বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

….একবার তোমার এক আচরণে (এটা নিয়ে পরে কথা বলব) আমি বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। প্রথম বারের মতো তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলে। চোখ ফুলিয়ে কেঁদেছিলে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।আমাদের সম্পর্কের সুতো আলগা হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর তা আবার জোড়া লাগলো। সেই শুরুর দিনগুলোর মতো।  প্রেম পেকে টসটসে হয়ে গেল, তুমি আমার হাতে হাত রেখে ১০৮ বারেরও বেশি  জিজ্ঞেস করে ফেললে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো? আমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবে নাতো? বেশ চলছিল এরপর।পাগলামি, কফিশপ,সিনেপ্লেক্স, কথায় কথায় রাতভোর হয়ে যাওয়া, স্বপ্ন,কল্পনা…

হঠাত একদিন কানাডা থেকে এলো এক দমকা হাওয়া । সেই দমকা হাওয়ায় অচিন দেশের রাজকুমার তোমাকে নিয়ে উড়াল দিল । বিদায় নিতে তুমি এসেছিলে রবীন্দ্র সরোবরে । কেঁদে কেঁদে বলেছিলে,“আমাকে ক্ষমা করে দিও”।  আমি হেসেছিলাম। তোমার চোখের পানি মুছে দিয়ে  দুগালে নিজের দুহাত  রেখে বলেছিলাম, “পাগলি মেয়ে একটা”।

তারপর কত দিন, কত রাত চলে গিয়েছে চলে গেছে। কতো নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটেছে।  কতো রাত  আমি নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছি বিছানায় এপাশ ওপাশ  করে করে । একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করেছি। গভীর রাতে সাউন্ড সিস্টেম অন করেছি । মান্না দে কেঁদে কেঁদে জানিয়েছে সে অনেকদিন দেখেনি তার প্রিয়াকে ,তাহসান বলেছে চাঁদের আলো কখনো তার হবে না । মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে হলের সিড়িতে বসতাম। গাঁজায়  দুটো দম দিয়ে গান ধরতাম ‘গিভ মি সাম সানশাইন , গিম মি সাম রেইন ……’

খাওয়া দাওয়া করতাম না, ক্লাসে যেতামনা, ক্লাস টেস্টগুলোও মিস করতাম।  বাসা থেকে ফোনের পর ফোন দিত। ধরতাম না। পরে ফোন করে আম্মুকে ঝাড়ি দিতাম। রুমমেট, বন্ধু বান্ধব, স্যার, অনেকেই চেষ্টা করেছে  বোঝানোর । বুঝিনি আমি।

বন্ধুরা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল । এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো যেটা আমার জীবনের মোড় ঘুরে ঘুরিয়ে দিল ১৮০ ডিগ্রী ।

গাঁজা আর সিগারেটের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে  গোলগাল,ভালোছেলে দুই রুমমেট অন্য রুমে পালিয়ে বাঁচলো। । বেডদুইটা ফাঁকা পড়েছিল এক দিন। দরজা বন্ধ করে সারাদিন গাঁজা টেনেছিলাম । পরের দিন বেডদুটো আবার দখল হয়ে গেল। একজন আমার চাইতে দুই বছরের সিনিয়র। হুজুর। মুখে একগাল দাঁড়ি, চোখে চশমা , ইয়েমেনি এক শায়খের মতো দেখতে অনেকটা (পরে চিনেছিলাম)। মুখে সব সময় স্মিত হাসি । প্রথম দেখাতেই মানুষটাকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল । আমার বেহাল অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন উনি।

ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আমাকে বুঝিয়েছিলেন উনি । আমি তর্ক করেছি , মেজাজ হারিয়ে  একদিন  চিৎকার করে বলেছিলাম , ‘আমাকে আমার মতোই থাকতে দিন না ভাই। আপনারা হুজুর মানুষ ,ভালোবাসার কী বোঝেন’? সব মেয়েরা মিথ্যেবাদী,প্রতারক’।

ভালোবাসার কী বুঝি!  ভাই স্মিত হেসে আমাকে শুনিয়েছিলেন ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান । শুনিয়েছিলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) ,খাদীজার (রাঃ) প্রেমের কথা, শত বাঁধা বিপত্তির মুখেও দ্বীন প্রচারে মুহাম্মাদের (সাঃ) দৃঢ়তা আর খাদীজার (রাঃ) পাশে থাকার কথা । শুনিয়েছেন স্ত্রীর সঙ্গে মুহাম্মাদের (সাঃ) দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প, , স্ত্রীর এঁটো  পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করার গল্প,সওয়ারীর পিঠে উঠতে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার গল্প ।

কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, ‘ হে নবী, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন অ তার বিলাসিতা কামনা কর,তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থ্যায় তোমাদের বিদায় দেই’। (সূরা আহযাবঃ আয়াত ২৮)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সব স্ত্রীদের জানিয়ে নিলেন। তাঁদেরকে বেছে নেবার সুযোগ দিলেন হয় আমাকে পাবে অথবা এই দুনিয়ার ভোগবিলাস,চাকচিক্য। তাঁর সব স্ত্রীরা একবাক্যে জানিয়ে দিলেন, ‘ আমরা আপনাকেই চাই ইয়া রাসূলুল্লাহ’।

এমন এক সংসার তাঁরা বেছে নিলেন যেখানে, মাসের পর মাস চুলায় আগুন জ্বলেনা, খেজুর খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়, নবীর স্ত্রী হয়েও মোটা কাপড় পরিধান করতে হয়, সংসারের কাজ করতে গিয়ে কালিঝুলি মাখতে হয়, জরাজীর্ণ কুটিরে  খেজুরপাতার বিছানায় শুতে হয়।

.আমি শুনেছি আর মুগ্ধ হয়েছি ।

এমনটাও হয়!

রূপকথার ভালোবাসাও যে হেরে যায় এর কাছে।

যদি আমাদের ঘর বাঁধা হতো, যদি আমাদের এরকম দারিদ্রতার মুখোমুখি হতে হতো, তুমি কী এভাবেই আমাকে ভালোবাসতে? কক্ষনো নয়। এই অবস্থায় পড়লে প্রথম সুযোগেই ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতো। সিনেমা বা ডেটিং এ না নিয়ে গেলে, তুমি যেরকম করতে আমার সাথে, মাসের পর মাস আধপেটে  থাকা, জীর্ণ পোষাক পরিধান করা… উফ! সম্ভবই না।

ভাই আমাকে বুঝিয়েছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে…

তুমি তো হেরেই গেলে। লুজার হয়েই রইলে আজীবন!
বালিকা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এক পলক দেখেই তুমি যাকে ভালোবেসেছিলে, ক্যারিয়ার, পড়াশোনা, শ্বাসত নিয়ম কানুন ভেঙ্গেচুরে কাঙ্গালের মতো ছুটে বেড়িয়েছিলে যার পিছু পিছু, সেই বালিকা তোমাকে ভুলে গিয়েছে।

একসময় তোমার কবিতা শোনার জন্য যেই বালিকা একটু পর পর ফোন করে জ্বালাতো, তোমার নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখলেই নক করতো, সেই মেয়ে শব্দেরও অধিক দ্রুত গতিতে ভুলে গিয়েছে তোমাকে, তোমার সেই সব নিশাচরী কবিতাগুলোকে। ভুলে গিয়েছে বাদলা দিনের প্রথম কদমফুল আর বৃষ্টিতে ভেজার সব প্রহরগুলোকে। পাগলামি, খুনশুটি, ফুচকার দোকান,বুড়ো অশত্থ গাছের নিচের বেঞ্চি, ফুটপাত,কফিশপ, ভালোবাসার রেণু লেগে থাকা প্রিয় সবকিছুকেই। ভুলে গিয়েছে সুপারসনিক গতিতে। একপলকেই ভুলে গিয়েছে সবকিছু,ঠিক যেমন এক পলক দেখেই তুমি প্রেমে পড়েছিলে। ভুলে গিয়েছে খুব দ্রুত।

বড়লোক, এস্টাব্লিশড স্বামীর সাথে রোজ রোজ ছবি দেয়, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, সিনেমাহলে। হানিমুনের ছবি, বিদেশ ঘোরাঘুরির ছবি। দামী ক্যামেরায় তোলা ঝকঝকে হাস্যোজ্জ্বল সব ছবি।সুখ, ভালোবাসা উপচে পড়ছে যেন।

তুমি এসব দেখে দেখে, অতীতের কথা ভেবে, পুরনো স্মৃতি মনে করে নিজেকে পোড়াও। তামাক পাতার ধোঁয়ায়। পুড়িয়ে কালো করে ফেলো তোমার তরুণ ফুসফুস। পুড়ে যায় তোমার কলিজা, হৃৎপিণ্ড। বেঈমানি করে বসে দুচোখ। নামে অশ্রুর অঝোর ধারা।

বালিকার ছলনা নারীজাতির ওপর থেকে তোমার সব বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য তুমি হানা দাও পর্নসাইটগুলোতে। ঘন্টার পর ঘন্টা নীল উদ্দামতা চলতে থাকে পর্দায়। তুমিও সমানে হাত চালাও।প্রতিশোধ নিতে হবে, মস্ত বড় প্রতিশোধ,ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।

এই প্রতিশোধের শেষ কোথায় ? আর কতোরাত গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে পড়ে থাকলে, আর কতো ক্লাস ফাঁকি দিলে, আর কতো মেয়েকে ধরে খেয়ে ছেড়ে দিলে, আর কতো জিবি পর্ন দেখলে, আর কতোবার হস্তমৈথুন করলে, মায়ের আর কতো চোখের জল দেখলে, বাবার আর কতো অপমান দেখলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হবে? তুমি ঐ মেয়েকে পরাজিত করতে পারবে? বলো, আর কতোকাল তোমার এই অদ্ভূত প্রতিশোধ চলবে? কবে তুমি বিজয়ী হয়ে? কবে বালিকা হেরে যাবে?

