আহ্নিক গতির উছিলায় সময়টা এখন রাত। কীরকম একটা হতাশা কাজ করছে আমাদের ছেলেটার ভেতর। আমাদের সেই ছোট্ট ছেলেটা – যে বাবার হাত ধরে শুক্রবারে জুমুআয় যেতো। ছোটোবোনকে মাছের মাথাটা দিলে কেঁদে বুক ভাসাতো। রাতের বেলা দাদীর বুকে মাথা রেখে কেচ্ছা-কাহিনী শুনতো। একটু হাঁটার পর যে হোঁচট খেতো, সেই ছোট্ট ছেলেটার মাথায় ঘুরতে শুরু করে ‘না পাওয়ার সব গল্পগুলো’। জীবনটাকে তুচ্ছ মনে হলো। জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো৷

সে জানে না চিরমুক্তির উপায় কী। তবে হ্যাঁ, এ হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তির একটা উপায় জানে সে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে পড়ে থাকা নিথর শরীরের দিকে অপলকে চেয়ে আছে সে। প্রিয়তমাকে কাছে পাওয়ার আগ্রহো বাড়লো তার। বিকৃত যৌনতা তার মাথায় প্রোগ্রামিং এর মতো গেঁথে দিলো ল্যাপটপের স্ক্রিনের ঐ লোকগুলো। আহা! এ যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি। কোনো ব্যাথা নেই, কোনো হতাশা নেই৷ শুধু শান্তি আর শান্তি।

হঠাৎ করে রুমের দরজাটা খুলে গেলো। স্ক্রিন থেকে চোখ উঠালো আমাদের সেই ছোট্ট ছেলেটা। ছোটো বোনটা দাঁড়িয়ে আছে দরজা ধরে। ছোটবোনের আগমনে তার ভেতরের কামুক সত্ত্বাটা জেগে উঠেছে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিলো সে। দমিয়ে রাখলো, বোনকে কাছে পাওয়ার আকাঙখা।

ক্লাসরুমে ম্যাডাম যখন লেকচার দেন, বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন হাসিতামাশা তো আছেই৷ ম্যাডামের শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে আলোচনা করার মাঝে আলাদা একটা উত্তেজনা টাইপ ব্যাপার আছে। সবাই এটা বুঝবে না। লেকচারের ফাঁকে ফাঁকে সে হারিয়ে যায় সেক্স ফ্যান্টাসিতে। পিয়নের বাজা বেলের শব্দে ভেঙে যায় সেই ফ্যান্টাসি। পিয়নকে মনে মনে গালমন্দ করে সে।

একসময় সে লক্ষ্য করলো – যে বাতাসে সে নিশ্বাস নিচ্ছে, সেটা দূষিত। কোনো কাজ করে তৃপ্তি পাচ্ছে না। সামনে পরীক্ষা। পড়া মনে থাকছে না। ঝাপসা লাগে প্রায়সময়। সারাদিন শুধু ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মায়ের কথা শুনলে ইচ্ছে করে – মহিলাটার মুখে স্কচটেপ মেরে দিই৷ সব কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা লাগছে। এভাবে আর কত…?

একসময় তার টনক নড়ে। বুকের মাংসপেশি কেঁপে উঠে৷ খিঁচুনি দিয়ে ওঠে সমস্ত শরীর৷ সে বুঝতে শুরু করে – এটা তার জীবনের উদ্দেশ্য নয়। নিজেকে পাল্টাতে হবে। কিন্তু কী থেকে শুরু করা যায়? হ্যাঁ, প্রথমে তাকে বের হতে হবে – এই বিষাক্ত বাতাস থেকে। পর্নোগ্রাফি। নীল এই অন্ধকার থেকে বের হতে পারলেই সব করা যাবে ইনশাআল্লাহ।

এবারের লক্ষ্য পরীক্ষায় ভালো মার্কস পাওয়া নয়। কিংবা দামী রেষ্টুরেন্টে বসে এক মিনিটে একটা বড়সড় বার্গার খাওয়াও নয় – এবারের লক্ষ্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সন্তুষ্টি।

একে একে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে পড়ার চেষ্টা করলো সে। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো খুব। এখন অবশ্য মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। ক্ষিধের যন্ত্রনায় আমাদের ছেলেটার রাগে সব ভেঙে ফেলার মতো অবস্থা হতো। এখন সে প্রায় প্রতি সপ্তাহে দুটো করে রোজা রাখে। কথায় কথায় রাগে না এখন সে। ক্লাসরুমে ম্যাডাম আসলে ম্যাডামের দিকে না তাকিয়েই ক্লাস করে। পাশের বাসার আন্টিদের সাথে দেখা করে না। দারোয়ান মামাকে নিয়মিত সালাম দেয়।গত জীবনে যা যা করেছে, সব কিছুর জন্য অনুতপ্ত সে। এখন আর গুনাহ করার ফুসরত নেই। বাকী জীবনটা এভাবে কাটিয়ে দিলেই হবে।

আমাদের ছেলেটা তো এই বিষাক্ত বাতাস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ভাই আমার, তুমি পেরেছো তো? যদি না পারো, প্লিজ ফিরে এসো ভাই আমার। একবার চিন্তা করো, এই অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয়, কী ভয়ঙ্কর পরিণতিটাই না হবে তোমার। ছোটোবেলায় ভুলবশত তুমি যখন জ্বলন্ত মশার কয়েলে পা দিয়ে ব্যাথায় ছটফটিয়েছো, সেই ব্যাথার কথা মনে আছে? জাহান্নামের আগুন তার চেয়েও ভয়ংকর। সত্তর গুণ ভয়ংকর। আঙুলে লাগলে কলিজা পর্যন্ত জ্বলে যাবে। তাহলে, কোন সাহসে তুমি এই বিষাক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছো?

হে ভাই আমার, অন্ধকার রুম থেকে বেরিয়ে এসো। জানালাটা খুলে দাও। নীল একটা আকাশ দেখতে পাবে৷ আকাশের বুকে উড়ে যেতে দেখবে সুন্দর সুন্দর পাখিদের৷ বিষাক্ত বাতাস থেকে বেরিয়ে এসো, নিশ্বাস নাও মুক্ত এই বাতাসে….

লিখা : ওমর ইবনে সাদিক…

নীড়ে ফেরার গল্প

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (সপ্তম কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

শেয়ার করুনঃ