আয় কান্না ঝেঁপে …

আয় কান্না ঝেঁপে …

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

সন্ধ্যার মরে আসে রোদ চিরকাল আমার মন খারাপ করে দেয় । মাঝে মাঝে  সারাদিন ঝুম বৃষ্টি হয়।  সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে টিপ টিপ করে পড়ে বা কখনো সম্পূর্ণ থেমে যায় । ধূসর একটা আলোয় ভরে যায় চারপাশ । কেউ  খেয়াল করে , কেউ করে না ।নারিকেল আর গগনশিরীষের বৃষ্টি ভেজা পাতা সেই ধুসর আলোতেও চিকচিক করে । দূরের আকাশে কালো একটা বিন্দুর মতো সোনালী ডানার চিল ভেসে বেড়ায় । করুন সুরে ডেকে ওঠে মাঝে মাঝে । চিরকাল খামখেয়ালী জীবন যাপন করা আমি উদাস হয়ে যায় । হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ইচ্ছে করে ।

কত বেদনা!

কত বিচ্ছেদ!

কত কথা রাখতে না পারা !

Image result for young man crying in salah

কথা দিয়েছিলাম আমার রব্বকে, ইয়া রব্ব! এবারের মতো মাফ করে দাও । আর কোনদিন একা রুমে ল্যাপটপে বসবনা ।

সেই কথা রাখতে পারিনি বহুবার আমার এই ২৩ বছরের জীবনে ।

বহুবার নির্লজ্জের মতো অন্ধকার জগতটাতে ফিরে গেছি । আর তারপর আক্ষেপের অশ্রু আমাকে ঘুম পাড়িয়েছে। অন্ধকার এত কেন টানে আমায়?

রব্বের কাছে দু’হাত তুলে চেয়েছিলাম, “ইয়া রব্ব! ভালো একটা ভার্সিটিতে  চান্স পাইয়ে দাও”

আমার রব্ব আমাকে নিরাশ করেননি ।

ভার্সিটিতে আসার পর ভুলে গেলাম আমার রব্বকে । বন্ধু, আড্ডা,গান, ফেসবুকিং, চ্যাটিং এর ভীড়ে হারিয়ে ফেললাম আমার রব্বকে ।

আমার রব্ব কিছুই বলেননি আমাকে । কোন শাস্তিও দেননি ।

মনে রঙ লাগার বয়সে মনে ধরেছিল এক বালিকাকে । কালো হরিনী চোখের সেই বালিকা যখন সবুজ ওড়না মাথায় দিয়ে আড়চোখে তাকাতো, আমি তখন অভিকর্ষ বলকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে উড়াল দিতাম আকাশে। ভালোবাসা ছুঁয়ে ফেলতো আকাশ । পৃথিবীর সব সুখ  চলে আসতো আমার দখলে ।

রব্বকে কথা দিয়েছিলাম, কখনো হারাম সম্পর্কে জড়াবো না । হারাম সম্পর্কে জড়ায়নি কখনো সেটা ঠিক , কিন্তু চেষ্টা তো কম করিনি ! রব্ব আমাকে দয়া করে প্রত্যেকবার ফিতনা থেকে বাঁচিয়েছেন ।

দুটো সিজদাহ্‌ কি কখনো দিয়েছি রব্বের এই রহমতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য?

চাইলেই কি রব্ব পারেন না, আমার চোখদুটোর আলো কেড়ে নিতে ?

যে চোখ দিয়ে আমি গোগ্রাসে গিলি এক্সরেটেড মুভি গুলো?

যে চোখ দিয়ে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি বালিকার রাঙ্গা রাজকন্যার মতো মুখটা ?

কোন মুখে দাঁড়াবো আমি আমার রব্বের সামনে, যেদিন আমার চোখ, আমার হাত,আমার পা, আমার কান , আমার ত্বক সাক্ষ্য দিবে আমার বিরুদ্ধে ?  আমাকে এমন আমলনামা পড়তে দেওয়া হবে যেটা্তে আমার করা প্রত্যেকটা কাজ খুটিনাটি সহকারে লিখা আছে ?

সেদিন শুনছিলাম  ইউসুফ (আঃ) এর অসাধারণ কাহিনী । চুড়ান্ত মাত্রার   আল্লাহ্‌ভীতি, পবিত্র থাকার অদম্য ইচ্ছা ! ক্রীতদাস ইউসুফ(আঃ) এর ওপর ক্রাশ খেয়ে ফেললেন তাঁরই মালিকের স্ত্রী । মহিলার অবশ্য করার কিছু  ছিলনা, আল্লাহ্‌,  ইউসুফ (আঃ)কে পৃথিবীর অর্ধেক রূপ যে দিয়েছিলেন । মহিলা,কিভাবে নিজেকে সামলাবে ?  ইউসুফ (আঃ) কে ফাঁদে ফেলার চক্রান্ত আটা শুরু হল । ইউসুফ (আঃ) হাত তুললেন আল্লাহ্‌র কাছে , “ইয়া আল্লাহ্‌ ! এরা আমাকে যেদিকে আহব্বান করে তার চেয়ে কারাগারো আমার অধিক প্রিয়  …’

জুলায়খা, ইউসুফ’র(আঃ) মালিকের স্ত্রী ছিল   সুন্দরী,লাস্যময়ী সেই সঙ্গে তাঁর ওপর প্রভাবশীল।  তারপরেও ইউসুফ (আঃ)  ফিরিয়ে দিয়েছেন জুলায়খাকে । কতভাবেই না ইউসুফ (আঃ) কে প্রলোভন দেখানো হয়েছে । তারপরেও তাঁকে ভুলানো যায়নি ।

আর, আমি সামান্য কোন মেয়ের চাহনিতেই কুপোকাত হয়ে  যায় । জুলায়খাদের এসে আমাকে প্রলোভন দেখাতে হয়না । আমি নিজেই ভার্চুয়াল জুলায়খাদের আড্ডায় হানা দেই । ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকি নীল রঙের সেই জগতটাতে । বাস্তবে উনার মতো অবস্থায় পড়লে কি হাল হতো আমার !

ইউসুফ (আঃ)  তো আমার মতোই রক্ত  মাংসের মানুষ   ছিলেন ।   পুরোপুরি তার মতো হতে নাই’বা পারলাম , কিছুটা যদি হতে পারতাম উনার মতো ! কিছুটা !

জানালার বাহিরের আকাশটা আজ অনেক কালো । মেঘ জমে একাকার  শীতল একটা বাতাসে সজনে গাছের সাদা ফুল গুলো তিরতির করে কাপছে । বোধহয় একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি নামবে  ।

ইশ! আমার বুকের মধ্যেও যদি  অনুতাপের  মেঘ জমতো , অশ্রু হয়ে অঝোরে  ঝরে পড়তো ভারী ভারী  সেই মেঘগুলো ! আমার অন্তর তো কঠিন হয়ে গেছে । অনেক কঠিন । পাথরের চেয়েও কঠিন ।

পাথর ফেটেও তো মাঝে মাঝে ঝরনা বের হয়ে আসে । কিন্ত আমার অন্তর তো আল্লাহর ভয়ে আল্লাহর স্মরনে বিগলিত হয় না । শেষ কবে সলাতে কেঁদেছি  মনে আছে ? শেষ কবে ঐ জঘন্য পাপ কাজটা করার পর জায়নামাজে সিজদাহয় লুটিয়ে পড়ে  ক্ষমা চেয়েছি ?

কতটুকু ভালোবাসেন আল্লাহ আমাদেরকে ? কতটুকু ?

এক মায়ের ছেলে হারিয়ে গিয়েছে । অনেক  খোঁজাখুজির পরেও ছেলেকে পাওয়া গেলনা ।  মায়ের পাগল হতে বাকী । এমন সময়  হারানো ছেলেকে পাওয়া গেল । মা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।  ভালোবাসার অশ্রু তার দুগাল বেয়ে অঝোরে নামছে । রোদ পড়ে চিকচিক করছে মুক্তোর মতো ।  এই মায়ের পক্ষে কি এই অবস্থায় সাত রাজার ধন  এই ছেলেকে  আগুনে ফেলে দেওয়া সম্ভব হবে ?

আল্লাহ আমাদেরকে  এই মায়ের চেয়েও অনেক অনেক গুন বেশি ভালোবাসেন । বাবামার অবাধ্য হলে তাদের কথা না শুনলে, তাদের মনে কষ্ট দিলে সন্তান্দের প্রতি তাদের ভালোবাসায় ভাটা পড়ে যায়

কিন্তু  আল্লাহর ভালোবাসায় কখনো ভাটা পড়ে না । আমি যখন আল্লাহকে   স্মরন করি , আল্লাহও আমাকে  স্মরন করেন । যখন তাকে ভুলে যাই, তার অবাধ্যতা করি তখনো তিনি আমাকে মনে করেন ।  আমার জন্য ক্ষুধার খাদ্য পাঠিয়ে দেন , তৃষনার     পানি  পাঠিয়ে দেন , বুক ভরে   শ্বাস  নিতে দেন মুক্ত  বাতাসে ।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন কখন আমি তাকে ডাকবো । মনের অজান্তেই একবার ইয়া রব্ব বলে ডাক দিলেই তিনি আনন্দিত হয়ে সাড়া দেন – ইয়া আবদি! হে আমার বান্দা বলো , বলো তোমার কি চাই ?

