পর্নোগ্রাফি গত দুই দশক থেকেই জনসাধারণের বেডরুম, ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতে শুরু করে স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ভিসিআর এর মাধ্যমে । এবং এখনকার সময়টাতে ইন্টারনেটের বদৌলতে  একেবারেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে । কেবল দুই তিনটা ক্লিকের ব্যাপার । তারপরেই পর্ন এর বিশাল ভান্ডার ।

আতঙ্কিত হবার বিষয় হল,পর্নোগ্রাফির বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বা তার চেয়েও কয়েকগুণ দ্রুত গতিতে বেড়েছে শারীরিক নির্যাতন এবং ধর্ষণ , মাত্রাতিরিক্ত ভায়োলেন্স, জঘন্য পদ্ধতিতে  নারীদের নির্যাতন করার ঘটনা । সেই সাথে বেড়েছে ‘কামের’ দৌরাত্ম। টেলিভিশানের বিজ্ঞাপন,স্পোর্টস ম্যাগাজিন,কর্পোরেট অফিস ভার্সিটির ক্যাম্পাস কোথায় আজ ‘কামের’ কেনাবেচা চলে না ?

আবির্ভাবের সময় থেকেই  পর্নোগ্রাফি,বিকৃত কাম এবং বিকৃত পৌরষত্বের   মাখামাখি সম্পর্ক । তবে পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে এবং প্রভাবে  বর্তমানে মহিলাদের  যৌন হয়রানি এমনকি মারধোর করে বিকৃত পৌরষত্বের প্রকাশটা বেশ চোখে লাগার মত ।

সত্যি কথা বলতে কি , পর্নোগ্রাফি আমাদের এই হৃদয়হীন কর্পোরেট সমাজের নিষ্ঠুরতাকেই ফুটিয়ে তোলে । আমাদের সমাজটা কি হৃদয়হীন হয়ে যাই নি? আমরা কি অমানুষ হয়ে যাই নি ?  আমরা তো সেই সমাজে বাস করি, যাদের  আমেরিকা এবং তার ইয়ার দোস্তদের বাণিজ্যিক অবরোধের কারণে গাজায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হলেও কিছু যায় আসে না ।  ইরাকে পাঁচ লাখ শিশু না খেতে পেয়ে কুকুর বিড়ালের মতো  মৃত্যুবরন করলেই বা আমদের কি?  আফগানিস্তান, পাকিস্তানে ড্রোন হামলায় শত শত নাবিলার সংসার তছনছ হচ্ছে তো কি হয়েছে আমাদের তো কিছুই হয়নি ?

চৌদ্দ বছরের ইরাকী বালিকা আবীর-আল-জানবিকে গনধর্ষণ করে , তার পরিবারের সকল সদস্যকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেললেও আমাদের প্রতিবাদ করা তো দূরে থাক, এগুলো শুনতেও ইচ্ছা করে না ।

পর্নোগ্রাফির ভায়োলেন্স, নিষ্ঠুরতা , নারীদের সম্মানহানি করা আমাদের এই ঘুনে ধরা, ভোগবাদী স্বার্থপর সমাজেরই প্রতিচ্ছবি ।

আবু গারিব  কারাগারের আমেরিকান সৈন্যদের হাতে নির্যাতিত মুসলিম বন্দীদের যে কয়েকটা ছবি লিকড হয়েছে সেগুলো পর্ন এর চাইতেও জঘন্য । একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক আমেরিকান মহিলা সৈনিক এক উলঙ্গ পুরুষের গলায় দড়ি বেঁধে গরু ছাগলের মত টানছে ।

আর একটা ছবি শিকলে বাঁধা নগ্ন বন্দীর  ।

মুসলিম বন্দীদেরকে নগ্ন করে, মেঝেতে একজনের ওপর আর একজনকে সাজিয়ে মানুষের পিরামিড তৈরি করা হয়েছে এমন ছবিও ছিল  ।

