হে বোন…

হে বোন…

“আমার কাছে একটি চিঠি এল। লিখেছেন এক ভদ্র মহিলা। চিঠিতে নাম ঠিকানা নেই। তবে ভাষা ও উপস্থাপন থেকে বোঝা যাচ্ছে বিদুষী নারী। সেখানে তিনি তার মত করে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, আর কিছু প্রস্তাবনা ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন। তার একটি বক্তব্য ছিল এরকম-
.
‘‘আপনি একজন আরব নারীর প্রতি লক্ষ করুন, কত সংকীর্ণ জীবন সে যাপন করে। আর একজন পশ্চিমা নারীকে দেখুন, তার জীবন কত প্রশস্ত। লক্ষ করুন, একজন পশ্চিমা নারী কত স্বাধীন ও মুক্ত, আর আরব নারী কতটা পরাধীন ও বন্দী।’’
.
চিঠির এ পর্যন্ত এসে আমি থেমে গেলাম। তার এ বক্তব্য নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম, তার পত্রের উত্তর দিব ইনশাআল্লাহ। তার সামনে তুলে ধরব তার (এবং তার মত অন্য অনেকের) ভাবনার ভুলটা কোথায়। পরক্ষণেই মনে পড়ল তার নাম ঠিকানা তো আমার জানা নেই, তাহলে কীভাবে সম্ভব। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, (কোনো পত্রিকায়) একটি প্রবন্ধ আকারে তার পত্রের উত্তর দিব। এই ভদ্র মহিলা এবং তার মত আরো যারা এমন ধারণা পোষণ করেন, বরং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তারা বোঝেন না বা স্বীকার করেন না যে, তাদের এই ধারণা নিছক ভাবনা-কল্পনা, বাস্তবতার সাথে যার কোনোই মিল নেই।
.
ড. শায়েখ বাহজাহ আলবায়তারকে এক আমেরিকান নারী যা বলেছিল, সেটিই তাদের এ ভুল ধারণার সবচেয়ে সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ও সারগর্ভ উত্তর।
.
ড. বাহজাহ আমাকে বলেছেন, তিনি আমেরিকাতে একটি কনফারেন্সে মুসলিম নারী ও নিজ সম্পদে তার একক অধিকার-বিষয়ে আলোচনা করছিলেন; -মুসলিম নারীর সম্পদে রয়েছে তার একচ্ছত্র অধিকার। তার সম্পদে স্বামী বা পিতা কারোরই হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। কোনো নারী প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার পরও যদি সে দরিদ্র হয় তাহলে তার ব্যয়ভার বর্তাবে তার পিতা বা ভাইয়ের উপর। যদি পিতা বা ভাই কেউ না থাকে সেক্ষেত্রে (পর্যায়ক্রমে) নিকটাত্মীয়দের উপর। বিবাহ পর্যন্ত অথবা তার স্বচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তারা তার ব্যয়ভার বহন করবে। তারপর যখন বিবাহ হবে তখন তার সকল দায়-দায়িত্ব ন্যস্ত হবে স্বামীর উপর। যদিও স্বামী সম্পদহীন সাধারণ শ্রমিক হয় আর স্ত্রীর অঢেল সম্পদ থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। যা আমাদের জানা আছে, কিন্তু তাদের (পশ্চিমাদের) এ বিষয়ে কিছুই জানা নেই। একথা শুনে এক প্রসিদ্ধ আমেরিকান লেখিকা দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘‘আপনি যেমনটি বলছেন, নারীর জীবন যদি আপনাদের সমাজে এমন সুখেরই হয়, তাহলে আমাকে নিয়ে চলুন, আমি সেখানে ছয় মাস থাকব তারপর আমাকে হত্যা করে ফেলুন। (অর্থাৎ, ছয় মাস এমন সুখের জীবন কাটানোর পর মরতেও আমার কোনো আপত্তি নেই।)’’ ড. বাহজাহ তার একথা শুনে আশ্চর্য হলেন। তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন এবং এমন মন্তব্যের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তখন তিনি নিজের এবং সেখানকার নারীদের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে বললেন, একজন আমেরিকান নারী বাহ্যত দেখা যায় স্বাধীন, আসলে সে পরাধীন। মনে হয় সে সম্মানিত, আসলে সে লাঞ্ছিত। ছোট ছোট বিষয়ে দেখা যায় তারা নারীকে সম্মান দেখাচ্ছে, কিন্তু বড় বড় বিষয়ে তারা তাকে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত করে। গাড়ি থেকে নামার সময় হাত ধরে নামাচ্ছে, ঘরে বা কোথাও প্রবেশের সময় তাকে আগে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। কখনো কখনো ট্রামে (এক প্রকার যানবাহন) পুরুষ দাঁড়িয়ে গিয়ে নারীকে বসতে দিচ্ছে অথবা নারীর চলার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে নারীর সাথে অনেক হীন আচরণ করা হয়, যা অসহনীয় ও ভাষায় প্রকাশ করার অযোগ্য। এখানে একটি মেয়ে যখন প্রাপ্তবয়স্কা হয়, পিতা তার থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। তার জন্য বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। পিতা আপন কন্যাকে বলে, যাও এখন কামাই করে খাও। আজ থেকে আমার কাছে তোমার আর কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। তখন বেচারি নিরুপায় হয়ে একাই জীবন সাগরে ঝাঁপ দেয়। সে জানেনা সে সাগরের গভীরতা। জানে না ঢেউ-স্রোতের প্রবলতা। জানে না তার কুমির-হাঙরের হিংস্রতা। এমনকি সে এ-ও জানে না জীবন সাগরের উজান-ভাটা কী জিনিস? কীভাবে সে মোকাবেলা করবে এসবকিছুর। কিন্তু তার পরিবারের তাতে কিছুই যায় আসে না। সে শ্রমের বিনিময়ে খাবে, না শরীরের বিনিময়ে, তা তাদের ভাববার বিষয় নয়। তারা তাকে জিজ্ঞেস করবে না, সে আপন হাতের কামাই খাচ্ছে নাকি…! আর এটা শুধু আমেরিকার কথা নয়, গোটা পশ্চিমা বিশ্বের চিত্র।

