পাঁচ.

আমেরিকা একটা অদ্ভুত জায়গা । এখানে পাগলের সংখ্যা অনেক। এ পাগল গাড়ি চালায়। স্মার্টফোনে কথা বলে। কাজ করে। খায়। দেখে বোঝার উপায় নেই। কথা বললেই বুঝে আসে। কথার খেই পাওয়া যায় না।  কখন যে পাগল হয়ে  গেছে, সে নিজেও জানে না। তাদের বাড়ি থেকেও নাই। পরিবার থাকলেও কাছে পায়না।  সব হারানোর কষ্টে একসময় এরা বদ্ধ পাগল হয়েই যায়। এরকম এক পাগলের বাসায় রাতের দাওয়াত ছিল। সজিব জোর করলো। গেলাম। খাচ্ছি। খাওয়ার টেবিলে বসেই তিনি তার মেয়েকে বিদায় দিলেন। যাচ্ছে ফ্রাইডে নাইটে। আমাকে বললেন,‘ ওর এক বন্ধুর বার্থেডে পার্টিতে যাচ্ছে’।

এসব পাগলারা সত্য বলতে পারে না। এজন্যেই বুকের কষ্ট মাথায় ওঠে। নার্ভগুলো সব উলটে দেয়। যা দেখে, ভুলে থাকে। যা শোনে, চেপে যায়। কত আর আমেরিকান হয়ে থাকা যায়! ইসলামের কিছু বোধ তখনো তাড়া করে ফেরে। যুবতী মেয়ে সারা রাত আর বাসায় ফেরে না। বাবা-মা নির্ঘুম জেগে থাকে। রাতের পর রাত। এমন কয়টা রাত লাগে পাগল হতে’? [১]

ছয়.

চাচা এদেশে সাঁইত্রিশ বছর ধরে আছেন। মিলিয়ন ডলারের কয়েকটি বাড়ি আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়। খুবই ধনী। এত ধন তার তেমন উপকার করেনি। তিনটি মেয়ে। বড় মেয়েটা  ভার্সিটি শেষ করে চাকুরী করেছে। এক হিন্দু বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরে। এজন্য চাচার মন ভালো থাকেনা। বয়স হয়ে গেছে। বাঁচার আশাও আর বেশি দেখেন না। সম্পদ সব বিক্রি করে দিতে চাচ্ছেন। বিক্রি করে কি করবেন জিজ্ঞেস করিনি। বেশি কথা বলা যাচ্ছে না। তিনিই কথা বলে যাচ্ছেন। পরে ভাব করে কথা বলতে হবে। গাড়ি চলছে।[২]

সাত.

আজ এখানে ২৫ ডিসেম্বর । খৃস্টানদের বিশেষ দিন। তারিখটা উল্লেখ করলাম। দিবসের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মুসলমানরা এখানে খৃস্টানদের পাশাপাশি কাজ করে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। শুভেচ্ছা জানাতে হয়। এজন্য হাসি-মুখে অনেকে বলে ফেলেঃ হ্যাপি ক্রিসমাস ডে। আমি শুনে ঘাবড়ে যাই। এ কথা বললে তো ঈমান থাকার কথা না। ব্যাপারটা কোনো আলেমকে জিজ্ঞেস করতে হবে।[৩]

আট.

নিউইয়র্কে আকাশ ছিল অনেক উপরে। উঁচু বিল্ডিং-এর ফাঁক গলে আকাশ দেখতে হতো। ডালাসে আকাশ অনেক নিচে। সোজা তাকালেই দৃষ্টি চলে যায়। দেশের শষ্যভরা ক্ষেত যেমন,মাইলের পর মাইল দিগন্ত বিস্তৃত, তেমন। আকাশ আকাশেই থাকে। শুধু মনের আকাশটাই ওঠানামা করে!

ডালাসের এই অঞ্চলে শষ্য-ক্ষেত নেই। তবে বাড়ি ঘর ছড়ানো ছিটানো। এত বিস্তৃত জায়গা, দৃষ্টিতে আটকায় না কিছুই। সোজা আকাশের নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে যায়। রাস্তাঘাটে মানুষজন চোখে পড়েনা। ঘর-বাড়ির বাইরেও কেউ নেই। আবাসিক এলাকা যেন বিরান ভূমি। এখানে প্রতিটি মানুষ এরকম একা, নিঃসঙ্গ। সব থেকেও কেউ নেই।

