বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

তরুণ বয়সটাতে মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়না সে স্বপ্ন যতো অবাস্তব আর অসম্ভব হোকনা কেন! স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় দগ্ধ হবার অভিজ্ঞতা থাকেনা তাই মানুষ প্রচন্ড সাহসী থাকে। যৌবনের প্রথম শৈশবেই যৌবনকে বাজি ধরে জীবনের অসাধারণ স্কেচ আঁকে। তরুণ দু’চোখের সীমিত রেটিনায় সেই স্বপ্নের কোনো খুঁত ধরা পড়েনা। মারাত্মক উজ্জ্বল রঙের সেই স্কেচ বিবর্ণ হয়ে যেতে শুরু করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই। সবার ক্ষেত্রে অবশ্য হয়না, তবে ব্যতিক্রম তো আর উদাহরণ হতে পারেনা। অভিজ্ঞতার বলিরেখা স্বপ্নকে শীর্ণ করে দেয়। মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। অনেক ভ্যারিয়েবল নিয়ে ভাবে, যদি এটা হয়, যদি এটা না হয়…। স্বপ্নভঙ্গের তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার স্বাদও সে পেয়ে যায়। সব মিলিয়ে এক বীভৎস অবস্থা। মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, স্বপ্ন দেখতে চায়না, অন্যকেও দেখতে দেয়না।
.
ভাইয়া দেখ, খুব মন খারাপ নিয়ে লিখাটা লিখছি। তোমাদের বয়সে আমিও স্বপ্ন দেখব বলে দু’চোখ পেতেছিলাম। আমারো একটা স্বপ্ন ছিল আর এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও আছে। আমি তোমাদের দুর্দান্ত দুর্দান্ত সব স্বপ্ন দেখতে নিষেধ করবনা, তবে কীভাবে, কোন পথে হাঁটলে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হবেনা তা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ্‌। তোমরা এখন যে পথের পথিক, সেই পথে হেঁটে ক্ষত বিক্ষত আমার দু’পা। চোরাবালি আর কাঁটাঝোপ গুলো চিনেছি একটা একটা করে, বুঝেছি কেন স্বপ্ন আহত হয় ক্ষণে ক্ষণে, তারপর একসময় নিহতই হয়ে যায়।
.
কেন স্বপ্নেরা মরে যায়, কেন উদীয়মান নক্ষত্ররা ঝরে যায়? ড্রাগস, প্রেম এই কালপ্রিটগুলোর কথা সচরাচর সামনে আসে। অভিভাবকেরা এগুলো নিয়ে কথা বলেন তাদের সন্তানদের সঙ্গে। মেনে চলতে না পারলেও (যেমন প্রেম) মোটামুটি সবাই সতর্ক থাকে বা মনের মধ্যে একটা খচখচানি থাকে। এই লিখায় আমরা আলোচনা করব এমন কিছু বিষয় নিয়ে যেগুলো সাধারণত সেরকমভাবে টাইমলাইটে আসেনা, না আসাটাও স্বাভাবিক। এগুলো বর্তমান অস্থির সময়ের নবউদ্ভূত সব সমস্যা। আমাদের বাবামার বা বড়ভাইবোনদের জেনারেশনদের অনেকেরই এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই।
(প্রেম সংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপারগুলো আলোচনা করা হয়েছে এই সিরিজে- আততায়ী ভালোবাসা-http://lostmodesty.com/2018/09/আততায়ী-ভালোবাসা-প্রথম-পর/)
.
ভার্সিটিতে পা দেওয়া একটা ছেলে বা মেয়ের লাইফ স্টাইল কীরকম ? কীভাবে তারা চিন্তা করে?
.
