বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

প্রথম পর্বের  পর ……

শ্রীঘর দর্শনঃ

সিয়াটল , সল্টলেক সিটি , কলারাডো , ফ্লোড়িডার মেয়েরা একের পর এক রহস্যজনক ভাবে হারিয়ে যাচ্ছে । জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না কাউকে । কয়েকদিন পর পাওয়া যাচ্ছে পচে গলে যাওয়া বিকৃত লাশ । এফবিআই   চারিদিকে জাল বিছিয়েছে ঘাতককে ধরার জন্য, কিন্তু ঘাতক প্রতিবারেই সুচতুরভাবে জালভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছে ।

আগস্ট , ১৯৭৫ । আমেরিকার সল্টলেক সিটির কিছুটা দূরের   Utah  হাইওয়ে ।  একটা ট্রাফিক সিগন্যাল মিস করাতে বাদামী রঙের একটা ভোক্সওয়াগানকে থামানো হল । প্যাট্রল অফিসাররা  অবাক হয়ে দেখলেন ভোক্সওয়াগানের সামনের ড্রাইভারের পাশের সিটটা নেই । সন্দেহ হওয়াতে গাড়ির ভেতরে সার্চ করা হল । পাওয়া গেল – নাইলনের দড়ি , সিঁধকাঠি , হ্যান্ডকাফ , মুখোশ , দস্তানা, স্ক্রু ড্রাইভার এবং আরো টুকিটাকি জিনিসপত্র । “এই ব্যাটা সিঁধেল চোর  না হয়েই যায় না” ভাবলেন প্যাট্রল অফিসাররা । গাড়ির মালিক  একান ওকান বিস্তৃত মনভুলানো হাসি দিয়ে অফিসারদের ভুজুং ভাজুং বোঝানোর চেষ্টা করল – বেরসিক অফিসাররা  হাতে হাতকড়া পড়িয়ে সে হাসির বিনিময় দিলেন  । অফিসাররা তখনো জানতেন না এইমাত্র তারা যাকে গ্রেফতার করলেন সে  আমেরিকার টপ টেন মোস্ট ওয়ান্টেড লোকদের একজন থিওডর রবার্ট বান্ডি ওরফে  টেড বান্ডি , নারীদের পশুর মতো ভোগ করে গলা টিপে হত্যা করা যার নেশা ।

পালাবি কোথায় ?

১৯৭৭ সালের জুন মাসে   বান্ডিকে Garfield County jail  থেকে  Pitkin County Courthouse   এ নিয়ে যাওয়া হয় একটা শুনানির জন্য।বান্ডিকে সুযোগ দেওয়া হয় আত্মপক্ষ সমর্থন করার এবং হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয়। শুনানির বিরতির একপর্যায়ে  বান্ডি  লাইব্রেরীতে যাওয়ায় আবেদন করে তার নিজের কেস নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য।লাইব্রেরীতে যেয়ে সে একটা বুকসেলফের পেছনের জানালা দিয়ে  দুই তলা থেকে লাফ দেয় মাটিতে। গোড়ালি মচকিয়ে গেলেও  কোর্টের সীমানার বাহিরে চলে যেতে  সক্ষম হয় সে। পুলিশের দেওয়া রোডব্লক এড়াতে এস্পেন পর্বতমালার মধ্যদিয়ে পালানোর চেষ্টা করে  ।কিন্তু পার্বত্য এলাকায় পথ হারিয়ে ফেলে বান্ডি।ছয়দিন পর বান্ডি যখন পুলিশের কাছে  স্যারেন্ডার করে তখন ক্ষুদপিপাসায়  আর ক্লান্তিতে তার অবস্থা ছিল খুবই কাহিল।

ফেরারী বান্ডিকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশের দেওয়া রোডব্লক

জেলে ফিরে বান্ডি  আবার ফন্দি আঁটতে থাকে কিভাবে ফেরারী হওয়া যায় । প্রায় ৫০০ ডলারের বিনিময়ে সে একটা হ্যাকসো ব্লেড জোগাড় করে ফেলে । সন্ধ্যায় অন্য বন্দীরা যখন গোসল করতো সেই ফাঁকে সে জেলের সেলের সিলিঙ ফুটো করতে থাকে । ছয় মাসের অবিরাম  চেষ্টায়  এবং  ১৬ কেজি ওজন কমিয়ে প্রায় একফুট বর্গাকার গর্ত দিয়ে সিলিঙের ওপরে উঠতে সক্ষম হয়  বান্ডি । বেশ  কয়েকবার রিহারসেল দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়  জেল থেকে পালানোর জন্য ।

