বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

বাকের ভাইকে (এইসব দিনরাত্রি নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র)   নিয়ে নব্বইয়ের দশকে অবিশ্বাস্য রকমের মাতামাতি করা হয়েছে  এদেশে । সেই সময়ের উঠতি তরুণেরা বাকের ভাইয়ের মতো দাঁড়ি রেখে, ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়িয়ে  সানগ্লাস চোখে ঘুরে বেড়াতো , মিছিলে শ্লোগান দিত – আমরা সবাই বাকের হবো , এত মোনা কোথায় পাব’?

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি আটকানোর জন্য রাস্তায় মিছিল করা হয়েছে, লেখককে হুমকি ধামকিও দেওয়া হয়েছে – বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে দেখে নেওয়া হবে, অভিনেতা কাদেরেরে ( নাটকে বাকের ভাইয়ের শাগরেদ) বাসায় নাকি ঠিল ছোঁড়া হয়েছে । এরকম একটা কথা শুনেছিলাম বাকের ভাইয়ের ফাঁসির পর তার কুলখানির আয়োজনও নাকি করা হয়েছিল ।

বর্তমান সময়ে দেশে   কিরনমালা সিরিয়াল নিয়ে যা হচ্ছে তা মিডিয়া কিভাবে মানুষের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে তার একটা ক্ল্যাসিক উদাহরণ হয়ে থাকবে । পুরো চিত্রটা পাওয়ার জন্য  নিচে কিছু  খবরের লিংক দেওয়া হলে, পড়ে দেখা যেতে পারে –

★”কিরনমালা নিয়ে দুই বোনের ঝগড়া। একজনের আত্মহত্যা”

[ http://bit.ly/2bvgPRn ]

.★”কিরনমালা নিয়ে স্বামির সাথে ঝগড়া, এক গৃহবধুর আত্মহত্যা”

[ http://bit.ly/2bELj0Z ]

.

★”কিরনমালা নিয়ে দুই গ্রামে সংঘর্ষ। পুলিশের ১০ রাউন্ড গুলি। আড়াইশতাধিক আহত।” [ http://bit.ly/2btqtF2 ]

.

★”কিরনমালা দেখতে না দেয়ায় ৭ বছরের ছেলের আত্মহত্যা”

[ http://bit.ly/2btpTXY ]

.

★”কিরনমালা দেখতে না দেয়ায় মোহাম্মদপুরে আরেক ১৪ বছরের মেয়ের আত্মহত্যা” [ http://bit.ly/2btqE3s ]

.

★”মা কিরনমালা দেখার সময় দুই ভাই-বোনের পানিতে ডুবে মৃত্যু”

[ http://bit.ly/2btqGrO ]

.

★‘কিরণমালা’ দেখছেন মা, পুড়ে মরল মেয়ে

[http://bit.ly/2b8pg3L]

[ সংকলনে – Muhammad Tafazzul ]

নাটক, সিনেমা,মিডিয়া, গল্প, উপন্যাস এগুলো মানুষের মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণ করার খুবই শক্তিশালী মাধ্যম ।  এই মিডিয়াই ঠিক করে দেয় আমরা কাকে নিয়ে চিন্তা করব, কিভাবে চিন্তা করব, কার দুঃখে কেঁদে বুক ভাসাবো, কার আনন্দে আনন্দিত হব , কি পোশাক পড়বো, কি খাবার খাব  সবকিছু । মানুষ হিমুর মতো পাগল সেজে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায় রাস্তায়,  ফুটবলারদের মতো  হেয়ারকাট দেয়,  শাহরুখ, রনবীরদের  মতো প্রেম করে ,  বিজ্ঞাপনের মডেলদের মতো  পোশাক আশাক পড়ে ।

‘আমি তো শুধু দেখছি কিছু করছি না , কারো ক্ষতি তো করছি না’ এই টাইপের একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় অনেক পর্ণ আসক্তদের  থেকে । অনেকে নিছক অজ্ঞতাবশত এই কথা বলে, আবার অনেকে নিজেদের পর্ণদেখাকে জাস্টিফাই করার জন্য এরকম একটা অন্তঃসারশূন্য ,ফাঁপা দাবী করে ।

আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে পর্ণমুভি/ আইটেম সং বা  মিউজিক ভিডিও (সফটকোর পর্ণ)  দেখা ধর্ষণ, যৌন বিকৃতি , শিশুনির্যাতন এর প্রভাবক হিসেবে কাজ করে , অনেক সময় প্রধান চালকের ভূমিকা পালন করে তাহলে এই লিখা পড়ে আপনার লাভ নেই । আপনি সত্যটা জানেন ।  শুধু শুধু সময় নষ্ট  হবে ।

এই লিখাটা তাদের জন্য যারা কোনরকম তথ্য-প্রমাণ ছাড়া , কোন একাডেমিক গবেষণা ছাড়া গায়ের জোরে প্রমাণ করতে চান , “পর্ণমুভি  ক্ষতিকর নয় , ধর্ষণ বা যৌন বিকৃতির জন্য এটা দায়ী নয়”, “আমি তো শুধু দেখছি, কিছু করছি না”।

লিখার আসল অংশে প্রবেশ করার পূর্বে কিছু কথা বলে নিতে চাই ।  আমরা এই আর্টিকেলের প্রথমেই বাকের ভাই এবং কিরনমালা’র উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি মানুষ যা দেখে , মিডিয়া যেটা তার সামনে হাইলাইট করে দেখায় সেটা তার ওপর কতোটা প্রভাব বিস্তার করে । মিছিল থেকে শুরু করে খুন !

তাহলে একটা মানুষ যদি রেগুলার  পর্ণমুভি দেখে সেটা তার আচার আচরনে প্রভাব ফেলবে এটাও তো অস্বাভাবিক কিছু না ।

খুব সুচতুরভাবে   আমাদের  পৃথিবীতে পর্ণমুভিকে  স্বাভাবিক একটা ব্যাপার বানিয়ে ফেলা হচ্ছে (নরমালাইজড) । আসল পর্ণ তো আছেই [ http://tinyurl.com/9ys2k],  বিজ্ঞাপন , বিলবোর্ড আইটেম সং, মিউজিক ভিডিওতে পর্ণস্টারদের অনুকরণ করা হচ্ছে । মুভি, সিরিয়াল গুলোর মাধ্যমে  বিকৃত যৌনাচার কে (এনাল সেক্স, ওরাল সেক্স ) যেমন  প্রমোট  করা হচ্ছে , তেমনি সমকামীদের জন্যেও একটা শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে  । পর্ণমুভি অতিসহজলভ্য করে ফেলা হয়েছে । বাংলাদেশের ১৩-১৭ বছর বয়সীদের শতকরা ৭৭ জন  নিয়মিত পর্ণমুভি দেখছে [http://tinyurl.com/z8mzjqs ] ।

এগুলোর ফলাফল তো আমরা হাতে নাতেই পাচ্ছি ।

গত কয়েক বছরে খুব দ্রুত  আমাদের সমাজে অশ্লীলতাকে বরন করে নেওয়ার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে । আমাদের দেশে  ফেসবুকে গ্রুপ খুলে লাখ লাখ ছেলে মেয়ে  নির্লজ্জ রসিকতায় মেতে উঠছে । আমাদের তরুণ তরুণীরা  কাম তাড়নায় পাগল হয়ে ভাদ্র মাসের কুত্তাদের মতো রাস্তাঘাটে, লিটনের ফ্ল্যাটে , ক্লাসরুমে শরীরের উত্তাপ মেপে নিচ্ছে । বিছানায়   পর্ণস্টারদের অনুকরণ করছে, পশুর মতো  একে অপরকে ব্যবহার করছে । ।  দশ  বছর আগেও টিভিতে যে দৃশ্য  একাকী দেখলেও আমরা লজ্জায় লাল হয়ে যেতাম, তারচেয়েও অশ্লীল দৃশ্য আমরা ফ্যামিলি শুদ্ধ বসে দেখছি  ।