আমি যখন আল্লাহর দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায় আল্লাহ আমার দিকে দশ ধাপ এগিয়ে আসেন , আমি  আল্লাহর দিকে হেঁটে গেলে তিনি দৌড়িয়ে আসেন । আল্লাহ সুযোগ খোঁজেন আমাকে ক্ষমা করে দেবার । অজুর পানির মাধ্যমে তিনি আমার পাপগুলো ঝরিয়ে দেন, দুই সলাতের মাধ্যমে মাঝের সময় গুলোতে করা পাপ গুলো ক্ষমা করে দেন । তিনি রাতে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন দিনের পাপীদের জন্য , আর দিনে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন রাতের পাপীদের জন্য ।

তিনি ঘোষনা দিয়ে রেখেছেন কেউ যদি তার সঙ্গে আকাশ সমান উঁচু পাপ নিয়েও দেখা করে কিন্তু শিরক না করে তাহলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন ।  তারপর তিনি প্রবেশ করাবেন এমন এক জান্নাতে [ http://bit.ly/2eXDZPI ]  যা কোন চোখ দেখেনি , কোন  অন্তর চিন্তাও করেনি ।

[http://bit.ly/2f24Adb]

“হে আমার বান্দাগন ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন । তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুনাময় । [আয-যুমারঃ ৫৩]

আমার সলাত, আমার সিজদাহ, আমার তাসবীহ কোন  কিছুরই কি প্রয়োজন আছে  আল্লাহ’র ?  আমি তো ক্ষুদ্র, অতি  নগন্য এক  সৃষ্টি । এই পৃথিবীর তুলনায় আমি কত ক্ষুদ্র । আমাদের এই পৃথিবীর   তুলনায় সূর্‌য প্রায় তের লক্ষগুন বড় । সূরযের পর আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে  কাছে যে নক্ষত্র রয়েছে  তার নাম Proxima Centauri . পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব প্রায় ৪.৫ আলোক বর্‌ষ ।

আলোর বেগ সবচাইতে বেশী । আলো এক সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলে । আর পৃথিবীথেকে এই আলোরই  Proxima Centauri তে যেতে সময়  লাগবে ৪.৫ বছর । ভাবা যায় কতদূরে আছে Proxima Centauri!

এরকম ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে আমরা যে গ্যালাক্সিতে রয়েছি সেই ‘ মিল্কি ওয়েতে’।  মহাবিশ্বে আবার ১০০ বিলিয়নের মতো গ্যালাক্সি রয়েছে ।  ২০০৪ সালে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন । যার নাম তাঁরা দেন ABEL 135 IR 116 .  এই বাবাজি পৃথিবী থেকে ১৩.২ বিলিয়ন দূরে অবস্থিত ।

আর এই সব কিছুই প্রথম আসমানে  । দ্বিতীয় আসমান প্রথম আসমানের তুলনায় কত বিশাল সেটা ব্যাখ্যা করার জন্য হাদীসে মরুভুমি এবং একটা আংটির কথা বলা হয়েছে । মরুভূমির বিশাল বুকে পড়ে থাকা একটি আংটি মরুভূমির তুলনায় যতটা ক্ষুদ্র । প্রথম আসমান দ্বিতীয় আসমানের তুলনায় ততোটুকুই ক্ষুদ্র । এভাবে  দ্বিতীয় আসমান তৃতীয় আসমানের তুলনায় ক্ষুদ্র , তৃতীয়, চতুর্‌থ আসমানের তুলনায় ক্ষুদ্র । এভাবে চলতে চলতে সপ্তম আসমানে যেয়ে ঠেকে ।

[http://bit.ly/2fpWjUE  ]

সুবহানাল্লাহ্‌! কত বড় এই মহাবিশ্ব । এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণায়, চিপায় চাপায় সবখানে ফিরিশতারা রয়েছেন  আল্লাহকে সিজদাহরত অবস্থায় । আমার সিজদাহ আল্লাহর কি কাজে আসবে ? হাদীসে কুদসীতে এসেছে ,” আল্লাহ বলছেন, “হে  মানুষ এবং জিন! তোমরা শুনে নাও তোমাদের সবাই যদি সবচেয়ে বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি হবে না । যদি তোমরা সবাই সবচেয়ে পাপী হৃদয়ের অধিকারীও হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি হবে না । তোমাদের সবার চাওয়াও যদি পূরন করে দেই, তাহলেও আমার কাছে যা আছে তার কিছুই ফুরাবে না ।

[http://bit.ly/2dQE4XX ]

আমার কোনকিছুরই প্রয়োজন নেই তাঁর। কোনকিছুরই প্রয়োজন নেই । রাজাদের রাজা তিনি, বাদশাহদের বাদশাহ ।  তারপরেও আল্লাহ আমাকে এতোটা ভালোবাসেন , আমাকে ক্ষমা করে দেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকেন, আমার জন্য আরশের ওপর থেকে প্রতি রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন , আমার জন্য জান্নাতে এত এত নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন ।

আর কতকাল  এই আল্লাহর সঙ্গে  দস্যুতা করে বেড়াবো ? আর কতকাল এই  আল্লাহকে ভুলে থাকবো ? আর কতকাল  নিজের নফসের কাছে পরাজিত হব?

আল্লাহর স্মরনে অন্তর বিগলিত হবার সময়  কি এখনো আসে নি  ?

আবু বকর (রাঃ) ছিলেন,  নবীদের (আঃ) পর এই জমীনের বুকে হেঁটে বেড়ানো সবচেয়ে পুন্যবান মানুষ । আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর কাছে বেশ   কয়েকবার জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন তিনি । তারপরেও সলাতে আল্লাহর ভয়ে তিনি কাঁদতেন । উমারের (রাঃ) মতো ক্ষ্যাপাটে লোকও সলাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদতেন । উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তো কাঁদতে কাঁদতে নিজের দাড়ি ভিজিয়ে ফেলতেন । দুইজনেই দুনিয়াতে থাকতে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন ।

আমি কি বিশাল এক পাপী।  সন্ত্রাসী , আল্লাহদ্রোহী । তারপরেও আমার চোখ শুষ্ক ।

অভিশপ্ত আমার দু’চোখ।

অভিশপ্ত ।

উঠো, হে পাপাত্মা উঠে দাঁড়াও তোমার রব্বের সামনে নতমুখে । সব জানেন তিনি , সব । গোপনে রাতের আঁধারে একা একা তুমি যা করেছিলে সব জানেন তিনি । তারপরেও তিনি অপেক্ষা করে আছেন তোমার জন্য ।তিনি তোমাকে তাঁর সামনে নতমুখে দেখতে চান ।  তোমাকে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন । আহ! জান্নাতে ।

হে পাপাত্মা,  উঠে দাঁড়াও । আর একবার তোমার রব্বকে কথা দাও তুমি ভালো হয়ে যাবে । শিশুর মতো অঝোরে কাঁদো , এই চোখের পানি তোমার রব্বের কাছে সব চাইতে প্রিয় ।

কাঁদো হে পাপাত্মা  কাঁদো ।

 

শেয়ার করুনঃ
“তোমরা  কী এমনি এমনি জান্নাতে চলে যাবে ?”

“তোমরা কী এমনি এমনি জান্নাতে চলে যাবে ?”

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

মাঝে মধ্যেই  পুরোনো এক বন্ধু   ফোন  করে  । কুশলাদি জানতে চায় উষ্ণ কন্ঠে । সেদিন দুপুরের দিকে ফোনে  কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। কন্ঠটা একটু  ভার ভার মনে হল। বুঝলাম মন খারাপ। কি হয়েছে জানতে চাইলাম।

বন্ধু যা বলল তার সারমর্ম হল – তার ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই (ছেলে মেয়ে। বন্ধু আমার ততোটা প্র্যাক্টিসিং না ) কমবেশি ভালবাসার জোয়ারে গা ভাসিয়েছে  ।  রেস্টুরেন্টের আলো আঁধারিতে হাত সাফাই,  পার্কে “বাদাম খাওয়” বা রিকশায় “বাতাস ”   খাওয়া এসব ওরা নিয়মিতই করে বেড়ায় ।    মাঝে মাঝে   ভালবাসার সম্পর্ককে  চাঙ্গা করতে কেউ কেউ হয়তো  লিটনের ফ্ল্যাট থেকেও ঘুরে  আসে । এরকম অস্থির পরিবেশে  থাকা  সত্ত্বেও বন্ধুর গায়ে অশ্লীলতার  বাতাস সেরকম লাগেনি । এরকম  পরিবেশে সে কতদিন  ভালো থাকতে পারবে সে জানে না। ভার্সিটি লাইফের একেবারে শেষে এসে তার পক্ষে  ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে বের হয়ে যাওয়াও সম্ভব না ; গ্রুপ স্টাডি করে একসঙ্গে ।    আমার কাছে জানতে চাইলো  এখন সে কী করবে ?  চুপ করেই থাকলাম । কিই’বা বলার আছে আমার ?  এই দেশে এই সময়   এই প্রশ্নের  যে কোন উত্তর নেই।

বুকের একেবারে গভীর থেকে উঠে আসা বড় বড় দীর্ঘশ্বাস গুলোর আড়ালে সে  চেষ্টা করছিল তার কষ্ট গুলো লুকিয়ে রাখার । কিন্তু পারলো কই?  সে শুধু একা নয় , তারমতো অনেকেই  চারপাশের সস্তা ভালোবাসার ছড়াছড়ির মাঝেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ চায়, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো  একা একা লড়ে যায় এই হাইপার সেক্সুয়ালাইজড সমাজটার বিরুদ্ধে । তাদের পবিত্র থাকার আকুতিগুলো , হৃদয়ের আর্তনাদগুলো চারদেয়ালের মাঝেই থমকে যায় । ভোগবাদের জোয়ারে গা ভাসানো এই সমাজটার  সময় নেই এই ছেলেগুলোর কষ্টগুলো বুঝতে চেষ্টা করার , আর্তনাদগুলো শোনার । কিন্তু পরম করুণাময়  সাত আসমানের উপর থেকে নিশ্চয়ই দেখেন এই ছেলেগুলোর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ । সিজদাতে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসানো এই ছেলেগুলোর চোখের পানির  প্রতিদান  একদিন নিশ্চয়ই  তিনি দিবেন। ইনশা আল্লাহ ।

এই হৃদয়হীন সমাজটা এই ছেলেদের কষ্টগুলো না বুঝুক , আল্লাহ (সুবঃ) অবশ্যই বোঝেন এই ছেলেদের কষ্ট গুলো ।এই ছেলেগুলো তাঁরই উপর ভরসা করে এবং তাঁর কাছেই  প্রতিদান আশা করে । আর যে ব্যক্তি আল্লাহ’র (সুবঃ) ওপর ভরসা করে তাঁর জন্য তিনিই যথেষ্ট।

এক  ভাইয়ের সঙ্গে একবার কথা হচ্ছিল ঈদের দিন কে কীভাবে মজা করে এইগুলো নিয়ে।আমাদের জেনারেশনের ছেলেমেয়ে  কোন একটা উপলক্ষ পেলেই হয় – সেটাকে ভ্যালেন্টাইনডে বানিয়ে ফেলতে ভুল করে না ।  ভাই বলছিলেন – ঈদের বিকেলে রিকশায় জোড়ায় জোয়ায় কপোত কপোতী  দেখে  ভীষণ  মন খারাপ হয়ে যায় তাঁর । আমাকে  জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে না , ভেতরটা   ফাঁকা ফাঁকা লাগে না’?

আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ ভাই। চারপাশের এইসব সস্তা ভালোবাসার ছড়াছড়ি দেখে ভেতরটা খাঁ খাঁ করে একজনের জন্য ।

ভাইকে সেদিন বলা হয়নি  এই একাকী থাকার জন্য আমার যতটা না খারাপ লাগে তারচেয়েও বেশি খারাপ লাগে  আল্লাহর ঐসব অবুঝ  বান্দার জন্য, যারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে একটা হারাম রিলেশানে জড়িয়ে আছে , বিনোদনের নামে পর্নমুভি,আইটেমসং এই টাইপের জিনিসগুলো  নিয়মিত দেখছে । ফেসবুকে নামীদামি রেস্তোরায় চেকইন, জানুপাই , বেবীপাই , কুট্টুস ক্যাপশনের কাপল সেলফি  দেখে  মনে হতে পারে  এরা বোধহয় বেশ সুখেই আছে । শান্তিতে আছে । আসলে এদের মনে  এতটুকুও শান্তি নেই । বাবা মার হাতে  ফোনে কথা বলতে যেয়ে ধরা পড়ে  যাবার টেনশন , বিএফ জিএফের সাথে নিয়মিত দেখা করার ঝামেলা , রেস্টুরেন্ট বিল , এই সেই হাবিজাবি নিয়ে এদের প্রচুর টেনশানে থাকতে  হয় । আল্লাহ’র (সুবঃ) আইনকে অমান্য করার জন্য  আল্লাহ এদের অন্তর অশান্ত করে দেন । আর বিয়ের পরে তাদের সংসারে শুরু হয় আরো অশান্তি ।

এই সব অবুঝ ভাইবোনেরা যদি জানতো  হারাম রিলেশান থেকে দূরে থাকা ভাইবোনদের অন্তর গুলো কতটা শান্ত! আল্লাহ কি পরিমান সকীনা ঢেলে দিয়েছেন সেই ভাইটির অন্তরে যিনি রাস্তায় চলাফেরা করার  সময় শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে চোখের হেফাজত করেন! তারা যদি উপলব্ধি করতে পারতো  সেই বোনটির অন্তরের প্রশান্তি   যিনি শীতের গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে তাঁর রবের সিজদাতে যেয়ে দু’আ করেন – তার রব যেন তাকে এমন একজন জীবন সঙ্গী দান করেন  যিনি তাঁর চোখ শীতল করবেন।

ফিতনায় ভরপুর এই যুগে নিজের নফসকে সংযত করা বড় কঠিন ভাই । আমরা বোধহয় সেই সময়ে চলে এসেছি যখন  রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সুন্নাহ অনুসরণ করা হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার নিয়ে থাকার চেয়েও বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে ।  চারপাশের সব কিছুই ভেতরের প্রবৃত্তির  আগুন জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট । বিল বোর্ড, বিজ্ঞাপন , নাটক, সিরিয়াল, মুভি , পত্রিকা সব কিছুতেই নগ্নতা আর বেহায়াপনার বিচরণ । শয়তান তার সকল হাতিয়ার  ব্যবহার করে আমাদের সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাতে চাচ্ছে এবং তাতে সে সফলও । সমাজের বেশিরভাগ মানুষই তার ফাঁদে পা দিয়েছে । তাই  বলে তুমি ,আমিও কি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাব?

ভাই, হারাম রিলেশান জিনিসটা শয়তান আমাদের কাছে শেয়ারিং, কেয়ারিং , রোমান্টিসজমের প্যাকেজ বানিয়ে অনেক আকর্ষণীয় ভাবে উপস্থাপন করে । বিয়েকে কঠিন করে ফেলা  এবং ব্যাভিচারকে সহজলভ্য করে ফেলা এই সমাজে শয়তানের এই প্যাকেজ ফিরিয়ে দেওয়া অনেক অনেক কষ্টকর। সিরিয়াল, পর্নমুভি,আইটেম সং এর বিনোদন থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে রাখাও তো অনেক কষ্টকর । কিন্তু তোমার আমার এই কষ্ট কী বিলাল ইবনে রাবাহ (আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোক) এর কষ্টের চেয়েও বেশি যাকে মরুভূমির  উত্তপ্ত বালুতে খালি গায়ে শুইয়ে রেখে তাঁর ওপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে রাখা হতো ? তোমার আমার এই কষ্ট কী মুসআব ইবনে উমাইর (আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোক) চেয়েও বেশি যিনি মক্কার সবচেয়ে ড্যাম স্মার্ট , সুদর্শন, ধনী আদরের দুলাল ছিলেন , কিন্তু ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল । পেছনে ফেলে আসতে হয়েছিল বিপুল ঐশ্বর্য আর বিলাসিতার জীবন। অনাহারে অর্ধাহারে অপুষ্টিতে তার গায়ের চামড়া এমনভাবে উঠে গিয়েছিল যেমন সাপ তার খোলস পরিবর্তন করে। সাহাবীগন (রাঃ) জীর্ণ পোশাকের মুস’আবকে (রাঃ) দেখে চোখের পানি আটকাতে পারতেননা। ভাই তাঁরাও তো আমাদের মতোই রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন । তাঁরা যদি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সাঃ) এর জন্য এতোটা কষ্ট করতে পারেন ,  ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন , তাহলে আমরা কেন এতটুকু কষ্ট করতে পারবো না ? আমরা কি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি না ? না কি শুধু মুখেই দাবি করি ?

ভাই , তুমি আমি কি চাই না জান্নাতের স্ত্রীকে নিয়ে খালিপায়ে সবুজ ঘাসের চাদরে হেঁটে বেড়াতে ,  অলস দুপরে নারিকেল বীথিতে বসে সমুদ্রের ঐ নীল জলরাশির দিকে চেয়ে  থাকতে ? তোমার কাঁধে তোমার প্রবাল ও পদ্মরাগ সদৃশ  জান্নাতী স্ত্রী মাথা এলিয়ে দিয়ে আছে , মাতাল বাতাসে তোমার জান্নাতী স্ত্রীর চুল এলোমেলো হয়ে তোমার  চোখ মুখে এসে পড়ছে , প্রাণভরে নিচ্ছো তুমি তাঁর চুলের সুবাস। যতবার তোমার স্ত্রী হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে যাচ্ছে , ততবার  তাঁকে আগের বারের চেয়ে বেশি সুন্দরী মনে হচ্ছে , তাঁর মুখটার দিকে তাকিয়ে তুমি  নতুন করে তাঁর প্রেমে পড়ে যাচ্ছ ততবার।

এইগুলো কি এমনি এমনি পেয়ে যাব তুমি , আমি ? এর জন্য কষ্ট করতে হবে না ? ভালো জিনিস কি কেউ এমনি এমনি দেয়?  জান্নাতের স্ত্রীদের জন্য মোহরানার ব্যবস্থা করতে হবে না ?

“……তোমরা কি মনে করে নিয়েছ তোমরা এমনি এমনি বেহেশতে চলে যাবে ?

অথচ পূর্ববর্তী নবীদের অনূসারীদের মতো কিছুই তোমাদের উপর এখনো নাযিল হয়নি । তাদের উপর বহু ধরণের বিপর্যয় ও সংকট এসেছে , কঠোর নির্যাতনে তারা নির্যাতিত হয়েছে, কঠিন নিপীড়িত তারা শিহরিত হয়ে উঠেছেন , এমন কি স্বয়ং আল্লাহ্‌র নবী ও তার সঙ্গী সাথীরা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে এই বলে আর্তনাদ করে  উঠেছে , আল্লাহ্‌র সাহায্য কবে আসবে ? অবশ্যই আল্লাহ্‌র সাহায্য অতি নিকটে ।

সূরা বাকারা -২১৪

ভাই,আমাদের রব আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন এই দুনিয়াতে । যাতে তিনি আমাদের পবিত্র করতে পারেন আমাদের পাপ থেকে ,  হাশরের ময়দানে আমাদের স্থান দিতে পারেন তাঁর আরশের ছায়ায় , কাউসার থেকে পানি পান করাতে পারেন , তাঁর দীদার দিয়ে আমাদের মানব জন্ম সার্থক করতে পারেন । তাই ভাই , দুনিয়ার এই ফিতনা, এই পরীক্ষায় হিম্মত হারিয়ে ফেললে হবে না । আল্লাহ্‌র ওপর তাওয়াক্কুল করে , তাঁর  নিকটে অনবরত  সাহায্য চেয়ে আমাদের কোমরবেঁধে লাগতে হবে এই পরীক্ষা উৎরানোর জন্য ।  আমাদের মঞ্জিল ভাই এই বয়ফ্রেন্ড , গার্ল ফ্রেন্ডের দুদিনের রিলেশান না , জিনা , ব্যভিচারের সাময়িক ফুর্তি না , আমাদের মঞ্জিল জান্নাত ।  জান্নাতে এক মুহূর্ত কাটানোর পর ভাই তুমি ভুলে যাবে দুনিয়ার এখনকার এই  দুঃখ, কষ্ট গুলো ।

চলোনা এই জীবনের এই সাময়িক দুঃখ , কষ্ট গুলো সিজদাতে লুটিয়ে পড়ে চোখের পানিতে  সমর্পণ করি আমাদের রবের কাছে  ।

“ …….আমি তো আমার অসহনীয় যন্ত্রণা, আমার দুশ্চিন্তা আল্লাহ্‌র কাছেই নিবেদন করি ”

(সূরা-১২, আয়াত ৮৬)

পড়তে পারেন-  শান্তি পাব কোথায় গিয়ে ?