.
প্রফেসর ড. ইয়াহইয়া আশশাম্মা‘ আমাকে আজ থেকে ৩৩ বছর আগে (তিনি প্যারিস থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফেরার পরপরই) বলেছেন, তিনি একটি বাসায় গেলেন, সে বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নেয়ার জন্য। তিনি বাসায় ঢোকার সময় দেখলেন, একটি মেয়ে চোখ মুছতে মুছতে বের হচ্ছে। তিনি কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা জানালো, সে এ বাড়িরই মেয়ে। সে স্বাধীনভাবে একা থাকার জন্য আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে। ড. ইয়াহইয়া বললেন, তাকে যে আমি কাঁদতে দেখলাম! তখন তারা বলল, হাঁ, সে এসেছিল আমাদের বাসার একটি রুম ভাড়া নেয়ার জন্য, কিন্তু আমরা তাকে ভাড়া দিতে রাজি হইনি। তিনি বললেন, কেন? তারা বলল, কারণ সে ২০ ফ্রাঙ্ক দিতে চাচ্ছে। কিন্তু অন্যের কাছে ভাড়া দিলে আমরা পাবো ৩০ ফ্রাঙ্ক!
.
পাঠক! আপনার যদি বিশ্বাস না হয় (বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। কারণ এমন ঘটনা একজন আরব বা মুসলিমের কাছে অবিশ্বাস্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত) আপনি ডক্টর সাহেবকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। তিনি আপনাকে নিশ্চিত করবেন যে, তিনি এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি ছাড়াও ইউরোপ-আমেরিকায় থেকেছেন আমাদের এমন অনেক বন্ধুই এজাতীয় ঘটনা শুনিয়েছেন, যারা তাদের সাথে মিশেছেন এবং কাছ থেকে তাদেরকে দেখেছেন। একজন মুমিন নারীর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, তার ইজ্জত-আব্রু। জীবনের বিনিময়ে হলেও সে এর হেফাযত করে। কিন্তু একজন পশ্চিমা নারী! সামান্য রুটির জন্য সে তার সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ইজ্জত-আব্রু বিলিয়ে দিচ্ছে। কোনো পাঠক হয়ত পড়ে থাকবেন; বিশিষ্ট লেখক-সাহিত্যিক তাওফীক হাকীম পশ্চিমা এক নারীর বিষয়ে লিখেছেন, যে নাকি নিজেকে তার (তাওফীক হাকীম) হাতে সঁপে দিয়েছিল। তার সাথে বসবাস করেছিল স্ত্রীর মত। বিনিময়ে সে পাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও দু’বেলা রুটি। পরবর্তীতে ঐ নারীর প্রতি বিরক্ত হয়ে সে তাকে তাড়িয়ে দেয়।[1]
.
প্রিয় বোন! মুসলিম নারী নিজেকে হেফাযত করেছে ; হেজাব গ্রহণ করেছে। ফলে সে সম্মানিত ও দামী হয়েছে। পর্দার বিধানকে আপন করেছে, অন্যায় সম্পর্ক থেকে বিরত থেকেছে। ফলে পুরুষই তাকে খোঁজ করে ফিরছে, তার জন্য পয়গাম পাঠাচ্ছে। মোটা অংকের মোহর পরিশোধ করে তাকে জীবনসঙ্গীনী বানাচ্ছে। আর পশ্চিমা নারী নিজেকে প্রদর্শন করেছে ও সহজলভ্য করেছে। ফলে সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়েছে। কারণ, সহজলভ্য প্রতিটি বস্তই মূল্যহীন। প্রথম যুগের আরব কবিদের অবস্থা ছিল, তাদের সামনে যদি নারীর হাতের তালু ও কব্জিটুকুও প্রকাশ পেত তাহলে তাদের হৃদয়ে তরঙ্গ খেলে যেত, দেহ-আত্মায় প্রেমের স্পন্দন জেগে উঠত, যবান কবিতা-সচল হত, শব্দ-ছন্দের ঝর্ণা প্রবাহিত হত। কারণ, আরব নারী থাকত হেজাবে ঢাকা, পরপুরুষের দৃষ্টির আড়ালে। আর পশ্চিমা নারী! সী-বীচে তার উপর-নিচ সব থাকে উন্মুক্ত। পুরুষ তার পায়ের গোছার দিকে তাকায়, কিন্তু তা তার মনে কোনো প্রভাব ফেলে না। হৃদয়কে নাড়া দেয় না। স্পন্দিত হওয়ার কোনো উপকরণ সেখানে সে খুঁজে পায় না। নারীর পায়ের গোছা আর চেয়ারের পায়া যেন একসমান! আর এ কারণেই তাদের সমাজে বিয়ের বাজার মন্দা। বিবাহ তো আজীবনের বন্ধন। নারী-পুরুষ সে বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এর মাধ্যমে তারা তাদের বিশেষ চাহিদা পূরণ করে। আর সেটিই বিবাহের প্রথম আকর্ষণ। এখন সে সমাজে যখন বন্ধন থেকে মুক্ত থেকেই চাহিদা মেটানো যায়, তখন কেন একজন পুরুষ বিবাহনামক বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাবে, নিজেকে সে ঝামেলায় জড়াবে?
.
আজ পশ্চিমা নারী বিবাহের মত পবিত্র বন্ধন থেকে বঞ্চিত। ফলে সে হারিয়েছে পরিবার ও তার ভরণ-পোষণের দায়িত্বশীলকে। বঞ্চিত হয়েছে জীবিকার নিরাপত্তা থেকে, মাথার উপরের নিরাপদ ছায়া থেকে। ফলে জীবন ধারণের জন্য সে গ্রহণ করেছে সব ধরণের পেশা, হীন থেকে হীনতর কাজ। সে আজ কারখানার শ্রমিক, রোদে খাটা কৃষক, পথের ঝাড়ুদার! আমাদের বন্ধুরা যারা ইউরোপে থেকেছেন, তারা সেখানে নারীদেরকে পাবলিক টয়লেটও পরিষ্কার করতে দেখেছেন। (আমি নিজেও ১৯৭০ ও ১৯৭৬ সনে নিজ চোখে তা দেখেছি।) আর কিছু নারী আছে যারা জুতা পালিশের কাজ করে। একটি বাক্স বহন করে এবং সারাদিন ফুটপাথে থাকে। এদের কাউকে কাউকে দেখা যায় সাথে বই, কাস্টমারের ফাঁকে ফাঁকে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোনো লোক এসে তার দিকে পা বাড়িয়ে দিলে সে বই ছেড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে জুতা পালিশে। এই তো পশ্চিমা নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার সাতকাহন।
.
এদিকে মুসলিম নারী নিজগৃহে অবস্থান করে, আর পুরুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে। একজন মুসলিম নারী যখন বিবাহের বয়সে উপনীত হয় তখন পুরুষ তার জন্য প্রস্তাব পাঠায় এবং তার পর্যন্ত পৌঁছতে মোটা অংকের মোহর পরিশোধ করে। স্বামী প্রদত্ত এ সম্পদ নারীর একার, এর একমাত্র মালিক সে। এতে তার অনুমতি ব্যতীত আপন পিতা, ভাই বা স্বামী কারো হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার নেই। আর পশ্চিমা নারী! তার নিজেকেই ছুটতে হয় পুরুষ সঙ্গীর খোঁজে। তারপর ঐ পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছতে তাকে পঞ্চাশ হোঁচট খেতে হয়। কখনো কখনো এমন তীব্র হোঁচট খায় যে, এক হোঁচটেই সবকিছু খোয়াতে হয়, এমনকি জীবনটা পর্যন্ত! এতকিছুর পর যদিওবা তার পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তাকে গুণতে হয় মোটা অংকের অর্থ। যেন স্ত্রী স্বামীকে মোহর দিয়ে বিবাহ করছে! এরপর থাকলো স্ত্রীর সম্পদ। সেখানেও তার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলবে না। স্বামীও হস্তক্ষেপ করবে তার সম্পদে। আর মুসলিম নারীর সম্পদ! একমাত্র তার, কারো হস্তক্ষেপ চলবে না তার সম্পদে।
.
প্রিয় বোন! তুমি হয়ত বলবে, এটা অনেক আগের কথা। আমাদের এখানেও এখন বিবাহের বাজার মন্দা এবং অবিবাহিতা নারীর সংখ্যা অনেক। কথা ঠিক। কিন্তু ভেবে দেখেছ, কেন এমন হল? কারণ, আমরা এখন পশ্চিমাদের অনুকরণ শুরু করেছি। ঐসকল বিষয়ে তাদের অনুকরণ করছি, যেগুলো থেকে মুক্তির পথ তারা খুঁজছে এবং তাদের ঐসকল বিষয় গ্রহণ করতে শুরু করেছি, যেগুলো থেকে তারা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। কারণ, ঔপনিবেশিকরা গত শতাব্দীতে – যখন আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম এবং গাফেল ছিলাম – আমাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে দিয়েছে যে, তারাই উন্নত, তারাই অগ্রগামী। তারা যা করছে সেটাই সঠিক। ফলে প্রতিটি বিষয়ে আমরা তাদের অন্ধ অনুকরণে মেতে উঠেছি; তাদের মত হতে পারাকেই পরম মোক্ষ লাভ মনে করছি! কিন্তু আরব (আরবের মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি) কি সকল বিষয়ে এমন অন্ধ অনুকরণ মেনে নিতে পারে? তা কি তাদের আত্মসম্মানে বাধে না?
.
আত্মসম্মানবোধ তো আরবদেরই বেশি থাকার কথা। একারণেই তো অসম্মানের ভেবে তারা আপন কন্যাকে জ্যান্ত পূঁতে ফেলত (যদিও সেটা ছিল আত্মসম্মানবোধ প্রকাশের এক ঘৃণ্য উপায়)। সে আরবরা কি এটা মেনে নেবে যে, অনুষ্ঠানে অপরিচিত কোনো লোক এসে বলবে, ‘ইসমাহ লী’ দয়া করে একটু দেবেন কি! কী দিবে? সিগারেট ধরানোর জন্য দিয়াশলাই? কয়টা বাজে দেখার জন্য হাত ঘড়িটা এগিয়ে ধরবে? না, বরং আপন স্ত্রীকে, ঐ লোকটার সাথে নাচার জন্য; তার বক্ষ ঐ পুরুষের বক্ষের সাথে মেলানোর জন্য, তার চেহারা ঐ অপরিচিত মানুষটির চেহারার কাছাকাছি নিয়ে, তার পা ওর পায়ের কাছে নিয়ে হাতে হাত ধরে নাচার জন্য! কোনো আরব বা কোনো মুসলিম কি এটা মেনে নেবে? না, আত্মমর্যাদাশীল কোনো পুরুষই তা মেনে নেবে না। বরং প্রাণীকুলের মধ্যে নিকৃষ্ট খিনযীর ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীও এটা মেনে নেবে না! এটাই হল পশ্চিমা নারীর হালচিত্র। এবার বলুন, পশ্চিমা নারী এমন কী ভালোর মাঝে আছে, যা আমরা আমাদের নারীদের জন্য কামনা করতে পারি?
.
ড. বাহজাহ আলবায়তারকে ঐ আমেরিকান লেখিকা যা বলেছিল তা আরেকবার স্মরণ করুন। যদি জিজ্ঞেস করেন, তাহলে প্রতিটি জার্মান এবং ফরাসী নারীও একই কথা বলবে। তোমরা আমাদের শরীয়ত বিষয়ে উচ্চবাচ্য কর, যা তা বল, -আমাদের শরীয়ত নারীকে পুরুষের অর্ধেক মীরাছ দেয়। পুরুষকে একাধিক বিবাহের সুযোগ দেয় ইত্যাদি। তাহলে তোমরা আমেরিকার নারীদের বলে দেখ, তারা পুরুষের অর্ধেক মিরাছ গ্রহণ করবে আর তাদের ভরণ-পোষণের যাবতীয় খরচ বহন করবে পুরুষ। দেখবে তারা প্রস্তাবপাঠ রাজি হয়ে যাবে। তেমনি জার্মানি নারীদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পার, বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তারা কি এই প্রত্যাশা করত না যে, তাদের প্রতি দশজনের জন্য একজন স্বামী হবে আর সে তাদের সাথে ইনসাফের মুআমালা করবে এবং তাদের ব্যয়ভার বহন করবে?
.
আল্লাহ যদি মানবজাতির জন্য এই সুযোগ না রাখতেন তাহলে কীভাবে জার্মান ও তার মত বিভিন্ন রাষ্ট্রে নারীর আধিক্যের বিষয়টির সমাধান হত? আল্লাহ তো মানুষকে এই স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করেছেন যে, নারী-পুরুষের মিলন অনিবার্য। একের ছাড়া অন্যের চলেই না! তারপর যখন প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ৫০ তখন অনিবার্যভাবে কি এই ফলাফল দাঁড়ায় না যে, প্রতি দু’জন নারীর জন্য একজন পুরুষ। বরং প্রতিটি প্রাণীর ক্ষেত্রেই তো আল্লাহর নিয়ম এই যে, মাদীর তুলনায় নর অর্ধেক বা তারও কম। মুরগি ও মৌমাছির কতভাগ নর? আরে পশ্চিমা পুরুষ কি চারজন নারী গ্রহণ করে না? বরং চারের বেশি! কিন্তু হারাম পথে!! . তোমাদের কাছে তো ইবলিসের ‘আকদে’ (চুক্তিতে,বন্ধনে) হারাম পন্থায় চার থেকে চলিস্নশ গার্লফ্রেন্ড আর বান্ধবী গ্রহণ দোষণীয় নয়, আর আল্লাহর ‘আকদে’ হালাল পথে চার বিবাহ দোষের? (অথচ কখনো কখনো তা নারীর জন্য একমাত্র রক্ষাকবচ!)
.
না হে বোন! একথা ভাববার কোনো কারণ নেই যে, পশ্চিমা নারী বেশি সুখী বা বেশি সম্মানিত! আল্লাহর কসম করে বলছি, এই পৃথিবীতে মুসলিম নারীই সবচেয়ে বেশি সুখী ও সম্মানিত। মুসলিমসমাজে স্বামী শুধুই তার স্ত্রীর জন্য; তার স্বামীতে কোনো গার্লফ্রেন্ড বা বান্ধবীর কোনো অধিকার নেই। তেমনি স্ত্রীও শুধুই তার স্বামীর জন্য; বয়ফ্রেন্ড বা বন্ধুর কোনো হস্তক্ষেপ সেখানে চলবে না। সে একান্তই তার স্বামীর, তার স্বামী একান্তই তার। সে স্বামী ছাড়া কারো সামনে নিজেকে সঁপে দেবে না। তার হেরেমে স্বামী ছাড়া কেউ প্রবেশ করবে না। তার আদ্যেপান্ত স্বামী ছাড়া কেউ জানবে না। বল হে বোন! এটাই কি পশ্চিমা বা তাদের অন্ধ অনুসারীদের কাছে মুসলিম নারীর দোষ; তার পরাধীনতা, তার বন্দীত্ব!? বল, কেউ কি এটা মেনে নেবে যে, তার স্ত্রী তার হবে এবং অন্য দশজনেরও!? বল, পবিত্রতা ও চারিত্রিক শুদ্ধতা কি দোষের? তাহলে কি যা কিছু ভালো তাকে বলব মন্দ, আর আলোকে বলব অন্ধকার!? ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে অন্যের মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা। অন্যের চোখ দিয়ে দেখা। অনেক হয়েছে বানরের মত গলায় অন্ধ অনুকরণের বেড়ি লাগিয়ে নেওয়া।
.
এখন আমাদের ফিরে আসতে হবে আত্মপরিচয়ের দিকে। ইসলামের দিকে, আরবের ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যের দিকে, চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে। পশ্চিমা নারীরা তাদের মত চলুক, তাদের পুরুষরা তাদের জন্য যেটা কল্যাণকর মনে করে সেভাবেই চলুক। ওদের সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? (ওদের তো আখেরাত বলে কিছু নেই। যাদের জীবনে আখেরাত-ভাবনা বলে কিছু নেই তাদের লাইফস্টাইল, তাদের জীবন-ভাবনা আমরা গ্রহণ করতে পারি কীভাবে। মুসলিম নারী তো সফল হতে চায় দুনিয়াতে ও আখেরাতে। সুতরাং ওদের জীবন আমাদের জীবন সম্পূর্ণ আলাদা।) আমাদের স্ত্রীরা চলুক আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে। আমরা তাদের জন্য যেভাবে চলা কল্যাণকর মনে করি সেভাবে। যাতে আমরা শুধুই তাদের হই। তাদেরকে নিয়েই আমরা সন্তুষ্ট থাকি। আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাক শুধু তাদের দিকে, অন্য কোনো নারীর দিকে নয়।
.
হে বোন! শুনে রাখো, পৃথিবীতে আমাদের নারীরাই শ্রেষ্ঠ; যতক্ষণ তারা হেজাবের পাবন্দী করবে, ইসলামের আদাবের প্রতি গুরুত্ব দিবে, আরবের স্বভাব-চরিত্র আর ইসলামের আহকামকে আঁকড়ে ধরে থাকবে এবং ঐ সমাজের রীতি-নীতি আপন করে নিবে, যে সমাজ জন্ম দিয়েছে আয়েশা, আসমা, খানসা ও খাওলার মত অগণিত মহিয়সী নারী। জন্ম দিয়েছে আলেমা, ফকীহা, মুহাদ্দিস ও সাহিত্যিক। উপহার দিয়েছে সতীসাধ্বী দ্বীনদার মা, যাদের থেকে জন্ম নিয়েছে বীর-বাহাদুর; যুদ্ধের ময়দানের বীর, বক্তৃতার মেম্বারের অনলবর্ষী বক্তা, চিন্তার জগতের অগ্রনায়ক। রাজত্ব ও অর্থ যাদের পদচুম্বন করত। আর তারাই ছিল পৃথিবীর কর্তা। তাদের হাতেই ছিল অর্ধ পৃথিবীর রাজত্ব। আর তোমরা ছিলে হে বোন! ঐ সকল বীর-বাহাদুরের জন্মদাতা মা, রত্মগর্ভা মহিয়সী জননী। l
.
[মা‘আন্নাস থেকে (পৃ. ১৬৯-১৭৬) ভাষান্তর : মুহাম্মাদ ফজলুল বারী] ___________________________________________________

[1] [কারো থেকে যদি কোনো পাপ প্রকাশ পায়, উচিত হল তা গোপন করা। কারণ, পাপের এলান আরো বড় পাপ। কিন্তু এসকল লেখক আল্লাহকেও ভয় করে না এবং এদের চক্ষু লজ্জাও থাকে না। -প্রবন্ধকার (ঠিক একাজটিই আমাদের দেশের এফ এম রেডিওগুলোতে হচ্ছে; ‘ফিজিক্যল রিলেশন’ নামে যিনার এলান হচ্ছে। দেখার যেন কেউ নেই! -অনুবাদক)]

Collected from: Mawaddah (পারিবারিক বন্ধন)

শেয়ার করুনঃ
যৌনশিক্ষা: বাচ্চাদের কীভাবে বলা যেতে পারে

যৌনশিক্ষা: বাচ্চাদের কীভাবে বলা যেতে পারে

(লিখেছেন- ডা. শামসুল আরেফীন)