১৯৭৭ এর ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ রাত । বেশীর ভাগ জেল কর্মীই বড়দিনের ছুটিতে। এই সুযোগ কাজে লাগায় বান্ডি । সিলিঙের গর্ত দিয়ে বের হয়ে নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায় জেল থেকে ।

১৭ ঘন্টা পর ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে যখন জেল কর্মকর্তারা বান্ডির সেলের সিলিঙ্গে গর্তটা আবিষ্কার করেন  ততক্ষণে বান্ডি পগার পার হয়ে গেছে ।

এই ঘরের সিলিং ফুটো করেই জেল থেকে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল বান্ডি

মৃত্যুর চৌকাঠেঃ

জেল থেকে পালিয়ে বান্ডি হাজির হয় ফ্লোরিডাতে । সেখানে একের পর এক ধর্ষণ আর  নারকীয় হত্যাকান্ড চালাতে থাকে এফবিআই আর ফ্লোরিডার পুলিশদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ।

অবশেষে  ফেব্রুয়ারী ১২ তারিখে রাত ১ টার সময় পুলিশ অফিসার ডেভিড লি   ,  Alabama  স্টেট এর কাছে  এরেস্ট করেন  টেড বান্ডিকে । মিঃ লি  টেড বান্ডিকে  সোজা নিয়ে যান  জেলে   । জেলে যাবার পথে  টেড বান্ডি আপন মনেই বলছিল –“ তুমি আমাকে মেরে ফেললেই ভালো করতে ,অফিসার”।

টেড বান্ডিকে তার অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয় ।

১৯৮৯ সালের ২৪ শে জানুয়ারী স্থানীয় সময় সকাল  ৭:১৬  মিনিটে টেড বান্ডিকে ইলেক্ট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় । সে সময় জেলের বাহিরে প্রায় ২০০০ জনতা বিশেষ করে তরুনী এবং যুবতীরা জড়ো হয়েছিল । নেচে, গেয়ে, ফায়ারওয়ার্ক এর মাধ্যমে তারা উল্লাস প্রকাশ করছিল । ক্ষণে ক্ষণে স্লোগান উঠছিল – “বার্ন বান্ডি বার্ন”, “ ইউ আর ডেড, টেড”

বান্ডির মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হয় এবং তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তা ওয়াশিংটনের   অজ্ঞাত স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয় ।

কিন্তু কেন ?

কি ছিল টেড বান্ডির এই অন্ধকার জগতের চালিকা শক্তি ? কেন  বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু ডিগ্রীও টেড বান্ডিকে মানুষ বানাতে পারেনি ?

উত্তরটা খুবই চমক জাগানিয়া – পর্নোগ্রাফি

বারো তের বছরের ছোট্ট টেড বান্ডি যেদিন  বাসার বাহিরে পাড়ার মুদি দোকানে এবং ড্রাগস স্টোরে পর্নোগ্রাফিক ম্যাগাজিনের সন্ধান পেয়ে গেল সেইদিনই ছোট্ট টেডের মধ্যে জন্ম নিল একটা সিরিয়াল কিলার , রেপিস্ট স্বত্বা ।

(মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে ডক্টর জেমস সি. ডবসন এর নিকট একটি সাক্ষাৎকার দেয় টেড বান্ডি । সাক্ষাৎকারটি পড়ে আসুন –  এখান থেকে  ।

অনুরোধ করব এই লিংকে যেয়ে সাক্ষাৎকারের ভিডিওটিও দেখে আসতে । মৃত্যুর চৌকাঠে পা দেওয়া মানুষটার কথাতে যে আবেগ মেশানো ছিল সেই আবেগ লেখাতে ধারন করার ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি)

আপনি  পর্ন মুভি দেখছেন আর ভাবছেন আমি তো শুধু কিছুই করছি না , শুধু দেখছি ; কিন্তু আপনার পর্ন আসক্তি যে আরেকটা টেড বান্ডির জন্ম দেবে না তার নিশ্চয়তা কে দিবে ?  বেশ কিছু হাই কোয়ালিফাইড গবেষনায় [ http://tinyurl.com/hgs2zeu ] প্রমাণিত হয়েছে পর্ন আসক্তি এর  আসক্তদের মাঝে  যৌন নিপীড়ন করার প্রবণতা জাগিয়ে তোলে ।

আপনি কি চান একজন টেড বান্ডি হতে ? একজন ধর্ষক  ?