শেয়ার করুনঃ
কাছে আসার গল্প ……

কাছে আসার গল্প ……

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

‘Love at first sight’ বলে ইংরেজিতে একটা কথা আছে। সোজা বাংলায় প্রথম দেখায় কিছু চিন্তা না করেই প্রেমে পড়া। ছেলেটার ঠিক তাই হলো। সে প্রথম দেখায় ক্রাশ খেল। অবশ্য ক্রাশ খাবার কারণ কিন্তু যথেষ্ট। কোমর পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুলের অধিকারী মেয়েটা যখন সামনে দিয়ে হেঁটে যায় তখন তার উপর থেকে চোখ ফেরানো বেশ কষ্টসাধ্য। ছেলেটা হঠাৎ আবিষ্কার করে এই একজন সামনে আসলেই সে প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে যায়,হার্ট খুব দ্রুত বিট করা শুরু করে,এমনকি নার্ভাসনেসের কারণে তার হাঁটুও কাঁপতে থাকে।

ছেলেটা তাই বুঝতে পারল এই মেয়েকে ছাড়া তার পক্ষে বাঁচতে পারা সম্ভব না। যে করে হোক তার তাকে পেতেই হবে । অনেক কষ্টে সে মেয়েটার ফোন নাম্বার জোগাড় করে। চেষ্টা করে মেয়েটার হৃদয়ে একটু হলেও জায়গা করে নিতে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই রাজী হয় না।কিছু সময় চলে যায়-এক মাস,দুই মাস,তিন মাস। মানবচরিত্রের আজন্ম প্রকৃতি একসময় তাদেরকে একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য করে। জীবন সম্পর্কে প্রচন্ড উদাসীন ছেলেটা হঠাৎই জীবনে নতুন এক প্রেরণা খুঁজে পায়। অসম্ভব শান্তি লাগে তার অপরপাশে মিষ্টি একটা গলা শুনতে পেরে।সারা রাত কথা বলার পরেও তার মনে হয় রাতটা এতো দ্রুত শেষ হয়ে গেলো কেন?

আবারো কিছু সময় খুব দ্রুতই কেটে যায়। ১-২-৩ বছর। এরপর ছেলেটা হঠাৎ করে আবিষ্কার করে আকর্ষণে কেন যেন ভাটা পড়ে গেছে। আগের মত আর তার মেয়েটাকে দেখলে হার্ট দ্রুত বিট করে না, হৃদয়ের সেই প্রশান্তিও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মেয়েটাও বুঝতে পারে সবকিছু আগের মত নেই।মনোমালিন্য শুরু হয়, একসময় সবকিছু শেষ হয়ে যায়।খুব বিষন্ন কিছু দিন কাটে।

তারপর?

তারপর আবার ছেলেটার চোখে নতুন কাউকে ভালো লাগতে শুরু করে।

তারপর আবার…………………।”

আমাদের চারপাশে হওয়া প্রায় ৯০ ভাগ বিয়ে-পূর্ববর্তী রিলেশনের একটা কমন গল্প বলার চেষ্টা করলাম এতোক্ষণ। বেশির ভাগ সময়েই সম্পর্কগুলো বিয়ে পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না। আর বিয়ে পর্যন্ত গড়ালেও আবেগের সাথে সাথে যখন সীমাহীন দায়িত্ব এসে ভর করে,তখন আবেগগুলো ফিকে হওয়া শুরু করে। ‘একে অপরকে পুরোপুরি বুঝতে পারে’ এমন দাবি করা প্রেমিকযুগল বিয়ের পর আবিষ্কার করে সম্পূর্ণ নতুন আরেকজনকে। এ কারণেই হয়তো ‘love marriage’ গুলোতে ‘rate of divorce’ অস্বাভাবিক রকমের বেশি। কারণ,এ বিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়নি,তাই এতে আল্লাহর কোন রহমত থাকে না। প্রথম প্রেম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পাশে থাকার যে ফ্যান্টাসি সমকালীন সাহিত্যে দেখনো হয় তা কেবল উপন্যাস কিংবা রূপালী পর্দাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।‘ কাছে আসার গল্প’ গুলোতে দূরে সরে যাবার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। তাই আজ আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কাছে আসার গল্প বলব……

আমাদের গল্পের নায়ক মুহম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ(সাঃ)। ধীর-স্থির যুবক। চাচার ঘরে মানুষ হয়েছেন। সমাজের কুলষতা থেকে দূরে নির্জনে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। প্রচন্ড সৎ ও সত্যবাদী হবার কারণে সবাই তাকে আল-আমিন নামে ডাকে। সম্ভবত এ কারণেই তিনি সে সময়ের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যবসায়ী খাদিজা(রাঃ) এর চোখে পড়েন। তিনি মুহম্মদ(সাঃ) কে তার হয়ে ব্যবসা করার জন্য প্রস্তাব পাঠান-

“একজন সৎ ও সত্যবাদী মানুষের বড় প্রয়োজন আমার।আপনার আল-আমীন খ্যাতি আমাকে আকৃষ্ট করেছে আপনার প্রতি। যদি এ বিশ্বাসের মর্যাদা আপনি রক্ষা করেন এবং আমার ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাহলে সন্তুষ্টচিত্তে আমি দ্বিগুণ লভ্যাংশ দিতে রাজী। এ প্রস্তাব মনঃপুত হলে আমি আপনাকে স্বাগত জানাই।” [১]

মুহম্মদ(সঃ) এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। তিনি খাদিজা(রাঃ) এর দাস মাইসরাহ ও পণ্যসামগ্রী নিয়ে সিরিয়ার পথে রওনা দিলেন। সিরিয়ায় পৌছে তিনি গির্জার কাছে এক গাছে বিশ্রাম নিলেন। তখন গির্জা থেকে এক পাদ্রী বের হয়ে মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করল,“গাছটির নিচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছে উনি কে?” মাইসরাহ বললেন, “তিনি হারামের অধিবাসী”। পাদ্রী বলল, “এই গাছে নবী ছাড়া আর কেউ কখনো বিশ্রাম নেয়নি।” [২]

পাদ্রীর এই কথাটি সিরিয়া থেকে ফিরে মাইসারাহ খাদিজা(রাঃ) কে অবহিত করেন। ঘটনাটি খাদিজার(রাঃ) মনে দাগ কাটে। তিনি তার চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফলকে,যিনি ছিলেন সে সময় তাওরাত ও ইঞ্জিলের একজন বিজ্ঞ পন্ডিত, পাদ্রীর কথাটি জানান।সব শুনে ওরাকা বললেন,

“যদি এ ঘটনাগুলো সত্য হয় তবে অবশ্যই মুহম্মদ এ উম্মতের নবী । আর আমি ভালোভাবেই জানি আমরা যার অপেক্ষা করছি, তার সময় খুব কাছেই।” [৩]

ওরাকার এ কথা খাদিজা(রাঃ) কে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। এদিকে ব্যবসাতেও মুহম্মদ(সাঃ) রেকর্ড পরিমাণ লাভ করে আসেন। মুহম্মদ(সাঃ) এর সততা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি মুহম্মদ(সাঃ) কি বিয়ে করতে আগ্রহবোধ করেন। বাংলাদেশের কিছু বিজ্ঞানমনষ্ক(!) লেখকরা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে,রাসূল(সাঃ) সম্পদের লোভে খাদিজা(রাঃ) কে বিয়ে করেছিলেন। অজ্ঞ(নাকি মিথ্যুক?) লোকগুলো এ কথা কখনোই বলবে না যে,ব্যবসা এবং বিয়ের প্রস্তাব কিন্তু খাদিজা(রাঃ) স্বয়ং রাসূল(সাঃ) কে দিয়েছিলেন। মুহম্মদ(সাঃ) চাচা আবু তালিবের সাথে পরামর্শ করে বিয়েতে রাজী হন। তখন তার বয়স ছিল ২৫ আর খাদিজা(রাঃ) এর বয়স ছিল চল্লিশ।তাদের বিয়েতে আবু তালিব খুতবা পাঠ করেন। [৪]

বিয়ের পরে কি খাদিজা(রাঃ) এর মোহ কাটতে শুরু করেছিল? না,ঘটনাটি আমাদের বর্তমান সময়ের মত এগোয়নি। বরং তার মুগ্ধতা বহুগুণে বেড়েছিল। মুহম্মদ(সাঃ) খাদিজা(রাঃ) এর সম্পদের কোন অপব্যবহার না করে আগেরমতই সাদা-সিধে জীবন-যাপন করতে থাকেন। বিয়ের পর মুহম্মদ(সাঃ) সম্পর্কে খাদিজা(রাঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি নব্যুওতের ঘটনা থেকে। মুহম্মদ(সাঃ) যখন প্রথম ওহী প্রাপ্ত হন এবং জীবনের আশংকা করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে প্রবেশ করেন,তখন খাদিজা(রাঃ) তাকে বস্ত্রাবৃত করে আত্নবিশ্বাসের সাথে বলেন,

