বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

নয়.

বয়স আমার ২৬

তখন ক্লাশ সেভেনে পড়ি৷ একদিন এক বন্ধু তার বাসায় আমন্ত্রণ করলো কি এক জিনিস দেখাবে সেইটার জন্য। আমি যখন বাসায় ঢুকলাম দেখলাম বাসায় ওর বাবা-মা কেউ নেই৷ কাজের মেয়েটাও নাই। আর  সোফাসেটে আমার পরিচিত কয়েকটি মুখ বসা (বন্ধু-বান্ধব)

সেই সময় মোবাইল বা ইন্টারনেট এতো বেশি এভেইলেবেল ছিলো না। যেই কারণে কোনো সময় নষ্ট না করে ওই বন্ধুটিই তার ডিভিডিতে ছেড়ে দিলো পর্ন। হাসির ব্যাপার হচ্ছে জীবনের প্রথম দেখেছিলাম ওইদিন পর্ন। আর তারপরেই এক হতাশাজনক কান্ড ঘটালো আমার সামনেই। সবাই উলঙ্গ হয়ে মাস্টারবেশনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ৷ আমার কাছে ব্যাপারটা ভালো না লাগায় আমি চলে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওরা আমাকে চলে যেতে দেয়নি ৷ আমাকেও বলেছিলো তাদের সাথে মাষ্টারবেট করতে৷ এই রকম পরিস্থিতিতে আমার জায়গায় আপনি হলে কী করতেন?

এক্সাক্টলি আমিও তাই করেছি। মিথ্যা একটা ঢং করেছি সবার সামনে যে হ্যাঁ আমিও করছি। কারণ, আমার লজ্জা লাগছিলো । আমি আমার উপরে বালিশ রেখে দিয়েছিলাম। বুদ্ধিটাও তাদেরই ছিলো। আমি কিন্তু তখন কিছুই করিনি৷ আমি যখন সেই জায়গা থেকে চলে আসি তখন কেনো যেনো সেদিন রাতে ঘুম আসছিলো না। চোখ বন্ধ করলেই সেই পর্ন ভেসে উঠছিলো চোখের সামনে৷

তারপরের তিনদিন আমি ওদের মতো প্র্যাক্টিস করা শুরু করি৷ আশ্চর্য্য হলেও সত্যি আমার প্রথম বীর্যপাত হয়েছিলো তিনদিন পর। কারণ, যখনই লাস্ট টাইম চলে আসছিলো আমার মনে হতো প্রসাব আসছে আর তাই বন্ধ করে দিতাম। তো এভাবেই তিনদিন লেগেছিলো শুধু এইটুকু বুঝতে।

তারপর থেকেই শুরু চলছে চলছে চলছেই…….

সব এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো। ক্লাসের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট বয় কীভাবে লাস্ট বয় হয়ে গেলাম টেরই পেলাম না৷ পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করতোনা। সারাদিন একা একা থাকতে ইচ্ছে হতো। আমার কাছে মনে হতো এই জীবন থেকে মরে যাওয়া অনেক ভালো। চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু মরতে পারিনি।

তারপর থেকে নেশায় ডুবে থাকতাম সব সময়। মদ, গাঁজা, ঘুমের ট্যাবলেট এগুলোর মধ্যেই ডুবে থাকতাম। কিন্তু তারপরেও কোনো লাভ হতো না। নেশার মধ্যেও মনে হতো আমি মাস্টারবেট করছি।

হঠাৎ একদিন সূর্যের দেখা মিললো যেইটার তালাশ অনেকদিন ধরেই করছিলাম। আর সেটি হলো ইসলামের ছায়াতল। একদিন নেশার ঘোরেই ছিলাম কিনা মনে নেই এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম তাহাজ্জুদের নামাযের গুরুত্ব। আমি এক অসাধারণ শান্তি খুজে পেলাম এই তাহাজ্জুদে। আল্লাহর দরবারে একদিন তাহাজ্জুদ পড়ে বলেছিলাম “আল্লাহ আমাকে এই নেশা থেকে বাচাও. আমাকে সব ধরনের অপকর্ম থেকে বাচাও। সারাজীবন আমি তোমার গোলাম হয়েই থাকবো।” তারপর থেকেই নিয়মিত হয়ে যাই নামাযে।

আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন।

আর আমিও তার গোলাম হয়েই থেকে গেলাম।

আজ ৩ বছর হলো আমি সেই সব অপকর্ম থেকে মুক্ত। আল্লাহই রক্ষা করেছেন।সব এডিক্টেড মানুষদের বলছি যারা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়৷ একদিন তাহাজ্জুদ পড়েই দেখুন না যদি আপনিও সেই ভাগ্যবানদের একজন হতে পারেন। আর অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামায জাময়াতের সাথে পড়বেন। দেখবেন ভালো করার মালিক আপনাকে ভালো করে দিয়েছেনই। আল্লাহই তো সিফা দান কারী। তাঁর কাছেই চান

