আসসালামু আলাইকুম

অন্ধকারকে আলো ভেবে জড়িয়ে ধরা ছেলেটার গল্প এটি। মরীচিকাকে সে ছুঁতে চাইতো, মিথ্যাকে আপন ভেবে গায়ে মাখাতো, বুকের মধ্যে পুষে রাখতো অভিশপ্ত এক জঞ্জালকে।
.
ছোটবেলা থেকেই আমাদের ‘ছেলেটা’ ভালো স্টুডেন্ট ছিলো। একেবারে, মায়ের চোখের মনি, বলতে গেলে সবার চোখের মনি, মায়ের ক্ষেত্রে একটু বেশীই ; কারণ মায়েরা মমতাময়ী। সারা পৃথিবীর সমস্ত মমতা এনাদের থেকেই আসে। মায়ের চোখের আড়াল হতো না সে। চাইলেও মা হতে দিতো না। সন্ধ্যায় যখন সে বন্ধুদের সাথে খেলার পরে মাগরিবের নামাজ পড়তে যেতো এবং ফিরতে একটু দেরী হতো, বোরকা চাপিয়ে বেরিয়ে পড়তো মা, সাথে থাকতো একবুক হতাশা আর ছেলে হারানোর ভয়।

আমাদের ‘ছেলেটা’ একটু বড় হলো, স্কুলে ভর্তি হলো। কী কান্নাটা-ই-না কেঁদেছিলো সেদিন। ছেলেটার কান্না গিয়ে ধাক্কা দেয় একজন স্যারের বুকে। ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলেন সোফার বালিশের মতো। হাতে গুঁজে দিলেন কিছু টাকা। আল্লাহ স্যারটাকে ভালো রাখুক সবসময়। দুবছর পড়ার পর ছেলেটা এলো নতুন স্কুলে। নতুন মানুষ। নতুন পরিবেশ। ছেলেটা পরিচিত হয় ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটার সাথে। কিছু বন্ধু তৈরী হয় তার। কত্ত সুন্দর জীবন যাচ্ছিলো তার….

আগেই বলেছিলাম, আমাদের ‘ছেলেটা’ ভালো স্টুডেন্ট ছিলো। ক্লাস ফাইভে পরীক্ষা দিয়ে সে আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার অশেষ রহমতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। সবাই মাথায় নিয়ে নাচতে থাকলো আমাদের গল্পের নায়ককে। এত্ত খুশী, এত্ত আনন্দ রাখার জায়গা তো মা-বাবা খুঁজে পাচ্ছে না।

হাইস্কুলে পা রাখলো আমাদের ‘ছেলেটা’। নতুন নতুন গোঁফ গজানো শুরু হলো। বুক উঁচিয়ে চলার প্রবণতা বাড়লো। দুনিয়াটাকে নিজের মতো বানাতে শুরু করলো আমাদের গল্পের হিরো। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি জন্মালো আকর্ষণ। নেতিবাচক জিনিস জানার আকাঙ্ক্ষা তাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে নিয়েছে তার আট পায়ে। ছোটোবেলা থেকেই টিভিতে বাংলা ছবি দেখতো সে। একটা সময় বুঝে উঠে সে, জীবনকে আরো সুন্দর করতে হলে দরকার একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষ। সে ডুবে থাকতে লাগলো অবাস্তব সব কল্পনায় – এদিকে মা-বাবা একের পর এক লড়ে যাচ্ছে তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার উদ্যমে।