“অসম্ভব! আপনাকে কখনো আল্লাহ তা’আলা অপমান করবেন না।আপনি আত্নীয়-স্বজনের হক আদায় করেন।বিপদগ্রস্থ লোকদের সাহায্য করেন।মেহমানদারী ও সত্যের পথে বিপদাপদে সহায়তা করেন।”[৫]

রাসূল(সাঃ) আর খাদিজা(রাঃ) এতোটাই পরিপূরক ছিলেন যে তার জীবদ্দশায় তিনি দ্বিতীয় কোন বিয়ে করেননি।ইবরাহীম ব্যতীত রাসূল(সাঃ) এর সকল-সন্ততি খাদিজা(রাঃ) এর গর্ভেই হয়েছিল।খাদিজা(রাঃ) এর মৃত্যু রাসূল(সাঃ) কে এতোটাই ব্যথিত করে যে তিনি যে বছর মারা যান সে বছরকে সীরাতকাররা “দুঃখ ও বিষন্নতার বছর” নামে অভিহিত করেছেন।[৬]

রাসূল(সাঃ) এর ভালবাসাও আমাদের ভালবাসার মত ঠুনকো ছিল না। তাই মৃত্যুর পরেই তা শেষ হয়ে যায়নি।পরবর্তীতে দ্বীনের স্বার্থে ও ওহীর ইশারায় তিনি বেশ কয়েকটি বিয়েতে আবদ্ধ হন,কিন্তু খাদিজা(রাঃ) সবসময়ই তার স্মৃতিতে অমলিন ছিলেন।

খাদিজা(রাঃ) এর মৃত্যুর পর একবার তার বোন হালাহ(রাঃ) রাসূল(সাঃ) এর সাথে দেখা করতে আসেন এবং ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন।তার কণ্ঠস্বর ছিল অনেকটা খাদিজা(রাঃ) এর মতই। সে স্বর শুনতে পেরেই রাসূল(সাঃ) এর খাদিজা(রাঃ) এর কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন, “হালাহ হবে হয়তো”। হযরত আয়েশা(রাঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ কথা শুনে তার মনে ঈর্ষার উদয় হলো। তিনি বললেন, ‘আপনি এখনো সে বৃদ্ধার কথা মনে করেন,তার এমনি প্রশংসা করেন,আল্লাহ যে আপনাকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দিয়েছেন। এ কথা শুনে রাসূল(সাঃ) খুব রাগ করে বললেন, “আল্লাহর শপথ ! আল্লাহতায়ালা আমাকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দেননি । মানুষ যখন আমার উপর ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল তখন সে আমার উপর ঈমান এনেছিল। যখন সবাই আমাকে মিথ্যুক বলেছে,তখন সে আমাকে সত্যবাদী বলেছে।” [৭]

নবী(সাঃ) যখনই কোন ছাগল জবাই করতেন তখন খাদিজা(রাঃ) এর ভালবাসার স্মরণে সে ছাগলের গোশত তার বান্ধবীদের উপহারস্বরূপ পাঠীয়ে দিতেন। [৮]

বদর যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে ছিলেন রাসূল(সাঃ) এর জামাতা আবুল আস। তিনি রাসূল(সাঃ) এর কন্যা যয়নাবের স্বামী ছিলেন। মুসলমানগণ যখন বন্দীদের মুক্তির জন্য পণ পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন,তখন যয়নাব নিজ গলার হার স্বামীর মুক্তির জন্য পাঠিয়ে দেন। এ হার খাদিজা(রাঃ) যয়নাবের বিয়ের সময় নিজের গলা থেকে খুলে দিয়েছিলেন। রাসূল(সাঃ) এ হার দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। তার চোখ পানিতে ভিজে গেল। তিনি সাহাবীদের বললেন, “তোমরা যদি রাজী থাক,তাহলে এই হার ফিরিয়ে দাও এবং বন্দীকে পণ ব্যতীতই বন্দীকে মুক্ত করে দাও।” [৯]

আমাদের বর্তমান সময়ে বিয়ের একটা প্রধান কারণ থাকে সাময়িক মোহ ও উদ্দাম যৌনতা। ৪০ বছরের একজন প্রৌঢ়ের সাথে ২৫ বছরের এক যুবকের বিয়েতে এসবের কিছুই ছিল না। ছিল আল্লাহর জন্য ভালবাসা এবং পারষ্পরিক চিরস্থায়ী মুগ্ধতা। তাহিরা [১০] ও আল-আমিনের ভালবাসা তাই একজনের মৃত্যুতেই শেষ হয়ে যায়নি।

আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ভালবাসা ‘আনা উহিব্বুকি’(I love you) তেই শেষ হয়ে যায়,সেখানে ‘ফিল্লাহি’(for Allah) কথাটি থাকে না। মহান আল্লাহতায়ালা এসব চোখ-ধাধানো কিন্তু অন্তসারশুন্য প্রেম-ভালবাসা থেকে আমাদের দূরে রাখুক।

কিশোর বয়সে আমি মনে করতাম হুজুরদের জীবন ভালবাসাশুন্য,প্রেমহীন। কিন্তু এখন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ও পবিত্রতম ‘লাভ স্টোরি’ হুজুররাই লিখে গিয়েছে। আমরা বর্তমান প্রজন্ম স্বল্প আলোতে চোখ ধাধিয়ে অধিক আলোতে অন্ধ হয়ে যাই ।এ কারণেই হয়তো রোমিও-জুলিয়েট নিয়ে হাহাকার করা প্রজন্ম খাদিজা(রাঃ)-মুহম্মদ(সাঃ) সম্পর্কে কিছুই জানে না।

মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সেই পবিত্র ভালোবাসার সাথে যুক্ত করুক,যে ভালোবাসাতে সততার মুগ্ধতা থাকবে,থাকবে বিপদে আশার বাণী,যে ভালবাসার কন্ঠস্বর মৃত্যুর পরেও আবেগতাড়িত করে।

যে ভালবাসার কারণেই স্ত্রী গভীর রাতে একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য স্বামীর মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়,অসম্ভব সুন্দর একটা তারাভরা রাতে গভীর মমতায় আদ্র এক কন্ঠ বলে উঠে-

আনা উহিব্বুকি ফিল্লাহ

(লিখেছেন শিহাব আহমেদ তুহিন । আল্লাহ (সুবঃ) লেখককে উত্তম  প্রতিদান দান করুক । আমীন)

পড়তে পারেন –

১) তোমরা কি এমনি এমনি জান্নাতে চলে যাবে ? http://lostmodesty.blogspot.com/2016/01/blog-post_25.html

২) ১০৮ টি নীলপদ্ম http://lostmodesty.blogspot.com/2015/08/blog-post.html

………………………………………………………………

পরিশিষ্টঃ

[১]তোমাকে ভালবাসি হে নবী-গুরুদত্ত সিং,পৃ-৩১

[২]সীরাত ইবনে হিশাম[বাংলা],পৃ-৪৭

[৩]উযনুল আসার,খন্ড ১,পৃ-৫

[৪]সীরাতে মোস্তফা[বাংলা]-মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী,পৃ-১০৩

[৫]সীরাতুল হাবীব-সাইফুদ্দিন বেলাল

[৬]আর রাহেকুল মাখতুম(বাংলা),পৃ-১৩০

[৭]সাহাবী চরিত-মাওলানা যাকারিয়া(রহঃ)

[৮]মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-আব্দুল হামিদ মাদানি

[৯]সীরাতে মোস্তফা[বাংলা]-মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী,পৃ-৩৬৮

[১০]তাহিরা অর্থ পবিত্র।এটি খাদিজা(রাঃ) এর উপনাম ছিল।

শেয়ার করুনঃ
‘ফাগুনের দিন শেষ হবে একদিন’(প্রথম পর্ব)

‘ফাগুনের দিন শেষ হবে একদিন’(প্রথম পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

.

এই স্বাধীনতা চেয়েছিলে বুঝি ? ভালোবাসার প্রতিদান বুঝি এভাবে দিতে হয়? বহুতল ভবনের ফুটপাতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা, থ্যাঁতলানো শরীর,খুলি ফেটে চৌচির,মগজ এদিক সেদিক ছড়ানো?

পাখির মতো উড়তে ইচ্ছে করতো তোমার, ভালবাসতে ঐ নীল আকাশ আর একদুপুর স্বাধীনতা। দশতলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলে যখন,তখনো কি ভালোবেসেছিলে ঐ আকাশ? মিটেছিলো কি ডানা মেলে উড়বার সাধ?

.

শুরুটা হয়েছিল ফাগুনেরদিনে। কি ছিল না সেদিন? প্রহর শেষের রাঙা আলো,বাতাসে মাতাল সুবাস। প্রেমে পড়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত দিন আর হয়না। প্রেমে পড়লে তুমি, প্রেমে পড়লে প্রথম এবং শেষবারের মতো। সেদিন কেউ কি জানতো মায়াবী এই ফাগুনের ক্ষণ  কি কাল হয়ে দাঁড়াবে তোমার জন্য।

.

এরও কিছুদিন আগে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বাইক তোমাকে কিনে দেওয়া হল।বাইকের জন্য কতো পাগলামিই না তুমি করেছো! দিনের পর দিন ভাত খাওনি,মায়ের  সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছো, ভাইয়া যখন বোঝাতে গিয়েছে,‘ আরেকটু বড় হ! তারপর বাবা তোকে বাইক কিনে দেবেন। বাবার ওপর এখনি অতো চাপ দিসনা। টানাটানির সংসার …’ ভাইয়াকে নিজের চরকায় তেল দিতে বলেছো তুমি। বাবার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে রেখেছিলে।

.

