রুমে কেউ নেই,দরজা বন্ধ। সামনে ল্যাপটপ ও ইন্টারনেটের অবাধ জগত। যেখানে ইচ্ছা সেখানে সার্ফিং করার সুযোগ। কেউ তো আর দেখছে না! শয়তানের ধোঁকা দেয়ার সুবর্ণ সুযোগ। আর মানবিক দুর্বলতা ও ঈমানি দুর্বলতার কারণে সেই ধোঁকায় পরার সমূহ সম্ভাবনা। বন্ধুর কাছ থেকে পেনড্রাইভ ও পোর্টেবল হার্ডডিস্ক ভর্তি করে আনা হারাম কন্টেন্টে ল্যাপটপ পূর্ণ। লাখ লাখ হারাম সাইট তো আছেই। হারামে প্রবেশ করতে একটি ক্লিকই যথেষ্ট।

বেনামাজিদের কথা বাদই দেয়া যাক, যারা নামাজ পরেন তারা অন্য গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারলেও শয়তানের এই আহবানকে মাঝে মধ্যে উপেক্ষা করতে পারেন না। কেননা হারাম জিনিসকে শুধুমাত্র হারাম জানলেই তা থেকে বাঁচা যায় না বরং ওই হারামকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করা দরকার। নিজেকে বুঝানো দরকার “কেউ না দেখলেও আল্লাহ্‌ তো দেখছেন”। আর মহান আল্লাহ্‌র সাহায্য থাকা তো অবশ্যই দরকার। শয়তানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এই বিজনেস মুসলিমদের মহান আল্লাহ্‌র হুকুম থেকে গাফেল করার জন্যই। এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে ইন্টারনেট ইউজ করে কিন্তু জীবনে কখনই এই হারাম জিনিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়নি। কিন্তু ১/২/৩ বার গুনাহ হয়েছে বলে একে অভ্যাসে পরিণত করা মহান আল্লাহ্‌র হুকুমের প্রতি অবজ্ঞার শামিল।

ভুল হয়েছে, ক্ষমা চাইতে হবে, বারবার ক্ষমা চাইতে হবে আর এই হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য মহান আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

যার চোখ নেই সেই একমাত্র জানে চোখের কদর কতোটুকু। এতো বড় নিয়ামাত চোখের শুকরিয়া কি আমরা হারাম দিকে দৃষ্টি দেয়ার মাধ্যমে আদায় করবো? ওয়াল্লাহি!

“তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না।” (আল-ইমরানঃ১৩৫)

“আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকেঃ আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।” (আন-নিসাঃ১৮)

এই জঘন্য গুনাহে নিমজ্জিত হওয়ার আগে আমাদের একটিবার ওইসব শহীদদের কথা মাথায় রাখা উচিত যাদের শাহাদাতের কারণে আজকে দ্বীন ইসলাম আপনার আমার পর্যন্ত এসেছে। আমরা তো সবাই শহিদ হতে চাই না। এবং শহিদ হওয়া সবার জন্য সম্ভবও নয়। মহান আল্লাহ্‌ যাকে অনুগ্রহ করেন একমাত্র সেই এই মহান নিয়ামাত লাভ করেন। আমাদের দরকার একটু নফসের কুরবানি। নফসের ধোঁকা থেকে নিজেকে হিফাজত করা।

খুব কি কঠিন কাজ???? সেইসব শহিদদের তুলনায় আমাদের নফসের কুরবানি কি বেশি হয়ে গেলো???? কখনই নয়।

নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত সালাত গুরুত্বসহকারে আদায় করা এবং মহান আল্লাহ্‌র সাহায্য ছাড়া বর্তমানের সবচেয়ে জঘন্য এই গুনাহ থেকে কেউ বেঁচে থাকতে পারবে না। খুশুর সহিত ৫ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় এবং মহান আল্লাহ্‌র কাছে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার দু’য়া করলে অবশ্যই মহান আল্লাহ্‌ সাহায্য করবেন।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন,

“আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।” (সূরা আল-আনকাবুতঃ৪৫)

ফেসবুকের নিউজ ফিড ও নেট সার্ফিং এর সময় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার কিছু টিপসঃ