আর কথা বাড়াতে চাই না ।  ধৈর্য ধরে পড়ে ফেলুন , ধর্ষণ, বিকৃত যৌনাচার বা শিশুনির্যাতনের সঙ্গে পর্ণমুভির কি সম্পর্ক তা নিয়ে লিখা একাডেমিক , রসকষহীন ,খুবই বিরক্তিকর এই আর্টিকেলটি ।

ধন্যবাদ ।

যৌন নিপীড়ন,লাঞ্ছনা,অবমাননা,ধর্ষণ,অজাচার,উৎপীড়ন ও অন্যান্য যৌন অপরাধ যেমন নারী পাচার ও যৌন দাসত্বের সাথে পর্নোগ্রাফির সম্পর্ক:

“পর্নোগ্রাফি হল থিওরি আর রেপ হল তার বাস্তবায়ন।”

-রবিন মরগান (Going Too Far: The Personal Chronicle of a Feminist)

“পুরুষরা পর্নোগ্রাফির পেছনে পয়সা ঢালে আর ধকল যায় নারীদের ওপর ধর্ষণ আর নিপীড়নের আকারে এমন এক সমাজের কাছে যা তাদের তুচ্ছ সেক্সুয়াল অবজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করে।” -রোসালি ম্যাগিও (The Dictionary of Bias-Free Usage)

“আমি জেলে লম্বা সময় কাটিয়েছি এবং অনেকের সাথেই কথা হয়েছে যাদের অপরাধের মূল উৎস হল পর্ণ।তাদের প্রত্যেকেই ছিল এতে বাজেভাবে আসক্ত।F.B.I. এর নিজস্ব সিরিয়াল হোমোসাইড এর গবেষণায় এসেছে, সিরিয়াল কিলারদের মধ্যে সবচেয়ে কমোন ইন্টারেস্ট হল পর্ণ যা একেবারে সত্য।”
-টেড বান্ডি (Serial Killer & Rapist of at least 28 Women & Girls)

পড়তে পারেন এই তিনটি লিখা –

http://bit.ly/2coKlub

http://bit.ly/2bztRsK

http://bit.ly/2by3Kc0

পর্নোগ্রাফি ও উদ্দামতা:

২০১০ সালের একটি রিসার্চ নিয়ে আলোচনা করা যাক যা সম্পন্ন করেন ম্যারি অ্যানি লেইডেন (PhD, Director of the Sexual Trauma and Psychopathology Program Center for Cognitive Therapy, Department of Psychiatry, University of Pennsylvania)

পর্ণের উত্তেজনা ব্যাক্তিকে ফ্যান্টাসির সীমানা ডিঙ্গিয়ে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখে ঠেলতে পারে।একটা এক্সপেরিমেন্টে একদল পুরুষকে দেখানো হয় রেইপ পর্ণ এবং আরেক দলকে নন-রেইপ পর্ণ।এরপর কোন রকম হাতের স্পর্শ ছাড়া নিজেদের সর্বোচ্চ মাত্রায় উত্তেজিত করতে বলা হল।এতে দেখা যায়, যাদের রেইপ পর্ণ দেখানো হয়েছে তাদের ফ্যান্টাসিগুলো ছিল অধিক বর্বর বাকিদের তুলনায়।আরেক গবেষণায় এসেছে, যেকোন ধাঁচের পর্ণই হোক না কেনো তার সাথে সরাসরি সম্পর্ক আছে অকথ্য গালাগালি, ড্রাগস আর অ্যালকোহলের।আর এসবই একজনকে দিয়ে ধর্ষণ করানোর জন্য যথেষ্ট।তাই যারা উগ্র লেভেলের পর্ণ দেখে, তাদের দ্বারা ধর্ষণের সম্ভাবনাও বিপুল থাকে।যাদের ডেইট রেইপ করার কলঙ্ক আছে তাদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে প্লেবয় টাইপের  কিছু ম্যাগাজিন বেশ ভূমিকা রেখেছে ।  দেখা গিয়েছে যে,যেসব স্টেইটে এইসব ম্যাগাজিনের সার্কুলেশনের হার বেশি সেসব স্টেইটে ধর্ষণের হারও বেশি।