কিছু ব্যতিক্রমবাদে মোটামুটি সবাই একটা ছকেঁবাধা জীবন যাপন করে। কিছুটা স্বকীয়তা নিয়ে ভার্সিটিতে আসলেও সেটি হারিয়ে ফেলতে খুব বেশি সময় লাগেনা পরিবেশের প্রেসারে। সবারই ছোট বড় একটা ফ্রেন্ড সার্কেল থাকে। ছেলেমেয়ে মিলিয়েই ফ্রেন্ড সার্কেল, আলাদা আলাদা না। এদের সাথে ফুটপাথে,গাছতলায়, ক্লাসরুম,লাইব্রেরির বারন্দায় রেস্টুরেন্ট এ আড্ডা দেওয়া, গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া, দুই তিনমাস অন্তর অন্তর বান্দরবন,কক্সবাজারে ফ্রেন্ড সার্কেলের সব ছেলেমেয়ে একসাথে ট্যুর দেওয়া, গার্লফ্রেন্ড,বয়ফ্রেন্ড নিয়ে রেস্টুরেন্ট, দিয়াবাড়ি টাইপ জায়গা, রিকশায় হুড তুলে ডেটিং, ফেসবুকে এ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তোলা ছবি আপলোড, কমেন্টে প্রশংসার বন্যা …। জাতে ওঠার জন্য ইংলিশ, কোরিয়ান সিরিয়াল, প্র্যাংক ভিডিও দেখা, ইপিএল, লা লিগা নিয়ে তুখোড় বিশ্লেষনে ফেসবুক কাঁপিয়ে ফেলা, আর্টসেল, তাহসান, মেটালিকায় বুঁদ হয়ে যাওয়া, গুরু জেমসের কনসার্টে উদ্দাম নাচানাচি, ফিফা, কল ওফ ডিউটি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকা … মোটামুটি এই হল তাদের জীবন। তাদের এই জীবনের অনেক উপাদানই তারা নিজেরা বেছে নেয়নি-মিডিয়া,ফোনকোম্পানিগুলো, পাশ্চাত্য সভ্যতা তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ইয়াবা,গাজা, লিটনের ফ্ল্যাট ব্যাপারগুলো আর না আনি। এগুলো তাদের লাইফস্টাইলের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবে আমরা শুরুতেই বলেছি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা আমাদের এই লিখার উদ্দেশ্য না।
.
এই ‘প্যারা নাই চিইল’ লাইফ লিড করতে যেয়ে পড়াশোনাটা আর ঠিকমতো করা হয়ে ওঠেনা। মাঝে মাঝে যে মন খারাপ হয়না, পড়তে বসতে ইচ্ছে করেনা সেটা নয়, তবে প্যারা নাই চিইল লাইফ লিড করার প্রেসারে এই মন খারাপটুকু পাত্তা পায়না। ভার্সিটির একদম প্রথম দিন থেকেই ‘পচানির’ তীব্র,আগ্রাসী যে কালচারের মুখোমুখি হতে হয় একজন তরুণ, তরুণীকে সেটা সহ্য করে নিজের স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। সব যায়গাতেই পচানি। উঠতে বসতে পচানি।
.
ভার্সিটিতে আসার প্রধান উদ্দেশ্যই তো ছিল কিছু শেখা, পড়াশোনা করা। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করলে, স্যারদের প্রশ্ন করলে, সন্ধ্যায় হলে ফিরে পড়ার টেবিলে বসলে শুনতে হয় টিটকিরি। ব্যাটা একটা আঁতেল , জীবনকে উপভোগ করতে পারবেনা, আতঁতলামি করতে করতেই পটল তুলবে…’ এই আঁতেল আঁতেল পচানি খেতে খেতে একসময় পড়াশোনায় সিরিয়াস ছেলেমেয়েগুলো উদাসীন হয়ে যায়, ক্লাসনোট ঠিকমতো তোলেনা, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসেনা। রেজাল্ট খারাপ করা শুরু করে।
.