বোকা ছেলে, তুমি তো শুরুতেই হেরে গিয়েছো। প্রতিশোধ নেবার নামে গাঁজা খাচ্ছো, সিগারেট খাচ্ছো, খাওয়া দাওয়া, ঘুমের অনিয়ম করছো এতে কার ক্ষতিটা হচ্ছে শুনি? ঐ মেয়ের, না তোমার নিজের, নিজের শরীরের। পর্ন আর হস্তমৈথুনে তুমি তিলে তিলে শেষ করে ফেলছো পৌরুষের সব শক্তি, কার ক্ষতি হচ্ছে? কার মা কষ্ট পাচ্ছে, আত্মীয়,প্রতিবেশী,পাশের বাসার আংকেল,আন্টিদের কাছে কার মা,কার বাবা অপমানিত হচ্ছেন?

সে তো সুখেই আছে। খাচ্ছে,দাচ্ছে,ঘুমোচ্ছে,শপিং করছে, ট্যুর দিচ্ছে। স্বামীর সাথের রং ঢঙের ছবি শেয়ার করছে। তোমার কোনো দুঃখ,কষ্ট,প্রতিশোধের অভিমান,আগুন কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করেনি, করবেওনা, এরকম অবস্থায় সাধারণত করেওনা।

আর তুমি?

নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছেড়েছো!  নর্দমার শুয়োর আর রাস্তার কুকুরেরা যেভাবে জীবন যাপন করে, তুমি বেছে নিয়েছো ঠিক সেই জীবন। নিজের শরীর শেষ করছো, স্বপ্নগুলোকে নিজের হাতে গলা টিপে মারছো।

বোকা ভাই আমার!   এটা কোনো জীবন হলো?

ফিরে এসো ভাই।
বোকা ভাই আমার, প্লিজ ফিরে আসো।
বাবার কাছে ক্ষমা চাও, মায়ের চোখের জল মুছে দাও। জায়নামাযে দাঁড়াও। চোখের জলে জ্বালিয়ে দাও অতীতের সব ভুল, সব পাপ। আবার শুরু থেকে সব শুরু করো। লম্বা একটা জীবন পড়ে আছে।
ফিরে আসো ভাই!
ফিরে আসো জীবনে।
প্লিজ!

আস্তে আস্তে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসা শুরু হল।  ঝাঁকড়া চুলে তেল চিরুনী পড়লো,সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলাম ,গাঁজা ছেড়ে দিলাম একেবারেই, শুক্রবার ছাড়াও মাঝে মাঝে মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম। বালিকা, তোমার বিরহের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করলো ।কী ঋতু চলছিল তখন? শরত না হেমন্ত? হেমন্ত বোধহয়। আহা কী ভীষণ দামি ছিল সেই হেমন্ত!

ইউটিউব ব্রাউজিং করতে করতে একদিন পেয়ে গেলাম পরকালের পথে যাত্রা নামের এক লেকচার সিরিজ।  গমগমে কন্ঠস্বরের বক্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে গেলেন। আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে শুনে গেলাম। কী দরদ মাখা তাঁর কণ্ঠ,কী গভীরতা তাঁর কথায়!

সেই লেকচারেই শুনলাম আশ্চর্য একদল তরুণীদের কথা ,আয়তনয়না যাদের চোখ, কোনো মানুষ ও জ্বীন কখনো যাদের স্পর্শ করেনি । প্রবাল ও পদ্মরাগের মতো এই সব তরুণীদেরকে আল্লাহ্‌ (সুবঃ) নাম দিয়েছে হূর আল আঈন। আল্লাহ্‌ (সুবঃ) এদেরকে নাকি এতো সুন্দর করে বানিয়েছেন যে এদের দিকে তাকিয়েই মানুষ  বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে । তবু চোখ ফেরাতে পারবে না ।

সেই লেকচারে আরো শুনলাম আকাশের ওপারের লাল নীল হারী আর মুক্তোর প্রাসাদের কথা, আদিগন্ত বিস্তৃত রেশমের গালিচা, সারি সারি আসন, সালসাবিল আর কাউসারের কথা, সিদরাতুল মুনতাহার কথা…।

.বালিকা তোমার প্রতি যে  ভালোবাসাটুকু অবশিষ্ট ছিল তার এক কানাকড়িও আর থাকলো না এই লেকচার শোনার পর। কঠোর প্রতিজ্ঞা করলাম, জান্নাতের সেই মুহূর্তগুলো কিছুতেই মিস করা যাবে না । বদলে গেলাম আমি ।

আমূল বদলে গেলাম।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

পড়ুন- প্রথম পর্ব

(সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত,কিছুটা পরিবর্ধিত)

 

শেয়ার করুনঃ