কিছুদিন আগে টিএসসির ভাইরাল হওয়া ছবির প্রসঙ্গে বলেছিলাম নৈতিকতার মানদন্ডের গুরুত্বের কথা। কোন মানদন্ডের ওপর ভিত্তি করে আমরা কোন কিছুকে ভালো বা খারাপ বলবো? আমরা কি মানদন্ড হিসেবে নেবো প্রচলন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কিংবা কোন নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জাতির ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিকে? নাকি একটি সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় মানদন্ড থাকতে হবে। বলেছিলাম – ইসলামের বদলে সামাজিকতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহ্যকে মানদন্ড হিসেবে নিলে পশ্চিম থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসা প্রচন্ড ও সর্বব্যাপী নৈতিক অধঃপতনের স্রোতের মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। সময়ের সাথে বদলাতে থাকা নৈতিকতার কম্পাস বাঁধ দিতে পারে না, বরং অধঃপতন আর অবক্ষয়ের কারণ হয়ে ওঠে। পাবলিক পারসেপশান বদলায়, খুব দ্রুতই বদলায়। এক প্রজন্মের কাছে যা অকল্পনীয়, অন্য প্রজন্মের কাছে তাই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক। গত এক শতাব্দী জুড়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাবলিক পারসেপশান এবং জনমত পরিবর্তনের কাজ করে আসছে ম্যাস মিডিয়া। আধুনিক প্রপাগ্যান্ডার জনক এবং আনসাং হিরো ( বা অ্যান্টিহিরো) এডওয়ার্ড বারনেইস তার বই “প্রপাগ্যান্ডা”-তে মিডিয়ার মাধ্যমে সোশ্যাল এঞ্জিনিয়ারিং এর ধাপগুলো তুলে ধরেছেন খুব সহজবোধ্য ও খোলামেলাভাবে।
.
একটা বাস্তব উদাহরণ দেই। গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে ধরে ইন্টারনেটে একটা বিষয় নিয়ে তুলকালাম হচ্ছে। জনপ্রিয় মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম TEDxTalk এর একটি পর্বে মিরজাম হেইন নামে একজন জার্মান মেডিক্যাল স্টুডেন্ট বলেছে – পেডোফিলিয়া বা শিশুকাম একটি অপরিবর্তনীয় যৌন প্রবৃত্তি (unchangeable sexual orientation)। একজন নারী ও পুরুষের পারস্পরিক যৌন কামনা যেমন স্বাভাবিক তেমনি কিছু মানুষ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষন বোধ করে – এটাও স্বাভাবিক। তাই যারা পেডোফাইল- শিশুকামী – এই তাড়না, এই আকর্ষনবোধের কারণে তাদের দোষারোপ করা উচিৎ না। ভিডিওটি প্রকাশিত হবার সাথেসাথে ব্যাপক তর্কবিতর্ক শুরু হয় এবং তুমুল বিরোধিতার কারণে TEDxTalk বাধ্য হয় তাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে ভিডিও সরিয়ে নিতে।
.
মজার ব্যাপারটা হল শিশুকামের প্রবণতা স্বাভাবিক, অপরিবর্তনীয় এসব বলার পাশাপাশি হেইন এটাও বলেছে যে, শিশুকামের বাস্তবায়ন অপরাধ ও অনৈতিক। অর্থাৎ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষন থাকা স্বাভাবিক কিন্তু এই কামনা বাস্তবায়িত করা, এই অ্যাট্র্যাকশানের ওপর কাজ করা অপরাধ।
.
এখানেই নৈতিকতার মানদন্ডের ব্যাপারে আমাদের আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
.
পেডোফিলিয়া যদি নারীপুরুষের পারস্পরিক শারীরিক আকর্ষনের মতোই যদি স্বাভাবিক এবং অপরিবর্তনীয় বিষয় হয় তাহলে এই আকর্ষনের ওপর আমল করা কেন অপরাধ হবে? কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যখন কোন শিশুর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয় তখন ব্যাপারটা দুজনের সম্মতিতে হয় না। অর্থাৎ এটা অপরাধ কারণে এখানে পারস্পরিক সম্মতি (Consent) অনুপস্থিত। একই কারণে পশুকামও অপরাধ, কারণ এক্ষেত্রেও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যৌনকর্ম হচ্ছে না। সম্মতি একপাক্ষিক। এটা হেইনের উত্তর। যদিও পশ্চিমের অনেকেই এখন তার বিরোধিতা করছে, কিন্তু যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমের ধারণা অনুযায়ী এ উত্তর সঠিক।
.
