পর্ন আসক্তি গিলে খাচ্ছে কিশোরদের!

পর্ন আসক্তি গিলে খাচ্ছে কিশোরদের!

পর্ন আসক্তি গিলে খাচ্ছে কিশোরদের। নিরিবিলি সময় কাটানো, রাতে একা বিছানায় শুয়ে বাটন চাপছে অনর্গল। সবই পর্ন মুভি। রিডিং রুমে থাবা মেলেছে পর্ন মুভি। জীবনের শুরুতেই এমন আসক্তি পাল্টে দিচ্ছে কারো কারো জীবন। কেউ কেউ কিশোর বয়স থেকেই হয়ে উঠছে বেপরোয়া। নারীসঙ্গ খুঁজতে হয়ে উঠে পাগলপ্রায়। এই কিশোরদের দিয়েই ঘটছে অঘটন।
.
রাজধানীর একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সুফি আয়ান। বাবা ইতালি প্রবাসী। মা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে আয়ান ছোট। বড় বোন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবিতে পড়ছেন। মা অফিসে, বড় আপু বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় স্কুলের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টা তাকে একাই বাসায় থাকতে হয়। আর এ সময়টা সে স্মার্ট ট্যাব নিয়ে পড়ে থাকে। এতো কম বয়সেই তাকে চোখে বইতে হচ্ছে ভারি পাওয়ার ওয়ালা মোটা কাচের চশমা। স্কুল থেকে ফিরে কোনোভাবে ড্রেসটা চেঞ্জ করে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। প্রায় সময়ই একা ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। একা রুমে সারাদিন কি করে তার খবর জানে না মা বা বড় বোন।
.
একদিন অনার্স পড়ুয়া বোন বাসায় এসে দেখে ট্যাব হাতে নিয়েই কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছে তার আদরের ছোট ভাই। ট্যাব বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ তার বোনের চক্ষু চড়কগাছ। যে ভাইকে খুব ছোট বলে এতদিন জেনে এসেছে তার ট্যাবে কিনা পর্ন সাইটের ভিডিও চলছে। অফিস থেকে মা ফেরার পর তাকে পুরো বিষয়টা জানায়। এরপর সুফির মা ছেলের সঙ্গে ফ্রি হওয়ার ভান ধরে কিছু অ্যাডাল্ট গল্পের ছলে জানতে পারে ছেলে অনেক আগে থেকেই পর্ন মুভির প্রতি আসক্ত। আর সে এসব কোথা থেকে জেনেছে জানতে চাইলে সুফি জানায়, ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন সর্বপ্রথম তার এক বন্ধুর ট্যাবে ৮-১০ বন্ধু মিলে বিদেশি বিভিন্ন পর্ন ভিডিও দেখে।
.
একইভাবে রাজধানীতে সরকারি চাকরিজীবী এক বাবা একদিন তার ইন্টারমিডিয়েটে পড়ুয়া কিশোর ছেলে রায়হানকে দেখে রুমের দরজা আটকে ওয়াইফাই কানেকশন দেয়া কম্পিউটারে বসে অ্যাডাল্ট মুভি দেখছে। ছোট সময় বাচ্চাদের মা মারা যাওয়ার পর আর বিয়ে করেননি বাবা সায়েম ফরায়েজী। দুই ছেলেকে নিয়েই চলছে সংসার। ছেলের এই বিপথে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি সায়েম। তাই একদিন ছেলেকে প্রচণ্ড মার দেয়ার কারণে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে পায় ছেলেকে। এ সময় তার বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারে স্কুল শেষ করে সারাদিন একা একা বাসায় থাকতে খুব বিরক্ত লাগার কথা সে তার আরেক বন্ধুকে জানালে সে তাকে এই অ্যাডাল্ট মুভি দেখতে পরামর্শ দেয়। তাই যখনই সুযোগ পায় তখনই পর্ন মুভি দেখে রায়হান। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ‘প্রযুক্তি’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে পর্নোগ্রাফি দেখার কারণে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। যৌন সহিংসতার প্রতি আকৃষ্ট হয়, অশ্লীলতার চর্চা বেড়ে যায়। মা-বাবাকে অসম্মান করতে শেখে, সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যায়, মনে ধর্ষণের ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে।
.
রাজধানীর স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পর্নছবির আসক্তি। ইন্টারনেটে পর্নসাইটের অনিয়ন্ত্রণ খুব সহজেই শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার জগতের দিকে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এই শিশু-কিশোররাই জড়িয়ে পড়ছে বড় বড় অপরাধের সঙ্গে।
.
একটি বেসরকারি গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজধানীতে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৭ ভাগ কোনো না কোনো ভাবে পর্নোগ্রাফি দেখছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিকৃত যৌন শিক্ষার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা এসব শিশু পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারকে কঠোর হবার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
.
বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি একশ’ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৬৬ জনই যৌন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। মনোচিকিৎসকরা মনে করেন, এভাবে ছেলেমেয়েদের মধ্যে পর্ন আসক্তি বাড়তে থাকলে আগামী দুই দশকের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ আর ধর্মীয় অনুশাসন বলে কিছু থাকবে না।
.
বর্তমান যুগে যোগাযোগের সহজ মাধ্যম ইন্টারনেট। আর এ ইন্টারনেটেই যখন সহজ প্রবেশাধিকার দিয়ে ইনডেক্স করা ৪৫০ মিলিয়ন পর্নোগ্রাফিক সাইট তখন প্রিয় সন্তানের জন্য অভিভাবকের উদ্বিগ্নতা প্রশমিত করার যেন উপায় থাকে না। যখন পরিসংখ্যান বলে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সের ৩৮ ভাগই ইন্টারনেটে আসক্ত তখন অভিভাবকদের ভাবতে হয় অনেক কিছু। আর সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের কারণে সম্পূর্ণ অপ্রতাশিতভাবে ৫ থেকে ৭ বছরের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ১২ শতাংশ এবং ৮ থেকে ১৭ বছরের ১৬ শতাংশ শিশুর সামনে ইনডেক্স করা এই ৪৫০ মিলিয়ন পেইজগুলোর সাজেশন্স চলে আসে। শিশু মন পরিচিত হয় পর্নোগ্রাফি নামক ভয়াল মানসিক বিকারের সঙ্গে। পরিসংখ্যানের এ তথ্যে, আধুনিক প্রযুক্তিকে আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হিসেবেই ধরা হয় অভিভাবকদের জন্য।
.
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উঠে এসেছে দেশের ৭৭ শতাংশ কিশোর-কিশোরী পর্ন দেখে। আর এগুলো দেখতে তারা ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ট্যাবের মতো সহজলভ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। এছাড়া ঘরে ঘরে ব্রডব্যান্ড আর ওয়াইফাই সহজলভ্য হওয়াতে এর বিস্তার বেড়েছে অনেক বেশি। শিশু কিশোরদের জন্য পর্ন দেখা সামাজিকভাবে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সুস্থ স্বাভাবিক যৌন শিক্ষা না থাকায় শিশু কিশোরদের মনোজগতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অল্প বয়স থেকেই পর্ন মুভি দেখার ফলে নানারকম সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটছে। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মাঝে অ্যামেচার পর্ন বানানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ।
.
