‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (শেষ পর্ব)

‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (শেষ পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

…বৃষ্টি ভালোবাসতাম আমরা দুজন।  কতোদিন বৃষ্টিতে দুজনে হেঁটে বেড়িয়েছি ফাঁকা ফুটপাতে, কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়েছি বৃষ্টির স্ত্রোতধারায়। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। সারা বিকেল আমরা ঘুরে বেড়িয়েছিলাম রিকশায়। শেষ বিকেলে ঝুম বৃষ্টির পরের সেই ভীষণ প্রিয় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। রিকশার ভেতরের আঁধো অন্ধকারে তুমি আমার গা সেঁটে বসেছিলে। একদম গা সেঁটে। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল।

আমি হয়তো তখন শুক্রবারের নামাযও পড়তামনা, হয়তো চেইন স্মোকার ছিলাম, লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ন দেখতাম হঠাত হঠাত । তারপরেও তুমি যখন মাঝে মাঝে  এতো কাছাকাছি আসতে তখন আমার  অস্বস্তি হতো। কেমন জানি হয়ে যেতে তুমি সেই সময়টুকুতে। চোখের ভাষায় কী জানি বলতে চাইতে!

সেদিন আমি ছোট্ট রিকশার একপাশে যতোটুকু সরে বসা সম্ভব ততোটুকু সরে বসছিলাম। তুমি মুখে রহস্যময় হাসি হেসে আবার আমার গা সেঁটে বসছিলে বারবার। রিকশা থেকে নেমে যাবার আগমুহূর্তে  আমার কানের কাছে ঠোঁট এনে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলেছিলে, ‘ কাল বাসা খালি। ভাইয়া,ভাবী বেড়াতে যাবে। একা একা আমি বাসায় থাকতে পারিনা। আমার ভীষণ ভয় লাগে…’।

কী ভুলের মধ্যেই না আমি ডুবে ছিলাম। আলেয়াকে আলো ভেবে নষ্ট করেছিলাম জীবনের সবচেয়ে সজীব সময়গুলো। এখনো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি  নামলে  ঘর থেকে বের হয়ে আসি।  বৃষ্টিতে ভিজি। খালি পায়ে একা হেঁটে বেড়াই সবুজ ঘাসের ওপর।  রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ। দু’আ করি মন ভরে ,বৃষ্টির সময় দু’আ কবুল হয়।   হলের  লেকের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি বৃষ্টির ফোটা পানিতে পড়ে বৃত্তাকার ঢেউ তৈরি করছে, দূরের শালবনের ভেতর কাকের দল বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির ঠাণ্ডা ফোটা ভিজিয়ে দেয় আমার সর্বাঙ্গ,আড়াল করে ফেলে চোখের তপ্ত তপ্ত অশ্রু।  কতো ভুল করে ফেলেছি এই ছোট্ট জীবনে। কতো গুনাহ করে ফেলেছি। ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি ছাড়া তো আমার যাবার জায়গা নেই।

বালিকা, তোমার সম্মোহনী আমন্ত্রণে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। তড়িতাহতের মতো কেপে উঠেছিলাম নিদারুণ বেদনায়। ঘৃণায় সারা শরীর রি রি করে উঠেছিল। নিজেকে ধোঁয়া তুলসি পাতা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছিনা।টগবগে তরুণ আমি। নারীদেহের ব্যাকুল শুশ্রুষা পাবার ইচ্ছে আমারো হতো।  কিন্তু বালিকা বিশ্বাস করো, কখনো তোমাকে নিয়ে এসব ভাবিনি। পাপ আর পঙ্কিলতা সযত্নে দূরে সরিয়ে বুকের বেশ বড়সড়ো একটা জায়গা ফাঁকা করে,পবিত্রতা আর স্নিগ্ধ ভালোলাগায় মুড়ে রেখেছিলাম তোমাকে। সেই তুমি এমন একটা কথা বলতে পারলে!

তুমি বোধহয় পড়ে ফেলেছিলে আমার অনুভূতি। সেই রাতে লম্বা একটা মেসেজ পাঠিয়ে  সরি বলেছিলে। দুইদিন পরে মাফ চাইতে আমার হলের নিচে এসেছিলে সশরীরে। তোমার চোখের পানি দেখে  ক্ষমা করে দিয়েছিলাম তখনই। কিন্তু তোমার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গিয়েছিল অনেকখানি।

ক্লাস নাইনের এ সেকশনের বালিকা, তুমি ছিলে আমার কৈশোরের প্রথম ভালোলাগা, ভালোবাসা। হাইস্কুল সুইটহার্ট। কোনো কালিমা না ছুঁয়ে নিখাদ ভালোবাসা আর শুভ্রতায় কতোবার তোমাকে ছুঁয়েছি কল্পনায়, তোমার রেশমের মতো চুলে আনমনে বিলুনি কেটেছি সে সবের তুমি কতোটা জেনেছো?

পোকাদের হাতে তুলে দিয়েছো নিজেকে, পোকারা খুবলে খুবলে ক্ষতবিক্ষত করেছে দিবানিশি,, কেউ একজন তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে পার করে দিবে দীর্ঘ সুখের প্রহর… এই সৌভাগ্য তোমার কখনো হবে?

এই পৃথিবীতে কতোদিন তোমাকে পেতাম বলো? কতোটাই বা নিখুঁত তুমি? অপরূপা ? পরিপূর্ণা? চুলে তেল না দিলে, চিরুনি না করলে তোমাকে পাগলি পাগলি লাগে। দাঁত না বাজলে দুর্গন্ধ বের হয়,বগল থেকে বিশ্রী গন্ধ আসে, চোখে পেচুক জমে, সাবান না দিলে ময়লার আস্তরণ পরে। টয়লেটে যেতে হয়, তোমার নাকে সর্দি আসে। ৩০-৩৫ বছর বয়স হলেই মেদ জমে হিপোপটোম্যাস হয়ে যাবে, একদিনতো  চুল পেকে যাবে,চামড়া ঝুলে যাবে, ফোঁকলা দাঁতের দাদী নানী হবে।

তোমার মায়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে ভুলতে বসেছিলাম তুমি সসীম, তুমি নশ্বর। ভুলতে বসেছিলাম এই আকাশের ওপারেও আকাশ রয়েছে। তারওপর স্বর্ণ,মনিমুক্তো আর হীরার একটা প্রাসাদ রয়েছে আমার।

সেখানে যাবার রাস্তা দুনিয়াতে নিজের বাড়ি যাবার পথের চাইতেও ভালোভাবে চিনব। প্রাসাদের কাছাকাছি যাবার পরে  অসাধারণ একটি দৃশ্য দেখে আমি থমকে যাব। আমার হার্টবিট মিস হবে।  পা ভারী হয়ে যাবে, নড়াচড়া করতে পারব না।

কী সেই  দৃশ্য?

জান্নাতী স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন- অপরূপ এই দৃশ্যে আমি মুগ্ধ হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকব বছরের পর বছর। ৪০ বছর পলকহীন চোখে তাকিয়ে উপভোগ করব  জান্নাতী স্ত্রীর সৌন্দর্য। এমন সৌন্দর্য, এমন রূপ যা দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায়না। কোনো মানবহৃদয় তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনা।

আল্লাহ (সুবঃ) বলছেন, ‘ আমি তাঁদেরকে বানিয়েছি বানানোর মতো করেই। তাঁদেরকে করেছি চিরকুমারী। তাঁরা হবে সমবয়সের প্রেম সোহাগিনী’। (সূরা ওয়াকিয়াঃআয়াত ৩৫-৩৮)

আয়তনয়না হুরদের   সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ (সুবঃ) বলছেন, তাঁরা যেন লুকিয়ে রাখা মুক্তো’ (সূরা ওয়াকিয়াঃ আয়াত ২৩)

‘ এরা যেন এক একটি প্রবাল ও পদ্মরাগ’ (সূরা আররহমানঃআয়াত ৫৮)

‘তাঁরা যেন সযত্নে লুকিয়ে রাখা ডিমের কুসুমের মতো উজ্জ্বল গৌর বর্ণের সুন্দরী’ ( সূরা আছছাফফাতঃ আয়াত ৪৯ )

জান্নাতীর স্ত্রীগণ  এ কারণেই সুন্দরী নয় যে তাঁরা কোনো সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে। বরং স্বয়ং আল্লাহ (সুবঃ) এদের সৌনদ্রযের সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জান্নাতের স্ত্রীদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- একজন জান্নাতের হুর যদি পৃথিবীর প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে তবে মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সমগ্র স্থান এমনভাবে আলোকিত, উদ্ভাসিত হয়ে যেতো যে তাতে চন্দ্র,সূর্যয়ের আলো পর্যন্ত নিষ্প্রভ হয়ে যেতো। সমগ্র পৃথিবী সুগন্ধিতে ভরে যেত। এমনকি যদি কোনো  হুর, হাতের তালু  পৃথিবীর দিকে মেলে ধরে তাহলে সমস্ত জগতবাসী তাঁর নূরের আভায় সম্বিৎ হারিয়ে ফেলত’। ( বুখারী)

হুর আল আইনরা এতোটাই রূপবতী যে জিব্রাইল (আঃ) এদের একজনকে একপলক দেখেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। [১] জান্নাতের স্ত্রীদের তোমার মতো শারীরিক সীমাবদ্ধতা নেই। তাদের টয়লেটে যেতে হয়না, গা দিয়ে গন্ধ বের হয়না, মুখের দুর্গন্ধ হয়না। তাঁদেরকে তো মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়নি। বরং আল্লাহ (সুবঃ) তাঁদের তৈরি করেছেন বিশেষভাবে- কস্তুরী, কর্পূর এবং জাফরান দ্বারা।  এদের থুতুও মেশকের সুগন্ধ ছড়াবে। মাথার ওড়না দুনিয়া এবং এই পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।