চিন্তা করে দেখুন, বিবাহবহির্ভূত সেক্স (যিনা), সমকামিতা, উভকামিতা, সুইঙ্গার সেক্স, হুকআপ কালচার (বহুগামীতা), গ্রুপসেক্সের মতো যৌনবিকৃতিগুলোর পক্ষে উদারনৈতিক পশ্চিমের ডিফেন্স কী?
.
“আমরা তো কারো ক্ষতি করছি না!”
.
“যতোক্ষন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিয়ে কিছু করছি, ততোক্ষন কী সমস্যা?”
.
“ভালোবাসা কোন বাঁধা মানে না”
.
“দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যা ইচ্ছে করার অধিকার আছে, এবং এতে হস্তক্ষেপ করার স্বাধীনতা কারো নেই”
.
“আমার এ ব্যাপারটা (যেকোন যৌনবিকৃতি) জন্মগত”
.
মূলত এধরণের উত্তরই বিভিন্নভাবে আমরা শুনে আসছি। সুতরাং পেডোফিলিয়ার ব্যাপারে মিরজাম হেইন যা বলেছে তা পুরোপুরিভাবে পশ্চিমের এ দৃষ্টিভঙ্গি – এ মানদণ্ডের – সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
.
এখন প্রশ্ন করতে পারেন – এ মানদন্ডে সমস্যা কোথায়? হ্যাঁ এটা ইসলামের নৈতিকতার সাথে যায় না, কিন্তু পারস্পরিক সম্মতির শর্ত দিয়ে তো অ্যাটলিস্ট শিশুকামিতা ও পশুকামিতার মতো ব্যাপারগুলো আটকানো যায়, এটাই বা কম কিসে?
সমস্যা হল, এ শর্ত দিয়ে শিশুকামিতাকে আটকানো যায় না। ব্যাখ্যা করছি।
.
বলা হচ্ছে – শিশুর সাথে সেক্স একটি অপরাধ এবং অনৈতিক কাজ কারণ এখানে উভয়পক্ষের পারস্পরিক সম্মতি (consent) নেই।
পারস্পরিক সম্মতি নেই কেন?
.
কারণ একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে, বয়ঃপ্রাপ্ত হবার আগে শিশুর মধ্য যৌনতার ধারণা গড়ে ওঠে না। যেহেতু শিশুর মধ্যে যৌনতার ধারণা, নিজের যৌনতা সম্পর্কে সচেতনতাই নেই। তাই তার পক্ষে কোন যৌনকর্মে সম্মতি দেয়া (consent করা) সম্ভব না। অতএব শিশুর সাথে সেক্স আবশ্যিকভাবেই সম্মতি ছাড়া হচ্ছে, তাই এটি একটি অনৈতিক ও অপরাধ। যেমন একজন নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া যৌনকর্ম করা রেইপ।
রাইট?
রং।
.
এ পুরো যুক্তির ভিত্তি হল “Consent” – সম্মতি। যদি আমি প্রমাণ করতে পারি যে এখন শিশুর যৌনতার ব্যাপারে সম্মতি দেয়ার মতো ম্যাচিউরিটি আছে, তাহলে কি এ যুক্তি আর দাড়াতে পারবে?
.
যদিও এখনো বিষয়টা ঠিক এভাবে আলোচনা করা হচ্ছে না, কিন্তু শিশুরাও যে “যৌনতা সম্পর্কে সচেতন” এটা অলরেডি পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়া এবং মিডিয়া সুপ্রতিষ্ঠিত একটি বিষয়। বিশ্বাস হচ্ছে না?
.
সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের অবস্থান হল শিশুরা জন্ম থেকেই যৌনতা সম্পর্কে সচেতন। যৌনতা সম্পর্কে আধুনিক সেক্সোলজির জনক ড. অ্যালফ্রেড কিনসি এবং আরেক মহারথী ড. জন মানির অবস্থানের দিকে তাকালেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। এ দুজনের অবস্থানের সারসংক্ষেপ হল –
.