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের করা একটি কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, মিসেস শায়লা একটি স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা। ওনাকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। একদিন পরীক্ষার হলে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে তিনি বকা দেন অসদুপায় অবলম্বন করার জন্য। এ ঘটনা তিনি ভুলেই যেতেন। কিন্তু দু’দিন পরে উক্ত শিক্ষিকার বাথরুমের বাইরের দেয়ালে খুবই আপত্তিকর এক ছবি আঁকা দেখতে পান ওই শিক্ষিকা। আর সেই ছবির নারী পুরুষের জায়গায় ওনার আর এক জুনিয়র শিক্ষকের নাম লেখা। এই ঘটনায় তিনি খুবই মর্মাহত হন আর ভেঙে পড়েন। তদন্তে বেরিয়ে পড়ে কাজটি সেই ছাত্রের করা আর এই দুজন শিক্ষক তাকে আরেকজনের খাতা দেখে লেখায় বকা দিয়েছিল। তাই সে প্রতিশোধ নিতে এমন কাজ করেছে। একটা শিশুর ভাবনার অস্বাভাবিকতা উঠে আসে এ ধরনের ঘটনায়।
.
শিশু কিশোর উন্নয়ন ও মনো-সামাজিক সংস্থা প্রেরণার সাধারণ সম্পাদক ও সাইকো থেরাপিস্ট এসজেড রেজিনা পারভীন বলেন, বয়ঃসন্ধিকালে প্রত্যেক শিশুকেই সুস্থ আর স্বাভাবিক যৌনতা সম্পর্কে জানা উচিত। যদি না জানে তার ফলে দেখা যায় তারা পর্নসহ বিভিন্ন অ্যাডাল্ট সাইটগুলো দেখে যৌন সম্পর্ককে অস্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে তাদের সামাজিক আচরণে। এমনকি বড় হওয়ার পরে দাম্পত্য সম্পর্কে এর প্রভাব পড়ছে। অনেক সময়ই অনেক স্বামী পর্ন মুভি যেভাবে দেখে ঠিক একইভাবে যৌন সম্পর্ক করতে চায় আর স্ত্রী রাজি না হলে শুরু করে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার।
.
পর্ন মুভি ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে। তাই ইন্টারনেটে এগুলো খুবই সহজলভ্য। স্বাভাবিক নানা বিষয়ে সার্চ করলেও পর্ন মুভির লিংক চলে আসে। আর ইদানীং সবচাইতে ভয়ানক যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হল অডিও পর্নের প্রচলন। এটাই এখন সবচাইতে ভয়ানক। একজন কিশোর কানে হেডফোন গুঁজে কী শুনছে তা সহজে বোঝা যাবেনা। সামনে বই খুলে বসে অডিও পর্ন শুনে শুনে আপনার আদরের শিশু বা কিশোর সন্তানটির সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত ধারণা পাচ্ছে। সে তখন নিজের পরিবারের নারী ছাড়া বাকি সব নারীদের নিয়ে বাজে চিন্তা করছে আর এটাকে সে মোটেই খারাপ ভাবছে না। শুনতে শুনতে তার কান ও চোখ এটাকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করছে।
.
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন পর্নোগ্রাফি অন্যান্য মাদকের মতোই একটা আসক্তি। মাদক যেমন মাদকাসক্তকে প্রভাবিত করে, নীল ছবিগুলোও মানুষের মস্তিষ্কে ঠিক সেভাবেই প্রভাব ফেলে। শিশু কিশোরদের বেলায়তো আরো একধাপ এগিয়ে। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় পর্নোগ্রাফি আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়ানক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষ্পাপতার দিন শেষ হয়ে গেছে। মানুষ এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক কিছুই জানতে পারে। এটা হচ্ছে ঘরে হেরোইন রেখে শিশুকে ছেড়ে দেয়ার মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী জেফরি সেটিনোভারের মতে, আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে, পর্নোগ্রাফির আসক্তি হেরোইনের মতোই। বিজ্ঞান গবেষকদের দাবি, যারা অধিক মাত্রায় অশ্লীল দৃশ্য উপভোগ করেন, তাদের মগজের ধূসর পদার্থ উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষা থেকে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে অবিরল যৌন দৃশ্য উপভোগ করলে মস্তিষ্কে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। আমরা শঙ্কিত যে আগামী প্রজন্ম একটি মেধাহীন ও অসুস্থ সমাজ উপহার দিবে।
.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, কিশোরদের প্রেমঘটিত কারণসহ নানা কারণে পর্নোগ্রাফিসহ বিভিন্ন ধরনের অন্যায় কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে সরকারিভাবে কিশোরদের পর্নসাইটে প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক দেশের সরকার এই সাইটগুলো বন্ধ করলেও আমাদের দেশে ওভাবে বন্ধ হয়নি। শিশু কিশোরদের বয়সের ডিমান্ড কমাতে বয়স এবং বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রেখে তাদের চাহিদা পূরণ করতে হবে। যে বয়সে যতটুকু প্রাপ্য তাকে ততটুকু সুবিধা প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এক ধরনের প্রেসার থাকতে হবে। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
.
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, কিশোরদের পর্ন আসক্তি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে- রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক, সামাজিক উদাসীনতা। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পর্ন সাইট বন্ধ করে দিয়েছে। যেটা আমাদের দেশে এখনো ওভাবে হয়নি। দ্বিতীয়ত হচ্ছে বর্তমান সময়ে বাবা মা এতটাই ব্যস্ত সময় কাটায় যে তাদের সন্তানকে খুব একটা সময় দিতে পারে না। ফলে শিশুরা একাকী সময় কাটাতে এবং শরীর বৃত্তীয় কামনা নিবৃত্ত করতে পর্ন সাইটের আশ্রয় নেয়। এই সর্বনাশা পথ থেকে সন্তানদের ফেরাতে বাবা মা’ই পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।
.
সমাজবিজ্ঞানি অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, আমাদের সমাজে ফ্যামিলি বন্ডিংসটা কমে যাচ্ছে। বাবা মায়েরা অনেক বেশি ব্যস্ত থাকায় ছেলেমেয়েকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারে না। একই সঙ্গে প্রযুক্তির যেমন ভালো দিক আছে তেমনি খারাপ দিকও আছে। এক্ষেত্রে বাচ্চাদের কোনো বিষয়ে চাপ প্রয়োগ না করে তার মধ্যে এমন মনোবৃত্তি তৈরি করতে হবে যেন সে লুকিয়ে লুকিয়ে পর্নোগ্রাফি বা নিষিদ্ধ কোনো জিনিসের প্রতি আসক্ত না হয়। বাচ্চাদের এই পজেটিভ মনোবৃত্তি তৈরিতে পরিবার, বাবা-মা, শিক্ষক, গণমাধ্যম সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
.
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সস্টিটিউটের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. নাসরীন ওয়াদুদ বলেন, চীনসহ বিভিন্ন দেশে পর্ন সাইটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যেটা আমাদের দেশে বহালতবিয়তে চলছে। আমাদের সমাজে অতি আধুনিক কিছু বাবা মা তাদের সন্তানদের কিশোর বয়সেই হাতে একটি স্মার্ট ফোন কিনে দিয়ে জাতে উঠতে চায়। ফলে বাচ্চারা তাদের ইচ্ছামতো বিভিন্ন সাইটগুলোতে প্রবেশ করে খেয়ালখুশিমতো পার পেয়ে যাচ্ছে। এভাবেই এক্সাইটমেন্টের জায়গা থেকে কিশোররা একটু একটু করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অপরাধের দিকে পা বাড়ায়। কিশোরদের এই অতিমাত্রায় আধুনিকতা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য বিপদ বয়ে আনবে।
.
সূত্র: মানবজমিন
.
অবশ্যই দেখুন- https://tinyurl.com/y43344jc
পড়তে পারেন-
শেয়ার করুনঃ

“ফ্যান্টাসি কিংডম ” (প্রথম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

-ভাই , বলেন তো কিশোর পাশা বলে বাস্তবে কেউ আছে কিনা ?