হাইস্কুলের বন্ধুগুলোকে বড্ড স্মার্ট মনে হতো আমাদের ‘ছেলেটার’। কত্ত আধুনিক ওরা। কথায় কথায় গালি আওড়াতে পারে। হিন্দী গান বুঝে – আবার গাইতেও পারে। ছেলেটা তাদের সান্নিধ্যে আসলো। লুফে নিলো সেই আকাঙ্ক্ষিত (!) গালি গুলো। এখন সেও গালি দিতে পারে। জীবনের উপর যে সাদা-কালোর পরতটা ছিলো, সেটা সরে যাচ্ছিলো দিনদিন। আহা, কত্ত সুন্দর এই পৃথিবী। কিছু বন্ধুকে খুব ভালো লাগতো তার। তারা মাঝেমাঝে ওকে ধরে নামাজে নিয়ে যেতো। সবাই মিলে মানুষকে বিরক্ত করতো। হোটেলে গিয়ে বিল চাপিয়ে দিতো একে অন্যের ঘাঁড়ে।
.
একদিন বাসার ছাদে আমাদের ‘ছেলেটা’ আবিষ্কার করে বসে এক নতুন জিনিস। অভিশপ্ত এক জিনিস। যেটা নষ্ট করে একজন মানুষকে, একটা পরিবারকে, একটা জাতিকে। পর্নোগ্রাফি। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে পড়ে থাকা উলঙ্গ শরীরটাকে দেখে বড্ড আনন্দ হতো ছেলেটার। একে একে পরিচিত হলো চটিগল্প আর মাস্টারবেশনের সাথে। একটু একটু করে পাওয়া এই সাময়িক সুখ বাড়াচ্ছিলো হতাশা, গ্লানি আর পরনির্ভরতা।
.
কম্বাইন্ড ক্লাস ছিলো আমাদের ‘ছেলেটার’ স্কুলে। একপাশে ছেলেরা বসতো, একপাশে মেয়েরা। কোনো একদিন সৌভাগ্যবশত (নাকি দূর্ভাগ্যবশত?) দেখা পায় একটি মেয়ের। তাদেরই ক্লাসের। ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেটা মাঝেমাঝে দেখতো মেয়েটা’কে। ছেলেটা এ কথা কাউকে জানালো না। নিজের মধ্যে চাপিয়ে রাখলো। মেয়েটাকে স্যাররা কখনো বকাঝকা করলে বা মারলে, আড়ালে স্যারকে গালি দিতো আমাদের হিরো। গালি দেয়া তার অভ্যেসে পরিণত হলো।
.
কিছুদিন ছেলেটা, মেয়েটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে দেখতেই পার করে দিলো। ছেলেটার ফেসবুক একাউন্টে একদিন সন্ধ্যা বেলায় ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে ক্লাসের সেই মেয়েটির। সমস্ত শরীরটা অবশের মতো হয়ে উঠলো। আমাদের ‘ছেলেটা’ হুট করে বলেই দিলো – আই লাভ ইউ। মেয়েটা অসম্মতিসূচক কিছু বলেনি। একরাতে লজ্জা ভেঙে মেয়েটাকে ফোন দিয়ে বসে ছেলেটা। দু-তিনবার চেষ্টার পরে দুজনেই সম্মলিতভাবেই কথা বলতে সক্ষম হয়। এরপর প্রত্যেকদিন রাতেই ছেলেটা কথা বলতো মেয়েটার সাথে। দুজনে ম্যাচিং ড্রেস পরে ক্লাসে আসতো। একদিন মেয়েটাও বেঞ্চের নিচ দিয়ে ছেলেটার হাত ধরে বসে। ছেলেটা নিজেকে সামলে নিয়েছিলো কোনোমতে।
.
ছেলেটার জেএসসি পরীক্ষা সামনে। মা-বাবার ঘুম হচ্ছে না টেনশনে। কোনো একটা কারনে ছেলেটার মনে হয়, মেয়েদের পর্দা করা ফরজ। কিন্তু তার প্রিয়তমা পর্দা করে না। পর্দা করা নিয়ে ঝগড়া করেই জেএসসি পরীক্ষার সময় আমাদের ‘ছেলেটা’ তার এই জীবনের(অবান্তর) ইতি টানলো। জেএসসি শেষ করলো। রেজাল্ট দিলো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রহমতে সে আবারো ভালো রেজাল্ট করেছে। কিন্তু, বন্ধুদের দেখাদেখি করে। কিছুদিন পর সে ভুলে গেলো বিপরীত লিঙ্গের সেই মানুষটাকে।
.
এরই মাঝে ডুবে গেলো অন্য এক জগতে। সেখানে আছে গান, মিউজিক, মুভি। একে একে সে পরিচিত হলো মিউজিকের বিভিন্ন জনরার সাথে। রক, মেটাল, হেভি মেটাল, ব্ল্যাক মেটাল, ডেথ মেটাল, থ্র‍্যাশ মেটাল…. এখন আর সে তার নতুন প্রিয়তমার হাত ধরতে লজ্জা পায় না।
.
ছেলেটার বন্ধুত্বের খাতায় যোগ হয় কিছু নতুন বন্ধু। কোনো একসময় সে আবারো পরিচিত হয় নতুন এক মেয়ের সাথে। কিন্তু বন্ধু হিসেবে। মেয়েটার পাশে যতক্ষন সে থাকতো, তার হার্টবিট বাড়তো শুধু। সে চাইতো মেয়েটা তার হাত ধরুক। সারাক্ষন তার সাথে কথা বলুক। কিন্তু, সে এই সম্পর্কটাকে (নাকি বেহায়াপনা?) নাম দিয়েছে ফ্রেন্ডশীপ। দুজনে প্রাইভেট পড়তো একসাথে। স্যারের অনুপস্থিতিতে স্যারের রুমের সে জড়িয়ে যায় এক অভিশাপের সাথে, এক পাপাচারের সাথে। যিনা। রুমের লাইট অফ করে দিয়েছিলো সে। মেয়েটার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না সে। পাশের রুম থেকে আসা মৃদু আলোতে সে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরার অনুমতি পেয়েছিলো। আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা তাকে এই যিনার গুনাহ থেকে মাফ করুন। সুযোগ পেলেই সে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতো, চুমু খেত। জীবনের অর্থ বদলে গেছে। মরীচিকাটা’কে সে সত্যি ভাবতে শুরু করলো।
.