.
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু। কেমন আছো তোমরা সবাই? আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সবাই ভালো আছি। এত দুর্দিনেও আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ভালো রেখেছেন। চারিদিকে কত খুন-রাহাজানি-ধর্ষণ-অগ্নিকান্ড, এর মাঝেও আল্লাহ আমাদের আর আমাদের পরিবারের সবাইকে সুস্থ রেখেছেন, নিরাপদে রেখেছেন, এজন্য আল্লাহর লাখো কোটি শুকরিয়া। কী বলো তোমরা?
.
আজ আমরা খুব বড় একটা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব। খুব বড় এবং খুব জটিল একটা সমস্যা। এই সমস্যাটা যদি আমরা এই ছোটবেলায়ই না ধরতে পারি, আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা যখন বড় হব, তখন সীমাহীন কষ্টে আমাদের জীবন ভরে যাবে, সে কষ্ট কাউকে বলাও যাবে না। এজন্য খুব মন দিয়ে আমাদের শুনতে হবে আজকের কথাগুলো। যত মন দিয়ে শুনবো, তত সমস্যাটা বুঝতে পারা যাবে। আর যত বুঝতে পারা যাবে, তত আমরা সেই মহাসমস্যা থেকে বাঁচতে পারব। শুনব তো সবাই?
.
তাহলে শুরু করা যাক। দেখো, আমরা ছোট ছিলাম। ছোট বেলায় আমরা খেলনা পছন্দ করতাম, রং-পেনসিল দিয়ে আঁকাআঁকি পছন্দ করতাম, কার্টুন পছন্দ করতাম। এরপর সেই বয়সটা চলে গেল। এখন তোমরা ক্রিকেট-ফুটবল পছন্দ কর। এখন তোমাকে বিল্ডিং সেট দিয়ে বসিয়ে দিলে ভালো লাগবে? লাগবে না। আমাদের পছন্দ পরিবর্তন হয়ে যায়, আবার আরেকটু বড় হলে এগুলোও ভালো লাগবে না। এর মানে, আমাদের মন-মানসিকতা বয়সের সাথে পরিবর্তন হয়।
.
শুধু তাই না। বয়সের সাথে আমাদের শরীরেও পরিবর্তন আসে। যেমন আমাদের শরীর সাইজে বড় হয়। তেমনি শরীরের ভিতরেও নানান পরিবর্তন হতে থাকে। ছেলেদের শরীরে বড় বড় পশম হয়, কণ্ঠস্বর মোটা হয়, হাড়গোড় শক্তপোক্ত হয়, শরীর পেশীবহুল হয়। তোমাদের কিন্তু এখন সেই মাঝামাঝি সময়টা চলছে। তোমরা এখন বাচ্চা থেকে পুরুষ মানুষ, বড়মানুষ হচ্ছো। এই সময়টাকে বলে ‘বয়ঃসন্ধিকাল’। বাসায় ছোটভাই আছে কার কার? খেয়াল করে দেখো তোমার আর তোমার ছোটভাইয়ের মধ্যে কত পার্থক্য। তাহলেই বুঝবে তুমি এখন বাচ্চা থেকে বড়মানুষ হচ্ছো। তোমার ঠোঁটের উপর গোঁফের রেখা আসছে, তোমার গলা মোটা হয়েছে। এসময় শরীরে খুব গন্ধ হয়, ঘামে খুব গন্ধ হয়, সেটা এসেছে, এটা চলে যাবে আরেকটু বড় হলে।
.
তবে এই পরিবর্তনগুলোর মাঝে আমাদের দুটো পরিবর্তন আছে, আমরা কাউকে বলতে পারি না, লজ্জা লাগে, তাই না? একটা হচ্ছে বাহুর নিচে বগলে আর নাভীর নিচে মোটা মোটা লোম ওঠে। এগুলো কেটে ফেলতে হয়, সপ্তাহে একবার শেভ করে ফেললে ভালো, শরীরে গন্ধ হয় না। নাহলে ঘাম আটকে থেকে গন্ধ হয়। প্রতি শুক্রবারে শেভ করার নিয়ম, আমাদের নবী আমাদের তাই শিখিয়েছেন। আর না কেটে ৪০ দিন পেরিয়ে গেলে গুনাহ লেখা হয়, শরীরে ঘাম আটকে থেকে গন্ধ হয়, কেউ কাছে আসতে চায় না, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া জমে ইনফেকশানও হতে পারে। আমরা প্রতি শুক্রবারে এটা শেভ করব, ঠিক আছে তো?
.
আরেকটা সমস্যা আমাদের হয়। প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে আঠালো একটা রসের মত আসে। একটু চাপ দিয়ে পেশাব করলে, বা পায়খানা একটু কষা হলে সেটা বেরিয়ে আসতে পারে। কিংবা কারো কারো রাতে ঘুমের ভেতরেও বেরিয়ে আসে, আসে কি না? এটাও খুব স্বাভাবিক, কোনো অসুখ না, একদম ভয়ের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তোমাদের হবে, আমাদের হয়েছে, আমাদের বাবাদের হয়েছে এই বয়সে। ঘুমের ভেতর স্পীডের সাথে বেরোলে গোসল করতে হয়। গোসলের আগ পর্যন্ত শরীর নাপাক থাকে, নামায পড়া যায় না, কুরআন ধরা যায় না, মসজিদে ঢুকা যায় না।
.
গোসলের নিয়ম হলো: প্রথমে ঐ জায়গা ধুয়ে নামাযের ওযুর মত ওযু করবে। এরপর গড়গড়াসহ কুলি করবে, গলার শেষ পর্যন্ত যেন পানি যায়। তারপর নাকের ভিতর পর্যন্ত পানি দেবে, পানি টেনে উঠাতে পারলে তো সবচেয়ে ভালো। আর লাস্টলি এমনভাবে গোসলটা করবে, যাতে প্রত্যেক লোমের নিচে পানি পৌঁছে, ডলে ডলে গোসল করবে। যাতে শরীরের কোথাও শুকনো না থাকে। আর যদি এমনি অন্য সময় স্পীডের সাথে না বেরোয়, এমনি চুঁইয়ে চুঁইয়ে আসে, তাহলে কেবল ওযু করলেই চলবে। এখন প্রশ্ন হল, এটা কেন আসে? প্রশ্ন আসছে তো?
.
চারপাশে দেখো। মানুষ দুই ধরনের: পুরুষ আর নারী। কেন দুই ধরনের? এক ধরনের কেন না? শুধু পুরুষ হতে পারত, কিংবা শুধু নারী? একপদের হলেই তো হতো? প্রশ্ন জাগে না মনে? এটা আল্লাহ তাআলার সিস্টেম। এই সিস্টেম আল্লাহ করে দিয়েছেন যাতে কিয়ামত পর্যন্ত দুটো মানুষ থেকে একটা মানুষ তৈরি হয়। একজন পুরুষ আর একজন নারী থেকে একটা নতুন মানুষ দুনিয়াতে আসে। এভাবে চলতে থাকবে। তোমার দাদা-দাদী থেকে তোমার বাবা এসেছেন। নানা-নানী থেকে তোমার আম্মু এসেছেন। আবার তোমার আব্বু-আম্মু থেকে তুমি দুনিয়াতে এসেছো। আবার তুমি-তোমার স্ত্রী থেকে আরেকটা নতুন মানুষ আসবে, যার এখন কোনো খোঁজ নেই। এভাবে তোমার বংশ চলতেই থাকবে। শুধু মানুষ না, অন্যান্য সব পশুপাখির ক্ষেত্রেও তাই। এই প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে বলে Reproduction, বাংলাতে ‘প্রজনন’। এটা কীভাবে হয়?
.
পুরুষ প্রাণীর শরীরে একটা বীজ তৈরি হয়, আর মেয়ে প্রাণীটার শরীরে তৈরি হয় জমি। জমিতে এই বীজ পৌঁছালে একটা নতুন সন্তান তৈরি হয়। যখন তুমি ছোট ছিলে তখন এই বীজ তৈরি হচ্ছিল না। এখন তুমি সেই বীজ তৈরির উপযুক্ত হচ্ছো, সেই বীজ তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে তোমার শরীরে। আমাদের দেহে যে টেস্টিস/অণ্ডকোষ আছে, সেখানে তৈরি হয় এই বীজ। বীজ মজুদ রাখার একটা থলের মত জায়গাও আছে তোমার দেহে। যখন পেশাব পায়খানার সময় ঐ থলেতে চাপ পড়ে, তখন প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে একটু একটু করে বেরিয়ে আসে। এটাই ঐ আঠালো তরল, যা তুমি দেখো। কিংবা যখন তৈরি হয়ে হয়ে থলেটাতে আর ধরে না, তখন ঘুমের মাঝে উপচে বেরিয়ে আসে, যাকে বলে ‘স্বপ্নদোষ’। এটা বিলকুল কোন অসুখ না, অনেক বন্ধুবান্ধব তোমাকে বুঝাবে, এটা অসুখ। এটা কোনো অসুখই না, কোনো টেনশনের কিচ্ছু নাই। কিছুটা দুর্বল লাগতে পারে, সেজন্য তোমাকে যেটা করতে হবে, খাওয়া দাওয়া বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিদিন ২ টা ডিম, দুধ, পুষ্টিকর খাবারদাবার খেতে হবে। ঠিক আছে না? বুঝতে পেরেছো সবাই? এটা নিয়ে টেনশন যদি কর, এই টেনশনটা ই শেষ পর্যন্ত রোগ হয়ে দাঁড়াবে। টেনশন না করলে তুমি অসুস্থ হবে না, সুতরাং কোনো টেনশান নয়।
.
এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কিন্তু নর্মাল বিষয়টা আলোচনা করলাম। এবার আমরা কিন্তু সমস্যায় প্রবেশ করছি। মন দিয়ে শুনো কিন্তু। আমাদের মাঝেই অনেক মানুষ, এমনকি তোমাদের বন্ধুরাও অনেকে এই সময়টা মারাত্মক এক খারাপ অভ্যাসে লিপ্ত হয়। তারা এই বীজ বের করে ফেলে ইচ্ছে করে। একবার থেকে বার বার। নিজ হাতে নিজের ভবিষ্যতকে শেষ করে দেয় তিলে তিলে। এই বয়সের বাজে অভ্যাস তাকে পরিণত বয়সে হতাশাগ্রস্ত একজন ব্যর্থ মানুষে পরিণত করে। একা একাই বেরিয়ে গেলে তা শরীরে খারাপ প্রভাব ফেলে না, কিন্তু নিজে ইচ্ছে করে বের করে ফেললে তা শরীরে সিরিয়াস ক্ষয় তৈরি করে। চলো দেখে নিই, এই সর্বনাশা অভ্যাসের ফলে কী কী দেখা দেয়:-
.
* শরীর দ্রুত ভেঙে পড়ে
* অকালে বুড়ো বুড়ো লাগে
* কোন কাজে আনন্দ লাগে না, সবসময় কেমন যেন বিমর্ষ লাগে।
* শরীর-মন চনমনে লাগে না, সতেজ থাকে না, ম্যাজমেজে লাগে
* কোমরে ব্যথা হয়
* মনোযোগ থাকে না পড়াশোনায়
* অল্পতেই ক্লান্ত লাগে
* পড়াশুনার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে, চেপে বসে হতাশা
* মাথাব্যথা করে
* চোখের দৃষ্টি কমে যেতে থাকে
* বীজ পাতলা হয়ে যায়, সন্তান হবার সম্ভাবনা কমে যায়
* লিঙ্গ নিস্তেজ হয়ে পড়ে
* লিঙ্গের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে, সোজা থাকে না
* স্ত্রীমিলনে আগ্রহ কমে
* স্ত্রীর চাহিদা মেটার আগেই দ্রুত বীর্যপাত হয়ে যায়
* দাম্পত্য জীবনে ব্যর্থ পুরুষ হিসেবে সাব্যস্ত হয়
* পারিবারিক কলহ, ডিভোর্স হতে পারে
* হতাশা একাকীত্ব জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।
.
সুতরাং ছোট্টবন্ধুরা, তোমরা বুঝতে পারছ— এই ইচ্ছা করে বীজ বের করে ফেলাটা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। আর যদি এটা তুমি না কর, তাহলে শরীর থাকবে সতেজ, মন থাকে প্রফুল্ল। তোমার মনে হবে, যেন তুমি বিশ্ব জিতে নিতে পারো। এতোটা আত্মবিশ্বাস তোমার উপর ভর করবে। পড়াশুনা-চাকুরি-ক্যারিয়ার-দাম্পত্যজীবন সবখানে তুমি একজন সফল ব্যক্তি হবে। এখন তুমিই বেছে নাও তুমি কোনটা চাও। সবাই বলো আমরা কোনটা চাই?
.
শুধু তাই নয়, আমাদের মৃত্যুর পর এক অনন্ত জীবন শুরু। কবর-হাশর তারপর জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা হবে। এই নিজে ইচ্ছে করে বীজ বের করে ফেলা আল্লাহর কাছেও মারাত্মক বড় গুনাহ যাকে বলে কবীরা গুনাহ। অন্তর থেকে ফিরে আসার সংকল্প না করলে মানে তাওবা না করলে এই গুনাহ মাফ হয় না। বার বার কবীরা গুনাহ একসময় ঈমান চলে যাওয়ার কারণও হতে পারে। এজন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির কথা এসেছে হাদিসে। এজন্য এমন কাজ, এমন অভ্যাস আমরা কেন করব যাতে দুনিয়াও শেষ হয়ে গেল, আখিরাতও শেষ হয়ে গেল। সবাই তাওবা করি আজ থেকে, আল্লাহ, আমরা এমন কাজ কখনো করব না। সবাই মন থেকে বলো। আর যাদের এই অভ্যাস আছে, তারাও তাওবা কর: বলো, আল্লাহ যা করেছি ভুল করেছি। আর কোনোদিন করবো না। বলেছো মনে মনে। মন থেকে আল্লাহকে বলতে হবে, তাঁকে কী ফাঁকি দেয়া যায়?
.
এবার আরেকটা মহাসমস্যার কথা তোমাদের শোনাবো। সেটা হলো: এই পুরুষ প্রজাতির বীজ নারী প্রজাতিতে ট্রান্সফারের জন্য একটা প্রক্রিয়া আছে। একটাই প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই সকল মানুষ জন্ম নেয়। পুরুষের জননাঙ্গ এবং নারীর জননাঙ্গকে একত্র করা হয় এবং বীজ দেয়া হয়। এই একটাই প্রক্রিয়া। পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষিত হবে, আর নারীর কাছে পুরুষদের ভালো লাগবে। এটাই নিয়ম। নারী-পুরুষের বাইরে যেকোন প্রকার জননাঙ্গ-কেন্দ্রিক আকর্ষণ হল অস্বাভাবিক ও অপরাধের কাজ। নারী-পুরুষের এই আকর্ষণ কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা ধনী দেশগুলো কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করে, অশ্লীল ছবি-সিনেমার ব্যবসা। ইন্টারনেট ভর্তি করে রেখেছে এসব বাজে বাজে ছবিতে-ভিডিওতে। এগুলো যুবকেরা দেদারসে দেখছে, আর নিজের জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কীভাবে সারা দুনিয়ায় যুবকেরা ধ্বংস হচ্ছে দেখবে? দেখো—
.
  •  অশ্লীল ছবি ভিডিওকে ইংরেজিতে বলে ‘পর্ন’। এখানে তারা নারী জাতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। নারীকে কেবলই পুরুষের ইচ্ছার দাসী হিসেবে দেখায়। যেন তার নিজের কোনো ইচ্ছে নেই, কোনো দাম নেই। যেন সে মানুষ না, কোনো বস্তু। যে এগুলো দেখে তার মনেও মেয়েদের সম্পর্কে বাজে বাজে ধারণা জেঁকে বসে।
  • এগুলোতে মানুষের শরীর সম্পর্কেও ভুল ধারণা জন্মে। মেকাপ করে মানুষের শরীর একদম নিখুঁত করে তোলে। ফলে বিয়ের পর যখন সে নিজের স্ত্রীর শরীর অত নিখুঁত পায় না, তখন পরিবারে অশান্তি শুরু হয়। পর্নে আসক্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
  • নিজেকে নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে। নিজের শরীর, নিজের মিলন নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না,অহেতুক হতাশায় ভোগে। সে পর্নকে বাস্তব মনে করতে থাকে, অথচ ওগুলো সব অভিনয়।
  • পর্ন তাকে বার বার বীজ অপচয় করতে বাধ্য করে। পর্ন দেখে সে উত্তেজিত হয়, আর বার বার বীজ বের করে। ফলে তার শরীর-মন সব শেষ করে ফেলে।
  • পর্ন প্রচুর সময় নিয়ে নেয়। এটা নেশার মত। আজ যা দেখেছে। কাল তা ভালো লাগে না, আরেকটু বেশি মাত্রার প্রয়োজন হয়। তারপর আরেকটু বেশি। কাংক্ষিত কন্টেন্ট পেতে সে ইন্টারনেটে বেশি সময় দিতে থাকে। তার পড়াশুনা, চাকরি সবখানের পারফর্মেন্স খারাপ হতে থাকে। হতাশা তাকে গ্রাস করে বসে।
  • তোমরা পেপারে ‘ধর্ষণ’ শব্দটা খুব দেখছো ইদানীং। পেপার পড় কে কে? জানো এটা কী? এটা হচ্ছে— বীজ দেবার জন্য যে কাজটা নিজের স্ত্রীর সাথে করার কথা, সেই কাজটা অন্য মেয়ের সাথে জোর করে করা। এটা কঠিন অপরাধ ও গুনাহের কাজ। আসলে নিজ স্ত্রী ছাড়া যেকোন নারীকে এই বীজ দেয়াটাই খারাপ কাজ, কঠিন গুনাহ। আখিরাতে এজন্য কঠিন আজাব ভোগ করতে হবে, কে জানে কতদিন! সেটা মেয়েটার ইচ্ছাতেই হোক, আর অনিচ্ছাতেই হোক। তো পর্নের নেশায় যারা আক্রান্ত, তারা এই কাজের জন্য পাগল হয়ে যায়, নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অন্য কারো ওপর আক্রমণ চালায় নিজের চাহিদা পূরণ করার জন্য। একবার চিন্তা কর, পেপারে তোমার ছবি এসে গেছে, তুমি অপরাধটা করেছো, তোমার বাবা-মায়ের চেহারাটা কেমন হবে, তারা কত লজ্জায় পড়ে যাবে, কতটা কষ্ট পাবে। এজন্য এসো আজ আমরা শপথ করি, আমরা কোনোদিন এই জিনিস দেখব না। কৌতূহলের বশেও না, কারণ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটা একটা নেশা। একবার যে দেখে সে আর ছাড়তে পারে না। তার দুনিয়ায় সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়, আর আখিরাতে তো কতকাল আগুনে জ্বলতে হবে তার ঠিক নেই, সেই আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়েও ৭০ গুণ তাপ বেশি হবে। যার যারা দেখেছো, এসো তাওবা করি, আল্লাহর কাছে ফিরে আসি। আয় আল্লাহ, আমাদের মাফ করে দিন। আমরা আর কোনোদিন এই সর্বনাশা জিনিস দেখব না। আপনি আমাদেরকে রক্ষা করেন। আমীন।
.
এখন এই যে তোমরা লেখাপড়া করছো। কেন? কারণ যে এখন খেলাধুলা কম করে লেখাপড়া বেশি বেশি করবে, সে পরে বৌবাচ্চা নিয়ে সুখে থাকবে, তাইতো? একইরকম ভাবে, এখন যে এই দুই জিনিস থেকে বেঁচে থাকবে, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে। সে পরে মহাক্ষতি থেকে বেঁচে যাবে। আর যে খেলতামাশায় মত্ত হবে, পর্ন দেখা আর ইচ্ছা করে বীজ বের করার গুনাহে লিপ্ত হতেই থাকবে। তার পারিবারিক জীবন শেষ হবে, সেই চিন্তায় চিন্তায় সে নিজেও শেষ হয়ে যাবে। দুনিয়াই হয়ে যাবে তার দোযখ, আর মৃত্যুর পর দোযখ তো আছেই। এজন্য আজ আমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করি, আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা কর এই কাজ থেকে। আমাদের তাওবা কবুল কর।
শেয়ার করুনঃ
রুদ্ধদ্বার