পাশের বাসার ছাদ থেকে প্রশ্নটা ভেসে আসলো । সঙ্গে একরাশ উদ্বিগ্নতা । ছাদের চিপায় নিরিবিলিতে  বসে একটু  আতলামী করছিলাম । অচমকা এমন প্রশ্নে ভসকাইয়া  গেলাম ।

উফফ! অসহ্য – শান্তি মতো  একটু পড়তেও পারবো না ।  খুবই বিরক্তি নিয়ে বহু কষ্টে বই থেকে মুখ উঠিয়ে তাকালাম  প্রশ্নকর্তার দিকে । (আঁতেল বলে একটু সুনাম ছিল এককালে ) প্রশ্নকর্তা পাশের বাসার তূর্য । যে সময়কার কথা বলছি, তখন  ক্লাস সিক্সে পড়ে  সে। আমি তখন তার চেয়ে দুই বছরের বড় ।  একই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি । আমাকে  ওস্তাদ মানে সে ।

চোখে মুখে রাজ্যের টেনশান নিয়ে  তূর্য আমার উত্তরের অপেক্ষা করছে – যেন এই প্রশ্নের উত্তরে আমি কি বলি সেটার  ওপর তার বাঁচা মরা নির্ভর করছে ।

তখনো তিন গোয়েন্দা ধরিনি , এক ফেলুদাতেই মজে ছিলাম  তাই মূর্খতা ঢাকার জন্য পাল্টা প্রশ্ন করলাম – কোন কিশোর পাশা ?

সাগরেদ , ওস্তাদের মূর্খতায় একটু দমে গেল ।

-ঐ যে ভাই , ঐ কিশোর পাশা !!! রকিব হাসানের লিখা “তিন গোয়েন্দা” সিরিজের প্রধান গোয়েন্দা । আমেরিকায় থাকে ।

– হুম ,তো কি হইছে ?

– আর বইলেন না ,ভাই ! আমাদের ক্লাসের মুন আছে না, মেয়েদের ক্যাপ্টেন ?

-হুঁ …তো ?

-তারে প্রপোজ করছিলাম আজকে …

– তুই প্রপোজ করছিলি !!! এই পিচ্চি বয়সে !!!

– হ্যাঁ ভাই । তারপর কি হইছে শোনেন না ,মুন আমাকে বলছে সে আমাকে ভালবাসতে পারবে না (অভিমানী কন্ঠস্বরে)। সে অন্য একজনকে ভালোবাসে । তার নাম কিশোর পাশা । আমেরিকায় থাকে ।  ‘ধলা’  রবিন মিলফোর্ড আর  ‘কাউলা’  মুসা আমানের সঙ্গে মিলে গোয়েন্দাগিরি করে । বেশ নামডাক । অ্যাঁ গোয়েন্দা  হইছে আমার ……  যতসব  লেজকাটা টিকটিকি !!!

তিন গোয়েন্দা সিরিজের লেখক  রকিব হাসানকে  একসময় বেশ সমালোচনা সহ্য  করতে হয়েছিল । সমালোচকদের অবশ্য দোষ ছিল না ,  তিন গোয়েন্দার বই পড়ে  মাথা বিগড়ে যাওয়া পোলাপান যদি এডভেঞ্চারের লোভে বাড়ী থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় তাহলে সেটা সিরিয়াসলি নেওয়াই উচিত ।  দুষ্টু ছেলেপিলেদের যেমন কান দুটো মলে দিয়ে বাসায় ফেরত পাঠানো দরকার তেমনি লেখকে একটু বকে দেওয়াওতো  দরকার ।

একসময় ফেলুদার ভূত আমার ঘাড়ে বেশ ভালোমতোই চেপেছিল । ফেলুদার মতো চিত হয়ে শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকতাম, আঙ্গুল মটকাতে মটকাতে ঘরময় পায়চারী করে বেড়াতাম, ভ্রূ কুঁচকে চিন্তা করার ভান করতে  করতে তো আমার চেহারায় পার্মানেন্ট একটা ভাব চলে আসলো ভ্রূ কুঁচকে থাকার , এখন চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারিনা (ফেলুদার মতো হাতের আড়ালে কায়দা করে চারমিনার ধরিয়ে তাতে দুটান দেওয়ার চেষ্টা অবশ্য কখনো করিনি! আমি বরাবরই ভালো ছেলে !)

ফেলু মিত্তির , কিশোর পাশাদের দিন শেষ । মুভি /সিরিয়াল/পর্ন/আইটেম সং/ চটিগল্পের রমরমা অবস্থা এখন । এখনকার কিশোর কিশোরীরা এগুলোতেই বুঁদ হয়ে থাকে রাতদিন । ইউরোপ আমেরিকার কথা ছেড়েই দিলাম , খোদ আমাদের দেশের পর্নস্ট্যাটস দেখলে মাথা ঘুরে যায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজধানীতে ৭৭ শতাংশ কিশোর পর্ন মুভিতে আসক্ত  ।  বাস্তব অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ সেটা আমিও যেমন জানি তেমন আপনিও জানেন ।  বিস্তারিত জানার জন্য  পড়ে দেখা যেতে পারে [বাংলাদেশে পর্ন-http://bit.ly/2ccXGnF ] । দেখুন যমুনা টিভির এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন – http://bit.ly/2c0TR1p

এই আসক্তি আমাদের জেনারেশানের ছেলেমেয়েদের  যে কতটা ক্ষতি করে চলেছে তা আমরা বুঝি না । বোঝার চেষ্টাও করি না ।

জীবনের দশ বারোটা বসন্ত পার হয়ে যাবার পর দেহ ও মনে অন্যরকম একটা পরিবর্তন আসে । মন কি জানি চায় । ফ্রক পড়া পাশের বাসার মেয়েটার চোখদুটো একটু বেশী কালো মনে হয়  ছেলেটার কাছে । সদ্য গোফের রেখা গজানো , শার্টের বোতাম খোলা কোঁকড়া চুলের ছেলেটাকে মাঝে মধ্যেই আড়  চোখে দেখে ফ্রক পড়া মেয়েটাও । বিপরীত লিঙ্গের প্রতি, নারী পুরুষের শরীরটার প্রতি অদম্য একটা কৌতূহল জেগে ওঠে । কিছুদিন আগেও এই  কৌতূহল মেটানো কঠিন ছিল ।  থ্রিজি, ফোরজির  যুগে আজ সেটা  পানির মতো সোজা । এখনকার ছেলেমেয়েরা দুধের দাঁত পড়ার আগেই সব কিছু জেনে ফেলছে । এটা খুব বেশী খারাপ কিছু হত না ,যদি বাবা মা বা অভিজ্ঞ কারো  নিকট থেকে তারা  কৌতূহল গুলো মেটাতো । কিন্তু দুঃখের বিষয় , সেক্স এডুকেশানের জন্য তারা ঢুঁ মারছে ইন্টারনেটের অন্ধকার গলিতে বা পর্ন/চটি গল্প গুলে খাওয়া কোন ইঁচড়ে পাকা বন্ধুর কাছে । আর তখনোই জ্বলে উঠছে বিশাল এক  দাবানলের প্রথম অঙ্গারটা ……