ততদিনে তার ঈমান খুব ভালো ভাবেই দূর্বল হয়ে পড়ে। সারাদিন মিউজিক নিয়ে থাকতো, রাত জেগে মুভি দেখতো। কতো ফজর যে ঘুমিয়ে কাঁটিয়েছে, তার হিসেব নেই। নামাজ পড়ে মজা পাওয়া যেত না। তেমন কেন বিধিনিষেধ না থাকলে, শুক্রবারেও মসজিদে যেত না আমাদের হিরো’টা। বহুবার সে ‘প্যান্ট নাপাক’ বলে ফিরে এসেছে মসজিদের সামনে থেকে। তার বন্ধুরা নামাজ পড়তো, ইচ্ছে করেই সে দাঁড়িয়ে থাকতো মসজিদের বাইরে। মনে মনে গাইতো দেশী বিদেশী বিভিন্ন নামকরা ব্যান্ডের গান। একসময় তার মধ্যে চলে আসে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। মা-বাবার সাথে রাগারাখি করা নিত্যদিনের রুটিন। মাঝেমাঝে সিদ্ধান্ত নেয়, মেয়েটাকে ছেড়ে যাবার। মেয়েটা একবার জড়িয়ে ধরলেই সে ভুলে যেতো পুরোনো সব সিদ্ধান্তগুলোর। সেই পুরোনো বাড়িটার দোতলায় ছেলেটাকে সেদিন প্রথম চুমু দিয়েছিলো মেয়েটা। সেই দৃশ্য কেউ না দেখলেও, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দেখেছিলেন। আল্লাহ তাদের মাফ করুক।

.