অনেককেই এরকম হতে দেখলাম, আমি নিজেও এর কিছুটা ভুক্তভোগী। ভাই দেখ তোমাকে যতোই আঁতেল আঁতেল বলে পচাকনে কেন, কানে তুলবেনা পচানি, জানি এটা করা খুবই কষ্টকর। কিন্ত চেষ্টা করো,পারবে তাদের পচানি উপেক্ষা করতে। তাদের টিটকিরি,পচানো শুনে যদি তুমি পড়াশোণা বন্ধ করে দাও তাহলে ক্ষতিটা ওদের হবেনা, ক্ষতি তোমারই হবে। যে যাই বলুক, তুমি নিয়মিত পড়াশোনা করা, ক্লাসে মনোযোগী থাকা বন্ধ করোনা। আমাদের যেই ছেলেগুলোকে আঁতেল বলে পচাতো সবাই, কিন্তু শত পচানি সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিল , তাদের মোটামুটি সবাই আজ বেশ ভালো ভালো জায়গায় রয়েছে।
.
আরেক ধরণের পচানি আছে। এ পচানির নাম -গাইয়া/ক্ষ্যাত পচানি। শহরের ছেলেমেয়েও এই পচানি খায় তবে গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা ছেলে মেয়েদের এই পচানি বেশি খেতে হয়। একটু আগে যে লাইফস্টালের কথা বললাম সেই লাইফস্টালের কোনো উপাদান কারো জীবনে না থাকলে গাইয়া/ক্ষ্যাত উপাধি পেতে হয়। কোরিয়ান,ইংরেজি সিরিয়াল না দেখে বাংলা সিরিয়াল দেখলে, হলিউডের মুভি না দেখে কলকাতার মুভি দেখা মানে তুমি একটা গাইয়া। তুমি বাংলিশ ভাষায় কথা বলতে পারোনা, আইতাছি,খাইতাছি,করতাছি করতে পারোনা মানে তুমি একটা ক্ষ্যাত। তুমি দামী স্মার্ট ফোন ব্যবহার করোনা মানে তুমি আনস্মার্ট, তোমার প্রেস্টিজ নেই। ফুটবলের কোনো খবর রাখোনা, ফাস্টফুডের অনেক আইটেম তুমি চেখে দেখনি, পিংক ফ্লয়েডের টিশার্ট পরোনা, চে গুয়েভরার ক্যাপ মাথায় দিয়ে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো তুমি বিপ্লব বিপ্লব মারাওনা তার মানে তুমি ক্ষ্যাত । মেয়েদের সঙ্গে মিশতে অস্বস্তিবোধ করো, ছেলেমেয়ে একসঙ্গে ট্যুর দিতে চাওনা তার মানে তুমি একটা ভোদাই। এই ক্ষ্যাত , ভোদাই আর গাইয়া পচানি কতো ছেলেমেয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
.
এদের ধরে ধরে আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে এই যে ভাই, তুমি মাই লাইফ মাই রুলস বলে অহংকার করছো, তোমার মতো জীবন যাপন করেনা দেখে আরেকজনকে নির্দ্বিধায় গাইয়া,ক্ষ্যাত বানিয়ে দিচ্ছ তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছে তুমি কার জীবন যাপন করছ? তোমার নিজের ? নাকি আরেকজনের বেঁধে দেওয়া জীবনে তুমি অভিনয় করছ? তুমি আরেকজনের হাতের পুতুল- যদি ফেসবুকে ক্লাসে ফাঁকি দেওয়া, ক্লাসে ঘুমানো প্রিপারেশন ছাড়া পরীক্ষা দেওয়াকে এতো গ্লোরিফাই না করা হতো, কুল ডুডস হবার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা না করা হতো তাহলে তুমি কি এগুলো করতে ? যদি মোবাইল কোম্পানিগুলো তোমাকে না শেখাতো জাস্টফ্রেন্ডদের (ছেলে মেয়ে একসঙ্গে, কোনো ব্যাপারনা) নিয়ে একসঙ্গে ট্যুরে যেতে হবে, একই হোটেলে একই রুম শেয়ার করে থাকতে হবে তাহলে কি তুমি এগুলো করতে ? যদি ফেসবুকে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ঘন ঘন দামি রেস্তোরায় সেলফি না দিলে জাতে উঠতে পারবেনা, সবাই ব্র্যান্ডের জামাকাপড় পরে,মাঞ্জা মেরে ছবি দেয় আমি না দিলে কেমন হয়’ এই প্রেসারগুলো যদি না থাকতো তুমি কি এতো কষ্ট করে টিউশানি করে, বাবা মার পকেট কেটে করে ঘন ঘন গার্লফ্রেন্ডে নিয়ে খেতে যেতে? ব্র্যান্ডের জামা কাপর কিনতে সব সময়? নিজের ইচ্ছেয় তুমি কি কি করো? আর জাতে ওঠার জন্য, ভাব মারার জন্য, অন্যরা কি ভাববে সেইটা ভেবে চিন্তিত হয়ে কি কি করো তার তালিকা করে দেখ- হিসেব মেলে কিনা!