তোমার মতো তাঁরা কখনো বুড়িয়ে যাবেনা। কখনো তাঁদের সৌন্দর্য  ম্লান হবেনা। বরং দিন দিন তাঁরা আরো বেশি রূপবতী, মায়াবতী হয়ে উঠবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। প্রত্যেক জুমুআবারে জান্নাতী লোকেরা সেখানে একত্রিত হবে। তারপর উত্তরের হাওয়ায় সেখানকার ধুলা-বালি তাঁদের চেহারা ও কাপড়ের ওপর পড়বে। তাতে তাঁদের সৌন্দর্য বেড়ে যাবে। স্ত্রীদের নিকট ফিরে যাবার পরে তাঁদের স্ত্রীরা বলবেন, আপনারা তো বেশি  সুন্দর হয়ে গিয়েছেন’। জান্নাতী লোকেরাও স্ত্রীদের  বলবেন , ‘ তোমরাও আগের চাইতে অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছো’। (মুসলিম)

জীবন বাবু হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে মালয় সাগর, বিদর্ভ নগর ঘুরে  শেষমেষ ববলতা সেনের কাছে যে শান্তি পেয়েছিলেল, আমি তোমার কাছে ঠিক সেই শান্তি পেতে চেয়েছিলাম। দিনরাত তুমি তুমি করেও অস্থিরতা,অশান্তি, নির্ঘুমরাতই কপালে জুটেছে বেশি । সবসময় সন্দেহ,ঝাড়ি,জেরা,পুলিশগিরি… এসবে শান্তি পাওয়া যায়?

জান্নাতের স্ত্রী কখনোই আমাকে  তোমার মতো বকাবকি করবেনা, ঝাড়ির ওপর রাখবেনা, এটা কিনে দাও, ওইটা কিনে দাও, রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যাও, সিনেমা দেখতে নিয়ে যাও ইত্যাদি আবদার করবেনা। কখনোই কটু কথা বলবেনা আমাকে। আমাকে সন্দেহ করবেনা।

‘তাঁদের সাথে থাকবে লজ্জাবতী,নম্র ও আয়তলোচনা তরুণীরা’ (সূরা আছ ছাফফাতঃআয়াত ৪৮ )

‘সেখানে তাঁরা কোনো অর্থহীন প্রলাপ শুনতে পাবেনা।বরং বলা হবে শুধু শান্তি! নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি।’ (সূরা ওয়াকিয়াঃআয়াত ২৫-২৬)

বালিকা, তুমি যেমন আমার মৌলিক ভালোবাসা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছো জান্নাতের স্ত্রীরা কখনোই এমন করবে না। কখনোই ধোঁকা দিবেনা। আমাকে কোনো টেনশন করতে হবেনা- না জানি আমাকে ছেঁড়ে চলে যায় না জানি আমাকে ধোঁকা দেয়, না জানি আমার সাথে প্রতারণা করে। হুর আল আঈনকে তো কেবল আমার জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। না কোনো মানুষ বা জীন এদের দেখেছে আর না তাঁদের কেউ স্পর্শ করেছে।

‘সেখানে থাকবে আয়তনয়না স্ত্রীগণ। এদের কোনো জ্বীন বা মানুষ স্পর্শ করেনি’। (সূরা রহমানঃ আয়াত ৫৬)

.জান্নাতের স্ত্রী কখনোই আমাকে ছেড়ে চলে যাবেনা। অন্য পুরুষের দিকে চোখ তুলেও তাকাবেনা। মিষ্টি সুরে আমাকে বলবে, ‘ তোমার চাইতে হ্যান্ডসাম পুরুষ আর কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা তো সেই আল্লাহর যিনি তোমাকে আমার স্বামী আর আমাকে তোমার স্ত্রী বানিয়েছেন’। ( ইবনে জাওযী রহ, কারা জান্নাতের কুমারীদের ভালোবাসে প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৩)

.আহহা! আমার কোনো টেনশন নেই। কোনো ভাবনা নেই। জান্নাতের স্ত্রী অসীম সময় জুড়ে আমাকেই শুধু আমাকেই ভালোবাসবে, প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে আগের মুহূর্তের চেয়েও বেশী ভালোবাসবে, আমার বুকের মুখ লুকোবে, আমাকে জড়িয়ে ধরেই সুখের গল্প লিখবে।

.জান্নাততো হলো সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে দুঃখ,কষ্ট নেই, গ্লানি,অবসাদ,বিষণ্ণতা কিছুই নেই। শুধু সুখ আর সুখ। অবিরাম বৃষ্টির মতো সুখ। যার শুরু আছে শেষ নেই। জান্নাতের নেয়ামতের কথা কল্পনা করারও ক্ষমতা নেই মাটির মানুষের। এমনই এক রাজ্য সেটি। রূপকথার মতো যেখানে- অতঃপর তাহারা চিরকাল সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিল’।

‘কেউই জানেনা  চোখ জুড়ানো কি কি নেয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়েছে জান্নাতে ’ (সূরা সাজদাঃআয়াত ১৭)

মাঝে মাঝে উত্থাল পাথাল জোস্ন্যায় ভেসে যায় চারিদিক। চাঁদের আলো যেন হেসে হেসে গলে পড়ে যায়। রাতজাগা বাতাস বকুলমালার তীব্র গন্ধ ভাসিয়ে নিয়ে আসে। এমন রাতে ঘুমানো অপরাধ। এই অপরাধ আমি করিনা। বাইরের বারন্দায়, দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকি। শত সহস্র বছরের পুরোনো নক্ষত্ররা মিটিমিটি তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমিও কী  তাদের দিকে তাকিয়ে  থাকিনা?  তোমায় ভেবে কল্পনায় আনমনে লিখতে থাকিনা এক উপাখ্যান? এক অদ্ভূত,কাল্পনিক কিন্তু সত্য প্রেমের উপাখ্যান…

‘তুমিও কি সহস্র বার আমার কথা ভেবেছো? নাকি তার চেয়েও বেশি; লক্ষ কোটি বার? ধূলো মলিন মিথ্যে কথার এই পৃথিবীতে বসে আমি কতো অযুত কোটিবার তোমার কথা ভেবেছি। পুকুর ধারে জলের গন্ধে চোখ ভিজিয়েছি। আর মস্তিষ্কের প্রত্যেকটি কোষ ব্যবহার করে কল্পনা করার চেষ্টা করেছি এমন এক সুখের যা কখনো কোন মানুষ অনুভব করেনি…

তুমি এলে… পাশে বসলে আমার, সবুজ ঘাসের ওপর। একটু দূরেই টলটলে স্বচ্ছ পানির বিশাল দীঘি। আকাশ থেকে একরাশ নীল ঝরে ঝরে পড়ে একটু নীলাভ দেখাচ্ছে দীঘিটাকে।  তোমার কোলে আমি মাথা রেখে শুয়ে আছি। তুমি আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছ। দুটো প্রজাপতি সেই কখন থেকে উড়ছে। তুমি তাদের দিকে তাকিয়ে খুশিতে হেসে দিলে। আমি দুশো একান্ন বারের মতো তোমার প্রেমে পড়লাম। আমার চোখ দেখেই তুমি বুঝে ফেললে সেটা, তাইনা?

খাম খেয়ালী মস্তান বাতাস এসে এলোমেলো করে দিল তোমার চুল। একগোছা চুল এসে পড়লো তোমার মুখের ডানপাশে। আমি ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিলাম।তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলে। দুশো বায়ান্ন বারের মতো আমি তোমার প্রেমে পড়লাম।

তোমার দুষ্টুমি ভরা চোখের তারায় নীল আকাশ তির তির করে কাঁপছিল। তুমি কি জানো, তোমার সেই সবুজাভ চোখ আমার ভেতরের কতো কিছুর মৃত্যু ঘটালো আর কতো কিছুর জীবন দিল?  আড় চোখে তোমার দিকে তাকাতেই ধরা পড়ে গেলাম আবার। তোমার চোখেমুখে সবজান্তার হাসি। আমার কী দোষ বল? তোমাকে আল্লাহ যে বানিয়েছেন বানানোর মতো করেই।

বিকেলের এক নরম মুহূর্ত। তুমি আবদার ধরলে, কাউসার দেখতে যাবে।  বেরিয়ে পড়লাম আমরা । নৌকায় দাঁড়িয়ে আগুন্তক বাতাসে তুমি মেলে দিলে দুই হাত। পাখির মতো। যেন এক্ষুনি গা ভাসাবে  এই আগুন্তক বাতাসে।  ঘোরলাগা এক আলো এসে পড়লো তোমার স্নিগ্ধ মুখটাতে। মুহূর্তেই তুমি যেন আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেলে। ছুঁতে ইচ্ছে করেনা, কথা বলতে ইচ্ছে করেনা,কাছে যেতেও ইচ্ছে করেনা। শুধু দূর থেকে দেখতে ইচ্ছে করে।

বছরের পর বছর ধরে।

দুশো তিপ্পানবারের মতো প্রেমে পড়লাম ঠিক তখনই।

.জানি তুমি আমার কল্পনার চাইতেও সুন্দর। আমার কল্পনা ধারে কাছেও যেতে পারেনা তোমার সৌন্দর্যের । তবু আমি তোমার কথা ভাবি।  কল্পনায় তোমাকে ছুঁই হরদম।

হে হুর আল আঈন, হে আমার জান্নাতি স্ত্রী, তুমিও কি আমার কথা ভাবো অষ্টপ্রহর? তুমি কি কখনো প্রেমে পড়েছো আমার? জানিনা, জানতে চাইওনা। শুধু জেনে রাখো, অসীম গুণোত্তর ধারার মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে চলেছি, প্রেমে পড়তেই আছি।

…মাতাল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেয়  গগণ শিরীষ গাছটা। ওর ডালপালার ছায়া বারন্দার জমীনে অদ্ভূত নকশা তৈরি করে। জ্যোৎস্না দুলে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে পানকৌড়ির ডাক। ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমার কল্পনার সুতো।ঠেস দিয়ে বসে থাকি আমি বারন্দায়। চোখের কোণে কী অশ্রুবিন্দু জমে? নাকি আমার মনের ভুল? কল্পনা? কি জানি!

