সৃষ্টির একবারের শুরুর সেই সময়টা । আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে ।  তিনি জান্নাতে থাকেন । একা একা  কিছুটা বিষণ্ণ মনে   ঘুরে বেড়ান । আই রিপিট “জান্নাতে” মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ান । অবশেষে আল্লাহ্‌ (সুবঃ), আদম (আঃ) এর সঙ্গী   হাওয়া (আঃ) কে সৃষ্টি করলেন।আদম (আঃ) এর বিষন্নতা কেটে গেল।

স্বামী / স্ত্রী এবং তাদের মধ্যেকার অন্তরঙ্গতা  আল্লাহ্‌ (সুবঃ) এর এক বিশাল নিয়ামত । স্বামী / স্ত্রী একজন অপরের চোখ শীতলকারী , প্রশান্তি দানকারী । হাজার বছর ধরেই স্বামী স্ত্রীর এই অসম্ভব সুন্দর সম্পর্ক, একে অপরের প্রতি স্রদ্ধাবোধ, ত্যাগ স্বীকারের হাজার হাজার  কাহিনী  লিপিবদ্ধ হয়েছে, মহাকাব্য রচিত হয়েছে , রচিত হয়েছে অসংখ্য অশ্রু  ঝরানো উপাখ্যান । কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক মহান সভ্যতায় বদলে গেছে  স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ।

ঠুনকো হয়ে গেছে  স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা ভালোবাসায় মিশে গেছে ফরমালিন । কমে গেছে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ।  আমাদের দাদা দাদী, নানা নানীদের জেনারেশান,   অত দূরে যেতে হবে না, আমাদের বাবা মার জেনারেশানের স্বামী স্ত্রীর  সম্পর্কের মধ্যে যে পরিমাণ সততা ছিল ,যে পরিমাণ আবেগ ছিল তা আমাদের জেনারেশানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা একসাথে একি ছাদের নিচে ঘুমিয়েছেন , জীবনের সকল দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন , সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছেন জীবনের পক্ষে।

আমাদের জেনারেশানের দাম্পত্য জীবন অনেকটা পিকনিকের মতো । একে অন্যকে  দেখে দুজনকেই দুজনের  অনেক “কুউউল” মনে হল , তারপর  দুজনে বিয়ে করে কিছুদিন “এনজয়” করল । তারপর একরাতে মশারী খাটাতে যেয়ে  দুজনের হালকা কথা কাটাকাটি শুরু হল , তারপর ঝগড়া , তারপর রাত দুপুরে দুই পক্ষের অভিভাবক ডেকে ডিভোর্স ।

খালাস।

আবার কিছুদিন পর অন্য একজনকে দেখে অনেক ‘কুউউল’ মনে হল, তারপর আবার বিয়ে , তারপর কিছুদিন এনজয়, ফেসবুকের ওয়ালপেজ ভর্তি বেডরূম সেলফি , তারপর একদিন সামান্য কারণে হুট করে  ডিভোর্স ।  এই দুষ্ট চক্র চলতেই থাকে ।

কিন্তু কেন?

কেন হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা  স্বামী স্ত্রীর মধুর সম্পর্কের আজ এই  বেহাল দশা ? কেন এক নিদারুণ দুঃসময়ে টালমাটাল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধনগুলোর একটি?

অনেক গুলো ফ্যাক্টর আছে এর পিছনে । পুঁজিবাদী চিন্তাভাবনা ,সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব

করা,সেকুল্যারিজমের প্রসার,মিডিয়ার মগজধোলাই,নারীবাদের উত্থান ।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর পর্নমুভি, আইটেম সং,  সর্বোপরি মিডিয়ার pornification এবং নারীকে শুধু মাত্র

দেহসর্বস্ব ‘সেক্স অবজেক্ট’ হিসেবে দেখানোর  ট্রেন্ড ।  এই কম আলোচিত বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই আমাদের   এই লিখাটি

সামনে এগুবে ইনশা আল্লাহ্‌  ।

আমাদের জেনারেশান  লাগামছাড়া অশ্লীলতা আর বেহায়াপনায় গা ভাসিয়েছে । এক দুই  ঘন্টানেট  ব্রাউজিং করেই তারা

বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে “যখন কিছুই লুকানোর থাকেনা” টাইপ মেয়েদের ছবি দেখে ফেলে তা আমাদের বাপ দাদারা তাঁদের

সারাজীবনে দেখেছে কিনা সন্দেহ । হাই স্পীড নেট , এন্ড্রয়েড ফোনের কল্যানে পর্ন মুভি আলু পটলের মতোই সহজলভ্য

