অবক্ষয়কাল

অবক্ষয়কাল

অতীত

.
ইতিহাসের দিকে তাকালে সভ্যতা ও যৌনতার সম্পর্কের একটা প্যাটার্ন দেখা যায়। বারবার বিভিন্ন সভ্যতায় এই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্যাটার্নটা কী?
.
সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলোজিস্ট জন ড্যানিয়েল আনউইন ৫,০০০ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র এবং ৬টি সভ্যতার ওপর এক পর্যালোচনা করেন। আনউইন এ গবেষণা শুরু করেন সভ্যতাকে অবদমিত কামনা-বাসনার ফসল হিসেবে দাবি করা ফ্রয়েডিয় থিওরি যাচাই করার জন্যে। কিন্তু ফলাফল দেখে হকচকিয়ে যান আনউইন নিজেই। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Sex & Culture বইতে দীর্ঘ এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন সভ্যতা ও সেগুলোর পতনে আনউইন দেখতে পান একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন–
.
কোনো সভ্যতার বিকাশ সেই সভ্যতার যৌনসংযমের সাথে সম্পর্কিত। যৌনতার ব্যাপারে কোনো সমাজ যত বেশি সংযমী হবে তত বৃদ্ধি পাবে বিকাশ ও অগ্রগতির হার। সহজ ভাষায় বললে, সভ্যতার বিকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা স্বাভাবিক যৌনাচার আবশ্যিক। প্রাথমিক বিকাশের পর্যায়ে যৌনাচারের ক্ষেত্রে প্রতিটি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি থাকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং এর ভিত্তি পারস্পরিক বিশ্বস্ততা।
.
বিস্মিত আনউইন আবিষ্কার করলেন, সুমেরিয়, ব্যাবলনীয়, গ্রিক, রোমান, অ্যাংলো-স্যাক্সনসহ প্রতিটি সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে এমন সময়ে যখন যৌনসংযম ও নৈতিকতাকে এসব সমাজে কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। কিন্তু উন্নতির সাথে সাথে প্রতিটি সভ্যতায় শুরু হয় অবক্ষয়। সফলতা পাবার পর সভ্যতাগুলো হারানো শুরু করে নিজেদের নৈতিকতা। সাফল্যের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে তাদের মূল্যবোধ, প্রথা ও আচরণ। ক্রমেই উদার হতে শুরু করে যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি। বহুগামিতা, সমকামিতা, উভকামিতার মতো ব্যাপারগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নেয় সমাজ। সামষ্টিক কল্যাণের ওপর ব্যক্তি স্থান দেয় তার নিজস্ব স্বার্থপর আনন্দকে।
.
যৌনাচার ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার, সমাজে এর কোনো নৈতিক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না–আজকের আধুনিক সভ্যতার আধুনিক মানুষগুলোর মতো এ মিথ্যে কথাটা বিশ্বাস করেছিল আগের সভ্যতাগুলোও। অবধারিতভাবেই একসময় সবার ভুল ধারণা ভাঙে, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যায় অনেক। একবার শুরু হয়ে গেলে আর থামানো যায় না অবক্ষয়ের চেইন রিঅ্যাকশান। অবাধ, উচ্ছৃঙ্খল যৌনাচারের সাথে সাথে কমতে থাকে সামাজিক শক্তি। কমতে থাকে সভ্যতার রক্ষণাবেক্ষণ ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা। ক্রমশ কমতে থাকে সমাজের মানুষের সংহতি, দৃঢ়তা ও আগ্রাসী মনোভাব। আর একবার এই অবস্থায় পৌঁছবার পর সভ্যতার পতন ঘটে দুটি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে–অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা অথবা আগ্রাসী শত্রুর আক্রমণ।
.
আনউইন উপসংহার টানেন, বিয়ে-পূর্ববর্তী ও বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতা এবং অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার যে সমাজে যত বেশি সে সমাজের সামাজিক শক্তি তত কম। যৌনতার ওপর যে সমাজ যত বেশি বাধানিষেধ আরোপ করে, তার সামাজিক শক্তি তত বাড়ে। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সমাজ হলো যেখানে যৌনতা এক বিয়েকেন্দ্রিক পরিবারের (Heterosexual Monogamy) মধ্যে সীমাবদ্ধ। আনউইনের মতে ৫,০০০ বছরের ইতিহাসজুড়ে, প্রতিটি সভ্যতা ও সমাজের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য।
.
‘যেকোনো সমাজকে সামাজিক শক্তি অথবা যৌন স্বাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। আর এর পক্ষে প্রমাণ হলো কোনো সমাজ এক প্রজন্মের বেশি এ দুটো একসাথে চালিয়ে যেতে পারে না।’
.
আনউইনের এই উপসংহারকে বিভিন্নভাবে হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব, তবে ফিতরাহর ওপর থাকা সুস্থ চিন্তার কোনো মানুষের জন্য সত্যটা স্পষ্ট। এই উপসংহার বিস্ময়কর–বিস্ময়ের কারণ হলো এত দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে একই চক্রের পুনরাবৃত্তি চলছে। কিন্তু এ উপসংহার অপ্রত্যাশিত না। আসুন দেখা যাক, আনউইনের গবেষণা থেকে আসলে আমরা কী কী জানতে পারছি।
.
সমাজে ফাহিশা (অশ্লীলতা ও বিকৃতি) ও যিনা বাড়লে ভাঙন ধরে পরিবার এবং মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোতে। এর প্রভাব পড়ে সামাজিক সংহতি এবং সমাজের অন্তর্নিহিত নৈতিক শক্তির ওপর। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে সমাজ। প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই সমাজ ও সভ্যতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে অপরিবর্তনীয় কিছু নিয়মাবলি। পার্থক্য হলো প্রকৃতির ক্ষেত্রে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে এই নিয়মগুলোর অস্তিত্ব আমরা ধরতে পারি। সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অতটা সহজ হয় না। কিন্তু যিনি জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্মের নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তিনিই বেঁধে দিয়েছেন মানবসমাজ ও সভ্যতার নিয়মগুলোও। আর তাই এই নিয়ম ভঙ্গ করার পরিণতি আছে।
.
নৈতিকতা, যৌনতার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করা, তার অবাধ্য হওয়া শুধু ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলে না; বরং প্রভাব ফেলে পরিবার, সমাজ ও প্রজন্মের ওপর। এর মূল্য চোকাতে হয় সবাইকে। আল্লাহ অনুমোদন দেননি এমন যেকোনো যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া ও মেনে নেয়া নিস্তেজ করে সমাজের উদ্যম, অনুপ্রেরণা ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে। শুরু হয় এক চেইন রিয়্যাকশন। ক্রমশ বেড়ে চলা বিকৃতির প্রতি শূন্য হতে শুরু করে মানুষ অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া। এক সময় বিকৃতি পরিণত হয় প্রচলন ও প্রথায় ।
.

বর্তমান

.

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। কিন্তু বোকা মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। চিনতে পারে না অবক্ষয়ের কালে সভ্যতার পচন ও আসন্ন পতনকে।
.
আজ বিশ্বজুড়ে যে যৌন উন্মাদনা, বিভিন্ন ধরনের যৌনবিকৃতির স্বাভাববিকীকরণ, আদর্শিক ও আইনি বৈধতা দেয়ার প্রবণতা আমরা দেখছি তা ইঙ্গিত দেয় সেই একই পরিণতির পুনরাবৃত্তির। অন্য সভ্যতাগুলোর মতোই আমাদের এ যৌন উন্মাদনা হলো সভ্যতার অবক্ষয় ও আসন্ন পতনের চিহ্ন। বিশেষ করে পুরুষত্বের ধারণাকে আক্রমণ করা এবং অ্যান্ড্রোজিনির (হাল আমলের ট্র্যান্সজেন্ডার আন্দোলন) এর দিকে যাবার প্রবণতা চরম পর্যায়ের অবক্ষয়ের চিহ্ন।
.
বর্তমান সময়ের পশ্চিমের ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনা নিয়ে খুব সুন্দর বলেছেন ক্যামিল পা’লিয়া। মহিলার প্রথম বই ছিল পশ্চিমা সভ্যতার শিল্পের ইতিহাসে অবক্ষয়–বিশেষভাবে যৌন অবক্ষয় নিয়ে। [1] পা’লিয়ার মতে প্রত্যেক বড় বড় সভ্যতার মধ্যে এ চক্র দেখতে পাওয়া যায়। সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে মহিমান্বিত করা হয় পুরুষত্বকে। কিন্তু অবক্ষয়ের পর্যায়ে সমাজ, শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে শুরু করে পুরুষত্বের বদলে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য। রোমান সভ্যতার শুরুর দিকের ভাস্কর্যগুলো যুদ্ধংদেহী, অ্যালফা-মেইল (Alpha Male)। শেষের দিকে জয়জয়কার আঁকাবাঁকাভাবে দাঁড়ানো মেয়েলি ডেইভিডদের। বিভিন্ন সভ্যতার ক্ষেত্রে এই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি হয়। অবক্ষয়ের পর্যায়ে এসে সভ্যতাগুলোর মধ্যে পুরুষত্ব, পরিবার, যৌনসংযমের বদলে মহিমান্বিত করা হয় যৌনবিকৃতিকে। হঠাৎ করে বিস্ফোরণ ঘটে সমকামিতা, উভকামিতা, অজাচার, পশুকামিতা, স্যাইডোম্যাসোকিযম, বন্ডেজ, জেন্ডার গেইমসসহ বিভিন্ন যৌনবিকৃতির। বিকৃত আচরণগুলো অর্জন করে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।
.
অবশ্য ওই সভ্যতার মানুষ এগুলোকে অবক্ষয় ও পতনের চিহ্ন হিসেবে দেখে না; তাদের কাছে এগুলোকে মনে হয় নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ আর সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। অ্যারিস্টোক্র্যাটিক, অভিজাত মুক্তচিন্তা। যৌনতার ব্যাপারে এমন মুক্তবাজারি দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা সংজ্ঞায়িত করে প্রগতি আর উন্নতির নামে। এটাকেই তারা মনে করে সভ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে দেখা যায়, এই সভ্যতা আসলে তার নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়া সভ্যতা এবং এ সভ্যতার নাগরিকেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে নিজ শরীর ও সত্তার ব্যাপারে। এ সভ্যতা নিজের পুরুষত্বকে প্রশ্ন করছে, প্রশ্ন করছে নিজের পরিচয়কে। যা কিছুর মাধ্যমে সভ্যতা একসময় মাহাত্ম্য অর্জন করেছিল, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তার ছিটেফোঁটা এখনো রয়ে গেছে, কিন্তু অবক্ষয়কালের মানুষ হারিয়ে ফেলেছে এর সাথে সব সম্পর্ক।
.
পশ্চিমের বর্তমান অবস্থার ক্ষেত্রে কথাগুলো খাপে খাপে মিলে যায়, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ক্ষেত্রে ঠিক এ ব্যাপারটাই ঘটছে। এ অবক্ষয়ের শুরুটা হয়েছে সেক্সুয়াল রেভুলুশানের মাধ্যমে যখন একটি প্রজন্ম নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দিক দিয়ে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আগের প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এবং সব ধরনের বাঁধন খুলে ফেলে যৌনতাকে দিয়েছে মানুষের ওপর অনিয়ন্ত্রিত রাজত্ব। পশ্চিমে এ ব্যাপারটা ঘটেছে ষাট ও সত্তরের দশকে। আর আমাদের মতো ‘মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাওয়াদের’ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটছে এখন। যার সাক্ষ্য দেয় আমাদের সমাজে এখন চলা যিনা, গর্ভপাত, পরকীয়া, সমকামিতা, পর্নোগ্রাফি এবং ধর্ষনের নীরব মহামারী।
.
এ সভ্যতা, যা আমরা মুসলিমরা বেছে নিইনি, যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে–আমরা ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় যাকে ভালোবাসতে এবং এ ভালোবাসাকে উন্নতি ও প্রগতি মনে করতে শিখেছি–তা আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায়। ৫,০০০ বছরের ইতিহাস তা-ই বলে। পতনোন্মুখ এক সভ্যতার শেষ প্রান্তে অবস্থান করছি আমরা। পেছনে তাকিয়ে দেখুন। দেখুন ব্যাবিলন, মিসর, গ্রিস, রোম আর বাইনযেন্টাইনের ইতিহাস। পুনরাবৃত্তি হচ্ছে সেই একই চক্রের, একই প্যাটার্নের। কিন্তু আমরা নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত, এত অসুস্থভাবে আত্মকেন্দ্রিক, আত্মপরিচয়ের সংকটে এতটাই নিমগ্ন যে, পচনের গন্ধ আমরা টের পাই না। পতনের শব্দ শুনতে পাই না। বর্তমানমুগ্ধতা আর ক্ষমতার উপাসনা করার প্রবণতা অন্ধ করে রেখেছে আমাদের। আমরা এত কাছে দাঁড়িয়ে আছি যে ক্যানভাস, কাগজ আর রঙের খুঁটিনাটি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু মূল ছবিটা দেখতে পারছি না। আমাদের ঘোরলাগা চোখে রঙের বিস্ফোরণ ধরা পড়ে, কিন্তু ধরা দেয় না বাস্তবতার অবয়ব।
.
এ সভ্যতার সাথে মানিয়ে নেয়ার আমাদের সব ‘সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম’ চেষ্টা, যেগুলোকে আমরা ‘প্রগতি’ আর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ’ বলি–পশ্চিমের অনুকরণ, পশ্চিমের ছাঁচে ইসলামকে নতুনভাবে ফ্রেইম করা, সবকিছুকে ধরে ধরে ইসলামীকরণ করার আমাদের মহাকৌশলী পরিকল্পনা, ‘ইসলামী’ গণতন্ত্র আর ব্যাংকিংয়ের মতো ধারণাগুলোর বৈধতা দেয়ার কূটতর্কের কারুকাজ, পদে পদে পশ্চিমের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে নিজেকে বদলে ফেলা–এসবই হলো এমন এক দালানকোঠার দেয়াল রং করার মতো, যা এরই মধ্যে আগুনে পুড়ে ধসে পড়তে শুরু করেছে।
.

ভবিষ্যৎ

.
চূড়ান্ত পরিণতি কী?