বাইকের পেছনে তোমার জানের জিগরি দোস্তকে বসিয়ে রাউন্ড দিচ্ছিলে তুমি সেদিন। হঠাৎ করেই তোমার চোখ পড়লো তার ওপর; তোমার হলুদ বসন্ত পাখি।কলেজের ইউনিফর্ম পড়া, ওড়নাটা প্যাঁচ লেগেছে রিকশার হুডের সঙ্গে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে প্যাঁচ খোলার কিন্তু প্যাঁচ খুলছেনা। ছোটোখাটো একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। রিকশার টুংটাং, সিএনজির হর্ন তাড়া দিচ্ছে। সে একবার প্যাঁচ খোলার চেষ্টা করে আর একবার জ্যামের দিকে চেয়ে বিব্রত হাসি দেয়। সেই হাসি দেখে তোমার একটা হার্টবিট মিস হলো। তুমি প্রেমে পড়লে!

.

তাহসান গান আর নাটকে তোমাকে প্রেম করা শেখালো। আরো কতো কিছু শিখলে তুমি! রাত জেগে ফোনে কথা বলা, বাবার পকেট কাটা, মায়ের কাছে মিথ্যে বলা,ক্লাস ফাঁকি দেওয়া। হাল ফ্যাশনের হেয়ারকাট,ছেঁড়া জিন্স,হাতে বালা- পুরুষ হতে চাইবার তোমার কতো চেষ্টা! হররোজ তোমার হলুদ বসন্ত পাখিকে বাইকের পেছনে বসিয়ে স্পিডোমিটারের কাটা  ছোঁয়াতে লাগলে তুমি নব্বুই এর ঘরে। ভাবতে লাগলে- জীবন তো এটাই , এইতো স্বাধীনতা, এইতো দু’ডানা মেলে আকাশে ওড়া, এইতো হলুদ বসন্ত সুখ!

.

এরপর আসলো রুদ্রঝড়। সেই ঝড়ে অচিন হয়ে গেল তোমার হলুদ বসন্ত পাখি। একদিন তোমার যে হাত তুমি রাখতে চেয়েছিলে আরেকটা নরম মেহেদি রাঙা হাতের ওপর, তোমার শীতার্ত হৃদয় ভালোবাসার উষ্ণতা শুষে নিতে চেয়েছিল,সেই হাতেই তুমি খুলতে শুরু করলে ফেন্সিডিলের বোতল। গাঁজা,হিরোইন কিছুই বাদ দিলেনা। চুলে জট বাঁধলো, তোমার গা দিয়ে দুর্গন্ধ বের হতে লাগলো। আজীবন ফার্স্ট হয়ে আসা তুমি ফেইল করলে এক সাবজেক্টে। তোমার বাবা অফিসে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটেও রাতে ঘুমাতে পারেননা তোমার চিন্তায়। ভাবেন, ‘কি ভুল ছিল আমার’? মা নীরবে চোখের পানি ফেলেন। আহা! জনমদুঃখী মা।

.

তারপর যেদিন তুমি শুনলে তোমার হলুদ বসন্ত পাখি,এক বাজপাখির  সঙ্গে উড়াল দিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, সেদিন কঠিন সে সিদ্ধান্তটা নিলে তুমি। গাঁজার কল্কিতে শেষ সুখটান দিলে। তারপর একে একে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসলে দশতালার ছাদে। পাখির মতো মেলে ধরলে দু হাত । তোমার সামনে  ইট,কাঠ, পাথরের এক শহুরে আকাশ আর  এক শহুরে মুক্তি। চিরকুটটা চাপা পড়ে রইলো এস্ট্রের নিচে – ভালোবাসার জন্য আমি এই জীবন বিসর্জন দিলাম!

.

তোমাদের পরিবারের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনগুলো মনে পড়ে খুব। আম্মা একদিন সন্ধ্যায় এসে বললো,‘খালিদ, পাশের বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে।ওদের দুইটা ছেলে আছে। বড়টা তোর বয়সীই হবে। পরিচিত হয়ে নিস’। তোমার ভাই আসিফের সঙ্গে সেদিন রাতেই মোড়ের চায়ের দোকানে পরিচয় হয়ে গেল। পরিচয় হবার দশ মিনিটের মধ্যেই সে দুম করে আমার কাছে টিউশানি চেয়ে বসলো।আমি অবাক হলাম,বুঝলাম তোমাদের সংসার টানাটানির।তোমার  বাবার বোঝা কিছুটা হলেও হালকা করতে চায়। এক মাথা কোঁকড়ানো চুল, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা আর মলিন,পুরোনো পাঞ্জাবী পড়া  সহজ সরল ছেলেটাকে আমার এক নিমিষেই ভালো লেগে গিয়েছিল। কেন জানি তখন নিজেকে অনেক ছোট মনে হল। আমার বয়সী একটা ছেলে এতো কষ্ট করছে আর আমি গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘোরাফেরা করে বাপের অন্ন ধ্বংস করছি। একটু বড় হতে মন চাইলো। আমার একমাত্র টিউশানিটা দিয়ে দিলাম তোমার ভাইকে। কয়দিন পরে অবশ্য ঠিকই একটা টিউশানি পেয়ে গিয়েছিলাম, আগেরটার চেয়ে ভালো। এই আত্মভোলা মানুষটা তোমাকে কতোটা ভালোবাসতো তুমি কোনদিন বোঝনি।

.

প্রায়দিন এতো সকালে খিদে নেই বলে প্রচন্ড খিদে নিয়ে সে বাসা থেকে বের হয়ে টিউশানিতে যেত। সকালের দুটো রুটির সঙ্গে ডিমভাজির পুরোটাই যেন তুমি পাও এজন্যেই সে এই অভিনয়টুকু করতো। রোজ বুধবার দুপুরের পর ন্যাচার স্টাডি ক্লাবের মিটিং এ রিফ্রেশমেন্ট দিত। সে ব্যাগে লুকিয়ে সেই রিফ্রেশমেন্ট তোমার জন্য নিয়ে আসতো। তুমি খেতে তার সামনে বসে এতেই তার খাওয়া হয়ে যেত।

.

তুমি তখন পড় ক্লাস নাইনে। তোমার সহপাঠী রুপমকে তার বিলাতফেরত ভাই শিয়ালকোটের  ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিয়েছিল। খেলার মাঠে রুপমের হাতে সেই ব্যাট দেখে তোমার ঐরকম একটা ব্যাট কেনার ইচ্ছে হল । সাহস করে বাবাকে বলতে পারলে না। বললে তোমার ভাইকে,‘ ভাইয়া, একটা ব্যাট কিনে দাওনা’। তোমার ভাইয়ের পকেট তখন গড়ের মাঠ। পায়ে হেঁটে টিউশানিতে যায়। বাস ভাড়াটুকুও নেই। তারপরে কীভাবে কীভাবে তোমাকে যেন একটা ব্যাট কিনে দিয়েছিল সে। এই ব্যাট দিয়ে মেরেই তুমি একবার তোমার ভাইয়ের মাথা ফাটিয়েছিলে। একদিন তোমার হলুদ বসন্ত পাখিকে নিয়ে তুমি শামীম ভাইয়ের ফুচকার দোকানে ফুচকা খাচ্ছিলে। দেখে ফেলে তোমার বাবা। সেদিন রাতে বাবা তোমাকে কড়া কিছু কথা শোনায়।অভিমান করে তুমি ভাত না খেয়ে শুয়ে পড়। তোমার ভাই, গভীর রাতে তোমাকে ডেকে তোলে। নরম কথায় তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। তুমি বিরক্ত হও। তবুও সে কথা চালিয়ে যেতে থাকে। ভাত খাবার অনুরোধ করে। তুমি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু কর,শুরু কর ধাক্কাধাক্কি, একপর্যায়ে ব্যাট দিয়ে মেরেই বস। দশটা সেলাই পড়েছিল তোমার ভাইয়ের মাথায়।

.

আরেকদিনের কথা। তোমার ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সিঁড়িতে। ইফতারির ঠিক পর পর , চাঁদ রাত ছিল বোধহয়। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। মুখ শুকনো। দেখে মনে হচ্ছিল বেশ ক্লান্ত। জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল সে ,‘আর বইলো না বড়লোকের রঙের কাহিনী, দুই মাস ধরে টিউশানির টাকা দেয়না, টাকা দিবে বলে আজকে অনেকক্ষন বসাইয়া রাখছিল ড্রয়িংরুমে। ইফতারির সময় হয়ে যাইতেছে তাও কেউ কিছু বলে না। আমি যে একটা মানুষ,ড্রয়িংরুমে বইসা আছি এক দেড় ঘন্টা ধরে কেউ মনে হয় চোখেই দেখেনি।লাস্টে ইফতারির ১০-১৫ মিনিট আগে ছাত্রের মা এসে হাসিমুখে বললো,‘ বাবা আসিফ! একটা ঝামেলা হয়ে গেছে,আমাদের ইফতারির পরে জুয়েলারি কিনতে যেতে হবে,আগামীকাল ঈদ বুঝতেই পারছো। কিছু মনে কইরো না বাবা,ঈদের পরে এসে টাকাটা নিও’। আমি বহু কষ্টে মুখে হাসি ধরে রেখে বললাম,‘ঠিক আছে আন্টি,সমস্যা নেই’। কি ছোটলোক দেখ, আমাকে একবার ইফতারি করতেও বললো না, ওরা বললেও অবশ্য আমি ইফতারি করতাম না’।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম তোমার হাতে কি?

ও বললো পাঞ্জাবী।

‘তোমার জন্য’?

‘না’।

‘তাহলে?’

‘কার আবার! আমার ছোট্ট ভাইটার জন্য’।

পাঞ্জাবি কেনার  টাকা কোথায় পেলে জিজ্ঞাসা করাতে সে  রহস্যময় একটা হাসি দিয়েছিল।চেপে ধরার পর বলেছিল,’ তার এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করেছে’।

.

এই পাঞ্জাবিটাই ছিল তোমার থ্যাঁতলানো শরীরে। রক্ত জমাট বেঁধেছিল। তোমার সেই রক্ত মেশানো পাঞ্জাবিটা জড়িয়ে ধরে এখনো তোমার ভাই কাঁদে।

.

