ট্যাবু!!

ট্যাবু!!

১. তরী পেজের ভাইদের দীর্ঘশ্বাস-

.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
.
ঈসায়ি সন দু’ হাজার নয়। ক্লাস এইটে উঠলাম। বাড়ি থেকে অনেক দূরের এক স্কুলে ট্রান্সফার করা হলো আমায়। প্রথমবারের মতো হোস্টেল লাইফের অভিজ্ঞতা হলো। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম, পাশের সিটে দুজন নীল ছবি দেখছে। ভয়ংকর এক জগতের সাথে পরিচিত হলাম আমি। নীল দানব। পর্নোগ্রাফি
.
আমি আমার বন্ধুদের দেখেছি, মেয়ে ক্লাসমেইটদের নিয়ে সারাক্ষণ সেক্স ফ্যান্টাসিতে বুদ হয়ে থাকতে। বান্ধবীদের শারীরিক বিশ্লেষণে মগ্ন থাকতে দেখেছি। আমি তাদের দেখেছি ক্লাসের ম্যাডামদের নিয়ে সেক্স ফ্যান্টাসিতে ভোগতে। কে কাকে কল্পনা করে মাস্টারবেশন করেছে তা নিয়ে সময়ের পর সময় পার করতে দেখেছি। এছাড়াও এমন সব নির্লজ্জপনা দৃশ্য আমি দেখেছি যা বর্ণনা করা আমার দ্বারা সম্ভব না।
.
কেন তাদের চিন্তাভাবনা, চালচলন এমন হয়ে গেলো? কী তাদেরকে এমনসব বেহায়াপনার দাস বানিয়ে ফেললো? পর্নোগ্রাফি। হ্যাঁ, পর্নোগ্রাফি। আরও আছে চটিগল্প। চটিগল্প এতোটাই জঘন্য গল্প যে এখানে সম্পর্কের দেয়াল থাকে না। চটিগল্প পড়তে পড়তে, পর্ন দেখতে দেখতে ব্রেইনের স্ট্রাকচার-ই পাল্টে গেছে। মস্তিষ্ক হয়েছে বিকৃত। অন্তর হয়েছে দূষিত।
.
এই যে পর্নের ছড়াছড়ি, এটা কখনকার ঘটনা? এটা তখনকার ঘটনা যখন বাংলার মানুষ ‘ফোরজি’ তো দূরের কথা, ‘ফোরজি’ ব্যবহার করার স্মার্টফোনের কথাও চিন্তা করতো না। তখন ছিলো MP3, MP4 এর যুগ। এটা ২০০৯ সালের ঘটনা। আজ থেকে দশ বছর আগের কথা। দশ বছর আগেই যদি ক্লাস এইটের ছাত্রদের অবস্থা এই হয়, তাহলে দশ বছর পর আজকে তা কোথায় পৌঁছেছে?
.
কিছুদিন আগে আমরা ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে এন্টিপর্ন ক্যাম্পেইন করার জন্য গিয়েছিলাম। কর্তৃপক্ষের অনুমতি চাইতে গেলে জনৈক ভদ্রলোক ভেটো দিয়ে বলেছিলেন, “মাধ্যমিকের ছেলেরা এসব (পর্নগ্রাফি) সম্পর্কে জানেনা। জানলেও দুই একজন।” উনার এই কথা দুঃখজনক নয়। এটা কমেডি। এটা হাইস্যকর।

 

২. ‘পর্ন নিয়ে কথা বলায় চিন্তিত সমাজ’ এর উদ্দেশ্যে Lost Modesty Supporting Team Chittagong University ভাইদের কিছু বার্তা-

.
আসুন পড়ি:
.
রংপুর নগরীতে প্রথম শ্রেণীর এক শিশু মেয়েকে গণধর্ষণ করেছে তিনজন শিশু।তাদের বয়স যথাক্রমে ৯,১০ ও ১১ বছর। আর মেয়ে শিশুটির বয়স ছিলো ৬ বছর! রংপুর মহানগরীর হাজিরহাট থানার ২নং ওয়ার্ডের পূর্ব গোয়ালু গ্রামে ঘটে ঘটনাটি। (https://tinyurl.com/y6kkzsqr)
.
আজকে আমার ৯ম শ্রেণীতে পড়ুয়া স্টুডেন্টের সিলেবাস দেখতে গিয়ে তার শারীরিক শিক্ষা না জানি কি একটা বইয়ে ‘বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রজনন প্রক্রিয়া’ টাইপ কিছু একটা চোখে পড়লো। যতটুকু জানি বর্তমানে ক্লাস ৮ম এর নিচেও এসব নিয়ে পাঠ্য বইয়ে আলোচনা করা হয়।
.
২০১২ সালের কথা। তখন আমি ৯ম শ্রেণীতে পড়তাম। তখন জীববিজ্ঞান বইয়ে ব্যাঙের একটি অধ্যায় ছিলো সেখানে ব্যাঙের প্রজনন নামে একটি টপিক ছিলো। লেখা ছিলো এরকম যে, ‘প্রজননের সময় সঙ্গমকরার জন্য ব্যাঙ ঘেঙর ঘেঙর করে ডাকে…….’
আমাদের যে স্যার ছিলেন তিনি আমাদের ব্যাঙ অধ্যায়টি পড়ানোর সময় এই টপিকটি পড়াননি। এড়িয়ে গিয়েছিলেন। আমরাও স্যারকে বলিনি। নিজেরা বুঝে নিয়েছিলাম।
.
বর্তমানে যুগ পাল্টেছে। এখন ব্যাঙ পড়তে হয়না। সরাসরি বাচ্চারা ‘মানুষ’ পড়ে। মানুষের প্রজনন পড়ে। জানা ও পড়াটা দোষের নয়। কিন্তু সেটা সময় যখন হবে তখন জানুক না। কিন্তু পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চাগুলোকে মাল্টিমিডিয়া দিয়ে বয়ঃসন্ধিকাল বুঝানোর মানে কি!
.
#লস্টমডেস্টি‘র কাজ করার সময় মাঝে মাঝে যখন মানুষকে লিফলেট বিতরন করি। পেজ থেকে কিছু বলা হয় তখন অনেক মানুষই অভিযোগ করেন যে,’আমাদের কাজের জন্য ছোট ছোট বাচ্চাদের হিতে বিপরীত হয়ে যাচ্ছেনা তো আবার! ফেসবুক ও ইউটিউবে অনেক টিনেজার আছে।তারা আমাদের এসব কাজ দেখে কৌতুহলী হয়ে যাচ্ছেনাতো আবার?!’
.
আমরা যখন কাজ করতে যাই তখন হিতে বিপরীত হয়ে যায়। অথচ স্কুলে পিচ্ছি পিচ্ছি বাচ্চাগুলোকে যখন বয়ঃসন্ধিকাল পড়ানো হয় সেটাতে সমস্যা হয় না!
.
প্রগতিশীল ভাই আমার। বলুন তো এই যে শিশু ছেলে গুলো ধর্ষণ করেছে তার কারণ কি? তারা ধর্ষণ জিনিসটা সম্পর্কে বুঝলো কি করে? এই বয়সে একটা মেয়েইবা চিনলো কি করে? এই বাচ্চা ছেলেগুলোর কি মনমানসিকতা দোষ? নারী শরীরের প্রতি লোভ টা দোষ?
উত্তরগুলো দিন যদি পারেন।
বলুন কি দায়ী এসবের জন্য? কে দায়ী?
.
এখন তো মোবাইলে দুই টিপ দিলেই দুধের বাচ্চাও পর্নো সাইটে প্রবেশ করতে পারে। তাইলে দোষ কিসের? আপনার কি করণীয়?

.

অবশ্যই দেখুন- পতনের আওয়াজ পাওয়া যায় 
পর্নোগ্রাফি-মাস্টারবেশন এর কুফল নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে চাইলে পড়ুন- আলোর মিছিল

 

শেয়ার করুনঃ
সভ্যতা ও অবক্ষয় ১ – বংশগতি

সভ্যতা ও অবক্ষয় ১ – বংশগতি

খবরগুলো নিয়মিত বিরতিতে সামনে আসে। পশ্চিমের নানা যৌন বিকৃতির বিচিত্র সব গল্প। সমকামিতা, উভকামিতা, শিশুকামিতা, পশুকামিতা, ট্র্যান্সজেন্ডার আরো কতো কী। আমরা হেসে এড়িয়ে কিংবা ভুলে যাই। অথবা পশ্চিমাদের অসভ্যতা নিয়ে ধরাবাঁধা কিছু কথা বলি। অন্য কিছু খবরও নিয়মিত বিরতিতে চোখে পড়ে। দেশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ডিভোর্স, গর্ভপাত আর লিভ টূগেদার নিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ বিভিন্ন প্রতিবেদন। মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায় লেইট নাইট পার্টি, কিংবা সমকামিদের বিভিন্ন ‘গেট টুগেদারের’ কথা। আর প্রতিনিয়তই, পত্রিকায়, রাস্তায়, বিলবোর্ডে, টিভি স্ক্রিনে, ব্রাউযার খুললেই চোখে পড়ে নতুন কোন বিজ্ঞাপন, সাহসি কোন সিনেমা কিংবা দৃশ্য নিয়ে প্রতিবেদন, ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, নারী দেহের পণ্যায়ন, নারীর নিজেকে প্রদর্শন, আদিম হাস্যরসে মেতে ওঠা আড্ডবাজদের হাসি, পথচারীর আড়চখের দৃষ্টি, পুঁজিবাদের যৌনকরন, হুকআপ কালচার নিয়ে জমে ওঠা অনলাইন বিতর্ক, ভাইরাল কোন ভিডিও, কিংবা কোন সুশীল বুদ্ধিজীবির কলাম – চোখ খুললেই চোখে পড়ে যৌনতা নিয়ে অবসেসড, যৌনন্মাদ এক সমাজ।
কেন?
.
.
যৌনতার ব্যাপারে বর্তমানে আমরা যেসব প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করা, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ধরাবাঁধা কিছু কথা বলে দায়িত্ব শেষ করা সহজ। নৈতিক এই বিপর্যয়কে দেখিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার নোংরামি তুলে ধরা কার্যকর। কিন্তু এই অবস্থা যে আরো গভীর ও মৌলিক কোন সমস্যার উপসর্গ এবং এই বাস্তবতা যে আরো কঠিন কোন পরিনতির ইঙ্গিত বহন করে – সেটা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, অথবা আমরা বিষয়টাকে সেভাবে দেখি না। সেই গভীর ও মৌলিক সমস্যা, সেই কঠিন পরিণতি কী – সেই আলোচনায় আমরা যাবো। তবে তার আগে আমাদের জানতে ঠিক কিভাবে, কোন পথে আমরা আজকের এই অবস্থায় এসে পৌছলাম।
.