কী অপেক্ষা করছে এ সভ্যতার জন্য?
.
আমরা অবশ্যই ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু ৫,০০০ বছরের ঐতিহাসিক প্যাটার্ন থেকে একটা ধারণা করা যায়।

১) অরাজকতাপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিল্পব ও বিশৃঙ্খলা, অথবা
২) অধিকতর সামাজিক শক্তির অধিকারী আগ্রাসী শত্রুর আক্রমণ
.
যৌনাচারের ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি আমরা এখন দেখছি অবধারিতভাবেই তা এমন এক বিভ্রান্ত প্রজন্মের জন্ম দেয় যারা না নতুন কিছু সৃষ্টি পারে, আর না পারে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে। অবক্ষয়, অবনতি, অরাজকতা, অযোগ্যতা আর ভীতসন্ত্রস্ত নিষ্ক্রিয়তার এক চক্রে আটকা পড়ে সভ্যতা। আত্মপরিচয়ের সংকটে ঘুরপাক খাওয়া আত্মরতিতে নিমগ্ন ভোগবাদী প্রজন্মের ঘোরলাগা চোখের সামনে খুলে আসে সমাজের বাঁধন। ধসে পড়তে শুরু করে সভ্যতা।
.
অথবা এমন কোনো জাতির আবির্ভাব ঘটে যারা ত্বরান্বিত করে একসময়কার শক্তিশালী ও গর্বিত কিন্তু বর্তমানে অধঃপতিত জাতির পতনকে, পরিপূর্ণ করে ধ্বংসপ্রক্রিয়াকে। বারবেরিয়ান, ভিসিগথ, হান, মঙ্গোল, ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব বেদুইন।
.
আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অবক্ষয়কালে কারা হবে এই আগ্রাসী বাহ্যিক শত্রু?
.
আধুনিক পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের বহু আগেই সভ্যতার পালাবদল আর জাতিগুলোর উত্থানপতনের চক্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইসলামী ইতিহাসের মহিরুহ ইবনু খালদুন। আগ্রাসী ও বিজয়ী জাতির বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তাঁর অবিস্মরণীয় রচনা আল-মুক্কাদিমাতে।
.
ইবনু খালদুনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো সামাজিক সংহতি। এটি হলো সেই বন্ধন যা একটি সমাজের মানুষের মধ্যে তৈরি করে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহায়তার মনোভাব। এ বন্ধন মানুষকে জোগায় প্রতিকূলতার মোকাবেলা আর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি। সাধারণত এ বন্ধন সবচেয়ে শক্তিশালী হয় গোত্রীয় সমাজগুলোতে। কারণ, এ সমাজগুলোর ভিত্তি হয় রক্ত-সম্পর্ক এবং আত্মীয়তার বন্ধন। তবে এরচেয়েও শক্তিশালী বন্ধন হলো ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ, যার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় খুব অল্পসংখ্যক মুসলিমরা পরাজিত করতে পেরেছিলেন গোত্রীয় আরব মুশরিকদের। সামাজিক সংহতির এ ধারণার আলোকেই ইতিহাসের চক্রকে ইবনু খালদুন ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে,
.
শক্তিশালী সামাজিক সংহতি-সম্পন্ন জাতি আক্রমণ করে বিলাসব্যসনে মগ্ন, আধুনিক, শহুরে সভ্যতাকে। অধিকাংশ সময় এ আক্রমণকারীরা হয় রুক্ষ, যাযাবর, দরিদ্র। তাদের থাকে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বন্ধন, অধিকতর প্রাণশক্তি, মনোবল এবং তুলনামূলকভাবে অল্প বৈষয়িক সম্পদ। অন্যদিকে প্রচুর বিত্তবৈভবের মালিক হলেও জীবনের প্রতি নির্লিপ্ত উদাসীনতা আর আধ্যাত্মিক আলস্যে ভোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী। নিজেদের রক্ষা করার মতো সামাজিক সংহতি আর যুদ্ধংদেহী মনোভাব থাকে না তাদের। সুবিধাজনক শহুরে স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে এসবের প্রয়োজনও হয় না। তারা ব্যস্ত থাকে সস্তা সুখের নানা আয়োজনে, ভোগ আর অবক্ষয়ে।
.
অবধারিতভাবেই আক্রমণকারীরা বিজয়ী হয়, স্থাপন করে নিজেদের আধিপত্য। তারপর একসময় তারাও গা ভাসিয়ে দেয় সহজ জীবনের সহজিয়া আনন্দের স্রোতে। ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে তাদের সংহতি আর নৈতিক শক্তি, ভাঙন ধরে সমাজে। দিগন্তে উদয় হয় নতুন কোনো জাতি, নতুন কোনো আক্রমণকারী। চলতে থাকে পালাবদলের চক্র।
.
ইবনু খালদুন এর ভাষায়,

‘…বিলাসব্যসন চরিত্রের মধ্যে নানা প্রকার দোষ, শৈথিল্য ও বদভ্যাসের জন্ম দেয়… সুতরাং তাদের মধ্য থেকে সেই সচ্চরিত্র অন্তর্হিত হয়, যা একসময় তাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠার যোগ্য গুণ ও নিদর্শন হিসাবে গৃহীত হয়েছিল। তা ত্যাগ করে তারা যখন অসৎ চরিত্রে সুসজ্জিত হয়ে ওঠে, তখন স্বভাবতই ক্ষয় ও দুর্বলতার লক্ষণ প্রকাশ পায়। আল্লাহর সৃষ্টিতে এ নিয়মই বিদ্যমান। ফলে সাম্রাজ্যে ধ্বংসের প্রারম্ভ সূচিত হয়ে তার অবস্থা বিশৃঙ্খল হয় ওঠে এবং তার মধ্যে ক্ষয়ের সেই সুপ্রাচীন ব্যাধি দেখা দেয়, যাতে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে।’ [2]
.
নগরবাসীরা সর্বপ্রকার আমোদ-প্রমোদ, বিলাসব্যসন, পার্থিব উন্নতি লাভের আশা ও তাকে ভোগ করার স্পৃহা দ্বারা বেষ্টিত থাকে। এর ফলে তাদের জীবাত্মা অসৎ চরিত্র ও অন্যায় প্রসঙ্গের মধ্যে কলুষিত হয়ে ওঠে। এভাবে তারা যতই তাতে নিমজ্জিত হয়, ততই সৎপথ ও ন্যায়পন্থা থেকে দূরে সরে যায়। এমনকি এর ফলে তাদের মধ্যকার সংযমের আচার-আচরণও তাদের অবস্থাগুলোতে দুর্নিরীক্ষ্য হয়ে ওঠে। [3]
.
(বর্বর গোত্রগুলো) প্রাধান্য বিস্তারে অধিকতর ক্ষমতাশালী এবং অন্যদের নিকট যা কিছু আছে, তা ছিনিয়ে নিতে অধিকতর পারঙ্গম। যখনই তারা প্রাচুর্যের সাথে পরিচিত হয় এবং সচ্ছলতার মধ্যে জীবনের ভোগ-সম্ভোগে লিপ্ত হয়, তখনই তাদের প্রান্তরবাস ও বন্যপ্রকৃতি হ্রাস পাওয়ার অনুপাতে তাদের শৌর্যবীর্যও হ্রাস পায়। [4]
.
ইবনু খালদুনের এ বিশ্লেষণ থেকে বিজয়ী জাতির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। তারা হবে অধিকতর সামাজিক সংহতি, নৈতিক ও প্রাণশক্তির অধিকারী। অতি সংবেদনশীল আধুনিক রুচির বিচারে সম্ভবত একটু বেশি রুক্ষ ও কর্কশ। আমাদের কাছে তাদেরকে মনে হতে পারে পশ্চাৎপদ, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাদামাটা এমনকি উগ্র। মূল্যবোধ ও যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তারা কঠোর সংযমী, কট্টর। সভ্যতার বিলাসব্যসন, অবক্ষয় ও অধঃপতনের বিষ থেকে মুক্ত। যুদ্ধংদেহী, বেপরোয়া, লড়াকু, কষ্টসহিষ্ণু।
.
এখানে যে বিষয়টা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, অধঃপতিত সভ্যতাকে যারা জয় করে তারা চারিত্রিক দৃঢ়তা, অধিকতর সংহতি ও সামাজিক শক্তির কারণে বিজয়ী হয়। নিছক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ, অর্থনীতি কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হবার কারণে না। তাদের বিজয়ের কারণ হলো ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া। এ কারণেই অ্যামেরিকার পতনের পর বিশ্বমঞ্চে প্রধান শক্তি ও নতুন সাম্রাজ্য হিসেবে চীন কিংবা রাশিয়ার আবির্ভাবের ব্যাপারে অনেকের প্রচার করা ও পছন্দের বিশ্লেষণ ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত প্যাটার্নের সাথে মেলে না। অ্যামেরিকার পতন হলে চীন এবং রাশিয়ার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব নিঃসন্দেহে বাড়বে। একটা সময় পর্যন্ত, একটা নির্দিষ্ট মাত্রায়। কিন্তু শতবর্ষের নতুন সাম্রাজ্য ও সভ্যতা তারা গড়ে তুলবে পারবে বলে মনে হয় না। সভ্যতার পতন ও রূপান্তরের পর্যায়ে বড়জোর সাময়িক একটা ভূমিকা থাকতে পারে তাদের। কারণ, যে দুর্বলতাগুলো আধুনিক পশ্চিমে বিদ্যমান সেগুলো বিদ্যমান চীন এবং রাশিয়াতেও। এ যৌনবিকৃতি, এ উন্মাদনা, সামাজিক সংহতি ও শক্তির এ দারিদ্র্য থেকে তারা মুক্ত না। আজকের চীন এবং রাশিয়াকে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা বলা যায় না। চীন ও রাশিয়া আধুনিক পশ্চিমের মতো ইউরোপীয় শেকড় থেকে বের হয়ে আসেনি, তাদের আছে হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এটুকু পার্থক্য আছে। কিন্তু এ পার্থক্য কেবল সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত। আদর্শ, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বস্তুবাদী, ভোগবাদী, আত্ম-উপাসনায় মগ্ন আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অধিবাসীদের সাথে চীন কিংবা রাশিয়ার খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাই যুক্তি বলে এভাবে চললে তাদের পরিণতিও অভিন্ন হবার কথা।
.
একইভাবে এ বিশ্লেষণ অনুযায়ী পশ্চিমের চিন্তা ও পদ্ধতিগত অনুকরণ করে চলা মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলনগুলোর কাছ থেকেও বিজয়ের আশা করা যায় না। কারণ, এ আন্দোলনগুলো সভ্যতার ব্যাধি থেকে মুক্ত না, হতেও চায় না। বরং এ ধরনের চিন্তার লক্ষ্য হলো আরও বেশি করে চলমান বিশ্বব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানো, সিস্টেমের অংশ হওয়া। তারা সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম না। এবং ধীরে হলেও তারাও একসময় অবধারিতভাবে আক্রান্ত হবে সভ্যতার সুপ্রাচীন ব্যাধিতে। যার অনেক বাস্তব প্রমাণ এখনই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
.
আবারও বলছি, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না; গ্বাইবের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই। ইবনু খালদুনসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকদের তুলে ধরা বিশ্লেষণ সভ্যতার পালাবদলের ব্যাপারে আমাদের একটা জেনারেল থিওরি দেয়। কিন্তু প্রতিটি জাতির উত্থানপতন আর ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকের পেছনে সক্রিয় থাকে আরও অনেকগুলো ফ্যাক্টর। তাই মূল তত্ত্ব থেকে এদিক-সেদিক হতে পারে, হওয়াটাই স্বভাবিক। কিন্তু সার্বিকভাবে এ প্যাটার্ন টিকে থাকার কথা। সেই সাক্ষ্যই দেয় ৫,০০০ বছরের ইতিহাস। পাশাপাশি ৩০ বছরের ব্যবধানে আধুনিক চোখে রুক্ষ, উগ্র, যাযাবর, পশ্চাৎপদ কিছু মানুষের হাতে পরপর তিনটি যুদ্ধে আমাদের সময়ের দু-দুটো সুপারপাওয়ারের বিস্ময়কর পরাজয়ও সভ্যতার এ অমোঘ পালাবদলের প্রাথমিক পর্বের ইঙ্গিত দেয় কি না, সে প্রশ্নও করা যায়।
.
আল্লাহর নির্ধারিত সিদ্ধান্ত আসার আগে এ প্রশ্নগুলোর নিশ্চিত কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব না। বাস্তবতার আলোকে নিজস্ব বিবেচনাবোধ অনুযায়ী সম্ভাব্য উত্তরগুলো থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে আমাদের। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, পতনের কালে বেঁচে আছি আমরা। আমরা বেঁচে আছি মহাকাব্যিক পটপরিবর্তনের সময়ে, যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে আর তারপর ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতার নতুন সৌধ। কালের অমোঘ স্রোতে হারিয়ে জেতে না চাইলে ইতিহাসের ভাঙাগড়ার এ পর্বে, এ অবক্ষয়কালে একটা পক্ষ আমাদের বেছে নিতেই হবে।
.

[1] Sexual Personae, Camille Paglia (1990)
[2] ‘রাজশক্তির স্বভাব যখন গৌরব, বিলাসব্যসন ও স্থিরতায় সুদৃঢ় হয়, তখনই সাম্রাজ্যে ক্ষয় দেখা দেয়’,আল মুকাদ্দিমা, ইবনু খালদুন।
[3] ‘প্রান্তরবাসীরা নগরবাসীদের অপেক্ষা সততায় অধিকতর নিকটবর্তী’, প্রাগুক্ত
[4] ‘বর্বর জাতিগুলো প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষেত্রে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা অধিকতর ক্ষমতাবান’, প্রাগুক্ত

.
লেখক- আসিফ আদনান
বই- চিন্তাপরাধ 
.
বইটি অনলাইনে অর্ডার করার লিঙ্ক –
১) রকমারি- https://bit.ly/2VqfRsn
২) ওয়াফি লাইফ- https://bit.ly/2Hq1ocd

শেয়ার করুনঃ
সভ্যতা ও অবক্ষয় ১ – বংশগতি

সভ্যতা ও অবক্ষয় ১ – বংশগতি

খবরগুলো নিয়মিত বিরতিতে সামনে আসে। পশ্চিমের নানা যৌন বিকৃতির বিচিত্র সব গল্প। সমকামিতা, উভকামিতা, শিশুকামিতা, পশুকামিতা, ট্র্যান্সজেন্ডার আরো কতো কী। আমরা হেসে এড়িয়ে কিংবা ভুলে যাই। অথবা পশ্চিমাদের অসভ্যতা নিয়ে ধরাবাঁধা কিছু কথা বলি। অন্য কিছু খবরও নিয়মিত বিরতিতে চোখে পড়ে। দেশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ডিভোর্স, গর্ভপাত আর লিভ টূগেদার নিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ বিভিন্ন প্রতিবেদন। মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায় লেইট নাইট পার্টি, কিংবা সমকামিদের বিভিন্ন ‘গেট টুগেদারের’ কথা। আর প্রতিনিয়তই, পত্রিকায়, রাস্তায়, বিলবোর্ডে, টিভি স্ক্রিনে, ব্রাউযার খুললেই চোখে পড়ে নতুন কোন বিজ্ঞাপন, সাহসি কোন সিনেমা কিংবা দৃশ্য নিয়ে প্রতিবেদন, ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, নারী দেহের পণ্যায়ন, নারীর নিজেকে প্রদর্শন, আদিম হাস্যরসে মেতে ওঠা আড্ডবাজদের হাসি, পথচারীর আড়চখের দৃষ্টি, পুঁজিবাদের যৌনকরন, হুকআপ কালচার নিয়ে জমে ওঠা অনলাইন বিতর্ক, ভাইরাল কোন ভিডিও, কিংবা কোন সুশীল বুদ্ধিজীবির কলাম – চোখ খুললেই চোখে পড়ে যৌনতা নিয়ে অবসেসড, যৌনন্মাদ এক সমাজ।
কেন?
.
.
যৌনতার ব্যাপারে বর্তমানে আমরা যেসব প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করা, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ধরাবাঁধা কিছু কথা বলে দায়িত্ব শেষ করা সহজ। নৈতিক এই বিপর্যয়কে দেখিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার নোংরামি তুলে ধরা কার্যকর। কিন্তু এই অবস্থা যে আরো গভীর ও মৌলিক কোন সমস্যার উপসর্গ এবং এই বাস্তবতা যে আরো কঠিন কোন পরিনতির ইঙ্গিত বহন করে – সেটা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, অথবা আমরা বিষয়টাকে সেভাবে দেখি না। সেই গভীর ও মৌলিক সমস্যা, সেই কঠিন পরিণতি কী – সেই আলোচনায় আমরা যাবো। তবে তার আগে আমাদের জানতে ঠিক কিভাবে, কোন পথে আমরা আজকের এই অবস্থায় এসে পৌছলাম।
.