জীবনের বেড়ে ওঠার এই সময়টাতে ছেলেমেয়েরা যা দেখে বা পড়ে সেটা তাদের মনোজগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে , বিষয়গুলো তারা সেরকম কোন চিন্তাভাবনা ছাড়াই   ধ্রুব সত্য বলে গ্রহন করে  নেয় এবং সেগুলো অনুসরন করার চেষ্টাও করে  (লিখার শুরুতে এ নিয়ে বহুত প্যাচাল পেড়েছি)। পর্ন মুভি বা আইটেম  সং বা চটিগল্পে   নারী পুরুষের সম্পর্কটাকে খুবই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে । বিশেষ করে নারীকে তো একেবারে পন্য (আইটেম বললে ব্যাপারটা ভালো বোঝা যায়)  বানিয়ে ফেলা হয়েছে । আমাদের ছেলেরা পর্ন/ আইটেম সং দেখে, চটিগল্প পড়ে শিখছে – মেয়েরা তোমার সঙ্গে বিছানায় যেতে উদগ্রীব তুমি  তার সঙ্গে  যেভাবে , যখন যা মন চাই করতে পারবে , সে কখনো না করবে না , কোন আপত্তি করবে না , তুমি যদি তাকে বেধড়ক মারধোর কর, এমনকি ধর্ষণও করো তাহলেও সে তোমাকে কিছুই বলবে না , বরং সে ব্যাপারটা উপভোগ করবে । মেয়েরা শিখছে – তোমার সম্পদ এই শরীরটা । এটা তোমার  হাতিয়ার ।  তুমি একে  প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে পুরুষের ওপর ছড়ি ঘুরাবে । সিড়িতে, গাড়ীতে, চিপায় চাপায়, রিকশায় একে ব্যবহার করবে , দরকার হলে লিটনের ফ্ল্যাটেও যাবে ।

 

আমাদের ছেলেমেয়েরা  ঐসব শিখে তো বসে নেই ।  পর্দায় দেখা জিনিসগুলো বাস্তবেও করার চেষ্টা করছে । ১২-১৩ বছর বা আরো কম বয়সী ছেলেদেরকে আমরা মনে  করি নাদান , অবুঝ শিশু , কদিন আগেও ফীডার খেত। কিন্তু এরা যে কি চীজ আমরা যদি  বুঝতাম ! আশেপাশের কোন মেয়েকেই এরা রেহাই দেয় না ,  হোক সে কোন নিকটাত্মীয় যেমন কাজিন , মামী, চাচী  বা পাড়াতো আপু , ক্লাসমেট , টিচার [ http://bit.ly/2c3OC2Y] , কাজের মেয়ে, পাশের বাসার আন্টি । সবাইকে নিয়ে ফ্যান্টাসীতে ভোগে ,মাস্টারবেট করে , চটিগল্প পড়ে , বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে , সুযোগ খোঁজে বা প্ল্যান করে এটা সেটা এবং ঐইটাও করে ফেলার । এরা কাউকে ছাড় দেয়না, কাউকে  না ।

আল্লাহ্‌র কসম! আমি একটুকুও বাড়িয়ে বলিনি । এই  ছেলেমেয়েরা  যে অশ্লীলতার কতটা গভীরে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছে তা আমি আপনি কল্পনাও করতে পারবো না ।  কল্পনাও করতে পারবো না ।

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ ……

 

শেয়ার করুনঃ

“ফ্যান্টাসি কিংডম ” (দ্বিতীয় কিস্তি)

পর্নআসক্তি শিশু কিশোরদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আমরা করব ইনশা আল্লাহ্‌ । কিন্তু তার পূর্বে শিশু কিশোরদের ওপর পর্ন মুভির অন্যান্য ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক।

পর্নআসক্তির কারনে একাডেমিক রেজাল্টের বারোটা বেজে যায় ।২০১৫ সালে এক গবেষণা থেকে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ‘টীনেজারদের পর্ন দেখা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ছয় মাসের মধ্যেই তারা পরীক্ষায় খুবই খারাপ রেজাল্ট করা শুরু করে’। [১]

২০০৮ এ জার্মানির একদল গবেষক বলেন পর্নআসক্তি কলেজ ছাত্রদের একাডেমিক পারফরম্যান্সের উন্নয়নে বড় একটা বাঁধা ।  পর্নমুভি দেখে এমন ছাত্ররা খুব একটা হোম ওয়ার্ক করতে চায়না, ক্লাস পালায়, ঠিকমতো এসাইন্মেন্ট জমা দেয় না । আসলে কেউ যদি পর্ন বা মাস্টারবেশনে আসক্ত হয় তাহলে তাকে এগুলোর পেছনে অনেক সময় এবং এনার্জি ব্যয় করতে হয় । এগুলো করার পরে আবার খারাপ লাগে । অন্তরের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়। কোন কাজ করতে ইচ্ছে করে না । শুয়ে বসে, ঝিমিয়ে, ঘুমিয়ে দিন পার করতে ইচ্ছে করে ।

পর্ন দেখার সময় ব্রেইনে খুব শক্তিশালী কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় [https://goo.gl/ZM5n3x ]। কেউ এতে আসক্ত হলে তার সব মনযোগ এতেই কেন্দ্রীভূত হয়; কবে ম্যাথ এক্সাম হবে বা  কবে কোন  এসাইন্মেন্ট জমা দিতে হবে তার কিছুই মনে থাকে না । তার   পক্ষে পড়াশোনায় মনযোগ দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না । মাথায় পর্নমুভির দৃশ্যগুলো ঘুরতে থাকে । পর্নমুভির ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকতেই সে পছন্দ করে , পড়াশোনা তার কাছে   কাঠখোট্টা, নীরস মনে হয় ।  ফলাফল- পরীক্ষায় ডাব্বু মারা ।

 

পর্নআসক্তি জন্ম দেয় হতাশা, উদ্বিগ্নতা। অল্প বয়সেই নারী পুরুষের দৈহিক রসায়ন জেনে ফেলাতে নিষ্পাপ , নির্ভাবনাময় শৈশব কৈশোরে ভর করে জটিলতা , জমে অবসাদ আর গ্লানির পাহাড়।[২]

যে বয়স ছিল দুরন্তপনার, মাঠ ঘাট দাপিয়ে বেড়ানোর সেই বয়সে অন্ধকার ঘরে পর্ন দেখা  কিশোরদের বাহিরের পৃথিবী সম্পর্কে অযথা ভয় ঢুকিয়ে দেয়। সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে। বয়ঃসন্ধিকালে এমনিতেই মানুষজন থেকে একটু দূরে দূরে থাকার প্রবণতা  থাকে, পর্নআসক্তি সেটা বাড়িয়ে ফেলে বহুগুন। কিশোরেরা হয়ে পড়ে অসামাজিক। মানুষজনের সামনে যেতে সে লজ্জা পায়,তাদের থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। চরম একাকীত্বে ভোগা শুরু হয়। এই হতাশা, অস্থিরতা, একাকীত্ব থেকে শুরু হয় ড্রাগ আসক্তি; সিগারেট,মদ-গাঁজা, ইয়াবা, হিরোইন বাদ যায়না কিছুই। [৩]

 

শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ চরম ভাবে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। পর্নআসক্তির কারণে খুব অল্প বয়স থেকেই  মাস্টারবেশনে আসক্ত হয়ে পড়ে। মাস্টারবেশন ছোট্ট জীবনটাকে করে ফেলে দুর্বিষহ। পর্ন,মাস্টারবেশন আসক্তির যুগলবন্দী ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয় কিশোরদের যৌনক্ষমতা।

 