‘বিপ্লবের’ বংশগতি

.
যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে আজ আমরা যে অবস্থা দেখছি – সমকামি ‘বিয়ের’ আইনী স্বীকৃতি, সমকামিতাকে প্রশংসনীয় সাব্যস্ত করা, ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট, বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভূত যৌনতার ব্যাপক প্রচলন, ব্যাপক গর্ভপাত, বিয়ে ও পরিবারের পবিত্রতা – এগুলোর ব্যাপারে সাধারন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শিশুকাম, পশুকাম, অজাচারসহ বিভিন্ন বিকৃতির স্বাভাবিকীকরনের চেষ্টা – এই সবকিছুই ষাট ও সত্তরের দশকের সেক্সুয়াল রেভোলুশান এর ফসল।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং সাদা ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে অ্যামেরিকার। এ সময়কার প্রজন্মকে বলা হয় ‘দা গ্রেইটেস্ট জেনারেইশান’। ১৯০০ থেকে ১৯২০ এর মাঝে জন্ম নেয়া এই ‘গ্রেইটেস্ট জেনারেশনই দূরদেশে গিয়ে লড়াই করেছিল বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বদলে দেয়া মহাযুদ্ধে। আর যারা দেশে ছিল তারা সচল রেখেছিল যুদ্ধকালীন অর্থনীতির চাকা। মহাযুদ্ধের বিজয়ী এ প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল বিশের দশকের ভয়ঙ্কর মন্দা, নানা সামাজিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। এ প্রজন্ম ছিল পরিশ্রমী, বাস্তবমুখী এবং তাদের নৈতিকতা ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক প্রগাঢ় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঝড় সবকিছু আমূল বদলে দেয়। পঞ্চাশের দশকের বিট জেনারেইশান আর ষাটের দশকের হিপি মুভমেন্ট আগের প্রজন্মের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চিন্তাগুলোকে আক্রমন করতে শুরু করে। রক অ্যান্ড রৌল, হলিউড, প্লেবয়, পেন্টহাউস, অ্যাকাডেমিয়া আর ম্যাস মিডিয়ার মাধ্যমে চলতে থাকে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ‘মহান’ প্রজন্মের সন্তানরা বেড়ে ওঠে জীবন ও নৈতিকতার প্রতি সম্পূর্ণ নতুন, প্রায় বিপরীতমুখী এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।। চিন্তা, চেতনা, আদর্শ ও দর্শনে দুই প্রজন্মের মাঝে তৈরি হয় এক গভীর বিভাজন। আর এর এ বিভক্তি তুঙ্গে পৌছায় সেক্সুয়াল রেভোলুশানের মাধ্যমে, যখন যৌনতার ব্যাপারে গ্রেইটেস্ট জেনারেশানের ধর্মীয় নৈতিকতা ছুড়ে ফেলে অ্যামেরিকা আলিঙ্গন করে নেয় ফ্রি সেক্সের প্যাইগান দর্শনকে। এ প্রজন্মের চিন্তায় গেথে যায় সব ধরনের যৌনাচার আর বিকৃতির অবাধ প্রচলন ও বৈধতার এক দর্শন। পরবর্তী ৫০ বছরে এই সেক্সুয়াল রেভোলুশনেরই নানা ফসল বিভিন্নভাবে আমাদের আজকের এই বাস্তবতাকে তৈরি করেছে।
.
ষাটের দশকের শেষদিকে শুরু হওয়া সেক্সুয়াল রেভোলুশানের ভিত কিন্তু স্থাপিত হয় আরো আগে। সেক্সুয়াল রেভোলুশান নামের সভ্যতার অবৈধ এ সন্তানের বংশগতি খুব সংক্ষেপে ও সিমপ্লিফাই করে এভাবে উপস্থাপন করা যায় –
মানুষের মনোদৈহিক প্রায় সব ধরনের সমস্যার কারন হিসেবে অবদমিত কামনাবাসনা তথা যৌনতাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে সেক্সুয়াল রেভ্যুলুশানের প্রাথমিক কাঠামো দাড় করায় সাইকোঅ্যানালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। মানুষের ব্যাক্তিত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, অনুপ্রেরণা – প্রায় সবকিছুর পেছনে ফ্রয়েড যৌনতা খুজে পায়। ফ্রয়েডের মতে মানবজীবনের সব আনন্দ ও কষ্টের সম্পর্ক লিবিডোর (যৌনতাড়না) সাথে। এমনকি শিশুকেও ফ্রয়েড আবিস্কার করে যৌন প্রাণী হিসেবে। ফ্রয়েডের চিন্তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় উইলহেম রাইশ এবং হার্বার্ট মারকিউসের মতো লোকেরা। তবে ফ্রয়েডের তৈরি করা কাঠামো ওপর দাঁড়িয়ে যে মানুষটি সত্যিকার অর্থে সেক্সুয়াল রেভোলুশান এবং আমাদের আজকের এই যৌনন্মাদ সমাজের জন্ম দেয় তার নাম অ্যালফ্রেড কিনসি। রকাফেলার ফাউন্ডেইশানের সমর্থন নিয়ে কিনসি ফ্রয়েডের চিন্তার সাথে যুক্ত করে নতুন এক দিক।
.
কিনসি দাবি করে মানুষের যৌনতা নির্দিষ্ট কোন কাঠামোতে আবদ্ধ না। মানব যৌনতা ক্রমপরিবর্তনশীল, বহমান। কিনসির মতে, যৌনতার ক্ষেত্রে ন্যায়অন্যায়ের কোন ধারণা নেই। যৌনতা সাদাকালো বাইনারি কোন সিস্টেম না, বরং মানুষের যৌনতা রংধনুর মতো। এখানে আছে অনেক রঙ, অনেক মাত্রা। রংধনুর একপ্রান্তে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা আর অন্য প্রান্তে সমকামিতা। এ দুইয়ের মাঝে আছে শিশুকামিতা, পশুকামিতা, উভকামিতা থেকে শুরু করে সবধরনের ফেটিশ, সবধরনের বিকৃতি। সমাজের মানুষেরা একেকজন এই স্পেকট্রাম বা বর্ণালীর মধ্যে বিভিন্ন অবস্থানে থাকতে পারে। আবার একজন মানুষ তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই বর্নালীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারে। তবে কিনসির মতে অধিকাংশ মানুষ দুই প্রান্তের মাঝামাঝি অবস্থানের দিকে থাকে, অর্থাৎ উভকামিতায়। কিন্তু সমাজ, সংস্কার ও ধর্মের মাধ্যমে আরোপিত নৈতিকতার কারনে মানুষ এই স্বাভাবিক অবাধ যৌনতার প্রবণতাকে চেপে রাখে। একে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে অথবা নিজের আসল যৌনাচারকে গোপন রেখে সমাজের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাভাবিকতার মুখোশ পড়ে থাকে। পাশাপাশি কিনসি তার কুখ্যাত দুটি বইয়ের (Sexual Behavior In The Human Male/Female) মাধ্যমে ‘প্রমান’ করে দেখায় যে যেগুলোকে আমরা বিকৃত যৌনতা বলি সেগুলো আসলে অনেক বেশি প্রচলিত। সমকামিতা, উভকামিতা, বহুগামিতাসহ – অনেক কিছুই সমাজের অনেকেই করে। কিন্তু তারা সেটা গোপন রাখে। ঐ যে, পাছে লোকে কিছু বলে!
.
এই দাবির পক্ষে কিনসি বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। যদিও কিনসির উপস্থাপিত পরিসংখ্যান দিয়ে তার দাবি প্রমানিত হয়, কিন্তু আসল ফাকিটা ছিল তার পরিসংখ্যানেই। কিনসি যাদের সাক্ষাতকার নিয়েছিল তাদের মধ্যে বিশাল একটি অংশ ছিল পতিতা, সমকামি পুরুষ পতিতা (পতিত?), সমকামি, যৌন অপরাধের কারনে কারাভোগকারী, এবং পেডোফাইল। অর্থাৎ কিনসি প্রশ্ন করার জন্য এমনভাবে মানুষ বেছে নিয়েছিল যাতে বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত মানুষদের অনুপাত বেশি হয়।
.
ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা করুন। আপনি যদি চুরির ওপর বাংলাদেশের ১০০ জন মানুষের ওপর জরিপ চালান, আর ইচ্ছে করেই সেখানে ৫০ জন চোরকে রাখেন তাহলে অবশ্যই আপনার জরিপের ফলাফলে দেখা যাবে বাংলাদেশের প্রায় ৪০-৫০% মানুষের মধ্যে চুরির প্রবণতা আছে। কিনসি ঠিক এ কাজটাই করেছিল।
.
তবে এই আমরা এখন বলতে পারলেও কিন্তু গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ কাজটা এতোটা সহজ ছিল না। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আর পঞ্চাশের দশকে কিনসির ‘রিসার্চ’ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। রকাফেলার ফাউন্ডেশানের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও সমর্থনে অ্যামেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে কিনসি নানা সেমিনারে নিজের আবিস্কৃত ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’গুলো প্রচার করে দাঁড়ায়। তার বইগুলো পরিণত হয় বেস্টসেলারে এবং কিনসির এই জালিয়াতি ভরা গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি। কিনসির উপসংহারের ওপর ভিত্তি করে স্কুলের যৌনশিক্ষা বই এবং আইন পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়। সেক্সুয়াল রেভলুশানের দুজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার, প্লেবয় ম্যাগাযিনের হিউ হেফনার এবং সমকামি অধিকার আন্দোলনের হ্যার হেই- গভীরভাবে কিনসির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। দুজনের ভাষ্যমতেই কিনসি Sexual Behavior In The Human Male – বইটি ছিল তাদের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট, এবং এই বইটি পড়ার পরেই তারা নিজেদের জীবনের গতিপথ বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
.
কিনসির দেয়া ন্যায়অন্যায় থেকে মুক্ত যৌনতার বর্ণালীতে নতুন একটি অক্ষ যোগ করে জন্স হপকিন্সের ড. জন মানি। যৌনতা (sexual preference), লিঙ্গ (gender) ও লৈঙ্গিক পরিচিতি (gender identity) – এর মাঝে মানি পার্থক্য খুজে বের করে। মানুষের যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় জন্মগতভাবে নির্ধারিত না। মানুষের ধরাবাঁধা কোন যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় নেই। যৌনতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক বিকৃতি, অবিকৃতি বলে কিছু নেই –আধুনিক যৌনতার ধারনায় এই চিন্তাগুলো যুক্ত করার মাধ্যমে জন মানি বর্তমানের ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের মূল দাবিগুলোর ব্যাখ্যা তৈরি করে। অন্যদিকে ফ্রয়েড, মার্ক্স আর রাইশের চিন্তার সমন্বয় করার মাধ্যমে কালচারাল মার্ক্সিসম ও আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ছাঁচে সমকামিতা সহ অন্যান্য বিকৃত যৌনাচারের স্বাভাবিকীকরনের আন্দোলনের জন্য একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করে ফ্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের হার্বাট মারকিউস।
.
কিনসি ও বিশেষ করে মানির কাছ থেকে আসা ধারণাগুলো লুফে নেয় ষাট ও সত্তরের দশকে তুঙ্গে থাকা ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট। এই যে “বৈজ্ঞানিক প্রমান’ পাওয়া গেছে, নারী ও পুরুষ আসলে একই। তাদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। পুরুষ যা পারে নারীও তা পারে। পুরুষ ও নারীর চিন্তা, সামর্থ্য, সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকার যে পার্থক্য সমাজে আছে তা জোর করে চাপিয়ে দেয়া। পুরুষতন্ত্রের মাধ্যমে এসব ধারণা গড়ে উঠেছে।। যুগে যুগে পুরুষরা ষড়যন্ত্র করে এসবের মাধ্যমে নারীদের ঘরে বেধে রেখেছে। প্রথা, ধর্ম, সংস্কার ইত্যাদিকে তারা ব্যবহার করেছে নারীদের আবদ্ধ রাখার জন্যে।।
.
