সাই সাই করে পঙ্খীরাজ ঘোড়ার মতো বাসটা উড়ে চলছিল কালো পিচে মোড়ানো প্রশস্ত রাজপথের বুকের ওপর দিয়ে। জানালার পাশের সিটে বসে ছিলাম। বাতাসে উড়ছিল মাথার কোঁকড়া চুল । পথের পাশের বাবলার গাছ,ভাঁটফুল, নাম না জানা জংলী লতার নীল নীল ফুল, আর ১১ কেভি ইলেক্ট্রিক লাইনের পুল, সব কিছু নিমেষেই হারিয়ে যাচ্ছিল চোখের সামনে থেকে। বাসের ভেতরে নীরবতা  জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। একটু আগেও বেশ হইচই হচ্ছিল। আমার আশে পাশে বসে ছিল পনের ষোল বছর বয়সের বেশ কয়েকজন কিশোর । কেউ গল্প করছিল, কেউ উদাস হয়ে বাইরে চেয়ে ছিল, কেউ কেউ সিটে বা  এরওর ঘাড়ে মাথা রেখে মুখ হা করে ঘুমাচ্ছিল। শেষের ছেলেগুলো বেশ ক্লান্ত। একটু আগেও হাই ভলিউমে ‘বুরখা পড়া মেয়ে পাগল করেছে’ টাইপ গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জটলা বেঁধে কি নাচটাই না এরা নাচছিল। এরকম নাচ দেখার সৌভাগ্য (না দুর্ভাগ্য?) আগে কখনো হয়নি। তবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেলে আফ্রিকান গহীন অরণ্যের কিছু জংলীদের নাচ দেখেছিলাম। সেই নাচের সাথে এই ছেলেগুলোর নাচের বেশ মিল আছে! যাই হোক ছেলেগুলো আমার বন্ধু, আমরা সবাই একি ক্লাসে পড়তাম। স্কুল থেকে আমরা বনভোজনে যাচ্ছিলাম মুজিবনগর । বসন্তের এক অসহ্য সুন্দর দিন ছিল সেটি ।

সামনের সিটগুলোতে স্যারেরা বসেছিলেন। তাদের ঠিক পেছনেই জটলা বেঁধে বসে ছিল ছেলেদের এবং মেয়েদের কয়েকজন। বাস থেকে নামার পরে বেশ কয়েকজনের মুখে শুনলাম এই ছেলেমেয়েগুলো বাসের মধ্যে প্রায় পুরোটা রাস্তা একসাথে মোবাইলে পর্ন দেখেছে!

প্রচন্ড রকমের বিস্মিত হয়ে ছিলাম সেদিন ।

এরপর আস্তে আস্তে এরকম অনেক ঘটনা দেখে বিস্মিত হতে হতে আমার বিস্মিত হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেল। আমি জানলাম আমার স্কুলের সবচেয়ে সেরা বন্ধু ভয়ংকর রকমের পর্ন আসক্ত। কলেজে আমার পাশে বসা ছেলেটার হার্ডডিস্ক ভর্তি পর্ন। পেছনের বেঞ্চের ছেলেটা সারারাত মোবাইলে পর্ন দেখে আর ক্লাসে এসে ঘুমায়। কাছের একজন বন্ধু, খুবই ভদ্র,লাজুক ছেলে, পর্ন আসক্তির কারণে প্রচন্ড নির্লজ্জ হয়ে উঠলো। আমি দেখলাম  ক্লাস রুমের দরজা আটকে স্কুলের বন্ধুরা পর্ন দেখছে, কলেজের বন্ধুরা মোবাইলের লাউডস্পিকারে পর্ন ছেড়ে দিয়ে ম্যাডামকে বিরক্ত করছে, ম্যাডামদের নিয়ে রসালো আলাপে পার করে দিচ্ছে টিফিনের সময়টা। ফেসবুকে কুৎসিত ইঙ্গিত করে ট্রল বানাচ্ছে। ভার্সিটির র‍্যাগিং এ নবাগত  ছাত্রদের পর্নস্টারদের অনুকরণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

পাশের রুমের ভদ্র ছেলেটাও যখন কলেজের ব্যাগে চটিগল্পের বই নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, নামাজে যাওয়া ছেলেটাও যখন রুমমেটের সঙ্গে পর্নস্টারদের নিয়ে মজা করে, তখন আমি কি আর বিস্মিত হব?

