একগুচ্ছ অনুবাদ (প্রথম কিস্তি)

একগুচ্ছ অনুবাদ (প্রথম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

 

আমাদের সমাজের অনেক গভীরে পর্ন মুভি শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে । ছেলে, বুড়ো , মধ্য বয়স্ক বিবাহিত, অবিবাহিত এমনকি অনেক মেয়েরাও আজকাল পর্নমুভিতে আসক্ত। কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় এই ভয়ংকর গুনাহ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার প্রয়াস খুব একটা দেখা যায়না আমাদের দেশে । অনেক মানুষের সঠিক ধারনাও নেই পর্নমুভির অপকারিতা সম্পর্কে। আমাদের ব্লগের যাত্রা শুরু হয়েছিল মানুষজনকে পর্ন মুভির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং চোখের হেফাজত করার মাধ্যমে আল্লাহ’র (সুবঃ) আনুগত্য করতে মানুষজনকে সহায়তা করার উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে । আমাদের কাজটা একটু সহজ হত যদি বাংলা ভাষায় পর্ন মুভির ব্যাপার গুলো নিয়ে কোন ম্যাটেরিয়ালস থাকতো । কিন্তু বাংলা ভাষায় পর্নমুভির টপিক নিয়ে খুব কম কাজ হয়েছে । কাজেই ব্লগের আর্টিকেল লিখতে যেয়ে আমাদের বেশীরভাগ সময় সাহায্য নিতে হয় ইংরেজীতে লিখা বিভিন্ন বই কিংবা ওয়েবসাইটের । যেহেতু বাংলা ভাষায় এ ব্যাপার নিয়ে গবেষণা হয়নি আর তেমন কোন রিসোর্সও নেই এবং আমরা টুকটাক কাজ করছি এগুলো নিয়ে , কাজেই আমাদের মনে হয়েছে আমরা যতদূর পারি ইংরেজী ভাষার রিসোর্স গুলো বাংলায় অনুবাদ করে রাখি । কোন একসময় গবেষনা বা অন্য কোন কাজে কেউ এখান থেকে উপকৃত হতে পারেন ।

 

# একবার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসন পর্ন মুভির ব্যাপারে বেশ উদার নীতি গ্রহণ করল । পর্ন মুভি বানানো ,প্রচার , প্রসার পূর্বে আইনত নিষিদ্ধ থাকলেও তারা সেসময় চোখ বুজে রাখতো । দেখেও না দেখার ভান করতো । ফলাফল – ধর্ষণের ঘটনা ২৮৪% বেড়ে গেল একই সময় অস্ট্রেলিয়ায় কুইন্সল্যান্ডে পর্নমুভির বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে খুব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হল । কিছুদিন পর প্রশাসন দেখল ধর্ষণ ঘটনা পূর্বের তুলনায় মাত্র ২৩% বৃদ্ধি পেয়েছে । হাওয়াইতে একবার পর্নমুভির ব্যাপারে উদারনীতি গ্রহণ করা হল , কিছুদিন যাবার পর পর্নমুভির বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে খুব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হল তারপর আবার উদারনীতি । ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যখন পর্ন মুভির ব্যাপারে উদারনীতি নেওয়া হয়েছিল তখন ধর্ষণের মাত্রা অনেক বেশী ছিল , যখন প্রশাসন কঠোরতা অবলম্বন করেছিল তখন ধর্ষণের মাত্রা কমে গিয়েছিল । তারপর আবার উদারনীতি গ্রহণ করার ফলে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল । (১) বাংলাদেশেও ইদানীং ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জরিপ অনুসারে চলতি বছরের (২০১৫) জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৪৯২ টি । ২০১৪ সালের পুরো বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল মোট ৯৩৯ টি । (প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশী। এগুলো কেবল মাত্র রিপোর্ট কৃত কেসের ঘটনা ) বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের ধর্ষণের উচ্চ মাত্রার জন্য দায়ী হতে পারে এ দেশে পর্নমুভি , আইটেম সং নামক সফটকোর পর্ন মুভির ব্যাপক প্রসার । ঢাকা ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর আয়েশা মাহমুদাও মনে করেন পর্নমুভি এবং ড্রাগসের সহজ লভ্যতা বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে ।

 

(২) Porn_fuels_rape:

 

আমি দীর্ঘ দিন যাবত হাজতবাস করছি। আমি এমন অনেক লোকের সংগে মিশেছি যারা এক একজন ছিল ভয়ংকর অপরাধী। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় প্রত্যেকেই ছিল মারাত্মকভাবে পর্নমুভিতে আসক্ত। F.B.I নিজেরা একবার গবেষণা করে দেখেছিল সিরিয়াল কিলারদের সবার একটা বিষয় কমন- সেটা হল পর্ন আসক্তি । এবং আমি মনে করি এটা সত্য”। – Ted Bundy, Serial Killer & Rapist of at least 28 Women & Girls

 

# “…পর্নোগ্রাফি হল থিওরি আর ধর্ষণ হল তার প্র্যাক্টিকাল”। Robin Morgan

 

(৩)Porn fuels violence: Cameron Hooker নামক এক লোকের ফ্যান্টাসী ছিল নারীদের বেঁধে বস্ত্রহীণ করে তার উপর নির্যাতন চালানো । তার এরকম ফ্যান্টাসীর উৎস ছিল এক বিশাল হার্ডকোর পর্নমুভির কালেকশান । একবার সে এক নারীর হাত পা এবং চোখ বেঁধে নির্যাতন করছিল । এক পর্যায়ে সেই নারী তার চোখে বাঁধা কাপড়ের ফাক দিয়ে আবিষ্কার করে বসে যে দেয়ালে একটা নগ্ন মহিলার ছবি ঝোলানো আছে । ছবির সেই মহিলাটা যেভাবে যে পজিশানে ছিল, Cameron ও তাকে ঠিক সেভাবে সেই পজিশানে বেঁধে রেখেছে । অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল সেই ছবি দেখে Cameron এর ভেতরে যে বিকৃত ফ্যান্টাসীর সৃষ্টি হয়েছিল সে সেটাই বাস্তবায়ন করছে এই নারীকে নির্যাতন করার মাধ্যমে ।

 

(৪)  যারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত তাদের পতিতালয়ে যাবার সম্ভাবনা সেই সব লোকদের থেকে বেশী থাকে যাদের পর্নমুভিতে আসক্তি নেই । আবার যেসব লোক নিয়মিতি পতিতালয়ে যায় তারা সেই সব লোকদের থেকে বেশীমাত্রায় পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত যারা হঠাৎ হঠাৎ পতিতালয়ে যায় ।

 

(৫) আপনি হয়তো ভাবতেই পারছেন না আপনার পর্ন আসক্তি একদিন আপনাকে পতিতালয়ে নিয়ে যাবে । কিন্তু এটাই বাস্তবতা । এমন হাজার হাজার পর্ন আসক্ত পাওয়া যাবে যাদের পর্ন আসক্তির শেষ পরিনতি ছিল পতিতালয়ে গমন । পর্নমুভি দেখা এমন একটা ভয়ংকর অভ্যাস যা খুলে দিবে আরো অনেক বড় বড় পাপের পথ ।

 

# “……… আমি আমার চিকিৎসা পেশার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি পর্নমুভি এর দর্শকদের যৌনক্ষমতা নষ্ট করে দেয় । পর্নমুভির ভোক্তাদের খুব বেশী যে সমস্যা হয় সেটা হল অকাল বীর্যপাত কিংবা সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা । স্ক্রীনের ওপারের অবাস্তব যৌন ফ্যান্টাসীতে খুব বেশী সময় ধরে ডুবে থাকার কারণে বাস্তব জীবনে তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে বেডরুমে তারা প্রচন্ড অস্বস্তিতে ভোগে । পর্নমুভি তাদের ভেতরের প্রবৃত্তিটাকে সবসময় উত্তেজিত করে রাখে আরো বেশী বেশী যৌনতার জন্য কিন্তু একই সাথে এটা তাদের যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় , দেখা দেয় অতৃপ্তি ”।– Dr. MaryAnne Layden