এবং এরকম আরো শত শত ক্লাসিফাইড ছবি আছে, যেগুলোর নাগাল হয়তো সাধারণ মানুষ কখনো পাবে না । কয়েকজন কংগ্রেসম্যান এরকম কিছু ক্লাসিফাইড ছবি দেখেছেন । ইরাকী মুসলিম বন্দীদের  জোরপূর্বক মাস্টারবেট করতে বাধ্য করানোর ছবি, যৌন মিলনের অভিনয়ে বাধ্য করানোর ছবি । কারাগারের গার্ডদের যৌন মিলনের  ছবি ।

পর্ন, পেশাদার রেসলিং, টেলিভিশানের রিয়েলিটি শো, মিউজিক ভিডিও এবং কর্পোরেট কালচারের  অন্তসারশূন্যতা এবং ভয়াবহতা এই লিকড ছবিগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় । এটা এমন একটি কালচার যা আপনার উপর আধিপত্য বিস্তার করে আপনাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে, আপনাকে মানসিক দাসত্বের শিকল পড়িয়ে দিবে এবং সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হল এটা আপনি কখনোই অনুধাবন করতে পারবেন না যে আপনি নিজেকে পুরোপুরি স্বাধীন একজন মানুষ হিসেবে দাবি করলেও আপনি যেদিন থেকে পর্ন এর খপ্পরে পড়েছেন সেদিনই আপনার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছেন । আপনি আসলে একজন দাস  । এটি এমন একটি পৃথিবী যেখানে নৈতিকতা এবং দয়ার কোন স্থান নেই । এটি এমন একটি পৃথিবী যেখানে ভালবাসা আর কামের নামে  নারীদেরকে বাণিজ্যিক পন্যের মতো কেনাবেচা করা হয় । মানুষকে শেখায় শুধুমাত্র ভোগবাদী চোখদিয়ে আর একজনকে বিচার করতে  ।

পর্নমুভি আমাদের সমাজে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যে এটা আর কারো চোখে লাগে না ।  যৌন হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ, শারীরিক এবং মানসিক টর্চার এইগুলোও মোটামুটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে । সামাজিক লজ্জা বা সামাজিক এবং রাষ্টীয় দায়বদ্ধতা এই ব্যাপারগুলো হারিয়ে গেছে ।

বিল মারগোল্ড নামক একজন পর্ন মুভির অভিনেতা এবং প্রডিউসার  একবার খুব আক্ষেপ করে বলেছিলেন , “  আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি , এই জঘন্য ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কাজটাই হল নারীদের জঘন্য পদ্ধতিতে নির্যাতনের মাধ্যমে   কিছু বিকৃত মানসিকতার (স্যাডিস্ট) পুরুষদের বিকৃত বাসনা চরিতার্থ করা । আমি ভেতরের গোমর ফাঁস করে দিয়েছি বলে   এই ইন্ডাস্ট্রি আমাকে ঘৃণা করে , কিন্তু আমি কাউকে পরোয়া করি না । আমরা সেটে এবং স্ক্রীনে মহিলাদের ধরে পেটাই, তাদের যাচ্ছেতাই ভাষায় গালি গালাজ করি , তাদের উপর চরমভাবে নির্যাতন চালানো হয় । আশ্চর্যের ব্যাপার হল , আমি শুনেছি আমার  এই অমানবিক কাজ গুলো পর্দায় দেখে  পর্ন মুভির  দর্শকেরা চিৎকার করে, সিটি বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে । আমি যখন কোন মহিলার গলা টিপে ধরি বা  তাদের সঙ্গে কুকুরের মত আচরণ করি তখন দর্শকেরা হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে ।

এত কিছুর পর নারীদেরকে পর্নমুভিতে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় , যেন তারা এটা খুব উপভোগ করছে । তাদের মুখ দিয়ে এমন এমন ডায়ালগ দেওয়ানো হয় যা একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানসিকতার কেউ কখনোই বলতে চাইবে না ।

এটি একটি নির্দয় পৃথিবী ।

(“Empire of Illusion: The End of Literacy and the Triumph of Spectacle”

by Pulitzer Prize winning author Chris Hedges

এই বইয়ের একটি অনুচ্ছেদের আলোকে রচিত,  ঈষৎ সংক্ষেপিত এবং পরিমার্জিত)

শেয়ার করুনঃ