রুদ্ধদ্বার

ট্রেনে আসছিলাম। কিছু টিকিট বিহীন যাত্রী থাকে। সিট না পেলে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করে। আখাউড়া থেকে সম্ভবত এরকমই এক মেয়ে ভ্রমণ করলো। সিট না পেয়ে আমাদের সিট সংলগ্ন পথে দাঁড়ালো। হাবভাবে বোঝা গেল, আন্তরিক, কথা বলতে আগ্রহী।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আরেক পুরুষ যাত্রী উঠলো টিকিট বিহীন। মেয়েটার পাশেই দাঁড়ালো। ট্রেনে এমনিতেই অনেক ভীড়। আখাউড়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত অবৈধ যাত্রীর সংখ্যা বেশি থাকে। ছুটির দিনগুলার আগে-পরে এদের দৌরাত্ম্যে বৈধ যাত্রীদের উঠানামাই কষ্টকর হয়ে পড়ে।

যাত্রী দুজন পরস্পর আলাপ শুরু করলো। মাঝে আমাদের সাথেও বলছে। কিছু পর ছেলেটা ফেবু আইডি চাইলো। মেয়েটাও কঠিন এক নাম বলে দিলো। সাথে রিকু পাঠানো যায় না, মেসেজ দিতে হবে ইত্যাদি। আমরাও টিকিট বিহীন যাত্রী মাড়িয়ে বহু কষ্টে নরসিংদী নেমে পড়লাম।

………..

শ্বশুরবাড়িতে একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একটা মেয়ে খুন হয়েছে ঈদের রাতে। নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। এমনকি খুনের পর তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
.
শুনলাম, মেয়েটা পরকীয়ার বলি। পরিচয় সম্ভবত মাজারে। এরপর মন দেয়া-নেয়া। পরে শারীরিক সম্পর্ক করতে চায়, মেয়েটা নাকি রাজি হয় নি। ছেলেটা বিবাহিত। ১ম স্ত্রীর সাথে তালাকের পর ২য় স্ত্রীর ঘরে সন্তান আছে। বখাটে ধরনের। মূলত ধর্ষণের জন্যই বিয়ের কথা বলে ঈদের দিন নিয়ে আসে।

………..

পুরো রামাদান জুড়েই এমন নিউজ দেখেছি কদিন পরপর। ধর্ষণ, গণ ধর্ষণের পর হত্যা। পাশাপাশি আরেক ধরনের নিউজও চোখে পড়ে, ‘বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অবস্থান! অধিকাংশ সময় দেখা যায়, প্রেমিক পালিয়ে গেছে! কোন ক্ষেত্রে ঐ প্রেমিকের স্ত্রী-সন্তানও আছে। আবার পালিয়ে আসা মেয়েও স্বামী-সন্তান ছেড়ে আসছে। আবার দেখলাম, উভয়ে একাধিক সন্তানের জনক-জননী স্বামী, স্ত্রী, সন্তান রেখে পালিয়ে গেছে!

…………

দুটো জিনিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে পাশাপাশি কঠিনও করে দেয়া হয়েছে। প্রথমটা বিয়ে। এটা আইন করে বন্ধ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, ১৮র আগে মেয়েদের বিয়ে দেয়া যাবে না। ১৮র পূর্বে ‘বাল্যবিয়ের’ নামে বন্ধ করে দেয়া বিয়েগুলোর খবর পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হয়। ইউএনও’র আর কোন কাজ থাক বা না থাক, বিয়ে বন্ধ করা তার প্রধান কাজ। এবং এটা বিরাট সফলতা হিসেবেও দেখা হয়।
.
দ্বিতীয়ত বন্ধ করা হয়েছে সকাল বেলার দ্বীনি শিক্ষা। এটা আইন না করলেও, সকালের সাধারণ শিক্ষা বা স্কুলগুলাকে এমন নিয়মে আনা হয়েছে, সকালের মাকতাবের শিক্ষাটা অলিখিত বে-আইনের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে গেছে। সকালের মাকতাবে শুধু কায়দা-কুরআন পড়ানো হত না। এখানে সুরে সুরে বিভিন্ন মাসআলা, তাজউইদ বা উচ্চারণের সাথে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হতো। সুরগুলা বাচ্চাদের অন্তরে গেঁথে যেতো। বড় হলেও এগুলা অন্তরে সুরের সাথে বাজতো। আমাদের এখনও বাজে। শিশুকালের এই নৈতিকতা তাকে বড় কালেও অনেক অন্যায় হতে বিরত রাখতো। সে নারীকে সম্মানের সাথে দেখতো। চোখ তুলে তাকাতো না। ধর্ষণ তো তার জন্য মরে যাওয়ার শামিল।
.
এবং একটা জিনিস খুলে দেয়া হয়েছে। অশ্লীলতা। অশ্লীলতার দরজা প্রায় সর্ব দিক দিয়ে খুলে দেয়া হয়েছে। এটা বন্ধুত্বের নামে, এটা সহশিক্ষার নামে, এটা আধুনিকায়নের নামে, এটা নারীর ক্ষমতায়নের নামে, এটা নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নামে।

…………

পুরুষের স্বভাব হল, সে সুযোগে নারীকে পেতে চাইবে। সে যখন বিবাহিত হয়, তখন সুযোগ পেলে ভিন্ন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কই তার উদ্দেশ্য। অপরদিকে নারীর স্বভাব হল, সে এক পুরুষকেই এককভাবে চাইবে। সেটা স্বামীকে ছেড়ে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গিয়েও হোক।

………..

নারী-পুরুষের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নারীর বিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। পুরুষের দ্বীনি শিক্ষা বন্ধ করা হয়েছে।
.
নারীকে সমাজে, লোকালয়ে ব্যাপক করা হয়েছে। তারা পুরুষের সাথে অবাধে মিশছে। পুরুষের স্বভাব চাইছে তাকে শারীরিকভাবে পেতে। নারীর বয়স বৈধ পন্থায় তাকে পাওয়া রুদ্ধ করেছে। নারী-পুরুষের দ্বীনি শিক্ষা নাই। তারা অবৈধভাবেই মেলামেশা করছে। এবার নারীর স্বভাব চাইছে, ঐ পুরুষকে এককভাবে পেতে। নৈতিকতাহীন পুরুষের আশপাশে নতুন নতুন অল্পবয়স্কা, সমবয়স্কা নারী। সে অবৈধভাবেই যখন নিত্যনতুন নারী সঙ্গ পাচ্ছে, কেন পুরনো এক নারীর সাথে চিরকালের জন্য আবদ্ধ হবে? অথবা সে বৈধভাবে আগে থেকেই এক নারীর সাথে আবদ্ধ। সম্প্রতি যৌন চাহিদায় মেলামেশা করা নতুন নারীকে সে কিভাবে স্থান দিবে?
.
এসব থেকে টানাপোড়েন এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিকটিম আমাদের নারীরাই। প্রতিদিনই তারা কোথাও না কোথাও খুন হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছে, গণধর্ষণ হচ্ছে এমনকি খুনের পরও ধর্ষণ হচ্ছে নতুবা আগুন ঢেলে দেয়া হচ্ছে। নৃশংসভাবে তাদের মারা হচ্ছে।

……….

পরিত্রাণের জন্য সর্বপ্রথম একটা চালু জিনিস বন্ধ করতে হবে। অশ্লীলতা। সেটা যে নামেই হোক। উপরে নামগুলা বর্ণনা করা হয়েছে।
.
এবং দুটো বন্ধ জিনিস খুলে দিতে হবে। একটা বিয়ে। বিয়ে অবাধ করতে হবে। বিয়ে অবাধ করলে নারী নিরাপদ হবে। আরেকটা, সকাল বেলার দ্বীনি শিক্ষা। এটা বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। একটা বাচ্চার অন্তরে যখন আল্লাহর ভয়, ভালবাসা প্রবেশ করিয়ে দেয়া হবে, তার থেকে বাকি সবাই নিরাপদ হয়ে যাবে, ইনশা-আল্লহ! বড় হয়ে তার সামনে উলঙ্গ নারী পড়ে থাকলেও সে চোখ তুলে তাকাবে না। ধর্ষণ দূরে থাক!
.
Written by: Nijam Uddin

শেয়ার করুনঃ
অবক্ষয়কাল

অবক্ষয়কাল

অতীত

.
ইতিহাসের দিকে তাকালে সভ্যতা ও যৌনতার সম্পর্কের একটা প্যাটার্ন দেখা যায়। বারবার বিভিন্ন সভ্যতায় এই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্যাটার্নটা কী?
.
সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলোজিস্ট জন ড্যানিয়েল আনউইন ৫,০০০ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র এবং ৬টি সভ্যতার ওপর এক পর্যালোচনা করেন। আনউইন এ গবেষণা শুরু করেন সভ্যতাকে অবদমিত কামনা-বাসনার ফসল হিসেবে দাবি করা ফ্রয়েডিয় থিওরি যাচাই করার জন্যে। কিন্তু ফলাফল দেখে হকচকিয়ে যান আনউইন নিজেই। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Sex & Culture বইতে দীর্ঘ এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন সভ্যতা ও সেগুলোর পতনে আনউইন দেখতে পান একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন–
.
কোনো সভ্যতার বিকাশ সেই সভ্যতার যৌনসংযমের সাথে সম্পর্কিত। যৌনতার ব্যাপারে কোনো সমাজ যত বেশি সংযমী হবে তত বৃদ্ধি পাবে বিকাশ ও অগ্রগতির হার। সহজ ভাষায় বললে, সভ্যতার বিকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা স্বাভাবিক যৌনাচার আবশ্যিক। প্রাথমিক বিকাশের পর্যায়ে যৌনাচারের ক্ষেত্রে প্রতিটি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি থাকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং এর ভিত্তি পারস্পরিক বিশ্বস্ততা।
.
বিস্মিত আনউইন আবিষ্কার করলেন, সুমেরিয়, ব্যাবলনীয়, গ্রিক, রোমান, অ্যাংলো-স্যাক্সনসহ প্রতিটি সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে এমন সময়ে যখন যৌনসংযম ও নৈতিকতাকে এসব সমাজে কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। কিন্তু উন্নতির সাথে সাথে প্রতিটি সভ্যতায় শুরু হয় অবক্ষয়। সফলতা পাবার পর সভ্যতাগুলো হারানো শুরু করে নিজেদের নৈতিকতা। সাফল্যের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে তাদের মূল্যবোধ, প্রথা ও আচরণ। ক্রমেই উদার হতে শুরু করে যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি। বহুগামিতা, সমকামিতা, উভকামিতার মতো ব্যাপারগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নেয় সমাজ। সামষ্টিক কল্যাণের ওপর ব্যক্তি স্থান দেয় তার নিজস্ব স্বার্থপর আনন্দকে।
.
যৌনাচার ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার, সমাজে এর কোনো নৈতিক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না–আজকের আধুনিক সভ্যতার আধুনিক মানুষগুলোর মতো এ মিথ্যে কথাটা বিশ্বাস করেছিল আগের সভ্যতাগুলোও। অবধারিতভাবেই একসময় সবার ভুল ধারণা ভাঙে, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যায় অনেক। একবার শুরু হয়ে গেলে আর থামানো যায় না অবক্ষয়ের চেইন রিঅ্যাকশান। অবাধ, উচ্ছৃঙ্খল যৌনাচারের সাথে সাথে কমতে থাকে সামাজিক শক্তি। কমতে থাকে সভ্যতার রক্ষণাবেক্ষণ ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা। ক্রমশ কমতে থাকে সমাজের মানুষের সংহতি, দৃঢ়তা ও আগ্রাসী মনোভাব। আর একবার এই অবস্থায় পৌঁছবার পর সভ্যতার পতন ঘটে দুটি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে–অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা অথবা আগ্রাসী শত্রুর আক্রমণ।
.
আনউইন উপসংহার টানেন, বিয়ে-পূর্ববর্তী ও বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতা এবং অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার যে সমাজে যত বেশি সে সমাজের সামাজিক শক্তি তত কম। যৌনতার ওপর যে সমাজ যত বেশি বাধানিষেধ আরোপ করে, তার সামাজিক শক্তি তত বাড়ে। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সমাজ হলো যেখানে যৌনতা এক বিয়েকেন্দ্রিক পরিবারের (Heterosexual Monogamy) মধ্যে সীমাবদ্ধ। আনউইনের মতে ৫,০০০ বছরের ইতিহাসজুড়ে, প্রতিটি সভ্যতা ও সমাজের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য।
.
‘যেকোনো সমাজকে সামাজিক শক্তি অথবা যৌন স্বাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। আর এর পক্ষে প্রমাণ হলো কোনো সমাজ এক প্রজন্মের বেশি এ দুটো একসাথে চালিয়ে যেতে পারে না।’
.
আনউইনের এই উপসংহারকে বিভিন্নভাবে হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব, তবে ফিতরাহর ওপর থাকা সুস্থ চিন্তার কোনো মানুষের জন্য সত্যটা স্পষ্ট। এই উপসংহার বিস্ময়কর–বিস্ময়ের কারণ হলো এত দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে একই চক্রের পুনরাবৃত্তি চলছে। কিন্তু এ উপসংহার অপ্রত্যাশিত না। আসুন দেখা যাক, আনউইনের গবেষণা থেকে আসলে আমরা কী কী জানতে পারছি।
.
সমাজে ফাহিশা (অশ্লীলতা ও বিকৃতি) ও যিনা বাড়লে ভাঙন ধরে পরিবার এবং মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোতে। এর প্রভাব পড়ে সামাজিক সংহতি এবং সমাজের অন্তর্নিহিত নৈতিক শক্তির ওপর। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে সমাজ। প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই সমাজ ও সভ্যতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে অপরিবর্তনীয় কিছু নিয়মাবলি। পার্থক্য হলো প্রকৃতির ক্ষেত্রে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে এই নিয়মগুলোর অস্তিত্ব আমরা ধরতে পারি। সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অতটা সহজ হয় না। কিন্তু যিনি জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্মের নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তিনিই বেঁধে দিয়েছেন মানবসমাজ ও সভ্যতার নিয়মগুলোও। আর তাই এই নিয়ম ভঙ্গ করার পরিণতি আছে।
.
নৈতিকতা, যৌনতার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করা, তার অবাধ্য হওয়া শুধু ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলে না; বরং প্রভাব ফেলে পরিবার, সমাজ ও প্রজন্মের ওপর। এর মূল্য চোকাতে হয় সবাইকে। আল্লাহ অনুমোদন দেননি এমন যেকোনো যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া ও মেনে নেয়া নিস্তেজ করে সমাজের উদ্যম, অনুপ্রেরণা ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে। শুরু হয় এক চেইন রিয়্যাকশন। ক্রমশ বেড়ে চলা বিকৃতির প্রতি শূন্য হতে শুরু করে মানুষ অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া। এক সময় বিকৃতি পরিণত হয় প্রচলন ও প্রথায় ।
.