১) জন্মের পর থেকেই শিশুরা যৌনতা সম্পর্কে সচেতন, সেক্সুয়ালি অ্যাক্টিভ এবং যৌনসুখ অর্জনে সক্ষম।
২) ১০-১১ বছর বয়েসী শিশু যৌন আকর্ষন অনুভব করতে পারে। তুলমামূলক ভাবে বয়স্ক কোন ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন – শিশুর জন্য নেতিবাচকই হবে এমন কোন কথা নেই।
.
[রেফারেন্স ও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, ১) মিথ্যের শেকল যত, মুক্তো বাতাসের খোঁজে, ইলমহাউস পাবলিকেশন, ২) “পাঠক সাবধান! ভয়ের জগতে প্রবেশ করছো তুমি!! ফলো দা মানি – https://bit.ly/2FiZ03e]
.
যদি কিনসি আর জন মানির দেয়া যৌনতার ধারণা গ্রহণ করা হয় – যদি মানব যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমা চিন্তার মূলনীতিগুলো মেনে নেয়া হয় – তাহলে আর এ যুক্তি দেয়া যায় না যে শিশুকাম একটি অপরাধ কারণ শিশুদের পক্ষে Consent করা বা যৌনকর্মে সম্মতি দেয়া সম্ভব না। যদি কেউ যৌনতা সম্পর্কে সচেতন হয়, যৌনসুখ অর্জনে সক্ষম হয় এবং সক্রিয়ভাবে যৌনকর্মে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে সম্মতি কেন দিতে পারবে না?
.
শিশুকামের পক্ষে প্রচারণা চালানো অ্যামেরিকান ও ইউরোপিয়ান বিভিন্ন সংস্থা সত্তরের দশক থেকে ঠিক এ যুক্তিই ব্যবহার করে আসছে। দেখুন অ্যামেরিকান সমকামি শিশুকামি সংস্থা NAMBLA – North American Man Boy Love Association এর সদস্যদের বক্তব্য – https://www.youtube.com/watch?v=Ygrd29-_O3I
.
এতো গেল অ্যাকাডেমিয়ার কথা। সাধারণ মানুষের কী অবস্থা? অধিকাংশ সময়ই অ্যাকাডেমিকদের তত্ত্বকথার কচকচির সাথে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের তেমন কোন সম্পর্ক থাকে না। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা কি এরকম? সাধারণ মানুষও কি মনে করছে একজন শিশু যৌনতা সম্পর্কে সচেতন, নিজের যৌনতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম ?
.
জি মনে করছে। কিংবা বলা ভালো তাদের মনে করানো হচ্ছে। এব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য মিডিয়া, এডুকেইশান সিস্টেম, পশ্চিমা সরকার এবং গ্লৌবাল অর্গাইনাইযেইশানগুলো (ইউএন, WHO ইত্যাদি) পুরোদমে কাজ করছে। ব্যাপারটা সম্ভবত আপনারও চোখে পড়েছে, তবে হয়তো কানেকশানটা ধরতে পারেননি।
.
গত দশ বছরে ট্র্যান্সজেন্ডার আইডেন্টিন্টি নিয়ে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো একটু মনে করার চেষ্টা করুন তো! কিছু শিরোনাম আবার মনে করিয়ে দেই –
.
“ব্রিটেনের প্রথম জেন্ডার ফ্লুয়িড পরিবার: বাবা নিজেকে নারীতে পরিণত করছেন, মা নিজেকে পুরুষ মনে করেন, আর ছেলে বড় হচ্ছে জেন্ডার নিউট্রাল হিসাবে”।
.
নিউ ইয়র্কে আইনি ভাবে ৩১ টি লৈঙ্গিক পরিচয়কে (Gender Identity) স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
.
ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্ট স্টোর জন লুইস ঘোষণা করেছে তারা বাচ্চাদের পোশাক আর “ছেলে” বা “মেয়ে” ট্যাগ দিয়ে আলাদা করবে না। এখন থেকে তারা বাচ্চাদের শুধু “Unisexz”/”Gender Neutral” পোশাক বিক্রি করবে।
.