বর্তমান ফিতনার যুগে চোখের গুনাহের সবচেয়ে উর্বর জায়গা হলো অনলাইন। এই দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে হাশরের ময়দানে। এমনকি ব্রাউজার হিস্টোরি,চ্যাট হিস্টোরি, প্রতিটি লাইক/কমেন্ট এর হিসাব দিতে হবে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করতে চাইলে তাকে ঠেকানোর কেউ নেই। আমাদের মাথায় রাখা দরকার “browsing history” ডিলিট করতে পারলেও আমরা কিরামান কাতিবিন(দুই কাঁধের ভালো-মন্দ লিখার ফিরিশতাদ্বয়) এর লিখা ডিলিট করতে পারবোনা। একাগ্রচিত্তে তাওবা ছাড়া এই গুনাহ মাফ হবে না। যারা অনিচ্ছাকৃতচোখের গুনাহ থেকে বাঁচতে চান

তাদের জন্য কিছু টিপসঃ

১) অনলাইনের অযাচিত অ্যাড দূর করার জন্য addons হিসেবে Adblock ইউজ করতে পারেন। Firefox, chrome উভয় ব্রাউজারের জন্যই পাবেন। এতে ওয়েব পেজ দ্রুত লোড হবে। ব্যান্ডউইডও কম খরচ হবে। আজেবাজে অ্যাডও দেখতে হবে না।

https://addons.mozilla.org/en-US/firefox/addon/adblock-plus/

https://chrome.google.com/webstore/detail/adblock-plus/cfhdojbkjhnklbpkdaibdccddilifddb

২) ফেসবুকের ডান পাশে আসা বিভিন্ন মডেলদের ফলো করার আইডি, বিভিন্ন অশ্লীলপেজ এর অ্যাড ইত্যাদি দূর করার জন্য facebook purity ইউজ করতে পারেন। Firefox, chrome উভয় ব্রাউজারের জন্যই পাবেন।

https://addons.mozilla.org/en-US/firefox/addon/fb-purity-cleans-up-facebook/

https://chrome.google.com/webstore/detail/fb-purity-clean-up-facebo/ncdlagniojmheiklojdcpdaeepochckl?hl=en

৩) নিউজ ফিডে উল্টাপাল্টা ছবি শেয়ার দেয়া বন্ধুদের নিউজ ফিডে অফ করে দিতে পারেন। আইডির উপর কার্সর রাখলে following লিখাকে unfollow করে দেন। এতে ওই আইডি আপানার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকবে কিন্তু নিউজ ফিডে শো করবে না। এতে চোখের গুনাহও হলো না বন্ধুও রাগ করলো না। মাঝখানে আপনি ফিতনা থেকে বেঁচে গেলেন। সেও দ্বীনের দাওয়াত থেকে বঞ্চিত হলো না।

৪) ইউটিউবে এখন প্রচুর ইসলামিক চ্যানেল রয়েছে। ওই চ্যানেলগুলোকে সাবস্ক্রাইব করে রাখলে ইউটিউবে নিজের গুগুল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করে রাখলে শুধু ওই চ্যানেলগুলোর ভিডিওগুলোর অ্যাডই আসবে। এতে চোখকে অযাচিত জিনিস দেখা থেকে বিরত রাখতে পারবেন।

কুরআন ও হাদিস থেকে কিছু রিমাইন্ডারঃ

“মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।”

(সূরা নূর : ৩০)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, দৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের মধ্যে একটি বিষাক্ত তীর। যে ব্যাক্তি আমার ভয়ে কু-দৃষ্টি ত্যাগ করে আমি তাকে এমন একটি ঈমানী নুর দান করি, যার স্বাদ সে তার অন্তরে অনুভব করে। (তাবরানী)

হযরত হাসান (রা.) থেকে বণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে পুরুষ দৃষ্টিপাত করে এবং যে নারী দৃষ্টিপাত করার সুযোগ দেয় উভয়ই আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত। (মিশকাত)

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান, কিয়ামতের দিন সমস্ত চোখ ক্রন্দনরত অবস্থায় থাকবে। কিন্তু ঐ চোখ ক্রন্দনরত অবস্থায় থাকবে না, যে চোখ দুনিয়াতে নিষিদ্ধ বস্তু দেখা থেকে বিরত রয়েছে। (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব।)

মহান আল্লাহ্‌ আমাদেরকে মাফ করুন ও শয়তানের ধোঁকা থেকে হিফাজত করুন। ঈমান আমলের যথাযথ হিফাজত করে দুনিয়া থেকে আখিরাতে যাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুনঃ