নীড়ে ফেরার গল্প (অষ্টম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (অষ্টম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।
.
অন্ধকারে সাতটি বসন্তঃ

কেবল মাত্র বার টপকে তের বয়স। আর দশটা ছেলের মতোই স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করছিলাম। পড়াশোনা,খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা সবকিছুতেই ছিলাম মোটামুটি পারদর্শী। আলহামদুলিল্লাহ ! ভদ্রছেলে হিসাবে সবার কাছে বেশ পরিচিত ছিলাম। চাকরির সুবাদে বাবা-মা দু জনেই ঢাকাতে পাড়ি জমালেন। আমাকে রেখে গেলেন নানার বাসায়। তখন সম্ভবত ক্লাস এইটে পড়ি। নানার বাসায় গিয়েও ভর্তি হলাম ক্লাস এইটে। কারো সাথে দ্রুত বন্ধুত্ব করতে আমি বেশ একটা পটু ছিলাম না। সেই জন্য নানার বাসায় নিজেকে খুবই একলা একলা মনে হত। যাই হোক কথা না বাড়িয়ে মুল টপিকে আসি, বেশ কিছু দিন পর যখন রুমে একা শুয়ে আছি, কেন যেন অজানা কারণে ঘুম আসছিল না। হঠাৎ, মাথায় কুচিন্তা আসলো, গায়ে কেমন যেন একটা জ্বালাতন শুরু হলো। উত্তেজিত হয়ে গেলাম খুবই। আমার এমনটা এর আগে কখনো হয়নি । তারপর পেনিস নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে হলো। করলামও। ব্যাস!! যা হবার তাই হলো,ভাবলাম প্যান্টে হয়তোবা প্রস্রাব করে দিয়েছি। কিন্তু না,আবিষ্কার করলাম অন্য কিছু, পেনিস দিয়ে আঠালো জাতীয় পদার্থ বের হল। অবাক হলাম! সাথে কিছুটা ভয়ও পেলাম। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, ব্যাপার টা আসলে কী ঘটলো। কেননা যৌনতা সম্পর্কে তখনও আমার স্বচ্ছ ধারনা ছিল না। তবে যাই ঘটুকনা কেন, আমি বেশ আনন্দ অনুভব করলাম। যেহেতু আনন্দ পেলাম তাই; পরবর্তীতে কোন একদিন তৈলাক্ত জাতীয় কিছু একটা দিয়ে শুরু করলাম আগের মত পেনিস নিয়ে নাড়াচাড়া। বেশ মজা পেলাম। মজা পাওয়াতে আমি এটা প্রায়ই করতাম। তবে পর্ন বা চটি জাতীয় অশালীন কোন কিছুর সাথে তখনও আমার পরিচয় হয়নি।
.
…এভাবে নিজে থেকেই আমি আসক্ত হয়ে পড়লাম মাস্টারবেশনে। তারপর আমার জীবনের কালো অধ্যায়গুলো রচনা হতে শুরু করল। তখন পর্যন্ত আমি বুঝিনি যে, মাস্টারবেশন করা শারীরিক মানসিক সহ সব দিক দিয়েই ক্ষতিকর। একদিন স্কুলের এক বন্ধুর কাছে শুনি যে এটা ক্ষতিকর!!!
কিন্ত কে শুনে কার কথা। তখন তো আমি মাস্টারবেশনে পুরে দমে আসক্ত এক নরকীট। তারপর আস্তে আস্তে পরিচয় পর্নোগ্রাফির সাথে। তবে পর্নে খুব একটা আসক্ত ছিলাম না। আমার মূল সমস্যা ছিল মাস্টারবেশন। দিনেরাতে মিলে ৫/৬ বারও মাস্টারবেট করতাম।ভাই বলতেও লজ্জা করছে কিন্তু কি আর করবো বলুন; তখন তো আমি শয়তানের দাসে পরিণত হয়েছি।
.
যখন কোথাও বসে থাকতাম, বসা থেকে উঠলে মাথাটা প্রচন্ড যন্রণা করতো, চোখে সব অন্ধকার দেখতাম। স্ব্যাস্থ একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। যে কেউ দেখলে চোখ বুজে বলে দিত পারত এ ব্যাটা নিশ্চিত গান্জাখোর। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে মনে হত, সাহারা মরূভূমি পাড়ি দিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি । হাড্ডিসার বুড়ার মতো দেখাতো আমাকে। রাস্তাঘাটে মেয়েদের দেখলে ভিতরে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যেত। যদিও হাইস্কুলে আমি কোন মেয়ের সাথে কখনো কথা বলিনি। বেশ লজ্জাবোধ কাজ করতো ভিতরে। সেই সুবাদে ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের কাছে ‘ভদ্রছেলের’ খেতাবও পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কেউই জানতো না, দেখতে ভদ্র এই মানুষটার ভেতরে কতটা পশুত্ব লুকিয়ে আছে! ভাবতাম, হয়তো এই দুনিয়ায় আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা মাস্টারবেশনে আসক্ত।
.
আমার মত আসক্ত, কোন ব্যক্তির সাথে আমার তখনও পরিচয় ছিল না। বিশেষ করে এই গ্রুপের মাধ্যমে জানতে পারলাম যুব সমাজের মাস্টারবেশন,পর্ন কতটা ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে। হে আল্লাহ, তুমি আমার ভাইদেরকে রক্ষা কর। বৃষ্টিবিলাস, বিকেলের পড়ন্ত রোদ, সকালের মৃদু হাওয়া , অন্ধকার রাত্রে বসে বসে আকাশে তারার দিকে চেয়ে পৃথিবী বুকে নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব অনুভব, ভোরবেলায় বুক ভরে প্রকৃতির ঘ্রাণ, আমার ছোট্ট পৃথিবীতে এগুলো ছিলো খুব খুব প্রিয়। এগুলো আস্তে আস্তে আমার কাছে অধরা হয়ে গিয়েছিল ততদিনে। পুরো পৃথিবী থেকে আমি যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। সব সময় একলা থাকতে পছন্দ করতাম। কেউ বাসায় আসলে তাদের সামনে যেতে লজ্জা করতো, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম। বড্ড অসহায় লাগতো নিজেকে। এমন অনেক দিন গেছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অঝরে কেঁদেছি। খেতে মন চাইতো না কিছুই। অনেকেই তো আমাকে জিগ্যেস করে বসেছে, যে আমি মাস্টারবেট করি কিনা। লজ্জা আর ভয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। এভাবেই কাটছিল আমার অন্ধকারছন্ন জীবনের দিনগুলি।
.
তারপর যখন কলেজে উঠি তখন শুরু হলো জীবনের আরেকটা কালো অধ্যায়। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পরলাম। একটা মেয়ের প্রেমেও পড়েছিলাম; মাস চারেক পর অবশ্য তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। খারাপ লেগেছিল কিছুটা কিন্তু মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। তবে সিগারেটের আসক্তি দিনদিন বেড়েই চলেছিল। শারীরিক মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ছিলাম। খুবই একা মনে হত নিজেকে। সব থেকেও, যেন মনে হত কিছু নেই আমার। পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছিলাম অনেক আগেই। কিছুই মনে থাকতোনা। ভেতরটা সবসময় হাহাকার করতো।এদিকে ইচ্ছা করলেও মাস্টারবেশন ছাড়তে পারছিলাম না কিছুতেই। যতদূর মনে পড়ে অনেক কষ্টে একবার মাত্র ১৪/১৫ দিনের মত দূরে ছিলাম। কিন্তু এর বেশিদিন পারিনি। পরে আবার আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম।
.

