এক বছরের বেশি হয়ে গেল আমার প্রবাস জীবনের – জার্মানির হামবুর্গ শহরে। হামবুর্গ আন্তর্জাতিক শহর – ১৮০ এর বেশী দেশের মানুষের এখানে বসবাস। এখানে আসার আগে মাত্র একজন বাংলাদেশীকে চিনতাম, তার উপর হামবুর্গে বাংলাদেশীর সংখ্যা হাতেগোনা হয়ার কারনে প্রথম থেকেই বিদেশি বন্ধবান্ধব জুটে জায়, এদের সাথেই উঠাবসা চলে। পূর্বের চায়না থেকে পশ্চিমের আমেরিকা – সবার সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে…ইংলিশটা ভাল হয়ার কারনে অনেক জার্মান বন্ধুও জুটেছে (হাম্বুরগের জার্মানরা তাদের ইংলিশ এর উন্নতির বেপারে খুবই সচেতন :D)….উইকেন্ডের সারা রাত জেগে জীবন ভিত্তিক আড্ডাও হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি বলব গত এক বছর আমার জীবনের সবচেয়ে শিক্ষামূলক সময় কাটিয়েছি – বেশ কিছু জিনিশ উপলব্ধি করেছি….
.
ছোটবেলায় আমার কাজিনের (Tamal vai)কল্যাণে হলিউড মুভি দেখা হয়েছে অনেক। মুভি দেখতাম আর আফসোস করতাম – ইশ!! কেন যে আমেরিকা-ইউরোপে জন্ম হলনা!!! কত সুন্দর বাল্যকাল কাটাতাম!!! স্কুল থেকে প্রতি বছর অন্য দেশে ট্রিপে নিয়ে যেত, সামারে বনেবাদারে ক্যাম্পিং করতাম, শীতকালে উইন্টার স্পোর্ট করতাম, ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে গার্লফ্রেন্ড থাক্ত, ১৬ বছর থেকে পার্টটাইম কাজ শুরু করে টাকা জমায় ২০-২১ বছরে ওয়ার্ল্ড ট্রিপ দিতাম! what a life that would have been……অনেক রাগ ছিল বিধাতার উপর…গরীব দেশে জন্ম দেয়ার কারনে।
.
আজ আমি এক বছর প্রবাস জীবন কাটানোর পর প্রতিদিন একবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায করি, গরীব-মুসলিম দেশে জন্ম দেয়ার কারনে……একটু ব্যাখা করার চেষ্টা করি, কেন এই উপলব্ধি।
.
জার্মানি আসার আগে জার্মানির উপর কিছু আর্টিকেল পড়েছিলাম। এমন একটা আর্টিকেল এ ছিল লাভ ইন জার্মানি এর উপরে। আর্টিকেলের একটা জিনিস বেশ অবাক লাগসে – জার্মানরা “আমি তোমাকে ভালবাসি” – এই কথাটা পারত পক্ষে বলে না। ২-৩ বছরের সম্পরকের পর ও ওরা ভালবাসার কথা এরায় চলে। প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। এখানে এসে জার্মানদের সাথে মিশার পর, বেশ কিছু জার্মান ফ্যামিলির কাছ থেকে দেখার পর ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারসি।
.
এখানে বিয়ে ৪-৫ বছরের বেশি টিকে না। অধিকাংশ ফ্যামিলি বাচ্চা ছোট থাকা অবস্থায় ভেঙ্গে যায়। এর ফলে যেটা হয় যে, বাচ্চা ছোট বয়স থেকেই দেখে যে বাবা-মা দুই জনের কাছেই কয়েক মাস পর পরই গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড আসতেসে…কেউই স্থায়ী হয় না। ছোট বেলা থেকেই একটা শিক্ষা ওরা নিয়ে নেয়, “মানুষ আসবে মানুষ যাবে”। যার কারনে অটমেটিকালি মানসিক আত্মরক্ষা এর কারনে ওরা কোন মানুষের প্রতি ইমশোনাল ডেভেলপমেন্ট করতে পারে না। কারন আনকনশাসলি ওরা এটা ধরেই নেয় যে, কেউই বেশিদিন থাকবে না। তার উপর ১৩-১৪ বয়স থেকেই ফিসিকাল রিলেশনশিপ শুরু করে দেয় – ভালবাশা এর জন্য না, আসলেই ফিসিকাল কিউরিসিটি থেকে এবং প্রতি বছর নতুন নতুন। যার কারনে নারীপুরুষ সম্পর্কের ভিতর ওদের কাছে কোন কিছু বাকি থাকে না। যার ফলে ওরা পুরা নারীপুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে ইন্সেন্সিটিভ হয়ে যায়।
.
একটা এক্সামপল দেই, এখানে ছেলে-মেয়ে বন্ধু (শুধু বন্ধু)একসাথে ঘুমায়…কোনরকম সমস্যা ছাড়া। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞাসা করা, কার সাথে চ্যাট করতেসে, কারসাথে পার্টিতে যাচ্ছে – এগুলো রুড।
রিলেশনশিপ ওদের কাছে নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয়া, নতুন শরীর এর অনুভূতি নেয়া মাত্র……ভালবাসা এর অনুভূতি এক অবাস্তব বিষয়। বলিঊডের মুভি দেখে প্রচণ্ড অবাক হয় – সত্যিই কি ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের মানুষরা এতোটা রোমান্টিক??? এতো অনুভূতি ওদের আসে কোথা থেকে???
.
আরেকটা বিষয় হল কালেক্টিভিসম অ্যান্ড ইন্ডিভিডুয়ালিসম। গরীব দেশের সমাজ কালিক্টিভিস্টিক হয় সারভাইভাল এর জন্য। কারন সরকার সমাজ সবসময় ব্যাসিক নিড ফিলাপ করে না। যার কারনে আমরা ছোটবেলা থেকেই পরিবার, বন্ধু, ভালোবাসার মানুষ এর জন্য স্যাক্রিফাইস করা শিখি…এটাইতো ভালবাসা, অনুভূতির জগতের ব্যাসিক।
