বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

.

প্রচন্ড শীতের রাত। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া জামা কাপড় ভেদ করে হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।পরমাসুন্দরী এক তরুণী  দৃঢ়,দ্রুতপদক্ষেপে হেঁটে যেয়ে নির্জন এক বাড়ির কড়া নাড়লো। দরজা খুলে দিল এক যুবক। এবং  চোখের সামনে সুন্দরী তরুণী দেখে সঙ্গে সঙ্গেই দরজা বন্ধ করে দিল।

.

মেয়েটি রাস্তা থেকে চেঁচিয়ে বলল,‘দয়া করে আমাকে আপনার বাড়িতে ঢুকতে দিন। আমি সফরে বেরিয়েছি। ভেবেছিলাম রাত নামার আগেই আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবো, কিন্তু রাত হয়ে গেছে অথচ আমি এখনো মাঝপথে এবং আমি জানি না, আমি কোথায় এসে পড়েছি। আমি এই এলাকার কাউকেই চিনি না।আপনি যদি আমাকে আপনার বাড়িতে আশ্রয় না দেন, আমি ভয় পাচ্ছি বাহিরে আমার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটতে পারে’।

যুবকটি উত্তর দিল,‘আশে পাশে আরো অনেক বাড়ি ঘর আছে… আপনি দয়া করে সেই বাড়িগুলোর কোন একটাতে যান, ইনশা আল্লাহ তারা আপনাকে সাহায্য করবে’।

.

মেয়েটি চলে গেল। আসলে চলে যাওয়ার ভান করলো। হাড় কাঁপানো শীতের রাতে মেয়েটির নির্জন ঐ বাড়ির কড়া নাড়া, সফরের কথা বলে আশ্রয় প্রার্থনা করা সবই জঘন্য একটা মাস্টারপ্ল্যানের অংশ। প্ল্যানে  বুঝতে হলে আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ডের ঘটনাগুলোও জানতে হবে।

.

এই যুবক ছিল আল্লাহর এক তাকওয়াবান বান্দা। সারাদিন রোযা রাখতো  আর সারারাত নফল সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্‌র ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দিত।সব ধরণের হারাম থেকে নিজেক সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতো।তাঁর পাড়া  প্রতিবেশী রা খুব একটা সুবিধের ছিল না । হারাম-হালালের কোন তোয়াক্কা তারা  করতো না ।আড্ডাবাজি,গীবত,পরচর্চা,পরনিন্দা করেই তাদের দিন কাটতো। আমাদের যুবক, পাড়া  প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করতো না। অধিকাংশ সময়ই সে তাঁর নিজের বাড়িতে বসে বসে আল্লাহ্‌র ইবাদাত করতো। তাঁর পাড়া  প্রতিবেশীরা এতে বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে গেল।তারা সব সময় এই যুবকের সমালোচনা করতো, ‘দেখ না,এই ব্যাটার ভাব দেখ, আমাদের পাত্তাই দেয়না,আমরা কি মানুষ না? সারাদিন ঘরে বসে বসে তসবিহ টিপে,আমাদের সঙ্গে কোন মেলামেশাই করোনা। ব্যাটাকে চল জন্মের মতো সাধুগিরির শিক্ষা দেই ’।

.

ইমেইজ কার্টেসিঃ shutterstock

তারা সবাই মিলে এই যুবকের পদস্খলনের ষড়যন্ত্র করলো। সুবহান আল্লাহ! শয়তান সবসময় মানুষকে সরাসরি আক্রমণ করে না । সে মাঝে মাঝে মানুষদের মধ্যেই এমন একটা দল তৈরি করে যারা অন্য মানুষকে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়।

.

ঐ যুবকের প্রতিবেশীরা গরু খোঁজার মতো করে আশেপাশের এলাকা চষে ফেললো রুপসী,লাস্যময়ী মেয়ের খোঁজে। তারা এমন এক তরুণীর সন্ধান পেল যে ছিল ঐ এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দরী। লোকগুলো ঐ মেয়েকে প্রস্তাব দিল,‘আমরা চাই, তুমি অমুক এলাকার ঐ যুবককে তোমার রূপের ফাঁদে ফেলবে এবং তার পদস্খলন ঘটাবে……তার সঙ্গে যিনা করবে’।

‘হায় আল্লাহ! আমি একজন মেয়ে, এমন কাজ আমি কিভাবে করবো?’

‘তুমি আমাদের এই কাজটা করে দাও। বিনিময়ে তুমি যা পাবে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা। তোমাকে ওজন করে তোমার ওজনের সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি স্বর্ণ তোমাকে দেওয়া হবে। রাজি ? ’

.

মেয়েটি কিছুক্ষন চিন্তা করলো। বিবেকের সঙ্গে যুদ্ধ করলো বলা যায়। সে ছিল খুবই গরীব। নুন আনতে পান্তা ফুরায় টাইপ অবস্থা। এক ধাক্কায় এতো সম্পদ। করলামই না হয় এই খারাপ কাজটা। একবারই তো! নিজেকে বোঝালো সে।

‘ঠিক আছে। এতো করেই বলছো যখন। আমি রাজি’

.