অপেক্ষার প্রহরগুলো বড় কষ্টের। সবকিছুরই তো শেষ আছে — তিক্ততার, শান্তির, অস্থিরতার, জীবনোপন্যাসের। দীর্ঘ অপেক্ষার তো বটেই।

তাইনা?

(শেষ)

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

পড়ুন আগের দুটি পর্বঃ

দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম (প্রথম পর্ব)

দুশো তিপ্পান্নতমপ্রেম (দ্বিতীয় পর্ব) 

সব পর্ব একসঙ্গে পিডিএফঃ

রেফারেন্স-

[১] https://tinyurl.com/y7po9h3c

কৃতজ্ঞতাঃ

শেষের দুটি লাইন, একটি কবিতা থেকে নেওয়া। কবির প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

শেয়ার করুনঃ
দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম (দ্বিতীয় পর্ব)

দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম (দ্বিতীয় পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

….একবার তোমার এক আচরণে (এটা নিয়ে পরে কথা বলব) আমি বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। প্রথম বারের মতো তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলে। চোখ ফুলিয়ে কেঁদেছিলে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।আমাদের সম্পর্কের সুতো আলগা হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর তা আবার জোড়া লাগলো। সেই শুরুর দিনগুলোর মতো।  প্রেম পেকে টসটসে হয়ে গেল, তুমি আমার হাতে হাত রেখে ১০৮ বারেরও বেশি  জিজ্ঞেস করে ফেললে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো? আমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবে নাতো? বেশ চলছিল এরপর।পাগলামি, কফিশপ,সিনেপ্লেক্স, কথায় কথায় রাতভোর হয়ে যাওয়া, স্বপ্ন,কল্পনা…

হঠাত একদিন কানাডা থেকে এলো এক দমকা হাওয়া । সেই দমকা হাওয়ায় অচিন দেশের রাজকুমার তোমাকে নিয়ে উড়াল দিল । বিদায় নিতে তুমি এসেছিলে রবীন্দ্র সরোবরে । কেঁদে কেঁদে বলেছিলে,“আমাকে ক্ষমা করে দিও”।  আমি হেসেছিলাম। তোমার চোখের পানি মুছে দিয়ে  দুগালে নিজের দুহাত  রেখে বলেছিলাম, “পাগলি মেয়ে একটা”।

তারপর কত দিন, কত রাত চলে গিয়েছে চলে গেছে। কতো নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটেছে।  কতো রাত  আমি নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছি বিছানায় এপাশ ওপাশ  করে করে । একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করেছি। গভীর রাতে সাউন্ড সিস্টেম অন করেছি । মান্না দে কেঁদে কেঁদে জানিয়েছে সে অনেকদিন দেখেনি তার প্রিয়াকে ,তাহসান বলেছে চাঁদের আলো কখনো তার হবে না । মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে হলের সিড়িতে বসতাম। গাঁজায়  দুটো দম দিয়ে গান ধরতাম ‘গিভ মি সাম সানশাইন , গিম মি সাম রেইন ……’

খাওয়া দাওয়া করতাম না, ক্লাসে যেতামনা, ক্লাস টেস্টগুলোও মিস করতাম।  বাসা থেকে ফোনের পর ফোন দিত। ধরতাম না। পরে ফোন করে আম্মুকে ঝাড়ি দিতাম। রুমমেট, বন্ধু বান্ধব, স্যার, অনেকেই চেষ্টা করেছে  বোঝানোর । বুঝিনি আমি।

বন্ধুরা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল । এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো যেটা আমার জীবনের মোড় ঘুরে ঘুরিয়ে দিল ১৮০ ডিগ্রী ।

গাঁজা আর সিগারেটের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে  গোলগাল,ভালোছেলে দুই রুমমেট অন্য রুমে পালিয়ে বাঁচলো। । বেডদুইটা ফাঁকা পড়েছিল এক দিন। দরজা বন্ধ করে সারাদিন গাঁজা টেনেছিলাম । পরের দিন বেডদুটো আবার দখল হয়ে গেল। একজন আমার চাইতে দুই বছরের সিনিয়র। হুজুর। মুখে একগাল দাঁড়ি, চোখে চশমা , ইয়েমেনি এক শায়খের মতো দেখতে অনেকটা (পরে চিনেছিলাম)। মুখে সব সময় স্মিত হাসি । প্রথম দেখাতেই মানুষটাকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল । আমার বেহাল অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন উনি।

ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আমাকে বুঝিয়েছিলেন উনি । আমি তর্ক করেছি , মেজাজ হারিয়ে  একদিন  চিৎকার করে বলেছিলাম , ‘আমাকে আমার মতোই থাকতে দিন না ভাই। আপনারা হুজুর মানুষ ,ভালোবাসার কী বোঝেন’? সব মেয়েরা মিথ্যেবাদী,প্রতারক’।

ভালোবাসার কী বুঝি!  ভাই স্মিত হেসে আমাকে শুনিয়েছিলেন ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান । শুনিয়েছিলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) ,খাদীজার (রাঃ) প্রেমের কথা, শত বাঁধা বিপত্তির মুখেও দ্বীন প্রচারে মুহাম্মাদের (সাঃ) দৃঢ়তা আর খাদীজার (রাঃ) পাশে থাকার কথা । শুনিয়েছেন স্ত্রীর সঙ্গে মুহাম্মাদের (সাঃ) দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প, , স্ত্রীর এঁটো  পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করার গল্প,সওয়ারীর পিঠে উঠতে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার গল্প ।

কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, ‘ হে নবী, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন অ তার বিলাসিতা কামনা কর,তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থ্যায় তোমাদের বিদায় দেই’। (সূরা আহযাবঃ আয়াত ২৮)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সব স্ত্রীদের জানিয়ে নিলেন। তাঁদেরকে বেছে নেবার সুযোগ দিলেন হয় আমাকে পাবে অথবা এই দুনিয়ার ভোগবিলাস,চাকচিক্য। তাঁর সব স্ত্রীরা একবাক্যে জানিয়ে দিলেন, ‘ আমরা আপনাকেই চাই ইয়া রাসূলুল্লাহ’।

এমন এক সংসার তাঁরা বেছে নিলেন যেখানে, মাসের পর মাস চুলায় আগুন জ্বলেনা, খেজুর খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়, নবীর স্ত্রী হয়েও মোটা কাপড় পরিধান করতে হয়, সংসারের কাজ করতে গিয়ে কালিঝুলি মাখতে হয়, জরাজীর্ণ কুটিরে  খেজুরপাতার বিছানায় শুতে হয়।

.আমি শুনেছি আর মুগ্ধ হয়েছি ।

এমনটাও হয়!

রূপকথার ভালোবাসাও যে হেরে যায় এর কাছে।

যদি আমাদের ঘর বাঁধা হতো, যদি আমাদের এরকম দারিদ্রতার মুখোমুখি হতে হতো, তুমি কী এভাবেই আমাকে ভালোবাসতে? কক্ষনো নয়। এই অবস্থায় পড়লে প্রথম সুযোগেই ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতো। সিনেমা বা ডেটিং এ না নিয়ে গেলে, তুমি যেরকম করতে আমার সাথে, মাসের পর মাস আধপেটে  থাকা, জীর্ণ পোষাক পরিধান করা… উফ! সম্ভবই না।

ভাই আমাকে বুঝিয়েছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে…

তুমি তো হেরেই গেলে। লুজার হয়েই রইলে আজীবন!
বালিকা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এক পলক দেখেই তুমি যাকে ভালোবেসেছিলে, ক্যারিয়ার, পড়াশোনা, শ্বাসত নিয়ম কানুন ভেঙ্গেচুরে কাঙ্গালের মতো ছুটে বেড়িয়েছিলে যার পিছু পিছু, সেই বালিকা তোমাকে ভুলে গিয়েছে।

একসময় তোমার কবিতা শোনার জন্য যেই বালিকা একটু পর পর ফোন করে জ্বালাতো, তোমার নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখলেই নক করতো, সেই মেয়ে শব্দেরও অধিক দ্রুত গতিতে ভুলে গিয়েছে তোমাকে, তোমার সেই সব নিশাচরী কবিতাগুলোকে। ভুলে গিয়েছে বাদলা দিনের প্রথম কদমফুল আর বৃষ্টিতে ভেজার সব প্রহরগুলোকে। পাগলামি, খুনশুটি, ফুচকার দোকান,বুড়ো অশত্থ গাছের নিচের বেঞ্চি, ফুটপাত,কফিশপ, ভালোবাসার রেণু লেগে থাকা প্রিয় সবকিছুকেই। ভুলে গিয়েছে সুপারসনিক গতিতে। একপলকেই ভুলে গিয়েছে সবকিছু,ঠিক যেমন এক পলক দেখেই তুমি প্রেমে পড়েছিলে। ভুলে গিয়েছে খুব দ্রুত।