২০১৭ এর মার্চে টাইম ম্যাগাযিন মানুষের মৌলিক পরিচয় ও যৌনতার পরিবর্তনশীল সংজ্ঞার এ যুগ নিয়ে কাভার স্টোরি করেছে। Beyond ‘He’ or ‘She’: The Changing Meaning of Gender and Sexuality – শিরোনামের এ লেখায় সমকামী অধিকার নিয়ে কাজ করা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ GLAAD এর একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে অ্যামেরিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এখন আর নিজেদের সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক যৌনাচারে আকৃষ্ট (Heterosexual) অথবা সম্পূর্ণ ভাবে সমকামিতায় আকৃষ্ট মনে করে না। বরং “মাঝামাঝি কিছু একটাকে” বেছে নেয়। একইভাবে অ্যামেরিকান তরুনদের এক-তৃতীয়াংশ “পুরুষ” বা “নারী” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় না।
.
[রেফারেন্স ও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন – “পাঠক সাবধান! ভয়ের জগতে প্রবেশ করছো তুমি!! ফলো দা মানি – https://bit.ly/2FiZ03e]
.
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের ডেইলি স্টার তাদের সাপ্তাহিক সাপ্লিমেন্ট “Lifestyle” এ Gender fluidity/ Gender Neutrality – কে সমর্থন করে কাভার স্টোরি করেছে। [লিঙ্ক – https://bit.ly/2OngXCN]
.
নার্সারির বাচ্চাদের জেন্ডার ফ্লুয়িডিটির ব্যাপারে ক্লাস নিচ্ছে ড্র্যাগ কুইনরা। [https://nbcnews.to/2tkr4P2]
.
ব্রিটেনে প্রতি সপ্তাহে ৫০ জন শিশুকে Gender Dysphoria ও Gender Change সঙ্ক্রান্ত ক্লিনিকে পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে ৪ বছর বয়েসী শিশুও আছে। শিশুদের মধ্যে লিঙ্গ পরিবর্তন অপারেশন বৃদ্ধি পাচ্ছে। [https://bit.ly/2LUsKai]
.
সংক্ষেপে ট্র্যান্সজেন্ডার আইডিওলজির মূল কথা হল – মানুষের ধরাবাঁধা কোন যৌনতা ও লৈঙ্গিক পরিচয় নেই। এ ব্যাপারটা একটা স্পেক্ট্রাম একটা রংধনুর মতো (হ্যাঁ এই জন্যই রংধুন সিম্বল ব্যবহার করা হয়)। কোন কিছু সাদাকালো না। এখানে আছে অনেক, অনেক রং। যে কোন মানুষ বা শিশু যদি বলে সে একজন নারী হিসেবে, বা পুরুষ হিসেবে, বা অন্য কোন “কিছু” হিসেবে পরিচিত হতে চায়, তবে তাই ধরে নিতে হবে। সে শারীরিকভাবে, জন্মসূত্রে যাই হোক না কেন!
.
মজার ব্যাপার হল ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের পক্ষে দেয়া যুক্তিগুলো দিয়ে খুব সহজে সমকামিতার পক্ষে দেয়া যুক্তিগুলো খন্ডন হয়ে যায়। সমকামিতার পক্ষে বহুল ব্যবহৃত একটি যুক্তি হল কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই সমকামি হয় (‘born this way’)। আবার অনেকে বলার চেষ্টা করে একটি বিশেষ জিন (the gay gene) আছে যার কারণে কিছু মানুষ সমকামি হয়ে জন্মায়। অর্থাৎ তারা দাবি করে সমকামিতদের যৌনতা বায়োলজিকালি নির্ধারিত।
.