বর্তমান

.

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। কিন্তু বোকা মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। চিনতে পারে না অবক্ষয়ের কালে সভ্যতার পচন ও আসন্ন পতনকে।
.
আজ বিশ্বজুড়ে যে যৌন উন্মাদনা, বিভিন্ন ধরনের যৌনবিকৃতির স্বাভাববিকীকরণ, আদর্শিক ও আইনি বৈধতা দেয়ার প্রবণতা আমরা দেখছি তা ইঙ্গিত দেয় সেই একই পরিণতির পুনরাবৃত্তির। অন্য সভ্যতাগুলোর মতোই আমাদের এ যৌন উন্মাদনা হলো সভ্যতার অবক্ষয় ও আসন্ন পতনের চিহ্ন। বিশেষ করে পুরুষত্বের ধারণাকে আক্রমণ করা এবং অ্যান্ড্রোজিনির (হাল আমলের ট্র্যান্সজেন্ডার আন্দোলন) এর দিকে যাবার প্রবণতা চরম পর্যায়ের অবক্ষয়ের চিহ্ন।
.
বর্তমান সময়ের পশ্চিমের ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনা নিয়ে খুব সুন্দর বলেছেন ক্যামিল পা’লিয়া। মহিলার প্রথম বই ছিল পশ্চিমা সভ্যতার শিল্পের ইতিহাসে অবক্ষয়–বিশেষভাবে যৌন অবক্ষয় নিয়ে। [1] পা’লিয়ার মতে প্রত্যেক বড় বড় সভ্যতার মধ্যে এ চক্র দেখতে পাওয়া যায়। সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে মহিমান্বিত করা হয় পুরুষত্বকে। কিন্তু অবক্ষয়ের পর্যায়ে সমাজ, শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে শুরু করে পুরুষত্বের বদলে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য। রোমান সভ্যতার শুরুর দিকের ভাস্কর্যগুলো যুদ্ধংদেহী, অ্যালফা-মেইল (Alpha Male)। শেষের দিকে জয়জয়কার আঁকাবাঁকাভাবে দাঁড়ানো মেয়েলি ডেইভিডদের। বিভিন্ন সভ্যতার ক্ষেত্রে এই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি হয়। অবক্ষয়ের পর্যায়ে এসে সভ্যতাগুলোর মধ্যে পুরুষত্ব, পরিবার, যৌনসংযমের বদলে মহিমান্বিত করা হয় যৌনবিকৃতিকে। হঠাৎ করে বিস্ফোরণ ঘটে সমকামিতা, উভকামিতা, অজাচার, পশুকামিতা, স্যাইডোম্যাসোকিযম, বন্ডেজ, জেন্ডার গেইমসসহ বিভিন্ন যৌনবিকৃতির। বিকৃত আচরণগুলো অর্জন করে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।
.
অবশ্য ওই সভ্যতার মানুষ এগুলোকে অবক্ষয় ও পতনের চিহ্ন হিসেবে দেখে না; তাদের কাছে এগুলোকে মনে হয় নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ আর সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। অ্যারিস্টোক্র্যাটিক, অভিজাত মুক্তচিন্তা। যৌনতার ব্যাপারে এমন মুক্তবাজারি দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা সংজ্ঞায়িত করে প্রগতি আর উন্নতির নামে। এটাকেই তারা মনে করে সভ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে দেখা যায়, এই সভ্যতা আসলে তার নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়া সভ্যতা এবং এ সভ্যতার নাগরিকেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে নিজ শরীর ও সত্তার ব্যাপারে। এ সভ্যতা নিজের পুরুষত্বকে প্রশ্ন করছে, প্রশ্ন করছে নিজের পরিচয়কে। যা কিছুর মাধ্যমে সভ্যতা একসময় মাহাত্ম্য অর্জন করেছিল, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তার ছিটেফোঁটা এখনো রয়ে গেছে, কিন্তু অবক্ষয়কালের মানুষ হারিয়ে ফেলেছে এর সাথে সব সম্পর্ক।
.
পশ্চিমের বর্তমান অবস্থার ক্ষেত্রে কথাগুলো খাপে খাপে মিলে যায়, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ক্ষেত্রে ঠিক এ ব্যাপারটাই ঘটছে। এ অবক্ষয়ের শুরুটা হয়েছে সেক্সুয়াল রেভুলুশানের মাধ্যমে যখন একটি প্রজন্ম নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দিক দিয়ে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আগের প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এবং সব ধরনের বাঁধন খুলে ফেলে যৌনতাকে দিয়েছে মানুষের ওপর অনিয়ন্ত্রিত রাজত্ব। পশ্চিমে এ ব্যাপারটা ঘটেছে ষাট ও সত্তরের দশকে। আর আমাদের মতো ‘মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাওয়াদের’ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটছে এখন। যার সাক্ষ্য দেয় আমাদের সমাজে এখন চলা যিনা, গর্ভপাত, পরকীয়া, সমকামিতা, পর্নোগ্রাফি এবং ধর্ষনের নীরব মহামারী।
.
এ সভ্যতা, যা আমরা মুসলিমরা বেছে নিইনি, যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে–আমরা ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় যাকে ভালোবাসতে এবং এ ভালোবাসাকে উন্নতি ও প্রগতি মনে করতে শিখেছি–তা আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায়। ৫,০০০ বছরের ইতিহাস তা-ই বলে। পতনোন্মুখ এক সভ্যতার শেষ প্রান্তে অবস্থান করছি আমরা। পেছনে তাকিয়ে দেখুন। দেখুন ব্যাবিলন, মিসর, গ্রিস, রোম আর বাইনযেন্টাইনের ইতিহাস। পুনরাবৃত্তি হচ্ছে সেই একই চক্রের, একই প্যাটার্নের। কিন্তু আমরা নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত, এত অসুস্থভাবে আত্মকেন্দ্রিক, আত্মপরিচয়ের সংকটে এতটাই নিমগ্ন যে, পচনের গন্ধ আমরা টের পাই না। পতনের শব্দ শুনতে পাই না। বর্তমানমুগ্ধতা আর ক্ষমতার উপাসনা করার প্রবণতা অন্ধ করে রেখেছে আমাদের। আমরা এত কাছে দাঁড়িয়ে আছি যে ক্যানভাস, কাগজ আর রঙের খুঁটিনাটি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু মূল ছবিটা দেখতে পারছি না। আমাদের ঘোরলাগা চোখে রঙের বিস্ফোরণ ধরা পড়ে, কিন্তু ধরা দেয় না বাস্তবতার অবয়ব।
.
এ সভ্যতার সাথে মানিয়ে নেয়ার আমাদের সব ‘সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম’ চেষ্টা, যেগুলোকে আমরা ‘প্রগতি’ আর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ’ বলি–পশ্চিমের অনুকরণ, পশ্চিমের ছাঁচে ইসলামকে নতুনভাবে ফ্রেইম করা, সবকিছুকে ধরে ধরে ইসলামীকরণ করার আমাদের মহাকৌশলী পরিকল্পনা, ‘ইসলামী’ গণতন্ত্র আর ব্যাংকিংয়ের মতো ধারণাগুলোর বৈধতা দেয়ার কূটতর্কের কারুকাজ, পদে পদে পশ্চিমের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে নিজেকে বদলে ফেলা–এসবই হলো এমন এক দালানকোঠার দেয়াল রং করার মতো, যা এরই মধ্যে আগুনে পুড়ে ধসে পড়তে শুরু করেছে।
.

ভবিষ্যৎ

.
চূড়ান্ত পরিণতি কী?

কী অপেক্ষা করছে এ সভ্যতার জন্য?
.
আমরা অবশ্যই ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু ৫,০০০ বছরের ঐতিহাসিক প্যাটার্ন থেকে একটা ধারণা করা যায়।

১) অরাজকতাপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিল্পব ও বিশৃঙ্খলা, অথবা
২) অধিকতর সামাজিক শক্তির অধিকারী আগ্রাসী শত্রুর আক্রমণ
.
যৌনাচারের ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি আমরা এখন দেখছি অবধারিতভাবেই তা এমন এক বিভ্রান্ত প্রজন্মের জন্ম দেয় যারা না নতুন কিছু সৃষ্টি পারে, আর না পারে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে। অবক্ষয়, অবনতি, অরাজকতা, অযোগ্যতা আর ভীতসন্ত্রস্ত নিষ্ক্রিয়তার এক চক্রে আটকা পড়ে সভ্যতা। আত্মপরিচয়ের সংকটে ঘুরপাক খাওয়া আত্মরতিতে নিমগ্ন ভোগবাদী প্রজন্মের ঘোরলাগা চোখের সামনে খুলে আসে সমাজের বাঁধন। ধসে পড়তে শুরু করে সভ্যতা।
.
অথবা এমন কোনো জাতির আবির্ভাব ঘটে যারা ত্বরান্বিত করে একসময়কার শক্তিশালী ও গর্বিত কিন্তু বর্তমানে অধঃপতিত জাতির পতনকে, পরিপূর্ণ করে ধ্বংসপ্রক্রিয়াকে। বারবেরিয়ান, ভিসিগথ, হান, মঙ্গোল, ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব বেদুইন।
.
আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অবক্ষয়কালে কারা হবে এই আগ্রাসী বাহ্যিক শত্রু?
.
আধুনিক পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের বহু আগেই সভ্যতার পালাবদল আর জাতিগুলোর উত্থানপতনের চক্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইসলামী ইতিহাসের মহিরুহ ইবনু খালদুন। আগ্রাসী ও বিজয়ী জাতির বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তাঁর অবিস্মরণীয় রচনা আল-মুক্কাদিমাতে।
.
ইবনু খালদুনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো সামাজিক সংহতি। এটি হলো সেই বন্ধন যা একটি সমাজের মানুষের মধ্যে তৈরি করে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহায়তার মনোভাব। এ বন্ধন মানুষকে জোগায় প্রতিকূলতার মোকাবেলা আর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি। সাধারণত এ বন্ধন সবচেয়ে শক্তিশালী হয় গোত্রীয় সমাজগুলোতে। কারণ, এ সমাজগুলোর ভিত্তি হয় রক্ত-সম্পর্ক এবং আত্মীয়তার বন্ধন। তবে এরচেয়েও শক্তিশালী বন্ধন হলো ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ, যার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় খুব অল্পসংখ্যক মুসলিমরা পরাজিত করতে পেরেছিলেন গোত্রীয় আরব মুশরিকদের। সামাজিক সংহতির এ ধারণার আলোকেই ইতিহাসের চক্রকে ইবনু খালদুন ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে,
.
শক্তিশালী সামাজিক সংহতি-সম্পন্ন জাতি আক্রমণ করে বিলাসব্যসনে মগ্ন, আধুনিক, শহুরে সভ্যতাকে। অধিকাংশ সময় এ আক্রমণকারীরা হয় রুক্ষ, যাযাবর, দরিদ্র। তাদের থাকে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বন্ধন, অধিকতর প্রাণশক্তি, মনোবল এবং তুলনামূলকভাবে অল্প বৈষয়িক সম্পদ। অন্যদিকে প্রচুর বিত্তবৈভবের মালিক হলেও জীবনের প্রতি নির্লিপ্ত উদাসীনতা আর আধ্যাত্মিক আলস্যে ভোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী। নিজেদের রক্ষা করার মতো সামাজিক সংহতি আর যুদ্ধংদেহী মনোভাব থাকে না তাদের। সুবিধাজনক শহুরে স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে এসবের প্রয়োজনও হয় না। তারা ব্যস্ত থাকে সস্তা সুখের নানা আয়োজনে, ভোগ আর অবক্ষয়ে।
.
অবধারিতভাবেই আক্রমণকারীরা বিজয়ী হয়, স্থাপন করে নিজেদের আধিপত্য। তারপর একসময় তারাও গা ভাসিয়ে দেয় সহজ জীবনের সহজিয়া আনন্দের স্রোতে। ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে তাদের সংহতি আর নৈতিক শক্তি, ভাঙন ধরে সমাজে। দিগন্তে উদয় হয় নতুন কোনো জাতি, নতুন কোনো আক্রমণকারী। চলতে থাকে পালাবদলের চক্র।
.
ইবনু খালদুন এর ভাষায়,

