বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

হস্তমৈথুন  বর্তমানে  যুবকদের সবচেয়ে বড়  সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই    সমস্যার জন্য  ব্যক্তির থেকে সমাজ বেশি দায়ী । বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ    ‘Late Marriage ‘ কে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় এই সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। যখন    হালালের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই হারামের দিকেই মানুষ    বেশি ঝুঁকে।

এই সমাজের কারণেই মুসলিম তরুণ সমাজের একটা বিরাট অংশ হস্তমৈথুন নামক একটা Destructive নেশায় আসক্ত ।

এই   নেশা থেকে মুক্তি পাবার উপায়গুলো আমি প্রধানত ১) ইসলামের আলোকে ও ২) বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করব। অন্যান্য বিষয়ের আলোকেও কিছু আলোচনা করা হবে।

প্রথমে আমাদের জানা উচিত, কেন আমরা হস্তমৈথুন নামক নেশায় বার বার পতিত হই?  BRAIN SCIENCE   আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম।

BRAIN SCIENCE OF MASTURBATION:

“মানুষের Main Sex Organ কোনটি?”এই প্রশ্নের উত্তরে  বেশিরভাগ মানুষই বলবে- “পুরুষাঙ্গ ও স্ত্রীর যৌনাঙ্গ” । এই উত্তরটা ভুল । মানুষের  প্রধান  Sex Organ  হল মানুষের মস্তিষ্ক ।[1]  কারণ  মস্তিষ্কের কিছু    Neurotransmitter মানুষের ‘ Sexual Process ‘ এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন    করে।

যখন একজন  ব্যক্তি হস্তমৈথুন করতে উদ্যত হয় তখন  সে  “Funnel Of  Sexual   Process”   এর মধ্য দিয়ে যায়। । [2]  হস্তমৈথুন করার জন্য সে যৌন  উত্তেজক  কিছু  দেখে  বা কল্পনা করে। যৌন উত্তেজক কিছু দেখা বা কল্পনা করার  ফলে তার  শরীরে ‘  Testosterone ‘ এর নিঃসরণ বেড়ে যায় । ‘ Testosterone ‘  ব্যক্তিকে   Sexually arouse করে এবং তাকে এই ফানেলে ঢুকিয়ে দেয়।

এরপর   শক্তিশালী কিছু Neurochemicals নিঃসরিত হয় ব্রেইনে। যেমন-Dopamine, Endorphins । এখানে Dopamine হল একধরনের নিউরোট্রান্সমিটার আর এর কারণেই আমরা ‘Sexual Plesure’ অনুভব করি। মূলত Dopamine  এর কারণেই মানুষে  হস্তমৈথুনে নেশাগ্রস্থ হয় ।

ব্যক্তি  যখন ফানেলে প্রবেশ করে  তখন এই কেমিক্যালগুলো ব্রেইনে  নিঃসরিত হয় আর এই  কেমিক্যালগুলোর উদ্দেশ্য হল  ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ উত্তেজনার  অবস্থায়  পৌঁছানো অর্থাৎ Orgasm । এই  কেমিক্যালগুলো খুবই পাওয়ারফুল আর এই  কারণেই  যখন ব্যক্তি ফানেলের গভীরে চলে  যায় তখন সে যেকোন উপায়ে Orgasm করতে  চায়  ,বলা যায় এই কেমিক্যালগুলো  ব্যক্তিকে এই কাজ করতে বাধ্য করে।

উদাহরণ  হিসেবে Dopamine এর কথা বলা  যায় । Dopamine এর অন্যতম কাজ হল  যৌনসংগীর  উপর ব্যক্তির মনোযোগ বৃদ্ধি  করা  ও অন্যান্য বিষয়ের উপর থেকে  মনোযোগ  সরিয়ে নেয়া। অর্থাৎ এটা আপনার  ব্রেনকে যৌক্তিকভাবে অন্যান্য বিষয়  নিয়ে  চিন্তা করতে বাধা দেয় এবং   ব্যক্তিকে Orgasm এ পৌঁছাতে ব্যস্ত রাখে।  আর  এই কারণে যখন কেউ “Funnel Of  Sexual  Process”  এর খুব ভিতরে ঢুকে পড়ে তখন  যুক্তি খুব ধীরে কাজ করে।