বাহ! খুব বড় বাহাদুর তুমি, ভালোবাসার জন্য জীবন দিয়েছো! তালিয়া, ইস বীর বাহাদুরকে লিয়ে বহুতই তালিয়া!

.

সামান্য একটা মেয়ের ভালোবাসার  মিথ্যে অভিনয়ে ভুলে  তুমি জীবন দিলে আর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা তোমার চোখেই পড়লোনা! আহারে প্রেমিক পুরুষ, ভালোবাসার তুমি কিছুই বোঝনা!

.

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ …

শেয়ার করুনঃ
ভালবাসা ও দু’টি বাস্তবত

ভালবাসা ও দু’টি বাস্তবত

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।

সাধারণভাবে ভালবাসা বলতে আমরা যা বুঝি তেমন প্রত্যেক ভালবাসাই, যদি সত্য হয়ে থাকে, একটা পরিণতিকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে – বিয়ে। একে অপরকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সেইসব কপটপূর্ণ ফেলনা ভালবাসার কথা আজ বাদ। আপনি একেবারে মন থেকেই কাওকে ভালবাসেন আর মন থেকে চান যেন আপনার ভালবাসা পরিণতি পাক, অথবা আপনি কাওকে ভালবাসলে মন থেকেই ভালবাসবেন এমন সততা পোষণ করেন, তাহলে অনুরোধ থাকবে একবার পুরোটা পড়ে দেখার জন্য। কেননা মন থেকে সৎ থাকলেও আপনি হয়ত দু’টি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছেন বা করবেন যা চুরমার করে দিতে পারে আপনার ভালবাসা।

.

প্রথমেই এক ভাইয়ের জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা উল্লেখ করব। ভার্সিটি জীবন থেকেই এক আপুর সাথে প্রেম করতেন। তারা দু’জনেই মন থেকে ছিলেন সৎ এবং তাদের এই ভালবাসাকে পরিণতি দিতে দু’জনেই ছিলেন বদ্ধপরিকর। এরপর ভার্সিটি থেকে বের হয়েই ভাইটি ভাল একটা চাকরি পেয়ে যান এবং এক সময়ে তাদের এই ভালবাসার কথা তাদের পরিবারদ্বয়কে জানানো হয়, প্রকাশ করা হয় বিয়ের আগ্রহ। দুই পরিবারই সহজেই মেনে নেয় এবং একটা সময়ে কথাবার্তা বলে বিয়ের দিন-তারিখও ঠিক করা হয়ে যায়। কোথাও কোন সমস্যা ছিল না – শুধুমাত্র একটা বিষয় ছাড়া। আর তা হল তাদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের সমস্ত মেলেমেশাগুলো ছিল আল্লাহ, যিনি এই বিশ্বজগৎ-আমার-আপনার রব, তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ। আর একারণেই একেবারে ঘটনার শেষ পর্যন্ত সেই ভাইটিকে আমার আরেক দ্বীনি ভাই বার বার স্মরণ করিয়ে দিতেন আল্লাহর নিষেধাজ্ঞার কথা। কিন্তু এই দ্বীনি ভাইটি ঐ ভাইটিকে কোন যুক্তি দেখাতে পারতেন না।

“কয়েকদিন পরেই তো বিয়ে করছি। বিয়ের তারিখও ঠিক হয়ে গেছে। তাহলে এখন কথা বলতে – দেখা করতে সমস্যা কোথায় ?” – এই প্রশ্নের মনমত কোন জবাব দিতে পারত না সেই দ্বীনি ভাইটি। তারপরও শুধু না করে যেতেন। কারণটা ছিল ঐ যে – রবের নিকট এর অবৈধতা। এভাবে করেই দিন কেটে যাচ্ছিল। অতঃপর বিয়ের দিন-তারিখ ঘনিয়ে আসলো। বিয়ের উদ্দেশ্যে ভাইটি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন – বাসে।

ভাইটি চট্টগ্রামে পৌঁছেছিলেন ঠিকই। কিন্তু প্রাণ নিয়ে নয়। আসার পথে বাস অ্যাক্সিডেন্ট করে আর সেই অ্যাক্সিডেন্টে অধিকাংশ বেঁচে গেলেও হাতে গোনা যে দুই-তিনজন মৃত্যুবরণ করেছিল – তাদের মধ্যে সেই ভাইটিও ছিল একজন।

দ্বীনি ভাইটি সেই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পান কয়েকদিন পরে। তিনি যখন ঘটনাটি বলছিলেন তখন উল্লেখ করেছিলেন, “মৃত্যু যে এভাবে চলে আসতে পারে – সেটা আমাদের কারও মাথাতেই আসে নি। আমার নিজেরও একেবারে কল্পনার বাইরে যেটা ছিল অগত্যা তাই হয়েছিল।”

.

এই হল প্রথম বাস্তবতা। আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেনসমস্ত কিছু যতই ঠিক দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হোক না কেন  আপনার রবের অনুমতি না থাকলে কোনো কিছুই সম্ভব না। যে ভাইটির ঘটনা বলছিলাম তিনি তো মন থেকে সৎই ছিলেন, আপুটিও ছিলেন। তাদের পরিবারও তো রাজি ছিল – না শুধু রাজিই নয়, বরং তারা তো খুশি হয়ে বিয়ের দিন তারিখও নির্ধারণ করেছিলেন। ঘটনাটির পর এতসমস্ত চিন্তা করে দেখলাম, শুধুমাত্র যে জিনিসটির অভাব এখানে ছিল তা হল আল্লাহ সুবহানাহুতা’লার ইচ্ছা বা অনুমতি।

পরবর্তীতে সেই আপুটির আরেক জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। কারও জীবনই তো আর থেমে থাকে না। কিন্তু আমি এটা নিশ্চিত যে আপুটি অনেক যন্ত্রণা পেয়েছিলেন, হয়ত এখনও পান।

.

এটা একটা ঘটনা, কোন গল্প নয়। এমন আরও বহু ঘটনা মানুষের জীবনে ঘুরপাক খায় – একেবারে হুবহু না হলেও এমন যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি করা ঘটনা। তানাহলে আত্নহত্যা তো দূরের কথা, ব্রেকআপ শব্দটাও বর্তমানে এতটা প্রচলন পেত না। কৌতুহল আশা-আকাঙ্খা আর আনন্দমাখা অনুভূতি দিয়ে যে সম্পর্কগুলোর সূচনা হয় সেগুলো শেষ হয় মনোমালিন্য, হতাশা আর যন্ত্রণা দিয়ে। আর সমস্ত কিছু ঠিক থাকার পরও যে পরিণতি অধরাই রয়ে যেতে পারে তার উদাহরণ তো কেবলই দিলাম। আর এই জীবন বিষিয়ে তোলা ঘটনার কারণ ঐ এক বাস্তবতাকে ভুলে যাওয়া : আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনকিছুই সম্ভব না।

তাই ভাই বা বোন আমার, আপনি হয়ত এখন উদ্দেশ্য ভাল রেখেই কারও সাথে প্রেম করে চলেছেন, কাটাচ্ছেন অনেক সুন্দর সময়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছা না থাকলে আপনার কাটানো সেই সুন্দর সময়গুলোই হয়ত দানব হয়ে আপনার জীবনকে তিক্ত করে তুলবে। ইসলাম বিয়ের আগে প্রেম ভালবাসাকে নিষিদ্ধ করেছে আমার-আপনার আত্মিক-মানসিক নিরাপত্তার জন্যেই। যাতে আমরা বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে জীবনকে দুর্বিষহ করে না তুলি।

.

এই তো গেল প্রথম বাস্তবতা। এটা নিয়ে একটু চিন্তা ভাবনা করলে একটা প্রশ্ন মাথায় চলে আসে আর সেই প্রশ্নটা আমাদেরকে ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয় বাস্তবতার দিকে ধাবিত করে।

প্রশ্নটা ভাগ্যবিশ্বাস নিয়ে। আল্লাহর হাতেই যদি শেষ পর্যন্ত সবকিছু থাকে তাহলে কি আমরা কখনও চেষ্টা করব না? এটা সুবিস্তারিতভাবে আরেকসময়ে আলোচনার দাবি রাখে। এখন শুধু একথা মাথায় রাখি যে, আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা তাঁর বান্দাদেরকে স্বাভাবিকভাবে যা কিছু কল্যাণকর তাঁর দিকেই ধাবিত করেন। বান্দার গুনাহ আর দুআ সেই স্বাভাবিকতার পরিবর্তন আনতে পারে। যদিও বান্দা দুআ করবে নাকি করবে না তা আল্লাহ সুবহানাহু তাঁর ই’লমে গায়িবের কারণে আগে থেকেই লিখে রেখেছেন, প্রকৃতপক্ষে আমরা দুআ করব বলেই তিনি লিখে রেখেছেন। তিনি লিখে রেখেছেন বলে আমরা করব – ব্যাপারটি এমন নয়। দুআ ছাড়াও অন্যান্য যেকোনো কাজের জন্যও এটি প্রযোজ্য।

আর এই কথাগুলো আসলে এমন যা একজন বিশ্বাসীর সন্দেহ দূর করে তার বিশ্বাসকে পোক্ত করে আবার একইসাথে অবিশ্বাসীর সন্দেহ বাড়িয়ে তুলে তার অবিশ্বাসকেও পোক্ত করে। এটা নির্ভর করে সেই মানুষটি মনের গহীনে এই সত্যকে অন্যসব সত্যের সাথে স্বীকার করে বিশ্বাসী হতে চায়, নাকি সন্দেহের মধ্যেই ডুবতে ডুবতে অতলে হারিয়ে যেতে চায় – তার ওপর। তাই দেখা যায়, অনেক অবিশ্বাসীও তাদের মনের সত্য স্বীকারের অনুভূতির দরুণ বিষয়গুলো বুঝতে পারে এবং বিশ্বাসীদের পথে পা বাড়ায়। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ। (তাকদীর আর এই সংক্রান্ত বিষয়াদি বিস্তারিত লিখা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ; নোটের নাম – ‘এক’ এর উপপাদ্য। শেষে লিংক দেওয়া আছে)

.

