দশ.

সিস্টেম ওয়ার্কস। এটা দেখার জন্য পশ্চিমা দেশগুলো ভালো জায়গা। আমেরিকাও এর মধ্যে অন্যতম। মানুষ এই একটি কারণে এখান থেকে যেতে চায় না। সুবিধায় অসুবিধা বোঝে না। জাগতিক সুবিধা জীবনের জন্য জরুরী।  জীবন যদি এখানেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে বেশ মজা হতো। এই মজায় যারা মজে যায়, তাদের জন্য নগদ সুবিধাই আসল। মরার পর যে জীবন আছে, সে জীবনের সুবিধা তাদের ভাবায় না।

এদেশে লাল বাতি জ্বললে গাড়ি থামে। পুলিশ না থাকলেও থামে। আবার কোথাও বাতি নাই। কেবল লেখা আছে, স্টপ। সেখানেও গাড়ি থামে। আশেপাশে তাকায়। শূন্য প্রান্তর হলেও গাড়ি চালিয়ে দেয় না। হয়তো কোনো মানুষ রাস্তা পার হবে। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করে। এমন দৃশ্য অবাক না করে পারে না। বাস-ট্রেনে লাইন ভাঙে না কেউ। ধাক্কা-ধাক্কি নেই। এটুকু শান্তি মানুষ চায়। এ শান্তির এখানে কোনো অভাব নেই। এরকম কিছু আমাদের দেশে ভাবা যায় না। এ মুহূর্তে কল্পনাও করা যাচ্ছে না। রাস্তায় চলার এই এক সুবিধা জীবনের দর্শনকেই পাল্টে দেয়। সে আর দেশে ফিরে যেতে চায় না।

সরকারী কোনো সুবিধা নিতে এদেশে কোনো ঘুষ দিতে হয় না। সিস্টেম ওয়ার্কস। লাইন লম্বা হলেও ভাগেরটা ঠিকই মেলে। ব্যাংক? গাড়ি থেকেও নামতে হয় না। সীটে বসেই সেরে নেওয়া যায় টাকা জমা ও তোলার কাজ।

এখানকার দোকানপাট আরেক জগত। জিনিস কিনে বাড়ি গেলেন। দ্রব্যটা পছন্দ হচ্ছে না। ফিরিয়ে দিন। চাইলে টাকাও ফেরত পাবেন । আপনাকে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না। এমন দেশ কে ছাড়তে চাইবে? মুসলমানদের অনেক আখলাখ তারা নিয়েছে। আমল করছে। ফল পাচ্ছে। আমরা তাদের বাহবা দেই। মনে করতে শুরু করি তাদের কাছ থেকেই মানবিকতা শিখতে হবে। সবচেয়ে বড় অমানবিক-স্রস্টাকে না মানা। আবার এটা যারা মানে, তারা এদেশে থেকে মুত্তাকী হতে পারতেন। সেখানেও সিস্টেম কাজ করে। তাকে আমেরিকান বানায়, মুত্তাকী হতে দেয় না।

এগারো.

ঘরের  মানুষ ঘরে থাকতে  চায় না। সবাই বাইরে বেরোতে চায়। বাইরের জগত দেখতে চায়। দু-পা ফেলে গাছের পাতায় শিশির দেখার আশা-লুকাতে পারে না। শীতের সকালে দেখে। গ্রীস্মেও। বেলায়-বেলায় সবসময়য় কি পাতায় শিশির থাকে? মানতে চায় না। ওখানে এখন শিশির নেই।  যেও না। ঠেকানো যায় না। সে নিজে পরখ করতে চায়। না থাকলেও সে যাবেই। আকাশে মেঘ গর্জন করছে। গর্জন কানে লাগে না। বৃষ্টিতে ভেজে একাকার হয়ে বাড়ি ফেরে। ফিরতেই হয়। না ফেরার দেশে পাড়ি দেওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবে যাওয়া-আসার মধ্যেই সে থাকে। নারী-পুরুষ সবাই। ছেলে-মেয়েরাও। আঠারোর পরে আর কাউকেই এখন ঘরে রাখা যায় না। সবাই সব অধিকার ভোগ করে মজা নিতে চায়। সরকারও সেগুলো দিয়েছে। আইন করে নিশ্চিত করেছে। যিনি এ স্বাধীনতা দেননি, তার কথা মনে থাকে না।