 

(৬) ভারত ক্রমাগতভাবে নারীদের জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হচ্ছে । ধর্ষণ সেখানকার নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা । ২০১২ সালে দিল্লীতে চলন্ত বাসে গ্যাং রেপের পাশবিকতা পুরো বিশ্বমিডিয়াতে ঝড় তুলেছিল । পুরো পৃথিবীর মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল – মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারে! ভারতে ধর্ষণের বেশীরভাগ ঘটনাই চাপা পড়ে যায় , লোকলজ্জার ভয়ে খুব কম ধর্ষিতাই থানায় অভিযোগ করে , কিংবা মিডিয়ার কাছে যায় । তবে মাঝে মাঝে যেসব ধর্ষণের খবর মিডিয়াতে আসে সেগুলো এই একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত উন্নত, মহান সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে । ভারতের মতো গনতান্ত্রিক দেশের আধুনিক,মুক্তমনা, সভ্য সেকুল্যার সমাজের অন্তঃসারশুন্যতা প্রকাশ করে দেয় এই ধর্ষণের ঘটনাগুলো । বলিউডের অভিনেতা বিশেষ করে অভিনেত্রীরা ধর্ষণের বিরুদ্ধে বেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান । তীব্র সমালোচনা করেন সেই সব পুরুষদের যারা নারীদের সম্মান করে না । অথচ এইসব অভিনেত্রীদের আয়ের একটা বড় অংশ আসে আইটেম সং এ অর্ধ নগ্ন হয়ে, কামার্ত পুরুষদের সামনে উত্তেজকভাবে নেচে নেচে । টাকার জন্য কাপড় খুলে বেডরুমের দৃশ্যে অভিনয় করতে এরা দ্বিধাবোধ করে না । এরা পুরুষদের বলে নারীদের সম্মান করতে অথচ এরাই আইটেম সঙ্গে পুরুষদের বলে আমি চিকেন তান্দুরী , তুই আমাকে মদ দিয়ে গিলে খা । সিনেমা একটি শক্তিশালী মাধ্যম ।মানুষ সিনেমায় তার প্রিয় নায়ক / নায়িকাকে যা করতে দেখে সেটা সে অনুকরন করতে চাই । কাজেই কারিনা কাপুর যখন আইটেম সং এ উত্তেজকভাবে নেচে নেচে , পুরুষদের কামার্ত করে এই মেসেজটা দেয় যে আমি চিকেন তান্দুরী, তুই আমাকে মদ দিয়ে গিলে খা তখন সেটার প্রতিক্রিয়া যে সমাজে ধর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিবে এটা স্বাভাবিক ।

 

বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ওমপুরিও মনে করেন , ভারতীয় চলচিত্রের আইটেম গানে অশ্লীলতার মাত্রা এত বেড়ে গেছে যে এটা ধর্ষণকে উৎসাহিত করে । পদ্মশী পুরষ্কার জেতা এই গুনী অভিনেতা বলেন , “ এখনকার হিন্দী মুভির আইটেম গানগুলো খুবই অশ্লীল । এই গানগুলোতে এমন সব ড্যান্স মুভমেন্ট আছে যা দেখে মনে হয় তারা বোধহয় সেক্সের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছে । ক্ষমা করবেন এরকম শব্দ ব্যবহার করার জন্য । কিন্তু অবস্থাটা এতটাই ভয়াবহ ।
কেউ যদি তার অবদমিত যৌন আকাংখা পূরন করতে চাই তাহলে এসব গানের সিডি কিনে তা চালিয়ে দেখলেই পারে । পুরোনো দিন গুলোতে এরকমটা ছিল না । ষাট , সত্তর এমনকি আশির দশকের মুভি গুলোতে বার, নাইটক্লাবে চিত্রায়িত যে গানগুলো দেখানো হতো সেগুলো এতটা অশ্লীল ছিল না । পুরোনো দিনগুলোতে এত ধর্ষণের ঘটনাও ছিল না । আমি নিশ্চিত , আইটেম গান গুলো ধর্ষণের ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে ।