এর   ফলে ” এই সব করা ঠিক না ” ” জাহান্নামের আগুনের কথা ” , ”  আল্লাহ্‌  তাআলা  আমাকে দেখছেন ” ইত্যাদি যুক্তিগুলো ব্যক্তির ঈমান অনুযায়ী  কাজ করে।  যদি  কারো ঈমান মজবুত হয় তাহলে সে    “Funnel Of Sexual   Process” এর সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে ফিরে আসতে পারবে   ।যদি কোন   সুন্দরী নারী কোন পুরুষ আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে আহ্বান করে তাহলে  ”  ‘Testosterone   ‘ এর একটা Boost  নিঃসরণ হবে যা কিনা Dopamine কে triggered  করার  মাধ্যমে  ব্যক্তিকে “Funnel Of Sexual  Process” এর গভীরে ঢুকিয়ে দিবে।

আর  এইজন্যই হয়তো আল্লাহ্‌ তাআলার আরশের নিচে সে ব্যক্তি স্থান  পাবে যাকে  কোন  সুন্দরী নারী ব্যভিচারের জন্য আহবান করে অথচ সে ব্যক্তি তা  অস্বীকার  করে।

কিন্তু যাদের ঈমান দুর্বল তাদের জন্য ফিরে আসা খুব কঠিন । এজন্য অনেক প্রাক্টিসিং মুসলিমও এই বদভ্যাস থেকে সহজে মুক্তি পায় না।

তো  আমরা বুঝতে পারছি যে হস্তমৈথুনের দ্বারা  মূলত ‘ Dopamine Addiction’  হয় । যখন Orgasm হয় তখন   Dopamine brainstorm এর সৃষ্টি হয় যা কিনা হিরোইন খাবার পর ব্রেনে যে ক্রিয়া হয় তার সমতুল্য। [3]

এখন   যারা এই বদভ্যাসে অভ্যস্ত তারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে আপনাকে  “Funnel  Of  Sexual  Process” এর মধ্য থেকে ফিরে আসা শিখতে হবে  ও ‘Dopamine  Addiction ‘ ছাড়তে হবে। আর এই দুইটা  সমস্যার সবচাইতে সুন্দর  সমাধান  দিয়েছে ইসলাম।

আমি এখন ইসলামের আলোকে এই নেশা থেকে মুক্তি পাবার কিছু উপায় নিয়ে আলোচনা করব—

১) তাক্বওয়া:

অন্তরে   আল্লাহ্‌ তাআলার ভয় থাকতে হবে। আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদের সর্বদা  আমাদের  দেখছেন , তাই যখনই  Sexual Urge অনুভব করবেন তখনই মনে রাখবেন যে  আল্লাহ্‌   তাআলা আপনাকে দেখছেন। তাঁর দৃষ্টিকে এড়িয়ে আপনি কখনোই কোন কাজ  করতে  পারবেন  না। আপনার কাজের জবাবদিহি আল্লাহ্‌ তাআলার কাছে করতে হবে।যদি তিনি অসন্তুষ্ট হন তাহলে আপনার পরিণাম হবে জাহান্নাম । — এই কথাগুলো মাথায় রাখবেন।আর তাক্বওয়া বৃদ্ধি পায় এমন আমল নিয়মিত করতে হবে। তাক্বওয়া আপনাকে সকল প্রকার হারাম থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম ।

২) সাওম পালন :

যারা   বিয়ে করতে পারছেন না তাদের জন্য উত্তম হল সাওম পালন করা । কারণ সাওম পালন করলে মানুষের ‘ Will Power ‘ বাড়ে এবং মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে ।আর  এই দুটি গুণ দিয়ে সহজেই একজন তার  Sexual Desire ‘কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ ) বলেন —

” হে যুবক সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করার সামর্থ রাখে সে  যেন বিয়ে করে  ।  কেননা বিয়ে দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান হিফাযাতের জন্য সবচেয়ে বেশি  সহায়ক ।  আর  যে সামর্থ রাখে না সে যেন সাওম পালন করে,কেননা সাওম যৌন  উত্তেজনা প্রশমনকারী।”[সহীহ মুসলিম]