নারীবাদে এসে সাইকোলজি, সেক্সোলজি, বিকৃতি, মানবিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির অদ্ভূত এক জগাখিচুড়ি তৈরি হয়। যৌনতা, পরিবার, মানবপ্রকৃতিসহ যেকোন কিছুকেই নির্দিষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ফসল হিসেবে দেখানোর পোস্টমর্ডানিস্ট যুক্তিও তারা গ্রহন করে। যার ফলে এ বিষয়গুলোর ব্যাপারের প্রতিষ্ঠিতই ধারনাগুলোকে আউটডেইটেড বলে নাকচ করে দেয়া সম্ভব হয়। এর সাথে আরো যুক্ত হয় আপেক্ষিত নৈতিকতা (moral relativism) ও এবং কোন চিরন্তন সত্যের অস্তিত্ব থাকাকে অস্বীকার করার প্রবণতা। ভালো ও খারাপের কোন ধরাবাধা সংজ্ঞা নেই, মানুষই ভালোমন্দের তৈরি করে। সময়ের সাথে ভালো ও খারাপ বদলাতে থাকে। সকল সত্যই আপেক্ষিক, প্রতিটি সত্যই কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও শক্তির কাঠামোর সাপেক্ষে সত্য – আপেক্ষিক নৈতিকতা ও আপেক্ষিত সত্যের অপ্রকৃতস্থ ধারনার ওপর গড়ে ওঠা এসব পোস্টমর্ডানিস্ট তর্কের মাধ্যমে সম্ভব হয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক, বিকৃতি এমনকি বায়োলজিকেও একপাশের সরিয়ে রাখা। ধাপে ধাপে ডিকন্সট্রাক্ট করা হয় গ্রেইটেস্ট জেনারেইশনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দর্শনকে।
.
নারীবাদ আক্রমন করে পরিবারকে। কারন পরিবার হল পুরুষতন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার। পরিবার একটি ‘পুরুষতান্ত্রিক’ কাঠামো যার উদ্দেশ্য নারীকে ঘরে আটকে রেখে পুরুষের আধিপত্য নিশ্চিত করা। নারীবাদ নারীকে শেখাতে শুরু করে, ‘একজন নারীর পুরুষের কোন দরকার নেই। প্রয়োজন নেই পরিবারের মধ্যে নিজের পরিচয় বা পূর্ণতা খোজার। সন্তান তোমাকে শুধু আরো পিছিয়ে দেবে। বরং তোমার উচিত নিজের স্বাতন্ত্র্য, নিজের ব্যাক্তিত্ব, নিজের ক্যারিয়ারের মাঝে সাফল্য খোঁজা। আর শরীরের চাহিদা? সেক্স? তার জন্য বিয়ের কী দরকার? সেক্স শুধু শরীরের জন্য, আনন্দের জন্য। যা ইচ্ছে করো, কিন্তু এর সাথে আর কোন কিছু জড়ানোর প্রয়োজন নেই। বহুগামীতাকে স্বাধীনতা হিসেবে দেখার এই প্রবনতাও নারীবাদ গ্রহন করে সেক্সুয়াল রেভোলুশানের কাছ থেকে। নারীবাদের ভাষায় বার্থ কন্ট্রোল পিলসহ অন্যান্য জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ও যেকোন সময়ে গর্ভপাতের সুযোগ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারীকে সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়। আর এভাবেই সব শেকল থেকে মুক্ত হয়ে যৌনতা পরিণত হয় নিছক আনন্দের এক অতৃপ্ত অন্বেষণে।
.
ষাটের দশকের শেষদিকে এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে শুরু হওয়া ফ্রি লাভ/ফ্রি সেক্স মুভমেন্ট ও সমকামি অধিকার আন্দোলনও পুরোপুরিভাবে এই বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করে। তাদের জন্য এটা একটা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল। প্রচলিত পরিবার কাঠামো, নৈতিকতা, যৌনতার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি – এসবকিছুই সমকামি ও অন্যান্য বিকৃতকামীদের আচরন ও দর্শনের সাথে মেলে না। কিন্তু সমকামিতা বা বিকৃতকামিতার জায়গা থেকে পরিবার বা নৈতিকতার সমালোচনা করা স্ট্র্যাটিজিকালি ভুল। এতে করে সমকামিরা যে অচ্ছুৎ, সমাজবিরোধী – এই ধারনাই আরো শক্ত হবে। কিন্তু স্ট্র্যাটিজিক হিসেবনিকেশের কারনে সমকামিরা যা প্রকাশ্যে বলতে পারছিল না, খুব সহজ সেই কাজটা করতে পারছিল নারীবাদীরা। তাই সমকামি আন্দোলনের সাথে নারীবাদীদের জোট বাধা ছিল যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক। এই দুই আন্দোলন আজও হাতেহাত রেখেই চলছে।
.
ষাট ও সত্তরের দশকে যা ছিল (নৈতিকতা, পরিবার, যৌনতা ইতাদির ব্যাপারে) খুব র‍্যাডিকাল ‘বিপ্লবী চিন্তা, পরের দশকগুলোতে সেগুলোই ধীরে ধীরে স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়। কিনসি, মানি ও মারকিউসদের দর্শন আর ফেমিনিস্ট থিওরিগুলো অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে শেখানো হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ওপর এই চিন্তাধারা প্রায় একচ্ছত্র আধিপ্ত্য বিস্তার করে। আর বিভিন্নভাবে সাধারন মানুষের চিন্তায় এ বিশ্বাসগুলো গেথে দিতে থাকে ম্যাস মিডিয়া। এই কলুষিত দর্শন, চিন্তার বিকৃতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা বিশ্বে।
.
এই মিশ্রণ থেকেই একসময় বের হয়ে আসে হেজেমনিক ও টক্সিক ম্যাস্কিউলিনিটি – এর ধারণা। টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটির এ তত্ত্ব দাবি করে, যা কিছুকে স্বাভাবিকভাবে পুরুষালি বলে গণ্য করা হয়, যেসব আচারআচরণ ও বৈশিষ্ট্যকে সমাজ পুরুষোচিত বলে উপস্থাপন করে, তার সবই বিষাক্ত। কারণ পুরুষত্বের এই ধারণা তৈরিই হয়েছে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। এই ‘পুরুষত্ব’ মানবতার জন্য ক্ষতিকর। সত্ত্বাগতভাবেই এই ‘পুরুষ’ অত্যাচারী, সম্ভাব্য ধর্ষক, সমাজ ও সভ্যতাকে কলুষিতকারী। এভাবে নারীবাদ পুরুষত্বের ধারণাকেই আক্রমন করে বসে আর এর মাধ্যমে অনিচ্ছায় ও অজান্তে আক্রমন করে নারীত্বকেও। এ পর্যায়ে এসে নারীবাদ দাবি করে, যা কিছু নারীসুলভ বলে স্বীকৃত তা আসলে পুরুষতন্ত্রের ফসল। নারী তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে, যখন সে পুরুষতন্ত্রের তৈরি ছাঁচ থেকে বের হতে পারবে। আর পুরুষের প্রায়শ্চিত্ত তখনই পূর্ণ হবে যখন সে সমাজস্বীকৃত পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্য ঝেড়ে ফেলবে আর নিজের পুরুষ পরিচয় আর ঐতিহাসিক ‘অপরাধের’ কারনে লজ্জিত হবে। তাই – যদি পুরুষ কতৃত্বশীল হয় তাহলে সে অত্যাচারী। যদি সে দৃঢ়চেতা হয়, সমাজস্বীকৃত পুরষোচিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয় তাহলে সে নারীর ওপর অত্যাচার ও শোষণের এই ফ্রেইমওয়ার্কের একটি অংশ। একইভাবে, যদি নারী সাবমিসিভ হয় তাহলে সে পুরুষতন্ত্রের গোলাম, ব্রেইনওয়াশড। যদি নারী মা ও স্ত্রী হিসেবে নিজের পরিচত বেছে নেয় তাহলে সে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্রের ফসল। যদি পুরুষ বিশ্বস্ততা আশা করে তাহলে সেটা ভন্ডামি, যদি নারী বিশ্বস্ত থাকতে চায় তাহলে সে মানসিক দাসত্বের স্বীকার।
.
নৈতিকতা, যৌনতা ইত্যাদির ব্যাপারে যতো ধারণা আছে, ভালোমন্দ, বৈধ-অবৈধ, বিকৃতি, স্বাভাবিকতা – সব কিছুই কলুষিত পুরুষতন্ত্র এবং ঐতিহাসিক শোষণ ও নির্যাতনের ফসল। সমকামিতা তাই শুধু যৌন সুখের সন্ধান না বরং নিজের স্বাধীনতার প্রয়োগ, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। একইভাবে বহুগামী নারী হল আধুনিক এক বিপ্লবী। আর দৃষ্টিকোণ সবচেয়ে বড় বিপ্লব হল অ্যান্ড্রোজিনি – ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট – কারন এ আন্দোলন সব প্রথা, প্রচলন আর কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে। পুরুষত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে পথের শুরু তার পরিসমাপ্তি অ্যান্ড্রোজিনি। টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটি তত্ত্বের ফসল হল ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্ট।
.
এখানে একটি বিষয় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবিতে বিকৃতকামীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে – ব্যাপারটা এমন না। সব সমাজেই এরা খুব ছোট একটা মাইনরিটি। কিন্তু পার্থক্য হল যৌনতার ব্যাপারে তাদের ধ্যানধারনাগুলো বিপুল সংখ্যক মানুষ মেনে নিয়েছে। মোটা দাগে এই সভ্যতা যৌনতার ব্যাপারে এই দর্শনকে গ্রহন করেছে। যৌনতাকে এখন এভাবেই দেখা হচ্ছে, সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। সমকামি অধিকার, ট্র্যান্সজেন্ডার অধিকারের নামের এসব বিকৃতির স্বাভাবিকীকরনের কাজ করা হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। আর এভাবেই এই বিকৃতি ও অবক্ষয় সমগ্র সভ্যতার ওপর নিয়ন্ত্রন অর্জন করেছেন।
.
এভাবেই আমরা এমন এক বিচিত্র সময়ে এসে পৌছেছি যখন ৫২ বছর বয়েসি ছয় সন্তানের বাবা নিজেকে ৬ বছরের বাচ্চা মেয়ে দাবি করে। যখন ৩০ বছরের এক মহিলা প্রথমে নিজেকে পুরুষ দাবি করে আর তারপর পুরুষ কুকুর। যখন ২৮টি দেশে সমকামি ‘বিয়ে’কে বৈধতা দেয়া হয়। যখন শিশুকামিতা ও পশুকামিতাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যখন সেইডম্যাসোকিযম, বন্ডেজ, জেন্ডার গেইমসসহ নানা বিকৃতির প্রকাশ্যে উৎসব হয়। যখন আমেরিকাতে বছরে সাড়ে ছয় লক্ষ আর বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ৭ লক্ষের ওপর গর্ভপাত হয়[1]। যখন বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভুত যৌনতা সামাজিক নিয়মে পরিনত হয়। যখন সিনেমা, সাহিত্য, টেলিভিশন, ইউটিউব সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে নকশা, অধুনা, আর পরামর্শের কলাম সন্তান আর সন্তানদের অভিভাবককে শিখিয়ে দেয় উঠতি বয়সে ‘প্রেম করা’ আর ‘শারীরিক ঘনিষ্ঠতা’ – স্বাভাবিক একটি ব্যপার। আর যখন এমন কিছু ঘটে যা পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো ঘটেনি – পর্নোগ্রাফি ঢুকে পড়ে প্রতিটি ঘরে, চলে আসে প্রতিটি মানুষের হাতের নাগালে, পরিণত হয় শত বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক ইন্ডাস্ট্রিতে। আর সেক্সুয়াল রেভোলুশানের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে অ্যামেরিকার কিন্ডাগার্টেন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ‘অধুনা’ এর পাতাতে।
এ তো গেল আমাদের বর্তমান আর এই বর্তমানের শেকড়ের কথা। কিন্তু এই বাস্তবতা কীসের উপসর্গ? আর এ বর্তমান কোন ভবিষ্যতের আভাস দেয়? এ প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। বর্তমানকে দেখতে হবে ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে।
.
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
লিখেছেন- আসিফ আদনান
____________________________________________
Footnote: The British Broadcasting Corporation (BBC) wants lesbians, gays, bisexuals and the transgendered to be seen twice as much on TV as they are in real life within the next two years. It’s all part of a move by the BBC, the world’s biggest public broadcasting corporation, to “increase diversity on and off air to reflect and represent today’s UK.” [2]
শেয়ার করুনঃ
নীড়ে ফেরার গল্প (অষ্টম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (অষ্টম কিস্তি)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।
.
অন্ধকারে সাতটি বসন্তঃ