‘বিপ্লবের’ বংশগতি

.
যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে আজ আমরা যে অবস্থা দেখছি – সমকামি ‘বিয়ের’ আইনী স্বীকৃতি, সমকামিতাকে প্রশংসনীয় সাব্যস্ত করা, ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট, বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভূত যৌনতার ব্যাপক প্রচলন, ব্যাপক গর্ভপাত, বিয়ে ও পরিবারের পবিত্রতা – এগুলোর ব্যাপারে সাধারন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শিশুকাম, পশুকাম, অজাচারসহ বিভিন্ন বিকৃতির স্বাভাবিকীকরনের চেষ্টা – এই সবকিছুই ষাট ও সত্তরের দশকের সেক্সুয়াল রেভোলুশান এর ফসল।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং সাদা ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে অ্যামেরিকার। এ সময়কার প্রজন্মকে বলা হয় ‘দা গ্রেইটেস্ট জেনারেইশান’। ১৯০০ থেকে ১৯২০ এর মাঝে জন্ম নেয়া এই ‘গ্রেইটেস্ট জেনারেশনই দূরদেশে গিয়ে লড়াই করেছিল বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বদলে দেয়া মহাযুদ্ধে। আর যারা দেশে ছিল তারা সচল রেখেছিল যুদ্ধকালীন অর্থনীতির চাকা। মহাযুদ্ধের বিজয়ী এ প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল বিশের দশকের ভয়ঙ্কর মন্দা, নানা সামাজিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। এ প্রজন্ম ছিল পরিশ্রমী, বাস্তবমুখী এবং তাদের নৈতিকতা ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক প্রগাঢ় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঝড় সবকিছু আমূল বদলে দেয়। পঞ্চাশের দশকের বিট জেনারেইশান আর ষাটের দশকের হিপি মুভমেন্ট আগের প্রজন্মের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চিন্তাগুলোকে আক্রমন করতে শুরু করে। রক অ্যান্ড রৌল, হলিউড, প্লেবয়, পেন্টহাউস, অ্যাকাডেমিয়া আর ম্যাস মিডিয়ার মাধ্যমে চলতে থাকে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ‘মহান’ প্রজন্মের সন্তানরা বেড়ে ওঠে জীবন ও নৈতিকতার প্রতি সম্পূর্ণ নতুন, প্রায় বিপরীতমুখী এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।। চিন্তা, চেতনা, আদর্শ ও দর্শনে দুই প্রজন্মের মাঝে তৈরি হয় এক গভীর বিভাজন। আর এর এ বিভক্তি তুঙ্গে পৌছায় সেক্সুয়াল রেভোলুশানের মাধ্যমে, যখন যৌনতার ব্যাপারে গ্রেইটেস্ট জেনারেশানের ধর্মীয় নৈতিকতা ছুড়ে ফেলে অ্যামেরিকা আলিঙ্গন করে নেয় ফ্রি সেক্সের প্যাইগান দর্শনকে। এ প্রজন্মের চিন্তায় গেথে যায় সব ধরনের যৌনাচার আর বিকৃতির অবাধ প্রচলন ও বৈধতার এক দর্শন। পরবর্তী ৫০ বছরে এই সেক্সুয়াল রেভোলুশনেরই নানা ফসল বিভিন্নভাবে আমাদের আজকের এই বাস্তবতাকে তৈরি করেছে।
.
ষাটের দশকের শেষদিকে শুরু হওয়া সেক্সুয়াল রেভোলুশানের ভিত কিন্তু স্থাপিত হয় আরো আগে। সেক্সুয়াল রেভোলুশান নামের সভ্যতার অবৈধ এ সন্তানের বংশগতি খুব সংক্ষেপে ও সিমপ্লিফাই করে এভাবে উপস্থাপন করা যায় –
মানুষের মনোদৈহিক প্রায় সব ধরনের সমস্যার কারন হিসেবে অবদমিত কামনাবাসনা তথা যৌনতাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে সেক্সুয়াল রেভ্যুলুশানের প্রাথমিক কাঠামো দাড় করায় সাইকোঅ্যানালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। মানুষের ব্যাক্তিত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, অনুপ্রেরণা – প্রায় সবকিছুর পেছনে ফ্রয়েড যৌনতা খুজে পায়। ফ্রয়েডের মতে মানবজীবনের সব আনন্দ ও কষ্টের সম্পর্ক লিবিডোর (যৌনতাড়না) সাথে। এমনকি শিশুকেও ফ্রয়েড আবিস্কার করে যৌন প্রাণী হিসেবে। ফ্রয়েডের চিন্তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় উইলহেম রাইশ এবং হার্বার্ট মারকিউসের মতো লোকেরা। তবে ফ্রয়েডের তৈরি করা কাঠামো ওপর দাঁড়িয়ে যে মানুষটি সত্যিকার অর্থে সেক্সুয়াল রেভোলুশান এবং আমাদের আজকের এই যৌনন্মাদ সমাজের জন্ম দেয় তার নাম অ্যালফ্রেড কিনসি। রকাফেলার ফাউন্ডেইশানের সমর্থন নিয়ে কিনসি ফ্রয়েডের চিন্তার সাথে যুক্ত করে নতুন এক দিক।
.
কিনসি দাবি করে মানুষের যৌনতা নির্দিষ্ট কোন কাঠামোতে আবদ্ধ না। মানব যৌনতা ক্রমপরিবর্তনশীল, বহমান। কিনসির মতে, যৌনতার ক্ষেত্রে ন্যায়অন্যায়ের কোন ধারণা নেই। যৌনতা সাদাকালো বাইনারি কোন সিস্টেম না, বরং মানুষের যৌনতা রংধনুর মতো। এখানে আছে অনেক রঙ, অনেক মাত্রা। রংধনুর একপ্রান্তে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা আর অন্য প্রান্তে সমকামিতা। এ দুইয়ের মাঝে আছে শিশুকামিতা, পশুকামিতা, উভকামিতা থেকে শুরু করে সবধরনের ফেটিশ, সবধরনের বিকৃতি। সমাজের মানুষেরা একেকজন এই স্পেকট্রাম বা বর্ণালীর মধ্যে বিভিন্ন অবস্থানে থাকতে পারে। আবার একজন মানুষ তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই বর্নালীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারে। তবে কিনসির মতে অধিকাংশ মানুষ দুই প্রান্তের মাঝামাঝি অবস্থানের দিকে থাকে, অর্থাৎ উভকামিতায়। কিন্তু সমাজ, সংস্কার ও ধর্মের মাধ্যমে আরোপিত নৈতিকতার কারনে মানুষ এই স্বাভাবিক অবাধ যৌনতার প্রবণতাকে চেপে রাখে। একে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে অথবা নিজের আসল যৌনাচারকে গোপন রেখে সমাজের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাভাবিকতার মুখোশ পড়ে থাকে। পাশাপাশি কিনসি তার কুখ্যাত দুটি বইয়ের (Sexual Behavior In The Human Male/Female) মাধ্যমে ‘প্রমান’ করে দেখায় যে যেগুলোকে আমরা বিকৃত যৌনতা বলি সেগুলো আসলে অনেক বেশি প্রচলিত। সমকামিতা, উভকামিতা, বহুগামিতাসহ – অনেক কিছুই সমাজের অনেকেই করে। কিন্তু তারা সেটা গোপন রাখে। ঐ যে, পাছে লোকে কিছু বলে!
.
এই দাবির পক্ষে কিনসি বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। যদিও কিনসির উপস্থাপিত পরিসংখ্যান দিয়ে তার দাবি প্রমানিত হয়, কিন্তু আসল ফাকিটা ছিল তার পরিসংখ্যানেই। কিনসি যাদের সাক্ষাতকার নিয়েছিল তাদের মধ্যে বিশাল একটি অংশ ছিল পতিতা, সমকামি পুরুষ পতিতা (পতিত?), সমকামি, যৌন অপরাধের কারনে কারাভোগকারী, এবং পেডোফাইল। অর্থাৎ কিনসি প্রশ্ন করার জন্য এমনভাবে মানুষ বেছে নিয়েছিল যাতে বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত মানুষদের অনুপাত বেশি হয়।
.
ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা করুন। আপনি যদি চুরির ওপর বাংলাদেশের ১০০ জন মানুষের ওপর জরিপ চালান, আর ইচ্ছে করেই সেখানে ৫০ জন চোরকে রাখেন তাহলে অবশ্যই আপনার জরিপের ফলাফলে দেখা যাবে বাংলাদেশের প্রায় ৪০-৫০% মানুষের মধ্যে চুরির প্রবণতা আছে। কিনসি ঠিক এ কাজটাই করেছিল।
.
তবে এই আমরা এখন বলতে পারলেও কিন্তু গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ কাজটা এতোটা সহজ ছিল না। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আর পঞ্চাশের দশকে কিনসির ‘রিসার্চ’ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। রকাফেলার ফাউন্ডেশানের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও সমর্থনে অ্যামেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে কিনসি নানা সেমিনারে নিজের আবিস্কৃত ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’গুলো প্রচার করে দাঁড়ায়। তার বইগুলো পরিণত হয় বেস্টসেলারে এবং কিনসির এই জালিয়াতি ভরা গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি। কিনসির উপসংহারের ওপর ভিত্তি করে স্কুলের যৌনশিক্ষা বই এবং আইন পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়। সেক্সুয়াল রেভলুশানের দুজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার, প্লেবয় ম্যাগাযিনের হিউ হেফনার এবং সমকামি অধিকার আন্দোলনের হ্যার হেই- গভীরভাবে কিনসির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। দুজনের ভাষ্যমতেই কিনসি Sexual Behavior In The Human Male – বইটি ছিল তাদের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট, এবং এই বইটি পড়ার পরেই তারা নিজেদের জীবনের গতিপথ বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
.
কিনসির দেয়া ন্যায়অন্যায় থেকে মুক্ত যৌনতার বর্ণালীতে নতুন একটি অক্ষ যোগ করে জন্স হপকিন্সের ড. জন মানি। যৌনতা (sexual preference), লিঙ্গ (gender) ও লৈঙ্গিক পরিচিতি (gender identity) – এর মাঝে মানি পার্থক্য খুজে বের করে। মানুষের যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় জন্মগতভাবে নির্ধারিত না। মানুষের ধরাবাঁধা কোন যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় নেই। যৌনতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক বিকৃতি, অবিকৃতি বলে কিছু নেই –আধুনিক যৌনতার ধারনায় এই চিন্তাগুলো যুক্ত করার মাধ্যমে জন মানি বর্তমানের ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের মূল দাবিগুলোর ব্যাখ্যা তৈরি করে। অন্যদিকে ফ্রয়েড, মার্ক্স আর রাইশের চিন্তার সমন্বয় করার মাধ্যমে কালচারাল মার্ক্সিসম ও আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ছাঁচে সমকামিতা সহ অন্যান্য বিকৃত যৌনাচারের স্বাভাবিকীকরনের আন্দোলনের জন্য একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করে ফ্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের হার্বাট মারকিউস।
.
কিনসি ও বিশেষ করে মানির কাছ থেকে আসা ধারণাগুলো লুফে নেয় ষাট ও সত্তরের দশকে তুঙ্গে থাকা ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট। এই যে “বৈজ্ঞানিক প্রমান’ পাওয়া গেছে, নারী ও পুরুষ আসলে একই। তাদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। পুরুষ যা পারে নারীও তা পারে। পুরুষ ও নারীর চিন্তা, সামর্থ্য, সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকার যে পার্থক্য সমাজে আছে তা জোর করে চাপিয়ে দেয়া। পুরুষতন্ত্রের মাধ্যমে এসব ধারণা গড়ে উঠেছে।। যুগে যুগে পুরুষরা ষড়যন্ত্র করে এসবের মাধ্যমে নারীদের ঘরে বেধে রেখেছে। প্রথা, ধর্ম, সংস্কার ইত্যাদিকে তারা ব্যবহার করেছে নারীদের আবদ্ধ রাখার জন্যে।।
.
নারীবাদে এসে সাইকোলজি, সেক্সোলজি, বিকৃতি, মানবিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির অদ্ভূত এক জগাখিচুড়ি তৈরি হয়। যৌনতা, পরিবার, মানবপ্রকৃতিসহ যেকোন কিছুকেই নির্দিষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ফসল হিসেবে দেখানোর পোস্টমর্ডানিস্ট যুক্তিও তারা গ্রহন করে। যার ফলে এ বিষয়গুলোর ব্যাপারের প্রতিষ্ঠিতই ধারনাগুলোকে আউটডেইটেড বলে নাকচ করে দেয়া সম্ভব হয়। এর সাথে আরো যুক্ত হয় আপেক্ষিত নৈতিকতা (moral relativism) ও এবং কোন চিরন্তন সত্যের অস্তিত্ব থাকাকে অস্বীকার করার প্রবণতা। ভালো ও খারাপের কোন ধরাবাধা সংজ্ঞা নেই, মানুষই ভালোমন্দের তৈরি করে। সময়ের সাথে ভালো ও খারাপ বদলাতে থাকে। সকল সত্যই আপেক্ষিক, প্রতিটি সত্যই কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও শক্তির কাঠামোর সাপেক্ষে সত্য – আপেক্ষিক নৈতিকতা ও আপেক্ষিত সত্যের অপ্রকৃতস্থ ধারনার ওপর গড়ে ওঠা এসব পোস্টমর্ডানিস্ট তর্কের মাধ্যমে সম্ভব হয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক, বিকৃতি এমনকি বায়োলজিকেও একপাশের সরিয়ে রাখা। ধাপে ধাপে ডিকন্সট্রাক্ট করা হয় গ্রেইটেস্ট জেনারেইশনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দর্শনকে।
.
নারীবাদ আক্রমন করে পরিবারকে। কারন পরিবার হল পুরুষতন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার। পরিবার একটি ‘পুরুষতান্ত্রিক’ কাঠামো যার উদ্দেশ্য নারীকে ঘরে আটকে রেখে পুরুষের আধিপত্য নিশ্চিত করা। নারীবাদ নারীকে শেখাতে শুরু করে, ‘একজন নারীর পুরুষের কোন দরকার নেই। প্রয়োজন নেই পরিবারের মধ্যে নিজের পরিচয় বা পূর্ণতা খোজার। সন্তান তোমাকে শুধু আরো পিছিয়ে দেবে। বরং তোমার উচিত নিজের স্বাতন্ত্র্য, নিজের ব্যাক্তিত্ব, নিজের ক্যারিয়ারের মাঝে সাফল্য খোঁজা। আর শরীরের চাহিদা? সেক্স? তার জন্য বিয়ের কী দরকার? সেক্স শুধু শরীরের জন্য, আনন্দের জন্য। যা ইচ্ছে করো, কিন্তু এর সাথে আর কোন কিছু জড়ানোর প্রয়োজন নেই। বহুগামীতাকে স্বাধীনতা হিসেবে দেখার এই প্রবনতাও নারীবাদ গ্রহন করে সেক্সুয়াল রেভোলুশানের কাছ থেকে। নারীবাদের ভাষায় বার্থ কন্ট্রোল পিলসহ অন্যান্য জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ও যেকোন সময়ে গর্ভপাতের সুযোগ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারীকে সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়। আর এভাবেই সব শেকল থেকে মুক্ত হয়ে যৌনতা পরিণত হয় নিছক আনন্দের এক অতৃপ্ত অন্বেষণে।
.
ষাটের দশকের শেষদিকে এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে শুরু হওয়া ফ্রি লাভ/ফ্রি সেক্স মুভমেন্ট ও সমকামি অধিকার আন্দোলনও পুরোপুরিভাবে এই বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করে। তাদের জন্য এটা একটা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল। প্রচলিত পরিবার কাঠামো, নৈতিকতা, যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি – এসবকিছুই সমকামি ও অন্যান্য বিকৃতকামীদের আচরন ও দর্শনের সাথে মেলে না। কিন্তু সমকামিতা বা বিকৃতকামিতার জায়গা থেকে পরিবার বা নৈতিকতার সমালোচনা করা স্ট্র্যাটিজিকালি ভুল। এতে করে সমকামিরা যে অচ্ছুৎ, সমাজবিরোধী – এই ধারনাই আরো শক্ত হবে। কিন্তু স্ট্র্যাটিজিক হিসেবনিকেশের কারনে সমকামিরা যা প্রকাশ্যে বলতে পারছিল না, খুব সহজ সেই কাজটা করতে পারছিল নারীবাদীরা। তাই সমকামি আন্দোলনের সাথে নারীবাদীদের জোট বাধা ছিল যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক। এই দুই আন্দোলন আজও হাতেহাত রেখেই চলছে।
.
ষাট ও সত্তরের দশকে যা ছিল (নৈতিকতা, পরিবার, যৌনতা ইতাদির ব্যাপারে) খুব র‍্যাডিকাল ‘বিপ্লবী চিন্তা, পরের দশকগুলোতে সেগুলোই ধীরে ধীরে স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়। কিনসি, মানি ও মারকিউসদের দর্শন আর ফেমিনিস্ট থিওরিগুলো অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে শেখানো হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ওপর এই চিন্তাধারা প্রায় একচ্ছত্র আধিপ্ত্য বিস্তার করে। আর বিভিন্নভাবে সাধারন মানুষের চিন্তায় এ বিশ্বাসগুলো গেথে দিতে থাকে ম্যাস মিডিয়া। এই কলুষিত দর্শন, চিন্তার বিকৃতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা বিশ্বে।
.
এই মিশ্রণ থেকেই একসময় বের হয়ে আসে হেজেমনিক ও টক্সিক ম্যাস্কিউলিনিটি – এর ধারণা। টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটির এ তত্ত্ব দাবি করে, যা কিছুকে স্বাভাবিকভাবে পুরুষালি বলে গণ্য করা হয়, যেসব আচারআচরণ ও বৈশিষ্ট্যকে সমাজ পুরুষোচিত বলে উপস্থাপন করে, তার সবই বিষাক্ত। কারণ পুরুষত্বের এই ধারণা তৈরিই হয়েছে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। এই ‘পুরুষত্ব’ মানবতার জন্য ক্ষতিকর। সত্ত্বাগতভাবেই এই ‘পুরুষ’ অত্যাচারী, সম্ভাব্য ধর্ষক, সমাজ ও সভ্যতাকে কলুষিতকারী। এভাবে নারীবাদ পুরুষত্বের ধারণাকেই আক্রমন করে বসে আর এর মাধ্যমে অনিচ্ছায় ও অজান্তে আক্রমন করে নারীত্বকেও। এ পর্যায়ে এসে নারীবাদ দাবি করে, যা কিছু নারীসুলভ বলে স্বীকৃত তা আসলে পুরুষতন্ত্রের ফসল। নারী তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে, যখন সে পুরুষতন্ত্রের তৈরি ছাঁচ থেকে বের হতে পারবে। আর পুরুষের প্রায়শ্চিত্ত তখনই পূর্ণ হবে যখন সে সমাজস্বীকৃত পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্য ঝেড়ে ফেলবে আর নিজের পুরুষ পরিচয় আর ঐতিহাসিক ‘অপরাধের’ কারনে লজ্জিত হবে। তাই – যদি পুরুষ কতৃত্বশীল হয় তাহলে সে অত্যাচারী। যদি সে দৃঢ়চেতা হয়, সমাজস্বীকৃত পুরষোচিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয় তাহলে সে নারীর ওপর অত্যাচার ও শোষণের এই ফ্রেইমওয়ার্কের একটি অংশ। একইভাবে, যদি নারী সাবমিসিভ হয় তাহলে সে পুরুষতন্ত্রের গোলাম, ব্রেইনওয়াশড। যদি নারী মা ও স্ত্রী হিসেবে নিজের পরিচত বেছে নেয় তাহলে সে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্রের ফসল। যদি পুরুষ বিশ্বস্ততা আশা করে তাহলে সেটা ভন্ডামি, যদি নারী বিশ্বস্ত থাকতে চায় তাহলে সে মানসিক দাসত্বের স্বীকার।
.
নৈতিকতা, যৌনতা ইত্যাদির ব্যাপারে যতো ধারণা আছে, ভালোমন্দ, বৈধ-অবৈধ, বিকৃতি, স্বাভাবিকতা – সব কিছুই কলুষিত পুরুষতন্ত্র এবং ঐতিহাসিক শোষণ ও নির্যাতনের ফসল। সমকামিতা তাই শুধু যৌন সুখের সন্ধান না বরং নিজের স্বাধীনতার প্রয়োগ, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। একইভাবে বহুগামী নারী হল আধুনিক এক বিপ্লবী। আর দৃষ্টিকোণ সবচেয়ে বড় বিপ্লব হল অ্যান্ড্রোজিনি – ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট – কারন এ আন্দোলন সব প্রথা, প্রচলন আর কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে। পুরুষত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে পথের শুরু তার পরিসমাপ্তি অ্যান্ড্রোজিনি। টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটি তত্ত্বের ফসল হল ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট।
.
এখানে একটি বিষয় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবিতে বিকৃতকামীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে – ব্যাপারটা এমন না। সব সমাজেই এরা খুব ছোট একটা মাইনরিটি। কিন্তু পার্থক্য হল যৌনতার ব্যাপারে তাদের ধ্যানধারনাগুলো বিপুল সংখ্যক মানুষ মেনে নিয়েছে। মোটা দাগে এই সভ্যতা যৌনতার ব্যাপারে এই দর্শনকে গ্রহন করেছে। যৌনতাকে এখন এভাবেই দেখা হচ্ছে, সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। সমকামি অধিকার, ট্র্যান্সজেন্ডার অধিকারের নামের এসব বিকৃতির স্বাভাবিকীকরনের কাজ করা হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। আর এভাবেই এই বিকৃতি ও অবক্ষয় সমগ্র সভ্যতার ওপর নিয়ন্ত্রন অর্জন করেছেন।
.
এভাবেই আমরা এমন এক বিচিত্র সময়ে এসে পৌছেছি যখন ৫২ বছর বয়েসি ছয় সন্তানের বাবা নিজেকে ৬ বছরের বাচ্চা মেয়ে দাবি করে। যখন ৩০ বছরের এক মহিলা প্রথমে নিজেকে পুরুষ দাবি করে আর তারপর পুরুষ কুকুর। যখন ২৮টি দেশে সমকামি ‘বিয়ে’কে বৈধতা দেয়া হয়। যখন শিশুকামিতা ও পশুকামিতাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যখন সেইডম্যাসোকিযম, বন্ডেজ, জেন্ডার গেইমসসহ নানা বিকৃতির প্রকাশ্যে উৎসব হয়। যখন আমেরিকাতে বছরে সাড়ে ছয় লক্ষ আর বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ৭ লক্ষের ওপর গর্ভপাত হয়[1]। যখন বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভুত যৌনতা সামাজিক নিয়মে পরিনত হয়। যখন সিনেমা, সাহিত্য, টেলিভিশন, ইউটিউব সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে নকশা, অধুনা, আর পরামর্শের কলাম সন্তান আর সন্তানদের অভিভাবককে শিখিয়ে দেয় উঠতি বয়সে ‘প্রেম করা’ আর ‘শারীরিক ঘনিষ্ঠতা’ – স্বাভাবিক একটি ব্যপার। আর যখন এমন কিছু ঘটে যা পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো ঘটেনি – পর্নোগ্রাফি ঢুকে পড়ে প্রতিটি ঘরে, চলে আসে প্রতিটি মানুষের হাতের নাগালে, পরিণত হয় শত বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক ইন্ডাস্ট্রিতে। আর সেক্সুয়াল রেভোলুশানের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে অ্যামেরিকার কিন্ডাগার্টেন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ‘অধুনা’ এর পাতাতে।
এ তো গেল আমাদের বর্তমান আর এই বর্তমানের শেকড়ের কথা। কিন্তু এই বাস্তবতা কীসের উপসর্গ? আর এ বর্তমান কোন ভবিষ্যতের আভাস দেয়? এ প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। বর্তমানকে দেখতে হবে ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে।
.
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
লিখেছেন- আসিফ আদনান
____________________________________________
Footnote: The British Broadcasting Corporation (BBC) wants lesbians, gays, bisexuals and the transgendered to be seen twice as much on TV as they are in real life within the next two years. It’s all part of a move by the BBC, the world’s biggest public broadcasting corporation, to “increase diversity on and off air to reflect and represent today’s UK.” [2]
শেয়ার করুনঃ
নীল নকশা (চতুর্থ কিস্তি)