আমেরিকায় এসে প্রায় সব পুরুষই নারীবাদী হয়ে ওঠে। নারীদের অধিকার দিতে উঠেপড়ে লাগে। আর তাদের প্রথম অধিকার হলো কামাই করার সুযোগ দেওয়া। মাইগ্রেন্ট করা মুসলমানদের অনেক পরিবারে শিক্ষিত নারী থাকে। আবার অনেকের এদেশে এসে আর পড়ালেখা করার সুযোগ থাকে না। বয়স হয়ে গেছে। অথবা ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। কিন্তু চাকুরী করানোর সুযোগ তারা খুব কমই মিস করে। ব্যস, তারপর তাদের আর নারীবাদী তত্ত্ব নিয়ে সংশয় থাকে না। মৌলবাদী ধ্যান-ধারণার মানুষও নারীবাদী হওয়াতে দোষের কিছু দেখে না।

নারীবাদী কথাটা নারীদের আবিষ্কার নয়। পুরুষদের। চার্লস ফোরিয়ার (Charles Fourier) এই শব্দটির জনক। ফ্রান্সে ১৮৩৭ সাল থেকে শুরু হয়ে এখন পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়েছে। নারীরা যদি ঘরেই থাকে, তাহলে তাদের ভোগ করার সুযোগ মিলবে না। সুতরাং একটা ধোঁয়া তুলে তাদের রাস্তায় বের করতে হবে। সম অধিকারের কথা বলতে হবে। উন্নতির কথা বলতে হবে। আধুনিকতার কথা বলে গণহারে তাদের চাকুরী দিতে হবে। হলোও তা-ই। নারীরা বের হলো। আগে কোনো ধর্মের নারীরা এত খোলামেলা ছিল না। এখন যখন ধর্ম ফেলে উন্নতির জোয়ার লাগল, তখন আর বাঁধ মানল না। বের হয়ে একেবারে নিজেদের উজাড় করে দিল। প্রযুক্তি তাদের ভোগপণ্য বানিয়ে ফেলল। যদিও বলা হয়, এটা আধুনিক সংস্কৃতি। মূলত এর মাধ্যমেই তাদের বেহায়াপনার শুরু। এখান থেকেই বাকি অবরুদ্ধ জায়গাগুলোতে পৌঁছে। মুসলমান নারীরাও আর ঘরে থাকতে পারল না।

এদেশে নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করে। আমাদের দেশেও করে। এখন গ্লোবাল কালচারে এটা আলোচ্য বিষয় নয়। মূল সমস্যা পর্দার কনসেপ্ট  পাল্টে গেছে। জিন্স আর টি শার্টের সঙ্গে মাথায় হিজাব দিলেই পর্দা হয়ে গেল। ধুমধাম পার্টি আর পুরুষদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশায় অসুবিধা দেখেনা কেউ। কিছু বললেই তেড়ে আসে। এসব মাসআলা এদেশে বেকার। নাচতে নেমে কেউ ঘোমটা দেয় না। ঘোমটা দেওয়ার কথা বলাটাই অন্যায়। নাচ থামাবেন, না  ঘোমটা দেওয়ার কথা বলবেন? আসলে ঈমানই অন্তরে থাকেনা। ঈমানের প্রসঙ্গ তুললেও বিপদ। তারা নামায পড়ে। রোযা রাখে। ইফতার পার্টিও দেয়। এই এক মেলানো-মেশানো কালচার চলছে। বেঁচে থাকতে হলে অনেক কিছুই করতে হয়। আস্তে আস্তে পরিবর্তন হবে। সেটা এতই আস্তে যে, মরে গেলেও আর হয়না। কামিজ ছেড়ে যে মহিলা জিন্স পরে,তার কাছে ঈমানের সংজ্ঞা ডিফারেন্ট। তাকে ঘরে ফেরানো মুশকিল।

এভাবে ঘর ছাড়া নারীরা বাইরের রোদ্দুরে গা পুড়িয়ে ঘরে ফেরে। একদিন বুড়ো হয়। তখন ভোগ করতে পারে,না ভোগের পাত্র থাকে! ফেলে আসা শৈশব মনে পড়ে। হুযুরদের কথা মনে উঁকি দেয়। মা-বাবারা স্মৃতিও ভেসে ওঠে। কী লাভ হলো এতোসব করে ? গাড়ি-বাড়ি আর বিলাসিতায় সব পড়ে থাকে এক কোণে। এখন ফেরার সময়। যিনি এ জীবন দিয়েছিলেন, তার কাছে ফিরে যেতে হবে। একা একা সেসব স্মৃতি মাড়িয়ে যেই একটু ভালো হতে চায়, শরীরের হাড়-গোড় মুচড়ে ওঠে।  মৃত্যুর অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা। সুযোগও মেলেনা।

বারো.