মৃত্যুর চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বলা টেড বান্ডির কিছু কথা এখানে না উল্লেখ করলেই  নয়-

“………আমাদের মতো যারা মিডিয়ার হিংস্রতা বিশেষত পর্নোগ্রাফিক হিংস্রতা দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত, তারা কেউই বাহ্যত দানবীয় নই। আমরা আপনাদেরই পুত্র, আপনাদেরই স্বামী। আর সবার মতোই আমরাও একটা পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠেছিলাম। কিন্তু এখন ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে- পর্নোগ্রাফি যে কারো বাসার মধ্যে  ঢুকে পড়ে এক ঝটকায় বাসার বাচ্চাটাকে পারিবারিক কাঠামোর বাইরে বের করে নিয়ে আসে। ঠিক যেমনভাবে বিশ-ত্রিশ বছর আগে এটা আমাকে ছোবল মেরে বাইরে বের করে এনেছিলো। আমার বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে এসব থেকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন যেমনটা অপরাপর কট্টর খ্রিস্টান পরিবারেও হয় কিন্তু এসব প্রভাবকের ব্যাপারে সমাজ অনেকটাই শিথিল” 

“…… আমি কোনো সমাজবিজ্ঞানী নই এবং ভান ধরে এটাও বলবো না যে- সভ্য সমাজের চিরাচরিত ধারনায় আমার বিশ্বাস আছে। কিন্তু আমি দীর্ঘদিন যাবত কারাগারে বন্দী এবং এই সময়ের মধ্যে আমি এমন অনেকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যারা ভায়োলেন্স ঘটানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ। কিছু ব্যতিক্রম বাদে, তাদের প্রত্যেকেই পর্নোগ্রাফিতে গভীরভাবে আসক্ত ছিলো। নরহত্যা সংক্রান্ত এফ.বি.আই এর নিজেদের রিপোর্ট  বলে- সিরিয়াল কিলারদের সাধারণ আগ্রহের বিষয় হচ্ছে পর্নোগ্রাফি। সুতরাং এটাকে উপেক্ষা করার কোনো উপায়ই নাই”    

“……… আমি আশা করবো- আমি যাদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়েছি তারা আমার অনুশোচনায় বিশ্বাস না করলেও এখন আমি যে কথাগুলো বলবো সেগুলো বিশ্বাস করবেন। আমাদের শহর, আমাদের সম্প্রদায় কিছু প্রভাবকের ব্যাপারে এতোটাই শিথিল যেগুলোর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে।  আজ হোক কাল হোক এগুলো প্রকাশ পাবেই। মিডিয়ায় ভায়োলেন্স বিশেষত সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স এখন হরেক উপায়ে গিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমার ভয় হয় যখন আমি ক্যাবল টি.ভি. দেখি। আজকাল সিনেমার মাধ্যমে যেসব ভায়োলেন্স আমাদের বাসা অবধি পৌঁছে গেছে, ত্রিশ বছর আগে সেগুলো এক্স-রেটেড অ্যাডাল্ট থিয়েটারেও দেখানো হতো না” 

এই কথাটা  খুব গুরুত্বপূর্ণ……

“………যেটা আমি আগেও বলেছি- প্রভাবকগুলোর ব্যাপারে আমাদের সমাজের শিথিলতা চোখে পড়ার মতো। বিশেষতঃ এই ধরণের ভায়োলেন্ট পর্নোগ্রাফি। যখন সভ্য সমাজ টেড বান্ডিকে দোষারোপ করতে করতে পর্ন ম্যাগাজিনের পাশ দিয়ে দেখেও না দেখার ভান করে হেঁটে যাচ্ছে, তখন আসলে একদল তরুন তাদের অগোচরেই  টেড বান্ডিতে পরিণত হচ্ছে।  আক্ষেপের জায়গাটা ঠিক এখানেই”