ঐ মেয়ে চলে যাবার ভান করলো। কিছুক্ষণ পরে… সে আবার যুবকের দরজায় কড়া নাড়লো।  ‘আমি পাশের বাড়িগুলোতে গিয়েছিলাম কিন্তু তারা কেউ বাড়িতে নেই। বাহিরে প্রচন্ড ঠাণ্ডা। আমার ভীষণ ভয় করছে, আপনি আমাকে আপনার বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি না দিলে আমি হয়তো ঠান্ডায় মরে যাব! দয়া করে দরজা খুলুন’ অনুনয় ঝরে পড়লো মেয়েটির কন্ঠে।

‘পাহাড়ের নিচের দিকে আরেকটু নেমে গেলে ওখানে আরো কিছু বাড়ি পাবেন। ইনশা আল্লাহ তারা আপনাকে তাদের সাথে থাকতে দেবেন। আমার বাড়িতে শুধু আমি,আর কেউ নেই। আমাদের দুজনের একসঙ্গে থাকা ঠিক হবে না’।– যুবকের সরল স্বীকারোক্তি।

.

মেয়েটি চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সে আবার ফিরে এল এবং দরজায় কড়া নাড়ল… এবার লোকটি দরজা খুললো এবং মেয়েটিকে দেখতে পেল। মেয়েটি বলল,‘আল্লাহর শপথ! আপনি যদি আমাকে ভেতরে আসার অনুমতি না দেন.. এবং কোনো পুরুষ যদি আমার সম্ভ্রম ছিনিয়ে নেয় তবে আল্লাহর! শপথ শেষ বিচারের দিন আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বলব যে, আপনিই হলেন সেই ব্যক্তি যার কারণে এসব ঘটেছে। আপনার কারণেই আমি ধর্ষিত হয়েছি….।

.

আর যুবকটি যখন আল্লাহ সুবহানুওয়া তা’আলার নাম শুনল তখন তাঁর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো কেননা, যখন মু’মিনগণের সামনে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে।

যুবক দরজার পাল্লা মেলে ধরলো।

‘আসুন, আপনি এই ঘরে রাতটা কাটিয়ে দিন,আমি পাশের ঘরেই থাকছি … দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করবেননা এবং ফজরের ওয়াক্ত হওয়ামাত্রই আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন’। এতোটুকু বলে যুবক পাশের ঘরে চলে গেল। কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করতে ভুল করলো না।

.

যুবকের প্রতিবেশীরা আশেপাশেই ওঁত পেতে ছিল। মেয়েটি বাড়ীতে ঢোকার পর তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে খেঁকশিয়ালের মতো খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দ করে হাসতে লাগলো- ব্যাটার সাধুগিরি একটু পরেই খতম হয়ে যাবে।আরো কিছুক্ষণ তাদের এভাবে বসে থাকার ইচ্ছা। তারপর,  একেবারে চূড়ান্ত মুহূর্তে হারে হারে করে যুবকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে যুবক এবং ঐ রূপসীকে হাতে নাতে ধরার প্ল্যান ।

.

যুবকটি নিবিষ্ট মনে কুরআন তিলাওয়াত করছিল। হটাত মেয়েটির ঘর থেকে রক্ত হিম করা একটা চিৎকার ভেসে আসলো। যুবক হাতে একটা বাতি নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে  প্রবেশ করল। চোখের সামনের দৃশ্য তাকে স্রেফ স্ট্যাচু বানিয়ে দিল।

মেয়েটি শুয়ে আছে বিছানায়। গায়ে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। দুচোখে তীব্র কামনা।

.

এখন এই যুবকটি  জীবনে প্রথমবারের মতো এমন কিছু দেখলো যা সে এর আগে কখনো দেখেনি। সে ভেতরে ভেতরে এমন কিছু অনুভূতির টের পেতে শুরু করল যা ইতিপূর্বে কখনো টের পায়নি ,তার মন তাকে এমন কিছু করতে বললো যা পূর্বে কখনো বলেনি…  তাদের অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি এখন তার সামনে…. হাতছানি দিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে নিষিদ্ধ জগতে হারিয়ে যাওয়ার! কী করবে সে?

টগবগে একজন যুবক এই পরিস্থিতিতে কী করে? সে তার জীবনে এমন কিছু কখনো দেখে নি…এলাকাবাসীরা আগেই বাড়িটি ঘিরে ফেলেছিল।এবার তারা তাদের বৃত্ত ছোট করে ফেলে প্রাচীরের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। আর মিনিট দুয়েক পরেই  দরজা ভেঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করবে তারা। যুবকটি ঐ মেয়ের ঘরে ঢোকার পর থেকেই মেয়েটি চিৎকার দেওয়া বন্ধ করে ফেলেছিল। কিছুক্ষণ রাজ্যের নীরবতা নেমে আসলো। দূরে একটা নিশাচর পাখি একগাছ থেকে অন্য গাছের উদ্দেশ্যে উড়াল দিল। গাছের পাতা থেকে একদলা তুষার মাটিতে পড়লো।

.

হটাত যুবকের বাড়ি থেকে রক্ত হিম করা চিৎকার ভেসে আসলো, মেয়েটির গলা… সে চিৎকার করছে… করতেই আছে… থামার কোন নাম গন্ধ নেই। এলাকাবাসীরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজায় হামলে পড়লো। তারপর মেয়ে এবং যুবক দুজনকেই আবিষ্কার করলো  একই ঘরের মেঝেতে!

.

(আগামী পর্বে সমাপ্য ইনশা আল্লাহ )

শেয়ার করুনঃ