Image may contain: text

কেনইবা আসক্ত হবো না, মন থেকে হয়তো কখনো চাইনি যে,এই অন্ধকার জগত থেকে বের হয়ে মুক্ত বাতাস গ্রহন করবো। এভাবেই চলছিল আমার দিনগুলো। যাক, অবশেষে এলো সেই শুভক্ষণ।
.
ভোরের সোনালি আলোয় সজীবতার ঘ্রাণ-

জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলিতে বেঁচে থাকার আশাটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ, কোন এক পড়ন্ত বিকেল বেলা কেন জানি খুব ইচ্ছা হল একটা খাতা আর কলম নিয়ে নিজের সমস্যা গুলা কলমের খোচায় খাতায় লিখতে। ব্যাস, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। শুরু করলাম লেখা, প্রথমে শরীরের ভেতরে আমার কী কী সমস্যা তাই লিখলাম, যেমন :-গ্যাস্ট্রিক, মাস্টারবেশন, এ ছাড়া আরো কিছু টুকিটাকি। আর শরীরের বাইরের সমস্যা হল :- দেরিতে ঘুমানো, অনেক দেরি করে ঘুম থেকে উঠা, বাজারে অনেক বেশি আড্ডা দেওয়া, ধুমপান করা ইত্যাদি। লেখার পর আনমনে ভাবতে লাগলাম, কিভারে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অবশেষ সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠবো। যদিও অন্যদিন আমি সকাল ১০টার আগে ঘুম থেকে উঠতে পারতাম না।
.
পরেরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলাম, তারপর রাস্তায় একটু হাঁটাহাটি করতে গেলাম। আহহ!!! কতদিন পর যে ভোরবেলার সূর্যটা দেখলাম। মনটা প্রশান্তি তে একদম ভরে গেল। কি যে ভাল লাগছিল আমার তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। এভাবে দুই চারদিন কেটে গেল, ঘুম থেকে উঠে প্রত্যেকদিন হাঁটাহাটি করলাম। তারপর থেকে প্রতিদিন ভোরবেলায় আম্মু ঘুম থেকে ডেকে দিত, ফজরের সালাত পড়ার জন্য। ফজরের সালাত যেহেতু জামা’আতের সাথে পড়া হয়, তাই অন্য ওয়াক্তের সালাত কাযা করতেও ইচ্ছে করত না। যেদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠার পর ফজরের সালাত কাযা না করার প্রতিজ্ঞা করছিলাম…আমার স্পষ্ট মনে আছে, তারপর থেকে আর কখনোই আমি মাস্টারবেট করিনি।
.
আলহামদুলিল্লাহ্‌! কেন যে মাস্টারবেশন আসক্তি একদম কেটে গিয়েছে তার কারণটা আজও অজানা। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে, আমি এমন একটা জঘন্য অভ্যাস এত সহজে ত্যাগ করতে পারব। আস্তে আস্তে আমি সালাতের খুযু খুশুর প্রতি মনোযোগী হলাম। আলহামদুলিল্লাহ্‌। সপ্তাহ দুয়েক পরে আমি ধুমপান করাও ত্যাগ করলাম। এটাও যে কিভাবে সম্ভব হলো তাও আমার কাছে অজানা। হয়তো মন থেকে ভাল হয়ে যেতে চেয়েছিলাম তাই।
.
তবে ধুমপান ত্যাগ করার পিছনে একটা কাহিনী আছে। একদিন এশা বাদ হাদিসের থেকে তালিম দেওয়ার সময় একটা হাদিস শুনছিলাম। তারপর নিয়্যত করলাম আর খাবো না। আর খাইনি। আলহামদুলিল্লাহ্‌! আল্লাহর অশেষ নিয়ামতে এখন ভালো আছি। মনে প্রশান্তি পাই সর্বদা। সব কাজ মন দিয়ে করতে পারি।
.
কিছু কথা-

প্রিয় ভায়েরা আমার, মন থেকে কিছু চাইলে আর নিয়্যত পরিশুদ্ধ করলে আল্লাহ্ সুবাহানু তা’আলা তাঁর বান্দাকে কখনো নিরাশ করেন না।
আল্লাহ্‌ সুবাহানু তা’আলার কাছে চান। মন থেকে দুআ করুন। হেদায়াত চান। ইনশাআল্লাহ, তিনি আপনাকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ দেখাবেন।
পানির ওপর ভেসে থাকা শাওলা যেমন একটুখানি ঢেউ এসে শাওলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি আল্লাহ্ সুবাহানু তা’আলার রহমতের ঢেউও আপনার সকল দুঃখ -কষ্ট কে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
.
অন্ধকার থেকে আলোর পথে ভ্রমণে যা শিখলাম-

১.পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তাকবীরের সাথে প্রথম কাতারে পড়ার চেষ্টা করতে হবে।
২. নফল সালাত বেশি বেশি করে পড়তে হবে।
৩. দৈনন্দিন যিকির- আজকার গুলো করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি হিসনুল মুসলিম এ্যাপ টা ব্যবহার করতে পারেন।
৪. সবসময় অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করতে হবে।
৫. চোখের হেফাযত করতে হবে।মাহরাম-ননমাহরাম মেইন্টেইন করে চলতে হবে।
৬. তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করতে হবে। এই নফল সালাতের অনেক অনেক ফজিলত।
.
নিজের কথাগুলোকে সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি। জানি ভাল হয়নি। কেননা লেখালেখির অভ্যাস আমার নেই। তাই কিছু ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ভুল গুলোকে শুধরে দিবেন। আর আমার জন্য দুআ করবেন। আল্লাহ যেন আমাকে হেদায়াতের ওপর অটল রাখেন। আমীন।

.
চলবে ইনশা আল্লাহ…
(লস্ট মডেস্টি টিম কর্তৃক ঈষৎ পরিমার্জিত)
.
পড়ুন আগের লিখা গুলো-

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

শেয়ার করুনঃ
খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (তৃতীয় পর্ব)

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (তৃতীয় পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

আমি এই পাপ কাজটার সাথে প্রথম জড়িয়ে পড়ি ১৫ কিংবা ১৬ বছর বয়সে বা তারও কম বেশি হবে সঠিক বয়সটা ঠিক মনে পড়তেছেনা। প্রথম প্রথম খুব একটা করতাম না, দু বার একবার করতাম। তারপর আস্তে আস্তে এটা আমার নেশায় পরিণত হয়ে গেল। সিগারেট যেমন মানুষ একটু সুযোগ পেলেই খেত আমিও সুযোগ পেলেই এই নিকৃষ্ট কাজটায় জড়িয়ে যেতাম। এটা ধীরে ধীরে আমাকে আমার পরিবার,সমাজ,বন্ধুবান্ধব থেকে আলাদা করে দিতে লাগল। সবসময় একা একা থাকতে ভালবাসতাম। কারও সাথে মিশতাম না,কোথাও যেতেও ভাল লাগতনা, বন্ধুরা যখন বিভিন্ন জায়গায় দলবেধে ঘুরত আর আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল তখন আমি বিভিন্ন অজুহাতে তাদের নিকট থেকে এক রকম পালিয়ে আসতাম।

কোন কিছুতেই মন বসাতে পারতাম না, না পড়া না খেলাধুলা। প্রতিবারই করার পর প্রতিজ্ঞা করেছি যে এইবারই শেষ বার আর কখনও করবনা, আর কখনও পর্ন দেখবনা, কিন্তু কোন লাভ হয়নি, আবার পর্ন দেখেছি আবার সেইম কাজ করেছি। নিজের কাছে খারাপ লাগতে শুরু করল,কোনভাবেই এই পাপ কাছ থেকে সরে আসতে পারছিলাম না। নামাজ পড়তাম কিন্তু কোনভাবেই নামাজে মনোযোগ বসাতে পারতাম না, যোহর পড়লে আসর পড়তাম না, আর ফজর সে তো আমার কাছে সোনার হরিণের মত মনে হত। নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে অপরাধী মনে হত। এইভাবে কয়েক বছর কেটে গেল।