আবার দেখুন ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে এরা বলছে যৌনতা, লৈঙ্গিক পরিচয়, এসবই পরিবর্তনশীল। কোন কিছুই পাথরে লেখা। যে নারী হিসী জন্মেছে সে একসময় পুরুষ হতে পারে, যে নারীদের প্রতি আকর্ষনবোধ করতো একসময় সে আকর্ষনবোধ করতে পারে পুরুষের প্রতি। এগুলো খুবই স্বাভাবিক ইত্যাদি। যদি তাই হয়, তাহলে নিশ্চয় সমকামিতা জন্মগত হতে পারে, যেহেতু জন্মগত লিঙ্গকেই স্বীকার করা হচ্ছে না। সমকামি জিন বলেও তাহলে কিছু থাকতে পারে না। এই যুক্তি অনুযায়ী সমকামিতা, উভকামিতা, পশুকামিতা, কিংবা নারী পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা – কোন কিছুই জিনগত না, বায়োলজিকালি নির্ধারিত না। এসবই এগুলো বদলাতে পারে। যার অর্থ একজন সমকামি, একসময় সমকামিতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আর যদি সাধারণভাবেই একজন সমকামি সমকামিতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে, তাহলে ট্রিটমেন্টের মাধ্যমেও এটা করা সম্ভব। অর্থাৎ ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে মিলিট্যান্ট সেক্যুলারিযম সমকামিতার পক্ষে চালানো নিজেরদের প্রপাগ্যান্ডাকেই খন্ডন করে বসে আছে। তাদের এক কথা আরেক কথার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। অসংলগ্ন ধ্যানধারণা ও মতাদর্শের মধ্যে এ প্যাটার্নটা বারবার দেখতে পাবেন।
.
লক্ষণীয় বিষয় হল এখানে সত্যিকারের ইন্টারসেক্স বা ট্রু হারমাফ্রোডাইটের কথা বলা আচ্ছে না। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী প্রতি ২০০০ জনে ১ জন True Hermaphrodite বা intersex ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। জনসংখ্যার ০.০৫%। অর্থাৎ এরা এমন মানুষ সংখ্যায় খুবই কম। ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টে এমন মানুষ/শিশুদের কথা বলা হচ্ছে যাদের শারীরিক কোন সমস্যা নেই। শারীরিকভাবে তারা পুর্নাংঙ্গ নারী বা পুরুষ। কিন্তু তারা মনে করেছে তারা ভুল দেহে আটকা পড়েছে। মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী চার বছর বয়েসী শিশুদেরও এখন এমন মনে হচ্ছে, এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ফ্রি-তে এমন ওষুধ দিচ্ছে যেগুলো তাদের স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকে বিলম্বিত বা বন্ধ করবে (Puberty Blockers – horomone therapy) [https://to.pbs.org/2uUu1rt, https://bit.ly/2K1zjpy]
ট্র্যান্সজেন্ডার উন্মাদনা নিয়ে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড রিডিং এর জন্য দেখুন –
.
নিচে দুটো দশ বছর বয়েসী ছেলের ভিডিও দিচ্ছি যারা দাবি করছে ২ এবং ৩ বছর বয়স থেকে “ড্র্যাগ” করা শুরু করেছে। এ বয়সেই তারা আবিষ্কার করেছে যে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক পরিচয়ের বাইরেও তাদের মধ্যে অন্য একটি “সত্ত্বা” আছে। ড্র্যাগ (Drag) হল পশ্চিমা সমকামিদের একটি সাবকালচার যেখানে সমকামি পুরুষরা নারীদের মতো ড্রেসআপ ও মেইকআপ করে বিভিন্ন ধরণের স্টেইজ শো – রানওয়ে, গান, নাচ ইত্যাদি-তে অংশগ্রহণ করে। কাজটা যখন সমকামি পুরুষরা করে তখন তাকে বলা হয় “ড্র্যাগ কুইন”। “ড্র্যাগ কিং” এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। সমকামি নারীরা পুরুষের মতো ড্রেসআপ ও মেইকআপ করে। এধরণের অনুষ্ঠানগুলো হাইলি সেক্সুয়ালাইযড হয়ে থাকে। ভিডিওও অংভঙ্গি দেখলেই বুঝতে পারবেন। এবাচ্চাগুলো টিভিতে বড়দের যা করতে দেখেছে তাই কপি করছে।
‘ডেযমন্ড’ – https://www.youtube.com/watch?v=Qk0WA3VlFfA
‘ল্যাকট্যাশিয়া’ – https://www.youtube.com/watch?v=bdCXxUxI-WE
.
[দুটো ভিডিওতেই নানা জাতের অসভ্য মানুষের ফুটেজ আছে, সো নিজ দায়িত্বে দেখবেন বা দেখবেন না। ট্র্যান্সজেন্ডার মুভমেন্টের উন্মাদনার মাত্রা বোঝানো এবং প্রমাণ হিসেবে লিঙ্কগুলো দেয়া। আমি পারসোনালি ভিডিওগুলো দেখতে সাজেস্ট করবো না।]
.