তবে  পর্নইন্ডাস্ট্রি  অমার্জনীয় এক অপরাধ করেছে ভালোবাসার সংজ্ঞা বদলে দিয়ে ।

মিডিয়া কিশোর তরুণদের খুবই প্রভাবিত করে। তাদের জীবনদর্শন,বিশ্বাস, আচার আচরণ, আবেগ মিডিয়া খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। [৪]

পর্নআসক্ত শিশু কিশোরদের বিশ্বাস-আচার আচরণ আবেগ সব কিছুই পর্দায় দেখা দৃশ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এটা বলাই বাহুল্য। সেক্স এডুকেশানের জন্য পর্নমুভিকে বেছে নিচ্ছে শিশু কিশোরেরা। [৫] যৌনতা  সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকায় পর্ন মুভির বিকৃত যৌনতাকেই তারা আদর্শ যৌনতার মাপকাঠি ধরে নেয়- এভাবেই বোধ হয় সঙ্গিনীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে হয়, ভালোবাসা বোধহয় একেই বলে, এভাবে সঙ্গিনীকে ভালবাসলে তারা পরিতৃপ্ত হয়, সঙ্গিনী অন্তরঙ্গ হতে চাচ্ছে না মানে সে আসলে বোঝাতে চাচ্ছে আমার ওপর একটু জোর খাটাও, তুমি একটু রাফ হও’।

কোনটা যে বিকৃত ফ্যান্টাসী আর কোনটা যে সত্যিকারের অন্তরঙ্গতা, ভালোবাসা সেটা বুঝতে পারেনা । [৬]

পর্নমুভি শিশু কিশোরদেরকে এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে নারী একটা যৌন বস্তু, পুরুষের  মনোরঞ্জনের জন্যেই যার পৃথিবীতে আগমন।নারীরাও যে মানুষ, তাদেরও হৃদয় আছে, তাদেরও মন আছে, একজোড়া চোখ আছে সেই চোখের ভেতরে একটা  আকাশ আছে এই অনুধাবন শক্তি নষ্ট করে দেয় পর্ন আসক্তি। নারীরা যেন শুধু একটা মাংসপিণ্ড যা নিয়ে উদ্দাম ফুর্তি করা যায়, রাত কাটানো যায়, কিন্তু ভালবাসা যায় না, চোখের তারায় হারিয়ে যাওয়া যায় না ,সম্মান করা যায়না । [৭]

এর ফল হয় মারাত্মক!

পর্নস্টার আর সিনেমার নায়িকারা তো আছেই, ছোট্ট মস্তিষ্ক সমস্ত শক্তি দিয়ে আশেপাশের সব নারীকে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগা শুরু করে দেয়, সমানে চলে মাস্টারবেশন। কাজিন,ক্লাসমেট, টিচার, পাশের বাসার আন্টি,পাড়াতো বড়আপু

ভাবী,চাচী,মামী,ফুপু,খালামনি, এমনকি নিজের বোনকে নিয়েও! বাদ যায়না কেউই।

পর্নমুভি শিশু কিশোরদের ভুলিয়ে দেয় যৌনতার পূর্বশর্ত  বিয়ে করা। খুব অল্প বয়সেই এরা হারিয়ে ফেলে নিজেদের পবিত্রতা। কলুষতার চাদর জড়িয়ে নেয় গায়ে। পর্ন দেখে দেখে মাস্টারবেট করে আর নিজেকে ঠান্ডা করা যায়না।একজন পার্টনারে  শিশু কিশোররা আর সন্তুষ্ট থাকতে পারেনা, ঘন ঘন পার্টনার বদলাতে থাকে,কেউ কেউ হয়তো হয় এক রাতের পার্টনার। বিশ্বস্ত, নিঃস্বার্থ সম্পর্কে আবদ্ধ হবার চেয়ে ‘যৌন স্বার্থের’ চুলচেরা হিসেব নিকেষের জটিল সম্পর্কে আবদ্ধ হয় এরা।

পর্দায় দেখা দৃশ্যগুলো অনুকরণ করে। সঙ্গিনী রাজি না হলে জোর করে। [৮,৯]

এনাল সেক্স, ওরাল সেক্স সহ ঝুঁকিপূর্ণ সব পদ্ধতিতে এরা যৌনমিলন করে, কোন ধরণের প্রতিরোধক ব্যবস্থা না ছাড়াই যৌন মিলনের ফলে যৌনবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়।উদ্দাম যৌন জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে মদ, গাঁজা, ইয়াবা সেবন । [১০,১১]

শিশু কিশোরেরা যতোবেশি পর্নআসক্ত হয় যতোবেশি হার্ডকোর পর্ন দেখে ততোবেশি বিকৃত যৌনতায় মেতে ওঠে। এনাল সেক্স, ওরাল সেক্সের কথা তো আগেই বলা হয়েছে, যৌনতার সময় সঙ্গিনীকে মারধোর করা, গলা টিপে ধরা, খিস্তিকেউর করা, জোর জবরদস্তি করা, গ্রুপ সেক্স,পশুকাম… আর বলার প্রবৃত্তি হচ্ছেনা। [১২,১৩]

যৌন সহিংসতাকে তীব্র ভাবে উৎসাহিত করা হয় পর্নমুভিতে। পর্নআসক্ত শিশু কিশোররা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে পরিণত হয় যৌন নিপীড়কে। ধর্ষণ করতেও দ্বিধাবোধ করেনা। হাতের কাছে যাকে পায় তাকে দিয়েই লালসা মেটাতে চায়।

ডেইলি মেইলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে ইন্টারনেট পর্ন কীভাবে শিশু কিশোরদের  ধর্ষকে পরিণত করে।

ইংল্যান্ডে মাত্র ৪ বছরে ১৭ বছরের চেয়ে কম বয়সীদের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গিয়েছে ২ গুন।

UK’s Ministry of Justice জানাচ্ছে ২০১৫ সালে ১২০ জন শিশু ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে ২০১১ সালের তুলনায় তা প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি।

Justice Minister Phillip Lee শিশুদের দ্বারা শিশুদের যৌন নিপীড়িনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অনলাইন পর্নকে দায়ী করেন এই শিশু-কিশোরদের এই অধঃপতনের জন্য । [১৪]

Australian Psychological Society ‘এর ধারণা অনুস্বারে  ২০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের  ধর্ষণের জন্যে কিশোরেরা দায়ী, এবং ৩০-৫০ শতাংশ শিশুদের যৌন নিপীড়নের জন্যে দায়ী এই কিশোরেরা।

Emeritus Professor Freda Briggs,  যিনি একজন শিশু নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞও,  দাবী করেন,‘ইন্টারনেট পরনোগ্রাফি শিশুদেরকে পর্দার যৌন নিপীড়কের একদম কার্বন কপি বানিয়ে ফেলছে। পর্দায় যা দেখছে তারা সেটাই করার চেষ্টা করছে অন্য শিশুদের ওপর। [১৫]

পর্নমুভি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে শিশুরাই অন্যশিশুদের যৌন নিপীড়ন করছে এরকম অসংখ্য ঘটনা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকদের জন্য আমরা কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।

১) ইংল্যান্ডে ১২ বছরের বালক পর্নমুভির অনুকরণে ৭ বছর বয়সের নিজের বোনকে ধর্ষণ করেছে [১৬]

২)  ঢাকার কেরানীগঞ্জের সিরাজনগর এলাকার ৭ বছরের শিশুকন্যা ফারজানা ২০১৭ সালের ১৬ সেপ্টেমবার  নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৭ সেপটেম্বার চাচা রহমত আলীর বাড়ির পেছনে পাওয়া যায় তার হাত-পা বাঁধা লাশ। নিষ্পাপ শিশুটিকে কে হত্যা করল?

ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে। কেঁচো খুঁড়তে যেয়ে সাপ নয় একদম কুমীর বের হয়ে আসে।

শিশু ফারজানার’ই এক নিকটাত্মীয় কিশোর মোবাইল পর্ন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফারজানাকে হত্যা করে। ফিল্মী কায়দায় পুলিশের চোখে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে । কিন্তু শেষ রক্ষা হয়না । [১৭]

৩) পর্ন দেখে দিশেহারা হয়ে ১৪ বছরের কিশোর ১০ বছরের শিশুকে অপহরণ করে ধর্ষণ করেছে [১৮]

৪) ১৫ বছরের কিশোর ১৪ বছরের বালিকাকে চেয়ারে বেঁধে পর্নমুভির অনুকরণে নির্যাতন চালিয়েছে [১৯]

আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত এরকম অজস্র ঘটনা ঘটে চলেছে আমরা টেরও পাইনা, বীভৎস ঘটনাগুলোর খুব অল্পসংখ্যকই জনসম্মুখে আসে।

বীভৎস একটি ব্যাপার হলো পর্নআসক্ত শিশু কিশোরেরা   সমকামিতায় লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। পর্নমুভি দ্বারা প্রোগ্রামড কিশোর তরুণদের নিকট এনাল সেক্স,ওরাল সেক্স খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বন্ধুবান্ধব মিলে একসঙ্গে পর্ন দেখার সময় উত্তেজনা সামলাতে না পেরে এবং নারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গতার সুযোগ না থাকার কারণে এরা অনেকসময়ই পর্ন দেখার সঙ্গী সাথিদের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হয়ে যায়।

মেয়েদের মধ্যেও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পর্ন আসক্তি।

১১০০০ কলেজ পড়ুয়া তরুণীদের ওপর গবেষণা করে দেখা যাচ্ছে শতকরা ৫২ জন ১৪ বছরে পা দেবার পূর্বেই পর্ন দেখে ফেলেছে।[২০]  আরেকটি সার্ভেতে দেখা যাচ্ছে প্রতি ৩ জন নারীদের মধ্যে ১ জন সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও পর্ন দেখে । [২১] বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় এক পর্ন সাইটের দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি পর্ন দেখা হয় তাদের মধ্যে ইন্ডিয়ার স্থান চার নাম্বারে। আর এই ইন্ডিয়া থেকে যতজন মানুষ সেই সাইটে পর্ন দেখে তার এক চতুর্থাংশই মহিলা। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে লেসবিয়ান এবং গে পর্ন।  [ ফিত্নার ভয়ে রেফারেন্স দেওয়া হল না ]

মেয়েদের এই ক্রমবর্ধমান পরনাসক্তি বদলে দিচ্ছে তাদের যৌন উপলব্ধি। বিকৃত যৌনাচার, যৌন সহিংসতা,ধর্ষণ তাদের কাছে স্বাভাবিক  ব্যাপার  হয়ে যাচ্ছে দিন দিন । [২২]  কিশোরী তরুণীদের মধ্যে গ্রুপ সেক্সে লিপ্ত হবার প্রবণতা বাড়ছে । [২৩]

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌……

পড়ুনঃ প্রথম কিস্তি- https://goo.gl/zwcD4I

রেফারেন্সঃ

[১] Ine Beyens, Laura Vandenbosch, and Steven Eggermont, “Early Adolescent Boys’ Exposure to Internet Pornography: Relationships to Pubertal Timing, Sensation Seeking, and Academic Performance,” The Journal of Early Adolescence 35, no. 8 (2015): 1045-1068

[২] Michael E. Levin, Jason Lillis, and Steven C. Hayes, “When is Online Pornography Viewing Problematic Among College Males? Examining the Moderating Role of Experiential Avoidance,” Sexual Addiction & Compulsivity 19, no. 3 (2012): 168–80.

[৩] Porn Addiction: Often Part of a Larger Addictive Pattern – https://goo.gl/FyBQ6L

[৪] Victor C. Strasburger, Amy B. Jordan, and Ed Donnerstein, “Health Effects of Media on Children and Adolescents,” Pediatrics 125, no. 4 (2010): 756–767

[৫] Students turn to porn for sex education – https://goo.gl/9NJJr9

[৬] Pamela Paul, “From Pornography to Porno to Porn: How Porn Became the Norm,” in The Social Costs of Pornography, edited by James R. Stoner Jr. and Donna M. Hughes, 3–20. Princeton, New Jersey: Witherspoon Institute, 2010.

[৭] Jochen Peter and Patti M. Valkenburg, “Adolescents’ Exposure to Sexually Explicit Internet Material and Notions of Women as Sex Objects: Assessing Causality and Underlying Processes,” Journal of Communication 59 (2009): 407–433.

[৮]Paul J. Wright, Robert S. Tokunaga, and Ashley Kraus, “Consumption of Pornography, Perceived Peer Norms, and Condomless Sex,” Health Communication 31, no. 8 (2016): 954-963.

[৯] Kids Who Find Hardcore Porn Want To Repeat What They’ve Seen, Study Shows- https://goo.gl/RDV1ia

[১০] Anneli Givens, Jacob Brown, and Frank Fincham, “Is Pornography Consumption Associated with Condom Use and Intoxication During Hookups?” Culture, Health & Sexuality 17, no. 10 (2015): 1155-1173.

[১১] Scott R. Braithwaite, Sean C. Aaron, Krista K. Dowdle, Kersti Spjut, and Frank D. Fincham, “Does Pornography Consumption Increase Participation in Friends With Benefits Relationships?” Sexuality & Culture: An Interdisciplinary Quarterly 19, no. 3 (2015): 513-532

[১২] Paul J. Wright, Chyng Sun, Nicola J. Steffen, and Robert S. Tokunaga, “Pornography, Alcohol, and Male Sexual Dominance,” Communication Monographs 82, no. 2 (2015): 252-270.

[১৩] Kathryn C. Seigfried ¬Spellar and Marcus K. Rogers “Does Deviant Pornography Use Follow a Guttman-Like Progression?” Computers in Human Behavior 29, no. 5 (2013): 1997–2003.

[১৪] Extreme internet porn is fuelling a surge in sex attacks by children: Number of under-17s convicted of rape almost doubles in four years – https://goo.gl/X9m6H8

[১৫] Sex Before Kissing: How 15-Year-Old Girls Are Dealing With Porn-Obsessed Boys- https://goo.gl/bFUKYn

[১৬] Boy who raped sister after watching pornography sentenced – https://goo.gl/UXMHa2

[১৭] ধর্ষণ-খুনে এক কিশোরের তেলেসমাতি-https://goo.gl/QqXcRZ

[১৮] Boy, 14, raped girl aged ten after watching online porn https://goo.gl/seKvxs

[১৯] Judge blames 15-year-old boy’s internet porn obsession for his rape of girl, 14, in a ‘heinous’ attack

https://goo.gl/wnkDyx

[২০] How Many Women are Hooked on Porn? 10 Stats that May Shock You- https://goo.gl/h31twR

[২১] Survey Finds More Than 1 In 3 Women Watch Porn At Least Once A Week- https://goo.gl/LRfx8o

[২২]Shawn Corne, John Briere, and Lillian M. Esses, “Women’s Attitudes and Fantasies About Rape as a Function of Early Exposure to Pornography,” Journal of Interpersonal Violence 7, no. 4 (1992): 454-461.