বড়লোক, এস্টাব্লিশড স্বামীর সাথে রোজ রোজ ছবি দেয়, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, সিনেমাহলে। হানিমুনের ছবি, বিদেশ ঘোরাঘুরির ছবি। দামী ক্যামেরায় তোলা ঝকঝকে হাস্যোজ্জ্বল সব ছবি।সুখ, ভালোবাসা উপচে পড়ছে যেন।

তুমি এসব দেখে দেখে, অতীতের কথা ভেবে, পুরনো স্মৃতি মনে করে নিজেকে পোড়াও। তামাক পাতার ধোঁয়ায়। পুড়িয়ে কালো করে ফেলো তোমার তরুণ ফুসফুস। পুড়ে যায় তোমার কলিজা, হৃৎপিণ্ড। বেঈমানি করে বসে দুচোখ। নামে অশ্রুর অঝোর ধারা।

বালিকার ছলনা নারীজাতির ওপর থেকে তোমার সব বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য তুমি হানা দাও পর্নসাইটগুলোতে। ঘন্টার পর ঘন্টা নীল উদ্দামতা চলতে থাকে পর্দায়। তুমিও সমানে হাত চালাও।প্রতিশোধ নিতে হবে, মস্ত বড় প্রতিশোধ,ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।

এই প্রতিশোধের শেষ কোথায় ? আর কতোরাত গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে পড়ে থাকলে, আর কতো ক্লাস ফাঁকি দিলে, আর কতো মেয়েকে ধরে খেয়ে ছেড়ে দিলে, আর কতো জিবি পর্ন দেখলে, আর কতোবার হস্তমৈথুন করলে, মায়ের আর কতো চোখের জল দেখলে, বাবার আর কতো অপমান দেখলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হবে? তুমি ঐ মেয়েকে পরাজিত করতে পারবে? বলো, আর কতোকাল তোমার এই অদ্ভূত প্রতিশোধ চলবে? কবে তুমি বিজয়ী হয়ে? কবে বালিকা হেরে যাবে?

বোকা ছেলে, তুমি তো শুরুতেই হেরে গিয়েছো। প্রতিশোধ নেবার নামে গাঁজা খাচ্ছো, সিগারেট খাচ্ছো, খাওয়া দাওয়া, ঘুমের অনিয়ম করছো এতে কার ক্ষতিটা হচ্ছে শুনি? ঐ মেয়ের, না তোমার নিজের, নিজের শরীরের। পর্ন আর হস্তমৈথুনে তুমি তিলে তিলে শেষ করে ফেলছো পৌরুষের সব শক্তি, কার ক্ষতি হচ্ছে? কার মা কষ্ট পাচ্ছে, আত্মীয়,প্রতিবেশী,পাশের বাসার আংকেল,আন্টিদের কাছে কার মা,কার বাবা অপমানিত হচ্ছেন?

সে তো সুখেই আছে। খাচ্ছে,দাচ্ছে,ঘুমোচ্ছে,শপিং করছে, ট্যুর দিচ্ছে। স্বামীর সাথের রং ঢঙের ছবি শেয়ার করছে। তোমার কোনো দুঃখ,কষ্ট,প্রতিশোধের অভিমান,আগুন কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করেনি, করবেওনা, এরকম অবস্থায় সাধারণত করেওনা।

আর তুমি?

নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছেড়েছো!  নর্দমার শুয়োর আর রাস্তার কুকুরেরা যেভাবে জীবন যাপন করে, তুমি বেছে নিয়েছো ঠিক সেই জীবন। নিজের শরীর শেষ করছো, স্বপ্নগুলোকে নিজের হাতে গলা টিপে মারছো।

বোকা ভাই আমার!   এটা কোনো জীবন হলো?

ফিরে এসো ভাই।
বোকা ভাই আমার, প্লিজ ফিরে আসো।
বাবার কাছে ক্ষমা চাও, মায়ের চোখের জল মুছে দাও। জায়নামাযে দাঁড়াও। চোখের জলে জ্বালিয়ে দাও অতীতের সব ভুল, সব পাপ। আবার শুরু থেকে সব শুরু করো। লম্বা একটা জীবন পড়ে আছে।
ফিরে আসো ভাই!
ফিরে আসো জীবনে।
প্লিজ!

আস্তে আস্তে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসা শুরু হল।  ঝাঁকড়া চুলে তেল চিরুনী পড়লো,সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলাম ,গাঁজা ছেড়ে দিলাম একেবারেই, শুক্রবার ছাড়াও মাঝে মাঝে মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম। বালিকা, তোমার বিরহের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করলো ।কী ঋতু চলছিল তখন? শরত না হেমন্ত? হেমন্ত বোধহয়। আহা কী ভীষণ দামি ছিল সেই হেমন্ত!

ইউটিউব ব্রাউজিং করতে করতে একদিন পেয়ে গেলাম পরকালের পথে যাত্রা নামের এক লেকচার সিরিজ।  গমগমে কন্ঠস্বরের বক্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে গেলেন। আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে শুনে গেলাম। কী দরদ মাখা তাঁর কণ্ঠ,কী গভীরতা তাঁর কথায়!

সেই লেকচারেই শুনলাম আশ্চর্য একদল তরুণীদের কথা ,আয়তনয়না যাদের চোখ, কোনো মানুষ ও জ্বীন কখনো যাদের স্পর্শ করেনি । প্রবাল ও পদ্মরাগের মতো এই সব তরুণীদেরকে আল্লাহ্‌ (সুবঃ) নাম দিয়েছে হূর আল আঈন। আল্লাহ্‌ (সুবঃ) এদেরকে নাকি এতো সুন্দর করে বানিয়েছেন যে এদের দিকে তাকিয়েই মানুষ  বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে । তবু চোখ ফেরাতে পারবে না ।

সেই লেকচারে আরো শুনলাম আকাশের ওপারের লাল নীল হারী আর মুক্তোর প্রাসাদের কথা, আদিগন্ত বিস্তৃত রেশমের গালিচা, সারি সারি আসন, সালসাবিল আর কাউসারের কথা, সিদরাতুল মুনতাহার কথা…।

.বালিকা তোমার প্রতি যে  ভালোবাসাটুকু অবশিষ্ট ছিল তার এক কানাকড়িও আর থাকলো না এই লেকচার শোনার পর। কঠোর প্রতিজ্ঞা করলাম, জান্নাতের সেই মুহূর্তগুলো কিছুতেই মিস করা যাবে না । বদলে গেলাম আমি ।

আমূল বদলে গেলাম।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

পড়ুন- প্রথম পর্ব

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

 

শেয়ার করুনঃ
‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (প্রথম পর্ব)

‘দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম’ (প্রথম পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

সবাই ফেরে না।  

ফিরতে যে হবে এই বোধটাই কাজ করেনা অনেকের মনে।  

কেউ  কেউ ফেরে।  

প্রত্যাবর্তনের পথে কিছু কিছু কস্টলি অতীত তো থেকেই যায়। সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে স্বযত্নে লুকিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাস,  এক পৃথিবী হাহাকার, অশ্রু,ঘাম,রক্ত,বুকের ভেতরের প্রতিনিয়ত লাল নীল ক্ষরণ।

প্রিয়তমার গভীর কালো চোখ,কালো চোখে মুক্তোর মতো জল, টুকরো টুকরো স্মৃতি, প্রিয় কিছু গান,কিছু কবিতা প্রত্যাবর্তনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সব হারানোর ভয়, সমাজ,সংস্কৃতি অদৃশ্য এক শিকলে আটকে রাখে, ফিরতে দেয়না।

তারপরেও কেউ কেউ ফিরে আসে জীবনে, ফিরে আসে মিল্লাতে ইবরাহীমে।

জাহেলিয়্যাতকে লাথি মেরে, মিথ্যে উপাস্যদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, বিমূর্ত মূর্তিকে ছুঁড়ে ফেলে,  সমাজ সংস্কৃতির কারাগারের দেয়াল মিশিয়ে দেয় ধূলোয়।

সব হারানোর ভয় হারিয়ে   বজ্র কন্ঠে ঘোষণা করে, ‘ আশহাদু আল লাইলাহা ইল্লাল্লাহ…… ‘

প্রত্যাবর্তনের পথে ফেরার ইচ্ছেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফিরে আসার আন্তরিক  ইচ্ছে থাকলে আল্লাহ (সুবঃ) ফেরার পথে অবশ্যই পরিচালিত করবেন। এটাই আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাহ।  দিল চলে যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যায়, এক জাতির উত্থান ঘটে, অন্য জাতির পতন হয়, নদী তার গতিপথ বদলে ফেলে, কিন্তু  আল্লাহর এই সুন্নাহর কোন পরিবরতন হয়না। আসহাবে কাহফের যুবক থেকে শুরু করে সালমান আল ফার্সি (রাঃ)….. কখনো হয়নি।

আমরা আজ এক যুবকের গল্প শুনব।  জীবনের সবকটি অন্ধকার গলিতে বিচরণ করে যে প্রত্যক্ষ করেছে  সকালের সোনালী সূর্যোদয় । অন্ধকারে মাথা কুটে মরেছে বহুকাল, তাই তীব্রভাবে বুঝেছে আলোর মূল্য, আলোর দেখা পাওয়া মাত্রই গ্রহণ করে নিয়েছে দ্বিধাহীন চিত্তে।