 

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত)
চলবে ইনশা আল্লাহ ……

 

রেফারেন্সঃ
১) Court, J. (1984). Sex and violence a ripple effect. In Malamuth, N & Donnerstein, E (Eds), Pornography and sexual aggression. San Diego, Academic Press.

২) http://www.dhakatribune.com/crime/2015/jul/25/intelligence-100-rapes-six-months-most-unreported

৩) Theory and Practice: Pornography and Rape,” 1974 in “Going Too Far: The Personal Chronicle of a Feminist” (1977)

৪) The Perfect Victim (McGuire & Norton 1988). .” [p. 23 and p. 741] [p.741]

৫) Monto, M. (1999). Focusing on the clients of street prostitutes: a creative approach to reducing violence against women. Final report for the National Institute of Justice. Available at www.ncjrs.org.

৬)Reisman, Sanitover, Layden, and Weaver, “Hearing.”

 

শেয়ার করুনঃ
একগুচ্ছ অনুবাদ  (দ্বিতীয়  কিস্তি)

একগুচ্ছ অনুবাদ (দ্বিতীয় কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

# কর্মক্ষেত্রেও পর্নোগ্রাফি!!

পর্নোগ্রাফির বিষবাষ্প আর এর বিষাক্ত প্রভাব রেহাই দেয়নি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশকেও। পাশ্চাত্য সভ্যতার তৈরি পর্ন ইন্ডাস্ট্রি এবং এর ন্যাক্কারজনক প্রোডাক্ট পর্নোগ্রাফি তিলে তিলে ধ্বংস করে চলেছে সারা পৃথিবীর মানুষের নীতিবোধ ও পবিত্রতা। তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব বুমেরাং হয়ে সবথেকে বেশি আক্রান্ত করেছে স্বয়ং পাশ্চাত্য সমাজকেই। পর্নোগ্রাফির দূষিত প্রভাবে কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রের নারীদেরকে সম্মুখীন হতে হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার।

ভাবুন তো, অফিসে বসে একজন কর্মী কম্পিউটারে কাজের ফাঁকে ফাঁকে চুপিচুপি আরেকটা ট্যাব খুলে তাতে পর্ন দেখছেন। এতে কাজের ক্ষতি হচ্ছে কি না সেটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। তবে এতে তার কল্পনা ও চিন্তনপ্রক্রিয়া ভরে যাচ্ছে কলুষতায়। এমন অবস্থায় তিনি তার পাশের বিপরীত লিংগের সহকর্মীর দিকে তাকালেন; হয়ত কোন জরুরি কাজের বিষয়েই তার সাথে কথা বলতে হবে। কিন্তু তিনি আর পারছেন না মনোযোগ স্থির রেখে মানুষটাকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে। না চাইলেও তার দৃষ্টি এমনভাবে চলে যাচ্ছে, যেভাবে একজন সহকর্মীর দিকে তার তাকানো উচিত নয় বা চিন্তা করা উচিত নয়; লুকানো ট্যাবে সদ্য দেখা চরিত্রের সাথে বারবার মিলিয়ে ফেলছেন তাকে। আচ্ছা এবার ভাবুন, দুর্ভাগা সেই সহকর্মীটি আপনি নিজেই! যেই কুপ্রবৃত্তির প্রভাবে পড়ে কেউ পর্ন দেখছেন, সেই একই প্রবৃত্তিই তাকে ধাবিত করছে কলুষ চিন্তাভাবনার দিকে, ফলে ঘটে চলেছে কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য, হয়রানি ইত্যাদি।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্না গ্রুপ’-এর চালানো একটি জরিপে দেখা যায়, বিগত তিন মাসের মধ্যে পুরুষদের ৬৩%ই কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় পর্ন দেখেছেন; নারীদের মধ্যে এর সংখ্যাটি ৩৬% (1) ।