নীল নকশা (চতুর্থ কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

IMUN (International Model United Nations) এর সোশ্যাল নাইটের কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে গানের তালে তালে পার্টিসিপেন্টদের ল্যাপড্যান্স দিতে, কিংবা স্ট্রিপারদের অনুকরণে নাচতে দেখা যাচ্ছে। বেশ সমালোচনা হচ্ছে। অনেক কথা হচ্ছে কিভাবে এগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে পশ্চিমা কালচার ঢোকানো হচ্ছে, কেন এগুলো বাংলাদেশের সমাজের সাথে যায় না – সেটা নিয়ে । সম্ভবত আজকে দুপুর থেকে এ কাজগুলোকে ডিফেন্ড করে পোস্ট আসতে শুরু করবে। সেগুলোতে বলা হবে, কিভাবে এসব আসলে চিন্তার স্বাধীনতা সংস্কৃতি চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতোক্ষন না আপনার আনন্দ আরেকজনের কষ্টের কারণ হচ্ছে, ততক্ষণ আপনি যা ইচ্ছে করতে পারেন, সমস্যা কোথায়? এটা জাস্ট এন্টারটেইনমেন্ট, ফান, লিবার্টি। এ অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত কেউ একজন সম্ভবত অলরেডি এমন কিছু বলেছে। অন্যরাও বলবে।
.
তারপর আমরা আরেকদলকে আসতে দেখবো – ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি অমুক অমুক কাজটা সমর্থন করি না, কিন্তু আরেকজনের পছন্দ, সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতাকে সমর্থন করি…’ টাইপ যুক্তি নিয়ে। তৃতীয় আরেকদল আসবে, ‘কাজটা ঠিক হয়নি এবং বন্ধ হওয়া উচিত, তবে মডেল ইউএন এর বিরোধিতার কোন মানে নেই। বাংলাদেশের মতো জায়গায় এটার গুরুত্ব অনেক। হয়তো এর মাধ্যমে তরুণরা সুস্থ রাজনীতির চর্চা শিখবে। এটার অমুক তমুক ভালো দিক আছে…’ ইত্যাদি কথা নিয়ে।
.
নানা দলের কথা আসার আগে কিছু কথা বলে নেই।
.
প্রথমত, ‘বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতির সাথে যায় না’ যুক্তিটা দয়া করে বাদ দিন। বেইসিকালি এটার অর্থ হল হূমায়ুন আহমেদের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের করা যিনা আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে যায়, কিন্তু সালমান মুক্তাদিরের কাজকর্ম যায় না। তাই সালমান মুক্তাদিরের যিনা ও ফাহিশাহর প্রমোশান খারাপ, হূমায়ুন আহমাদেরটা ভালো। শাড়ী-পাঞ্জাবী পরে মোমবাতি হাতে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে ছেলেমেয়ে একসাথে সোশ্যাল নাইট কাটিয়ে দিলে তাতে কোন সমস্যা থাকতো না। এটা একটা ননসেন্সিকাল কনসেপ্ট। সংস্কৃতি-সমাজ কোন অ্যাবসোলিউট মানদন্ড না এবং এগুলো অপরিবর্তনীয় না। ২০ বছর আগে মেয়েদের জিন্সের প্যান্ট আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে ‘মানাতো না’, এখন সম্ভবত জিন্স- ফতুয়া সাংস্কৃতিক –টাইপদের ইউনিফর্ম হয়ে গেছে। ১০ বছর পর স্কার্ট আর ব্লাউয হয়তো হবে। যা বলতে চাচ্ছি তা হল, সমাজ ও সংস্কৃতির মতো পরিবর্তনশীল মানদন্ডলে ওপর নৈতিকতা, শালীনতা ও আচরণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আর দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ড্রয়িং রুমে বসে সবাই মিলে টিভিপর্দায় দেখা কাজগুলো একদিন বাস্তবে উঠে আসতে পারে এ সম্ভাবনা কি একেবারেই আপনার মাথায় আসেনি?
.
দ্বিতীয়ত, যে ব্যাপারটা সামনে এসেছে সেটা বেশ স্থূল উদাহরণ তবে সত্যিকার অর্থে মডেল ইউএন, ইয়ুথ লিডারশীপ, মুভ ফাউন্ডেশানসহ এ জাতীয় বিভিন্ন সংস্থা এবং তাদের ওয়ার্কশপের মূল কাজটার বাস্তব রূপ আসলে এটাই। শুনতে ভালো এমন কিছু কথা, এবং দেখতে ভালো এমন কিছু কাজের আড়ালে সুনির্দিষ্ট কিছু চিন্তা সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। এ মানুষগুলো তারপর নিজ থেকেই সমাজে এসব ধারণা ছড়িয়ে দেবে। সেটা হতে পারে নারী অধিকার, মানবতা, ইন্টারফেইথ, স্বাধীনতা, ব্যাক্তি স্বাধীনতা কিংবা মুক্তচিন্তার মতো কনসেপ্ট যেগুলো, ভালো শোনায় এবং যেগুলোর শাব্দিক পোশাক তাদের মূল অর্থকে খুব সুন্দরভাবে আড়াল করে রাখে। যারা এসবে অংশগ্রহণ তাদের বেশিরভাগই এতোকিছু জেনেবুঝে যায় না, এবং নিজের অজান্তেই চেইঞ্জ এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় ব্র্যান্ডের উগ্র ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অনেকেই ইসলামকে বদলে দেয়ার অ্যামেরিকান ব্র্যান্ডের এই সূক্ষ এজেন্ডার বিরোধিতা করা তো দূরে থাকুক, বরং সমর্থক কিংবা সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হয়। একারণেই মাদ্রাসার ছাত্ররা মুভ ফাউন্ডেশানের অনুষ্ঠানে গিয়ে দাত বের করে তেলতেলে হাসি দেয়, ‘কিভাবে সমন্বিতভাবে মুভ করা যায়’ সেটা নিয়ে মুভ ফাউন্ডেশানের ওয়ার্কশপে গিয়ে ইসলামী বই প্রকাশকরা ব্রেইনস্টর্মিং করে, অনেক ইসলামিস্ট সেলিব্রিটি মডেল ইউএন টাইপ ব্যাপারগুলোতে অংশগ্রহণ করে কারণ ১) সিভিতে কাজে লাগবে, ২) নেটওয়ার্কিং হবে, ৩) বিতর্কের দক্ষতা আর পাবলিক স্কিলস বাড়বে, ৪) ফ্রি-তে বিদেশ ঘুরে আসা যাবে।
.
তৃতীয়ত, এটা চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা চর্চার সংস্কৃতির বাস্তব প্রতিফলন – একথা পুরোপুরি সত্য। হার্ম প্রিন্সিপাল অনুযায়ী এ কাজে কোন ভুল নেই। ছেলেপেলের মজা লাগছে, শরীর গরম হয়েছে, তাই একটু-আধটু ফান করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল তারা অন্য কারো ক্ষতি করেনি, কোন আইন না ভাঙ্গেনি – তাহলে এতে সমস্যা কোথায়? আপনার ভালো না লাগলে আপনি করবেন না। আর এখানে তো ভিডিও করাটাই অপরাধ হয়েছে, কারণ ভিডিও করা হয়েছে অনুমতি না নিয়ে। ওরা যা করেছে সেটা তো রাস্তায় মাইক লাগিয়ে করেনি। একটা ভিআইপি এরিয়াতে বন্ধ রুমের ভেতর করেছে। সমস্যা কোথায়?
.
যে জিনিসটাকে মাড়ির দাত দিয়ে কামড়ে ধরে নিজেদের জাতে টেনে তুলতে ইসলামিস্টদের বিশাল একটা অংশ উদগ্রীব, সেই সেক্যুলার ডিসকোর্স দিয়ে এর বিরোধিতা করা যায় না। করা গেলেও সেটা তেমন যুতসই হয় না। হবার কথাও না। ভালোমন্দের সেক্যুলার সংজ্ঞা দিয়ে এসবের বিরোধিতা করা সম্ভব না। আর ‘সমাজের সাথে যায় না’ যুক্তিও চরমভাবে দুর্বল। এসব কথা দিয়ে কোন লাভ তো হয় না, মাঝখান দিয়ে এসবের উপযুক্ত ও যথাযথ আদর্শিক বিরোধিতা এবং সঠিক অবস্থান মানুষের সামনে তুলে ধরার কাজটাও হয় না। এতোসব জোড়াতালি না দিয়ে, লম্বাচওড়া তাত্ত্বিকতা দিয়ে বুদ্ধিমান সাজার চেষ্টা না করে সরাসরি আত্মবিশ্বাসের সাথে সত্য কথাটা বলুন। এ কাজগুলো খারাপ কারণ আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল এর কাছে এগুলো খারাপ। এটা হারাম কারণ ইসলামী শারীয়াহ অনুযায়ী এটা হারাম। ব্যাপারটাতো এমন না যে সাধারন মানুষ বুঝছে না যে এগুলো খারাপ। সে বুঝতে পারছে, তার কাছে এগুলো খারাপই লাগছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে, ঠিক কোন জায়গা থেকে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে সেটা হয়তো সে পিনপয়েন্ট করতে পারছে না। আপনি তাকে সেটা ধরিয়ে দিন। তা না করে অনর্থক অর্থহীন অনুকরণের ব্যর্থ চেষ্টায় তাকে বিভ্রান্ত করবেন না।
.
চতুর্থত, মূল সমস্যা এবং এর মাত্রা নিয়ে চিন্তা করা দরকার। কিছু ছেলেপেলে মদ খেয়ে নাচানাচি করেছে, রাতে একসাথে থেকেছে এর চেয়ে অনেক বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হল তাদের মধ্যে যে আইডিওলজি ঢোকানো হচ্ছে এবং তাদের মাধ্যমে সমাজে যেসব ধ্যানধারণা প্রসার পাচ্ছে সেটা। পশ্চিমা ধাঁচের ল্যাপড্যান্সের চেয়ে পশ্চিমের অনুকরণে মানবতা, কল্যাণরাষ্ট্র কিংবা ব্যাক্তি স্বাধীনতার অনুকরণ করাটা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। শরীরে পাপ লাগে না, কিন্তু অন্তরের ময়লা পৃথিবীর সব সমুদ্রের পানি দিয়ে ধুলেও যায় না।

লিখেছেন- আসিফ আদনান

পড়ুন আগের পর্বগুলো-

নীল নকশা (প্রথম কিস্তি)- https://goo.gl/MLfx9j

নীল নকশা (দ্বিতীয় কিস্তি) http://bit.ly/2D4eOsS

‘নীল নকশা’ (তৃতীয় কিস্তি)