খুব বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম ২০১১ সালের রমাদানে। লাইলাতুল কদরের রাতে গ্রামের মসজিদে গিয়েছিলাম। নামাজ পড়ার মাঝে বিরতিতে খেয়াল করলাম বারো তের বছরের কিছু ছেলে মসজিদের বাইরের উঠোনের আমগাছের নিচে বসে জটলা বেঁধে মোবাইলে পর্ন দেখছে। হাতে নাতে ধরা।

ইয়া আল্লাহ্! রমাদান মাসে! লাইলাতুল ক্বদরের রাতে!

লা হাওলা ওয়ালা কুআতা ইল্লাহ বিল্লাহ!

ভার্সিটিতে আমি নিজে অনেক অনুনয় বিনয় করে কয়েকজনকে রাজি করাতে পেরেছিলাম হার্ডডিস্ক পরিষ্কার করতে। এদের কারো কারো হার্ডডিস্কে শত গিগাবাইটের ওপরে পর্ন ছিল !

আমরা যখন বেড়ে উঠেছি তখনো বাংলাদেশে মোবাইল, ইন্টারনেট সহজলভ্য ছিলনা। তখনই এরকম ভয়ংকর অবস্থা ছিল!

এখন কী অবস্থা হতে পারে চিন্তা করে দেখুন একবার!

পর্ন আসক্তির ওপরে বাংলাদেশে তেমন কোন গবেষণা হয়নি বললেই চলে। ২০১২ সালে কয়েকটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর কিছু ছাত্রছাত্রীর উপর চালানো একটি জরিপে দেখা যায় শতকরা ৭৬ জন শিক্ষার্থীর নিজের ফোন আছে। বাকিরা বাবামার ফোন ব্যবহার করে। এদের মধ্যে-

* ৮২ শতাংশ সুযোগ পেলে মোবাইলে পর্ন দেখে।

* ক্লাসে বসে পর্ন দেখে ৬২ শতাংশ।

* ৭৮ শতাংশ গড়ে ৮ ঘন্টা মোবাইলে ব্যয় করে।

* ৪৩ শতাংশ প্রেম করার উদ্দেশ্যে মোবাইল ব্যবহার করে।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, বেসরকারী এক হিসাবে দেখা গেছে ফটোকপি আর মোবাইলে ফোনে গান/রিংটোন ভরে দেয়ার দোকানগুলো থেকে দেশে দৈনিক ২.৫ কোটি টাকার পর্ন বিক্রি হচ্ছে।[1]

এছাড়াও বাংলাদেশে থেকে এক মাসে গুগলে “পর্ন” শব্দটা সার্চ করা হয়েছে ০.৮ মিলিয়ন বার এরও বেশী। বিশ্বব্যাপী সংখ্যাটা হচ্ছে ৬১১ মিলিয়ন বার! “সেক্স” শব্দটা বাংলাদেশ থেকে সার্চ করা হয়েছে ২.২ মিলিয়ন বার। বিশ্বব্যাপী করা হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন বার।  অন্যান্য পর্নোগ্রাফিক শব্দের ক্ষেত্রে অবস্থাও অনেকটা এমন।

৩০ জুলাই ২০১৩, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) পর্নোগ্রাফির উপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকার সাইবার ক্যাফেগুলো থেকে প্রতি মাসে বিভিন্ন বয়সের মানুষেরা যে পরিমাণ পর্ন ডাউনলোড করে তার মূল্য ৩ কোটি টাকার মতো।[2]

 

“মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন” পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, পর্ন ভিডিওতে আসক্ত রাজধানীতে ৭৭ শতাংশ কিশোর। অবস্থার ভয়াবহতা ফুটে ওঠে যমুনা টিভির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও।[3]

কোন বাবা-মা’ ই বিশ্বাস করতে চাননা তাদের সন্তান পর্ন দেখার মতো এতোটা নিচে নামতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। সিকিউরিটি টেকনোলজি কোম্পানি Bitdefender এর গবেষনা অনুযায়ী, পর্ন সাইটে যাতায়াত করা প্রতি দশ জনের মধ্যে ১ জনের বয়স দশ বছরের নিচে। আর এই দুধের বাচ্চা গুলো রেইপ পর্ন  জাতীয় জঘন্য জঘন্য সব ক্যাটাগরির পর্ন দেখছে।[4]

লা হাউলা কুউ’আতা ইল্লাহ বিল্লাহ!