কেবল মাত্র বার টপকে তের বয়স। আর দশটা ছেলের মতোই স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করছিলাম। পড়াশোনা,খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা সবকিছুতেই ছিলাম মোটামুটি পারদর্শী। আলহামদুলিল্লাহ ! ভদ্রছেলে হিসাবে সবার কাছে বেশ পরিচিত ছিলাম। চাকরির সুবাদে বাবা-মা দু জনেই ঢাকাতে পাড়ি জমালেন। আমাকে রেখে গেলেন নানার বাসায়। তখন সম্ভবত ক্লাস এইটে পড়ি। নানার বাসায় গিয়েও ভর্তি হলাম ক্লাস এইটে। কারো সাথে দ্রুত বন্ধুত্ব করতে আমি বেশ একটা পটু ছিলাম না। সেই জন্য নানার বাসায় নিজেকে খুবই একলা একলা মনে হত। যাই হোক কথা না বাড়িয়ে মুল টপিকে আসি, বেশ কিছু দিন পর যখন রুমে একা শুয়ে আছি, কেন যেন অজানা কারণে ঘুম আসছিল না। হঠাৎ, মাথায় কুচিন্তা আসলো, গায়ে কেমন যেন একটা জ্বালাতন শুরু হলো। উত্তেজিত হয়ে গেলাম খুবই। আমার এমনটা এর আগে কখনো হয়নি । তারপর পেনিস নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে হলো। করলামও। ব্যাস!! যা হবার তাই হলো,ভাবলাম প্যান্টে হয়তোবা প্রস্রাব করে দিয়েছি। কিন্তু না,আবিষ্কার করলাম অন্য কিছু, পেনিস দিয়ে আঠালো জাতীয় পদার্থ বের হল। অবাক হলাম! সাথে কিছুটা ভয়ও পেলাম। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, ব্যাপার টা আসলে কী ঘটলো। কেননা যৌনতা সম্পর্কে তখনও আমার স্বচ্ছ ধারনা ছিল না। তবে যাই ঘটুকনা কেন, আমি বেশ আনন্দ অনুভব করলাম। যেহেতু আনন্দ পেলাম তাই; পরবর্তীতে কোন একদিন তৈলাক্ত জাতীয় কিছু একটা দিয়ে শুরু করলাম আগের মত পেনিস নিয়ে নাড়াচাড়া। বেশ মজা পেলাম। মজা পাওয়াতে আমি এটা প্রায়ই করতাম। তবে পর্ন বা চটি জাতীয় অশালীন কোন কিছুর সাথে তখনও আমার পরিচয় হয়নি।
.
…এভাবে নিজে থেকেই আমি আসক্ত হয়ে পড়লাম মাস্টারবেশনে। তারপর আমার জীবনের কালো অধ্যায়গুলো রচনা হতে শুরু করল। তখন পর্যন্ত আমি বুঝিনি যে, মাস্টারবেশন করা শারীরিক মানসিক সহ সব দিক দিয়েই ক্ষতিকর। একদিন স্কুলের এক বন্ধুর কাছে শুনি যে এটা ক্ষতিকর!!!
কিন্ত কে শুনে কার কথা। তখন তো আমি মাস্টারবেশনে পুরে দমে আসক্ত এক নরকীট। তারপর আস্তে আস্তে পরিচয় পর্নোগ্রাফির সাথে। তবে পর্নে খুব একটা আসক্ত ছিলাম না। আমার মূল সমস্যা ছিল মাস্টারবেশন। দিনেরাতে মিলে ৫/৬ বারও মাস্টারবেট করতাম।ভাই বলতেও লজ্জা করছে কিন্তু কি আর করবো বলুন; তখন তো আমি শয়তানের দাসে পরিণত হয়েছি।
.
যখন কোথাও বসে থাকতাম, বসা থেকে উঠলে মাথাটা প্রচন্ড যন্রণা করতো, চোখে সব অন্ধকার দেখতাম। স্ব্যাস্থ একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। যে কেউ দেখলে চোখ বুজে বলে দিত পারত এ ব্যাটা নিশ্চিত গান্জাখোর। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে মনে হত, সাহারা মরূভূমি পাড়ি দিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি । হাড্ডিসার বুড়ার মতো দেখাতো আমাকে। রাস্তাঘাটে মেয়েদের দেখলে ভিতরে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যেত। যদিও হাইস্কুলে আমি কোন মেয়ের সাথে কখনো কথা বলিনি। বেশ লজ্জাবোধ কাজ করতো ভিতরে। সেই সুবাদে ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের কাছে ‘ভদ্রছেলের’ খেতাবও পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কেউই জানতো না, দেখতে ভদ্র এই মানুষটার ভেতরে কতটা পশুত্ব লুকিয়ে আছে! ভাবতাম, হয়তো এই দুনিয়ায় আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা মাস্টারবেশনে আসক্ত।
.
আমার মত আসক্ত, কোন ব্যক্তির সাথে আমার তখনও পরিচয় ছিল না। বিশেষ করে এই গ্রুপের মাধ্যমে জানতে পারলাম যুব সমাজের মাস্টারবেশন,পর্ন কতটা ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে। হে আল্লাহ, তুমি আমার ভাইদেরকে রক্ষা কর। বৃষ্টিবিলাস, বিকেলের পড়ন্ত রোদ, সকালের মৃদু হাওয়া , অন্ধকার রাত্রে বসে বসে আকাশে তারার দিকে চেয়ে পৃথিবী বুকে নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব অনুভব, ভোরবেলায় বুক ভরে প্রকৃতির ঘ্রাণ, আমার ছোট্ট পৃথিবীতে এগুলো ছিলো খুব খুব প্রিয়। এগুলো আস্তে আস্তে আমার কাছে অধরা হয়ে গিয়েছিল ততদিনে। পুরো পৃথিবী থেকে আমি যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। সব সময় একলা থাকতে পছন্দ করতাম। কেউ বাসায় আসলে তাদের সামনে যেতে লজ্জা করতো, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম। বড্ড অসহায় লাগতো নিজেকে। এমন অনেক দিন গেছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অঝরে কেঁদেছি। খেতে মন চাইতো না কিছুই। অনেকেই তো আমাকে জিগ্যেস করে বসেছে, যে আমি মাস্টারবেট করি কিনা। লজ্জা আর ভয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। এভাবেই কাটছিল আমার অন্ধকারছন্ন জীবনের দিনগুলি।
.
তারপর যখন কলেজে উঠি তখন শুরু হলো জীবনের আরেকটা কালো অধ্যায়। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পরলাম। একটা মেয়ের প্রেমেও পড়েছিলাম; মাস চারেক পর অবশ্য তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। খারাপ লেগেছিল কিছুটা কিন্তু মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। তবে সিগারেটের আসক্তি দিনদিন বেড়েই চলেছিল। শারীরিক মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ছিলাম। খুবই একা মনে হত নিজেকে। সব থেকেও, যেন মনে হত কিছু নেই আমার। পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছিলাম অনেক আগেই। কিছুই মনে থাকতোনা। ভেতরটা সবসময় হাহাকার করতো।এদিকে ইচ্ছা করলেও মাস্টারবেশন ছাড়তে পারছিলাম না কিছুতেই। যতদূর মনে পড়ে অনেক কষ্টে একবার মাত্র ১৪/১৫ দিনের মত দূরে ছিলাম। কিন্তু এর বেশিদিন পারিনি। পরে আবার আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম।
.