‘…বিলাসব্যসন চরিত্রের মধ্যে নানা প্রকার দোষ, শৈথিল্য ও বদভ্যাসের জন্ম দেয়… সুতরাং তাদের মধ্য থেকে সেই সচ্চরিত্র অন্তর্হিত হয়, যা একসময় তাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠার যোগ্য গুণ ও নিদর্শন হিসাবে গৃহীত হয়েছিল। তা ত্যাগ করে তারা যখন অসৎ চরিত্রে সুসজ্জিত হয়ে ওঠে, তখন স্বভাবতই ক্ষয় ও দুর্বলতার লক্ষণ প্রকাশ পায়। আল্লাহর সৃষ্টিতে এ নিয়মই বিদ্যমান। ফলে সাম্রাজ্যে ধ্বংসের প্রারম্ভ সূচিত হয়ে তার অবস্থা বিশৃঙ্খল হয় ওঠে এবং তার মধ্যে ক্ষয়ের সেই সুপ্রাচীন ব্যাধি দেখা দেয়, যাতে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে।’ [2]
.
নগরবাসীরা সর্বপ্রকার আমোদ-প্রমোদ, বিলাসব্যসন, পার্থিব উন্নতি লাভের আশা ও তাকে ভোগ করার স্পৃহা দ্বারা বেষ্টিত থাকে। এর ফলে তাদের জীবাত্মা অসৎ চরিত্র ও অন্যায় প্রসঙ্গের মধ্যে কলুষিত হয়ে ওঠে। এভাবে তারা যতই তাতে নিমজ্জিত হয়, ততই সৎপথ ও ন্যায়পন্থা থেকে দূরে সরে যায়। এমনকি এর ফলে তাদের মধ্যকার সংযমের আচার-আচরণও তাদের অবস্থাগুলোতে দুর্নিরীক্ষ্য হয়ে ওঠে। [3]
.
(বর্বর গোত্রগুলো) প্রাধান্য বিস্তারে অধিকতর ক্ষমতাশালী এবং অন্যদের নিকট যা কিছু আছে, তা ছিনিয়ে নিতে অধিকতর পারঙ্গম। যখনই তারা প্রাচুর্যের সাথে পরিচিত হয় এবং সচ্ছলতার মধ্যে জীবনের ভোগ-সম্ভোগে লিপ্ত হয়, তখনই তাদের প্রান্তরবাস ও বন্যপ্রকৃতি হ্রাস পাওয়ার অনুপাতে তাদের শৌর্যবীর্যও হ্রাস পায়। [4]
.
ইবনু খালদুনের এ বিশ্লেষণ থেকে বিজয়ী জাতির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। তারা হবে অধিকতর সামাজিক সংহতি, নৈতিক ও প্রাণশক্তির অধিকারী। অতি সংবেদনশীল আধুনিক রুচির বিচারে সম্ভবত একটু বেশি রুক্ষ ও কর্কশ। আমাদের কাছে তাদেরকে মনে হতে পারে পশ্চাৎপদ, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাদামাটা এমনকি উগ্র। মূল্যবোধ ও যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তারা কঠোর সংযমী, কট্টর। সভ্যতার বিলাসব্যসন, অবক্ষয় ও অধঃপতনের বিষ থেকে মুক্ত। যুদ্ধংদেহী, বেপরোয়া, লড়াকু, কষ্টসহিষ্ণু।
.
এখানে যে বিষয়টা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, অধঃপতিত সভ্যতাকে যারা জয় করে তারা চারিত্রিক দৃঢ়তা, অধিকতর সংহতি ও সামাজিক শক্তির কারণে বিজয়ী হয়। নিছক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ, অর্থনীতি কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হবার কারণে না। তাদের বিজয়ের কারণ হলো ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া। এ কারণেই অ্যামেরিকার পতনের পর বিশ্বমঞ্চে প্রধান শক্তি ও নতুন সাম্রাজ্য হিসেবে চীন কিংবা রাশিয়ার আবির্ভাবের ব্যাপারে অনেকের প্রচার করা ও পছন্দের বিশ্লেষণ ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত প্যাটার্নের সাথে মেলে না। অ্যামেরিকার পতন হলে চীন এবং রাশিয়ার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব নিঃসন্দেহে বাড়বে। একটা সময় পর্যন্ত, একটা নির্দিষ্ট মাত্রায়। কিন্তু শতবর্ষের নতুন সাম্রাজ্য ও সভ্যতা তারা গড়ে তুলবে পারবে বলে মনে হয় না। সভ্যতার পতন ও রূপান্তরের পর্যায়ে বড়জোর সাময়িক একটা ভূমিকা থাকতে পারে তাদের। কারণ, যে দুর্বলতাগুলো আধুনিক পশ্চিমে বিদ্যমান সেগুলো বিদ্যমান চীন এবং রাশিয়াতেও। এ যৌনবিকৃতি, এ উন্মাদনা, সামাজিক সংহতি ও শক্তির এ দারিদ্র্য থেকে তারা মুক্ত না। আজকের চীন এবং রাশিয়াকে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা বলা যায় না। চীন ও রাশিয়া আধুনিক পশ্চিমের মতো ইউরোপীয় শেকড় থেকে বের হয়ে আসেনি, তাদের আছে হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এটুকু পার্থক্য আছে। কিন্তু এ পার্থক্য কেবল সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত। আদর্শ, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বস্তুবাদী, ভোগবাদী, আত্ম-উপাসনায় মগ্ন আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অধিবাসীদের সাথে চীন কিংবা রাশিয়ার খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাই যুক্তি বলে এভাবে চললে তাদের পরিণতিও অভিন্ন হবার কথা।
.
একইভাবে এ বিশ্লেষণ অনুযায়ী পশ্চিমের চিন্তা ও পদ্ধতিগত অনুকরণ করে চলা মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলনগুলোর কাছ থেকেও বিজয়ের আশা করা যায় না। কারণ, এ আন্দোলনগুলো সভ্যতার ব্যাধি থেকে মুক্ত না, হতেও চায় না। বরং এ ধরনের চিন্তার লক্ষ্য হলো আরও বেশি করে চলমান বিশ্বব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানো, সিস্টেমের অংশ হওয়া। তারা সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম না। এবং ধীরে হলেও তারাও একসময় অবধারিতভাবে আক্রান্ত হবে সভ্যতার সুপ্রাচীন ব্যাধিতে। যার অনেক বাস্তব প্রমাণ এখনই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
.
আবারও বলছি, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না; গ্বাইবের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই। ইবনু খালদুনসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকদের তুলে ধরা বিশ্লেষণ সভ্যতার পালাবদলের ব্যাপারে আমাদের একটা জেনারেল থিওরি দেয়। কিন্তু প্রতিটি জাতির উত্থানপতন আর ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকের পেছনে সক্রিয় থাকে আরও অনেকগুলো ফ্যাক্টর। তাই মূল তত্ত্ব থেকে এদিক-সেদিক হতে পারে, হওয়াটাই স্বভাবিক। কিন্তু সার্বিকভাবে এ প্যাটার্ন টিকে থাকার কথা। সেই সাক্ষ্যই দেয় ৫,০০০ বছরের ইতিহাস। পাশাপাশি ৩০ বছরের ব্যবধানে আধুনিক চোখে রুক্ষ, উগ্র, যাযাবর, পশ্চাৎপদ কিছু মানুষের হাতে পরপর তিনটি যুদ্ধে আমাদের সময়ের দু-দুটো সুপারপাওয়ারের বিস্ময়কর পরাজয়ও সভ্যতার এ অমোঘ পালাবদলের প্রাথমিক পর্বের ইঙ্গিত দেয় কি না, সে প্রশ্নও করা যায়।
.
আল্লাহর নির্ধারিত সিদ্ধান্ত আসার আগে এ প্রশ্নগুলোর নিশ্চিত কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব না। বাস্তবতার আলোকে নিজস্ব বিবেচনাবোধ অনুযায়ী সম্ভাব্য উত্তরগুলো থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে আমাদের। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, পতনের কালে বেঁচে আছি আমরা। আমরা বেঁচে আছি মহাকাব্যিক পটপরিবর্তনের সময়ে, যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে আর তারপর ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতার নতুন সৌধ। কালের অমোঘ স্রোতে হারিয়ে জেতে না চাইলে ইতিহাসের ভাঙাগড়ার এ পর্বে, এ অবক্ষয়কালে একটা পক্ষ আমাদের বেছে নিতেই হবে।
.

[1] Sexual Personae, Camille Paglia (1990)
[2] ‘রাজশক্তির স্বভাব যখন গৌরব, বিলাসব্যসন ও স্থিরতায় সুদৃঢ় হয়, তখনই সাম্রাজ্যে ক্ষয় দেখা দেয়’,আল মুকাদ্দিমা, ইবনু খালদুন।
[3] ‘প্রান্তরবাসীরা নগরবাসীদের অপেক্ষা সততায় অধিকতর নিকটবর্তী’, প্রাগুক্ত
[4] ‘বর্বর জাতিগুলো প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষেত্রে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা অধিকতর ক্ষমতাবান’, প্রাগুক্ত

.
লেখক- আসিফ আদনান
বই- চিন্তাপরাধ 
.
বইটি অনলাইনে অর্ডার করার লিঙ্ক –
১) রকমারি- https://bit.ly/2VqfRsn
২) ওয়াফি লাইফ- https://bit.ly/2Hq1ocd

শেয়ার করুনঃ
ট্যাবু!!

ট্যাবু!!

১. তরী পেজের ভাইদের দীর্ঘশ্বাস-

.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
.
ঈসায়ি সন দু’ হাজার নয়। ক্লাস এইটে উঠলাম। বাড়ি থেকে অনেক দূরের এক স্কুলে ট্রান্সফার করা হলো আমায়। প্রথমবারের মতো হোস্টেল লাইফের অভিজ্ঞতা হলো। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম, পাশের সিটে দুজন নীল ছবি দেখছে। ভয়ংকর এক জগতের সাথে পরিচিত হলাম আমি। নীল দানব। পর্নোগ্রাফি
.
আমি আমার বন্ধুদের দেখেছি, মেয়ে ক্লাসমেইটদের নিয়ে সারাক্ষণ সেক্স ফ্যান্টাসিতে বুদ হয়ে থাকতে। বান্ধবীদের শারীরিক বিশ্লেষণে মগ্ন থাকতে দেখেছি। আমি তাদের দেখেছি ক্লাসের ম্যাডামদের নিয়ে সেক্স ফ্যান্টাসিতে ভোগতে। কে কাকে কল্পনা করে মাস্টারবেশন করেছে তা নিয়ে সময়ের পর সময় পার করতে দেখেছি। এছাড়াও এমন সব নির্লজ্জপনা দৃশ্য আমি দেখেছি যা বর্ণনা করা আমার দ্বারা সম্ভব না।
.
কেন তাদের চিন্তাভাবনা, চালচলন এমন হয়ে গেলো? কী তাদেরকে এমনসব বেহায়াপনার দাস বানিয়ে ফেললো? পর্নোগ্রাফি। হ্যাঁ, পর্নোগ্রাফি। আরও আছে চটিগল্প। চটিগল্প এতোটাই জঘন্য গল্প যে এখানে সম্পর্কের দেয়াল থাকে না। চটিগল্প পড়তে পড়তে, পর্ন দেখতে দেখতে ব্রেইনের স্ট্রাকচার-ই পাল্টে গেছে। মস্তিষ্ক হয়েছে বিকৃত। অন্তর হয়েছে দূষিত।
.
এই যে পর্নের ছড়াছড়ি, এটা কখনকার ঘটনা? এটা তখনকার ঘটনা যখন বাংলার মানুষ ‘ফোরজি’ তো দূরের কথা, ‘ফোরজি’ ব্যবহার করার স্মার্টফোনের কথাও চিন্তা করতো না। তখন ছিলো MP3, MP4 এর যুগ। এটা ২০০৯ সালের ঘটনা। আজ থেকে দশ বছর আগের কথা। দশ বছর আগেই যদি ক্লাস এইটের ছাত্রদের অবস্থা এই হয়, তাহলে দশ বছর পর আজকে তা কোথায় পৌঁছেছে?
.
কিছুদিন আগে আমরা ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে এন্টিপর্ন ক্যাম্পেইন করার জন্য গিয়েছিলাম। কর্তৃপক্ষের অনুমতি চাইতে গেলে জনৈক ভদ্রলোক ভেটো দিয়ে বলেছিলেন, “মাধ্যমিকের ছেলেরা এসব (পর্নগ্রাফি) সম্পর্কে জানেনা। জানলেও দুই একজন।” উনার এই কথা দুঃখজনক নয়। এটা কমেডি। এটা হাইস্যকর।

 

২. ‘পর্ন নিয়ে কথা বলায় চিন্তিত সমাজ’ এর উদ্দেশ্যে Lost Modesty Supporting Team Chittagong University ভাইদের কিছু বার্তা-

.
আসুন পড়ি:
.
রংপুর নগরীতে প্রথম শ্রেণীর এক শিশু মেয়েকে গণধর্ষণ করেছে তিনজন শিশু।তাদের বয়স যথাক্রমে ৯,১০ ও ১১ বছর। আর মেয়ে শিশুটির বয়স ছিলো ৬ বছর! রংপুর মহানগরীর হাজিরহাট থানার ২নং ওয়ার্ডের পূর্ব গোয়ালু গ্রামে ঘটে ঘটনাটি। (https://tinyurl.com/y6kkzsqr)
.
আজকে আমার ৯ম শ্রেণীতে পড়ুয়া স্টুডেন্টের সিলেবাস দেখতে গিয়ে তার শারীরিক শিক্ষা না জানি কি একটা বইয়ে ‘বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রজনন প্রক্রিয়া’ টাইপ কিছু একটা চোখে পড়লো। যতটুকু জানি বর্তমানে ক্লাস ৮ম এর নিচেও এসব নিয়ে পাঠ্য বইয়ে আলোচনা করা হয়।
.
২০১২ সালের কথা। তখন আমি ৯ম শ্রেণীতে পড়তাম। তখন জীববিজ্ঞান বইয়ে ব্যাঙের একটি অধ্যায় ছিলো সেখানে ব্যাঙের প্রজনন নামে একটি টপিক ছিলো। লেখা ছিলো এরকম যে, ‘প্রজননের সময় সঙ্গমকরার জন্য ব্যাঙ ঘেঙর ঘেঙর করে ডাকে…….’
আমাদের যে স্যার ছিলেন তিনি আমাদের ব্যাঙ অধ্যায়টি পড়ানোর সময় এই টপিকটি পড়াননি। এড়িয়ে গিয়েছিলেন। আমরাও স্যারকে বলিনি। নিজেরা বুঝে নিয়েছিলাম।
.
বর্তমানে যুগ পাল্টেছে। এখন ব্যাঙ পড়তে হয়না। সরাসরি বাচ্চারা ‘মানুষ’ পড়ে। মানুষের প্রজনন পড়ে। জানা ও পড়াটা দোষের নয়। কিন্তু সেটা সময় যখন হবে তখন জানুক না। কিন্তু পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চাগুলোকে মাল্টিমিডিয়া দিয়ে বয়ঃসন্ধিকাল বুঝানোর মানে কি!
.
#লস্টমডেস্টি‘র কাজ করার সময় মাঝে মাঝে যখন মানুষকে লিফলেট বিতরন করি। পেজ থেকে কিছু বলা হয় তখন অনেক মানুষই অভিযোগ করেন যে,’আমাদের কাজের জন্য ছোট ছোট বাচ্চাদের হিতে বিপরীত হয়ে যাচ্ছেনা তো আবার! ফেসবুক ও ইউটিউবে অনেক টিনেজার আছে।তারা আমাদের এসব কাজ দেখে কৌতুহলী হয়ে যাচ্ছেনাতো আবার?!’
.
আমরা যখন কাজ করতে যাই তখন হিতে বিপরীত হয়ে যায়। অথচ স্কুলে পিচ্ছি পিচ্ছি বাচ্চাগুলোকে যখন বয়ঃসন্ধিকাল পড়ানো হয় সেটাতে সমস্যা হয় না!
.
প্রগতিশীল ভাই আমার। বলুন তো এই যে শিশু ছেলে গুলো ধর্ষণ করেছে তার কারণ কি? তারা ধর্ষণ জিনিসটা সম্পর্কে বুঝলো কি করে? এই বয়সে একটা মেয়েইবা চিনলো কি করে? এই বাচ্চা ছেলেগুলোর কি মনমানসিকতা দোষ? নারী শরীরের প্রতি লোভ টা দোষ?
উত্তরগুলো দিন যদি পারেন।
বলুন কি দায়ী এসবের জন্য? কে দায়ী?
.
এখন তো মোবাইলে দুই টিপ দিলেই দুধের বাচ্চাও পর্নো সাইটে প্রবেশ করতে পারে। তাইলে দোষ কিসের? আপনার কি করণীয়?