এর মাঝেও হয়তো আমি কোন ভাল কাজ করেছিলাম, যার ফলে ২০১৩ সালে আমি আল্লাহর রহমতে ভালো একটা চাকরিতে জয়েন করলাম। কিন্তু এখানে এসে আমার আরও পর্ণের প্রতি আসক্তি বেড়ে গেল, কারন একটাই চাকরিতে জয়েন করার পর টাকা পয়সার তেমন অভাব ছিল না, জিবি জিবি নেট প্যাকেজ কিনে পর্ন দেখতাম আর নিকৃষ্ট কাজটা করতাম। এভাবেও কয়েক বছর কেটে গেল। লাস্ট কয়েক মাস আগে ফেসবুকে দ্বীনি পরামর্শ নামে একটা গ্রুপের দেখা পাই। এই গ্রুপের সাথে যারা জড়িত আছেন সবাইকে আল্লাহ তায়ালা দীর্ঘ জীবি করুক। এই গ্রপটা হয়তো আল্লাহর পক্ষে থেকে আমার জন্য হয়তো ছিল বিশেষ নিয়ামত। এই গ্রুপের প্রতিটা পোষ্ট আমি খুব গুরুত্বের সহকারে পড়তে লাগলাম।

আমার দিল নরম হতে লাগল, আমি কী করেছি এতদিন এইসব? নিজের খুব খারাপ লাগতে লাগল, প্রতিজ্ঞা করলাম আর জীবনে এই খারাপ কাজ করব না, করব না, করব না, এবার হয়তো আমি প্রতিজ্ঞাটা একদম মন থেকে করেছিলাম তাই হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। এর ফাকে পেয়ে গেলাম “মুক্ত বাতাসের খোজে” গ্রুপটার দেখা। এই গ্রুপের সাথে যারা জড়িত আছে,আল্লাহ তায়ালা তাদেরকও দীর্ঘজীবী করুক। এই গ্রুপের মাধ্যমে পেয়ে গেলাম মুক্ত”বাতাসের খোজে” বইটা, মাশা আল্লাহ অনেক সুন্দর একটা বই।

বইটা পড়ার পর আরও কঠিন প্রতিজ্ঞা করলাম। নামাজ শুরু করে দিলাম,৫ ওয়াক্ত জামাতের সাথে,হয় তো কাজের জন্য ২/১ ওয়াক্ত নামাজে জামাত মিস হয়ে গেছে, কিন্তু সর্ব্বোচ চেষ্টা করেছি। তাহাজ্জুদ প্রতি রাতেই পড়ার চেষ্টা করি, তাহাজ্জুদ পড়ে প্রতি রাতেই আল্লাহর কাছে কেঁদেছি, সাহায্য চেয়েছি, নিজের নজরকে কন্ট্রোল করতে শুরু করলাম, ফোন মেমরি থেকে সকল ভিডিও ডিলিট করে দিলাম, ইউটিঊবে সব ইসলামিক চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে নিলাম, কাজের বিরতিতে আল্লাহর কাছে তওবা করলাম, হাটতেছি তাতেও আল্লাহর কাছে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে ক্ষমা চাচ্ছি, শুয়ে আছি তাতেও, সবসময় আল্লাহ যিকির মুখের মধ্যে আছেই।

যার ফলে আল্লাহ হয়তো আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। আর প্রায় ৪ মাস হয়ে গেল আমি এইসব থেকে দূরে আছি। আর এখন নামাজে অনেক মজা পাই, এক ওয়াক্ত নামাজ মিস হয়ে গেলে বুক ফেটে কান্না চলে আসে। এখন নিজেকে ছোট বাচ্চাদের মত মনে হয়,ছোট বাচ্চারা যেমন সব সময় হাসিখুশি থাকে আমিও তেমনই থাকি,কাজের ভিতর মজা পাই, সবার সাথে মিশে গল্প গুজব করে সময় কাটাই, আল্লাহকে ডাকি, সময়মত নামাজ পড়ি। জানিনা আমি কতটুকু পেরেছি,আর এইভাবে কতদিন থাকতে পারব,তবে আমি মনে করি আমি পেরেছি আল্লাহর বিশেষ রহমতে।

তাই ভাই আসুন, আমরা যারা এখনও এই খারাপ কাজের সাথে জড়িত আছি আজকে এই মুহুর্ত থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে এই খারাপ কাজ থেকে ফিরে আসি। বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকি, দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি,সম্ভব হলে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই কান্নাকাটি করি। জান্নাত,জাহান্নাম,সম্পর্কে বেশি বেশি জানার চেষ্টা করি। দিনে অত্যন্ত কয়েকবার মৃত্যুকে স্মরণ করি। বিভিন্ন ইসলামিক আলোচনা শুনি।

আল্লাহ নিশ্চয় আমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন,কারণ আমরা আল্লাহকে যত ভালবাসি আল্লাহু তার চেয়েও অনেক বেশি আমাদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ নিজেও চান না তার বান্দারা জাহান্নামে যাক।

ভাই আমাদের হাতে কত সময় আছে আমরা কেউ জানিনা, তাই যতটুকু সময় পাই কাজে লাগাই,আল্লাহর পথে ফিরে আসি সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে। আমি পেরেছি ভাই,আপনিও পারবেন আমরা সবাই পারব ইনশা আল্লাহ।

ভাই আমরা সবাই একদিন মৃত্যু বরণ করব আগে আর পরে,তাই মৃত্যু আসার আগেই নিজেই প্রস্তুত করে নেই পরকালে শান্তির আশায়। পরকালে প্রতিটা কাজের জন্যই আমাদেরকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে, তখন ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ নাই,লুকোচুরির কোন সুযোগ নাই ভাই, তাই আসুন আমরা দুনিয়াতে এমন কোন কাজ না করি যাতে আল্লাহর কাছে লজ্জিত হতে হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুক (আমিন)।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

আগের পর্বগুলো-

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (প্রথম পর্ব)
খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (দ্বিতীয় পর্ব)

শেয়ার করুনঃ
খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (দ্বিতীয় পর্ব)

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (দ্বিতীয় পর্ব)

আসসালামু আলাইকুম। ভাই আপনাদের প্রতি অনুরোধ আমার এই লেখাটা ছাপাবেন। এটা আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সত্যি একটা ঘটনা। এতে যদি উম্মাহর কোনো তরুণ বা তরুণী উপকৃত হয় তবেই আমার লেখা সার্থক।

আমার হস্তমৈথুনের অভ্যাসটা শুরু হয়েছিল ক্লাস সেভেন থেকে। তখন বয়স ১২ কি ১৩ বছর। একদিন বাথ্রুমে গিয়ে গোসল করতে করতে অনেকটা নিজের অজান্তেই এই পদ্ধতিটা আবিষ্কার করে ফেলি। মনে আছে খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। তখন পর্যন্ত পর্ণ জগতের সাথে আমার জানাশোনা ছিলো না। পরিচয়টা ঘটে এর কিছুদিন পরেই। এখন যেমন মোবাইল, ল্যাপটপ বা ইন্টারনেটে এগুলো ডাল্ভাত হয়ে গেছে তখন এমন ছিলো না। যখনকার কথা বলছি তখন বাংলাদেশে এই সর্বনাশা ভাইরাসটা একটু একটু করে পাখা মেলতে শুরু করেছে। মানুষের হাতে তখন সস্তা চায়না ফোন গুলো আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন মোবাইলের দোকান থেকে মেমরী কার্ডে পর্ণ লোড করে নেয়া যেত। মানুষ এগুলো থেকে ব্যবসা করতো।