আর এই কারণে রমাদান মাসে অনেকেই পুরো এক মাসই হস্তমৈথুন করা থেকে বিরত থাকতে পারেন।

৩)নিয়মিত স্বলাত আদায়:

ইসলাম   প্র্যাকটিস করা ছাড়া এই নেশা থেকে মুক্তি পাবার পসিভিলিটি খুবই কম। ইসলাম প্র্যাকটিস করতে হলে অবশ্যই আপনাকে নিয়মিত স্বলাত আদায় করতে হবে। আর স্বলাতের ফাযীলতগুলোর মধ্য একটি হল যে স্বলাত অশ্লীল কাজ থেকে মানুষকে বিরত  রাখে।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন–

” নিশ্চয়ই স্বলাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। ” [সূরা আনকাবূত, আয়াত-৪৫ ]

হস্তমৈথুন অবশ্যই একটা Erotic Act তাই নিয়মিত যত্নের সাথে স্বলাত আদায় করলে অবশ্যই আপনি এই অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হবেন। বিস্তারিত জানার  জন্য আয়াতটির তাফসীর দেখে নিবেন।

৪)দৃষ্টি সংযত রাখা :

এই বিষয়ে অনেকে যুবকই অসচেতন । একটা কথা আপনাকে মনে রাখতে হবে যে  ‘Sincerity’  ছাড়া কখনোই আপনি এই নেশা থেকে মুক্তি পাবেন না। আর   ‘Sincerity ‘ এর পরীক্ষায় আপনাকে  পাশ করতে হলে অবশ্যই যখন আপনাকে আপনার  দৃষ্টিকে সংযত   রাখতে হবে। অনেকে আছে যারা বেগানা নারীর দিকে এক নজরে তাকিয়ে থাকে হোক তা বাস্তবে বা টিভিতে  অথবা কম্পিউটার স্ক্রিনে।

রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ ) বলেন–

“চোখের যিনা হল দৃষ্টিপাত করা বা দেখা। “[বুখারী]

কোন   মেয়েকে  একনজরে দেখার পর আপনার প্রধান Sex Organ  ব্রেন, ইনপুট হওয়া   ডাটা এনালাইজ করা শুরু করে ।  যেহেতু আপনি বিপরীত লিঙ্গকে  দেখেছেন  সেহেতু   আপনার শরীরে অল্প হলেও  ‘Testosterone ‘  নিঃসরিত হবে ,  কতটা নিঃসরিত হবে তা নির্ভর করে ডাটার আকর্ষণীয়তার উপর । আর এইভাবেই যদি   আপনি কয়েকজনকে   দেখেন তাহলে আপনার ব্রেইন সেই ইমেজগুলো অল্পসময়ের জন্য হলেও  সেভ করে রাখবে   আর এই ইমেজগুলোই আপনার  অন্তরে লুকিয়ে থাকা কামনাগুলোকে  জাগ্রত করে দিবে এবং আপনার শরীরের সেক্সুয়াল মোড অন করে দিবে যার ফলাফল হতে পারে হস্তমৈথুন।

তাই অশ্লীলমুভি, অশ্লীল অনুষ্ঠান  ও  বেপর্দা নারীদের দিকে দৃষ্টিপাত  করা থেকে আপনাকে বিরত থাকতে হবে নাহলে  হস্তমৈথুন থেকে মুক্তি লাভ  করা আর  আকাশ-কুসুম কল্পনা করা একই কথা হবে।

৫)অবাধ মেলামেশা:

যেখানে   নারীদের দিকে তাকানোই হারাম সেখানে তাদের সাথে প্রেম করা , বন্ধুত্ব করা ,মেলামেশা করার তো প্রশ্নই আসে না। অবাধ মেলামেশাও পুরুষের সেক্সুয়াল মোড অন করে। পুরুষ যখন কোন নারীর সাথে ইন্টারেকশন করে তখনও তার শরীরের   ভিতর  ‘Testosterone ‘  নিঃসৃত হয়  এবং তাকে সেই নারীর সাথে সঙ্গম করার  জন্য   প্রস্তুত করে।[4]