২০০৩ সালে বিজনেস অ্যান্ড লিগ্যাল রিপোর্ট একটি জরিপ করেছিল ৪৭৪ জন হিউম্যান রিসোর্স প্রফেশনালদের উপর, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ কর্মীই বলেছেন তারা তাদের অফিস কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে পর্ন পেয়েছেন (2) । পাওয়াটা অস্বাভাবিক ও নয়। কারণ, ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার ৩৫০টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চালান জরিপে জানা যায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মীই স্বীকার করেছেন অফিস কম্পিউটারে পর্নোগ্রাফিক উপাদান ডাউনলোড করার কথা (3) । ঐ একই বছরেই ম্যাসেজ ল্যাবস-এর রিপোর্টে দেখা গেল, সারাদিনের ভেতর পর্নসাইটগুলোতে সবচেয়ে বেশি হিট পড়ে সকাল ৯টা থেকে ৫টার মধ্যে- যখন কি না অধিকাংশ মানুষই থাকে কর্মস্থলে। তার মানে তারা সারাদিনের ভেতর পর্ন দেখার জন্য অফিসের সময়টাকে নির্বিঘ্ন বলে বেছে নেন, এতটাই নেশা!

কলুষতার সাথে বসবাসকরলে এর প্রভাব আচরণ, কাজে-কর্মে পড়বেই ।  এরই এক উদাহরণ কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি ।  ‘Survey Monkey’ নামকএকটি সংস্থা ২২৩৫ জন পূর্ণ ও খন্ডকালীন নারীকর্মীর উপর জরিপ চালিয়ে ফলাফল পায়, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী মহিলাকর্মীদের প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জনই কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সহকর্মীর দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন।এদের মধ্যে শতকরা ৮১ জন জানিয়েছেন তারা মৌখিক হয়রানির (অশালীনইংগিত/মন্তব্য) শিকার।অন্য দিকে শতকরা ২৫ জন বলেছেন, তারা চুড়ান্ত অশালীন ক্ষুদে বার্তা বা ইমেইলপান এবং শতকরা ৪৪ জন অভিযোগ করেছেন যে তারা অনাকাংক্ষিত স্পর্শের সম্মুখীন হয়েছেন।

জরিপে আরো দেখা যায়যে, হয়রানির শিকার মহিলাদের শতকরা ৭১ জনই এব্যাপারে কোন রিপোর্ট করেননা।চাকরিহারানোর ভয়, তার কথা কেউ পাত্তা দেবেনা, মূল অপরাধীর বদলে বরং তাকেই সবাই দোষ দেবে ইত্যাদি চিন্তা করে তারা সাহস করে মুখ না খুলে বিষয়গুলো চেপে যান।এবংদুঃখজনক হলেও সত্যি, অনেক সময় এধরনের অভিযোগ তোলা হলে হয়রানিকারীর দোষ না দেখে ভুক্তভোগীকেই দোষী বলা হয়।আবার কিছুক্ষেত্রে দেখা যায় মানুষ এই আচরনকে মজা বা কৌতুক হিসেবে নেয়।ফলে ভুক্তভোগী মনে করে এব্যাপারে কিছু বললে বা অভিযোগ করলে অন্যরা তাকে অসামাজিক বা রসবোধহীন মনে করবে।এমনকি যেসব পেশাকে খুব সম্মানজনক বলে ধরে নেওয়া হয় সেখানেও এই অন্ধকার দিকগুলো বিদ্যমান।উদাহরণ স্বরুপ সেনাবাহিনীর সদস্যদের কথা বলা যায়, যেখানে কেউই নিরাপদ নন।