শেয়ার করুনঃ
আপেক্ষিক নৈতিকতা ও পেডোফিলিয়া

আপেক্ষিক নৈতিকতা ও পেডোফিলিয়া

কিছুদিন আগে টিএসসির ভাইরাল হওয়া ছবির প্রসঙ্গে বলেছিলাম নৈতিকতার মানদন্ডের গুরুত্বের কথা। কোন মানদন্ডের ওপর ভিত্তি করে আমরা কোন কিছুকে ভালো বা খারাপ বলবো? আমরা কি মানদন্ড হিসেবে নেবো প্রচলন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কিংবা কোন নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জাতির ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিকে? নাকি একটি সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় মানদন্ড থাকতে হবে। বলেছিলাম – ইসলামের বদলে সামাজিকতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহ্যকে মানদন্ড হিসেবে নিলে পশ্চিম থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসা প্রচন্ড ও সর্বব্যাপী নৈতিক অধঃপতনের স্রোতের মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। সময়ের সাথে বদলাতে থাকা নৈতিকতার কম্পাস বাঁধ দিতে পারে না, বরং অধঃপতন আর অবক্ষয়ের কারণ হয়ে ওঠে। পাবলিক পারসেপশান বদলায়, খুব দ্রুতই বদলায়। এক প্রজন্মের কাছে যা অকল্পনীয়, অন্য প্রজন্মের কাছে তাই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক। গত এক শতাব্দী জুড়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাবলিক পারসেপশান এবং জনমত পরিবর্তনের কাজ করে আসছে ম্যাস মিডিয়া। আধুনিক প্রপাগ্যান্ডার জনক এবং আনসাং হিরো ( বা অ্যান্টিহিরো) এডওয়ার্ড বারনেইস তার বই “প্রপাগ্যান্ডা”-তে মিডিয়ার মাধ্যমে সোশ্যাল এঞ্জিনিয়ারিং এর ধাপগুলো তুলে ধরেছেন খুব সহজবোধ্য ও খোলামেলাভাবে।
.
একটা বাস্তব উদাহরণ দেই। গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে ধরে ইন্টারনেটে একটা বিষয় নিয়ে তুলকালাম হচ্ছে। জনপ্রিয় মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম TEDxTalk এর একটি পর্বে মিরজাম হেইন নামে একজন জার্মান মেডিক্যাল স্টুডেন্ট বলেছে – পেডোফিলিয়া বা শিশুকাম একটি অপরিবর্তনীয় যৌন প্রবৃত্তি (unchangeable sexual orientation)। একজন নারী ও পুরুষের পারস্পরিক যৌন কামনা যেমন স্বাভাবিক তেমনি কিছু মানুষ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষন বোধ করে – এটাও স্বাভাবিক। তাই যারা পেডোফাইল- শিশুকামী – এই তাড়না, এই আকর্ষনবোধের কারণে তাদের দোষারোপ করা উচিৎ না। ভিডিওটি প্রকাশিত হবার সাথেসাথে ব্যাপক তর্কবিতর্ক শুরু হয় এবং তুমুল বিরোধিতার কারণে TEDxTalk বাধ্য হয় তাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে ভিডিও সরিয়ে নিতে।
.
মজার ব্যাপারটা হল শিশুকামের প্রবণতা স্বাভাবিক, অপরিবর্তনীয় এসব বলার পাশাপাশি হেইন এটাও বলেছে যে, শিশুকামের বাস্তবায়ন অপরাধ ও অনৈতিক। অর্থাৎ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষন থাকা স্বাভাবিক কিন্তু এই কামনা বাস্তবায়িত করা, এই অ্যাট্র্যাকশানের ওপর কাজ করা অপরাধ।
.
এখানেই নৈতিকতার মানদন্ডের ব্যাপারে আমাদের আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
.
পেডোফিলিয়া যদি নারীপুরুষের পারস্পরিক শারীরিক আকর্ষনের মতোই যদি স্বাভাবিক এবং অপরিবর্তনীয় বিষয় হয় তাহলে এই আকর্ষনের ওপর আমল করা কেন অপরাধ হবে? কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যখন কোন শিশুর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয় তখন ব্যাপারটা দুজনের সম্মতিতে হয় না। অর্থাৎ এটা অপরাধ কারণে এখানে পারস্পরিক সম্মতি (Consent) অনুপস্থিত। একই কারণে পশুকামও অপরাধ, কারণ এক্ষেত্রেও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যৌনকর্ম হচ্ছে না। সম্মতি একপাক্ষিক। এটা হেইনের উত্তর। যদিও পশ্চিমের অনেকেই এখন তার বিরোধিতা করছে, কিন্তু যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমের ধারণা অনুযায়ী এ উত্তর সঠিক।
.
চিন্তা করে দেখুন, বিবাহবহির্ভূত সেক্স (যিনা), সমকামিতা, উভকামিতা, সুইঙ্গার সেক্স, হুকআপ কালচার (বহুগামীতা), গ্রুপসেক্সের মতো যৌনবিকৃতিগুলোর পক্ষে উদারনৈতিক পশ্চিমের ডিফেন্স কী?
.
“আমরা তো কারো ক্ষতি করছি না!”
.
“যতোক্ষন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিয়ে কিছু করছি, ততোক্ষন কী সমস্যা?”
.
“ভালোবাসা কোন বাঁধা মানে না”
.
“দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যা ইচ্ছে করার অধিকার আছে, এবং এতে হস্তক্ষেপ করার স্বাধীনতা কারো নেই”
.
“আমার এ ব্যাপারটা (যেকোন যৌনবিকৃতি) জন্মগত”
.
মূলত এধরণের উত্তরই বিভিন্নভাবে আমরা শুনে আসছি। সুতরাং পেডোফিলিয়ার ব্যাপারে মিরজাম হেইন যা বলেছে তা পুরোপুরিভাবে পশ্চিমের এ দৃষ্টিভঙ্গি – এ মানদণ্ডের – সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
.
এখন প্রশ্ন করতে পারেন – এ মানদন্ডে সমস্যা কোথায়? হ্যাঁ এটা ইসলামের নৈতিকতার সাথে যায় না, কিন্তু পারস্পরিক সম্মতির শর্ত দিয়ে তো অ্যাটলিস্ট শিশুকামিতা ও পশুকামিতার মতো ব্যাপারগুলো আটকানো যায়, এটাই বা কম কিসে?
সমস্যা হল, এ শর্ত দিয়ে শিশুকামিতাকে আটকানো যায় না। ব্যাখ্যা করছি।
.
বলা হচ্ছে – শিশুর সাথে সেক্স একটি অপরাধ এবং অনৈতিক কাজ কারণ এখানে উভয়পক্ষের পারস্পরিক সম্মতি (consent) নেই।
পারস্পরিক সম্মতি নেই কেন?
.
কারণ একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে, বয়ঃপ্রাপ্ত হবার আগে শিশুর মধ্য যৌনতার ধারণা গড়ে ওঠে না। যেহেতু শিশুর মধ্যে যৌনতার ধারণা, নিজের যৌনতা সম্পর্কে সচেতনতাই নেই। তাই তার পক্ষে কোন যৌনকর্মে সম্মতি দেয়া (consent করা) সম্ভব না। অতএব শিশুর সাথে সেক্স আবশ্যিকভাবেই সম্মতি ছাড়া হচ্ছে, তাই এটি একটি অনৈতিক ও অপরাধ। যেমন একজন নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া যৌনকর্ম করা রেইপ।
রাইট?
রং।
.
এ পুরো যুক্তির ভিত্তি হল “Consent” – সম্মতি। যদি আমি প্রমাণ করতে পারি যে এখন শিশুর যৌনতার ব্যাপারে সম্মতি দেয়ার মতো ম্যাচিউরিটি আছে, তাহলে কি এ যুক্তি আর দাড়াতে পারবে?
.
যদিও এখনো বিষয়টা ঠিক এভাবে আলোচনা করা হচ্ছে না, কিন্তু শিশুরাও যে “যৌনতা সম্পর্কে সচেতন” এটা অলরেডি পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়া এবং মিডিয়া সুপ্রতিষ্ঠিত একটি বিষয়। বিশ্বাস হচ্ছে না?
.
সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের অবস্থান হল শিশুরা জন্ম থেকেই যৌনতা সম্পর্কে সচেতন। যৌনতা সম্পর্কে আধুনিক সেক্সোলজির জনক ড. অ্যালফ্রেড কিনসি এবং আরেক মহারথী ড. জন মানির অবস্থানের দিকে তাকালেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। এ দুজনের অবস্থানের সারসংক্ষেপ হল –
.
১) জন্মের পর থেকেই শিশুরা যৌনতা সম্পর্কে সচেতন, সেক্সুয়ালি অ্যাক্টিভ এবং যৌনসুখ অর্জনে সক্ষম।
২) ১০-১১ বছর বয়েসী শিশু যৌন আকর্ষন অনুভব করতে পারে। তুলমামূলক ভাবে বয়স্ক কোন ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন – শিশুর জন্য নেতিবাচকই হবে এমন কোন কথা নেই।
.
[রেফারেন্স ও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, ১) মিথ্যের শেকল যত, মুক্তো বাতাসের খোঁজে, ইলমহাউস পাবলিকেশন, ২) “পাঠক সাবধান! ভয়ের জগতে প্রবেশ করছো তুমি!! ফলো দা মানি – https://bit.ly/2FiZ03e]
.
যদি কিনসি আর জন মানির দেয়া যৌনতার ধারণা গ্রহণ করা হয় – যদি মানব যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমা চিন্তার মূলনীতিগুলো মেনে নেয়া হয় – তাহলে আর এ যুক্তি দেয়া যায় না যে শিশুকাম একটি অপরাধ কারণ শিশুদের পক্ষে Consent করা বা যৌনকর্মে সম্মতি দেয়া সম্ভব না। যদি কেউ যৌনতা সম্পর্কে সচেতন হয়, যৌনসুখ অর্জনে সক্ষম হয় এবং সক্রিয়ভাবে যৌনকর্মে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে সম্মতি কেন দিতে পারবে না?
.
শিশুকামের পক্ষে প্রচারণা চালানো অ্যামেরিকান ও ইউরোপিয়ান বিভিন্ন সংস্থা সত্তরের দশক থেকে ঠিক এ যুক্তিই ব্যবহার করে আসছে। দেখুন অ্যামেরিকান সমকামি শিশুকামি সংস্থা NAMBLA – North American Man Boy Love Association এর সদস্যদের বক্তব্য – https://www.youtube.com/watch?v=Ygrd29-_O3I
.
এতো গেল অ্যাকাডেমিয়ার কথা। সাধারণ মানুষের কী অবস্থা? অধিকাংশ সময়ই অ্যাকাডেমিকদের তত্ত্বকথার কচকচির সাথে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের তেমন কোন সম্পর্ক থাকে না। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা কি এরকম? সাধারণ মানুষও কি মনে করছে একজন শিশু যৌনতা সম্পর্কে সচেতন, নিজের যৌনতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম ?
.
জি মনে করছে। কিংবা বলা ভালো তাদের মনে করানো হচ্ছে। এব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য মিডিয়া, এডুকেইশান সিস্টেম, পশ্চিমা সরকার এবং গ্লৌবাল অর্গাইনাইযেইশানগুলো (ইউএন, WHO ইত্যাদি) পুরোদমে কাজ করছে। ব্যাপারটা সম্ভবত আপনারও চোখে পড়েছে, তবে হয়তো কানেকশানটা ধরতে পারেননি।
.
গত দশ বছরে ট্র্যান্সজেন্ডার আইডেন্টিন্টি নিয়ে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো একটু মনে করার চেষ্টা করুন তো! কিছু শিরোনাম আবার মনে করিয়ে দেই –
.
“ব্রিটেনের প্রথম জেন্ডার ফ্লুয়িড পরিবার: বাবা নিজেকে নারীতে পরিণত করছেন, মা নিজেকে পুরুষ মনে করেন, আর ছেলে বড় হচ্ছে জেন্ডার নিউট্রাল হিসাবে”।
.
নিউ ইয়র্কে আইনি ভাবে ৩১ টি লৈঙ্গিক পরিচয়কে (Gender Identity) স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
.
ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্ট স্টোর জন লুইস ঘোষণা করেছে তারা বাচ্চাদের পোশাক আর “ছেলে” বা “মেয়ে” ট্যাগ দিয়ে আলাদা করবে না। এখন থেকে তারা বাচ্চাদের শুধু “Unisexz”/”Gender Neutral” পোশাক বিক্রি করবে।
.
২০১৭ এর মার্চে টাইম ম্যাগাযিন মানুষের মৌলিক পরিচয় ও যৌনতার পরিবর্তনশীল সংজ্ঞার এ যুগ নিয়ে কাভার স্টোরি করেছে। Beyond ‘He’ or ‘She’: The Changing Meaning of Gender and Sexuality – শিরোনামের এ লেখায় সমকামী অধিকার নিয়ে কাজ করা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ GLAAD এর একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে অ্যামেরিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এখন আর নিজেদের সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক যৌনাচারে আকৃষ্ট (Heterosexual) অথবা সম্পূর্ণ ভাবে সমকামিতায় আকৃষ্ট মনে করে না। বরং “মাঝামাঝি কিছু একটাকে” বেছে নেয়। একইভাবে অ্যামেরিকান তরুনদের এক-তৃতীয়াংশ “পুরুষ” বা “নারী” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় না।
.
[রেফারেন্স ও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন – “পাঠক সাবধান! ভয়ের জগতে প্রবেশ করছো তুমি!! ফলো দা মানি – https://bit.ly/2FiZ03e]
.
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের ডেইলি স্টার তাদের সাপ্তাহিক সাপ্লিমেন্ট “Lifestyle” এ Gender fluidity/ Gender Neutrality – কে সমর্থন করে কাভার স্টোরি করেছে। [লিঙ্ক – https://bit.ly/2OngXCN]
.
নার্সারির বাচ্চাদের জেন্ডার ফ্লুয়িডিটির ব্যাপারে ক্লাস নিচ্ছে ড্র্যাগ কুইনরা। [https://nbcnews.to/2tkr4P2]
.
ব্রিটেনে প্রতি সপ্তাহে ৫০ জন শিশুকে Gender Dysphoria ও Gender Change সঙ্ক্রান্ত ক্লিনিকে পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে ৪ বছর বয়েসী শিশুও আছে। শিশুদের মধ্যে লিঙ্গ পরিবর্তন অপারেশন বৃদ্ধি পাচ্ছে। [https://bit.ly/2LUsKai]
.
সংক্ষেপে ট্র্যান্সজেন্ডার আইডিওলজির মূল কথা হল – মানুষের ধরাবাঁধা কোন যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় নেই। এ ব্যাপারটা একটা স্পেক্ট্রাম একটা রংধনুর মতো (হ্যাঁ এই জন্যই রংধুন সিম্বল ব্যবহার করা হয়)। কোন কিছু সাদাকালো না। এখানে আছে অনেক, অনেক রং। যে কোন মানুষ বা শিশু যদি বলে সে একজন নারী হিসেবে, বা পুরুষ হিসেবে, বা অন্য কোন “কিছু” হিসেবে পরিচিত হতে চায়, তবে তাই ধরে নিতে হবে। সে শারীরিকভাবে, জন্মসূত্রে যাই হোক না কেন!
.
মজার ব্যাপার হল ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের পক্ষে দেয়া যুক্তিগুলো দিয়ে খুব সহজে সমকামিতার পক্ষে দেয়া যুক্তিগুলো খন্ডন হয়ে যায়। সমকামিতার পক্ষে বহুল ব্যবহৃত একটি যুক্তি হল কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই সমকামি হয় (‘born this way’)। আবার অনেকে বলার চেষ্টা করে একটি বিশেষ জিন (the gay gene) আছে যার কারণে কিছু মানুষ সমকামি হয়ে জন্মায়। অর্থাৎ তারা দাবি করে সমকামিতদের যৌনতা বায়োলজিকালি নির্ধারিত।
.
আবার দেখুন ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে এরা বলছে যৌনতা, লৈঙ্গিক পরিচয়, এসবই পরিবর্তনশীল। কোন কিছুই পাথরে লেখা। যে নারী হিসী জন্মেছে সে একসময় পুরুষ হতে পারে, যে নারীদের প্রতি আকর্ষনবোধ করতো একসময় সে আকর্ষনবোধ করতে পারে পুরুষের প্রতি। এগুলো খুবই স্বাভাবিক ইত্যাদি। যদি তাই হয়, তাহলে নিশ্চয় সমকামিতা জন্মগত হতে পারে, যেহেতু জন্মগত লিঙ্গকেই স্বীকার করা হচ্ছে না। সমকামি জিন বলেও তাহলে কিছু থাকতে পারে না। এই যুক্তি অনুযায়ী সমকামিতা, উভকামিতা, পশুকামিতা, কিংবা নারী পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা – কোন কিছুই জিনগত না, বায়োলজিকালি নির্ধারিত না। এসবই এগুলো বদলাতে পারে। যার অর্থ একজন সমকামি, একসময় সমকামিতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আর যদি সাধারণভাবেই একজন সমকামি সমকামিতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে, তাহলে ট্রিটমেন্টের মাধ্যমেও এটা করা সম্ভব। অর্থাৎ ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে মিলিট্যান্ট সেক্যুলারিযম সমকামিতার পক্ষে চালানো নিজেরদের প্রপাগ্যান্ডাকেই খন্ডন করে বসে আছে। তাদের এক কথা আরেক কথার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। অসংলগ্ন ধ্যানধারণা ও মতাদর্শের মধ্যে এ প্যাটার্নটা বারবার দেখতে পাবেন।
.
লক্ষণীয় বিষয় হল এখানে সত্যিকারের ইন্টারসেক্স বা ট্রু হারমাফ্রোডাইটের কথা বলা আচ্ছে না। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী প্রতি ২০০০ জনে ১ জন True Hermaphrodite বা intersex ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। জনসংখ্যার ০.০৫%। অর্থাৎ এরা এমন মানুষ সংখ্যায় খুবই কম। ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টে এমন মানুষ/শিশুদের কথা বলা হচ্ছে যাদের শারীরিক কোন সমস্যা নেই। শারীরিকভাবে তারা পুর্নাংঙ্গ নারী বা পুরুষ। কিন্তু তারা মনে করেছে তারা ভুল দেহে আটকা পড়েছে। মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী চার বছর বয়েসী শিশুদেরও এখন এমন মনে হচ্ছে, এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ফ্রি-তে এমন ওষুধ দিচ্ছে যেগুলো তাদের স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকে বিলম্বিত বা বন্ধ করবে (Puberty Blockers – horomone therapy) [https://to.pbs.org/2uUu1rt, https://bit.ly/2K1zjpy]
ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনা নিয়ে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড রিডিং এর জন্য দেখুন –
.
নিচে দুটো দশ বছর বয়েসী ছেলের ভিডিও দিচ্ছি যারা দাবি করছে ২ এবং ৩ বছর বয়স থেকে “ড্র্যাগ” করা শুরু করেছে। এ বয়সেই তারা আবিষ্কার করেছে যে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক পরিচয়ের বাইরেও তাদের মধ্যে অন্য একটি “সত্ত্বা” আছে। ড্র্যাগ (Drag) হল পশ্চিমা সমকামিদের একটি সাবকালচার যেখানে সমকামি পুরুষরা নারীদের মতো ড্রেসআপ ও মেইকআপ করে বিভিন্ন ধরণের স্টেইজ শো – রানওয়ে, গান, নাচ ইত্যাদি-তে অংশগ্রহণ করে। কাজটা যখন সমকামি পুরুষরা করে তখন তাকে বলা হয় “ড্র্যাগ কুইন”। “ড্র্যাগ কিং” এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। সমকামি নারীরা পুরুষের মতো ড্রেসআপ ও মেইকআপ করে। এধরণের অনুষ্ঠানগুলো হাইলি সেক্সুয়ালাইযড হয়ে থাকে। ভিডিওও অংভঙ্গি দেখলেই বুঝতে পারবেন। এবাচ্চাগুলো টিভিতে বড়দের যা করতে দেখেছে তাই কপি করছে।
‘ডেযমন্ড’ – https://www.youtube.com/watch?v=Qk0WA3VlFfA
‘ল্যাকট্যাশিয়া’ – https://www.youtube.com/watch?v=bdCXxUxI-WE
.
[দুটো ভিডিওতেই নানা জাতের অসভ্য মানুষের ফুটেজ আছে, সো নিজ দায়িত্বে দেখবেন বা দেখবেন না। ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের উন্মাদনার মাত্রা বোঝানো এবং প্রমাণ হিসেবে লিঙ্কগুলো দেয়া। আমি পারসোনালি ভিডিওগুলো দেখতে সাজেস্ট করবো না।]
.
আসুন এবার ডটগুলো মেলানো যাক। পুরো ব্যাপারটা এবার একটু স্টেপ বাই স্টেপ চিন্তা করুন –
১০ বছর বয়েসী বাচ্চারা বলছে তারা ২/৩ বছর বয়েস থেকেই নিজেদের মধ্যে এই ‘সত্ত্বা’ অনুভব করছে। কেউ অনুকরণ করছে ড্র্যাগ কুইনদের, আবার কেউ বলছে সে নিজের নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চায়। অভিভাবক, সমাজ, রাষ্ট্র ও মিডিয়া তাদেরকে সমর্থন করছে, এবং এই বাচ্চাদের “অনুভূতির” ওপর বেইস করে জীবনকে আমূল বদলে দেয়া বিভিন্ন মেডিকাল প্রসিজারের দিকে যাচ্ছে। লক্ষ করুন, এ সিদ্ধান্তগুলোর সাথে যৌনতার ব্যাপার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ৮ বছর বয়েসী একটা ছেলে যদি বলে সে হাইলি সেক্সুয়ালাইযড সমকামি সাবকালচারের সাথে আইডেন্টিফাই করে, অথবা যখন সে বলে সে আসলে পুরুষের দেহে আটকে পড়া একজন নারী – এবং আমরা যখন সেটা মেনে নেই, তখন মূলত আমরা এটাই মেনে নিচ্ছি যে নিজের যৌনতা ও শরীরের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্তগুলো দেয়ার মতো ম্যাচিউরিটি তার মধ্যে এসেছে। অর্থাৎ এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার মাধ্যমে আমরা মেনে নিচ্ছি এ বয়েসী একটা বাচ্চার সম্মতি দেয়ার – consent করার – সক্ষমতা আছে।
“নিজের পুরো শরীরকে বদলে ফেলার ব্যাপারে, নিজের লিঙ্গ বদলে ফেলার ব্যাপারে যে মানুষ সিদ্ধান্ত দিতে পারে, কার সাথে শোবে সেই ব্যাপারে সে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না?”
.
একজন পেডোফাইল যদি প্রশ্ন করে, কী জবাব দেবেন? যদি যৌনতা এবং যৌন বিকৃতির ব্যাপারে পশ্চিমা চিন্তার মূল কাঠামোকে মেনে নেন, যদি আপনি মেনে নেন একটা শিশু তার লিঙ্গ পরিবর্তনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে আপনাকে এটাও মানতে হবে যে এই শিশু তাহলে যৌনকর্মের ব্যাপারেও সম্মতি দিতে পারে। সুতরাং যে যুক্তি দিয়ে মিরজাম হেইন এবং অন্যান্য আরো অনেকে শিশুকামকে অনৈতিক ও অপরাধ বলছেন তা ধোপে টেকে না। ট্র্যান্সজেন্ডার আইডিওলজি আমাদের দেখাচ্ছে যে শিশুরাও যৌনতার ব্যাপারে সচেতন, সক্রিয় ও সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম। এবং এভাবেই যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমা দর্শন – যা আমরা আধুনিকতার নামে গদগদ হয়ে গ্রহণ করেছি – সেটা শিশুকামীতাকে বৈধতা দেবে।
অলরেডি একে বৈধতা দেয়ার থিওরেটিকাল এবং রেটোরিকাল ফ্রেইমওয়ার্ক পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন শুধু প্রয়োজন নিয়মিত কিছু আবেগঘন নভেল, সিরিয়াল, সিনেমা আর দেশে দেশে হাই-প্রোফাইল কিছু শিশু ট্র্যান্সজেন্ডার সেলিব্রিটি। ঠিক দু’দশক আগে যেভাবে সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমানে “ট্রান্সজেন্ডার রাইটস”-এর নামে ঠিক একই কাজ করা হচ্ছে।
[সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন কিভাবে হল – https://bit.ly/2vdLmL6]
.
“যৌনতা, ব্যক্তি পরিচয় এসবই আপেক্ষিক। ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিষয়। একজন মানুষ ভেতরে কেমন তাই মুখ্য। সামাজিক প্রথা আর পশ্চাৎপদতার কারণে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি উচিৎ না। যখন কারো ক্ষতি হচ্ছে না তখন বিরোধিতা কেন?” – এসব আর্গুমেন্টের মাধ্যমে এই বিকৃতি ও অসুস্থতাকে স্বাভাবিক, নির্দোষ কিছু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। এবং একবার এই বিকৃতি গৃহীত হবার পর এই যুক্তি ব্যবহার করে বৈধতা দেয়া হবে পেডোফিলিয়ারও। আমার কথাটা স্মৃতিতে মজুদ করে রাখতে পারেন, বছর দশেক পর মিলিয়ে নেবেন।
.
এই অর্থহীন যৌনমানসিক বিকৃতির জট ইসলামের আলোতে খোলা খুব সহজ। আমরা জানি, আল্লাহ মানুষকে ফিতরাহর (natural disposition) ওপর সৃষ্টি করেছেন। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হল বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষন। জীবনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে প্রতটি মানুষ বয়ঃপ্রাপ্ত (বালেগ) হয়, এবং তখন থেকে সে যৌনতায় সক্রিয় হবার সক্ষমতা অর্জন করে। অঞ্চল, আবহাওয়া ও পরিবেশভেদে এই বয়সের মধ্বেঁযে কিছু পার্ধেথক্য পরিলক্ষিত হয়। সমকামিতা জন্মগত না, স্বাভাবিক না। বরং একটি যৌনমানসিক বিকৃতি। আমরা জানি আল্লাহ ভুল করেন না। কাজেই ভুল করে, ছেলের দেহে মেয়ে বা মেয়ের দেহে ছেলে আটকা পড়েছে – এধরণের কিছু হওয়া সম্ভব না। হয় এটা মানসিক রোগ, বিকৃতি, বাহ্যিক কোন ফ্যাক্টরের প্রভাব (অ্যাবিউয, শক, ট্রমা ইত্যাদি) অথবা সিহর বা জ্বিন শায়াত্বিনের প্রভাব। আর যারা সত্যিকার অর্থে, শারীরিকভাবে ইন্টারসেক্স (ট্রু হারমাফ্রোডাইট) তাদের হুকুম আহাদিস থেকে স্পষ্ট, এবং এটা তাদের জন্য একটি পরীক্ষা।
.
কিন্তু যখনই আপনি পরম মানদন্ডকে ছেড়ে আপেক্ষিকের গলিতে ঢুকে পড়বেন, কোন কূলকিনারা পাবেন না। আপেক্ষিক নৈতিকতা আর সামাজিকতাকে নৈতিকতার মানদন্ড হিসেবে নেয়ার এই হল ফলাফল। যৌনতা এবং যৌনবিকৃতি এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে শক্তিশালী কারণ এ বিষয়গুলো সহজাতভাবে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু একই ধরণের বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান পশ্চিমা চিন্তা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অন্যান্য ক্ষেত্রেও। পশ্চিমা সভ্যতা তাদের উৎকর্ষের চরমে পৌছানোর পর এখন আছে অবক্ষয় আর অধঃপতনের পর্যায়ে। প্রত্যেক সভ্যতায় এই পর্যায়ে এসে নানান ধরণের যৌনবিকৃতি ও সীমালঙ্ঘন দেখা দেয়। লেইট স্টেইজ ডেকাডেন্স। পশ্চিম এখন এই অবস্থায় আছে। তাদের মধ্যে অনেকে এটা বুঝতেও পারছে। [https://bit.ly/2HtHdsg] কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা মুসলিমরা এখনো অনিমেষ নয়নে মুগ্ধ হয়ে পচতে শুরু করা অতিকায় এই কাঠামোর দিকে চেয়ে আছি। তাদের অনুকরণে নিজেদের উন্নতির স্বপ্ন দেখছি। অথচ সত্যিকারের দিকনির্দেশনা, সত্যিকারের পরশপাথর, পরম মানদন্ড – আল ফুরকান আমাদের হাতের কাছেই। কী বিচিত্র ইচ্ছাঅন্ধত্ব, কী অদ্ভূত আত্মঘৃণা!
====
লেখক- আসিফ আদনান
শেয়ার করুনঃ
মিথ্যের শেকল যত