.
আর একটা ইন্ডিভিডুয়ালিস্টিক সোসাইটিতে স্যাক্রিফাইস এর কন্সেপ্টটা অচেনা……একানকার মোটো হল – “তোমার জীবন এটা, তাই কর, যেটা শুধু তোমার জীবনের জন্য ভাল”। যার ফলে প্রতিটা মানুষ বাচে শুধু নিজের জন্য-আমাদের জন্য যেটা সায়েন্স ফিকশন, কল্পনার বাইরে। একারণে পরিবার-ভালবাসার মধ্যে এইধরনের প্রশ্ন খুবই কমন – “ও কি আমাকে সুখী করছে? ওকেই কি আমি চাই? আমার বাবা-মা এর সাথে থাকার কারনে আমার বযক্তিগত জীবন কি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে?”- পুরো জীবন জুরেই এইসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে খুজতে চলে যায়…অনুভব আর করা হয় না। ওরা খুবই অবাক হয় শুনে, যখন আমি বলি, আমাদের প্রশ্নগুলো পুরো উল্টো – আমারা চিন্তা করি আমার আমাদের বাব-মাকে সুখী করতে পারছি কিনা, ভালবাসার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারছি কিনা…
.
আর সবথেকে বড় বিষয় হল, গডলেস সোসাইটিতে বড় হবার কারণে শিখে, এই জীবনটাই আসল, এরপর আর কিছু নাই, সব শেষ! সব মানুষের পক্ষে তার এইধরনের বাস্তবতা মেনে নেয়া কঠিন। হার্টে সত্তের অপূর্ণতা থেকেই যায়।
.
মজার একটা বিষয় হল ছোটবেলা থেকেই এতোটা রোবোটিক যে, এখানে আপনি জার্মান কোন বাচ্চাকে কাঁদতে দেখবেন না। রাস্তায় যদি কোন বাচ্চার কান্না শুনেন, তাহলে চোখ বন্ধ করে বুঝে নিবেন টার্কিশ বা আরব বাচ্চা। আমি এখন পর্যন্ত একটা জার্মান বাচ্চাকে কান্তে দেখি নাই…সত্তি!!!!!!!!
.
আমার এই অভিজ্ঞতার পর ছোটবেলার ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের প্রতি হিংসা, ওদের প্রতি করুণায় পরিণত হয়েছে। যতবারই জার্মানদের সাথে এইসব বিষয়ে কথা বলেছি, ততবারই গম্ভীর হযে গেছে, ২-৩ জন কেঁদেও দিয়েছে। আসলেই ওদের মনের ইমোশনাল ভেকেন্সিটা একটু ফিল করতে পারলে ভয় লাগে…কিভাবে এভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব??? উত্তর হল উইকডেতে কাজে ব্যস্ত থাকা, উইকেন্ডে মাতাল হয়ে সব ভুলে যাওয়া…মাঝে মাঝে সাইক্রিটিস্ট ভিসিট করা, এন্টি দিপ্রেসসিভ ড্রাগ নেয়া……নতুন রিলেশনশিপ খোজা, রাস্তায় প্রথম ২-৩ মাস ওপেনে কড়া ভালোবাসা(!) বহিঃপ্রকাশ করা……তারপর আবার প্রথম থেকে শুরু করা…..
.
আসলেই আল্লাহর কাছে অগনিত শুকরিয়া, বাংলাদেশের মত গরিব ও রক্ষণশীল মুসলিম দেশে জন্ম দেয়ার জন্য। যেখানে এমন মা পেয়েছি যে তার, ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করার জন্য। যেখানে বাবা পেয়েছি যে শখ করে নিজের জন্য একটা ঘড়িও কিনেনি – ছেলেমেয়েদের পেছনে খরচ করার জন্য। যেখানে পরিবার পেয়েছি যার কথা ভাবলেই সব দুঃখ কষ্ট ম্লান হয়ে যায়। যেখানে আল্লাহ তোমাকে পেয়েছি – আখিরাতের কথা চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছি……
.
My last word would be my greatest realization in life, „Whatever that sounds good or looks good is not necessarily good “… Dear Generation Y, stop following west blindly. I know that it looks like a joy ride, but it’s all a downhill fall which has almost no way back unless Allah wants. May Allah make us among those upon whom he has bestowed His grace. May Allah guide us all to the right path and make us the grateful of His grace. Ameen

চলবে ইনশা আল্লাহ…

(কালেক্টেড)

আরো পড়ুন-
একেই বলে সভ্যতা (প্রথম পর্ব) !!!: https://tinyurl.com/yaky6j8b
একেই বলে সভ্যতা (দ্বিতীয় পর্ব) !!!: https://bit.ly/2xbpnW5
এরই নাম স্বাধীনতা !!!: https://bit.ly/2xcsUnn
এরই নাম স্বাধীনতা!!! দ্বিতীয় পর্ব – https://bit.ly/2xce9kq
এরই নাম স্বাধীনতা!!! তৃতীয় পর্ব-https://bit.ly/2MxnRna
পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা: https://bit.ly/2p1Irme
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব-২: https://bit.ly/2Ms17VA
মুখোশ উন্মোচনঃ পর্ব- ৩ https://bit.ly/2p6dopk

শেয়ার করুনঃ