তো যাই হোক, একদিন এক কাজিন ডিভিডিতে করে কিছু পর্ণ নিয়ে আসলো। মনে আছে প্রথমবার ওগুলো দেখার পর ভীষণ খারাপ একটা অনুভূতি কাজ করছিলো। বমি আসতে চাইছিলো যেনো। ভেবেছিলাম আর দেখবো না। কিন্তু কিছুদিন পর ওই কাজিনের পাল্লায় পরে আবার দেখে ফেললাম। প্রথমবারের তুলনায় এবার আর অতটা খারাপ লাগলো না। বরং কিছুটা ভালোই লাগলো। সেই থেকে শুরু। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১১ টি বছর। এই ১১ টি বছরে খুব কম দিনই আমার জীবনে এসেছে যেদিন আমি হস্তমৈথুন করিনি অথবা পর্ণ দেখিনি। এসএসসি পরীক্ষার পর আমাকে বাসা থেকে একটা কম্পিউটার কিনে দেয়া হয়। সেই কম্পিউটার পেয়ে আমি মহা খুশি। চুটিয়ে পর্ণ দেখা শুরু করলাম। কিন্তু একদিন ধরা পড়ে যাই। আমার আব্বা আম্মা খুব কষ্ট পেয়েছিলো সেদিন। আমার আম্মা আমার সাথে অনেকদিন কথা বলেননি।

এই সময় একটা ঘটনা ঘটে। একদিন তরকারি কাটতে গিয়ে আমার আম্মা হাত অনেকখানি কেটে ফেলেন। দরদর করে হাত থেকে রক্ত ঝরছিলো। আমি দৌড়ে গেলাম মাকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু আমার মা আমাকে তাকে স্পর্শ করতে দিলেন না। তার কথাটা আমাকে এখনো মনে আছে। তিনি সেদিন বলেছিলেন, “তুই আমাকে ছুবি না”। আমার অসম্ভব খারাপ লাগলো। নিজেকে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট মনে হলো। ইচ্ছে হলো মরে যাই। অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখলাম। আমার ছোট ভাই সেদিন মায়ের সেবা করেছিলো। তার হাতে সেলাই করতে হয়েছিলো। অথচ তিনি কোনো ব্যাপারে আমার সামান্যতম কোনো সাহায্যও নেননি।

ইন্টারে ঢাকায় একটা নামকরা কলেজে ভর্তি হলাম। এই ২ টা বছর আমি তেমন পর্ণ দেখিনি। বলা চলে সুযোগ পাই নি। কারন আমার কাছে ১ টা ফোন ছিলো যা দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যেতো না। তবে হস্তমৈথুন বলতে গেলে নিয়মিতই চলতো। অনেকবার চেষ্টা করেছি ছেড়ে দেয়ার। একবার ১১ দিন না করে ছিলাম। কিন্তু তারপর আর পারি না। এভাবে আমি আমার জীবনের আরও কয়েক বসন্ত পার করে দিলাম। .

ভার্সিটিতে উঠে ল্যাপ্টপ, মোবাইল, ইন্টারনেট সবকিছু সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় পর্ণ দেখার মাত্রা আগের চেয়ে বেড়ে গেলো। একসময় আবিষ্কার করলাম আমার আর সফটকোর টাইপের কোনো পর্ণ আর ভালো লাগে না। দিন দিন আরও বেশি এগ্রেসিভ পর্ণ এর প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকলো। একটা সময় দিনে ৩ বা ৪ বার হস্তমৈথুন করা অভ্যাস হয়ে গেলো। শরীর দূর্বল হয়ে গেলো। কোনো কিছুতে উৎসাহ পেতাম না। এই রকম একটা অবস্থায় চলে গেলে আরো তিনটি বছর।

একটা মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো। প্রথম প্রথম জাস্ট ফ্রেন্ড টাইপ সম্পর্ক থেকে একটা সময় গিয়ে প্রেমের সম্পর্কে এটা রূপ নেয়। আর এই সময় আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মারাত্নক ভুলটা করে বসি। আমি মেয়েটার সাথে যিনায় লিপ্ত হই। একবার না। বেশ কয়েকবার তার সাথে আমি এই জঘন্য পাপাচার করেছি। আমি আবিষ্কার করলাম একটা মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে যে পরিমাণ আনন্দ পাওয়ার কথা আমি আসলে তা পাচ্ছি না। পর্ণ দেখতে দেখতে নিজের ওপর এমন অত্যাচার করেছিলাম যে আমি ধরেই নিয়েছিলাম পুরুষ মানুষ হচ্ছে মেশিনের মতো। সে যতো বেশি সময় নিজেকে ধরে রাখতে পারবে ততই তার কৃতিত্ব। এই জঘন্য অপরাধ করতে করতে একসময় আমার ভেতর থেকে পাপবোধ চলে গেলো।

আগে শুক্রবার অন্তত জুমা পড়তে যেতাম। আস্তে আস্তে তাও ছেড়ে দিলাম। পাপ পঙ্কিলতায় ডুবে থাকার কারণে আমার অন্তরের শান্তি নষ্ট হয়ে গেলো। আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না। অল্পতেই অতিরিক্ত টেনশন করতাম। আমি প্রচুর টাকা খরচ করতাম। সিগারেট খেতাম। মাঝে মাঝে মদ গাঁজাও খেতাম। আস্তে আস্তে একটা আস্ত নরপশুতে পরিণত হলাম আমি। এভাবেই চলছিলো। এরপরই খুব দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটে গেলো আর আমার অগোছালো নোংরা জীবনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিকে মোড় নিলো।

একদিন কোনো এক আল্লাহর বান্দার হাত থেকে আমার হাতে “মুক্ত বাতাসের খোঁজে” বইটি এলো। পড়তে শুরু করলাম। সম্পূর্ণ বইটি পড়ার পর মনে হলো বইটি মনে হয় আমার জন্যই লেখা হয়েছে। বিশ্বাস করুন একটুও বাড়িয়ে বলছি না, আমি এর আগে অনেক বই পড়েছি কিন্তু এই বইটি প্রথমবারের মতো আমার ভেতরটাকে নাড়া দিয়ে গেলো। আলহামদুলিল্লাহ, এই বইটি পড়া শেষ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি কোনো পর্ণ দেখিনি বা হস্তমৈথুনও করি নি। এই অবস্থায় আমার জন্য রিলেশনটা একটা বড় ফিতনা হিসেবে সামনে দাড়ালো। আমি তখন একটু আধটু নামাজ পড়া শুরু করেছি। যিনার শাস্তি সম্পর্কে ইসলামের বিধান কি তা যখন জানলাম তখন অঝোরে কাঁদলাম। আর-রহমানের দরবারে হাত তুলে ক্ষমা চাইলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম আর এ পথে পা পাড়াব না।

.কিন্তু হায়! বিধি বাম সাধলো এবারো। আমার গার্লফ্রেন্ড ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছিলো আমাকে তার সাথে দেখা করার জন্য। সে আমার পরিবর্তনটা আঁচ করতে পেরেছিলো। কিন্তু আমি দেখা করতে রাজি হচ্ছিলাম না। ফোন দিয়ে প্রচুর কান্নাকাটি করলো। একসময় আমি তাকে বললাম যে দেখো আমি এখন থেকে চেঞ্জ হয়ে যাবো। নামাজ পড়বো, দাড়ি রাখবো। হারাম রিলেশন রাখবো না। সে আমার কথা শুনে খুবই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলো। এতদিন আমি কি কি করে এসেছি সেই ফিরিস্তি আমাকে শোনাতে লাগলো। সন্দেহ নেই যে কথাগুলো সত্যি। আমি শুধু বললাম, আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল। চল তুমি আমি দুইজনই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেদের পরিবর্তন করে ফেলি। আমি তাকে বিয়ে করে ফেলার প্রস্তাব দিলাম শুধু এই শর্তে তাকে পুরোপুরি পর্দা করতে হবে এবং ইসলামি বিধান মেনে চলতে হবে। সে রাজি হলো। শুধু বললো সে একবার শুধু দেখা করতে চায়। আমি রাজি হলাম এবং এইখানেই শয়তানের পাতা ফাঁদে পা দিলাম। আমার ঈমান তখনো অনেক দুর্বল। তাই সহজেই শয়তানের ধোকায় পড়ে গেলাম। আরে একবারই তো দেখা করবি। আর বিয়ে তো করেই ফেলবি সুতরাং চিন্তা কি? ফলে যা হওয়ার তাই হলো। আমি আবারো যিনায় লিপ্ত হলাম।

এইবার আমার অনুশোচনা হলো। প্রচন্ড অনুশোচনা। হায়! আমি এ কি করলাম? আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দেয়ার পরও কি করে এই কাজ আমি করতে পারলাম? অনুশোচনায় ভিতরে ভিতরে দগ্ধ হতে থাকলাম। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কাঁদলাম, “হে আল্লাহ, আমি আমার নিজের নফসের ওপর জুলুম করেছি। আমি গোনাহগার, আমই পাপী, আমি নিকৃষ্ট এক বান্দা। তবু আমি তো তোমারই বান্দা। শুধু নেক বান্দারাই যদি তোমার রহমত প্রাপ্ত হয় তবে আমরা গোনাহগাররা কই যাব হে মাবুদ? তোমার কাছ থেকে হিদায়াত পাওয়ার পরেও আমি তার মূল্যায়ন করতে পারি নাই। হে আমার রব্ব, আমি লজ্জিত, আমি অনুতপ্ত অতএব আমাকে ক্ষমা করে দাও। নিশচয়ই তুমি ক্ষমশীল, পরম দয়ালু।“

আমি তাহাজ্জুদ পড়া শুরু করলাম। রাত দেড়টা দুইটার দিকে ঘুম থেকে উঠে বাকি রাত নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে অঝোরে কাঁদতাম। ডুকরে ডুকরে কেঁদে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকলাম। এরই মধ্যে রমাদান মাস চলে এলো। এতদিন এই মাসটাকে অবহেলা করে এসেছি। কিন্তু এবার জানলাম এই মাস এমন এক মাস যেই মাসে মহান আল্লাহ তা’আলা জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেন আর জাহান্নামের দরজা গুলো বন্ধ করে দেন। শয়তানকে শিকল পড়িয়ে বেঁধে রাখা হয়। বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় এই মাসে। আল্লাহ তার ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন এই মাসে। ভাবলাম এই সুযোগ, এই মাস পুরোপুরি কাজে লাগাবো। মনপ্রাণ দিয়ে ইবাদত করবো। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো। এরই মধ্যে একদিন খবর পেলাম আমার গার্লফ্রেন্ড প্রেগ্ন্যান্ট।

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। হায়! এখন কি করবো? আমাকে সে চাপ দিলো বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে চায় তাই তার সাথে দেখা করতে বললো। আমি কিছুতেই রাজি হলাম না। আমি তাকে বিয়ে করতে বললাম আর বলে দিলাম পুরোপুরিভাবে দ্বীন ইসলামে সে যেনো প্রবেশ করে। সে সময় চাইলো। আমি তাকে সময় দিলাম। আর ওদিকে আমি ক্ষমা চাইতে থাকলাম আল্লাহর কাছে। উঠতে বসতে সারাক্ষণ আমি তওবা করতাম। আমি সারাদিন রোজা রাখতাম। ইসলাম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতাম আর রাতে খুব অল্প সময় ঘুমিয়ে বাকি রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতাম। দীর্ঘ সময় সিজদায় পড়ে পড়ে আল্লাহ তা’আলার করুণা ভিক্ষা করতাম। “হে আল্লাহ, আমি অপরাধ করেছি। আমি তোমার আদেশ অমান্য করেছি। আমি বড় বিপদে পড়েছি। আমার কারণে একটা নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে গেছে। ও আল্লাহ, ক্ষমা করে দাও আমায়। আমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করো। আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তুমি ছাড়া আমাকে বাঁচানোর কেউ নেই। সাহায্য করো হে আমার রব্ব। সাহায্য করো।“

ফজরের পর সবাই যখন ঘুমাতে চলে যেতো আমি তখন মসজিদের পাশের একটা মাঠে চলে যেতাম। দু হাত তুলে রবের দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা চাইতাম। চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু নেমে আসতো। সে অশ্রুতে প্লাবিত হতো, দু গাল, সদ্য রাখতে শুরু করা শ্মশ্রু। “হে আল্লাহ আমি তোমার রহমত থেকে নিরাশ হই নি। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নাই। আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। মেহেরবানী করে আমাকে ক্ষমা করে দাও।“ কাঁদতে কাঁদতে কখনো কখনো মাটিতে লুটিয়ে পড়তাম। ভোরবেলার ঝিরঝিরে পবিত্র বাতাস আমার শরীরের ওপর দিয়ে আল্লাহর রহমতের পরশ বুলিয়ে দিত। যেনো বলতে চাইত, “দুঃখ কোরোনা। নিশ্চই তোমার রব্ব পরম দয়ালু।“ ۞ نَبِّئْ عِبَادِىٓ أَنِّىٓ أَنَا ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ﴿٤٩﴾ “আমার বান্দাদের জানিয়ে দাও যে, আমি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (সূরা আল-হিজর, আয়াত ৪৯)

এরই মধ্যে ক্বদরের রাত চলে এলো। এই দশ রাতের প্রতিটি রাত সারারাত সলাত আর কুরআন তিলওয়াতে কাটলো। সেই দশ রাতের অভিজ্ঞতা আমার পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব না। হায়! সেই দশ রাত যদি আবার ফিরে পেতাম! ঈদের দিন এলো। খুশির দিন। কিন্তু আমার মনে অপরাধবোধ। আল্লাহ কি আমায় ক্ষমা করে দিয়েছেন? নাকি আমি ক্ষমা করিয়ে নিতে পারি নি?

ঈদের সলাত আদায় করতে গেলাম। ইমাম সাহেব বললেন যে এই দিনে সলাত আদায়ের পর যারা সারা রমাদান মাস সিয়াম পালন করেছে তাদের এমনভাবে ক্ষমা করে দেয়া হয় যেনো সদ্য জন্মানো শিশু। সলাত শেষ হলো। ইমাম সাহেব হাত উঠালেন। দুআ শুরু করলেন। সবাই কাঁদতে শুরু করলো। আমিও চোখের পানির বাঁধ ছেড়ে দিলাম। কাদঁতে কাদঁতে দাড়ি ভিজে গেলো। একটা সময় দুআ শেষ হলো। কিন্তু আমি উঠতে পারছিনা। আমি তখনো কেঁদেই যাচ্ছি কেঁদেই যাচ্ছি। কান্না থামাতে পারছি না। “হে আমার রব্ব, আমি সত্যিই অনুতপ্ত। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন।” এক সময় মানুষ উঠে কোলাকুলি শুরু করলো। আমি তখনো কেঁদে যাচ্ছি। আমার বাবা আমার পাশে এসে দাড়ালেন। পরম মমতা নিয়ে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও। .

আমার দুআ আল্লাহ ত’আলা শুনেছেন। তিনি আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। সে অন্য গল্প। আমার জীবনে আমি এখন অনেক সুখী। সব ধরনের আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। যারা আমার মতো আছেন তাদের প্রতি আমার একটাই কথা, ভাই/বোন কখনো হতাশ হবেন না। আপনি যত বড় গুনাহই করেন না কেনো আপনি ক্ষমা চাইলে আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেনই। দরকার শুধু আপনার একটু চেষ্টা আর আন্তরিকতা। তাই নিজের হতাশাকে একেবারে ঝেড়ে ফেলুন। উঠুন, দেখুন কত সুন্দর এই পৃথিবী। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করুন। দেখবেন জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সিরাতল মুস্তাকিমের পথে চলার তৌফিক দিন, আমিন।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

পড়ুন-

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (প্রথব পর্ব)

আরো পড়ুনঃ

নীড়ে ফেরার গল্প

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

শেয়ার করুনঃ
খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (প্রথব পর্ব)

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (প্রথব পর্ব)

আহ্নিক গতির উছিলায় সময়টা এখন রাত। কীরকম একটা হতাশা কাজ করছে আমাদের ছেলেটার ভেতর। আমাদের সেই ছোট্ট ছেলেটা – যে বাবার হাত ধরে শুক্রবারে জুমুআয় যেতো। ছোটোবোনকে মাছের মাথাটা দিলে কেঁদে বুক ভাসাতো। রাতের বেলা দাদীর বুকে মাথা রেখে কেচ্ছা-কাহিনী শুনতো। একটু হাঁটার পর যে হোঁচট খেতো, সেই ছোট্ট ছেলেটার মাথায় ঘুরতে শুরু করে ‘না পাওয়ার সব গল্পগুলো’। জীবনটাকে তুচ্ছ মনে হলো। জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো৷

সে জানে না চিরমুক্তির উপায় কী। তবে হ্যাঁ, এ হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তির একটা উপায় জানে সে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে পড়ে থাকা নিথর শরীরের দিকে অপলকে চেয়ে আছে সে। প্রিয়তমাকে কাছে পাওয়ার আগ্রহো বাড়লো তার। বিকৃত যৌনতা তার মাথায় প্রোগ্রামিং এর মতো গেঁথে দিলো ল্যাপটপের স্ক্রিনের ঐ লোকগুলো। আহা! এ যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি। কোনো ব্যাথা নেই, কোনো হতাশা নেই৷ শুধু শান্তি আর শান্তি।

হঠাৎ করে রুমের দরজাটা খুলে গেলো। স্ক্রিন থেকে চোখ উঠালো আমাদের সেই ছোট্ট ছেলেটা। ছোটো বোনটা দাঁড়িয়ে আছে দরজা ধরে। ছোটবোনের আগমনে তার ভেতরের কামুক সত্ত্বাটা জেগে উঠেছে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিলো সে। দমিয়ে রাখলো, বোনকে কাছে পাওয়ার আকাঙখা।

ক্লাসরুমে ম্যাডাম যখন লেকচার দেন, বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন হাসিতামাশা তো আছেই৷ ম্যাডামের শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে আলোচনা করার মাঝে আলাদা একটা উত্তেজনা টাইপ ব্যাপার আছে। সবাই এটা বুঝবে না। লেকচারের ফাঁকে ফাঁকে সে হারিয়ে যায় সেক্স ফ্যান্টাসিতে। পিয়নের বাজা বেলের শব্দে ভেঙে যায় সেই ফ্যান্টাসি। পিয়নকে মনে মনে গালমন্দ করে সে।

একসময় সে লক্ষ্য করলো – যে বাতাসে সে নিশ্বাস নিচ্ছে, সেটা দূষিত। কোনো কাজ করে তৃপ্তি পাচ্ছে না। সামনে পরীক্ষা। পড়া মনে থাকছে না। ঝাপসা লাগে প্রায়সময়। সারাদিন শুধু ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মায়ের কথা শুনলে ইচ্ছে করে – মহিলাটার মুখে স্কচটেপ মেরে দিই৷ সব কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা লাগছে। এভাবে আর কত…?

একসময় তার টনক নড়ে। বুকের মাংসপেশি কেঁপে উঠে৷ খিঁচুনি দিয়ে ওঠে সমস্ত শরীর৷ সে বুঝতে শুরু করে – এটা তার জীবনের উদ্দেশ্য নয়। নিজেকে পাল্টাতে হবে। কিন্তু কী থেকে শুরু করা যায়? হ্যাঁ, প্রথমে তাকে বের হতে হবে – এই বিষাক্ত বাতাস থেকে। পর্নোগ্রাফি। নীল এই অন্ধকার থেকে বের হতে পারলেই সব করা যাবে ইনশাআল্লাহ।

এবারের লক্ষ্য পরীক্ষায় ভালো মার্কস পাওয়া নয়। কিংবা দামী রেষ্টুরেন্টে বসে এক মিনিটে একটা বড়সড় বার্গার খাওয়াও নয় – এবারের লক্ষ্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সন্তুষ্টি।

একে একে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে পড়ার চেষ্টা করলো সে। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো খুব। এখন অবশ্য মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। ক্ষিধের যন্ত্রনায় আমাদের ছেলেটার রাগে সব ভেঙে ফেলার মতো অবস্থা হতো। এখন সে প্রায় প্রতি সপ্তাহে দুটো করে রোজা রাখে। কথায় কথায় রাগে না এখন সে। ক্লাসরুমে ম্যাডাম আসলে ম্যাডামের দিকে না তাকিয়েই ক্লাস করে। পাশের বাসার আন্টিদের সাথে দেখা করে না। দারোয়ান মামাকে নিয়মিত সালাম দেয়।গত জীবনে যা যা করেছে, সব কিছুর জন্য অনুতপ্ত সে। এখন আর গুনাহ করার ফুসরত নেই। বাকী জীবনটা এভাবে কাটিয়ে দিলেই হবে।

আমাদের ছেলেটা তো এই বিষাক্ত বাতাস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ভাই আমার, তুমি পেরেছো তো? যদি না পারো, প্লিজ ফিরে এসো ভাই আমার। একবার চিন্তা করো, এই অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয়, কী ভয়ঙ্কর পরিণতিটাই না হবে তোমার। ছোটোবেলায় ভুলবশত তুমি যখন জ্বলন্ত মশার কয়েলে পা দিয়ে ব্যাথায় ছটফটিয়েছো, সেই ব্যাথার কথা মনে আছে? জাহান্নামের আগুন তার চেয়েও ভয়ংকর। সত্তর গুণ ভয়ংকর। আঙুলে লাগলে কলিজা পর্যন্ত জ্বলে যাবে। তাহলে, কোন সাহসে তুমি এই বিষাক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছো?

হে ভাই আমার, অন্ধকার রুম থেকে বেরিয়ে এসো। জানালাটা খুলে দাও। নীল একটা আকাশ দেখতে পাবে৷ আকাশের বুকে উড়ে যেতে দেখবে সুন্দর সুন্দর পাখিদের৷ বিষাক্ত বাতাস থেকে বেরিয়ে এসো, নিশ্বাস নাও মুক্ত এই বাতাসে….