জীবনের বিশাল ক্যানভাসে সুনিপুণভাবে এঁকেছে প্রত্যাবর্তনের গল্প…

.…প্রথম কখন কোন মুহূর্তে আমি তোমাকে দেখেছিলাম  ঠিক মনে নেই। বুকের হার্টবিট মিস হয়নি, বুকের বাম পাশটা খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে যেতেও চায়নি। স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ছেদ পড়লে কান গরম হয়ে যায়। বালিকা বিশ্বাস করো, সেই মুহূর্তে আমার কিছুই হয়নি। হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে   শুধু একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- যে করেই হোক তোমাকে পেতে হবে, যে করেই হোক। ষোলোতে পা দেওয়া আমি হঠাত করেই সেদিন যেন অনেক বড় হয়ে গেলাম। বুঝে ফেললাম এক নিমিষে, ক্যারিয়ারে মনোযোগী না হলে নিম্নমধ্যবিত্ত এই আমার তোমাকে পাওয়া হবেনা কখনোই।

পড়াশোনায় সিরিয়াস হলাম। রাত জেগে জেগে পড়তাম। যখন ঘুমে দুচোখ ভারী হয়ে আসতো, তখন তোমার কথা ভাবতাম,তোমাকে কল্পনা করতাম। বেতের ফলের মতো নীরব ব্যথিত তোমার দুচোখ, পুরো মুখ জুড়ে নীরব বিষাদ ছড়িয়ে রয়েছে , চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।  ঘুম পালিয়ে যেত। অদ্ভূত এক শক্তি অনুভব করতাম। ভাগ্যের সন্ধানে নড়বড়ে পালতোলা জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়া যুবকদের স্বপ্নের মতো শক্তি পেতাম। হাতমুঠো করে প্রতিজ্ঞা নবায়ণ করতাম। তোমাকে পেতেই হবে। একদিন, কোনো একদিন থুতনি ধরে সবুজ ঘোমটার আড়াল থেকে তোমাকে বের করব। জিজ্ঞাসা করব, ‘ মেয়ে, কিসের এতো দুঃখ তোমার’?

একবছরের জুনিয়র তুমি, জানলেও না আমার রেসাল্ট এরপর থেকে কতো ভালো হতে শুরু করলো। অংকের মামুন স্যারের হাতে  বরাবরই বেইজ্জতি হতাম, সেই মামুন স্যার পর্যন্ত আমাকে ক্লাসের সবার সামনে ডেকে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন!

বিতর্কের ডায়াসে দাঁড়িয়ে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতাম, করতালিতে  ফেটে পড়তো হলরুম। এককোণায় চুপটি করে বসে থাকতে তুমি, স্নিগ্ধ,সৌম্য মূর্তি হয়ে, আমি আরো প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম প্রতিপক্ষের ওপর!

টিফিনের ব্রেকে তুমি ফুচকা খেতে যেতে স্কুল গেটে। দূর থেকে তোমাকে দেখতাম আর মুগ্ধ হতাম ক্ষণে ক্ষণে। একটা মেয়ে গোগ্রাসে ফুচকা গিলছে একের পর এক, এই অদ্ভূত দৃশ্যও আমার কাছে অপূর্ব মনে হতো। প্রেমে পড়লে সত্যিই বোধহয় মানুষের মস্তিষ্ক ওলট পালট আচরণ করে।  

প্রথম কখন আমাদের  কথা হয়েছিল, মনে আছে তোমার?

ফিজিক্সের প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলে তুমি মফিজ স্যারের বাসায়। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিলবাসায় ফেরার মাঝপথে আটকা পড়েছিলে  আমাদের পাশের গলিতে, নাবিলদের বাসার নিচে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে, কাদামাখা ভূত হয়ে  বাসায় ফিরছিলাম। ভর সন্ধ্যায় তোমাকে ঐখানে দেখে চমকে গেলাম। তুমি আমার দিকে একপলক চাইলে। ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গিয়েছে তোমার মুখ। যা বোঝার বুঝে গেলাম। এক দৌড়ে বাসায় গিয়ে ছাতা নিয়ে আসলাম। একটা রিকশা ডেকে দিলামএকেবারে সিনেমার  নায়কদের মতো।

পুরোটা সময় তুমি মুখ গোমড়া করে রেখেছিলে, হাইপাওয়ায়ের চশমা পড়া হাইস্কুলের হেড মাস্টারনীর মতো। ভাগ্যিস , তখন ফেইসবুক, মোবাইলের এতো সহজলভ্যতা ছিলনা, তাহলে তুমি খুব সহজেই বাসায় যোগাযোগ করতে আর আমারও  কপালে জুটতোনা হিরোগিরি করা। রিকশায় ওঠার আগে হাফপ্যান্ট, ম্যাগি টিশার্ট পড়া আপাদমস্তক কাদামাখা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলে। আস্তে করে বলেছিলে, থ্যাংকস।

বুকে কাঁপন উঠেছিল আমার।

এরপর মাঝে মাঝেই তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে। কখনো টিফিনের ব্রেকে ম্যাথ বুঝতে আসতে, কখনোবা ফিজিক্স। আমি খুব নার্ভাস হয়ে যেতাম। তুমি কঠিন মুখে পড়া বুঝতে। নাকি বোঝার ভান করতে, আর মনে মনে আমার দুরাবস্থা দেখে হাসতে?

একবার পরীক্ষাতে তোমার সিট পড়েছিল একদম আমার পাশে। আমি পরীক্ষা  আর কী দিব! এতো নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম, হৃদপিণ্ডটা এতো জোরে ধুকধুঁক করছিল ভয় হচ্ছিল সবাই না শুনে ফেলে।

আমি স্কুল শেষ করে বের হয়ে আসলাম। তুমি এক বছরের জুনিয়র, স্কুলেই থেকে গেলে। আমি চলে গেলাম অন্য শহরে। কলেজের ক্লাস টেস্ট, ল্যাবের ভয়াবহ অত্যাচার, নতুন পরিবেশ, তারওপর  তোমার সাথে আর যোগাযোগ হয়না। আমার তখন কী যে ভাংচুর অবস্থা! ছুটিতে বাড়ি এসে তোমার বাসার সামনের গলিতে হেঁটে বেড়াতাম, যদি একটিবার তোমার দেখা পাওয়া যায়, যদি একটিবার তুমি  ব্যালকনিতে আসো।  কী যে কষ্টের ছিল সেই দিনগুলা। ফেইসবুকে একাউন্ট খুলেছিলাম। তোমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছিলাম। অনেক বন্ধুবান্ধবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম পাইনি। দুইবছর এভাবে চলে গেল। তোমার দেখা পেলাম না। তুমিও আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করলে না। ভীষণ দুঃসময় চলছিল আমার তখন।

ভার্সিটিতে ওঠার পর ভাবলাম এবার তোমাকে বোধহয় মনের কথা বলা যায়। কতো কাহিনী করে তোমার ফোন নম্বর ম্যানেজ করেছিলাম। উইকএন্ড ছিল। পুরো হল ফাঁকা। সারাদিন মনের সাথে যুদ্ধ করলাম। সাহস সঞ্চয় করলাম। আগুনঝরা চৈত্রের শেষ প্রহরে দুরু দুরু বুকে তোমাকে ফোন দিয়েছিলাম। আড়াই বছর পরে তোমার কথা শুনলাম। নার্ভাস হয়ে সব ভজঘট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। কথা জড়িয়ে আসছিল। একটুপর ধাতস্ত হয়ে কতো কথা বলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেই কথাটি আর বলা হলোনাতুমি ঠিকই ধরে ফেলেছিলে। হেসেছিলে প্রাণভরে। কপট রাগের স্বরে বলেছিলে-   সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা’।

আমি আর তোমাকে ফোন দেইনি। এর মাঝে একদিন তুমি  ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে। আমি দিনে অন্তত দশবার তোমার ওয়ালে ঘুরে বেড়াতাম আর বুক ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। নক করার সাহসও হয়নি। কেন যে এতো ভীরু হয়ে যেতাম তোমার কাছে!

প্রেমের মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছিল সেই প্রথম দেখা থেকেই। যদিওবা তখন তা ছিল একপাক্ষীক হাওয়া। হৃদয় আকাশে যে অল্প অল্প করে ভালোবাসার মেঘ জমছিল সেটা তুমিও বুঝতে আমিও বুঝতাম। শুধু বৃষ্টিটা কেন জানি নামছিল না!

এইচএসসির পর আমার শহরে  চলে আসলে মেডিকেলে চান্স পেয়ে। উঠলে তোমার ভাইয়ের বাসায়। ভাইয়াকে বলে দিয়েছিলে এডমিশানের সব কাজ  একাই পারবে। ফোন করে ডেকে নিলে আমাকে।

তারপর এডমিশনের কাজে এ বিল্ডিং ও বিল্ডিং এ ছোটাছুটি,রাস্তা পার হতে গিয়ে ভয় পেয়ে তোমার আমার বামবাহু আঁকড়ে ধরা, রিকশায় ঘোরাঘুরি… কখন যে বিস্ময়কর রুদ্ধশ্বাস ভালোবাসার মেঘ গলে গেলো, কখন অঝোরে বৃষ্টি নামলো, কখন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে আসলাম আমরা দুজন, টের পাইনি একদম!

এরপরের কাহিনীটা পুরনোই। পৃথিবীর বুকে অনেকবার অভিনীত হয়েছে। অবিমিশ্র ভালোবাসায় মাতাল হয়ে গেলাম আমরা দুজন।

নিঃসঙ্গতায়, নির্জনতায় কেটেছে আমার সারাবেলা,কত ভয়ঙ্কর দিন গেছে, কত গভীর গোপন কথা লুকোনো আছে আমার হৃদয়ে… এখন আমার খুব কাছে সমস্ত উষ্ণতা, নিশ্চয়তা  আর স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবিশ্বাস্য সুন্দরী এক মেয়ে। এ যেন এক রূপকথা! এক স্বপ্নের ভালোবাসা!