[২৩] Porn use makes teen girls five times more likely to have group sex: study- https://goo.gl/9k5SiJ

শেয়ার করুনঃ

ফ্যান্টাসি কিংডম (শেষ কিস্তি)

হাইস্কুলের প্রেম!

কখন যে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া বালক ফ্রক পড়া বালিকার প্রেমে পড়ে যায় ঠিক বোঝা যায়না! কোচিং ফাঁকি দিয়ে, বালক হেঁটে বেড়ায় বালিকার বাসার অলিতে গলিতে। হয়তো কোন এক দুর্লভ মুহূর্তে বালিকা ব্যালকনিতে আসবে, বেণী খোলা চুল ভাসিয়ে দিবে দক্ষিণের বাতাসে। ক্ষণিকের দেখা পাওয়া! এতোটুকুই তো চাওয়া! এতেই বালকের রাতের ঘুম শেষ! অংকে ভুরি ভুরি ভুল, বিজ্ঞানের ক্লাসে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা!

দিন যেতে থাকে। বালক, বালিকার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকে। কোন একদিন বালিকারও ভালো লাগে যায় বালককে। সদ্য গোফের রেখা গজানো, শার্টের বোতাম খোলা বালককে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। বালিকা কলমের ক্যাপ কামড়িয়ে কামড়িয়ে বাকা করে ফেলে। কিছুতেই মন বসেনা পড়ার টেবিলে।

একদিন মুখোমুখি দাঁড়ায় দুজন।

কিছুক্ষণের জন্যে নেমে আসে মহাজাগতিক নীরবতা।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শতবার রিহারসেল দিয়ে আসার পরেও বালকের কথা আটকে যায়। গলা শুকিয়ে যায়। নার্ভাস লাগে।

বালিকা বালকের করুণ অবস্থা বুঝে ফেলে নিমিষেই। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে রেখে বালিকা কঠিন স্বরে বলে, ‘ এই ছেলে এতো ভয় পাচ্ছো কেন? আমি কি বাঘ? খেয়ে ফেলব’?

বালক আরো নার্ভাস হয়ে যায়।

বালিকা ফিক করে হেসে ফেলে…

বয়ঃসন্ধিকালীন প্রেমের জটিলতা, অস্থিরতা,জীবন ধ্বংসের অন্যান্য আরোদিক খুব সযত্নে লুকিয়ে  গল্প উপন্যাস মুভি সিরিয়ালে রোমান্টিসিজমের চাদরে মুড়িয়ে খুবই ইতিবাচক  হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রথম ভালোলাগা, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম কাছে আসা, প্রথম স্পর্শ…… সব মিলিয়ে নিদারুণ সুখের এক কমপ্লিট প্যাকেজ।

মেয়েদের উপস্থাপন করা হয় ‘রানী’ হিসবে। ছেলেরা প্রজা,ছেলেরা দাস। কিশোরী,তরুণীদের পটানোর জন্য ছেলেরা পাগলামি করে বেড়াচ্ছে,কবিতা লিখছে, গান বাঁধছে, দূর আকাশের চাঁদটাও চুরি করে আনার প্রতুস্তুতি দিচ্ছে।  শেষমেষ হাঁটু গেড়ে বসে ভালোবাসার কথা জনাচ্ছে।। কিশোর,তরুণদের সকল প্রচেষ্টা, সকল কর্মকাণ্ড ঘরছে কিশোরী, তরুণীদের হৃদয় দখলকে কেন্দ্র করে।

দীর্ঘসময় ধরে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া সম্ভব হলেও এই হাইপার সেক্সুয়ালাইজড সমাজে ঠিক বের হয়ে এসেছে প্রেমের আসল চেহারা, পঁচে,গলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে এর বীভৎস অবস্থা।

আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি পর্নআসক্তি খুব দ্রুত শিশু কিশোরদের বাস্তব  যৌনতার দিকে ঠেলে দেয়। আর  এর ফলে মেয়েদের ওপর তীব্র প্রেসার পড়ে।

কিশোরেরা অন্তরঙ্গতার জন্যে কিশোরীদের চাপ দিতে থাকে। রাজি না হলে কিশোরীদের নিয়ে রসালো মন্তব্য করা হয়, কিশোরীদের পবিত্র থাকার আকুতিকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ঠাট্টা উপহাস করা হয় ।[২৪]

বয়ফ্রেন্ড,গার্লফ্রেন্ডের আবেগ নিয়ে খেলা করে,ব্ল্যাক মেইল করে,‘ তুমি আমাকে যদি সত্যিকারের ভালোবাস তাহলে আমাকে তোমার টপলেস একটা ছবি পাঠাও’। টপলেস ছবি প্রযুক্তির কল্যানে ঘুরতে থাকে অন্য ছেলেদের ফোনেও, ছবি দেখে ফ্যান্টাসীতে ভোগা হয়, করা হয় মাস্টারবেশন। অন্য ছেলেরা এসব ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে।

গার্লফ্রেন্ড বিছানায় যেতে রাজি না হলে কিশোরেরা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।মেয়েরাও অন্য ছেলেদের কাছে পাত্তা পায়না যদিনা তারা তাদের টপলেস ছবি ছেলেদের কাছে না পাঠায়, বা বিছানায় যেতে আগ্রহী হয়। শেষমেশ বাধ্য হয়ে  ছেলেদের প্রস্তাব মেনে নিতে হয়। নিজের শরীর তুলে দিতে হয় ছেলেদের হাতে।

গত ৬০ বছরে ভার্জিনিটি হারানোর বয়স ১৯ থেকে নেমে ১৬ তে এসেছে।“ডলি ম্যাগাজিন” এর তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালে ৫৬% কিশোরকিশোরী মাত্র ১৩-১৫ বছর বয়সেই নিজেদের দেহকে তুলে দিয়েছে অন্যের হাতে। অস্ট্রেলিয়ান এক গবেষণায় দেখা যায়, মেয়েদের জীবনের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা হয়েছে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে।গড় বয়স ছিল ১৪ এর মত।[২৫]সেই সঙ্গে বাড়ছে গর্ভপাতের পরিমাণ। জন্মের ছাড়পত্র না পেয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু যায়গা করে নিচ্ছে রাস্তার ডাস্টবিন আর টয়লেটের কমোডে।বিছানায় বয়ফ্রেন্ডের যেকোন আবদার মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে মেয়েরা- হোক সেটা ওরাল সেক্স বা এনাল সেক্স বা গ্রুপ সেক্সের মতো  বিকৃত যৌনাচার।[২৬,২৭,২৮]

কিশোরদের নিকট এনাল এবং ওরাল সেক্স খুবই জনপ্রিয়। Journal Adolescent Health এ প্রকাশিত গবেষণা থেকে ১৬-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যেই এনাল এবং ওরাল সেক্স সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

১৯৯০ সালে যেখানে প্রতি ১০ জন কিশোরীদের একজনের এনাল সেক্সের অভিজ্ঞতা থাকতো সেখানে বর্তমানে প্রতি ৫ জন কিশোরীদের মধ্যে ১ জনের এনাল সেক্সের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এনাল সেক্সের  এই নাটকীয় উত্থানের জন্য দায়ী পরনোগ্রাফি। [২৯,৩০]