.
ভাই তুমি আসলে সম্পূর্ণরূপে ব্রেইন ওয়াশড। মিডিয়া, এই সমাজ, সভ্যতার দ্বারা তুমি মগজধোলাইয়ের শিকার। তুমি অন্ধ। তুমি দাস।
.
এই জীবনে কি তুমি সুখী? তুমি কি হতাশার চাষাবাদ করোনা? তুমি কি অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে চাপা দিয়ে রাখোনা ? ভবিষ্যতের চিন্তা করতে তুমি ভয় পাও। সিগারেট, গাঁজার আগুনে তুমি তোমার দুঃখগুলো পোড়াতে চাও। জাস্টফ্রেন্ডকে ভেবে বাথরুমে নিজের ওপর অত্যাচারের জীবনটাতে তুমি খুশি? রিকশা বিলাস আর লিটনের ফ্ল্যাটের অভিসার, এবোরশনের চিন্তা, একটার পর একটা গার্লফ্রেন্ডে পালটানো তোমাকে শান্তি দিয়েছে?
.
অথচ তোমার এই ‘ফেসবুকে সুখী কিন্ত বাস্তবে দুঃসহ’ জীবন যাপন করেনা জন্যেই তুমি আরেকজনকে গাইয়া/ক্ষ্যাত বলছো। তার জীবনটাকে নরক গুলজার করে ছাড়ছো। উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে খেতে ঘুমাতে তোমার পচানি খেতে খেতে তারা নরক যন্ত্রণা ভোগ করে। নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ভেতরে গুমরে গুমরে মরে, বাথরুমে কাঁদে। পড়াশোনার ক্ষতির কথা বলাই বাহুল্য, অনেক ছেলেমেয়ে এই মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভার্সিটি ছেড়ে দেয়, ঢাকা ভার্সিটির এক ছেলে আত্মহত্যা করেছিল এ কারণে এমন সংবাদও একবার চোখে পড়েছিল। তুমি নিজের অজান্তেই কতো ছেলেমেয়ে তাদের বাবা মা পরিবারের স্বপ্ন নষ্ট করেছে, ভেবে দেখেছো?
.
এই যে এখন তুমি আরেকজনকে গাইয়া, ক্ষ্যাত বলে পচাচ্ছো, খুব মুভি সিরিয়াল, বন্ধু আড্ডা গান, ব্যাচট্যুর, রেস্টুরেন্ট, গারলফ্রেন্ড মারাচ্ছো, তোমার রেজাল্টের কী অবস্থা? তোমার কি কি স্কিল আছে? শুদ্ধ করে বাংলা বা ইংরেজি বলতে পারো? লিখতে পারো ? পাস করে যখন বের হবে তখন চাকুরী পাবে ? চাকুরী না পেলে আর এইসব মুভি সিরিয়াল, বন্ধু আড্ডা গান থাকবেনা, ফ্রেন্ডস অফ বেনিফিটসরা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, টিকির নাগালো পাবেনা, হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাবে আর আফসোস করবে।
.