দশ

আমি সারাদিন খারাপ কাজে ব্যস্ত কিন্তু ভাল হতে চাইতাম । অনেকের মোটিভেশনাল ভিডিও দেখতাম । অনেক হুজুরের ওয়াজ ও শুনতাম । তৎক্ষণাৎ রক্ত গরম হয়ে যেত ২-৪ দিন সেই উদ্যমে থাকতে পারতাম । একটানা ১০ দিন আমার দ্বারা পরিবর্তিত হওয়া সম্ভব হয় নাই ।

গত দুই বছর ধরে আমি আমার অসফলতার কারণ খুঁজেছি এবং পেয়েছি কেন আমি হেরে যাই । আমার দৈনন্দিন কোন কাজটি আমাকে হারিয়ে দিচ্ছে । এই কারণটি খুঁজে পাবার আগে আমি অন্যদের দায়ী করতাম আমার পরাজয়ের জন্য। যা আমাকে আরো অসফল ও অলস করে তুলেছিল । রাগের সাগরে আমাকে নিমজ্জিত করে রেখেছিল ।

অসফলতার কারণটা খুঁজে পাবার পরে আমি চেষ্টা করেছি এটা থেকে বের হতে কিন্তু কোন ভাবেই পারছিলামনা। অতঃপর সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় ( যিনি সকল সৃষ্টি জগতের মালিক ও অসীম দয়ালু এবং পরম করুণাময় । যার গুন বলে শেষ করা যায় না ) এবং এক বন্ধুর দেওয়া একটা বই যেটা আমি বিরক্তি নিয়ে পড়া শুরু করলেও সকল কর্ম বাদ দিয়ে ধৈর্য নিয়ে বইটা একটানা পড়ে ফেলি । একটানা পড়ার কারণ বইটি মাত্র ২২৮ পেজ । যা আমার পক্ষে অতি তাড়াতাড়ি পড়া সম্ভব এবং এর আগে আর কিছু বই পড়েছি যা কিনা ৫০ ৬০ পেজ পড়েই হাল ছেড়েছি কিংবা কোননা কোন কারণে পড়া হয় নাই কিন্তু পড়ার  সুপ্ত ইচ্ছা ছিল ।

তখনই সাথে পরিকল্পনা করলাম যে আমি বই পড়া চালিয়ে যাবো । সবার আগে এমন বই পড়তে হবে যেটা দিয়ে সব থেকে বেশি জ্ঞান অর্জন করা যায় । আর কুরআনের থেকে ভাল কি আর হতে পারে ?

আফসোস আরবি পড়া অনেক আগেই ভুলে গেছি । দীর্ঘদিন ধরেই চিন্তা করছিলাম যে আবার শুরু করবো কোন হুজুরের কাছে । কিন্তু পারিনি এখনো । তো এর আগে সূরা আল ইমরান পর্যন্ত বাংলা অর্থ পড়েছিলাম ইউনিভার্সিটিতে থাকা অবস্থায় । সুরা বাকারা পড়েই আমার এমন ভাল লাগা শুরু হয়েছিল যে কোন এক সাবজেক্ট এর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতে পড়া বাদ দিয়ে বাংলা অর্থ পড়া শুরু করেছিলাম । পরীক্ষা টা কেমন দিছিলাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।  আফসোসের ব্যাপার, কুরআনের অনুবাদ পড়াটা চালিয়ে যেতে পারিনি । তবে অনেক পরিবর্তন এসেছিল নিজের মধ্যে ।

এত বছর পরে সেই আবার শুরু করেছি । তবে এবার শুধু অর্থ পড়েই হাল ছেড়ে দিচ্ছি না । যেহেতু কুরআন ইসলামিক কিতাব যা কিনা ইসলামের শেষ আসমানি কিতাব যা অবতীর্ণ হয়েছিল ইসলামের পথ প্রদর্শনকারী শেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর, তাই চিন্তা করলাম এর পাশাপাশি আমার অন্য যে কোন একটা বই পড়তে হবে । রাসুল (সাঃ) এর স্বাস্থ্যবিধান নামক একটি বই পড়তাম এর আগে । ৫০-৬০ পেজ পড়া হয়েছিল ভাবলাম এটাই শেষ করি । কিন্তু পরে মনে পড়লো আর একটি বই আছে নাম ইসলামী মনোবিজ্ঞান । তখন স্বাস্থ্যবিধান বইটা বাদ দিয়ে এই বইটি ও পড়তে শুরু করি । যেটা সত্যিই আমাকে অনেক সাহায্য করতেছে । এবং চিন্তাই বদল করে দিয়েছে ।

যেখানে সারাদিন আমি ১০০ চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরতাম যা সবই ছিল নেগেটিভ । আর এই মাত্র ১২ দিনে আমার মাথায় হাজার পজিটিভ চিন্তা এনে দিয়েছে । যার ধরুন ১০ দিনে ঘুম ঠিক মতন হয় নাই কিন্তু একটুও বিচলিত হই নাই । আজকেই তাহাজ্জুত নামাজ পড়েছি এবং দোয়া করেছি নিজের জন্য যা আগে এমন ভাবে করা হয় নাই এর আগে কোনদিন ।