আর  ‘Testosterone ‘  নিঃসরণের লেভেল  যদি  high  হয় তাহলে ব্যক্তি  Orgasm এর প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করে।  তাই  অবাধ মেলামেশা থেকে আপনাকে বিরত থাকতে হবে।

৬) বন্ধু নির্বাচন :

খারাপ  চরিত্রের বন্ধুদের সাথে মেলামেশা একেবারেই কমিয়ে দিতে হবে। আপনার ৫ জন বন্ধুর মধ্যে যদি ৪ জনই সেক্স এডিক্ট হয় , তাহলে আপনার সেক্স এডিক্ট   হবার সম্ভাবনা খুব বেশি।

রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ ) বলেছেন–

“মানুষ তার বন্ধুর স্বভাব-আচরণে প্রভাবিত হয়, সুতরাং  যাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে ,তার ব্যাপারে আগে ভেবে নাও। ” [আবু দাউদ, তিরমিযী]

তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হবে। যারা ইসলামের পথে সময় ব্যয় করছে তারাই হতে পারে আপনার উত্তম বন্ধু ।

এছাড়া যা যা করতে পারেন-

শয়তান   আমাদের অশ্লীলতার পথে পরিচালিত করতে চায়।তাই যখনই শয়তান আপনাকে  আহ্বান  করবে হারামের পথে তখনই আপনি দু’আ পড়ে শয়তানের কুমন্ত্রণা   থেকে  আল্লাহ্‌   তাআলার কাছে আশ্রয় চাইবেন। ‘হিসনুল মুসলিম ‘ বইয়ে এই সম্পর্কিত  দু’আ   পাবেন। আপনি ‘ আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম ‘ বলেও আশ্রয়   চাইতে   পারেন।

রাতে ঘুমানোর সময় পুরুষদের   যৌনাঙ্গ  কয়েকবার erect হয়। একে বলা হয়  ‘Nocturnal Penile Tumescence’ ।  এই  erection এর কারণেও অনেকে উত্তেজিত হয়ে  পড়ে এবং হস্তমৈথুন করে। এই  সমস্যা  থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য  রসূলুল্লাহ্‌  (সঃ ) এর সুন্নাহ অনুসরণ  করতে হবে।  যখন আপনি রাতে ঘুমাতে যাবেন তখন অযু করে  ঘুমাতে পারেন,   ঘুমানোর সময় যেসব  দু’আ পড়তে আমাদের বলা হয়েছে সেগুলো পড়তে  পারেন , ডান  কাতে শুতে হবে ,  পেটের উপর শোয়া যাবে না ইত্যাদি।

আপনার রুমে ক্বুর’আনের আয়াত ও হাদীস পোস্টারিং করতে পারেন । এতে  করে   যখন আপনার  Sexual Urge হবে তখন যুক্তি দিয়ে তা সহজে কমাতে পারবেন।

একটা   কথা মনে রাখবেন রাতারাতি আপনি এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন না, আপনাকে    ধৈর্য ধরতে হবে। কখনো ব্যর্থ হলে হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদের হস্তমৈথুনের ফিতনা থেকে  বিরত থাকার তওফীক দান করুন। আমীন ।

[আগামী কিস্তিতে বিজ্ঞানের আলোকে কিছু পয়েন্ট আলোচনা করা হবে, ইনশা’আল্লাহ্‌ । পড়ার আমন্ত্রণ রইল]

পড়ুন-

ব্রেক দ্যা সার্কেলঃ মাস্টারবেশন থেকে মুক্তি – https://bit.ly/2N9OeEM
ব্রেক দ্যা সার্কেলঃ মাস্টারবেশন থেকে মুক্তি (শেষ কিস্তি) – https://bit.ly/2oYwnls

লেখক-  ফরহাদ হোসেইন মিঠু ।  উনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত। আল্লাহ ভাইকে উত্তম প্রতিদান দান করুক।

তথ্যসূত্রঃ-

[1] Dr. Laura Berman

[2] Is Masturbation a Healthy Outlet?

[3] THE NEUROCHEMISTRY OF SEX

[4] Desires And Plesures Decoded , Documentry by Discovery Channel

শেয়ার করুনঃ