লিখা : ওমর ইবনে সাদিক…

নীড়ে ফেরার গল্প

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

শেয়ার করুনঃ
নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

আসসালামু আলাইকুম

অন্ধকারকে আলো ভেবে জড়িয়ে ধরা ছেলেটার গল্প এটি। মরীচিকাকে সে ছুঁতে চাইতো, মিথ্যাকে আপন ভেবে গায়ে মাখাতো, বুকের মধ্যে পুষে রাখতো অভিশপ্ত এক জঞ্জালকে।
.
ছোটবেলা থেকেই আমাদের ‘ছেলেটা’ ভালো স্টুডেন্ট ছিলো। একেবারে, মায়ের চোখের মনি, বলতে গেলে সবার চোখের মনি, মায়ের ক্ষেত্রে একটু বেশীই ; কারণ মায়েরা মমতাময়ী। সারা পৃথিবীর সমস্ত মমতা এনাদের থেকেই আসে। মায়ের চোখের আড়াল হতো না সে। চাইলেও মা হতে দিতো না। সন্ধ্যায় যখন সে বন্ধুদের সাথে খেলার পরে মাগরিবের নামাজ পড়তে যেতো এবং ফিরতে একটু দেরী হতো, বোরকা চাপিয়ে বেরিয়ে পড়তো মা, সাথে থাকতো একবুক হতাশা আর ছেলে হারানোর ভয়।

আমাদের ‘ছেলেটা’ একটু বড় হলো, স্কুলে ভর্তি হলো। কী কান্নাটা-ই-না কেঁদেছিলো সেদিন। ছেলেটার কান্না গিয়ে ধাক্কা দেয় একজন স্যারের বুকে। ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলেন সোফার বালিশের মতো। হাতে গুঁজে দিলেন কিছু টাকা। আল্লাহ স্যারটাকে ভালো রাখুক সবসময়। দুবছর পড়ার পর ছেলেটা এলো নতুন স্কুলে। নতুন মানুষ। নতুন পরিবেশ। ছেলেটা পরিচিত হয় ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটার সাথে। কিছু বন্ধু তৈরী হয় তার। কত্ত সুন্দর জীবন যাচ্ছিলো তার….

আগেই বলেছিলাম, আমাদের ‘ছেলেটা’ ভালো স্টুডেন্ট ছিলো। ক্লাস ফাইভে পরীক্ষা দিয়ে সে আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার অশেষ রহমতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। সবাই মাথায় নিয়ে নাচতে থাকলো আমাদের গল্পের নায়ককে। এত্ত খুশী, এত্ত আনন্দ রাখার জায়গা তো মা-বাবা খুঁজে পাচ্ছে না।

হাইস্কুলে পা রাখলো আমাদের ‘ছেলেটা’। নতুন নতুন গোঁফ গজানো শুরু হলো। বুক উঁচিয়ে চলার প্রবণতা বাড়লো। দুনিয়াটাকে নিজের মতো বানাতে শুরু করলো আমাদের গল্পের হিরো। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি জন্মালো আকর্ষণ। নেতিবাচক জিনিস জানার আকাঙ্ক্ষা তাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে নিয়েছে তার আট পায়ে। ছোটোবেলা থেকেই টিভিতে বাংলা ছবি দেখতো সে। একটা সময় বুঝে উঠে সে, জীবনকে আরো সুন্দর করতে হলে দরকার একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষ। সে ডুবে থাকতে লাগলো অবাস্তব সব কল্পনায় – এদিকে মা-বাবা একের পর এক লড়ে যাচ্ছে তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার উদ্যমে।

হাইস্কুলের বন্ধুগুলোকে বড্ড স্মার্ট মনে হতো আমাদের ‘ছেলেটার’। কত্ত আধুনিক ওরা। কথায় কথায় গালি আওড়াতে পারে। হিন্দী গান বুঝে – আবার গাইতেও পারে। ছেলেটা তাদের সান্নিধ্যে আসলো। লুফে নিলো সেই আকাঙ্ক্ষিত (!) গালি গুলো। এখন সেও গালি দিতে পারে। জীবনের উপর যে সাদা-কালোর পরতটা ছিলো, সেটা সরে যাচ্ছিলো দিনদিন। আহা, কত্ত সুন্দর এই পৃথিবী। কিছু বন্ধুকে খুব ভালো লাগতো তার। তারা মাঝেমাঝে ওকে ধরে নামাজে নিয়ে যেতো। সবাই মিলে মানুষকে বিরক্ত করতো। হোটেলে গিয়ে বিল চাপিয়ে দিতো একে অন্যের ঘাঁড়ে।
.
একদিন বাসার ছাদে আমাদের ‘ছেলেটা’ আবিষ্কার করে বসে এক নতুন জিনিস। অভিশপ্ত এক জিনিস। যেটা নষ্ট করে একজন মানুষকে, একটা পরিবারকে, একটা জাতিকে। পর্নোগ্রাফি। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে পড়ে থাকা উলঙ্গ শরীরটাকে দেখে বড্ড আনন্দ হতো ছেলেটার। একে একে পরিচিত হলো চটিগল্প আর মাস্টারবেশনের সাথে। একটু একটু করে পাওয়া এই সাময়িক সুখ বাড়াচ্ছিলো হতাশা, গ্লানি আর পরনির্ভরতা।
.
কম্বাইন্ড ক্লাস ছিলো আমাদের ‘ছেলেটার’ স্কুলে। একপাশে ছেলেরা বসতো, একপাশে মেয়েরা। কোনো একদিন সৌভাগ্যবশত (নাকি দূর্ভাগ্যবশত?) দেখা পায় একটি মেয়ের। তাদেরই ক্লাসের। ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেটা মাঝেমাঝে দেখতো মেয়েটা’কে। ছেলেটা এ কথা কাউকে জানালো না। নিজের মধ্যে চাপিয়ে রাখলো। মেয়েটাকে স্যাররা কখনো বকাঝকা করলে বা মারলে, আড়ালে স্যারকে গালি দিতো আমাদের হিরো। গালি দেয়া তার অভ্যেসে পরিণত হলো।
.
কিছুদিন ছেলেটা, মেয়েটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে দেখতেই পার করে দিলো। ছেলেটার ফেসবুক একাউন্টে একদিন সন্ধ্যা বেলায় ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে ক্লাসের সেই মেয়েটির। সমস্ত শরীরটা অবশের মতো হয়ে উঠলো। আমাদের ‘ছেলেটা’ হুট করে বলেই দিলো – আই লাভ ইউ। মেয়েটা অসম্মতিসূচক কিছু বলেনি। একরাতে লজ্জা ভেঙে মেয়েটাকে ফোন দিয়ে বসে ছেলেটা। দু-তিনবার চেষ্টার পরে দুজনেই সম্মলিতভাবেই কথা বলতে সক্ষম হয়। এরপর প্রত্যেকদিন রাতেই ছেলেটা কথা বলতো মেয়েটার সাথে। দুজনে ম্যাচিং ড্রেস পরে ক্লাসে আসতো। একদিন মেয়েটাও বেঞ্চের নিচ দিয়ে ছেলেটার হাত ধরে বসে। ছেলেটা নিজেকে সামলে নিয়েছিলো কোনোমতে।
.
ছেলেটার জেএসসি পরীক্ষা সামনে। মা-বাবার ঘুম হচ্ছে না টেনশনে। কোনো একটা কারনে ছেলেটার মনে হয়, মেয়েদের পর্দা করা ফরজ। কিন্তু তার প্রিয়তমা পর্দা করে না। পর্দা করা নিয়ে ঝগড়া করেই জেএসসি পরীক্ষার সময় আমাদের ‘ছেলেটা’ তার এই জীবনের(অবান্তর) ইতি টানলো। জেএসসি শেষ করলো। রেজাল্ট দিলো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রহমতে সে আবারো ভালো রেজাল্ট করেছে। কিন্তু, বন্ধুদের দেখাদেখি করে। কিছুদিন পর সে ভুলে গেলো বিপরীত লিঙ্গের সেই মানুষটাকে।
.
এরই মাঝে ডুবে গেলো অন্য এক জগতে। সেখানে আছে গান, মিউজিক, মুভি। একে একে সে পরিচিত হলো মিউজিকের বিভিন্ন জনরার সাথে। রক, মেটাল, হেভি মেটাল, ব্ল্যাক মেটাল, ডেথ মেটাল, থ্র‍্যাশ মেটাল…. এখন আর সে তার নতুন প্রিয়তমার হাত ধরতে লজ্জা পায় না।
.
ছেলেটার বন্ধুত্বের খাতায় যোগ হয় কিছু নতুন বন্ধু। কোনো একসময় সে আবারো পরিচিত হয় নতুন এক মেয়ের সাথে। কিন্তু বন্ধু হিসেবে। মেয়েটার পাশে যতক্ষন সে থাকতো, তার হার্টবিট বাড়তো শুধু। সে চাইতো মেয়েটা তার হাত ধরুক। সারাক্ষন তার সাথে কথা বলুক। কিন্তু, সে এই সম্পর্কটাকে (নাকি বেহায়াপনা?) নাম দিয়েছে ফ্রেন্ডশীপ। দুজনে প্রাইভেট পড়তো একসাথে। স্যারের অনুপস্থিতিতে স্যারের রুমের সে জড়িয়ে যায় এক অভিশাপের সাথে, এক পাপাচারের সাথে। যিনা। রুমের লাইট অফ করে দিয়েছিলো সে। মেয়েটার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না সে। পাশের রুম থেকে আসা মৃদু আলোতে সে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরার অনুমতি পেয়েছিলো। আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা তাকে এই যিনার গুনাহ থেকে মাফ করুন। সুযোগ পেলেই সে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতো, চুমু খেত। জীবনের অর্থ বদলে গেছে। মরীচিকাটা’কে সে সত্যি ভাবতে শুরু করলো।
.