মিথ্যের শেকল যত

পর্নোগ্রাফি সরাসরি বিকৃত যৌনাচার এবং যৌন-নিপীড়নের প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। যৌনতা যেমন শারীরিক, তেমনই মানসিক। পর্নোগ্রাফি টার্গেট করে মানুষের মনকে, আর একবার মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করার পর সেটার ছাপ পড়তে শুরু করে শরীরের ওপর। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সবাই বের হয়ে রেইপ করা শুরু করে দেয়, ব্যাপারটা এমন না। তবে পর্ন সেক্সের ব্যাপারে স্বাভাবিক ধারণাকে বদলে দিয়ে বিকৃত ও অস্বাভাবিক যৌনতার ইচ্ছে তৈরি করে। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত সবার মধ্যেই বিকৃত যৌনতার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

প্রথমবার হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখার সময় অনেক কিছুই আপনার কাছে অস্বাভাবিক, নোংরা মনে হবে। গা ঘিনঘিন করবে। কিন্তু ক্রমাগত এ ধরনের পর্ন ভিডিও দেখতে থাকলে এক সময় আপনার কাছেই এসব কাজকে খুব স্বাভাবিক লাগবে। শুধু তা-ই না, আপনার মধ্যে এমন আচরণ করার আকর্ষণ জন্মাবে। পর্নোগ্রাফি এভাবে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অবসেসিভ এবং প্যাথোলজিকাল টেন্ডেন্সি গড়ে তোলে।

একেক জনের মধ্যে একেক ধরনের আসক্তি, অবসেশন, বিকার বা প্যাথোলজিকাল আচরণের প্রবণতা তৈরি হয়। এটা হতে পারে হস্তমৈথুন, ভয়ারিযম,[1] অ্যানাল-ওরাল সেক্সের মতো বিকৃত যৌনাচার, ক্রমাগত সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে ভোগা, গ্রুপ সেক্স, সমকামিতা, শিশুকামিতা, ধর্ষণ করার প্রবণতা, ব্যাপক বহুগামিতা অথবা অন্য কোনো যৌন-মানসিক বিকৃতি।

সহজ ভাষায়, পর্নোগ্রাফি মানুষের স্বাভাবিক যৌন প্রবণতা নষ্ট করে দেয়। পর্নোগ্রাফি যত “কড়া” ধাঁচের হয়, পর্ন-আসক্ত দর্শকের ওপর সেটার প্রভাব তত তীব্র হয়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্ন ভিডিওগুলোতে সহিসংতার ব্যাপক উপস্থিতির কারণে এখন পর্ন-আসক্তদের মধ্যে ধর্ষণ-প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কথাগুলোর সাথে স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ-সম্পন্ন কারও দ্বিমত করার কথা না। একজন মানুষ যার ফিতরাহ (Natural Disposition/সহজাত প্রবণতা) নষ্ট হয়ে যায়নি, এ কথাগুলো স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। অর্থনীতিতে। যখন কোনো সমীকরণে অর্থনীতি ঢুকে পড়ে, সবচেয়ে সোজাসাপ্টা বিষয়গুলোও চরম গোলমেলে হয়ে ওঠে।

গ্লোবাল পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। ২০০৬ সালে এ ইন্ডাস্ট্রির মোট আয় ছিল ৯৭ বিলিয়ন ডলার। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাযন, ইয়াহু, অ্যাপল এবং নেটফ্লিক্সের সম্মিলিত আয়ের চেয়ে বেশি![2]

বছরে পর্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রফিট ১৫ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় হলিউডের বাৎসরিক প্রফিট? ১০ বিলিয়ন ডলার।[3]

আর এ তো শুধু ঘোষিত আয়ের হিসেব। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির লেনদেনের বড় একটা অংশ কখনো রিপোর্টেড হয় না।[4] অর্থাৎ এ ইন্ডাস্ট্রির প্রকৃত সাইযটা আরও বড়। যখন কোনো কিছুর সাথে এত এত টাকা জড়িত থাকে, তখন সেটাকে ক্ষতিকর হিসাবে স্বীকার করা, ঘোষণা দেয়া বেশ কঠিন হয়ে যায়। সহজ সমীকরণে গোলমেলে অর্থনীতি ঢুকে পড়ে। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসকে রক্ষা করাটা হয়ে দাঁড়ায় রুটি-রুজি আর পুঁজির প্রশ্ন। ফার্মাসিউটিক্যাল, হোটেল ও ট্যুরিযম, ক্যাইবল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, ওয়াল স্ট্রিট, গ্লোবাল সেক্স ট্র্যাফিকিং, সেক্সোলজি ও সাইকোলজি—এ সবগুলো ইন্ডাস্ট্রি বিভিন্নভাবে লাভবান হয় পর্ন ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে।

ব্যক্তি ও সমাজের ওপর পর্নের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা আড়াল করে পর্নকে নির্দোষ ও উপকারী বিনোদন প্রমাণ করতে তাই ধরাবাঁধা কু-যুক্তি আর অপবিজ্ঞান ব্যবহার করে চালানো হয় ব্যাপক প্রপাগ্যান্ডা। আর পর্নোগ্রাফি ও হস্তমৈথুনের ফাঁদে আটকে পড়া অনেকেই অন্ধের মতো এ ফাঁকাবুলিগুলো ক্রমাগত আওড়ে যান।

এমনই একটি বহুল ব্যবহৃত তত্ত্ব হলো “Catharsis Theory” বা “Catharsis Effect”। বার বার এ তত্ত্বের রেফারেন্স টেনে এনে অনেকেই দাবি করে বসে, “ধর্ষণ, যৌন-নিপীড়ন, যৌনবিকৃতি, মানসিক বিকৃতি, শিশুকাম এগুলোর পেছনে পর্নোগ্রাফি প্রভাবক হিসেবে কাজ তো করেই না, বরং সমাজ থেকে এ অপরাধগুলোর মাত্রা কমিয়ে ফেলার জন্য পর্নোগ্রাফি খুবই কার্যকর। একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র!”