Image may contain: text

কেনইবা আসক্ত হবো না, মন থেকে হয়তো কখনো চাইনি যে,এই অন্ধকার জগত থেকে বের হয়ে মুক্ত বাতাস গ্রহন করবো। এভাবেই চলছিল আমার দিনগুলো। যাক, অবশেষে এলো সেই শুভক্ষণ।
.
ভোরের সোনালি আলোয় সজীবতার ঘ্রাণ-

জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলিতে বেঁচে থাকার আশাটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ, কোন এক পড়ন্ত বিকেল বেলা কেন জানি খুব ইচ্ছা হল একটা খাতা আর কলম নিয়ে নিজের সমস্যা গুলা কলমের খোচায় খাতায় লিখতে। ব্যাস, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। শুরু করলাম লেখা, প্রথমে শরীরের ভেতরে আমার কী কী সমস্যা তাই লিখলাম, যেমন :-গ্যাস্ট্রিক, মাস্টারবেশন, এ ছাড়া আরো কিছু টুকিটাকি। আর শরীরের বাইরের সমস্যা হল :- দেরিতে ঘুমানো, অনেক দেরি করে ঘুম থেকে উঠা, বাজারে অনেক বেশি আড্ডা দেওয়া, ধুমপান করা ইত্যাদি। লেখার পর আনমনে ভাবতে লাগলাম, কিভারে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অবশেষ সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠবো। যদিও অন্যদিন আমি সকাল ১০টার আগে ঘুম থেকে উঠতে পারতাম না।
.
পরেরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলাম, তারপর রাস্তায় একটু হাঁটাহাটি করতে গেলাম। আহহ!!! কতদিন পর যে ভোরবেলার সূর্যটা দেখলাম। মনটা প্রশান্তি তে একদম ভরে গেল। কি যে ভাল লাগছিল আমার তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। এভাবে দুই চারদিন কেটে গেল, ঘুম থেকে উঠে প্রত্যেকদিন হাঁটাহাটি করলাম। তারপর থেকে প্রতিদিন ভোরবেলায় আম্মু ঘুম থেকে ডেকে দিত, ফজরের সালাত পড়ার জন্য। ফজরের সালাত যেহেতু জামা’আতের সাথে পড়া হয়, তাই অন্য ওয়াক্তের সালাত কাযা করতেও ইচ্ছে করত না। যেদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠার পর ফজরের সালাত কাযা না করার প্রতিজ্ঞা করছিলাম…আমার স্পষ্ট মনে আছে, তারপর থেকে আর কখনোই আমি মাস্টারবেট করিনি।
.
আলহামদুলিল্লাহ্‌! কেন যে মাস্টারবেশন আসক্তি একদম কেটে গিয়েছে তার কারণটা আজও অজানা। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে, আমি এমন একটা জঘন্য অভ্যাস এত সহজে ত্যাগ করতে পারব। আস্তে আস্তে আমি সালাতের খুযু খুশুর প্রতি মনোযোগী হলাম। আলহামদুলিল্লাহ্‌। সপ্তাহ দুয়েক পরে আমি ধুমপান করাও ত্যাগ করলাম। এটাও যে কিভাবে সম্ভব হলো তাও আমার কাছে অজানা। হয়তো মন থেকে ভাল হয়ে যেতে চেয়েছিলাম তাই।
.
তবে ধুমপান ত্যাগ করার পিছনে একটা কাহিনী আছে। একদিন এশা বাদ হাদিসের থেকে তালিম দেওয়ার সময় একটা হাদিস শুনছিলাম। তারপর নিয়্যত করলাম আর খাবো না। আর খাইনি। আলহামদুলিল্লাহ্‌! আল্লাহর অশেষ নিয়ামতে এখন ভালো আছি। মনে প্রশান্তি পাই সর্বদা। সব কাজ মন দিয়ে করতে পারি।
.
কিছু কথা-