ঘরের লোকজনও ঘরে থাকে না। কাজে থাকে। সবাই কাজে মগ্ন। ভালোবাসা আর খাওয়া-দাওয়া। জীবনের অংশ নয়। কাজের অংশ। কাজ মানেই টাকা। এজন্য ভালোবাসাও টেকে না বেশি দিন। টাকা না হলে জীবনও  মরে যায়। মরা জীবনে ইসলাম এককোণে পড়ে থাকে। যখন পাশ দিয়ে যায়, ছুঁয়ে দেখে। দূরে গেলে ভুলে যায়।

ফজর পড়েছি মসজিদে। গেইট দিয়ে বের হতেই একটা বাক্স চোখে পড়ল। বাক্সের ওপর লেখাঃ Bank of Akherah (আখেরাতের ব্যাংক) ইন্টারেস্টিং । এরকম এখনো দেখিনি দেশে। মসজিদে এলেই ভালো লাগে। দ্বীনদারি কিছু চোখে পড়ে। বাইরে এর ছাপ কোথাও নেই। আযানও মসজিদের চার দেয়ালে আটকে থাকে।

এখনকার ইয়ং জেনারেশনের খোঁজখবর নেওয়া মুশকিল। বাবাদের দেখা পেলেও সন্তানদের দেখা মেলে না। আমার ভাতিজাদের দেখে কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। তাদের এখন স্কুল বন্ধ। সারাক্ষণ পাশে পাচ্ছি। একবার তাদের এক বন্ধু এল। একসাথে নামাযে যাব। তারপর জিমে খেলবে। গাড়িতে উঠতেই পরিচয় হলো। নাম হিশাম । মুসলমান। এদেশে জন্ম। বাবা শ্রীলংকান, আর মা মালয়েশিয়ান । পুরো আলখেল্লা পরে নামায পড়লো। ভালো লাগলো।

নামায শেষে তাদের জিমে ড্রপ করতে হবে। আবার কিছু সময় পাওয়া গেল। এই সুযোগে তার কুরআন পড়া শুনতে চাইলাম। সূরা ফাতিহা পড়তে বললাম । ছেলেটা জবাব দিল, ‘ আমার দাঁতে ব্যথা। কুরআন পড়তে পারব না’।

আমি শুনে অবাক হলাম। কথা বলতে  অসুবিধা হচ্ছে না। কুরআন পড়লে অসুবিধা হবে। এর মানে আমার বুঝতে বাকি থাকে না। চুপ মেরে গেলাম। পরে আমার ভাতিজা আমাকে বলেছেন, ‘তুমি তার কাছে কুরআন পড়া কেন শুনতে চেয়েছোঁ? সে মাইন্ড করেছে’। আমি তাকে আর কি জবাব দেব! এখন তার প্রতিও আমার ভয় বেড়ে গেল। আমরা বড় বেশি সেকেলে হয়ে গেছি! [৪]

নয়.

রিহেবিলিটেশন সেন্টারটা একটা কারাগার। এ কারাগারের কোনো পাহারাদার নেই। বিছানায় লেপ্টে থাকা রোগীদের  জন্য এর প্রয়োজনও নেই। পরিচিতজনরাও কম আসে। এদেশে এমনিতে পরিবারের বন্ধন ঠিক থাকেনা। বাবা-মা, ভাই-বোন – একসময় সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সবাই সবার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। রোগী দেখার সময় পায় না।

হাসপাতালগুলোও এ কালচার মেনে চলে। রোগীর সঙ্গে কেউ না থাকলে অসুবিধা হয়না। পুরো দায়িত্ব  তারা কাঁধে তুলে নেয়। দায়িত্বেরও সীমা থাকে। অকেজো মানুষদের সেবা করা  কঠিন কাজ । নার্সরাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এজন্য এখানে এলে বাঁচতে চায় না কেউই। আমরা যখন ফিরছিলাম, তখন এক ঘর থেকে আওয়ায আসছে, Help! I need help ! তার এ চিৎকার কেউ শুনছে না । হেলপ! হেলপ ! চিৎকার চলছে।

পড়ুন আগের পর্বগুলোঃ

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (প্রথম পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (দ্বিতীয় পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (তৃতীয় পর্ব)

স্বর্গের দিন স্বর্গের রাত (চতুর্থ পর্ব)

আরো পড়ুনঃ

মুখোশ উন্মোচনঃ প্রথম পর্ব

মুখোশ উন্মোচনঃ তৃতীয় পর্ব

নরক –

রেফারেন্সঃ

[১] একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা ১০২,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

[২]একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা ৯৮,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

[৩]একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা ৫৮,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

[৪] একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

[৫] একা একা আমেরিকা, পৃষ্ঠা ৭০,  লেখকঃ মুহাম্মাদ আদম আলী, সাবেক মেরিন অফিসার, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফুরকান

 

 

শেয়ার করুনঃ