ততদিনে তার ঈমান খুব ভালো ভাবেই দূর্বল হয়ে পড়ে। সারাদিন মিউজিক নিয়ে থাকতো, রাত জেগে মুভি দেখতো। কতো ফজর যে ঘুমিয়ে কাঁটিয়েছে, তার হিসেব নেই। নামাজ পড়ে মজা পাওয়া যেত না। তেমন কেন বিধিনিষেধ না থাকলে, শুক্রবারেও মসজিদে যেত না আমাদের হিরো’টা। বহুবার সে ‘প্যান্ট নাপাক’ বলে ফিরে এসেছে মসজিদের সামনে থেকে। তার বন্ধুরা নামাজ পড়তো, ইচ্ছে করেই সে দাঁড়িয়ে থাকতো মসজিদের বাইরে। মনে মনে গাইতো দেশী বিদেশী বিভিন্ন নামকরা ব্যান্ডের গান। একসময় তার মধ্যে চলে আসে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। মা-বাবার সাথে রাগারাখি করা নিত্যদিনের রুটিন। মাঝেমাঝে সিদ্ধান্ত নেয়, মেয়েটাকে ছেড়ে যাবার। মেয়েটা একবার জড়িয়ে ধরলেই সে ভুলে যেতো পুরোনো সব সিদ্ধান্তগুলোর। সেই পুরোনো বাড়িটার দোতলায় ছেলেটাকে সেদিন প্রথম চুমু দিয়েছিলো মেয়েটা। সেই দৃশ্য কেউ না দেখলেও, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দেখেছিলেন। আল্লাহ তাদের মাফ করুক।

.

ছেলেটা এসএসসি দিলো, দেখাদেখি করার অভ্যেসটা এবারো তাকে এনে দিলো ভালো রেজাল্ট। এলাকায় ভালো কলেজ না থাকায় পাড়ি দিলো ঢাকায়। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলো মা-বাবার স্বপ্ন। আবারো ডুবে যেতে লাগলো  মিউজিক, মুভি, পর্নোগ্রাফি এবং মাস্টারবেশনে। রাতদিন হতাশ থাকতো। দিন দিন আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছিলো। বাড়ি থেকে মা-বাবা ফোন করলে অসহ্য মনে হতো। সারাদিন কাটাতো শুয়ে বসেই।

.

একদিন আমাদের ‘ছেলেটা’ তার আরেক বন্ধুকে নিয়ে যায় নীলক্ষেতে। উদ্দেশ্য ‘বই কেনা’। নীলক্ষেত থেকে একটু দূরেই বাটা সিগন্যাল থেকে সামান্য হাঁটলেই অন্য বন্ধুর বাসা। ভুত চাপলো সেদিনের রাতটা তাদের বাসায় থাকায়। প্রচুর আড্ডা দেয়া যাবে, গান বাজনা হবে, পঁচানো হবে একে অন্যকে। বাসায় এসেই কতক্ষন আড্ডা দিলো তারা। আড্ডার এক পর্যায়ে তার এক বন্ধু তাকে ‘পর্নোগ্রাফি’র খারাপ দিক নিয়ে একটি ভিডিও দেখায়। খুব মনযোগ সহকারে ভিডিওটি দেখে সে। তার মস্তিষ্কের ডোপামিনগুলো ক্রমশ ছোটাছুটি করছিলো। কিছু একটা তাকে তাড়া দিচ্ছিলো। তার কেন যেন মনে হচ্ছিলো, সব মিথ্যে ছিলো তার অতীত। সে নিজেকে নিচু ভাবতে শুরু করলো।

পরদিন দুপুরে সে নিজের বাসায় ফিরে আসে। কিন্তু, গতরাতের চিন্তাটা তার মাথায় গেঁথে আছে। সে ঘাঁটাঘাঁটি করে সন্ধান পায় একটি বইয়ের। নাম ‘মুক্ত বাতাসের খোঁজে’। পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতা জানার পর সে শিউরে উঠে। সে বুঝে উঠে যে, এটাই সেই মুক্ত বাতাস, যেটা সে এতদিন খুঁজার চেষ্টা করতো বিপরীত লিঙ্গের মানুষটির বুকে, গালে, ঠোঁটে।

সেই রাতটা সে পুরোটা কাটিয়ে দিয়েছিলো ইউটিউবে ইসলাম নিয়ে ঘাটাঘাটি করে। ‘জাহান্নামের ভয়াবহতা’ নিয়ে একটা বয়ান শুনে তার লোম দাঁড়িয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় নিজেকে পালটে ফেলার। আর কোনো পর্ন না। যে গানগুলো ছাড়া সে তার জীবনকে অর্থহীন মনে করতো, এক ক্লিকেই ডিলিট করে দিলো সব । অনেক হাল্কা অনুভব করলো। নামাজ পড়া শুরু করলো। অনেকদিন পর হাতে নিলো কুরআন শরীফ। কম্বল ছেড়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযূ করে আদায় করে নিল জীবনের প্রথম তাহাজ্জুদ নামাজ। অহংকারকে দমিয়ে রেখে শুরু করলো টাকনুর উপরে প্যান্ট পরা। দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা ছেড়ে দিয়েছে এখন সে। মা-বাবার সাথে ডেইলি কথা না বললে কেমন যেন খালি খালি মনে হয় তার। আস্তে আস্তে সে জামায়াতে নামাজ পড়া শুরু করলো। এখন তার জীবনে কোনো ডিপ্রেশন নেই। আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছে তার। এভাবেই চলতে থাকুক আমাদের ‘ছেলেটা’র জীবন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এভাবেই আলোর পথে ফিরিয়ে আনুক আমাদের সবগুলো ‘ছেলে’কে।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

 

শেয়ার করুনঃ