প্রিয় ভায়েরা আমার, মন থেকে কিছু চাইলে আর নিয়্যত পরিশুদ্ধ করলে আল্লাহ্ সুবাহানু তা’আলা তাঁর বান্দাকে কখনো নিরাশ করেন না।
আল্লাহ্‌ সুবাহানু তা’আলার কাছে চান। মন থেকে দুআ করুন। হেদায়াত চান। ইনশাআল্লাহ, তিনি আপনাকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ দেখাবেন।
পানির ওপর ভেসে থাকা শাওলা যেমন একটুখানি ঢেউ এসে শাওলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি আল্লাহ্ সুবাহানু তা’আলার রহমতের ঢেউও আপনার সকল দুঃখ -কষ্ট কে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
.
অন্ধকার থেকে আলোর পথে ভ্রমণে যা শিখলাম-

১.পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তাকবীরের সাথে প্রথম কাতারে পড়ার চেষ্টা করতে হবে।
২. নফল সালাত বেশি বেশি করে পড়তে হবে।
৩. দৈনন্দিন যিকির- আজকার গুলো করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি হিসনুল মুসলিম এ্যাপ টা ব্যবহার করতে পারেন।
৪. সবসময় অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করতে হবে।
৫. চোখের হেফাযত করতে হবে।মাহরাম-ননমাহরাম মেইন্টেইন করে চলতে হবে।
৬. তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করতে হবে। এই নফল সালাতের অনেক অনেক ফজিলত।
.
নিজের কথাগুলোকে সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি। জানি ভাল হয়নি। কেননা লেখালেখির অভ্যাস আমার নেই। তাই কিছু ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ভুল গুলোকে শুধরে দিবেন। আর আমার জন্য দুআ করবেন। আল্লাহ যেন আমাকে হেদায়াতের ওপর অটল রাখেন। আমীন।

.
চলবে ইনশা আল্লাহ…
(লস্ট মডেস্টি টিম কর্তৃক ঈষৎ পরিমার্জিত)
.
পড়ুন আগের লিখা গুলো-

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

শেয়ার করুনঃ
খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (তৃতীয় পর্ব)

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (তৃতীয় পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

আমি এই পাপ কাজটার সাথে প্রথম জড়িয়ে পড়ি ১৫ কিংবা ১৬ বছর বয়সে বা তারও কম বেশি হবে সঠিক বয়সটা ঠিক মনে পড়তেছেনা। প্রথম প্রথম খুব একটা করতাম না, দু বার একবার করতাম। তারপর আস্তে আস্তে এটা আমার নেশায় পরিণত হয়ে গেল। সিগারেট যেমন মানুষ একটু সুযোগ পেলেই খেত আমিও সুযোগ পেলেই এই নিকৃষ্ট কাজটায় জড়িয়ে যেতাম। এটা ধীরে ধীরে আমাকে আমার পরিবার,সমাজ,বন্ধুবান্ধব থেকে আলাদা করে দিতে লাগল। সবসময় একা একা থাকতে ভালবাসতাম। কারও সাথে মিশতাম না,কোথাও যেতেও ভাল লাগতনা, বন্ধুরা যখন বিভিন্ন জায়গায় দলবেধে ঘুরত আর আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল তখন আমি বিভিন্ন অজুহাতে তাদের নিকট থেকে এক রকম পালিয়ে আসতাম।

কোন কিছুতেই মন বসাতে পারতাম না, না পড়া না খেলাধুলা। প্রতিবারই করার পর প্রতিজ্ঞা করেছি যে এইবারই শেষ বার আর কখনও করবনা, আর কখনও পর্ন দেখবনা, কিন্তু কোন লাভ হয়নি, আবার পর্ন দেখেছি আবার সেইম কাজ করেছি। নিজের কাছে খারাপ লাগতে শুরু করল,কোনভাবেই এই পাপ কাছ থেকে সরে আসতে পারছিলাম না। নামাজ পড়তাম কিন্তু কোনভাবেই নামাজে মনোযোগ বসাতে পারতাম না, যোহর পড়লে আসর পড়তাম না, আর ফজর সে তো আমার কাছে সোনার হরিণের মত মনে হত। নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে অপরাধী মনে হত। এইভাবে কয়েক বছর কেটে গেল।

এর মাঝেও হয়তো আমি কোন ভাল কাজ করেছিলাম, যার ফলে ২০১৩ সালে আমি আল্লাহর রহমতে ভালো একটা চাকরিতে জয়েন করলাম। কিন্তু এখানে এসে আমার আরও পর্ণের প্রতি আসক্তি বেড়ে গেল, কারন একটাই চাকরিতে জয়েন করার পর টাকা পয়সার তেমন অভাব ছিল না, জিবি জিবি নেট প্যাকেজ কিনে পর্ন দেখতাম আর নিকৃষ্ট কাজটা করতাম। এভাবেও কয়েক বছর কেটে গেল। লাস্ট কয়েক মাস আগে ফেসবুকে দ্বীনি পরামর্শ নামে একটা গ্রুপের দেখা পাই। এই গ্রুপের সাথে যারা জড়িত আছেন সবাইকে আল্লাহ তায়ালা দীর্ঘ জীবি করুক। এই গ্রপটা হয়তো আল্লাহর পক্ষে থেকে আমার জন্য হয়তো ছিল বিশেষ নিয়ামত। এই গ্রুপের প্রতিটা পোষ্ট আমি খুব গুরুত্বের সহকারে পড়তে লাগলাম।

আমার দিল নরম হতে লাগল, আমি কী করেছি এতদিন এইসব? নিজের খুব খারাপ লাগতে লাগল, প্রতিজ্ঞা করলাম আর জীবনে এই খারাপ কাজ করব না, করব না, করব না, এবার হয়তো আমি প্রতিজ্ঞাটা একদম মন থেকে করেছিলাম তাই হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। এর ফাকে পেয়ে গেলাম “মুক্ত বাতাসের খোজে” গ্রুপটার দেখা। এই গ্রুপের সাথে যারা জড়িত আছে,আল্লাহ তায়ালা তাদেরকও দীর্ঘজীবী করুক। এই গ্রুপের মাধ্যমে পেয়ে গেলাম মুক্ত”বাতাসের খোজে” বইটা, মাশা আল্লাহ অনেক সুন্দর একটা বই।

বইটা পড়ার পর আরও কঠিন প্রতিজ্ঞা করলাম। নামাজ শুরু করে দিলাম,৫ ওয়াক্ত জামাতের সাথে,হয় তো কাজের জন্য ২/১ ওয়াক্ত নামাজে জামাত মিস হয়ে গেছে, কিন্তু সর্ব্বোচ চেষ্টা করেছি। তাহাজ্জুদ প্রতি রাতেই পড়ার চেষ্টা করি, তাহাজ্জুদ পড়ে প্রতি রাতেই আল্লাহর কাছে কেঁদেছি, সাহায্য চেয়েছি, নিজের নজরকে কন্ট্রোল করতে শুরু করলাম, ফোন মেমরি থেকে সকল ভিডিও ডিলিট করে দিলাম, ইউটিঊবে সব ইসলামিক চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে নিলাম, কাজের বিরতিতে আল্লাহর কাছে তওবা করলাম, হাটতেছি তাতেও আল্লাহর কাছে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে ক্ষমা চাচ্ছি, শুয়ে আছি তাতেও, সবসময় আল্লাহ যিকির মুখের মধ্যে আছেই।

যার ফলে আল্লাহ হয়তো আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। আর প্রায় ৪ মাস হয়ে গেল আমি এইসব থেকে দূরে আছি। আর এখন নামাজে অনেক মজা পাই, এক ওয়াক্ত নামাজ মিস হয়ে গেলে বুক ফেটে কান্না চলে আসে। এখন নিজেকে ছোট বাচ্চাদের মত মনে হয়,ছোট বাচ্চারা যেমন সব সময় হাসিখুশি থাকে আমিও তেমনই থাকি,কাজের ভিতর মজা পাই, সবার সাথে মিশে গল্প গুজব করে সময় কাটাই, আল্লাহকে ডাকি, সময়মত নামাজ পড়ি। জানিনা আমি কতটুকু পেরেছি,আর এইভাবে কতদিন থাকতে পারব,তবে আমি মনে করি আমি পেরেছি আল্লাহর বিশেষ রহমতে।

তাই ভাই আসুন, আমরা যারা এখনও এই খারাপ কাজের সাথে জড়িত আছি আজকে এই মুহুর্ত থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে এই খারাপ কাজ থেকে ফিরে আসি। বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকি, দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি,সম্ভব হলে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই কান্নাকাটি করি। জান্নাত,জাহান্নাম,সম্পর্কে বেশি বেশি জানার চেষ্টা করি। দিনে অত্যন্ত কয়েকবার মৃত্যুকে স্মরণ করি। বিভিন্ন ইসলামিক আলোচনা শুনি।

আল্লাহ নিশ্চয় আমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন,কারণ আমরা আল্লাহকে যত ভালবাসি আল্লাহু তার চেয়েও অনেক বেশি আমাদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ নিজেও চান না তার বান্দারা জাহান্নামে যাক।

ভাই আমাদের হাতে কত সময় আছে আমরা কেউ জানিনা, তাই যতটুকু সময় পাই কাজে লাগাই,আল্লাহর পথে ফিরে আসি সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে। আমি পেরেছি ভাই,আপনিও পারবেন আমরা সবাই পারব ইনশা আল্লাহ।

ভাই আমরা সবাই একদিন মৃত্যু বরণ করব আগে আর পরে,তাই মৃত্যু আসার আগেই নিজেই প্রস্তুত করে নেই পরকালে শান্তির আশায়। পরকালে প্রতিটা কাজের জন্যই আমাদেরকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে, তখন ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ নাই,লুকোচুরির কোন সুযোগ নাই ভাই, তাই আসুন আমরা দুনিয়াতে এমন কোন কাজ না করি যাতে আল্লাহর কাছে লজ্জিত হতে হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুক (আমিন)।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

আগের পর্বগুলো-

খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (প্রথম পর্ব)
খুলে দাও হৃদয়ের দ্বার (দ্বিতীয় পর্ব)

শেয়ার করুনঃ
পর্ন আসক্তি গিলে খাচ্ছে কিশোরদের!

পর্ন আসক্তি গিলে খাচ্ছে কিশোরদের!