.

অবশ্যই দেখুন- পতনের আওয়াজ পাওয়া যায় 
পর্নোগ্রাফি-মাস্টারবেশন এর কুফল নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে চাইলে পড়ুন- আলোর মিছিল

 

শেয়ার করুনঃ
সভ্যতা ও অবক্ষয় ১ – বংশগতি

সভ্যতা ও অবক্ষয় ১ – বংশগতি

খবরগুলো নিয়মিত বিরতিতে সামনে আসে। পশ্চিমের নানা যৌন বিকৃতির বিচিত্র সব গল্প। সমকামিতা, উভকামিতা, শিশুকামিতা, পশুকামিতা, ট্র্যান্সজেন্ডার আরো কতো কী। আমরা হেসে এড়িয়ে কিংবা ভুলে যাই। অথবা পশ্চিমাদের অসভ্যতা নিয়ে ধরাবাঁধা কিছু কথা বলি। অন্য কিছু খবরও নিয়মিত বিরতিতে চোখে পড়ে। দেশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ডিভোর্স, গর্ভপাত আর লিভ টূগেদার নিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ বিভিন্ন প্রতিবেদন। মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায় লেইট নাইট পার্টি, কিংবা সমকামিদের বিভিন্ন ‘গেট টুগেদারের’ কথা। আর প্রতিনিয়তই, পত্রিকায়, রাস্তায়, বিলবোর্ডে, টিভি স্ক্রিনে, ব্রাউযার খুললেই চোখে পড়ে নতুন কোন বিজ্ঞাপন, সাহসি কোন সিনেমা কিংবা দৃশ্য নিয়ে প্রতিবেদন, ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, নারী দেহের পণ্যায়ন, নারীর নিজেকে প্রদর্শন, আদিম হাস্যরসে মেতে ওঠা আড্ডবাজদের হাসি, পথচারীর আড়চখের দৃষ্টি, পুঁজিবাদের যৌনকরন, হুকআপ কালচার নিয়ে জমে ওঠা অনলাইন বিতর্ক, ভাইরাল কোন ভিডিও, কিংবা কোন সুশীল বুদ্ধিজীবির কলাম – চোখ খুললেই চোখে পড়ে যৌনতা নিয়ে অবসেসড, যৌনন্মাদ এক সমাজ।
কেন?
.
.
যৌনতার ব্যাপারে বর্তমানে আমরা যেসব প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করা, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ধরাবাঁধা কিছু কথা বলে দায়িত্ব শেষ করা সহজ। নৈতিক এই বিপর্যয়কে দেখিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার নোংরামি তুলে ধরা কার্যকর। কিন্তু এই অবস্থা যে আরো গভীর ও মৌলিক কোন সমস্যার উপসর্গ এবং এই বাস্তবতা যে আরো কঠিন কোন পরিনতির ইঙ্গিত বহন করে – সেটা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, অথবা আমরা বিষয়টাকে সেভাবে দেখি না। সেই গভীর ও মৌলিক সমস্যা, সেই কঠিন পরিণতি কী – সেই আলোচনায় আমরা যাবো। তবে তার আগে আমাদের জানতে ঠিক কিভাবে, কোন পথে আমরা আজকের এই অবস্থায় এসে পৌছলাম।
.