পড়তে পারেন-

এরই নাম স্বাধীনতা !!!: https://bit.ly/2xcsUnn
এরই নাম স্বাধীনতা!!! দ্বিতীয় পর্ব – https://bit.ly/2xce9kq
এরই নাম স্বাধীনতা!!! তৃতীয় পর্ব-https://bit.ly/2MxnRn
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-১: https://bit.ly/2OhCeO0

শুধুমাত্র নারীরাই না, পুরুষরাও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন। আইনজীবি স্লেটার আর. গর্ডন কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্মস্থলে নারী ও পুরুষ উভয়ই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং তা বেড়েই চলেছে। প্রায় ৪০% পুরুষ এ ব্যাপারে রিপোর্ট করেন ।কিন্তু আরও বাকি ৬০% পুরুষ এই ধরনের ঘটনা নিজেদের মাঝেই চেপে রাখেন এবং এটাই এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে  (4&5) ।

#  ……প্রতি বছর হাজার হাজার টিনেজারদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি আপনি যদি এই “বড়দিনে”  বড়দিনের উপহার হিসেবে আপনার বাচ্চার জন্য বাজার থেকে স্মার্টফোন বা আইপড কিনে আনেন , তাহলে  আপনি আপনার বাচ্চার জন্য আসলে একটা পোর্টেবল এক্স রেটেড মুভি থিয়েটার কিনে নিয়ে আসলেন ।

আপনার বাচ্চার নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য (এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবন সঙ্গী / সঙ্গিনীর জন্যও) দয়া করে অবশ্যই অবশ্যই বাচ্চার হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে তাকে ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত সম্পর্কে সচেতন করুন ।   বিপদ ঘটার পূর্বেই  প্রয়োজনীয়  এক্সরেটেড ওয়েবসাইট ব্লকিং  সফটওয়্যার বা অ্যাপস  ইন্সটল করুন । দেরী করবেন না । এবং ভাববেন না আমার বাচ্চার ওপর আমার বিশ্বাস আছে , ও কখনো এমন করবে না । সমস্যাটা হয় আপনার সন্তানের ওপর আপনার বিশ্বাসের কারণে না বরং ইন্টারনেটের ওপর আপনার অগাধ বিশ্বাসের কারণে ।  আবারো বলছি গড়িমসি করবেন না । তা হলে  হয়তো কিছু দিন পর  আপনি আবিষ্কার করে বসবেন  আপনার সন্তান পর্ন মুভিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে”। (Matt Fradd , anti porn activist)

শিশু কিশোরদের পর্ন আসক্তির ব্যাপকতা, ক্ষতিকর দিক এবং এ  শিশু কিশোরদের পর্ন আসক্তি দূর করার উপায় নিয়ে লিখা এই আর্টিকেল গুলো পড়তে পারেন –

মৃত্যু? দুই সেকেন্ড দূরে! (প্রথম পর্ব): https://bit.ly/2OcDLF9
আমাদের সন্তান পর্ন দেখে!!! (প্রথম কিস্তি): https://bit.ly/2CMF4sV
আমাদের সন্তান পর্ন দেখে!!! (দ্বিতীয় কিস্তি): https://bit.ly/2N6WIMF
আমাদের সন্তান পর্ন দেখে!!! (শেষ কিস্তি): https://bit.ly/2NzPdxm
পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা: https://bit.ly/2p1Irme

 