পর্ন আসক্তি গিলে খাচ্ছে কিশোরদের। নিরিবিলি সময় কাটানো, রাতে একা বিছানায় শুয়ে বাটন চাপছে অনর্গল। সবই পর্ন মুভি। রিডিং রুমে থাবা মেলেছে পর্ন মুভি। জীবনের শুরুতেই এমন আসক্তি পাল্টে দিচ্ছে কারো কারো জীবন। কেউ কেউ কিশোর বয়স থেকেই হয়ে উঠছে বেপরোয়া। নারীসঙ্গ খুঁজতে হয়ে উঠে পাগলপ্রায়। এই কিশোরদের দিয়েই ঘটছে অঘটন।
.
রাজধানীর একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সুফি আয়ান। বাবা ইতালি প্রবাসী। মা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে আয়ান ছোট। বড় বোন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবিতে পড়ছেন। মা অফিসে, বড় আপু বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় স্কুলের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টা তাকে একাই বাসায় থাকতে হয়। আর এ সময়টা সে স্মার্ট ট্যাব নিয়ে পড়ে থাকে। এতো কম বয়সেই তাকে চোখে বইতে হচ্ছে ভারি পাওয়ার ওয়ালা মোটা কাচের চশমা। স্কুল থেকে ফিরে কোনোভাবে ড্রেসটা চেঞ্জ করে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। প্রায় সময়ই একা ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। একা রুমে সারাদিন কি করে তার খবর জানে না মা বা বড় বোন।
.
একদিন অনার্স পড়ুয়া বোন বাসায় এসে দেখে ট্যাব হাতে নিয়েই কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছে তার আদরের ছোট ভাই। ট্যাব বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ তার বোনের চক্ষু চড়কগাছ। যে ভাইকে খুব ছোট বলে এতদিন জেনে এসেছে তার ট্যাবে কিনা পর্ন সাইটের ভিডিও চলছে। অফিস থেকে মা ফেরার পর তাকে পুরো বিষয়টা জানায়। এরপর সুফির মা ছেলের সঙ্গে ফ্রি হওয়ার ভান ধরে কিছু অ্যাডাল্ট গল্পের ছলে জানতে পারে ছেলে অনেক আগে থেকেই পর্ন মুভির প্রতি আসক্ত। আর সে এসব কোথা থেকে জেনেছে জানতে চাইলে সুফি জানায়, ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন সর্বপ্রথম তার এক বন্ধুর ট্যাবে ৮-১০ বন্ধু মিলে বিদেশি বিভিন্ন পর্ন ভিডিও দেখে।
.
একইভাবে রাজধানীতে সরকারি চাকরিজীবী এক বাবা একদিন তার ইন্টারমিডিয়েটে পড়ুয়া কিশোর ছেলে রায়হানকে দেখে রুমের দরজা আটকে ওয়াইফাই কানেকশন দেয়া কম্পিউটারে বসে অ্যাডাল্ট মুভি দেখছে। ছোট সময় বাচ্চাদের মা মারা যাওয়ার পর আর বিয়ে করেননি বাবা সায়েম ফরায়েজী। দুই ছেলেকে নিয়েই চলছে সংসার। ছেলের এই বিপথে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি সায়েম। তাই একদিন ছেলেকে প্রচণ্ড মার দেয়ার কারণে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে পায় ছেলেকে। এ সময় তার বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারে স্কুল শেষ করে সারাদিন একা একা বাসায় থাকতে খুব বিরক্ত লাগার কথা সে তার আরেক বন্ধুকে জানালে সে তাকে এই অ্যাডাল্ট মুভি দেখতে পরামর্শ দেয়। তাই যখনই সুযোগ পায় তখনই পর্ন মুভি দেখে রায়হান। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ‘প্রযুক্তি’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে পর্নোগ্রাফি দেখার কারণে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। যৌন সহিংসতার প্রতি আকৃষ্ট হয়, অশ্লীলতার চর্চা বেড়ে যায়। মা-বাবাকে অসম্মান করতে শেখে, সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যায়, মনে ধর্ষণের ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে।
.
রাজধানীর স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পর্নছবির আসক্তি। ইন্টারনেটে পর্নসাইটের অনিয়ন্ত্রণ খুব সহজেই শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার জগতের দিকে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এই শিশু-কিশোররাই জড়িয়ে পড়ছে বড় বড় অপরাধের সঙ্গে।
.
একটি বেসরকারি গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজধানীতে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৭ ভাগ কোনো না কোনো ভাবে পর্নোগ্রাফি দেখছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিকৃত যৌন শিক্ষার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা এসব শিশু পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারকে কঠোর হবার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
.
বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি একশ’ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৬৬ জনই যৌন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। মনোচিকিৎসকরা মনে করেন, এভাবে ছেলেমেয়েদের মধ্যে পর্ন আসক্তি বাড়তে থাকলে আগামী দুই দশকের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ আর ধর্মীয় অনুশাসন বলে কিছু থাকবে না।
.
বর্তমান যুগে যোগাযোগের সহজ মাধ্যম ইন্টারনেট। আর এ ইন্টারনেটেই যখন সহজ প্রবেশাধিকার দিয়ে ইনডেক্স করা ৪৫০ মিলিয়ন পর্নোগ্রাফিক সাইট তখন প্রিয় সন্তানের জন্য অভিভাবকের উদ্বিগ্নতা প্রশমিত করার যেন উপায় থাকে না। যখন পরিসংখ্যান বলে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সের ৩৮ ভাগই ইন্টারনেটে আসক্ত তখন অভিভাবকদের ভাবতে হয় অনেক কিছু। আর সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের কারণে সম্পূর্ণ অপ্রতাশিতভাবে ৫ থেকে ৭ বছরের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ১২ শতাংশ এবং ৮ থেকে ১৭ বছরের ১৬ শতাংশ শিশুর সামনে ইনডেক্স করা এই ৪৫০ মিলিয়ন পেইজগুলোর সাজেশন্স চলে আসে। শিশু মন পরিচিত হয় পর্নোগ্রাফি নামক ভয়াল মানসিক বিকারের সঙ্গে। পরিসংখ্যানের এ তথ্যে, আধুনিক প্রযুক্তিকে আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হিসেবেই ধরা হয় অভিভাবকদের জন্য।
.
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উঠে এসেছে দেশের ৭৭ শতাংশ কিশোর-কিশোরী পর্ন দেখে। আর এগুলো দেখতে তারা ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ট্যাবের মতো সহজলভ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। এছাড়া ঘরে ঘরে ব্রডব্যান্ড আর ওয়াইফাই সহজলভ্য হওয়াতে এর বিস্তার বেড়েছে অনেক বেশি। শিশু কিশোরদের জন্য পর্ন দেখা সামাজিকভাবে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সুস্থ স্বাভাবিক যৌন শিক্ষা না থাকায় শিশু কিশোরদের মনোজগতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অল্প বয়স থেকেই পর্ন মুভি দেখার ফলে নানারকম সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটছে। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মাঝে অ্যামেচার পর্ন বানানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ।
.
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের করা একটি কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, মিসেস শায়লা একটি স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা। ওনাকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। একদিন পরীক্ষার হলে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে তিনি বকা দেন অসদুপায় অবলম্বন করার জন্য। এ ঘটনা তিনি ভুলেই যেতেন। কিন্তু দু’দিন পরে উক্ত শিক্ষিকার বাথরুমের বাইরের দেয়ালে খুবই আপত্তিকর এক ছবি আঁকা দেখতে পান ওই শিক্ষিকা। আর সেই ছবির নারী পুরুষের জায়গায় ওনার আর এক জুনিয়র শিক্ষকের নাম লেখা। এই ঘটনায় তিনি খুবই মর্মাহত হন আর ভেঙে পড়েন। তদন্তে বেরিয়ে পড়ে কাজটি সেই ছাত্রের করা আর এই দুজন শিক্ষক তাকে আরেকজনের খাতা দেখে লেখায় বকা দিয়েছিল। তাই সে প্রতিশোধ নিতে এমন কাজ করেছে। একটা শিশুর ভাবনার অস্বাভাবিকতা উঠে আসে এ ধরনের ঘটনায়।
.
শিশু কিশোর উন্নয়ন ও মনো-সামাজিক সংস্থা প্রেরণার সাধারণ সম্পাদক ও সাইকো থেরাপিস্ট এসজেড রেজিনা পারভীন বলেন, বয়ঃসন্ধিকালে প্রত্যেক শিশুকেই সুস্থ আর স্বাভাবিক যৌনতা সম্পর্কে জানা উচিত। যদি না জানে তার ফলে দেখা যায় তারা পর্নসহ বিভিন্ন অ্যাডাল্ট সাইটগুলো দেখে যৌন সম্পর্ককে অস্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে তাদের সামাজিক আচরণে। এমনকি বড় হওয়ার পরে দাম্পত্য সম্পর্কে এর প্রভাব পড়ছে। অনেক সময়ই অনেক স্বামী পর্ন মুভি যেভাবে দেখে ঠিক একইভাবে যৌন সম্পর্ক করতে চায় আর স্ত্রী রাজি না হলে শুরু করে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার।
.
পর্ন মুভি ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে। তাই ইন্টারনেটে এগুলো খুবই সহজলভ্য। স্বাভাবিক নানা বিষয়ে সার্চ করলেও পর্ন মুভির লিংক চলে আসে। আর ইদানীং সবচাইতে ভয়ানক যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হল অডিও পর্নের প্রচলন। এটাই এখন সবচাইতে ভয়ানক। একজন কিশোর কানে হেডফোন গুঁজে কী শুনছে তা সহজে বোঝা যাবেনা। সামনে বই খুলে বসে অডিও পর্ন শুনে শুনে আপনার আদরের শিশু বা কিশোর সন্তানটির সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত ধারণা পাচ্ছে। সে তখন নিজের পরিবারের নারী ছাড়া বাকি সব নারীদের নিয়ে বাজে চিন্তা করছে আর এটাকে সে মোটেই খারাপ ভাবছে না। শুনতে শুনতে তার কান ও চোখ এটাকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করছে।
.
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন পর্নোগ্রাফি অন্যান্য মাদকের মতোই একটা আসক্তি। মাদক যেমন মাদকাসক্তকে প্রভাবিত করে, নীল ছবিগুলোও মানুষের মস্তিষ্কে ঠিক সেভাবেই প্রভাব ফেলে। শিশু কিশোরদের বেলায়তো আরো একধাপ এগিয়ে। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় পর্নোগ্রাফি আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়ানক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষ্পাপতার দিন শেষ হয়ে গেছে। মানুষ এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক কিছুই জানতে পারে। এটা হচ্ছে ঘরে হেরোইন রেখে শিশুকে ছেড়ে দেয়ার মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী জেফরি সেটিনোভারের মতে, আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে, পর্নোগ্রাফির আসক্তি হেরোইনের মতোই। বিজ্ঞান গবেষকদের দাবি, যারা অধিক মাত্রায় অশ্লীল দৃশ্য উপভোগ করেন, তাদের মগজের ধূসর পদার্থ উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষা থেকে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে অবিরল যৌন দৃশ্য উপভোগ করলে মস্তিষ্কে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। আমরা শঙ্কিত যে আগামী প্রজন্ম একটি মেধাহীন ও অসুস্থ সমাজ উপহার দিবে।
.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, কিশোরদের প্রেমঘটিত কারণসহ নানা কারণে পর্নোগ্রাফিসহ বিভিন্ন ধরনের অন্যায় কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে সরকারিভাবে কিশোরদের পর্নসাইটে প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক দেশের সরকার এই সাইটগুলো বন্ধ করলেও আমাদের দেশে ওভাবে বন্ধ হয়নি। শিশু কিশোরদের বয়সের ডিমান্ড কমাতে বয়স এবং বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রেখে তাদের চাহিদা পূরণ করতে হবে। যে বয়সে যতটুকু প্রাপ্য তাকে ততটুকু সুবিধা প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এক ধরনের প্রেসার থাকতে হবে। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
.
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, কিশোরদের পর্ন আসক্তি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে- রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক, সামাজিক উদাসীনতা। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পর্ন সাইট বন্ধ করে দিয়েছে। যেটা আমাদের দেশে এখনো ওভাবে হয়নি। দ্বিতীয়ত হচ্ছে বর্তমান সময়ে বাবা মা এতটাই ব্যস্ত সময় কাটায় যে তাদের সন্তানকে খুব একটা সময় দিতে পারে না। ফলে শিশুরা একাকী সময় কাটাতে এবং শরীর বৃত্তীয় কামনা নিবৃত্ত করতে পর্ন সাইটের আশ্রয় নেয়। এই সর্বনাশা পথ থেকে সন্তানদের ফেরাতে বাবা মা’ই পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।
.
সমাজবিজ্ঞানি অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, আমাদের সমাজে ফ্যামিলি বন্ডিংসটা কমে যাচ্ছে। বাবা মায়েরা অনেক বেশি ব্যস্ত থাকায় ছেলেমেয়েকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারে না। একই সঙ্গে প্রযুক্তির যেমন ভালো দিক আছে তেমনি খারাপ দিকও আছে। এক্ষেত্রে বাচ্চাদের কোনো বিষয়ে চাপ প্রয়োগ না করে তার মধ্যে এমন মনোবৃত্তি তৈরি করতে হবে যেন সে লুকিয়ে লুকিয়ে পর্নোগ্রাফি বা নিষিদ্ধ কোনো জিনিসের প্রতি আসক্ত না হয়। বাচ্চাদের এই পজেটিভ মনোবৃত্তি তৈরিতে পরিবার, বাবা-মা, শিক্ষক, গণমাধ্যম সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
.
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সস্টিটিউটের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. নাসরীন ওয়াদুদ বলেন, চীনসহ বিভিন্ন দেশে পর্ন সাইটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যেটা আমাদের দেশে বহালতবিয়তে চলছে। আমাদের সমাজে অতি আধুনিক কিছু বাবা মা তাদের সন্তানদের কিশোর বয়সেই হাতে একটি স্মার্ট ফোন কিনে দিয়ে জাতে উঠতে চায়। ফলে বাচ্চারা তাদের ইচ্ছামতো বিভিন্ন সাইটগুলোতে প্রবেশ করে খেয়ালখুশিমতো পার পেয়ে যাচ্ছে। এভাবেই এক্সাইটমেন্টের জায়গা থেকে কিশোররা একটু একটু করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অপরাধের দিকে পা বাড়ায়। কিশোরদের এই অতিমাত্রায় আধুনিকতা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য বিপদ বয়ে আনবে।
.
সূত্র: মানবজমিন
.
অবশ্যই দেখুন- https://tinyurl.com/y43344jc
পড়তে পারেন-
শেয়ার করুনঃ
যৌনশিক্ষা: যে কথা যায় না বলা