যেসব কিশোর এই সব পর্ণ দেখে অভ্যস্ত তাদের ৪২% হল সেক্স অফেন্ডার।সাধারণ কিশোরদের তুলনায় এদের পর্ণে জড়িয়ে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক।৫-৮ বছর বয়সের মধ্যেই তা সম্ভব।এদের খুব কম সংখ্যক নিশ্চিত করেছে যে নিজেদের এই কুকর্মের পেছনে পর্ণ দায়ী নয়।তবে বাকিদের ক্ষেত্রে পর্ণই প্রধান কারণ।
এখন কিছু পরিসংখ্যান দেখা যাক।হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি লেলিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন ধাঁচের অপরাধীকে তাদের অপরাধ সংঘটনের জন্য।যেমন,চাইল্ড মলেস্টার(৬৭%),ইনসেস্ট অফেন্ডার(৫৩%) ও রেইপিস্ট(৮৯%)।এদের সবাই যে শুধু পর্ণ দেখার পরই ভিক্টিমদের উপর হামলা করত তা নয়,এদের অনেকেই রেগুলার পর্ণ দেখায় আসক্ত ছিল যা তাদের বর্বর হতে রসদ জুগিয়েছে এবং ওগুলো যে হার্ডকোর লেভেলের ছিল তাও কিন্তু নয়।তাই একজন পুরুষের পুরুষত্বের অপব্যবহার তার পর্ণ দেখার হারের ওপরও নির্ভর করে।যারা তাদের দৈহিক সামর্থ্যকে বাজেভাবে কাজে লাগায় বা যারা নারীদের কেবল আমোদের উপাদান হিসেবে উপভোগ করে আসছে তাদের দ্বারা শঙ্কিত হবার শঙ্কা অনেক বেশি থাকে।

এবার কিছু ভিক্টিমের বক্তব্য শোনা যাক।১০০ জন ভিক্টিমের মধ্যে ২৮% বলেছে যে তাদের ওপর হামলাকারী ব্যাক্তি পর্ণ দেখেছিল আর বাকিদের মধ্যে ৫৮% এ ব্যাপারে ঠিক নিশ্চিত নয়।আবার প্রথম শ্রেণির ভিক্টিমদের ৪০% বলেছে যে তাদের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছিল তার একটি অংশ ছিল পর্ণ।বাকি ৪৩% বলেছে যে নির্যাতনের প্রকৃতি পর্ণে যা দেখানো হচ্ছিল তার মতোই ছিল অনেকটা।১৮% এর ধারণা অনুযায়ী,পর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে নির্যাতনকারী আরও ধর্ষকামী হয়ে উঠেছিল।১০০ জনের মধ্যে ১২% জানিয়েছে যে নির্যাতনকারী হুবুহু তার দেখা পর্ণের অনুরুপ ঘটিয়েছে তাদের সাথে আর ১৪% জানিয়েছে যে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক কিছু বর্বর কাজ করানো হয়েছিল।

সবশেষে মূল কথা হল,পর্নোগ্রাফির জগৎ আপনাকে অস্বাভাবিক ব্যবহারে অভ্যস্ত করাবে।ধীরে ধীরে আপনার জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক অংশে পরিণত হবে এবং আপনার বিকৃত মস্তিষ্ক এক সময় আপনার কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।এই বিষের সংক্রমণ থেকে কেউই নিরাপদ নয়।হতে পারে সে পুরুষ বা নারী, যুবক বা যুবতী, বাচ্চা বা বুড়ো, বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত।

#অনিবার্য_যত_ক্ষয়

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ ……

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টীম কর্তৃক অনূদিত)

পড়তে পারেন –

অনিবার্য যত ক্ষয়’ (দ্বিতীয় পর্ব) – https://bit.ly/2x5OdHU
অনিবার্য যত ক্ষয়’ (শেষ পর্ব) – https://bit.ly/2O7Pgxf

রেফারেন্সঃ http://bit.ly/2c8x0li

শেয়ার করুনঃ