মানুষ আশা করে। স্বপ্ন দেখে। একটু ভালো থাকতে চায়। কাজ আর আনন্দ নিয়ে থাকতে চায়। নিরিবিলি কাটাতে চায় আলস্যের সময়। ঝামেলায় জড়াতে চায় না। পাশ্চাত্যে এগুলো পেতে স্বপ্ন দেখতে হয় না। এমনিতেই মেলে। কেউ কারো পেছনে লেগে নেই। যে যার কাজ করছে। সামাজিক নিয়ম-কানুন ছকে বাঁধা । সব ঘড়ির কাঁটায় চলে। মানুষও। ঝামেলা যে হয় না, তা না। চুরি,ডাকাতি,খুন-খারাবি সবই হয়। এগুলো না থাকলে ভালো এত  ভালো হতো না। এর মূলে কাজ করে এদেশের এডুকেশন সিস্টেম। ভারী বোঝা এরা এত হালকা করে বহন করতে জানে, সিস্টেমে না ঢুকলে বোঝা যায় না।

আমাদের দেশে শিশুদের উপর প্রথমে ভারী বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। তারপর তারা যখন বড় হয়, তখন সেগুলো মাথা থেকেই ফেলে দেয়। সমাজ অন্ধকারে যেতে থাকে। আলোর মুখ দেখে না। সেক্যুলার হয়েও পাশ্চাত্যের ভালো কিছু নিতে পারেনা। কিন্তু খারাপ নিতে ভুল করে না। আমেরিকান এডুকেশান সিস্টেমের মন্দ দিকটা সবাই জানে। ভুক্তভোগী অনেক মুসলমানও সেসব নিয়ে কথা বলতে চান না।

পড়ালেখা করতেই হবে। বড় হতে হলে এর বিকল্প নেই। কত বড় হবে তুমি? এটা কারো জানা থাকেনা। টার্গেট থাকে। মজার ব্যাপার হলো  এদেশে ছেলেরা ফায়ারম্যান হতে চায়। গারবেজম্যান হতে চায়! সুপারম্যানও হতে চায়। চাইতেই পারে। মিডিয়াতে যা দেখে, তা-ই হতে চায়। এডুকেশন সিস্টেম এমন ,ইলেভেন ক্লাস না পেরোনো পর্যন্ত তার চাওয়া থামে না।  তারপর যারা টিকে যায়, তারা সোসাইটিতে আগে বাড়তে পারে। উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে। এ পথ পরিক্রমা খুব সহজ না। মাল্টিকালচারে পড়ালেখা তার মেধা-মননে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। বড় কিছু হতে শেখায়। তবে রিলিজিয়ন নিয়ে ভাবতে শেখায় না।

এদেশে রাস্তাঘাট যেমন সুন্দর,তেমন স্কুল কলেজও। খুবই প্রশস্ত জায়গা নিয়ে বানানো। খেলার মাঠ ছাড়া কোনো স্কুল নযরে পড়েনি।  শারীরিক ফিটনেস পড়ালেখার অংশ। খেলাচ্ছলেই ছেলেমেয়েদের পড়ানো হয়। খুবই ইফেক্টিভ। তুলনামূলক পাবলিক স্কুলে পড়া সহজ। খরচ কম। মাইগ্রেট করা অনেক মুসলমান ছেলে –মেয়েদের প্রথমে এখানেই হাতে খড়ি হয়। তারা যা দেখে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। কালচার ভেবে লুফে নেয়। তাকেও জাতে ওঠার চেষ্টা করতে হয়। তখন তারা পাত ভুলে যায়। খুব আস্তে আস্তে সে আমেরিকান হয়ে ওঠে। বাবা মা টের পায় না।