.রং বদলে ধূসর হয়ে গেল জীবন কয়েক মাসের মাথাতে। আসলে প্রেমে পড়ার সময় থেকে প্রেম হয়ে যাবার পরের কিছুটা সময় স্বপ্নের মতো কাটে। তারপর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।

তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে আমাদের ঝগড়া হতো… এইটা কেন করলাম, কেন ওইটা করলাম না, কেন ওর সঙ্গে কথা বললাম, কেন ফোন রিসিভ করলাম না, কেন মেসেজের রিপ্লাই দিলামনা…। প্রত্যকে ঝগড়া শেষে আমাকেই সরি বলতে হতো। মালির চোখ এড়িয়ে হলের বাগান থেকে গোলাপ চুরি করে, মনের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে (বেশিরভাগ সমইয় জীবনানন্দ বা সুনীলের কবিতা কপি পেস্ট করতাম। তুমি বইটই পড়তেনা। ধরতেই পারতেনা  আমার কারচুপি!) বা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে তোমার মান-অভিমানের বরফ গলাতে হত।

আমাকে কতো সন্দেহ করতে তুমি!  কিছুক্ষণ পর পর ফোন করতে । ফোন একটু বিজি দেখালেই  চিল্লাচিল্লি করতে। মায়ের সঙ্গেও যে আমি ফোনে কথা বলতে পারি এটা  বুঝতে চাইতেনা। ঝগড়া করতে। অথচ অন্য ছেলেদের সাথে তুমি খুব হেসে হেসে কথা বলতে, রিকশায় এখানে সেখানে যেতে।আমার গা জ্বলে যেতো ঈর্ষায়। তোমাকে জিজ্ঞাসা করলে, হেসে উড়িয়ে দিতে। বলতে ওরা তো আমার ক্লাসমেট বা জাস্ট ফ্রেন্ড। একবার এক ব্যাচেলর স্যারের স্কেচ এঁকে ফেইসবুকে আপলোড দিলে তুমি। এটা নিয়ে কথা বলা শুরু করতেই ক্ষেপে ব্যোম হয়ে গেলে, আমার সাথে কথা বললেনা ঝাড়া দু’সপ্তাহ।   

একেতো ছিলে ডানাকাটা পরীদের মতো রূপবতী, তার ওপর খুব মিশুক। সহজেই ক্যাম্পাসে পপুলার হয়ে গেলে। ডিএলএসআরওয়ালা অনেক  জাস্টফ্রেন্ড ছিল তোমার। তাদের দিয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে। আমার পছন্দ হতনা। নিষেধ করলে শুনতে না। ঘষামাজা করে প্রায় প্রত্যেকদিন ফেইসবুকে ছবি আপলোড করতে, ছেলেরা সমানে লাভ রিএক্ট দিত, কমেন্টে তোমার রূপের প্রশংসা করত। তুমি খুব খুশি হতে। আর এদিকে আমি ঈর্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ে কয়লা হয়ে যেতাম।  

অনেকবার তোমাকে বুঝিয়েছিলাম, ফেইসবুকে এভাবে ছবি দিওনা। যে ছেলেগুলো তোমার রূপের প্রশংসা করছে, সেই ছেলেগুলোর অনেকেই তোমাকে নিয়ে সেক্স ফ্যান্টাসিতে ভোগে, রসালো আলোচনা করে বন্ধুদের সাথেআমার অনেক বন্ধুদের দেখেছি সামনা সামনি বা ফেইসবুকে কোনো মেয়ের অনেক প্রশংসা করতে, কিন্তু আড়ালে ঐ মেয়ের কথা উঠলেই বাজারের মেয়ে টাইপ গালি দিয়ে সম্বোধন করে। ডিএলএসআর ওয়ালা বন্ধুদের দেখেছি তাদের জাস্টফ্রেন্ড বন্ধুদের ছবি এডিট করার সময় জুম করে করে দেখতে আর বাজে বাজে কথা বলতে।

তুমি আমার কথা শুনে রেগে ফায়ার হয়ে যেতে। আমি খুব পযেসিব, তুমি তোমার ব্যক্তি স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছো, স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছোনা,আমার মানসিকতা খুব নোংরা, আমার পাশে তুমি ইনসিকিউরড ফিল করো, গা ঘিন ঘিন করে…… কতো কিছু শুনিয়েছিলে তুমি।

রাত জেগে ফোনে কথা বলার কারণে সকালের ক্লাসগুলো মিস হতো। পড়াশোনায়ও মন দিতে পারতাম না। পড়ার টেবিলে বসলে শুধু ‘তুমিই’ মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে। তাছাড়া একটু পর পর মেসেজের রিপ্লাই দিতে হতো, কথা বলতে হতো। খুব খারাপ রেসাল্ট হয়েছিল সেই সেমিস্টারগুলোতে।

ভালোছাত্র,ভালোমানুষ রুমমেট  অনেক বুঝিয়েছিলো। পাত্তা দেইনি । বাবা মাঝে মাঝে পড়াশোনা কেমন চলছে জিজ্ঞাসা করতেন। আমি বাবার কাছে আজীবন সত্যি বলে এসেছি। আমাকে নিয়ে তিনি একদম নিশ্চিন্ত ছিলেন। মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে আমার বুক ভেঙ্গে যেত। খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু মিথ্যে বলতেই হতো।ঐদিনগুলোতে প্রবল এক পাপবোধ তাড়া করে বেড়াতো।শান্তি পেতাম না।রাতে ঘুমুতে পারতাম না।

পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল । একবার টার্ম ব্রেকের সময় বাসাতেও যেতে পারলাম না টিউশনির কারণেডেটিং এর খরচ জোগাড়ের জন্য বাসায় মিথ্যে কথা বলে টাকা নিতাম। একই বই তিনচারবার করে কিনতাম। টিউশনিও করাতে হতো কয়েকটা। টায়ার্ড হয়ে রুমে ফিরতাম রাতে। পড়তে বসার মনমানসিকতা বা এনার্জি কোনোটাই থাকতো না। রেসাল্ট খারাপ হতো আগেই বলেছি। আমার কি যে খারাপ লাগতো! আমার গাধা গাধা বন্ধুগুলা আমার চেয়ে অনেক ভালো করতো।     

তোমাকে স্বপ্নভেবে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বড়ো সাধ ছিল আকাশে সাত লক্ষ সুখের ফানুশ ওড়ানোর, অথচ আমার মৃত আকাশ জুড়ে উড়েছিল শুধুই যন্ত্রনার বেলুন। বিষম ভার হয়ে তুমি চেপে বসেছিলে আমার বুকের ভেতর। তবু তোমার হাসি,আড়চোখের চাহনি,পাগলামি, ঘন্টার পর ঘন্টা ছেলেমানুষি কথাবার্তা, আলো-আধারি,রহস্যময়তা,উদাসীনতা,গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা সবকিছু মিলিয়ে তুমি আমার কাছে ছিলে এক মাদকের মতো। মিশে গিয়েছিলে আমার রক্তের প্রতিটি অনুচক্রিকায়। জানি তুমি আমাকে পোড়াবে, কিন্তু আমি পুড়তেই যে ভালোবাসতাম…

চলবে ইনশা আল্লাহ…

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

 

শেয়ার করুনঃ
আততায়ী ভালোবাসা (প্রথম পর্ব) 

আততায়ী ভালোবাসা (প্রথম পর্ব) 