যাই হোক তুমি নিজে যদি কখনো এরকম পচানির শিকার হও, তাহলে খুঁজে দেখ তোমার আশেপাশে কোনো হুজুর ছেলে বা মেয়ে আছে কিনা (মেয়েদের জন্য)। তাদের সঙ্গে তুমি এই কষ্টগুলোর কথা শেয়ার করো। তাদের সাহায্য চাও। তাদের সঙ্গে বেশি বেশি মেশো। চলাফেরা, খাওয়া দাওয়ার, কথাবার্তার কিছু কিছু আদব থাকে। তাদের কাছ থেকে শিখে নাও। ইনশা আল্লাহ্‌ হুজুর ছেলে বা মেয়েগুলো তোমাকে সাহায্য করবে। তোমাকে নিরাশ হওয়া লাগবেনা। যেই পোলাপানগুলো তোমাকে বেশি পচানি দেয়, তাদের সঙ্গে একাকী কথা বলতে পারো। তাদের বোঝাতে পারো তাদের এই আচরণগুলো তোমাকে কতোটা কষ্ট দিচ্ছে। একটু ভালোমতো বুঝাতে পারলেই তারা বুঝবে ইনশা আল্লাহ্‌।

.
বেশ বড়সড় একটা ক্ষতি করে ফেলে মোটিভেশনাল স্পীকাররা । পড়াশোনার সাথে নূন্যতম সম্পর্ক নেই এমন পোলাপান যখন পরীক্ষায় ফেইল করে পড়ার টেবিলে ফেরত আসতে চায়, তখন এই গলাবাজরা কুমন্ত্রণা ঢালে পোলাপানের কানে। আরে দুই একটা ফেইল না করলে হয়- এইযে বিলগেইটসকে দেখ পরীক্ষায় ফেইল করেছে, স্টিভ জবসকে দেখো সে তো ভার্সিটি ড্রপ আউট… এরকম মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে পোলাপানের মধ্যে ‘ ফিল গুড’ টাইপের একটা অনুভূতি নিয়ে আসে। পোলাপান ভাবে তাইতো, পড়াশোনা করার কি দরকার- আমি বিল গেইটস হবো, আমি স্টিভ জবস হবো, পরীক্ষার আগে আগে ভাবে- এ সিঙ্গেল শিট অফ পেপার ক্যান্ট ডিসাইড মাই ফিউচার- এতো প্রেসার নেবার কি দরকার এগুলো ভেবে নিজেকে সান্তনা দেয়। বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়। মোটিভেশন স্পীচ ড্রাগের মতো হয়ে গিয়েছে। মোটিভেশনার স্পীকাররা বাস্তবতা ভুলিয়ে দেয়, কাককে কোকিল আর ময়ূর হবার স্বপ্ন দেখিয়ে একগাদা টাকা আর তালি বগলদাবা করে ঘরে ফিরে।
.
সব মানুষের পক্ষেই স্টিভ জবস বা বিল গেইটস হওয়া সম্ভব নয়। যদি পরীক্ষায় ফেইল করা বিলগেইটস হবার পূর্বশর্ত হতো তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে বিলগেইটস থাকতো। পোলাপান এই মিথ্যে সান্তনায় নিজেকে ভুলিয়ে তাদের প্যারা নাই চিইল লাইফে আবার ফেরত যায়। পোলাপান স্টিভ জবস বা বিল গেইটস হতে চায় কিন্তু তাদের মতো কাজ করেনা, তাদের মতো নিজের স্বপ্নের পেছনে সময় ব্যয় করেনা, মন প্রাণ ঢেলে কাজ করেনা। তাহলে কীভাবে সফল হবে? কীভাবে নিজের বুকের কোণে সযত্নে রাখা স্বপ্নটাকে আকাশের মতো বিশাল করবে ? সারা দুনিয়ার মাঝে ছড়িয়ে দেবে? পড়াশোনা করতে তোমার ভালো লাগেনা ঠিক আছে, তোমার স্বপ্ন নিয়ে তুমি কাজ করো। তুমি পড়াশোনার কথা বললে বলবা যে আমার এসব ভালোলাগেনা, আমি নিজের মতো করে কিছু করব, আবার নিজের স্বপ্নের পেছনেও সময় দাওনা, চিইল করে করে উল্টায়া ফেলো, তাহলে চারবছর শেষে একটা লো সিজিপিএ আর একরাশ হাতাশা ছাড়া তোমার কপালে কিছু জুটবে? । তুমি কাক, কাকই থেকে যাবে, না হতে পারবে ময়ূর না হতে পারবে কোকিল।
.