নাইন-টেন ক্লাসেই অনেক মেয়ে কনসিভ (Conceive) করে। মেয়েদের বয়ফ্রেন্ড, আর ছেলেদের গার্লফ্রেন্ড বাড়তে থাকে। সমকামিতাও বাড়ে। সমাজে এটা নিয়ে হৈচৈ হয় না। অগোচরে সম্পর্ক গড়ায় অনেক দূর। সেক্স বিষয়টা তাই পুরোনো আদলেই থাকে। আর রিলিজিয়ন বাসা-বাড়িতে আগে বাড়লেও স্কুল কলেজে বাড়ে না। আমেরিকান বানাতে চাইলে এটা ধরে রাখতেই হবে। সরকার এই একটা জায়গায় যা খেলার খেলে। মুখে কিছু বলে না। এজন্য বাবা-মা ধার্মিক বা মৌলবাদী হোক, তাতে অসুবিধা নেই। সরকার তাদের নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। তাদের সন্তানই টার্গেট। জেনারেশন কিল (Kill) করতে এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর নেই।

এদেশে ইসলামী এডুকেশন সিস্টেমও আছে। মসজিদ কেন্দ্রিক স্কুল। সব শহরে এখনো গড়ে ওঠেনি। অনেক শহরেই আছে। মুসলমানদের জন্য একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ার সুযোগ করে দিয়েছে এ স্কুলগুলো। উচ্চ শিক্ষার দ্বার খোলা রেখেই এর কারিকুলাম বানানো হয়েছে।  এর ফলে ইসলামী কৃষ্টি কালচারের চর্চা হয়। অনেকে হাফেজও হয়। তবে ধরে রাখাটা সহজ হয়না । ইউনিভার্সিটিতে গেলে তারা তখন মূল ধারায় ফিরে আসে।  যাদের ভাগ্য ভালো, তারা নিজেদের বাঁচিয়ে চলে। আর নতুবা গা ভাসিয়ে দিয়ে, সত্যিকার আমেরিকান হয়ে ওঠে।

মুসলমান পরিবার কখনো পরবর্তী জেনারেশন হারাতে চায় না। পরিবেশের জন্য ঠিক রাখতেও পারেনা। বেঠিক চলতে চলতে আশার আলো দেখে সবাই। একদিন হয়তো জাগরণ হবে। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। সেদিন কবে আসবে? [১]

তেরো.

রাত ১১:৫৯ এ ফ্লাইট। টার্কিস এয়ারলাইনস। মইন ভাই এয়ারপোর্টে নিয়ে গেলেন। আমি এক নিঃসঙ্গ মানুষ আমেরিকা থেকে একা একা ফিরছি। আসার সময় প্রফেসর হযরত বার বার বলেছেন, ‘ একাই যাচ্ছ?’ ফেরার সময় যখন কথা হলো, তখনও বললেন, ‘তুমি তো একাই ফিরছ না?’ আমি তবু ফিরছি। মইন ভাই ফিরতে পারছেন না । না স্ত্রী -কন্যার কাছে, না নিজের দেশে। তিনি ফিরে যাবেন বাফেলো। আবার ছয়-সাত ঘন্টা ড্রাইভ। একাই।

পৌনঃপুনিক নিঃসঙ্গের দেশ আমেরিকা। সব থেকেও তারা খুব একা। আর যাদের কেউ নেই, তাদের অবস্থা আরও করুণ। নিঃসঙ্গের মাত্রা মাপা যায়না, তবু জীবন এগিয়ে চলে। মরুভূমিতে পথ হারালে ফেরা যায়না। আমৃত্যু অপেক্ষা মৃত্যুর জন্য। আকাশে উড়াল দিয়ে আমি বাহ্যিকভাবে সেই মৃত্যুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম।মৃত্যুকে পেছনে ফেলা যায়না।

আমাদেরও  যেতে হবে এবং একাই![২]

চলবে ইনশা আল্লাহ…

 

পড়ুন আগের পর্বগুলোঃ

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (প্রথম পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (দ্বিতীয় পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (তৃতীয় পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (চতুর্থ পর্ব)

স্বর্গের দিন! স্বর্গের রাত! (পঞ্চম পর্ব)

আরো পড়ুনঃ

মুখোশ উন্মোচনঃ প্রথম পর্ব

মুখোশ উন্মোচনঃ তৃতীয় পর্ব

নরক –

 

 

রেফারেন্সঃ

[১] একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা  ৮২-৮৮,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

[২] একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা ১১২-১১৩,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

 

শেয়ার করুনঃ