 

তো কীভাবে এই ব্রহ্মাস্ত্র কাজ করে?

এ তত্ত্বের প্রবক্তারা ব্যাখ্যা করেন এভাবে –

ধরুন, কেউ কামের জ্বালায় একদম অস্থির হয়ে আছে। পাগলপ্রায় অবস্থা। যেকোনো উপায়ে, যার সাথেই হোক অন্তরঙ্গ না হতে পারলে সমূহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কিন্তু সেই লোকের কোনো সুযোগ নেই কারও সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার। এখন সে কী করবে? প্রবৃত্তির ক্রমাগত অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে হাত বাড়াতে পারে তার আশেপাশের যেকোনো নারীর দিকে, শিশুদের দিকে নজর দেয়াও অসম্ভব কিছু না, পতিতালয়েও যেতে পারে! কিন্তু যদি তার পর্ন দেখার সুযোগ থাকে, তাহলে নিজের ভেতরের ক্রমেই বাড়তে থাকা প্রেশারটুকু রিলিয করে দিয়ে ঠান্ডা হতে পারবে। সমাজের অগণিত মানুষ রক্ষা পাবে বিপর্যয়ের হাত থেকে।

মনে করুন, একজন ব্যক্তি সম্ভাব্য শিশু ধর্ষক। বহুদিন থেকেই তার ইচ্ছা শিশুদের নিপীড়ন করার। কিন্তু সুযোগের অভাবে সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনা। এখন এই ব্যক্তিকে যদি ক্রমাগত চাইল্ড পর্ন দেখানো হয়, তাহলে সে কিছুদিন পর শিশুদের সঙ্গে যৌনমিলনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।[5] এভাবে মানুষের যৌনতাড়না, যৌনবিকৃতি, যৌন-নিপীড়নের ইচ্ছা, সেক্স ফ্যান্টাসিগুলো পর্ন দেখার মাধ্যমে পূরণ হয়ে যাবে। বাস্তবজীবনে আর এসব বিকৃত কাজকর্ম করার দরকার হবে না। সমাজ রক্ষা পাবে ক্ষতির হাত থেকে।[6]

এই পর্যন্ত পড়ার পর মনে হয় ঠিকই তো! পর্নোগ্রাফি যৌনচাহিদা (তা যতই বিকৃত হোক না কেন) পূরণের একটা নিরাপদ রাস্তা তৈরি করে দিয়ে সমাজকে মারাত্মক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে।

কিন্তু আসলে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। এ থিওরিকে বহু আগেই এক্সপার্টরা বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছেন।[7], [8]

তাহলে শুভংকরের ফাঁকিটা কোথায়?

যে এক্সপেরিমেন্টের ওপর ভিত্তি করে Catharsis Theory দেয়া হয়েছিল তার এক্সপেরিমেন্টাল সেটআপ ছিল খুবই অগোছালো। মানসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য গবেষণার জন্য যে স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখা দরকার তার কিছুই করা হয়নি।[9] টেনেটুনে ৩০ জনের একটু বেশি মানুষের (৩২ জন) ওপর ১৫ দিন ধরে গবেষণা চালিয়ে Catharsis Theory-এর উপসংহার টানা হয়। এ ৩২ জনের মধ্যে ২৩ জনের একটা গ্রুপকে একটানা ১৫ দিন, ৯০ মিনিট করে একই ঘরানার পর্ন ভিডিও দেখানো হয়। ১৫ দিন পর ২৩ জনের গ্রুপটা জানায়, শুরুতে তারা পর্ন ভিডিও দেখে উত্তেজিত হতো, কিন্তু পরে তারা পর্ন ভিডিওতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একই রকমের পর্ন ভিডিও দেখার ফলে তাদের একঘেয়েমি পেয়ে বসে। শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই। পর্নকে নির্দোষ প্রমাণ করার বদলে এটা আসলে মানুষের যৌনতার ওপর পর্নের ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর প্রভাবের একটি প্রমাণ।

ব্যাপারটা একটু চিন্তা করুন। একই ধরনের পর্ন টানা ১৫ দিন; মাত্র ১৫ দিন দেখলেই মানুষের একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। একই ধাঁচের পর্ন তাদের আর আগের মতো উত্তেজিত করতে পারে না। মনে করুন আপনি বিরিয়ানি খেতে পছন্দ করেন, এখন আপনাকে যদি ক্রমাগত কয়েকদিন ধরে বিরিয়ানি খাওয়ানো হতেই থাকে, হতেই থাকে, তাহলে একপর্যায়ে আপনি আর বিরিয়ানি খেতে চাইবেন না। এটাই স্বাভাবিক। তেমনিভাবে একই ঘরানার পর্ন ভিডিও বার বার দেখতে থাকলে তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা খুবই স্বাভাবিক।

এমন অবস্থায় একঘেয়েমি দূর করার জন্য মানুষ কী করতে পারে? তারা বোরড হয়ে পর্ন দেখা ছেড়ে দেয়? অথবা তাদের আচরণ এবং যৌন-চাহিদার ওপর পর্নোগ্রাফির কোনো প্রভাব পড়ে না? আমরা কিন্তু ইতিমধ্যেই বুঝতে পারছি যে, কিছুটা হলেও যৌন-চাহিদার ওপর প্রভাব পড়ছে। কারণ, কয়েকদিন পর্ন দেখার পরই দর্শকের উত্তেজিত হবার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে সংবেদনশীলতা।

মানুষ সাধারণত প্রথম দিকে সফটকোর ঘরানার পর্ন দেখে। একসময় সফটকোর পর্ন তাদের কাছে একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। তখন তারা ঝুঁকে হার্ডকোর পর্নোগ্রাফির দিকে। একসময় হার্ডকোর পর্নোগ্রাফিও তাদের উত্তেজিত করার জন্য যথেষ্ট হয় না। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি তখন ঝুঁকে আরও কড়া ধাঁচের পর্নোগ্রাফির দিকে। পশুকাম, শিশুকাম, রেইপপর্ন, ট্যাবু ইত্যাদি চরম বিকৃত ধরনের পর্ন দেখা শুরু করে।[10] একইসাথে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে পর্ন-আসক্তি। মানে পর্ন দেখার সময় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। আসক্তির শুরুর দিকে কেউ সপ্তাহে এক ঘণ্টা পর্ন দেখলে, কিছুদিন পর সে হয়তো সপ্তাহে দুই ঘণ্টা পর্ন দেখবে, এভাবে ধীরে ধীরে পর্ন দেখার পরিমাণ বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে পর্দায় দেখা জিনিসগুলো বাস্তব জীবনে অনুকরণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

এখন কেউ হয়তো বলতে পারে, “যারা পর্ন দেখে তাদের সবাই কি ধর্ষণ কিংবা শিশুনির্যাতন শুরু করে? অবশ্যই না। তাই পর্নোগ্রাফি রেইপ কিংবা অন্যান্য যৌন-বিকৃতিকে প্রভাবিত করে, এমন বলা ভুল।“

এ কথাটা আসলে টোবাকো ইন্ডাস্ট্রির এ ভুল দাবির মতো যে, “যেহেতু অনেক ধূমপায়ীই ফুসফুস ক্যান্সারে মারা যায় না, তাই ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ না।” পর্ন ভিডিও দেখেই সবাই রেইপ করতে বেড়িয়ে পরে না, এ কথা সত্য। কিন্তু এ থেকে কি এই উপসংহার টানা যায়, পর্ন আসলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করে? দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দিকে তাকানো যাক।

১. সাধারণত পর্নোগ্রাফি দেখার পর মানুষ কী করে?

২. পর্নোগ্রাফি দেখা কি দর্শকের ওপর কোনো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক (psychosexual) প্রভাব ফেলে?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা সবার জানা। কেউ পর্ন দেখা শেষ করে চুপচাপ পড়াশোনা, অফিসের কাজ অথবা পরিবারের লোকজনের সাথে আলাপচারিতায় ফেরত যায় না। পর্ন দেখার পর অবশ্যই “ঠান্ডা” হতে হয়। কোনো কারণে তখনই সম্ভব না হলে, একটু নিরিবিলিতে, উপযুক্ত সুযোগ পাওয়ামাত্র ব্যক্তি “ঠান্ডা” হতে চায়। পর্ন দেখার পর অধিকাংশ মানুষ হস্তমৈথুন করে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্ন দেখা হয় হস্তমৈথুন করার জন্য। এটা একটা সার্কুলার লুপের মতো।

যদিও অধিকাংশ মানুষের কাছে সেক্সের তুলনায় হস্তমৈথুন যৌনক্রিয়া হিসাবে হয়তো “নিম্নমানের” অলটারনেটিভ, কিন্তু তবুও দিন শেষ হস্তমৈথুন একটা যৌনক্রিয়া। সুতরাং এ কথা আমরা সবাই স্বীকার করি যে, মানুষ পর্ন দেখে যৌনক্রিয়ায় (হস্তমৈথুন) লিপ্ত হয় অথবা যৌনক্রিয়ার আগে নিজেকে উত্তেজিত করার জন্য পর্ন দেখে। পর্ন দেখা, গান শোনা কিংবা নাটক দেখার মতো নিছক কোনো প্যাসিভ, নিষ্ক্রিয় বিনোদন না। বরং পর্ন দেখা এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ যার সাথে বাস্তব যৌনক্রিয়া অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। পর্ন দেখার পর আপনি রিলিয খুজবেনই। এটাই স্বাভাবিক। পর্নোগ্রাফি এবং বীর্যপাতের আনন্দ অর্জন, একসূত্রে গাঁথা। যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে বীর্যপাত বা শীর্ষসুখে পৌঁছানো হলো পর্ন দেখার স্বাভাবিক পরিণতি।[11] এটুকু পর্যন্ত স্বীকার করে নিতে সুস্থ মস্তিষ্কের কারও আপত্তি থাকার কথা না।

যদি এটুকু আপনি স্বীকার করে নেন তাহলে আসলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, আপনি কি মনে করেন সব ক্ষেত্রে এ “যৌনক্রিয়া” হস্তমৈথুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি শুধু হস্তমৈথুনেই আগ্রহী হবে? চিন্তা করতে থাকুন, সেই ফাঁকে আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তরের দিকে একটু নজর বুলিয়ে নিই।

পর্নোগ্রাফি দেখা কি দর্শকের ওপর কোনো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক (psychosexual) প্রভাব ফেলে?

হ্যাঁ। পর্নোগ্রাফি দর্শকের যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর প্রভাব ফেলে। পর্নোগ্রাফিকে উপকারী প্রমাণ করার জন্য যে তত্ত্ব প্রচার করা হয়, সেটা দিয়েই এটা প্রমাণ করা যায়। একই ধরনের পর্ন একটানা দেখার কারণে একঘেয়ে লাগা—এটা একটা যৌন-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। আগে যা দেখে দর্শক উত্তেজিত হচ্ছিল, এখন সেটাতে আর তার হচ্ছে না, এটা হলো যৌন-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলাফল। পর্নের কারণে দর্শকের যৌনচাহিদা এবং যৌনচিন্তার ধরন বদলে যাচ্ছে।

পর্নে দেখা যৌনাচারগুলো ছাড়া সাধারণ যৌন আচরণ পর্ন-আসক্ত অনেকের কাছে একেবারেই পানসে মনে হয়। অনেকের জন্য পর্ন বা বিকৃত যৌনাচার ছাড়া স্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হওয়া কঠিন হয়ে যায়, এটা আরেকটা প্রমাণ। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি বাস্তব জীবনে পর্ন ভিডিওতে দেখা কাজগুলোর অনুকরণ করতে চায়, এটা আরও একটা প্রমাণ।

পর্ন দেখে মানুষ শুধু রিলিয পাচ্ছে না, বিশেষ ধরনের যৌনাচারের জন্য তার মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হচ্ছে এবং শুধু এটুকুতেই আসলে ক্যাথারসিস থিওরি ভুল প্রমাণিত হয়ে যায়।[12]

এখানে একটা বিষয় হলো যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর পর্নোগ্রাফির এ প্রভাব সাথে সাথে কার্যকর হয় না। যারা পর্নোগ্রাফিকে উপকারী বলেন, তারা মূলত এ পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের দাবি প্রমাণ করতে চান। কিন্তু সমস্যা হলো পর্নোগ্রাফির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী, সেটা তারা এড়িয়ে যান। পর্ন দেখেই কেউ রেইপ করতে বের হয়ে যায় না, কিন্তু তার মানে এটা না যে, এর কোনো প্রভাব তার ওপর পড়েনি। যৌন-মনস্তত্ত্বের ওপর পর্নোগ্রাফির যে প্রভাব সেটা ধীরে ধীরে কার্যকর হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বার বার পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে, তার চিন্তার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।

পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি পর্ন দেখা বা পর্নের দৃশ্য নিয়ে ফ্যান্টাসাইয করা ছাড়া উত্তেজিত হতে পারে না। আবার ক্রমাগত পর্ন দেখতে থাকলে সময়ের সাথে সাথে পর্নের মাধ্যমে তার উত্তেজিত হবার ক্ষমতাও কমতে থাকে। আরও বেশি সহিংস, আরও বেশি বিকৃত পর্ন ছাড়া সে উত্তেজিত হতে পারে না। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একপর্যায়ে সেক্স সম্পর্কে তার চিন্তা, বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক যৌন আচরণ থেকে একবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সহজ ভাষায় প্রথমত পর্নোগ্রাফি মানুষকে যৌনক্রিয়াতে তীব্রভাবে উদ্বুদ্ধ করে। আর দ্বিতীয়ত পর্নোগ্রাফির যৌনক্রিয়ার ব্যাপারে মানুষের প্রেফারেন্সকে বদলে দেয়। তার যৌনচাহিদা এবং যৌনমনস্তত্ত্ব বিকৃত হয়ে যায়।

একদিকে তার মধ্যে তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে, অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে তৃপ্ত হওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নারী, বিয়ে, সেক্স, রেইপ, বিকৃত যৌনাচার ইত্যাদি নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ বদলে যায়। এমন ব্যক্তির রেইপ, শিশুকাম কিংবা অন্য কোনো বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

“সিগারেট থেকে শুরু, শেষকালে হেরোইন”, ব্যাপারটা অনেকটা এমন। এটা মাদকাসক্তির ক্লাসিক প্যাটার্ন। শুরুতে অল্পেই নেশা হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সাথে চাহিদা বাড়তে থাকে। আগে যতটুকুতে “ধরত”, তাতে আর হয় না। নেশা চড়াতে আরও বেশি মাদকের দরকার হয়। সেই সাথে তৈরি হতে থাকে মাদকের ওপর ডিপেন্ডেস, আসক্তি। এভাবে মাদকাসক্তি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। পর্ন-আসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন।