কিশোরী তরুণীরা সাধারনত এনাল বা ওরাল সেক্সের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে, বেশ ব্যাথা পায়,  সচরাচর এগুলো পছন্দ করেনা। কিন্তু বয়ফ্রেন্ডের জোরাজুরিতে এনাল সেক্স বা ওরাল সেক্সে বাধ্য হয়।অনেক সময় ছেলেরা কৌশলের আশ্রয় নেয়, ‘ তুমি এতে রাজি হও, ব্যাথা পাবেনা সিউর, আসলে আমি এরকম করতে চাইনি, ভুলে হয়ে গিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি…   তাদের মাইন্ডসেট এমন হয়ে গিয়েছে এনাল সেক্সে মেয়েরা  ব্যাথা পাচ্ছে তাতে কি, একটু না হয় পেলই, কিন্তু ছেলেরা তো মজা পাচ্ছে, সঙ্গীর জন্য না হয় মেয়েরা একটু কষ্ট করলই , ব্যাথা পেলই।

ছেলেরা এনাল সেক্স  নিয়ে অন্য ছেলেদের সঙ্গে  গর্ব করছে, ‘আমি এতো এতো বার এনাল সেক্স করেছি’ ।[৩১]

 

পর্নআসক্ত কিশোর-তরুণদের সঙ্গে তাল মেলাতে যেয়ে কিশোরী তরুণীদের জীবন ‘ছ্যাড়াব্যাড়া’ করে ফেলেছে। পর্দার পর্নস্টারের মতো দেহ ছাড়া তারা ছেলেদের কাছে পাত্তা পাচ্ছেনা;তুমি উগ্র পোশাক আশাক পড়োনা, তোমার শরীর পর্ন অভিনেত্রীদের মতো না  তার মানে তুমি কুৎসিত, তোমার দিকে কেউ ঘুরেও তাকাবে না।  নিরুপায় হয়ে তারা পর্নস্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। খেয়ে না খেয়ে, ডায়েট পিল খেয়ে, সার্জারি করে পর্নস্টারের মতো হবার চেষ্টা করছে।  এক দশকের একটু বেশি সময়ে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের genital surgery করার প্রবণতা বেড়েছে তিনগুনেরও বেশি।কিশোরী তরুণীরা তাদের নিজেদের শরীরকে ঘৃণা করছে। বাড়ছে প্লাস্টিক সার্জারি, বাড়ছে বক্ষ স্ফীতকরণের পরিমাণ। [৩২]

এনাল সেক্স, ওরাল সেক্সের মাধ্যমে কিশোরীরা  দৈহিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। মলাশয়ের টিস্যু ছিড়ে যাচ্ছে, প্রস্রাব-পায়খানা করার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে, এমনকি তাদের এজন্যে colostomy ব্যাগ (https://en.wikipedia.org/wiki/Colostomy )  ব্যবহার করতে হচ্ছে। ওরাল সেক্সের কারণে HPV ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। গলায় ক্যান্সার হবার কারণে অনেককেই সার্জারির আশ্রয় নিতে হচ্ছে।[৩৩]

কিশোরীরা- তরুণীরা ভুগছে অস্থিরতা,উদ্বিগ্নতা, হতাশা আর বিষণ্ণতায়। বাড়ছে আত্মহত্যার পরিমাণ, ড্রাগ নেওয়া।মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১১-১৩ বছর বয়সী কিশোরীদের মানসিক সমস্যা বেড়ে গেছে বহুগুন যা Journal of Adolescents Health এর বিশেষজ্ঞদেরক পর্যন্ত বিস্মিত করে দিয়েছে।[৩৪]

১৫ বছরের এক কিশোরীকে  তার প্রথম অন্তরঙ্গতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জানতে চাওয়া হয়েছিল তার অভিজ্ঞতা।

নিরীহ মুখে সে জবাব দিয়েছিল ,‘ আমার মনে হয় আমার সঙ্গী ব্যাপারটি উপভোগ করেছে। আমার শরীর ঠিক তেমনটাই ছিল যেমনটা সে আশা করে’! [৩৫]

চিন্তা করুন, একবার পর্নমুভি ভয়াবহতা! পর্নমুভি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যেখানে কিশোরী তরুণীদের অবকাশ নেই নিজের সুখের ব্যাপারে চিন্তা করার। তাদের প্রধান চিন্তা সঙ্গীদের সুখ দেওয়ায়। এই pornified সমাজে কিশোরী, তরুণীরা খুব অল্পদিনেই ধরে ফেলে সমাজের মূল মেসেজটা- ‘তুমি নারী, পৃথিবীতে তোমার আগমন ঘটেছে পুরুষদের সুখ দেওয়ার জন্য, সে তোমাকে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ব্যবহার করবে। তুমি  তোমার নিজের সুখের ব্যাপারে চিন্তা করতে পারবেনা, তোমার সকল চিন্তা ভাবনা আবর্তিত হবে সঙ্গীকে সুখ দেওয়াকে কেন্দ্র করে’।

কিশোরী, তরুণীদের চাওয়া তো খুব বেশি ছিলনা , একজন কেয়ারিং সঙ্গী যে তাকে বুঝতে পারবে, তাকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে রাখবে, যার কাঁধে পরম নির্ভাবনায় মাথা রাখা যাবে!

এই হাইপার সেক্সুয়ালাইজড সমাজ তাদেরকে সুখের স্বপ্ন দেখিয়ে, ভালোবাসার ফানুস উড়াতে ইন্ধন দিয়ে বের করে নিয়ে আসলো ঘরের বাহিরে। ছলে বলে কৌশলে কাপড় খুলিয়ে পরিবেশণ করলো পুরুষের প্লেটে। এক আকাশ স্বাধীনতার প্রলোভন দেখিয়ে  বানিয়ে ফেলল পুরুষের যৌনদাসী!

ছেলেরা যখন থেকে মেয়েদের ‘Slave’ হিসেবে দেখা শুরু করল, যখন থেকে এই সমাজ মেয়েদের ‘যৌনদাসী’ বানিয়ে ফেলল তখন থেকেই মেয়েরা বুঝে ফেলল, তার শরীর তার সম্পদ, এই বিরুদ্ধ পরিবেশে লড়াই করার একমাত্র হাতিয়ার। মেয়েরা তাদের শরীর ব্যবহার শুরু করল, হতে থাকলো লাস্যময়ী যেন যৌবন জ্বালায় বিকারগ্রস্থ ছেলেদের চড়কির মত ঘোরানো যায়! নেওয়া যায় অনেক সুযোগ সুবিধা!

ছেলেদের সামনে  মেয়েরা দাঁড়িয়ে গেল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।

যেই সম্পর্ক ছিল ভালোবাসার, পবিত্রতার, বিশ্বস্ততার, সহযোগিতার সেই সম্পর্ক হয়ে গেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। স্বার্থপরতা, প্রতারণা, ছলাকলার!

(শেষ)

পড়ুনঃ

প্রথম কিস্তি-  https://goo.gl/zwcD4I

দ্বিতীয় কিস্তি- https://goo.gl/2PbcAX

রেফারেন্সঃ

[২৪]https://goo.gl/mHDUch

[২৫] https://goo.gl/V9WTLJ

[২৬] https://goo.gl/uAqsJY

[২৭] https://goo.gl/AByyin

[২৮] https://goo.gl/xEQJnY

[২৯]https://goo.gl/VWBjZq

[৩০] https://goo.gl/4LFC4p

[৩১] Cicely Alice Marston and Ruth Lewis. “Anal Heterosex Among Young People and Implications for Health Promotion: A Qualitative Study in the UK,” BMJ Open 4, no. 8 (2014).

[৩২]https://goo.gl/pk6nSz

[৩৩]https://goo.gl/14p2cN

[৩৪] https://goo.gl/Xy8bzy

[৩৫] https://goo.gl/YpFj7N

শেয়ার করুনঃ