়েছে জানো?
.
❝তারা (নারীরা) তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।❞ (সূরা বাকারাহ : ১৮৭)
.
আমি এসব থেকে বাঁচতে চাই মা। এমন পোশাক চাই, যে আমার আবরণ হবে। আমাকে যিনা থেকে দূরে রাখবে। গোপন গুনাহ থেকে বিরত রাখবে। হ্যাঁ মা, কেবল সে পোশাকটিই পারে তোমার ছেলেকে পবিত্র রাখতে। সেই পোশাকটিই পারে তোমার ছেলেকে ফিতনামুক্ত রাখতে। রাসূল স. বলেছেন,
❝হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং যৌনতাকে সংযমী করে।❞ (বুখারি : ৮/৪৬৯৬)
.
যখন আকারে ইঙ্গিতে তোমায় সে পোশাকটি এনে দিতে বলি, তখন তুমি টাকার কথা বলো। আচ্ছা মা, আমাদের নবী স. যখন বিয়ে করেছেন, তখন তাঁর কাছে কী পরিমাণ টাকা ছিলো? উনার তো উল্লেখ করার মতো কিছুই ছিলো না। উনার চেয়ে খাদিজা রা.-এর ঢের বেশি অর্থ-সম্পদ ছিলো। খাদিজা রা. মারা যাওয়ার পর তিনি যখন একাধিক বিয়ে করেন, তখন তাঁর কাছে কী ছিলো? তখন তো অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ ছিলো। আমাদের নবীজি স.-এর মেয়েকে যখন আলী রা.-এর সাথে বিয়ে দেওয়া হলো, তখন আলী রা.-এর হাতে কী পরিমাণ টাকা ছিলো? কতটা ব্যাংকে উনার অ্যাকাউন্ট ছিলো? কতটা ক্রেডিট কার্ড উনার পকেটে ছিলো? উনার কাছে তো একটি বর্ম ছাড়া কিছুই ছিলো না। শেষমেশ বর্মটিও মোহরানার জন্যে বিক্রি করে দিতে হয়েছিলো।
.
আচ্ছা মা, আমার যদি আরেকটা বোন থাকতো—তবে কি সে টাকার অভাবে না খেয়ে মারা যেতো? সত্যি করে বল তো, টাকাটাই কি প্রধান সমস্যা? যদি তাই হয়, তবে আমার খরচের অর্ধেকটা দিয়ে দিতে আমি রাজি। আর আমি তো পঙ্গু নই। আল্লাহ আমাকে শক্তি দিয়েছেন, মেধা দিয়েছেন। আমি কোনো না কোনো পথ করেই নেবো। সত্যি কথা বলতে কী, টাকাটাই প্রধান সমস্যা নয়। আমি যেদিন প্রাইভেট মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার কথা বলেছিলাম, সেদিন তো তুমি রাজি হয়েছিলে। আমি বলেছিলাম, এত টাকা কোত্থেকে আসবে? তুমি বলেছিলেন, ও তোকে ভাবতে হবে না। তুই মন দিয়ে পড়াশোনো কর। তাহলে টাকার সমস্যা যে সত্যিকার সমস্যা না, সেটা বুঝতে কি আমার কষ্ট হবে? আসল সমস্যা কোথায় জানো? সমস্যা হলো, তুমি তোমার ছেলের অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করছো না। তার আর্তনাদ তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। আর পৌঁছলেও তুমি শুনে না শোনার ভান করছো। আসলে তোমার সদিচ্ছা নেই মা। তুমি যদি দেখতে ‘Got married’ এর স্ট্যাটাসে অবিবাহিত ছেলেদের কতটা লাইক পড়ে, তবেই হয়তো আমার না বলা কথাটা বুঝতে পারতে।
.
প্লিজ মা, ভুল বুঝো না। ভেবো না, আমি তোমায় বাদ দিয়ে কেবল জীবনসঙ্গিনীর জন্যে পাগলপারা হচ্ছি। আল্লাহর শপথ! তুমি যদি না থাকতে, তবে তো আমি আঁধারে হারিয়ে যেতাম। না হাঁটতে পারতাম, না চলতে পারতাম, আর না এই অবস্থানে আসতে পারতাম। আল্লাহ তো তোমার মাধ্যমেই আমায় দুনিয়ার আলো দেখিয়েছেন। তোমার মাধ্যমেই সেই ছোট্ট বাবু থেকে আজকের তাগড়া জোয়ান বানিয়েছেন। তোমার অবদান আমি কী দিয়ে শোধ করবো মা? তোমার ঋণ শোধ করার মতো সাধ্যি কি আমার আছে?
.
কিন্তু তবুও…একটু বোঝার চেষ্টা করো। তোমার সাথে কথা বলার একটা সীমা আছে, যে সীমার বাইরে কিছু বলা যায় না। তোমার-আমার মধ্যে একটা রেড লাইন আছে, যে লাইন অতিক্রম করা যায় না। তাই এমন কাউকে দরকার, যার সাথে কোনো সীমা থাকবে না, কোনো রেড লাইন থাকবে না। যাকে সব বলা যাবে। যে আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হবে। আমার সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবে। আমার সাথে মিষ্টি দুষ্টুমি করবে। আমাকে মধুর যন্ত্রণা দেবে। চক্ষুকে শীতল করবে।
.
একজন ভালো সঙ্গিনী পুরুষকে অনেকদূর এগিয়ে দিতে পারে৷ অন্ধকার পথে আলোক জ্বালিয়ে সাহস সঞ্চার করতে পারে। বাবা তো মাঝেমধ্যেই বলেন, ‘তোর মা না থাকলে আমার জীনবটা এত গোছালো হতো না।’ আসলেই মা, বাবা বিন্দু পরিমাণও মিথ্যে বলেননি। জীবনসঙ্গিনীর সাথে এমন কিছু শেয়ার করা যায়, যা অন্য কাউকেই বলা যায় না। এ সত্যিটা তো তুমিও জানো। তবুও কেন যে আমার বেলায় এটা বুঝতে চাও না, আমি জানি না। আমি সত্যিই জানি না।
.
মা তুমি ভালো থেকো। বাবাকে আমার সালাম দিও। আর তোমার ছেলেটাকে একটু বুঝতে চেষ্টা কোরো।
ইতি
তোমার খোকা

====
লেখকঃ জাকারিয়া মাসুদ (https://www.facebook.com/JakariaMasudOfficial)

শেয়ার করুনঃ