যাই হোক, ভালোবাসায় ফিরে যাই। প্রথম বাস্তবতা আমাদেরকে শেখায় যে কোন কাজের সফলতা-ব্যর্থতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই আমাদের ভালবাসার বা অন্য যেকোন কাজের সফলতার জন্য আল্লাহর অনুমতি প্রয়োজন। আর আল্লাহর অনুমতি কীভাবে পাওয়া যায়? – দুআ !

দুআর মাধ্যমে আপনি আল্লাহর কাছে চাইবেন। দুআ হল মুমিনের অস্ত্র। এর মাধ্যমে আপনি আল্লাহর অনুমতি চাইবেন। কিন্তু কীভাবে চাইবেন? এই প্রশ্নটির উত্তরেই রয়েছে দ্বিতীয় বাস্তবতা যা ক্রমে ক্রমে আসবে বলেছিলাম।

.

আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করব যা আপনাকে পুরো ব্যাপারটি বুঝতে সহজ করে দিবে ইনশাআল্লাহ।

এক বোন বছরের পর বছর ধরে দুআ করেছিলেন যেন তার বিয়ে এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে হয়। অতঃপর ৭-৮ বছরের দুআ আর চেষ্টার পর সকল বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে সেই বোনের বিয়ে যখন অমুক ব্যক্তির সাথেই হয়েছিল তখন তিনি উল্লেখ করেন – আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা যে তার দুআ কবুল করেছিলেন তা তিনি একেবারে অনুভব করেছিলেন। অতঃপর হয়ত ভালই কেটেছিল সেই বোনের কিছুদিন। হ্যাঁ হয়ত, তাও আবার কিছুদিন। কেননা বিয়ের দেড় বছরের মাথায় শুনেছিলাম স্বামীর ব্যবহার আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক খালাত বোনের বাসায় একেবারে চলে আসেন।

মাঝে যে তিনি একবারও দুঃখ কষ্ট সইতে না পেরে বাবার বাড়িতে চলে আসেন নি – এমনটি নয়। মানসিক নির্যাতন আর তার স্বামীর অন্য নারী-বান্ধবী-কলিগদের প্রতি কাতরতা দেখে রেগে বহুবারই বাবার বাড়িতে চলে এসেছিলেন। কিন্তু বাড়িতে শোনানো ‘তুমি তো নিজের পছন্দেই বিয়ে করেছ। তাহলে এখন এখানে এসব বলছ কেন?’ – এমনসব প্রশ্ন আর কিছুদিন পর পর স্বামীর ক্ষমা চেয়ে নিতে আসা – ইত্যাদি তাকে বাধ্য করত বারবার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হত না। পরবর্তীতে তার স্বামী আরও খারাপ-অকথ্য কিছু ঘটনা ঘটালে তিনি বাধ্য হয়ে চলে যান সেই খালাত বোনের বাসায়। আরও অনেক ঘটনার পরে বোনটির স্বামী তাকে তালাক দিলে শেষে বোনটির আরেকবার বিয়ে হয়। হয়ত বোনটি এখন যথাসম্ভব ভালই আছেন।

.

কিন্তু তার দুঃখের দিনগুলোতে তিনি আফসোস করে করে কাঁদতেন, “কেন যে আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছিলেন? তাতে যে কোন কল্যাণ ছিল না…” – এখানেই হল আল্লাহর কাছে কীভাবে চাইবেন তার উত্তর ও দ্বিতীয় বাস্তবতা। আর সেটা হলঃ আল্লাহর নিকট দুআতে আমাদের চাইতে হবে ‘যা কিছু কল্যাণকর’ বা এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করে, মোটেই নির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ করে নয়। কারণ একটি নির্দিষ্ট বিষয় কারও জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে হয়ত বুঝতে পারছি না। কিন্তু আল্লাহ সুবহানহুতালা জানেন  আমাদের জন্য প্রকৃতপক্ষে কী কল্যাণকর আর কী অকল্যাণকর। আমরা এখন জীবনের যে সাদা বিন্দুতে অবস্থান করে একে ভাল ভাবছি হয়ত সেই সাদা বিন্দুটিই সমস্ত জীবনছবির সবচেয়ে অসুন্দর-অকল্যাণকর অংশ। সমস্তটার খবর তো কেবল আল্লাহই জানেন।

রাসূলুল্লাহ সা. এর শেখানো দুআগুলো খেয়াল করলেও এই বাস্তবতা চোখে পড়ে। দুআ যে বিষয়েই হোক না কেন, কখনই তা নির্দিষ্ট করে না চেয়ে বরং সেই বিষয়ে যা কিছু আল্লাহর জ্ঞানে কল্যাণকর তা চাওয়া হয়েছে, আর নিস্তার চাওয়া হয়েছে অকল্যাণ থেকে। উপরের ঘটনাটিতে বোনটির ভুল ছিল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই স্বামী হিসেবে পাবার জন্য দুআ করা। অথচ উত্তম হতো তিনি যদি ‘যে স্বামী তার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে’ এমনটি চেয়ে দুআ করতেন।

.

তাই ভাই বা বোন আমার, এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করবেন না। আল্লাহর অনুমতি প্রয়োজন বোঝার পর আপনি যে নির্দিষ্ট মানুষটির সাথে আপনার পরিণতির জন্য দুআ করবেন বলে ভাবছিলেন সেই যে কিছুদিন পর আপনার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক মানুষে পরিণত হবে না তার গ্যারান্টি তো আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না। যে মানুষটি আপনাকে আজ এত ভালবাসছেসে তো পরবর্তীতে অন্য কারও প্রতি আরও আকৃষ্ট হতেই পারে। দেখতেশুনতেজ্ঞানে গুণে যে স্কেলেই তুলনা করুন না কেনআপনার চেয়েও ভাললাগার মতভালবাসার মত মানুষ আশেপাশেই রয়েছেঅহরহ রয়েছে। আর একারণেই আজ লক্ষ লক্ষ ব্রেকআপের পর কোটি কোটি নতুন রিলেশন দেখা যায়। আর নিয়মিত হারে পেপার পত্রিকার পরকীয়ার ঘটনা তো বাদই দিলাম।

তাছাড়া আল্লাহর ভয়বিহীন মানুষগুলোর পক্ষে যে পশুর স্তরেও নেমে যাওয়া অসম্ভব না। আর যে এখন আপনার সাথে হারাম সম্পর্কে মজে গিয়ে দুনিয়ার জীবনের সামান্য লৌকিক ভাল সময়ের আড়ালে অনন্ত অসীম আখিরাতের জীবনটিকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে – তাও আবার শুধু নিজেরটাকেই নয় বরং আপনারটাকেও, সে আসলে আল্লাহর আযাবকে কতটাই বা ভয় করে আর আপনাকেই বা আসলে কতটা ভালবাসে ! প্রকৃতঅর্থেই সে আপনাকে ভালবাসলে যে সে তার এই ভালবাসাকে কেবল এই জীবনে সীমাবদ্ধ রাখতে মোটেই চাইত না, বরং অনন্তকালের জন্য স্থায়ী করতে চাইত। বাদ দিত এই কয়েকদিনের হারাম সম্পর্ক। তাই হারাম সম্পর্ক বাদ দিন, আল্লাহর কাছে কল্যাণকর জীবনসঙ্গী চেয়ে দুআ করতে থাকুন এবং সবর করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনার প্রতি কোনও যুলুম করবেন না।

.

আর কথা বাড়াব না। অতি সংক্ষেপে সমস্তটা আরেকবার উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হব –

১। আপনি যা কিছুই করার স্বপ্ন দেখুন না কেনশেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছা বা অনুমতি ছাড়া তা অসম্ভব। সুতরাং দুআর মাধ্যমে আল্লাহর অনুমতি প্রার্থনা করুন।

২। আল্লাহই যাবতীয় কল্যাণ এবং অকল্যাণের জ্ঞান রাখেন। সুতরাং আল্লাহর কাছে যা চাইবেন তা নির্দিষ্ট না করে যা আপনার দুনিয়া  আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে তা চাইবেন। এরপর আল্লাহর সিদ্ধান্তে ভরসা করে সবর করবেন।

এই দুই বাস্তবতাকে যতদিন মেনে নিয়ে কাজ করতে পারবেন না, ততদিন জীবন বিষিয়ে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু না, বরং অতি স্বাভাবিক। আর ভালবাসা ভাললাগার ব্যাপারটিও যে এর উর্ধ্বে নয় তা তো বিভিন্ন জীবন থেকে নেওয়া দু’টো ঘটনা উল্লেখ করেই বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কী করা সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত তাও দেখানোর চেষ্টা করলাম। এরপরও না বুঝলে আরও সহজ করে দিই। ভালবাসুন তাঁকে যিনি ভালবাসার সবচেয়ে বেশি দাবি রাখেনঃ আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন। তারপরও না বুঝলে মাফ করবেন : আপনার দুই দিনের জীবনের কিছু সময় নষ্ট করলাম।

অতঃপর ভাল থাকুক আপনার জীবন, আপনার ভালবাসা।

.

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁর বান্দাদেরকে এতটা ভালবাসেন, এতটা ক্ষমা করেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্ললাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যিনি তাঁর উম্মাতকে ভালবেসেছেন, ভালবাসতে শিখিয়েছেন।

মূল নোটের লিঙ্ক- https://goo.gl/9ibF2g

==========

লেখকঃ তানভীর আহমেদ ।

লেখকের ফেসবুক আইডি লিংক- https://goo.gl/dfPxQr

শেয়ার করুনঃ