হয়ে গেছে আর আমাদের ছেলে মেয়েরা তা গোগ্রাসে গিলছে ।

প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ২৮,২৫৮ জন মানুষ পর্ন দেখছে [১] University of Montreal  এর গবেষকরা এমন একজনকেও খুঁজে পাননি যে জীবনে কখনোই পর্ণ দেখেনি।[২]

Security technology company Bitdefender এর গবেষনা থেকে দেখা যাচ্ছে,পর্নসাইটে যাতায়াত করে এমন ১০ জনের মধ্যে ১ জনের বয়স দশ বছরের নিচে । এবং এই দুধের বাচ্চা গুলো রেপপর্ন টাইপের জঘন্য জঘন্য সব ক্যাটাগরির পর্ন দেখে । [৩]

পর্নমুভি দেখে, চটি গল্প পড়ে বড় হওয়া এইসব ছেলে মেয়েরা যৌনতা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত, অবাস্তব ধারনা নিয়ে বড় হয়ে ঊঠছে ।  এদের সেক্স এডুকেশানের  মাধ্যমও এই পর্ন মুভি। National Union of Students(NUS) এর জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে শতকরা ৬০ জন স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা যৌনতা সম্পর্কে জানার জন্য পর্ণ মুভি দেখছে।[৪]

অস্ট্রেলিয়ান গবেষক Maree Crabbe এবং David Corlett এর ভাষ্যে,‘ আমাদের সংস্কৃতিটাই এমন হয়ে গিয়েছে যে কিশোর,তরুণরা কীভাবে যৌনতাকে উপলব্ধি করবে এবং যৌনতার মুখোমুখি দাঁড়াবে সেটা শেখাচ্ছে পর্ণ। সেক্স এডুকেশানের প্রভাবশালী মাধ্যম হচ্ছে পর্ণ’। [৫]

মানুষ কোন একটা বিষয় বার বার দেখতে থাকলে এবং সেটা তার ভালো লাগলে একসময় না একসময় সে সেটা করতে চাই । কাজেই  বিয়ের পর শুরু হচ্ছে ঝামেলা। [৬]

পর্নমুভিতে আসক্ত হওয়ার কারণে বিয়ের আগে  থেকেই  স্বামীর মনে নারী দেহের বিভিন্ন অঙ্গের আকার  আকৃতি   সম্পর্কে অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব ধারনা থাকে। [৭] তার  অবচেতন মন এটা ধারণা করে থাকে যে সব  নারীর দেহই  পর্নমুভির অভিনেত্রীদের মতো । এবং  নারীরা  বিছানায়, পর্নঅভিনেত্রীদের মতোই বেপরোয়া । কিন্তু সে যখন আসল সত্যটা আবিষ্কার করে বসে তখন সে হতাশ হয়ে যায় এবং দাম্পত্য জীবনে শুরু হয় অশান্তি।

মুদ্রার ওপর পিঠটাও দেখে ফেলা যাক । পর্নমুভিতে আসক্ত নারীরাও ছেলেদের দেহ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারনা করে বসে থাকে । বিয়ের পর সে যখন আবিষ্কার করে তার স্বামীর দেহ পর্নমুভিতে দেখানো পুরুষদের মতো না , তার স্বামী পর্নমুভিতে দেখানো পুরুষটার মতো এক্ট করতে পারছে না বা  ডিউরেশান পর্নমুভির চেয়ে  অনেক কম । তখন সে তার স্বামীকে নিয়ে অসন্তুষ্টিতে ভুগছে । দাম্পত্য কলহ শুরু হচ্ছে । পরকীয়ার সূত্রপাত হচ্ছে ।  পরকীয়ার পালে জোর হাওয়া লাগাতে ইন্ডিয়ান বস্তাপচা সিরিয়াল তো আছেই ।