আসুন এবার ডটগুলো মেলানো যাক। পুরো ব্যাপারটা এবার একটু স্টেপ বাই স্টেপ চিন্তা করুন –
১০ বছর বয়েসী বাচ্চারা বলছে তারা ২/৩ বছর বয়েস থেকেই নিজেদের মধ্যে এই ‘সত্ত্বা’ অনুভব করছে। কেউ অনুকরণ করছে ড্র্যাগ কুইনদের, আবার কেউ বলছে সে নিজের নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চায়। অভিভাবক, সমাজ, রাষ্ট্র ও মিডিয়া তাদেরকে সমর্থন করছে, এবং এই বাচ্চাদের “অনুভূতির” ওপর বেইস করে জীবনকে আমূল বদলে দেয়া বিভিন্ন মেডিকাল প্রসিজারের দিকে যাচ্ছে। লক্ষ করুন, এ সিদ্ধান্তগুলোর সাথে যৌনতার ব্যাপার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ৮ বছর বয়েসী একটা ছেলে যদি বলে সে হাইলি সেক্সুয়ালাইযড সমকামি সাবকালচারের সাথে আইডেন্টিফাই করে, অথবা যখন সে বলে সে আসলে পুরুষের দেহে আটকে পড়া একজন নারী – এবং আমরা যখন সেটা মেনে নেই, তখন মূলত আমরা এটাই মেনে নিচ্ছি যে নিজের যৌনতা ও শরীরের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্তগুলো দেয়ার মতো ম্যাচিউরিটি তার মধ্যে এসেছে। অর্থাৎ এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার মাধ্যমে আমরা মেনে নিচ্ছি এ বয়েসী একটা বাচ্চার সম্মতি দেয়ার – consent করার – সক্ষমতা আছে।
“নিজের পুরো শরীরকে বদলে ফেলার ব্যাপারে, নিজের লিঙ্গ বদলে ফেলার ব্যাপারে যে মানুষ সিদ্ধান্ত দিতে পারে, কার সাথে শোবে সেই ব্যাপারে সে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না?”
.
একজন পেডোফাইল যদি প্রশ্ন করে, কী জবাব দেবেন? যদি যৌনতা এবং যৌন বিকৃতির ব্যাপারে পশ্চিমা চিন্তার মূল কাঠামোকে মেনে নেন, যদি আপনি মেনে নেন একটা শিশু তার লিঙ্গ পরিবর্তনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে আপনাকে এটাও মানতে হবে যে এই শিশু তাহলে যৌনকর্মের ব্যাপারেও সম্মতি দিতে পারে। সুতরাং যে যুক্তি দিয়ে মিরজাম হেইন এবং অন্যান্য আরো অনেকে শিশুকামকে অনৈতিক ও অপরাধ বলছেন তা ধোপে টেকে না। ট্র্যান্সজেন্ডার আইডিওলজি আমাদের দেখাচ্ছে যে শিশুরাও যৌনতার ব্যাপারে সচেতন, সক্রিয় ও সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম। এবং এভাবেই যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমা দর্শন – যা আমরা আধুনিকতার নামে গদগদ হয়ে গ্রহণ করেছি – সেটা শিশুকামীতাকে বৈধতা দেবে।
অলরেডি একে বৈধতা দেয়ার থিওরেটিকাল এবং রেটোরিকাল ফ্রেইমওয়ার্ক পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন শুধু প্রয়োজন নিয়মিত কিছু আবেগঘন নভেল, সিরিয়াল, সিনেমা আর দেশে দেশে হাই-প্রোফাইল কিছু শিশু ট্র্যান্সজেন্ডার সেলিব্রিটি। ঠিক দু’দশক আগে যেভাবে সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমানে “ট্রান্সজেন্ডার রাইটস”-এর নামে ঠিক একই কাজ করা হচ্ছে।
[সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন কিভাবে হল – https://bit.ly/2vdLmL6]
.