NSPCC ChildLine এর  সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের মধ্যে শতকরা ১০ জন এই ভেবে ভীত যে, তারা পর্ণে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারা মনে করছে চাইলেও আর পর্ন দেখা বন্ধ করতে পারবে না।[5]

২০০৮ সালে ১৪-১৭ বছর বয়সীদের ওপরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, এক তৃতীয়াংশেরও বেশী কিশোরেরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও পর্ন দেখে।[6]

পর্নমুভির সঙ্গে প্রথমবার পরিচিত হবার গড় বয়স ১১! সবচেয়ে বেশি পর্ন আসক্ত ১২-১৭ বছর বয়সীরাই![7]

 

শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে নিরাপদ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা এনজিও Childnet এর সিইও, এবং UK Safer Internet Centre এর একজন ডাইরেক্টর উইল গার্ডনার মন্তব্য করেন, “মা বাবার জন্য এটা বিশ্বাস করা খুবই কষ্টকর যে তাদের ছেলেমেয়েরা পর্ন দেখে । কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখনকার সময়ে পর্নোগ্রাফি খুবই সহজলভ্য এবং বাচ্চারা খুবই অল্প বয়সেই পর্নোগ্রাফির সাথে পরিচিত হয়ে যায়”।[8]

আঁতকে ওঠার মতো আরো অনেক জরিপ আছে । সব লিখতে গেলে ঢাউস বই হয়ে যাবে ।

আপনি, আপনার ছোটভাই/বোন বা সন্তানকে যতই নিরীহ,ভদ্র আর ল্যাদা গ্যাদা কাঁচু মনে করেন না নিশ্চিত থাকুন সে একবার না একবার হলেও পর্ন দেখে ফেলেছে এবং অচিরেই তার পর্ন আসক্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে । সর্বনাশ  হয়ে যাবার আগেই সাবধান হোন । দাঁত থাকতেই দাঁতের মূল্য বুঝুন । না হলে পরে পস্তাতে হবে ।

পর্নআসক্তি আপনার সন্তানের জন্য কতটা বিপদজনক তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে “ফ্যান্টাসি কিংডম” সিরিজে। পড়ুন এখানে-

“ফ্যান্টাসি কিংডম”(প্রথম কিস্তি): https://bit.ly/2x6Azo2
“ফ্যান্টাসি কিংডম”(দ্বিতীয় কিস্তি): https://bit.ly/2QrL9xJ
“ফ্যান্টাসি কিংডম”(শেষ কিস্তি): https://bit.ly/2NdAKIh

আরো পড়ুন-

আমাদের সন্তান পর্ন দেখে!!! (প্রথম কিস্তি): https://bit.ly/2CMF4sV
আমাদের সন্তান পর্ন দেখে!!! (দ্বিতীয় কিস্তি): https://bit.ly/2N6WIMF
আমাদের সন্তান পর্ন দেখে!!! (শেষ কিস্তি): https://bit.ly/2NzPdxm
হৃদয়ের ঋণ (প্রথম কিস্তি)- https://bit.ly/2MmESA9
হৃদয়ের ঋণ (শেষ কিস্তি)- https://bit.ly/2NHUza4

রেফারেন্সঃ

[1] Porn addiction of bangladeshi school going children’s (an investigative tv report) –  http://bit.ly/2c0TR1p

[2] Let’s talk about porn – https://goo.gl/dC5ymX

[3] https://www.youtube.com/watch?v=jUxXQB8PW7s

[4] One In 10 Visitors To Graphic Porn Sites Are Under 10 Years Old- http://bit.ly/2fdBY1a

[5] “Pornography addiction worry” for tenth of 12 to 13-year-olds – https://goo.gl/EWVkvZ

[6] Bev Betkowski, “1 in 3 boys heavy porn users, study shows,” Eurekalert.org, Feb. 23, 2007. http://www.eurekalert.org/pub_releases/2007-02/uoa-oit022307.php (accessed Dec. 9, 2013).

[7] How Hardcore Internet Porn Is Sexually Damaging Teens- https://goo.gl/UFNxqi

[8] Here’s The Shocking Percentage Of 12-Year-Olds Who Admit They Struggle With Porn – http://bit.ly/1S8hnvQ

শেয়ার করুনঃ