দুজনের কেউই ভেবে দেখছেনা পর্নমুভিতে যেগুলো দেখানো হচ্ছে সেগুলো  কতটা ফেক ।কতটা এডিটিং করা হয়েছে । পর্নঅভিনেত্রীদের “শরীর” বলুন আর পর্নঅভিনেতার “শরীর” বলুন এগুলো সব কিছুই স্বাভাবিক আকারের চেয়ে অতিরিক্ত বড় আকারে পর্নমুভিতে এডিটিং এর মাধ্যমে উপস্থাপনা করা হয় । অনেক ঘাম ঝরিয়ে , বিশেষ ব্যামায় করে, সার্জারির মাধ্যমে এইগুলো বড় করা হয় । স্বাভাবিক নারী পুরুষের দেহ তাদের মত হবে না এটাই সত্য ।  আর ত্রিশ চল্লিশ মিনিটের একটি পর্নমুভি হয়তো সাত দিন ধরে শুটিং করা হচ্ছে ,পুরুষ অভিনেতা বা অভিনেত্রীরা যৌন শক্তি বর্ধক ড্রাগস নিয়ে তাতে পারফর্ম করছে , আর এর ভোক্তারা  নীল স্ক্রীনের সামনে  পর্ন মুভি দেখে ভেবে নিচ্ছেন তারা বোধহয় “একশটেই” চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট  স্টে করতে পারে । পর্নআসক্ত স্ত্রী ভাবছে পর্নমুভির অভিনেতা এতক্ষন পারলে আমার স্বামী কেন পারছে না তার নিশ্চয় সমস্যা আছে, পর্নআসক্ত স্বামী ভাবছে আরে সে এতক্ষন পারলে আমি কেন পারি না , নিশ্চয় আমার কোন সমস্যা আছে।

এইভাবে পর্নআসক্ত স্বামী তার আত্মবিশ্বাস  হারিয়ে ফেলছে আর স্ত্রীরাও অসন্তুষ্টিতে ভুগছে । স্বামী স্ত্রীর ভালবাসায় ভাটা পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের (যৌন বিশেষজ্ঞ,চিকিৎসক,মনোবিদ,মনোবিজ্ঞানী,প্রফেসর) শতাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে [৮] পর্ন,মারাত্মক রকমের যৌন সমস্যা সৃষ্টি করে। ইরেক্টাইল  ডিসফাংশন (লিঙ্গ উত্থিত না হওয়া) থেকে শুরু করে , প্রিম্যাচিউর ইউজাকুলেশান(অকাল বীর্যপাত), যৌনতার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অতৃপ্ত থাকা,স্বামী স্ত্রীর মধ্যেকার ভালোবাসা কমে যাওয়া, যৌনতায় আগ্রাসন প্রদর্শন…

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে যুবকদের যৌনসমস্যা যতোটা বৃদ্ধি পেয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো এরকম হয়নি। ৭জন নেভি চিকিৎসক সহ আরো অনেক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে লিখিত একটি গবেষণাপত্র [৯], [১০] থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৪ থেকে ৩৫ শতাংশ পুরুষ ইরেক্টাইল ডিসফাংশন জনিত সমস্যায় আক্রান্ত। যৌনতায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন এমন পুরুষের সংখ্যা শতকরা ১৬ থেকে ৩৭ জন। এই পুরুষদের কারো কারো বয়স ৪০ বছর বা তার চেয়ে কম , কেউ কেউ ২৫ বছর বয়সী টগবগে যুবক , কেউ কেউ সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া টিনেজার!

অনলাইন ফ্রি পর্নোগ্রাফি যুগের পূর্বের (?-২০০৬) বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে ৪০ বছর বা এর চেয়ে কম বয়সী পুরুষদের মাত্র ২-৫ শতাংশ পুরুষ ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত। ৩৫ বছর বা এর চেয়ে কমবয়সী কেউ ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত এমনটা শোনাই যেতনা। তার মানে গত কয়েক বছরে তরুণ,যুবকদের ইরেক্টাইল ডিসফাংশন  প্রায়  ১০০০% বেড়েছে। এর পেছনে দায়ি কে ?

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌……

পড়ুন-

১০৮ টি নীলপদ্ম (দ্বিতীয় কিস্তি)- https://bit.ly/2oZy6ab
১০৮ টি নীলপদ্ম (শেষ কিস্তি)- https://bit.ly/2QodAwv

রেফারেন্সঃ

[১] https://goo.gl/NxUWuY

[২]https://goo.gl/Z6TwPJ

[৩][ http://bit.ly/2fdBY1a

[৪]  https://goo.gl/HdfMq6

[৫] https://goo.gl/PGF6zX

[৬]Cicely Alice Marston and Ruth Lewis. “Anal Heterosex Among Young People and Implications for Health Promotion: A Qualitative Study in the UK,” BMJ Open 4, no. 8 (2014).

[৭] Emily Leickly, Kimberly Nelson, and Jane Simoni, “Sexually Explicit Online Media, Body Satisfaction, and Partner Expectations Among Men who have Sex with Men: A Qualitative Study,” Sexuality Research & Social Policy (2016). doi:10.1007/s13178-016-0248-7

[৮] https://goo.gl/tGJ4Nd

[৯] https://goo.gl/9FbhBs

[১০] https://goo.gl/ANeYcd

শেয়ার করুনঃ