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

ফেইসবুক মাঝে মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তারুণ্যের প্রথম দিনগুলোতে। পুরোনো স্ট্যাটাসগুলো ফেইসবুক মেমরি হিসেবে হোমপেইজে ভেসে ওঠে। চশমার এপাশের চোখদুটো যা দেখে তা বিশ্বাস করতে চায়না। আফসোস, বিস্ময় আর হাসির মাঝামাঝি একটা অনুভূতি হয়। কতো অপরিপক্ক ছিলাম তখন। কী সব ছেলেমানুষি করেছি, হাস্যকর কতো স্ট্যাটাস দিয়েছি!
.
সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেই। ইয়ার দোস্তদের কেউ দেখে ফেললে আর রক্ষে নেই। পঁচিয়ে পাগল করে দিবে। অথচ চার পাঁচ বছর আগে যখন এগুলো লিখেছিলাম তখন নিজেকে কতো ‘স্মার্ট আর কুল’ মনে হয়েছিল। লাইক কমেন্ট পেয়ে খুব ভালো লেগেছিল। বন্ধুরা কতো প্রশংসা করেছিল! এককালের ‘হিট’ স্ট্যাটাসগুলো আজ সেই একই আমির কাছে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । যে বন্ধুরা প্রশংসার বন্যায় আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছিল সেই একই বন্ধু বান্ধবের দল এই পোস্ট দেখলে আমাকে পঁচাবে!
.
চৌধুরী সাহেব ঠিকই বলেছিল। মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়,বেঁচে থাকলে বদলায়। সকালে বিকালে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়।
.
মাত্র চার পাঁচ বছরের ব্যবধানে কতো বদলে গেছি! চারপাঁচ বছর পরেও এই আমি আর সেই আমি থাকবোনা নিশ্চয়ই।
গতকাল যেটাকে ধ্রুবসত্য বলে মনে হয়েছিল আজ তা মিথ্যে, যে আচার আচরণকে স্মার্ট,কুল,জাতে ওঠার সিঁড়ি ভেবেছিলাম আজ নিজের কাছেই তা হাসি ঠাট্টা আর লজ্জার বিষয়। আফসোসের বিষয়!
কীভাবে এতো অপরিণত আচরণ করেছিলাম ভেবে অবাক হবার বিষয়।
.
আল্লাহ্‌র কালাম আর আল্লাহ্‌র দ্বীন ছাড়া কোন কিছুই আসলে ধ্রুব সত্য নয়। শক্ত করে আঁকড়ে ধরে জমে থাকার কিছু নেই। সময় পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে বদলে যায় সবই… ফিজিক্সের থিওরি,ফেসবুকের ট্রেন্ড, রাজনীতি, সিংহাসন, নিয়ন আলোর রাজপথ। পরাশক্তির অহং, ঔদ্ধত্যও ধুলোয় লুটোয়।
.
আজ কোন মেয়েকে তোমার কাছে মনে হচ্ছে স্বর্গের অপ্সরী, মেয়ে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে অষ্টপ্রহর। তুমি নিশ্চিত থাকো কিছুদিন পরেই তোমার এই অনুভূতির পরিবর্তন হয়ে যাবে। ঘোর কেটে যাবে। এটা স্রেফ বয়ঃসন্ধিকালের মোহ, বা অস্থির তারুণ্যের অস্থিরতা।
স্কুলে পড়ার সময় তুমি একরকম থাকবে, তোমার চিন্তাভাবনা পছন্দ অপছন্দের মাপকাঠি জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একরকম হবে।
.
কলেজে ওঠার পর তোমার পরিচিতির গন্ডি কিছুটা বড় হবে। তুমি কিছুটা বদলাবে।
মনোজগতে আলোড়ন বয়ে যাবে এর পরের ধাপ- বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভার্সিটির বাতাসেও কী যেন থাকে! তোমার জীবনবোধ,চিন্তা চেতনা, পছন্দ অপছন্দের মাপকাঠি বদলে যাবে। তুমি নিজেকে ক্রমাগত ভাঙতে থাকবে নতুনভাবে গড়ার নেশায়।
.
স্কুল থেকে কলেজ,কলেজ থেকে ভার্সিটি … ধীরে ধীরে বদলে যাবে তুমি । একটু একটু করে পরিণত হবে। কিন্তু তোমার মনের মানুষটিও যদি এরকম কোনো জার্নির মধ্যে দিয়ে না যায়, পিছিয়ে পড়ে তাহলেই পরিস্থিতি ধারণ করবে জটিল আকার। প্রেমিকার কালো চোখ আর অতো টানবেনা,অন্ধকার রাত্রির মতো ঘনকালো চুল মনে হবে ঘোড়ার লেজ, যে হাসি আগে বুকে ছুরি বসাতো সেই হাসি দেখে প্রথমেই মনে হবে, ‘আরে! ওর দাঁত এতো হলুদ কেন। কয়দিন ব্রাশ করেনা? আচার আচরণ কথা বার্তায় অনেক ভুল ধরা পড়বে, … ক্ষ্যাত মনে হবে। প্রেমিকা হয়ে যাবে অচল মূদ্রার মতো। সহজ বাংলায় প্রেম আর জমবেনা, তুমি পালাবার পথ খুঁজবে। (বোনেরা আমার, প্রেমিকার জায়গায় প্রেমিক ধরে পড়ে যাও। একই কাহিনী। যাহাই বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন। তোমাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা আরো প্রকোট হয়ে ধরা পড়বে। তুমি চাইবেইনা তোমার প্রেমিক তোমার চেয়ে কম শিক্ষিত বা কম যোগ্যতা সম্পন্ন হোক)
.
কিছু কিছু প্রেম সময়ের এই ঝড় ঝাপটা সামলে নিয়ে টিকে থাকে তেলাপোকার মতো করে। বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় এবং প্রেমের এপিটাফ লিখা হয়ে যায় ঠিক তখনই। সামনের লেখাগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইনশা আল্লাহ্‌ ।
.
মোহ আর প্রেমের কতো ফুল ফুটতে দেখলাম। কিছুকাল পরে সেই ফুল ঝরে যেতে দেখলাম নিজের চোখে। কতো প্রেমিক প্রেমের শপথ করে কবিতা আউড়ে কসম খেল- ভালোবাসার জন্যে তারা জীবন বিলিয়ে দিবে নিঃসংকোচিত্তে, দুঃখের প্রত্যেকটি দ্বীপকে আপণ করে নিবে, দরকার হলে দাঁড়িয়ে যাবে পুরো পৃথিবীর বিপক্ষে, তবুও ভালোবাসার অসম্মান হতে দিবেনা,প্রেমিকাকে বুকে জড়িয়ে রাখবে আজীবন, শত প্রতিকূলতার মুখেও হাত ছাড়বেনা কখনোই। আকাশ বাতাস আর জমীনকে সাক্ষী রেখে তারা উদ্দাত্ত কন্ঠে জানান দিল জীবন চলে গেলেও অন্য কোনো মেয়েকে মেনে নিবেনা জীবনসঙ্গিনী হিসেবে।
আজ সেইসব বোকা, মিথ্যুক প্রেমিকের দল অন্য কোনো রূপসীর চোখে চোখে রেখে সেই একই পুরোনো কবিতার কসম খাচ্ছে। লাজুক মুখে কেউ কেউ জানান দিচ্ছে অন্য কোনো মমতাময়ীর বাচ্চার বাবা হবার শুভ সংবাদ ।
.
ভাই তোমার মোহ কেটে গেলে, নেশা কেটে গেলে প্রেমও হারিয়ে যাবে। তুমি অন্য কোনো ভালোবাসার প্রহরে অন্য কোনো রূপসীকে ভালোবাসার কথা বলবে। প্রেম হচ্ছে মদের মতো, প্রেমিকেরা নেশাখোর। কিছুতেই তোমার মন ভরবেনা, নেশা জমবেনা।
বিশ্বাস করো তুমি ঐসব বোকা প্রেমিকদের মতোই। তুমি ওদের চেয়ে আলাদা নও কিছুতেই। তুমি ওদের মতোই।
.
যেই রূপসী তোমার চিন্তা ভাবনা,তোমার রক্তে মিশে গেছে , যে রূপসীকে ছাড়া তোমার দিন কাটেনা, তুমি বাঁচবেনা, বিশ্বাস করো সেই রূপসীকে ছাড়াই তুমি দিব্যি হেসে খেলে বেঁচে থাকবে। মাসের পর মাস চলে যাবে, ক্যালেন্ডারের পাতায় ধুলো জমবে, রূপসীর কথা তোমার ক্ষণিকের জন্যেও মনে হবেনা। তার চেহারা মন থেকে মুছে যাবে, যেই চোখ তোমার রাতের ঘুম হারাম করে দিত সেই গভীর কালো চোখও হারিয়ে যাবে। হয়তো ভুলে যাবে রূপসীর নামও। উদাস দুপুরের কোনো দলছুট চৈতালী বাতাস দূর অতীত থেকে বয়ে নিয়ে আসবে টুকরো টুকরো স্মৃতি… গাগলামী, ছেলেমানুষী… রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখা, এসিডে পুড়িয়ে নিজের শরীরে প্রেমিকার নাম লিখা,দূরালপনের এলোমেলো কথোপকথনে রাত ভোর হয়ে যাওয়া,বাবার পকেট কেটে ১৮ তম জন্মদিনে ১৮টি রক্তলাল গোলাপ কিনে দেওয়া, রিকশায় বৃষ্টিবিলাস, ফুচকা খাওয়া, মনোমালিন্য,ঝগড়া, ইঁদুর মারা বিষ বা কোকের সঙ্গে মিশিয়ে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ফেলা …
.
পাগলামির কথা ভেবে তুমি হাসবে, কী অবুঝ ছিলে তুমি, পাগলামির কী বিশাল ভাবসম্প্রসারণ করেছিলে। নাতি নাতনি বা কোন তরুণ শ্রোতাকে সামনে বসিয়ে তুমি রসিয়ে রসিয়ে প্রেমের অমর(!) কাহিনী শোনাবে!
.
বয়সে ছোটদেরকে প্রেম বিষয়ক সবক দিতে গেলে আমি আলোচনা মূলত এভাবেই শুরু করি। এ পর্যন্ত বোঝানোর পর প্রায় সবাই বিনাবাক্যব্যয়ে আমার কথা মেনে নেয়। ঠিক ঠিক, তোমার কথা ঠিক। বোঝাতে পারার তৃপ্তির হাসি দিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করি , ‘তাহলে তোরা প্রেম করিস কেন’?
মোটা দাগে তিন ধরণের উত্তর আসে-
.
১) এখন যার সঙ্গে প্রেম করছি তাকেই বিয়ে করব এমননা। জাস্ট টাইম পাস করার জন্যে প্রেম করি।
২) ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই প্রেম করে, আমি প্রেম না করলে কেমন না?
৩) প্রেম না করলে ভালো লাগেনা , একা একা লাগে। গুমোট নগরে ভীষণ দুঃখবোধ হয়। দুদণ্ড শান্তি দরকার ভাই , দুদন্ড শান্তি।

(চলবে ইনশা আল্লাহ্‌)

শেয়ার করুনঃ
শান্তি পাব কোথায় গিয়ে ?

শান্তি পাব কোথায় গিয়ে ?