‘বিপ্লবের’ বংশগতি

.
যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে আজ আমরা যে অবস্থা দেখছি – সমকামি ‘বিয়ের’ আইনী স্বীকৃতি, সমকামিতাকে প্রশংসনীয় সাব্যস্ত করা, ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট, বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভূত যৌনতার ব্যাপক প্রচলন, ব্যাপক গর্ভপাত, বিয়ে ও পরিবারের পবিত্রতা – এগুলোর ব্যাপারে সাধারন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শিশুকাম, পশুকাম, অজাচারসহ বিভিন্ন বিকৃতির স্বাভাবিকীকরনের চেষ্টা – এই সবকিছুই ষাট ও সত্তরের দশকের সেক্সুয়াল রেভোলুশান এর ফসল।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং সাদা ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে অ্যামেরিকার। এ সময়কার প্রজন্মকে বলা হয় ‘দা গ্রেইটেস্ট জেনারেইশান’। ১৯০০ থেকে ১৯২০ এর মাঝে জন্ম নেয়া এই ‘গ্রেইটেস্ট জেনারেশনই দূরদেশে গিয়ে লড়াই করেছিল বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বদলে দেয়া মহাযুদ্ধে। আর যারা দেশে ছিল তারা সচল রেখেছিল যুদ্ধকালীন অর্থনীতির চাকা। মহাযুদ্ধের বিজয়ী এ প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল বিশের দশকের ভয়ঙ্কর মন্দা, নানা সামাজিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। এ প্রজন্ম ছিল পরিশ্রমী, বাস্তবমুখী এবং তাদের নৈতিকতা ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক প্রগাঢ় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঝড় সবকিছু আমূল বদলে দেয়। পঞ্চাশের দশকের বিট জেনারেইশান আর ষাটের দশকের হিপি মুভমেন্ট আগের প্রজন্মের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চিন্তাগুলোকে আক্রমন করতে শুরু করে। রক অ্যান্ড রৌল, হলিউড, প্লেবয়, পেন্টহাউস, অ্যাকাডেমিয়া আর ম্যাস মিডিয়ার মাধ্যমে চলতে থাকে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ‘মহান’ প্রজন্মের সন্তানরা বেড়ে ওঠে জীবন ও নৈতিকতার প্রতি সম্পূর্ণ নতুন, প্রায় বিপরীতমুখী এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।। চিন্তা, চেতনা, আদর্শ ও দর্শনে দুই প্রজন্মের মাঝে তৈরি হয় এক গভীর বিভাজন। আর এর এ বিভক্তি তুঙ্গে পৌছায় সেক্সুয়াল রেভোলুশানের মাধ্যমে, যখন যৌনতার ব্যাপারে গ্রেইটেস্ট জেনারেশানের ধর্মীয় নৈতিকতা ছুড়ে ফেলে অ্যামেরিকা আলিঙ্গন করে নেয় ফ্রি সেক্সের প্যাইগান দর্শনকে। এ প্রজন্মের চিন্তায় গেথে যায় সব ধরনের যৌনাচার আর বিকৃতির অবাধ প্রচলন ও বৈধতার এক দর্শন। পরবর্তী ৫০ বছরে এই সেক্সুয়াল রেভোলুশনেরই নানা ফসল বিভিন্নভাবে আমাদের আজকের এই বাস্তবতাকে তৈরি করেছে।
.
ষাটের দশকের শেষদিকে শুরু হওয়া সেক্সুয়াল রেভোলুশানের ভিত কিন্তু স্থাপিত হয় আরো আগে। সেক্সুয়াল রেভোলুশান নামের সভ্যতার অবৈধ এ সন্তানের বংশগতি খুব সংক্ষেপে ও সিমপ্লিফাই করে এভাবে উপস্থাপন করা যায় –
মানুষের মনোদৈহিক প্রায় সব ধরনের সমস্যার কারন হিসেবে অবদমিত কামনাবাসনা তথা যৌনতাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে সেক্সুয়াল রেভ্যুলুশানের প্রাথমিক কাঠামো দাড় করায় সাইকোঅ্যানালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। মানুষের ব্যাক্তিত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, অনুপ্রেরণা – প্রায় সবকিছুর পেছনে ফ্রয়েড যৌনতা খুজে পায়। ফ্রয়েডের মতে মানবজীবনের সব আনন্দ ও কষ্টের সম্পর্ক লিবিডোর (যৌনতাড়না) সাথে। এমনকি শিশুকেও ফ্রয়েড আবিস্কার করে যৌন প্রাণী হিসেবে। ফ্রয়েডের চিন্তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় উইলহেম রাইশ এবং হার্বার্ট মারকিউসের মতো লোকেরা। তবে ফ্রয়েডের তৈরি করা কাঠামো ওপর দাঁড়িয়ে যে মানুষটি সত্যিকার অর্থে সেক্সুয়াল রেভোলুশান এবং আমাদের আজকের এই যৌনন্মাদ সমাজের জন্ম দেয় তার নাম অ্যালফ্রেড কিনসি। রকাফেলার ফাউন্ডেইশানের সমর্থন নিয়ে কিনসি ফ্রয়েডের চিন্তার সাথে যুক্ত করে নতুন এক দিক।
.
কিনসি দাবি করে মানুষের যৌনতা নির্দিষ্ট কোন কাঠামোতে আবদ্ধ না। মানব যৌনতা ক্রমপরিবর্তনশীল, বহমান। কিনসির মতে, যৌনতার ক্ষেত্রে ন্যায়অন্যায়ের কোন ধারণা নেই। যৌনতা সাদাকালো বাইনারি কোন সিস্টেম না, বরং মানুষের যৌনতা রংধনুর মতো। এখানে আছে অনেক রঙ, অনেক মাত্রা। রংধনুর একপ্রান্তে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা আর অন্য প্রান্তে সমকামিতা। এ দুইয়ের মাঝে আছে শিশুকামিতা, পশুকামিতা, উভকামিতা থেকে শুরু করে সবধরনের ফেটিশ, সবধরনের বিকৃতি। সমাজের মানুষেরা একেকজন এই স্পেকট্রাম বা বর্ণালীর মধ্যে বিভিন্ন অবস্থানে থাকতে পারে। আবার একজন মানুষ তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই বর্নালীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারে। তবে কিনসির মতে অধিকাংশ মানুষ দুই প্রান্তের মাঝামাঝি অবস্থানের দিকে থাকে, অর্থাৎ উভকামিতায়। কিন্তু সমাজ, সংস্কার ও ধর্মের মাধ্যমে আরোপিত নৈতিকতার কারনে মানুষ এই স্বাভাবিক অবাধ যৌনতার প্রবণতাকে চেপে রাখে। একে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে অথবা নিজের আসল যৌনাচারকে গোপন রেখে সমাজের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাভাবিকতার মুখোশ পড়ে থাকে। পাশাপাশি কিনসি তার কুখ্যাত দুটি বইয়ের (Sexual Behavior In The Human Male/Female) মাধ্যমে ‘প্রমান’ করে দেখায় যে যেগুলোকে আমরা বিকৃত যৌনতা বলি সেগুলো আসলে অনেক বেশি প্রচলিত। সমকামিতা, উভকামিতা, বহুগামিতাসহ – অনেক কিছুই সমাজের অনেকেই করে। কিন্তু তারা সেটা গোপন রাখে। ঐ যে, পাছে লোকে কিছু বলে!
.
এই দাবির পক্ষে কিনসি বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। যদিও কিনসির উপস্থাপিত পরিসংখ্যান দিয়ে তার দাবি প্রমানিত হয়, কিন্তু আসল ফাকিটা ছিল তার পরিসংখ্যানেই। কিনসি যাদের সাক্ষাতকার নিয়েছিল তাদের মধ্যে বিশাল একটি অংশ ছিল পতিতা, সমকামি পুরুষ পতিতা (পতিত?), সমকামি, যৌন অপরাধের কারনে কারাভোগকারী, এবং পেডোফাইল। অর্থাৎ কিনসি প্রশ্ন করার জন্য এমনভাবে মানুষ বেছে নিয়েছিল যাতে বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত মানুষদের অনুপাত বেশি হয়।
.
ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা করুন। আপনি যদি চুরির ওপর বাংলাদেশের ১০০ জন মানুষের ওপর জরিপ চালান, আর ইচ্ছে করেই সেখানে ৫০ জন চোরকে রাখেন তাহলে অবশ্যই আপনার জরিপের ফলাফলে দেখা যাবে বাংলাদেশের প্রায় ৪০-৫০% মানুষের মধ্যে চুরির প্রবণতা আছে। কিনসি ঠিক এ কাজটাই করেছিল।
.
তবে এই আমরা এখন বলতে পারলেও কিন্তু গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ কাজটা এতোটা সহজ ছিল না। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আর পঞ্চাশের দশকে কিনসির ‘রিসার্চ’ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। রকাফেলার ফাউন্ডেশানের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও সমর্থনে অ্যামেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে কিনসি নানা সেমিনারে নিজের আবিস্কৃত ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’গুলো প্রচার করে দাঁড়ায়। তার বইগুলো পরিণত হয় বেস্টসেলারে এবং কিনসির এই জালিয়াতি ভরা গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি। কিনসির উপসংহারের ওপর ভিত্তি করে স্কুলের যৌনশিক্ষা বই এবং আইন পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়। সেক্সুয়াল রেভলুশানের দুজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার, প্লেবয় ম্যাগাযিনের হিউ হেফনার এবং সমকামি অধিকার আন্দোলনের হ্যার হেই- গভীরভাবে কিনসির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। দুজনের ভাষ্যমতেই কিনসি Sexual Behavior In The Human Male – বইটি ছিল তাদের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট, এবং এই বইটি পড়ার পরেই তারা নিজেদের জীবনের গতিপথ বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
.
কিনসির দেয়া ন্যায়অন্যায় থেকে মুক্ত যৌনতার বর্ণালীতে নতুন একটি অক্ষ যোগ করে জন্স হপকিন্সের ড. জন মানি। যৌনতা (sexual preference), লিঙ্গ (gender) ও লৈঙ্গিক পরিচিতি (gender identity) – এর মাঝে মানি পার্থক্য খুজে বের করে। মানুষের যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় জন্মগতভাবে নির্ধারিত না। মানুষের ধরাবাঁধা কোন যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় নেই। যৌনতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক বিকৃতি, অবিকৃতি বলে কিছু নেই –আধুনিক যৌনতার ধারনায় এই চিন্তাগুলো যুক্ত করার মাধ্যমে জন মানি বর্তমানের ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের মূল দাবিগুলোর ব্যাখ্যা তৈরি করে। অন্যদিকে ফ্রয়েড, মার্ক্স আর রাইশের চিন্তার সমন্বয় করার মাধ্যমে কালচারাল মার্ক্সিসম ও আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ছাঁচে সমকামিতা সহ অন্যান্য বিকৃত যৌনাচারের স্বাভাবিকীকরনের আন্দোলনের জন্য একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করে ফ্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের হার্বাট মারকিউস।
.
কিনসি ও বিশেষ করে মানির কাছ থেকে আসা ধারণাগুলো লুফে নেয় ষাট ও সত্তরের দশকে তুঙ্গে থাকা ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট। এই যে “বৈজ্ঞানিক প্রমান’ পাওয়া গেছে, নারী ও পুরুষ আসলে একই। তাদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। পুরুষ যা পারে নারীও তা পারে। পুরুষ ও নারীর চিন্তা, সামর্থ্য, সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকার যে পার্থক্য সমাজে আছে তা জোর করে চাপিয়ে দেয়া। পুরুষতন্ত্রের মাধ্যমে এসব ধারণা গড়ে উঠেছে।। যুগে যুগে পুরুষরা ষড়যন্ত্র করে এসবের মাধ্যমে নারীদের ঘরে বেধে রেখেছে। প্রথা, ধর্ম, সংস্কার ইত্যাদিকে তারা ব্যবহার করেছে নারীদের আবদ্ধ রাখার জন্যে।।
.
নারীবাদে এসে সাইকোলজি, সেক্সোলজি, বিকৃতি, মানবিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির অদ্ভূত এক জগাখিচুড়ি তৈরি হয়। যৌনতা, পরিবার, মানবপ্রকৃতিসহ যেকোন কিছুকেই নির্দিষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ফসল হিসেবে দেখানোর পোস্টমর্ডানিস্ট যুক্তিও তারা গ্রহন করে। যার ফলে এ বিষয়গুলোর ব্যাপারের প্রতিষ্ঠিতই ধারনাগুলোকে আউটডেইটেড বলে নাকচ করে দেয়া সম্ভব হয়। এর সাথে আরো যুক্ত হয় আপেক্ষিত নৈতিকতা (moral relativism) ও এবং কোন চিরন্তন সত্যের অস্তিত্ব থাকাকে অস্বীকার করার প্রবণতা। ভালো ও খারাপের কোন ধরাবাধা সংজ্ঞা নেই, মানুষই ভালোমন্দের তৈরি করে। সময়ের সাথে ভালো ও খারাপ বদলাতে থাকে। সকল সত্যই আপেক্ষিক, প্রতিটি সত্যই কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও শক্তির কাঠামোর সাপেক্ষে সত্য – আপেক্ষিক নৈতিকতা ও আপেক্ষিত সত্যের অপ্রকৃতস্থ ধারনার ওপর গড়ে ওঠা এসব পোস্টমর্ডানিস্ট তর্কের মাধ্যমে সম্ভব হয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক, বিকৃতি এমনকি বায়োলজিকেও একপাশের সরিয়ে রাখা। ধাপে ধাপে ডিকন্সট্রাক্ট করা হয় গ্রেইটেস্ট জেনারেইশনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দর্শনকে।
.
নারীবাদ আক্রমন করে পরিবারকে। কারন পরিবার হল পুরুষতন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার। পরিবার একটি ‘পুরুষতান্ত্রিক’ কাঠামো যার উদ্দেশ্য নারীকে ঘরে আটকে রেখে পুরুষের আধিপত্য নিশ্চিত করা। নারীবাদ নারীকে শেখাতে শুরু করে, ‘একজন নারীর পুরুষের কোন দরকার নেই। প্রয়োজন নেই পরিবারের মধ্যে নিজের পরিচয় বা পূর্ণতা খোজার। সন্তান তোমাকে শুধু আরো পিছিয়ে দেবে। বরং তোমার উচিত নিজের স্বাতন্ত্র্য, নিজের ব্যাক্তিত্ব, নিজের ক্যারিয়ারের মাঝে সাফল্য খোঁজা। আর শরীরের চাহিদা? সেক্স? তার জন্য বিয়ের কী দরকার? সেক্স শুধু শরীরের জন্য, আনন্দের জন্য। যা ইচ্ছে করো, কিন্তু এর সাথে আর কোন কিছু জড়ানোর প্রয়োজন নেই। বহুগামীতাকে স্বাধীনতা হিসেবে দেখার এই প্রবনতাও নারীবাদ গ্রহন করে সেক্সুয়াল রেভোলুশানের কাছ থেকে। নারীবাদের ভাষায় বার্থ কন্ট্রোল পিলসহ অন্যান্য জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ও যেকোন সময়ে গর্ভপাতের সুযোগ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারীকে সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়। আর এভাবেই সব শেকল থেকে মুক্ত হয়ে যৌনতা পরিণত হয় নিছক আনন্দের এক অতৃপ্ত অন্বেষণে।
.
ষাটের দশকের শেষদিকে এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে শুরু হওয়া ফ্রি লাভ/ফ্রি সেক্স মুভমেন্ট ও সমকামি অধিকার আন্দোলনও পুরোপুরিভাবে এই বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করে। তাদের জন্য এটা একটা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল। প্রচলিত পরিবার কাঠামো, নৈতিকতা, যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি – এসবকিছুই সমকামি ও অন্যান্য বিকৃতকামীদের আচরন ও দর্শনের সাথে মেলে না। কিন্তু সমকামিতা বা বিকৃতকামিতার জায়গা থেকে পরিবার বা নৈতিকতার সমালোচনা করা স্ট্র্যাটিজিকালি ভুল। এতে করে সমকামিরা যে অচ্ছুৎ, সমাজবিরোধী – এই ধারনাই আরো শক্ত হবে। কিন্তু স্ট্র্যাটিজিক হিসেবনিকেশের কারনে সমকামিরা যা প্রকাশ্যে বলতে পারছিল না, খুব সহজ সেই কাজটা করতে পারছিল নারীবাদীরা। তাই সমকামি আন্দোলনের সাথে নারীবাদীদের জোট বাধা ছিল যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক। এই দুই আন্দোলন আজও হাতেহাত রেখেই চলছে।
.
ষাট ও সত্তরের দশকে যা ছিল (নৈতিকতা, পরিবার, যৌনতা ইতাদির ব্যাপারে) খুব র‍্যাডিকাল ‘বিপ্লবী চিন্তা, পরের দশকগুলোতে সেগুলোই ধীরে ধীরে স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়। কিনসি, মানি ও মারকিউসদের দর্শন আর ফেমিনিস্ট থিওরিগুলো অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে শেখানো হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ওপর এই চিন্তাধারা প্রায় একচ্ছত্র আধিপ্ত্য বিস্তার করে। আর বিভিন্নভাবে সাধারন মানুষের চিন্তায় এ বিশ্বাসগুলো গেথে দিতে থাকে ম্যাস মিডিয়া। এই কলুষিত দর্শন, চিন্তার বিকৃতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা বিশ্বে।
.
এই মিশ্রণ থেকেই একসময় বের হয়ে আসে হেজেমনিক ও টক্সিক ম্যাস্কিউলিনিটি – এর ধারণা। টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটির এ তত্ত্ব দাবি করে, যা কিছুকে স্বাভাবিকভাবে পুরুষালি বলে গণ্য করা হয়, যেসব আচারআচরণ ও বৈশিষ্ট্যকে সমাজ পুরুষোচিত বলে উপস্থাপন করে, তার সবই বিষাক্ত। কারণ পুরুষত্বের এই ধারণা তৈরিই হয়েছে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। এই ‘পুরুষত্ব’ মানবতার জন্য ক্ষতিকর। সত্ত্বাগতভাবেই এই ‘পুরুষ’ অত্যাচারী, সম্ভাব্য ধর্ষক, সমাজ ও সভ্যতাকে কলুষিতকারী। এভাবে নারীবাদ পুরুষত্বের ধারণাকেই আক্রমন করে বসে আর এর মাধ্যমে অনিচ্ছায় ও অজান্তে আক্রমন করে নারীত্বকেও। এ পর্যায়ে এসে নারীবাদ দাবি করে, যা কিছু নারীসুলভ বলে স্বীকৃত তা আসলে পুরুষতন্ত্রের ফসল। নারী তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে, যখন সে পুরুষতন্ত্রের তৈরি ছাঁচ থেকে বের হতে পারবে। আর পুরুষের প্রায়শ্চিত্ত তখনই পূর্ণ হবে যখন সে সমাজস্বীকৃত পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্য ঝেড়ে ফেলবে আর নিজের পুরুষ পরিচয় আর ঐতিহাসিক ‘অপরাধের’ কারনে লজ্জিত হবে। তাই – যদি পুরুষ কতৃত্বশীল হয় তাহলে সে অত্যাচারী। যদি সে দৃঢ়চেতা হয়, সমাজস্বীকৃত পুরষোচিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয় তাহলে সে নারীর ওপর অত্যাচার ও শোষণের এই ফ্রেইমওয়ার্কের একটি অংশ। একইভাবে, যদি নারী সাবমিসিভ হয় তাহলে সে পুরুষতন্ত্রের গোলাম, ব্রেইনওয়াশড। যদি নারী মা ও স্ত্রী হিসেবে নিজের পরিচত বেছে নেয় তাহলে সে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্রের ফসল। যদি পুরুষ বিশ্বস্ততা আশা করে তাহলে সেটা ভন্ডামি, যদি নারী বিশ্বস্ত থাকতে চায় তাহলে সে মানসিক দাসত্বের স্বীকার।
.
নৈতিকতা, যৌনতা ইত্যাদির ব্যাপারে যতো ধারণা আছে, ভালোমন্দ, বৈধ-অবৈধ, বিকৃতি, স্বাভাবিকতা – সব কিছুই কলুষিত পুরুষতন্ত্র এবং ঐতিহাসিক শোষণ ও নির্যাতনের ফসল। সমকামিতা তাই শুধু যৌন সুখের সন্ধান না বরং নিজের স্বাধীনতার প্রয়োগ, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। একইভাবে বহুগামী নারী হল আধুনিক এক বিপ্লবী। আর দৃষ্টিকোণ সবচেয়ে বড় বিপ্লব হল অ্যান্ড্রোজিনি – ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট – কারন এ আন্দোলন সব প্রথা, প্রচলন আর কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে। পুরুষত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে পথের শুরু তার পরিসমাপ্তি অ্যান্ড্রোজিনি। টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটি তত্ত্বের ফসল হল ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট।
.
এখানে একটি বিষয় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবিতে বিকৃতকামীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে – ব্যাপারটা এমন না। সব সমাজেই এরা খুব ছোট একটা মাইনরিটি। কিন্তু পার্থক্য হল যৌনতার ব্যাপারে তাদের ধ্যানধারনাগুলো বিপুল সংখ্যক মানুষ মেনে নিয়েছে। মোটা দাগে এই সভ্যতা যৌনতার ব্যাপারে এই দর্শনকে গ্রহন করেছে। যৌনতাকে এখন এভাবেই দেখা হচ্ছে, সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। সমকামি অধিকার, ট্র্যান্সজেন্ডার অধিকারের নামের এসব বিকৃতির স্বাভাবিকীকরনের কাজ করা হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। আর এভাবেই এই বিকৃতি ও অবক্ষয় সমগ্র সভ্যতার ওপর নিয়ন্ত্রন অর্জন করেছেন।
.
এভাবেই আমরা এমন এক বিচিত্র সময়ে এসে পৌছেছি যখন ৫২ বছর বয়েসি ছয় সন্তানের বাবা নিজেকে ৬ বছরের বাচ্চা মেয়ে দাবি করে। যখন ৩০ বছরের এক মহিলা প্রথমে নিজেকে পুরুষ দাবি করে আর তারপর পুরুষ কুকুর। যখন ২৮টি দেশে সমকামি ‘বিয়ে’কে বৈধতা দেয়া হয়। যখন শিশুকামিতা ও পশুকামিতাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যখন সেইডম্যাসোকিযম, বন্ডেজ, জেন্ডার গেইমসসহ নানা বিকৃতির প্রকাশ্যে উৎসব হয়। যখন আমেরিকাতে বছরে সাড়ে ছয় লক্ষ আর বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ৭ লক্ষের ওপর গর্ভপাত হয়[1]। যখন বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভুত যৌনতা সামাজিক নিয়মে পরিনত হয়। যখন সিনেমা, সাহিত্য, টেলিভিশন, ইউটিউব সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে নকশা, অধুনা, আর পরামর্শের কলাম সন্তান আর সন্তানদের অভিভাবককে শিখিয়ে দেয় উঠতি বয়সে ‘প্রেম করা’ আর ‘শারীরিক ঘনিষ্ঠতা’ – স্বাভাবিক একটি ব্যপার। আর যখন এমন কিছু ঘটে যা পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো ঘটেনি – পর্নোগ্রাফি ঢুকে পড়ে প্রতিটি ঘরে, চলে আসে প্রতিটি মানুষের হাতের নাগালে, পরিণত হয় শত বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক ইন্ডাস্ট্রিতে। আর সেক্সুয়াল রেভোলুশানের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে অ্যামেরিকার কিন্ডাগার্টেন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ‘অধুনা’ এর পাতাতে।
এ তো গেল আমাদের বর্তমান আর এই বর্তমানের শেকড়ের কথা। কিন্তু এই বাস্তবতা কীসের উপসর্গ? আর এ বর্তমান কোন ভবিষ্যতের আভাস দেয়? এ প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। বর্তমানকে দেখতে হবে ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে।
.
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
লিখেছেন- আসিফ আদনান
____________________________________________
Footnote: The British Broadcasting Corporation (BBC) wants lesbians, gays, bisexuals and the transgendered to be seen twice as much on TV as they are in real life within the next two years. It’s all part of a move by the BBC, the world’s biggest public broadcasting corporation, to “increase diversity on and off air to reflect and represent today’s UK.” [2]
শেয়ার করুনঃ