ছেলেটা এসএসসি দিলো, দেখাদেখি করার অভ্যেসটা এবারো তাকে এনে দিলো ভালো রেজাল্ট। এলাকায় ভালো কলেজ না থাকায় পাড়ি দিলো ঢাকায়। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলো মা-বাবার স্বপ্ন। আবারো ডুবে যেতে লাগলো  মিউজিক, মুভি, পর্নোগ্রাফি এবং মাস্টারবেশনে। রাতদিন হতাশ থাকতো। দিন দিন আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছিলো। বাড়ি থেকে মা-বাবা ফোন করলে অসহ্য মনে হতো। সারাদিন কাটাতো শুয়ে বসেই।

.

একদিন আমাদের ‘ছেলেটা’ তার আরেক বন্ধুকে নিয়ে যায় নীলক্ষেতে। উদ্দেশ্য ‘বই কেনা’। নীলক্ষেত থেকে একটু দূরেই বাটা সিগন্যাল থেকে সামান্য হাঁটলেই অন্য বন্ধুর বাসা। ভুত চাপলো সেদিনের রাতটা তাদের বাসায় থাকায়। প্রচুর আড্ডা দেয়া যাবে, গান বাজনা হবে, পঁচানো হবে একে অন্যকে। বাসায় এসেই কতক্ষন আড্ডা দিলো তারা। আড্ডার এক পর্যায়ে তার এক বন্ধু তাকে ‘পর্নোগ্রাফি’র খারাপ দিক নিয়ে একটি ভিডিও দেখায়। খুব মনযোগ সহকারে ভিডিওটি দেখে সে। তার মস্তিষ্কের ডোপামিনগুলো ক্রমশ ছোটাছুটি করছিলো। কিছু একটা তাকে তাড়া দিচ্ছিলো। তার কেন যেন মনে হচ্ছিলো, সব মিথ্যে ছিলো তার অতীত। সে নিজেকে নিচু ভাবতে শুরু করলো।

পরদিন দুপুরে সে নিজের বাসায় ফিরে আসে। কিন্তু, গতরাতের চিন্তাটা তার মাথায় গেঁথে আছে। সে ঘাঁটাঘাঁটি করে সন্ধান পায় একটি বইয়ের। নাম ‘মুক্ত বাতাসের খোঁজে’। পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতা জানার পর সে শিউরে উঠে। সে বুঝে উঠে যে, এটাই সেই মুক্ত বাতাস, যেটা সে এতদিন খুঁজার চেষ্টা করতো বিপরীত লিঙ্গের মানুষটির বুকে, গালে, ঠোঁটে।

সেই রাতটা সে পুরোটা কাটিয়ে দিয়েছিলো ইউটিউবে ইসলাম নিয়ে ঘাটাঘাটি করে। ‘জাহান্নামের ভয়াবহতা’ নিয়ে একটা বয়ান শুনে তার লোম দাঁড়িয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় নিজেকে পালটে ফেলার। আর কোনো পর্ন না। যে গানগুলো ছাড়া সে তার জীবনকে অর্থহীন মনে করতো, এক ক্লিকেই ডিলিট করে দিলো সব । অনেক হাল্কা অনুভব করলো। নামাজ পড়া শুরু করলো। অনেকদিন পর হাতে নিলো কুরআন শরীফ। কম্বল ছেড়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযূ করে আদায় করে নিল জীবনের প্রথম তাহাজ্জুদ নামাজ। অহংকারকে দমিয়ে রেখে শুরু করলো টাকনুর উপরে প্যান্ট পরা। দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা ছেড়ে দিয়েছে এখন সে। মা-বাবার সাথে ডেইলি কথা না বললে কেমন যেন খালি খালি মনে হয় তার। আস্তে আস্তে সে জামায়াতে নামাজ পড়া শুরু করলো। এখন তার জীবনে কোনো ডিপ্রেশন নেই। আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছে তার। এভাবেই চলতে থাকুক আমাদের ‘ছেলেটা’র জীবন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এভাবেই আলোর পথে ফিরিয়ে আনুক আমাদের সবগুলো ‘ছেলে’কে।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (পঞ্চম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (ষষ্ঠ কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

 

শেয়ার করুনঃ