চিন্তা করে দেখুন, একজন পর্ন-আসক্ত ব্যক্তি যখন এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়, তখন তার যৌন-মনস্তত্ত্বের কী অবস্থা হয়? নিত্যনতুন নারী কিংবা শিশুদেহের হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি দেখেও যে লোক উত্তেজিত হতে পারে না, বাস্তবের রক্ত-মাংস-ঘামের নারীর সাথে স্বাভাবিক যৌনতা কি তাকে উত্তেজিত করতে পারবে? এভাবে একজন লোক যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে, যখন ধর্ষণের ভিডিও কিংবা শিশুদের ধর্ষণের ভিডিও পর্যন্ত তার কাছে একঘেয়ে লাগা শুরু করে, তখন সে কী করে? কী তাকে উত্তেজিত করবে? সে কি অতৃপ্তির জ্বালা, এ তীব্র ক্ষুধা নীরবে সয়ে যাবে? আপনি-আমি, আমরা সবাই জানি, তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা নিছক “মনের জোরে” চেপে রাখা যায় না। সাময়িকভাবে পারা গেলেও সেটা স্থায়ী হয় না। এক সময় না এক সময় বিস্ফোরণ ঘটেই।

আসলে পর্নোগ্রাফি রিলিযের কাজ তো করেই না; বরং আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে এবং আসক্ত ব্যক্তিকে বিকৃত যৌনাচারের দিকে নিয়ে যায়। ফলে সমাজে যৌন-নিপীড়ন, শিশুকাম, রেইপসহ অন্যান্য বিকৃত কামের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যার অনেক প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে আলোচনা করেছি, আরও অসংখ্য প্রমাণ চারপাশের পৃথিবীতে আপনি পাবেন। এত গেল যৌনচাহিদা এবং যৌন-মনস্তাত্ত্বিক দিকের কথা। এ ছাড়া কমন সেন্সের মাপকাঠিতেও ক্যাথারসিস থিওরি বা পর্নোগ্রাফি “উপকারী” হবার অন্য কোনো থিওরি, একেবারেই টেকে না। যদি কেউ বার বার ইয়াবা কিংবা হেরোইন খাবার ভিডিও দেখে, যদি এসব ভিডিওতে এ কাজগুলোকে গ্ল্যামারাইযড করে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে কি সমাজে ইয়াবা কিংবা হেরোইন ব্যবহার কমে যাবে? আচ্ছা ধরুন আপনাকে বলা হলো, বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক কর্তৃক শিশুদের শারীরিক আঘাত করার হার কমাতে। আপনি কি এটার সলিউশান হিসাবে এসব শিক্ষকদের বলবেন, ছোট বাচ্চাদের পেটানোর এবং টর্চার করার নতুন নতুন ভিডিও নিয়ম করে দেখতে?

নানা আঙ্গিকে, নানা লোকেশানে চাকচিক্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে ছোট বাচ্চাদের মারা এবং মার খেতে দেখার ভিডিও কি তাদের পেটানোর ইচ্ছা ও মানসিকতাকে নষ্ট করে দেবে? সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ কি আদৌ এ ধরনের “সমাধান” সিরিয়াসলি নেবে? পর্ন দেখার সাথে যদি রেইপের হার কমে, তাহলে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পর্ন প্রডিউস করা এবং পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় গ্রাহক অ্যামেরিকাতে কেন এত রেইপ হয়? কেন অ্যামেরিকান মিলিটারি, কলেজ, হলিউড সব জায়গাতে এত ধর্ষণ, এত যৌন-নিপীড়ন হয়? কেন রেইপ পর্ন ইন্ডিয়াতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার পরও ভারতে রেইপ না কমে বরং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়? স্রেফ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এ ধরনের গোঁজামিল দেয়া কথা ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফির মতো এতটা ক্ষতিকর বিষয়কে “নির্দোষ বিনোদন” প্রমাণ করার প্রপাগ্যান্ডা চালানো হয়। হস্তমৈথুনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ডাক্তার, এক্সপার্ট এবং ইন্টারনেট ওয়েবসাইট আপনাকে বলবে, হস্তমৈথুন একেবারেই ক্ষতিকর না।

এদিক-সেদিক থেকে নানা জোড়াতালি দেয়া প্রমাণ তুলে এনে প্রমাণ করতে চাইবে হস্তমৈথুন “প্রায় নিশ্চিতভাবেই” শরীরের জন্য ভালো। এটা একেবারেই “ন্যাচারাল” একটি বিষয়, এ নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। হস্তমৈথুন শরীরের জন্য ভালো বা স্বাভাবিক যৌন আচরণ এ ধরনের কোনো কংক্রিট প্রমাণ নেই। হস্তমৈথুন “স্বাভাবিক”, “ন্যাচারাল” এসব কথার প্রচলন আজ থেকে মাত্র সাত-আট দশক আগে। এর আগ পর্যন্ত হস্তমৈথুনকে, বিশেষ করে নিয়মিত ও ক্রনিক হস্তমৈথুনকে একটি অস্বাভাবিক যৌনাচার হিসাবেই দেখা হতো। এমনকি নানা যৌনবিকৃতিকে হোয়াইটওয়াশ করা, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো বিকৃত মানসিকতার লোকও হস্তমৈথুনক অস্বাভাবিক মনে করত।

মূলত হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক এবং উপকারী হিসেবে দেখার প্রবণতা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে আলফ্রেড কিনসির Sexual Behavior In The Human Male প্রকাশিত হবার পর। এ বইটি এবং ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই Sexual Behavior in the Human female, ম্যাস মিডিয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাশ্চাত্যে ঝড় তোলে। যৌনতা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে আনে আমূল পরিবর্তন। পাশ্চাত্যের ইতিহাসের অন্য কোনো বই বা রিপোর্ট পাশ্চাত্যকে এতটা বদলে দেয়নি যেমন এই দুটি বই দিয়েছিল। আধুনিক সেক্স এডুকেশান, সাইকোলজি এবং সেক্স সম্পর্কে চিকিৎসকদের সার্বিক চিন্তা কিনসির এই দুটি বইয়ের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে। যৌনতা সম্পর্কে আধুনিক পশ্চিমা ধারণা একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে আলফ্রেড কিনসির এই দুই বিখ্যাত “থিসিসের” ওপর ভিত্তি করে। তার এ বইয়ে কিনসি চরম পর্যায়ের বিকৃত কিছু চিন্তাকে বিজ্ঞানের নামে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। সে দাবি করে শিশুরা জন্মগত ভাবেই, এমনকি গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই সেক্সুয়ালি এক্টিভ। তার মতে শিশুরা একেবারে ছোটকাল থেকেই হস্তমৈথুন করা শুরু করে।

কত ছোটকাল থেকে?

কিনসির দাবি হল দুই, চার, সাত মাস বয়সী শিশুরাও নাকি হস্তমৈথুনের মাধ্যমে চরমানন্দে (Orgasm) পৌঁছাতে সক্ষম! সাত মাস বয়সী একটি শিশু এবং এক বছরের নিচের আরও পাঁচজন শিশুকে সে নিজে নাকি শীর্ষসুখ অর্জন করতে দেখেছে।[13] সে আরও বলে, এত কমবয়স্ক শিশুরা বয়স্ক সঙ্গী/সঙ্গিনীদের সঙ্গে আনন্দদায়ক এবং উপকারী যৌনমিলন করতেই পারে, এবং এমন করা উচিত।[14] অভিভাবকদের উচিত ৬-৭ বছর বয়স থেকে শুরু করে শিশুদের হস্তমৈথুন করানো এবং একসাথে মিলেমিশে হস্তমৈথুন করা!

কিনসি আরও দাবি করে, অধিকাংশ মানুষ আসলে উভকামী, যৌনতার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। কোনো যৌনতাই অস্বাভাবিক না। সমকাম, উভকাম, শিশুকাম, পশুকাম, অজাচার, যার যা ইচ্ছে সেটা করবে, এতে কোনো সমস্যা নেই।[15]

আসলে কিনসি নিজে ছিল একজন চরম মাত্রার বিকৃত মানসিকতার লোক। ব্যক্তিজীবনে ভয়ঙ্কর বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত। তার “রিসার্চ” ছিল জালিয়াতিতে ভরা। পরবর্তীকালে এই “মহান” বিজ্ঞানীর কাজগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে বিজ্ঞানীদের হাতেই। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আলফ্রেড কিনসির দাবিগুলোর তেমন কোনো সায়েন্টিফিক ভিত্তি নেই, তার তথ্য-উপাত্তগুলো যথেষ্ট পরিমাণে গোঁজামিলে ভরপুর।[16] এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য অনেক সময় সাবজেক্টের ওপর চরম যৌন-নির্যাতন চালানো হয়েছে, রেহাই দেয়া হয়নি শিশুদেরও। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। “হস্তমৈথুন ক্ষতিকর না; বরং উপকারী” কিনসির জোর গলায় দাবি করা এ চরম মিথ্যা সেক্স এডুকেশানের বইগুলোতে বার বার খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটাকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু হস্তমৈথুন যদি স্বাভাবিক ও ভালো হয়, তাহলে প্রথমবার হস্তমৈথুনের পর কেন মনের ওপর অনুশোচনার একটা গাঢ় পর্দা নেমে আসে?

প্রথমবার হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত করার প্রায় সবার চরম অনুশোচনা হয়। ভাষা, ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম-বর্ণভেদে এমন অবস্থায় মানুষের মনে হয় সে খুব খারাপ কিছু একটা করে ফেলেছে। অনুভূতিটা সর্বজনীন। এর ব্যাখ্যা কী? হস্তমৈথুন ভালো প্রমাণ করতে চাওয়া “বিশেষজ্ঞরা” বলবে, ধর্ম এবং সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের চিন্তা করতে শেখায় যে, এ কাজটা খারাপ। এটা একটা পাপ। আর এ জন্যই মানুষের মধ্যে অনুশোচনা কাজ করে।

এ ব্যাখ্যার ভুল কোথায়?

কোনো কাজের ব্যাপারে ধর্মের বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হবার জন্য আপনাকে তো আগে কাজটাকে চিনতে হবে, সেটার সম্পর্কে ধর্মের বক্তব্য জানতে হবে। কিন্তু আপনি দেখবেন হস্তমৈথুনের মাধ্যমে প্রথম বীর্যপাতের অভিজ্ঞতার সময় অনেকেরই ধারণাই থাকে না আসলে কী হচ্ছে। যে ছেলেটা বুঝতেই পারছে না কী হলো, সে কীভাবে ওই কাজের ব্যাপারে ধর্মের বক্তব্য জানবে, আর সেটা দিয়ে প্রভাবিত হবে? আসলে এটাই হলো ফিতরাহ, মানুষের সহজাত প্রবণতা (Natural Disposition)। মানুষের সহজাত নৈতিক কম্পাস তাকে জানিয়ে দেয় কাজটা খারাপ। আর তাই প্রথম প্রথম সবাই অনুশোচনায় ভোগে। কিন্তু পরে মানুষ এর যৌক্তিকতা দাঁড় করায়, একে স্বাভাবিক মনে করা শুরু করে।

এ ছাড়া বাস্তব অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে হস্তমৈথুন আসক্তি শুধু সমস্যাই না; বরং ভয়ঙ্কর রকমের মনোদৈহিক সমস্যা। ভুক্তভোগীদের কিছু অভিজ্ঞতা এরই মধ্যে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। হস্তমৈথুনে আসক্তদের এমন করুণ উপাখ্যান এক-দুটো না। অজস্র।

হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক প্রমাণে উঠেপড়ে লাগার পেছনে আরেকটা বড় কারণ হলো, সেই পুরনো কালপ্রিট—অর্থনীতি। হস্তমৈথুন আসক্তি আর পর্নোগ্রাফি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এ দুয়ে মিলে এক চক্র তৈরি করে। আর এ চক্রে আটকা পড়ে শত সহস্র প্রাণ। যদি হস্তমৈথুনকে ক্ষতিকর বলে স্বীকার করে নেয়া হয়, হস্তমৈথুন না করতে মানুষকে উৎসাহ দেয়া হয়, হস্তমৈথুন আসক্তি বন্ধে কাউন্সেলিং করা হয়, তাহলে শত বিলিয়ন ডলারের পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির কী হবে? এ অতিকায় ইন্ডাস্ট্রি কি নিজ অস্তিত্বের প্রতি এমন হুমকিকে মেনে নেবে? নাকি নিজের অঢেল সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে অ্যাকাডেমিয়া, মিডিয়া এবং “বিশেষজ্ঞদের” মাধ্যমে হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রমাণে?

পরের বার “কেন হস্তমৈথুন ভালো”, “হস্তমৈথুনের ১৮ অজানা উপকারিতা” জাতীয় ইন্টারনেট আর্টিকেলগুলো পড়ার সময় এ বিষয়টা মাথায় রাখবেন।

সর্বোপরি মুসলিম হিসাবে আমাদের ফ্রেইম অফ রেফারেন্স কোনটা আগে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। এতক্ষণ যা কিছু আমরা আলোচনা করেছি, এ সবকিছু হলো সেকেন্ডারি, গৌণ প্রমাণ। মুসলিম হিসাবে আমাদের জন্য প্রাইমারি প্রমাণ হলো ইসলামী শারীয়াহর বক্তব্য। আর ইসলামের বক্তব্য হলো হস্তমৈথুন হারাম।[17] একজন মুসলিমের জন্য প্রমাণ হিসাবে এটাই যথেষ্ট হওয়া উচিত। যেখানে ইসলামের স্পষ্ট বিধান আছে সেখানে বিজ্ঞানের “প্রায় নিশ্চিত” মত গোনায় ধরার মতো কিছু না। বিশেষ করে বিষয়টি যখন নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত। যেমন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিয়ে-বহির্ভূত সেক্স ক্ষতিকর কিছু না। বরং আধুনিক পশ্চিমা দর্শনে এটা স্বাভাবিক, এমনকি প্রশংসনীয়। অন্যদিকে যিনা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। বিজ্ঞান যদি কাল থেকে যিনাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে প্রচার করা শুরু করে, তাহলে এতে একজন মুসলিমের কিছুই যায় আসে না। যিনার ব্যাপারে তার ধারণা এতে বদলে যাবে না।

সুতরাং হস্তমৈথুন যদি কখনো বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুনিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যকর বলে প্রমাণিতও হয় (যেটা এখনো হয়নি) তবুও এতে একজন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসার কথা না, কারণ ইসলামের মাপকাঠিতে কাজটা অনৈতিক এবং হারাম। আর বাস্তবতা হলো মনোদৈহিকভাবে হস্তমৈথুন এবং পর্ন-আসক্তি দুটোই অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি কীভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবার ও সমাজ কেউই মুক্তি পায়নি।

পর্ন-আসক্তি আর হস্তমৈথুনের চক্র ব্যক্তির জীবনকে হতাশা, গ্লানি আর পুনরাবৃত্তির চোরাবালিতে আটকে ফেলে। এ বৃত্তে আটকা পরে তিলে তিলে ক্ষয়ে যেতে থাকে শত সহস্র মানবাত্মা। এ চক্র ভাঙার, এ বৃত্তের বাইরে যাবার উপায় কী? আদৌ কি সম্ভব?

পড়ুন- http://lostmodesty.com/tag/ঝেটিয়ে-বিদায়-করুন-বেয়াড়া/

 

রেফারেন্সঃ

[1] Voyeurism – ঈক্ষণকামিতা। অপরের যৌনক্রিয়া দেখে যৌন তৃপ্তি পাওয়া।

[2] Pornography addiction: A neuroscience perspective,Donald L. Hilton, Jr and Clark Watts – https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3050060/]

[3] How Big is the Porn Industry? – http://bit.ly/2AVUgxT

[4] How large is the adult entertainment industry? – http://to.pbs.org/2FxiEt7

[5] Bart & Jozsa, 1980, p. 210

[6] Kelly, Wingfield, & Regan, 1995, p. 23

[7] Catharine A. MacKinnon, “X-Underrated: Living in a World the Pornographers Have Made,” in Big Porn Inc., edited by Melinda Tankard Reist and Abigail Bray, 9–15. North Melbourne, Australia: Spinifex Press, 2011

[8] Sommers & Check, 1987

[9] Diamond, 1980; Howard, Reifler, & Liptzin, 1991

[10] Zillmann & Bryant, 1986, p. 577

[11] Cline, 1974; Osanka & Johann, 1989.

[12] Sommers & Check, 1987

[13] Sex education as bullying, page 7

[14] Kinsey, Sex and Fraud, page 3

[15] Ibid, page 2

[16] Ibid, page 1

[17] Ruling on masturbation and how to cure the problem – https://islamqa.info/en/329

শেয়ার করুনঃ