দেখুন নারী স্বাধীনতা, নারীদের সমানাধিকার বিশেষ করে মুসলিম নারীদের নিয়ে পাশ্চাত্যের চিন্তাভাবনার কোন শেষ নেই , মুসলিম নারীদের জন্য  তাদের ফেমিনিস্টদের মায়াকান্নায়  আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যায়  , অথচ দেখুন পাশ্চাত্যই কি সুনিপন ভাবে এই পৃথিবীটাতে  লক্ষ লক্ষ টেড বান্ডি তৈরি করার কাঁচামাল যোগান দিচ্ছে ……   প্রতি ৩৯ মিনিটে আমেরিকা একটা করে নতুন পর্ন মুভি আপলোড করছে , বিশ্বের  মোট পর্ন মুভির শতকরা ৮৫-৮৯ ভাগ বানাচ্ছে আমেরিকা একাই ।

[http://tinyurl.com/9ys2k , http://tinyurl.com/jm8qtl8 ] পর্ন মুভি বানানোয় প্রথম ১০টা দেশের মধ্যে বেশীরভাগই   পাশ্চাত্যের

http://tinyurl.com/zap2rap ] হলিউড, মিউজিক ভিডিও,  রিয়েলিটি শো, ফ্যাশন শো , সুন্দরী প্রতিযোগিতা, রেসলিং এইগুলার কথা না হয় নাই বললাম ।

পাশ্চাত্যের পর্ন মুভি আর সেক্স ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা পুরনের জন্য মানব পাচারের শিকার হতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মা বোন , লক্ষ লক্ষ ছোট ছোট দুধের শিশুদের । [http://tinyurl.com/zanm372 , http://tinyurl.com/hvofqnd, http://tinyurl.com/zn2yvy9 ]

পাশ্চাত্য   নারীদের কিভাবে  স্বাধীনতা  দিবে ? যখন  তারাই নারীদের   জন্য এই পৃথিবীটাকে  করে তুলেছে  বসবাসের অযোগ্য ।

আমেরিকাতে প্রতি  ১০৭ সেকেন্ডে একটা করে ধর্ষণ হয় [http://tinyurl.com/k8ehojc ] , তাদের  তরুনরা এতোটাই পশু যে প্রতি ৪ জন নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন ধর্ষিত হয় তাদেরই পুরুষ ক্লাসমেটদের দ্বারা [http://tinyurl.com/jagb8ky ] ,  প্রতি ৬ জন নারীর মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ৩৩ জন পুরুষের মধ্যে একজন তাদের লাইফটাইমে একবার হলেও  ধর্ষণের শিকার হয়। [http://tinyurl.com/nm3gp5o ] ১৮ বছরে পা দেবার আগেই প্রতি ৪ জন মেয়ে শিশুর ১জন এবং প্রতি ৬ জন ছেলে শিশুর ১ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়[http://tinyurl.com/mzfxksp]

বাবার হাতে মেয়ে, ভাইয়ের হাতে বোন ধর্ষণের শিকার হয় ।  [http://tinyurl.com/hjq2a29  ,  http://tinyurl.com/zerbb5v ]

মা বোনেরা অফিসে আদালতে, রাস্তা ঘাটে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় । [http://tinyurl.com/mk2dmcr , http://tinyurl.com/pbzgmdrhttp://tinyurl.com/hvhqkcq ]

এতকিছুর পরেও যখন পাশ্চাত্য নারী স্বাধীনতার বুলি আওড়াই তখন কুরআনের একটা আয়াতই কেবল মনে পড়ে ……

“…তাদের যখন বলা হয় এই পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করোনা , তখন তারা বলে আমরাই তো বরং শান্তি স্থাপন কারী” । (সূরা বাকারাহ , আয়াত-১১)

আল্লাহ (সুবঃ) আমাদের অন্তর গুলো খুলে দিক , সত্য গ্রহণ করার তৌফিক দিক । (আমীন)

(শেষ)

শেয়ার করুনঃ