যৌনশিক্ষা: যে কথা যায় না বলা

যৌনতা নিজেই একটা ট্যাবু (যে কথা যায় না বলা)। ব্যাপারটা এমন না যে, শুধু পাক-ভারত-বাংলাতেই ট্যাবু, বা মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতেই ট্যাবু। বেসিকালি চিরকাল ট্যাবুই ছিল একেশ্বরবাদী সমাজগুলোতে। রক্ষণশীল ইহুদী সমাজে ও ক্যাথলিক সমাজে যৌনবিষয়ক খোলামেলা আলোচনা হত, এমন খবর চোখে পড়ে না। মূর্তিপূজারী এবং প্যাগানসমাজে যৌনতা খানিকটা খোলামেলা থাকায় আলোচনাও ট্যাবু ছিল না, কখনোসখনো সেক্স ছিল পূজারই অংশ। এজন্য বাৎসায়নের কামসূত্র, খাজুরাহোর মন্দির, শিবলিঙ্গপূজায় এর আঁচ করা যায়। পরবর্তীতে দীর্ঘ মুসলিম শাসনের প্রভাবে যৌনবিষয়ক আলোচনা ব্যাপকতা হারায় এতদাঞ্চলে। গ্রেকো-রোমান সমাজে সমকামের ব্যাপক প্র্যাকটিস প্রমাণ করে যে স্বাভাবিক যৌনতাও কতটা খোলামেলা ছিল।
.
পুঁজিবাদের উত্থানে যখন সামাজিক-পারিবারিক-ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াতে থাকল, তখন ট্যাবুগুলোকে ভেঙে ব্যবসাবান্ধব করার প্রয়োজন দেখা দিল। বিংশ শতকের শেষভাগে এসে এমন এমন সব থিওরির দেখা মিলল, যা যৌনতার সংজ্ঞাকেই বদলে দিল। খুব ভালো করে দেখেন, যৌনতার সংজ্ঞা বদলে দিতে পারলে সামাজিক-পারিবারিক-ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো সব ভেঙে দেয়া যায় কারো মনে জেতা-ঘোড়ার উপর বাজি ধরতে পারলে, মানে বিজ্ঞানের মিশেলে যদি যৌনতার এইসব বিকৃত সংজ্ঞা বসিয়ে দিতে পারেন; তাহলে ধর্ম ও পরিবার থেকে তাকে বের করে আনা যায়। এখন সে পুঁজিবাদের সকল দোকানের সহজ শিকার, বান্ধা কাস্টমার। সেক্সুয়াল ফ্লুইডিটি, ট্রান্স-জেন্ডার, লাইফস্টাইলের নামে পশুকাম-সমকাম, ‘লিঙ্গ নাকি দৈহিক বিষয় না, সমাজ কর্তৃক আরোপিত’-ইত্যাদি কনসেপ্টের নামে সেই আয়োজনই করছে পুঁজিপতিরা। গে-জিনের আবিষ্কর্তা নিজে সমকামী, ‘জেন্ডার’ কনসেপ্টের পুরোধা জন মানি নিজে উভকামী। এগুলো না ধরতে পারলে আসেন মুড়ি খাই।
.
আমার স্বল্প পড়াশুনায় মনে হয়েছে, ইসলাম যৌনতাকে ঠিক সেভাবেই দেখে যেভাবে দেখা প্রয়োজন। এটা একই সাথে ট্যাবু (আলোচনা নিষেধ) এবং আলোচনা জরুরি। এর অবাধ আলোচনা যেমন নির্লজ্জতা, এর আলোচনা না থাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। ঠিক ততটুকুই আলোচনা হওয়া চাই, যতটুকু ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ ঠিক রাখতে দরকার। প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে ইয়ার্কি-ফ্যান্টাসির সীমায় গিয়ে পড়লে এটা অবশ্যই ট্যাবু। ‘সত্য বলতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল লজ্জা পান না’ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথাতেই বুঝা যাচ্ছে, যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু যৌন-আলোচনা বা যৌন শিক্ষা দীনেরই অংশ, যেহেতু যৌনজীবন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এজন্য ইসলামে রজঃচক্র, স্বামী-স্ত্রী সহবাস, জানাবাত, বালেগ হওয়া প্রভৃতি সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা এবং আরও বিস্তারিত আলোচনার সূত্র দেয়া হয়েছে। কুরআন-হাদিস-ফিকহের কিতাবাদিতে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয়তা ও প্রায়োগিকতার মাঝে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, যা দীনী ইলমেরই অংশ।
.
অথচ আজ মুসলিম সমাজেও যৌনশিক্ষা ট্যাবু কেন? যখন থেকে ব্রিটিশরা শিখিয়েছে ‘ইসলাম হল ধর্ম, জাস্ট ধর্ম’; সেদিন থেকে আমাদের ধ্বংস শুরু। নামাজ-রোযা-হজ্জের বাইরে আর কোথাও ইসলাম নেই। বাজার-অর্থব্যবস্থা-বিচার-আইন-লাইফস্টাইল সবখানে ইসলাম অপাংক্তেয় হয়ে গেছে সেদিন থেকে। ইসলাম মানে আর ‘আত্মসমর্পণ’ থাকেনি, ইসলাম মানে হয়ে গেছে ‘শান্তি’। স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানেও যে ইসলাম আছে, আমার আর আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাঝেও যে ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে— তা আজ স্বীকারই করে না, এমন মুসলিমও আছে। এজন্যই শোনা যায়— ‘সবকিছুর মধ্যে শুধু ধর্ম টেনে আনিস কেন?’। টেনে আনব কেন, ইসলাম তো আছেই সবকিছুর মধ্যে সবকিছুতে নিজের ইচ্ছাকে দমিয়ে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণকেই তো বলে ইসলাম।
.
ভূমিকা অনেক বড় হয়ে গেল, স্যরি। আপনি যদি সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষাটা তাকে না দেন, তবে বেঠিক সময়ে বেঠিক লোকে তাকে বেঠিক শিক্ষাটা দেবে। হয় সে বখে যাওয়া কোন বন্ধুর থেকে শিখবে, না হয় ইন্টারনেট তার শিক্ষক হবে, নয়তো কোন পর্নোম্যাগাজিন বা কলিকাতা হার্বালের পোস্টার থেকে সে যৌনতা সম্পর্কে একটা ভুল এবং অপ্রায়োগিক জ্ঞান পাবে, যার সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই।
  • কোন ‘ইঁচড়ে-পচা’ বন্ধু তাকে শেখাবে ‘ডানহাতি স্ক্রু নিয়ম’। (সায়েন্সের পোলাপান বুঝবে)
  • ইন্টারনেট তার কাছে বমির-যোগ্য কিছু প্র্যাকটিসকে পবিত্র ও উপভোগ্য করে তুলবে।
  • ফুলবডি মেকাপ ও সিলিকন জেল ঢুকানো পর্নোস্টারগুলো স্বাভাবিক নারীদেহ সম্পর্কে তার মনে ভুল প্রত্যাশা গড়ে তুলবে।
  • সার্জারি করে বানানো অতিকায় পুরুষাঙ্গ তার মনে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স তৈরি করবে।
  • ভায়াগ্রা খেয়ে ৭ দিন ধরে শুটিং করা ১০ মিনিটের ভিডিও বিয়ে নিয়ে তার মনে অমূলক অহেতুক আশঙ্কা তৈরি করবে।
  • আর বড় বড় করে ‘যৌন’ লেখা কলিকাতা হার্বালের পোস্টার তাকে বুঝাবে— তোমার শরীর থেকে কী না কী ইম্পর্টেন্ট জিনিস বের হয়ে যাচ্ছে, তু তো গ্যায়া।
.
আমি তো মনে করি প্রতিদিন যাদের বিয়ে হচ্ছে, ১% এরও সঠিক যৌনশিক্ষা নেই। সেদিনও এক রুগী পেলাম, ১০ মাস বিয়ে হয়েছে। দ্রুত বীর্যপাত হয়, দ্রুত নরম হয়ে যায়। ১০ মাস ধরেই এমন। স্ত্রী এখন ফোনে তার আরেক বন্ধুর সাথে বেশি বেশি সময় দিচ্ছে। অথচ সামান্য একটু যৌনশিক্ষা হয়ত জীবনটা সুখময় করতে পারত, যদিও সবই তকদীর, আমাদের সচেতন চেষ্টার কথাই বলছি।
.
পিরিয়ড শুরু হয়ে গেলে আমাদের মেয়েরা বেসিক যৌনশিক্ষাটা মায়ের কাছ থেকে পেয়ে ফেলে। নারী-পুরুষ বায়োলজির কারণ, ক্রিয়া, পিরিয়ডের কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে মেয়েরা জেনে নেয় মায়ের কাছে থেকে। এজন্য মেয়েদের জানাটা সেফ ও সঠিক হয়। যতটুকু আলোচনা মা-মেয়েতে হয়, দীনী সীমারেখাগুলো আলোচনা করা থাকলে তা যথেষ্ট। আমরা একটা ডেমো দেখব একটু পরে। আর বিয়ের আগে ভাবী/বড়বোন/ সমবয়েসী খালা-ফুপুদের কেউ সহবাস রিলেটেড আলোচনাগুলো করে দিলেই হয়ে গেল। তবে সমস্যা হল, সবাই এগুলো নিয়ে জোকস করে, কেউ সিরিয়াসলি কিছু আলোচনা করে দেয়া দরকার। অবশ্য যাঁরা আলোচনা করবেন, তাঁদের ক’জনারই স্পষ্ট ধারণা আছে।
.
সমস্যা হল ছেলেদের, ব্যাপক সমস্যা। মেয়েরা মায়েরও ক্লোজ থাকে, বাবারও আদর পায়, পারতপক্ষে বাবারা মেয়েদের বকুনি/পিটুনি দেয় না বললেই চলে, মেয়েদের অত শাসন লাগেও না। কিন্তু ছেলেরা মায়ের আহ্লাদ পায়, কিন্তু এসব বিষয়ে ফ্রী হওয়া সম্ভব না। আবার বাপের সাথে কিছুটা মার-পিটের সম্পর্ক থাকে বলে বাবার সাথে বেশ দূরত্ব নিয়েই বড় হই আমরা। বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো। একারণে মেয়েরা যতখানি সঠিক যৌনশিক্ষা নিয়ে বড় হয়, ছেলেদের মনে ততটাই বেঠিক শিক্ষা গেড়ে বসে। তবে ফাইনাল কথা হল, ছেলেরা যৌনশিক্ষা বাপের থেকেই পেতে হবে। কেননা বাপ ছাড়া আর যত সোর্স সে এই বয়সে পায়, সবাই তাকে ভুল শিক্ষাটাই দিবে। বাপ হয়ে কীভাবে সম্ভব? কেন, মা হয়ে মেয়েকে শেখাতে পারলে বাপ হয়ে কেন পারবেন না? এসব ন্যাকামো বাদ দেন, বিষয়টা কতখানি জরুরি এটা ফীল করি আসেন। ছেলে পর্নো-আসক্ত বা সমকামী হয়ে গেলে তখন তো হায় হায় করবেন। কিছু পয়েন্ট মনে রাখতে হবে—
.
– বিষয়টা বার বার আলোচনা করার মত না। বার বার আলোচনা করলে সন্তান আর ভয় পাবে না আপনাকে, ওয়েট লস হবে। এজন্য আলোচনা হবে একদিনই, মাইন্ড ইট।
– আলোচনাটা হবে ইয়ার-দোস্ত স্টাইলে না, শিক্ষক-ছাত্র স্টাইলে। শিক্ষক-ছাত্র আজকের কনটেক্সটে বুঝা যাবে না। ওস্তাদ-শাগরেদ স্টাইলে।
– বাপ-ছেলে বা রাজা-প্রজা স্টাইলে হলে সে আপনার কথাটা নিতে পারবে না, হুকুম টাইপ কিছু মনে করবে। এজন্য হয়ে পারে বাপ-বেটা কোথায় বেড়াতে গেলেন, সাথে নিয়ে মার্কেটে গিয়ে একসাথে কিছু কিনলেন, একসাথে মাকে ছাড়া কোন রেস্টুরেন্টে খেলেন। মূল কথা পাড়ার আগে এমন কিছু একটা করতে হবে। যাতে পরের আলোচনাটা ‘হুকুম’ আকারে না হয়ে ‘ট্রেনিং সেশন’ আকারে হয়।
.
– শুরুটা এমন হতে পারে:
বাবা শোনো, তোমার সাথে খুব জরুরি একটা বিষয়ে আলোচনা করব। তুমি আজকের এই আলোচনাটা জীবনে কোনোদিন ভুলবে না। এমনকি আমি যেভাবে তোমাকে বলছি, সেভাবে তুমিও তোমার ছেলের সাথে এভাবে আলোচনা করবে। তুমি এখন এখন বড় হচ্ছো। ভেবে দেখ, একসময় তুমি খেলনা গাড়ি কত পছন্দ করতে। এখন তুমি ক্রিকেট সেট, ফুটবল এসব পছন্দ কর। বড় হবার সাথে সাথে তোমার মনের কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে, দেখেছো? একইভাবে তোমার দেহেও পরিবর্তন এসেছে/আসছে/আসবে। লম্বায় বড় হবার সাথে সাথে তোমার গলার স্বর মোটা হবে, যেমন আমার। তোমার শরীরের গাঁথুনি শক্তপোক্ত হবে… এরই অংশ হিসেবে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে প্রস্রাবের বদলে আঠালো এক ধরনের তরল আসতে পারে। তুমি ভয় পাবে না, এটাই স্বাভাবিক, সবার হয়, তোমার মত বয়সে আমারও হয়েছে। কখনও দেখবে ঘুমের ভিতরে বেরিয়েছে, ভয়ের কিছু নেই, এটা কোন অসুখ না…
.
– স্বপ্নদোষ বেশি হওয়াও কোন অসুখ না, এটা বুঝাবেন। একটা গ্লাসে দেড় গ্লাস পানি রাখলে বাকিটুকু উপচে পড়ে। তেমনি একটা বিষয় স্বপ্নদোষ। উৎপাদন তো চলছেই, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হয়ে গেলে বেরিয়ে আসে। এখন তোমার করণীয়, বেশি বেশি ভাল ভাল খাবার খাওয়া। ফলমূল খাওয়া। ডিম-মাছ-মাংস খাওয়া। মন থেকে টেনশন দূর করে দেবেন।
.
– নারী-পুরুষ কেমিস্ট্রিটা খুব সংক্ষেপে বলে দেবেন:
দেখ, দুনিয়ায় দুই ধরনের মানুষ আছে। পুরুষ আর মহিলা। তোমার কি প্রশ্ন জাগে, কেন মানুষ এক ধরনের হল না? এটা হচ্ছে সিস্টেম। তোমার শরীরে যে আঠালো পদার্থ তৈরি হচ্ছে, সেটা হল বীজ। আর তুমি যে মেয়েকে বিয়ে করবে তার শরীরে এই বীজ পৌঁছালে, তোমাদের সন্তান জন্ম নেবে। এভাবে মানুষের জন্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন আল্লাহ। এভাবে নতুন শিশু জন্ম নেয়।
.
– আবার আল্লাহর হুকুম জানিয়ে দিতে হবে:
তোমার দুষ্টু বন্ধুরা তোমাকে বিভিন্ন আজেবাজে বুদ্ধি দেবে। তুমি আমার কথা মনে রাখবে। সন্তানের জন্য বাবার চেয়ে ভালো আর কেউ চায় না। এই বীজ এমনিতেই উপচে বেরিয়ে গেলে সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি স্বেচ্ছায় বের করলে আল্লাহ ভয়ংকর রাগ হবেন। তোমার শরীর ভেঙে পড়বে, তোমার বিবাহিত জীবনেও নানা অসুখবিসুখে অশান্তিতে আক্রান্ত হবে। এই বীজ কেবল তোমার স্ত্রীর জন্য, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নিজেকে শেষ করে দেবেনা। মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হবে, ভালো লাগবে। কিন্তু আল্লাহ তোমাকে সেটা নিষেধ করেছেন, তোমার দৃষ্টিও কেবল তোমার স্ত্রীর জন্য। কোন খারাপ ছবি-সিনেমা থেকে সবসময় দূরে থাকবে, এগুলো যে বন্ধুরা দেখে বা দেয়, তাদের থেকেও দূরে থাকবে। নাহলে তোমার ভবিষ্যত কিন্তু অন্ধকার হয়ে যাবে, বাবা। সাবধান… বাবা হিসেবে তোমার কাছে আমার অনুরোধ। আর এ বিষয়ে যেকোন সমস্যা বা প্রশ্ন তুমি বন্ধুদের করবে না, আমাকে করবে, ঠিক আছে বাবা?
.
রাফলি এমন। এখন, কোন সময়ে আপনি তাকে এই সেশনটা নেবেন? কখন? ১১-১২ বছরে ছেলেরা বালেগ হয়। তবে এখন পর্নোর যুগে ৯-১০ বছরের বাচ্চারাই সব বোঝে। যদি সন্দেহ উদ্রেককারী লক্ষণ না পান তবে ১১-১২ বছরেই আলোচনাটা হবে। আর সন্দেহের কিছু পেলে, তখনই। আর মায়েরা মেয়েদের সাথে যথেষ্ট আলোচনা তো করেনই। বাকি আরেকটু জিনিস স্পষ্ট করে দেবেন:
.
– নারী-পুরুষ কেমিস্ট্রিটা:
মেয়েদের প্রতিমাসে একটা ডিম আসে, ডিম্বাণু বলে তাকে। একটাই পরিপক্ব হয়। ওটার প্রভাবে জরায়ুর (যেখানে বাচ্চা থাকে) জমিনটা উর্বর হয়, বীজ নেবার মত উপযুক্ত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে বীজ পেলে তো বাচ্চা তৈরি হবে। আর যদি না পায়, তবে পুরো জমিনটা চাকা চাকা রক্তের আকারে বেরিয়ে আসে। এটা স্বাভাবিক, তুমি যেহেতু এখন বড় হয়েছো। এই বীজটা কোথায় আছে? বীজ আছে তোমার স্বামীর দেহে…
.
– আর আল্লাহর হুকুমগুলো:
আর এখন তুমি বড় হচ্ছ। মেয়েদের শরীরে যে সৌন্দর্য সেটা তোমার মাঝে এখন আসছে। ছেলেরা তোমার দিকে তাকাবে, তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইবে। তুমি কারো দিকে তাকাবে না। কোন ছেলের সাথে কথা বলবে না… তোমার স্বামীর সাথে বিয়ে হবার আগ পর্যন্ত নিজেকে হেফাজত করে চলতে হবে…খারাপ বান্ধবী যারা ছেলেদের সাথে সম্পর্ক করে, আজেবাজে গল্প করে তাদের এড়িয়ে চলবে।
.
এখন কিশোর-কিশোরীদের নাকি আবার যৌনশিক্ষা দেয়া হচ্ছে সরকারি-বেসরকারিভাবে। সেখানে যৌন-তারল্য (তুমি যা ভাবো তাই তোমার যৌনতা, লিঙ্গের উপর না) শেখানো হয়। পারস্পরিক সম্মতিতে যৌন অনুভূতি প্রকাশ নাকি দোষণীয় না। সমকামিতাকে ইনিয়েবিনিয়ে স্বাভাবিক করে তোলা হয়। এরকম জঘন্য পরিস্থিতিতে আপনি যদি তাকে সঠিক শিক্ষা দিতে লজ্জা করেন, তাহলে আল্লাহ মাফ করুন অনাকাংক্ষিত কোন ঘটনায় কাকে দোষ দেবেন। আরেকটা বিষয়, তাকে ছোট করে না রেখে, এ বয়সেই তাকে আদর্শ স্ত্রী বা স্বামী হবার মানসিক শিক্ষা দেয়া শুরু করুন। মানসিক শিক্ষাগুলো বার বার দেয়া যাবে, সমস্যা নেই। পুঁজিবাদ যদি এ বয়সে তাকে সেক্সের জন্য ফিট মনে করে যৌনশিক্ষার জন্য উপযুক্ত মনে করে, তাহলে আপনি কেন তাকে সংসারশিক্ষার জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না? বড় হয়ে ওঠা বয়সের দ্বারা নির্ধারণ হয় না, শিক্ষার দ্বারা হয়, মানসিক পরিপক্বতার দ্বারা হয়। আগের যুগে দেখেন ১৭-২৫ বছরেই তাদের কত কত অ্যাচিভমেন্ট, এখন কেন হচ্ছেনা। মনের বয়সকে আমরা আটকে দিয়েছি বলে। খেলাধুলা-কার্টুনের মাঝে তার সত্তাকে সীমাবদ্ধ ভাববেন না। এগুলোর বাইরে আরেকটা জগত তার মনে গড়ে উঠা শুরু হয়ে গেছে— যৌনমনোজগত। শুরুতেই সেই জগতে একটা টীকা (ভ্যাক্সিন) দিয়ে দেয়া আপনারই কাজ, যাতে পরে কোন রোগজীবাণু ঢুকতে না পারে। সঠিক ধারণাটা দিয়ে দিলে, ভুল ধারণাগুলো জায়গা পাবে না।
.
আরও কোন কিছু বাদ গেল কি না, জানাবেন। ‘কুররাতু আইয়ুন-২’ তে অ্যাড করে দিব ইনশাআল্লাহ। বিবাহিতদের যৌনশিক্ষার একটা আইডিয়া আমার কাছে আছে। ইনবক্সে অনেকেই পেয়েছেন, তারা অন্য বিবাহিতদের সাথে শেয়ার করবেন। আর অবিবাহিতদের জন্য একটা লিখছি, আল্লাহর ইচ্ছায়। পর্নো-হস্তমৈথুন সবকিছু মিলিয়ে তো, একটু সময় লাগছে।
.
আল্লাহ আমাদেরকে সন্তানের জন্য বেইজ্জতি হবার হাত থেকে হিফাজত করুন। আমীন।
(লিখেছেন- Shamsul Arefin Shakti)
শেয়ার করুনঃ