বিসমিল্লাহির  রহমানীর রহীম

আর  ত্রিশ মিনিট পরে আপনার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইলেক্ট্রনিক্স -২ পরীক্ষা । আপনি ওপ-এম্প এর সার্কিট  ঠিকমতো সলভ করতে পারেননা , টাইমারের সার্কিট দেখলে মনে হয় কাগজে অর্থহীন কিছু আকাআঁকি । তারওপর  কোর্স টিচার মারাত্মক রকমের হাড় কিপটা । নাম্বার দিতেই চান  না , আর সেই সাথে তাঁর  অতীত সুনাম আছে  প্রশ্নপত্র কঠিন করে স্টুডেন্টদের সাথে “মজা” নেওয়ার ।  নিরুপায় হয়ে  পরীক্ষায় আসতে পারে এমন  কিছু প্রশ্নের উত্তর পিডিএফ বানিয়ে আপনি মোবাইলে নিয়ে নিলেন ।    কিন্তু পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে যাওয়া নিষেধ  । কোন স্টুডেন্টের কাছে মোবাইল পেলেই তৎক্ষণাৎ সেই স্টুডেন্টকে পরীক্ষার হল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয় । সেই সাথে একবছর ড্রপ  । তো এরকম একটা ভয়াবহ পরিস্থতিতে,  আপনি পকেট থেকে আলতো করে মোবাইল বের করে টুকলিবাজি শুরু করেছেন পরীক্ষার হলে ।  স্বাভাবিকভাবেই আপনি প্রচণ্ড অস্থিরতায় ভুগছেন  ।  ফ্যানের নীচে থেকেও আপনার কপালে   বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে  গেছে  । হার্টবিট বেড়ে গেছে  ।  আপনি  সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে  আছেন এই বুঝি স্যারের হাতে ধরা খেয়ে গেলেন ।

আপনার অন্তর বড় অশান্ত , বড় অস্থির ।

সুবহানআল্লাহ, একটু চিন্তা করে,  দেখুন দুনিয়ার সামান্য মানুষের বানানো আইন ভাঙ্গার কারণে , খুব ছোট একটা অপরাধ করার কারণেই আপনার মনের শান্তি কর্পূরের মতো উবে গেছে । তাহলে আকাশ ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা , যিনি একেবারে শূন্য থেকে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন সেই মহিমান্বিত আল্লাহর (সুবঃ) আইন প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে , প্রতিনিয়ত আল্লাহর সঙ্গে বিদ্রোহ করে আপনি কী করে অন্তরে শান্তি পাবেন?  বলুন, কীভাবে শান্তি পাবেন ?

আল্লাহ (সুবঃ) আপনাকে বলেছিলেন  দৃষ্টি সংযত করতে , চোখের হেফাজত করতে ।

“……মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।”

(সূরা নূর : ৩০)

আপনি প্রতিনিয়ত  তাঁর সেই আদেশকে বুড়ো আঙ্গুল  দেখাচ্ছেন । রাস্তায় মেয়েদেরকে চোখ দিয়ে  গিলে খাচ্ছেন ,  বন্ধুদের সঙ্গে মেয়েদের ফিগার নিয়ে থিসিস করছেন ,  গভীর রাতে আপনার  মোবাইলের স্ক্রিন নীল হয়ে  যায়, সার্ফিং করে বেড়ান এক্সরেটেড সব ওয়েবসাইটে, পর্নস্টার আর আইটেম গার্লরা আপনার  ড্রিম গার্ল, স্বপ্নের রাজকন্যা  । আপনি কিভাবে শান্তি পাবেন ?

বন্ধু , আড্ডা , গান , জিএফ, বিএফ ,  সিরিয়াল ,ফেসবুকিং, সেলফি , ডিএসএলআর, কেএফসি,  পিৎজাহাট  এগুলো নিয়েই আপনার কেটে যাচ্ছে অষ্টপ্রহর । ভাবছেন ,সুখেই আছি । বুকে হাত রেখে একবার সত্যি করে  বলুন তো, আপনি কী আসলেই শান্তিতে  আছেন, সুখে আছেন   ?

কেন এক বিকেল বেলা ঘুম থেকে উঠে শেষ বিকেলের আলোয়  অজানা কারণে আপনার মন খারাপ হয়ে যায়? গভীর রাতে কি  যেন ভেবে  আপনার চোখ ভিজে যায় জলে । দলা বাধা কষ্টগুলে ভিড় জমায় বুকের ভেতর ।   অন্তরটা খাঁ খাঁ করে  ।  কি যেন নেয় আপনার ।  কোথায় যেন একটা  অপরিপূর্ণতা । কোথায় যেন কিসের একটা অভাব ।   জীবনটা  বড্ড বেশী জটিল মনে হয়  ।

আইটেম গার্লদের কোমর দোলানি আর দেহের ভাঁজ দেখে আপনার  মন কি অস্থির , অশান্ত হয়ে যায় না ? মনের ভেতরের পশুটা কি আপনাকে কুঁরে কুঁরে  খায় না? প্রত্যেক বার পর্ন মুভি দেখার  পর , মাস্টারবেট করার পর  আপনার কি মরে  যেতে ইচ্ছে করে না ? মনে হয়না কেন করলাম , কেন করলাম , কেন কেন …… ?

 

কিসের নেশায় ডুবে আছেন ভাই আপনি ? কিসের নেশায় ?

পর্নস্টারের নিটোল দেহ ,  জিএফের ‘মনে ঝড় তোলা চোখ, আইটেম গার্লদের লাস্যময়ী হাসি ? আপনি এদেরকে কি একেবারে নিজের মতো করে কখনো পাবেন ? পাবেন না । এরা তো ইলিউশান ছাড়া কিছুই না । এরা একদিন বুড়িয়ে যাবে । দেহে অনেক ভাঁজ পড়বে , চামড়া কুচকিয়ে যাবে, দাঁত পড়ে যাবে , চোখ ধূসর হয়ে যাবে , চুল পাটের শনের মতো হয়ে যাবে । সবশেষে মাটির নীচে পোকা মাকড়ে খুবলে খুবলে খাবে এদের দেহ , গলে পচে দুর্গন্ধ ছড়াবে ।

এতেই আপনার এত আকর্ষণ! এদের কারণেই আপনি সেই জাহান্নামের আগুণকে তুড়িমেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন , যা অন্তর পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলবে আর যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর ।

আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনার সেই “আয়তনয়না” জান্নাতি স্ত্রীর কথা যিনি আপনার জন্য লক্ষ কোটি বছর ধরে অপেক্ষা করে আছেন । যাঁর মাথার স্কার্ফ এই দুনিয়া এবং আকাশের মধ্যবর্তী সবকিছুর থেকেও উত্তম । প্রবাল ও পদ্মরাগ সদৃশ জান্নাতের স্ত্রীদের সৌন্দর্যের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ (সুবঃ) সার্টিফিকেট দিয়েছেন ।

জান্নাতেও ঝুম বৃষ্টি হবে , আপনার জান্নাতি স্ত্রীকে নিয়ে রিকশায় বসে আপনি লক্ষ কোটি বছর ধরে বৃষ্টি বিলাস করতে পারবেন , হা করে জ্যোৎস্না গিলতে পারবেন , শেষ বিকেলের মরে আসা নরম হলুদ আলোয়  দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবেন হাজার হাজার বছর ।

দুজনে ঘুরে বেড়াবেন জান্নাতের বাগানে । মাথার উপর থেকে ঝরে পড়বে গাছের ঝরা পাতা । আপনাদের শরীরে আলতো পরশ বুলিয়ে দিয়ে যাবে । আপনার স্ত্রী আপনার কাঁধে মাথা রেখে হাঁটবে , আপনি তাঁকে শোনাবেন জান্নাতের কোন প্রেমের গান , পশু পাখি অবাক হয়ে শুনবে আপনার গান । এত সুন্দর গান কে গায় তা দেখার জন্য চাঁদটাও হয়তো উঁকি দিবে আকাশে ।

আমি আপনি কত পাগল , কত পাগল !!!

……”নারী জাতির প্রতি ভালোবাসা , সন্তান সন্ততি , কাঁড়ি কাঁড়ি সোনা রুপা , পছন্দসই ঘোড়া , গৃহপালিত জন্তু ও জমীনের ফসল মানব সন্তানের জন্য লোভনীয় করে রাখা হয়েছে । অথচ এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের কিছু ভোগের সামগ্রী মাত্র । উৎকৃষ্ট আশ্রয় তো একমাত্র আল্লাহ্‌র কাছেই রয়েছে ।

(সুরা আলে ইমরান , আয়াত -১৪)

পর্নমুভির ফ্যান্টাসি , আইটেম গার্লদের গ্ল্যামারে কোন শান্তি নেই ।  এগুলো আপনার অন্তরকে   ক্ষত বিক্ষত করে তোলে  ।  শান্তি নেই ঝুম বৃষ্টিতে ‘জিএফের” সঙ্গে একি  রিকশাতে পাশাপাশি বসে কাকভেজা হয়ে ভিজাতে, চাঁদনী  পসর রাতে হা করে জ্যোৎস্না গিলাতে । এগুলো আপনাকে ক্ষনিকের আনন্দ দিতে পারে কিন্তু শান্তি দিতে পারে না ।

 

শান্তি আছে , আল্লাহর আদেশ মেনে দৃষ্টি হেফাজত করার মধ্যে । শান্তি আছে আপনার রবকে সিজদাহ করার মধ্যে  , রবের সামনে রাতে  একাকী দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলাতে । নিজের নফসের অবাধ্যতা করে রবের দাসত্ব করাতে ।  ভাই এই  শান্তি   অমূল্য । দুনিয়ার কোন  কিছুর বিনিময়ে এই শান্তি পাওয়া যায় না।  একবার এই শান্তি  পেলে আপনি বারবার চাইবেন এই শান্তি পেতে ।   একবার চেষ্টা করেই দেখুন না । একটা সপ্তাহ আল্লাহ্‌র নফরমানী না করে চোখের হেফাজত করে দেখুন না ফলাফল কি হয় ।  শান্তি না পেলে ভাল না লাগলে আবার আগের লাইফ  স্টাইলে ফিরে গেলেন । একবার তো  চেষ্টা  করে দেখবেন ।

 

“  ………অবশ্যই আল্লাহর স্মরণে হৃদয় প্রশান্ত হয়।” (আল কুর‘আনঃ সূরা ১৩, আয়াত ২৮).

শেয়ার করুনঃ