আসরের নামাজ জামাতে পড়েই হুজুরের কাছে কোরআন পড়া শিখবো মাগরিবের আজান পর্যন্ত এমন শপথ করে নিয়েছি । কথাও বলেছি হুজুরের সাথে । তবে তার ওই সময়টায় বর্তমানে ব্যস্ততা থাকায় তার কাছে পড়া হচ্ছে না । এক মামা বলেছেন তিনি অন্য হুজুরের ব্যবস্থা করে দিবেন, আলহামদুলিল্লাহ্‌ । আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যেই শেখা শুরু করে দিব, ইনশাআল্লাহ্‌ ।

আমি জানি মাত্র ১০-১২ দিনের গল্পে সফলতার ঘোষণা দেয়াটা অনেক বড় বোকামির পরিচয় । এতক্ষণে যদি কেউ আমার লেখা পরে থাকেন হয়তো আপনিই বলবেন যে আরে ব্যাটা আগে এটা ধরে রাখ দেখি  ক্যামনে পারিস । ১২ দিনের পরিবর্তন দিয়া আসছে আমার স্ট্যাটাস দিতে । আর অনেক প্রবাদ বাক্য ঝেড়ে দিলেন 🙁 ।

বিশ্বাস করুন আমার মন খারাপ হয় নাই । কারণ আমার মনের মধ্যে এখন যা বয়ে যাচ্ছে এই লেখাটাতে তার বিন্দুমাত্র ফুটে উঠেছে। আল্লাহর রহমতে আমি আমার এই পরিবর্তন ধরে রাখতে চাই ।  আমার স্বপ্ন আমি মানুষের জন্য এমন কিছু করতে চাই যা এই মুহূর্তে আমার নিজের আশা কামনার চেয়ে লক্ষ কোটিগুণ ডোপামিন ক্ষরণ করছে আমার মস্তিষ্কে । এখন আপনি আমাকে যত পঁচাবেন আমার ততই লাভ । আমার যুদ্ধ টা আপনার সাথে নয় আমার যুদ্ধটা আমার মধ্যে বসে থাকা শয়তানের সাথে । আমার হৃদয়ে ভিত্তি ঘরে নেওয়া ইবলিসের সাথে । আমি ইবলিসকেই পরাজিত করতে চাই । আমার কোন ইচ্ছা নাই আপনাকে কথার মাধ্যমে কষ্ট দিয়ে আঘাত করতে । বরং আমি আপনার জন্য দোয়া করবো যে আপনি একদিন আল্লাহ’র ইচ্চায় জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করে আপনার ভুল টা বুঝতে পারেন ।

এত কথার পরেও একটা যদি রেখে যাই, আমি মাত্র শুরু করেছি । শয়তান এই মুহূর্তে তার লক্ষ্য সেনা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যে আমাকে সে হারাবেই । আর আমিও তাকে হারানোর সকল কৌশল প্রস্তুত করে চলেছি । এক মাত্র আল্লাহ্‌ই জানেন যে আমি কতটা সফল হবো কেননা আল্লাহ্‌ বলেছেন তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত দান করে ।আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন যেন নিজের পরিবর্তন ধরে রাখতে পারি ।

এতক্ষণে অনেকের প্রশ্ন আসতেই পারে কোন সেই বই যা কিনা আমাকে মোটিভেট করেছে । তার নাম

” মুক্ত বাতাসের খোঁজে ” ।

যেহেতু আমার বন্ধু আমাকে এটি উপহার দিয়েছে তাই আমি ওর ফেইসবুক পেজ শেয়ার করে তাকে অতি নগণ্য সাহায্য করতে চাই ।

যারা বইটি পড়তে ইচ্ছুক, তারা https://www.facebook.com/iqrashop18 এইখানে যোগাযোগ করতে পারেন ।

আল্লাহ্‌ যিনি সৃষ্টিজগতের মহান পালনকর্তা এবং তার কোন শরীক নাই  মানে তার নেই কোন সন্তান, তার নাই কোন কামনা বাসনা, তার প্রয়োজন হয় না খাবারের, যার দরকার নাই কোন সঙ্গী, কেননা তিনি এক, অনন্য, যার সমতুল্য আর কেউ নাই যিনি মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তারই ইবাদত করার জন্য, এবং তারই আদেশে একদিন সবার মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে । এবং তিনিই আবার বিচার দিবসে আমাদের জীবিত করবেন ।

সবাইকে রহমত প্রদান করুন এবং সবাই আল্লাহ’র সাহায্য আশা করুক এই কামনায় আজকের মতন শেষ করছি ।

আল্লাহ্‌ হাফেজ । আসসালামু আলাইকুম ।

চলবে ইনশা আল্লাহ…

নীড়ে ফেরার গল্প (প্রথম কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (তৃতীয় কিস্তি)

নীড়ে ফেরার গল্প (চতুর্থ কিস্তি)

মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের লিংক-

শেয়ার করুনঃ