“যৌনতা, ব্যক্তি পরিচয় এসবই আপেক্ষিক। ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিষয়। একজন মানুষ ভেতরে কেমন তাই মুখ্য। সামাজিক প্রথা আর পশ্চাৎপদতার কারণে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি উচিৎ না। যখন কারো ক্ষতি হচ্ছে না তখন বিরোধিতা কেন?” – এসব আর্গুমেন্টের মাধ্যমে এই বিকৃতি ও অসুস্থতাকে স্বাভাবিক, নির্দোষ কিছু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। এবং একবার এই বিকৃতি গৃহীত হবার পর এই যুক্তি ব্যবহার করে বৈধতা দেয়া হবে পেডোফিলিয়ারও। আমার কথাটা স্মৃতিতে মজুদ করে রাখতে পারেন, বছর দশেক পর মিলিয়ে নেবেন।
.
এই অর্থহীন যৌনমানসিক বিকৃতির জট ইসলামের আলোতে খোলা খুব সহজ। আমরা জানি, আল্লাহ মানুষকে ফিতরাহর (natural disposition) ওপর সৃষ্টি করেছেন। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হল বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষন। জীবনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে প্রতটি মানুষ বয়ঃপ্রাপ্ত (বালেগ) হয়, এবং তখন থেকে সে যৌনতায় সক্রিয় হবার সক্ষমতা অর্জন করে। অঞ্চল, আবহাওয়া ও পরিবেশভেদে এই বয়সের মধ্বেঁযে কিছু পার্ধেথক্য পরিলক্ষিত হয়। সমকামিতা জন্মগত না, স্বাভাবিক না। বরং একটি যৌনমানসিক বিকৃতি। আমরা জানি আল্লাহ ভুল করেন না। কাজেই ভুল করে, ছেলের দেহে মেয়ে বা মেয়ের দেহে ছেলে আটকা পড়েছে – এধরণের কিছু হওয়া সম্ভব না। হয় এটা মানসিক রোগ, বিকৃতি, বাহ্যিক কোন ফ্যাক্টরের প্রভাব (অ্যাবিউয, শক, ট্রমা ইত্যাদি) অথবা সিহর বা জ্বিন শায়াত্বিনের প্রভাব। আর যারা সত্যিকার অর্থে, শারীরিকভাবে ইন্টারসেক্স (ট্রু হারমাফ্রোডাইট) তাদের হুকুম আহাদিস থেকে স্পষ্ট, এবং এটা তাদের জন্য একটি পরীক্ষা।
.
কিন্তু যখনই আপনি পরম মানদন্ডকে ছেড়ে আপেক্ষিকের গলিতে ঢুকে পড়বেন, কোন কূলকিনারা পাবেন না। আপেক্ষিক নৈতিকতা আর সামাজিকতাকে নৈতিকতার মানদন্ড হিসেবে নেয়ার এই হল ফলাফল। যৌনতা এবং যৌনবিকৃতি এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে শক্তিশালী কারণ এ বিষয়গুলো সহজাতভাবে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু একই ধরণের বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান পশ্চিমা চিন্তা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অন্যান্য ক্ষেত্রেও। পশ্চিমা সভ্যতা তাদের উৎকর্ষের চরমে পৌছানোর পর এখন আছে অবক্ষয় আর অধঃপতনের পর্যায়ে। প্রত্যেক সভ্যতায় এই পর্যায়ে এসে নানান ধরণের যৌনবিকৃতি ও সীমালঙ্ঘন দেখা দেয়। লেইট স্টেইজ ডেকাডেন্স। পশ্চিম এখন এই অবস্থায় আছে। তাদের মধ্যে অনেকে এটা বুঝতেও পারছে। [https://bit.ly/2HtHdsg] কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা মুসলিমরা এখনো অনিমেষ নয়নে মুগ্ধ হয়ে পচতে শুরু করা অতিকায় এই কাঠামোর দিকে চেয়ে আছি। তাদের অনুকরণে নিজেদের উন্নতির স্বপ্ন দেখছি। অথচ সত্যিকারের দিকনির্দেশনা, সত্যিকারের পরশপাথর, পরম মানদন্ড – আল ফুরকান আমাদের হাতের কাছেই। কী বিচিত্র ইচ্ছাঅন্ধত্ব, কী অদ্ভূত আত্মঘৃণা!
====
লেখক- আসিফ আদনান
শেয়ার করুনঃ