আসল কথা হল পর্ন ইন্ড্রাস্টীর মুনাফার অংকটা বেশ বড় ।  আর এ কারনেই  বিশ্বজুড়ে  পর্নমুভির ভয়াবহ বিস্তার । এবং ব্যক্তিজীবনে, সমাজ জীবনে  পর্ন মুভির  ভয়াবহতা দেখেও পর্নমুভির বিস্তার ঠেকানোর সেরকম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ কেউ নেয় না ।   আমাদের দেশে (ইন্দোনেশিয়া)  কয়েক বছর আগে সরকার একটা উদ্যোগ নিয়েছিল আইন করে পর্ন  মুভির ভয়াবহ প্রসার বন্ধ করার  । কিন্তু তথাকথিত “প্রগতিশীলরা” এটা হজম করতে পারলো না কারণ ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন ধর্মীয় কমিউনিটি বিশেষ করে মুসলিম কমিউনিটি সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছিল এবং সাপোর্ট করেছিল এই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য । সেই তথাকথিত ‘প্রগতিশীল এবং মুক্তমনাদের’ প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত আমাদের সরকার সেই আইনটি আর পাশ করাতে পারেনি ।  এই পর্নমুভির কারণে  বর্তমান ইন্দোনেশিয়ান তরুণ- তরুনীদের  মানসিকতা কতটা নীচে নেমে গেছে তা আপনি হয়তো ভাবতেও পারবেন না । ইউটিউবে তারা নিয়মিত এমন সব ভিডিও আপলোড দেয় যা অনেক সময় পর্ন মুভির বেহায়াপনাকেও হার মানায় ।

(একটি এন্টিপর্ন ওয়েবসাইটের কমেন্ট সেকশনে করা একজন ইন্দোনেশিয়ান মুসলিমের কমেন্টের চুম্বুকাংশ)

—————————*————————-

#  ……. বিশ্বায়নের একটি অভাবিত ফল হল উন্নয়নশীল বিশ্বে পশ্চিমা পর্নোগ্রাফির জঘন্য প্রভাব বিস্তার।  অনেক অনুন্নত দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও জেনারেটর চালিয়ে গ্রামের একটি কুঁড়েঘরকে অশ্লীল সিনেমা হলে পরিণত করা হয়, যা  তরুণদেরকে বানায় ধর্ষক; উৎসাহিত করে নারীদেরকে  নির্যাতন করতে। তরুণরা লাগামহীন ভাবে পর্ন মুভি দেখছে  আর যা দেখছে ঠিক তা-ই বাস্তবে করতে গিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা, অনাচার আর   HIVএর সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এইডস কমিশনের প্রধানের বিবৃতি অনুযায়ী,পর্নোগ্রাফি হল এমন এক টাইমবোমা যা তাদের সকল জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।  জরিপে দেখা গেছে যে HIV আক্রান্ত বিবাহিতদের যৌনশিক্ষার উৎস হল ল্যাটিন আমেরিকায় তৈরি পর্নোগ্রাফি” .

—- টিম স্যামুয়েলস (  চলচ্চিত্র নির্মাতা,বিবিসি প্রামাণ্য চিত্র “Hardcore Profits”(২০০৯)  The Guardian “Africa Goes Hardcore” )

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত)

চলবে ইনশাআল্লাহ……

পড়ুন-
একগুচ্ছ অনুবাদ (প্রথম কিস্তি): https://bit.ly/2x4krTM

রেফারেন্স-

1)    2014 Pornography Survey and Statistics. Proven Men Ministries. http://www.provenmen.org/2014pornsurvey/ (accessed Dec. 29, 2014).

2)    Michael Leahy, Porn @ Work: Exposing the Office’s #1 Addiction(Chicago: Northfield Publishing, 2009).

3)    Bob Sullivan, “Porn at work problem persists,” MSNBC News,Sept.6,2004.http://www.msnbc.msn.com/id/5899345/ (accessed Dec. 27, 2012).

4)      http://www.theguardian.com/lifeandstyle/womens-blog/2013/oct/23/sexual-harassment-workplace-endemic-women

5)    http://m.huffpost.com/us/entry/6713814

শেয়ার করুনঃ