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল। আরেকটা ফাঁদ- উদ্যোক্তা হবার, ব্যবসা করার ফাঁদ। প্রথম থেকেই চাকুরী তোমার কাছে মনে হয় গোলামি। তুমি তাই উদ্যোক্তা হবে, ব্যবসায়ী হবে। তাই চারবছর পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস থাকলেনা। চিইল আর এঞ্জয় করে গেলে। বের হবার পর এখন তোমার সময় হলো মাঠে নামার। প্রথম ধাক্কাটা আসবে পরিবার থেকে। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখনো জাতে ওঠার জন্য ব্যবসা বা উদ্যোক্তা ভালো কোনো অপশন নয়। ‘ছেলে কি করে’ সমাজের এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা খুব ভালো উত্তর নয়। বাবা মা তোমাকে প্রবলভাবে বাঁধা দিবে। তুমি সেই বাঁধাতে টিকতেই পারবেনা। উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন ভুলে বিসিএস পড়তে বসতে হবে, লো সিজিপিএর, স্কিল না থাকার কারণে অন্যান্য চাকুরী পেতে সমস্যা হবে। ঘুরে ফিরে সেই হতাশা আর হতাশা।
.
ধরো বাবা মা রাজি হলো। তুমি কোনো প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নামলে। হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করলে উদ্যোক্তা হবার কি কষ্ট, কতো পরিশ্রম, কতো মানসিক শক্তির দরকার। প্রথম অবস্থাতে লাভের মুখ খুব বেশি দেখবেনা, রাতারাতি কাড়ি কাড়ি টাকা কামানোর আরাম আয়েশের যে স্বপ্ন ছিল তা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাবে। লস হলে তো কথায় নেই, তুমি সব কিছুতে ইস্তফা দিয়ে ঘরে ফিরে আসবে। সঙ্গী ? একটা লো সিজিপিএ আর তীব্র হতাশা । অনেকেই যে সফল উদ্যোক্তা হয়না সেটা না। কিন্তু তাদের মানসিক শক্তি, সংকল্প থাকে অন্য মাত্রার। শুরু থেকেই তাদের কংক্রিট একটা প্ল্যান ছিল। তুমি উদ্যোক্তা হতে চাও, ব্যবসায়ী হতে চাও, ভার্সিটিতে থাকা অবস্থাতেই শুরু করে দিতে সমস্যা কী? কেন এভাবে নিজেকে ভুলিয়ে রাখছো চার বছর? কেন নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারছো?
.
ভাই, তুমি বিল গেইটস হও, স্টিভ জবস হও, নিজের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করো, উদ্যোক্তা হয়, হালাল হারামের সীমার মধ্যে থেকে চিল করো কোন সমস্যা নেই। শুধু একটু পড়াশোণা করো নিয়মিত। যে স্যারের ক্লাসগুলো করতে ভালো লাগে সেই স্যারের ক্লাসগুলো করো , সব ক্লাস করতে হবেনা, উইকেন্ডের একটা দিন ক্লাসনোটগুলাতে চোখ বুলাও, কুইজ বা ক্লাস টেস্টগুলো একটু পড়ে দাও। তাহলে দেখবে তুমি মোটামুটি নিজের ভেতর কিছু মালপানি নিয়ে বের হচ্ছো চারবছর পর। খুব বেশি সময় কিন্তু লাগেনা, অতি অল্প সময়ের একটু পড়াশোনা, এক সপ্তাহে এক দুই ঘন্টার পড়াশোনা তোমাকে রাখবে স্বপ্নপূরণের পথে।
.
চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ …

ইউটিউব লিংক-https://m.youtube.com/watch?v=1fhMLMgEajA

শেয়ার করুনঃ