বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

অগাস্ট, ২০১৩।

ইউ.এস. এ।

স্বপ্ন, স্বাধীনতা আর স্বাধিকারের ভূমি।

সদ্য ১৯ -এপা দেয়া সারা (ছদ্মনাম)আজ খুব খুশি। ওরএতোদিনের স্বপ্ন পূরন হতেযাচ্ছে। অনেক চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত সুযোগে মিলেছে পছন্দের ইউনিভার্সিটিতে পড়ার। এসেছে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় রাতে সব ক্লাসমেইটরা মিলে পার্টি করছিল। সারাও ছিল সেখানে। ঘড়ির কাঁটা বারোর ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে বেশ আগেই। দেখা হয়ে গেল এক পুরুষ ক্লাসমেইটের সাথে। ছেলেটাকে আগে কখনো না দেখলেও মাঝে মাঝে অনলাইনে কথা হয়েছে। কিছুক্ষন গল্প গুজবের পর ছেলেটা প্রস্তাব দিল, “চলো, কিছু ড্রিংক করা যাক”। মাথা নেড়ে সায় জানালো সারা,“ভালো বলেছো,গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে”। ছেলেটা গ্লাসে ড্রিংক ঢেলে দিল। সারা চুমুক দিল গ্লাসে। তারপর আর কিছুই মনে নেই…

নয় ঘন্টা পর যখন জ্ঞান ফিরলো সারা নিজেকে আবিষ্কার করল অপরিচিত এক বিছানায়। মাথাটা ঝিম ঝিম করছিলো, গায়ে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। চুলগুলো এলোমেলো। বিছানার পাশে চেয়ারে বসে আছে একটা ছেলে। এই ছেলেটাই গত রাতে ওর গ্লাসে মদ ঢেলে দিয়েছিলো, মনে পড়লো সারা। স্থানীয় একটা হাসপাতালে মেডিক্যাল চেকআপের রিপোর্ট থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল, সারাকে ধর্ষণ করা হয়েছে’।[১]

ইউরোপ-অ্যামেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এরকম ঘটনা খুবই কমন। ধর্ষণ ইউরোপ-অ্যামেরিকার শিক্ষার্থীদের কাছে অতি সাধারণ ঘটনা। বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়া অনেক মানুষ তৈরি করছে সত্য, কিন্তু সেই সাথে তৈরি করছে অনেক ধর্ষক আর তার চেয়ে বেশি ধর্ষিতা। অ্যামেরিকার স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস গুলোই নারীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে অনিরাপদ ক্যাম্পাস ।

কথাগুলো অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে তবে আশা কিছু পরিসংখ্যান অবস্থার ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করবে –

#   এমন  ছয়লাখ তিয়াত্তর হাজার  শিক্ষার্থী যারা এ মুহূর্তে আমেরিকার কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন তাঁরা জীবনে অন্তত একবার   ধর্ষণের শিকার হয়েছেন[২]।

#  প্রতি ২১ ঘন্টায় আমেরিকার কোন না কোন কলেজের ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে [৩]।

#  প্রতি ১২ জন কলেজেগামী পুরুষ  শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জন ধর্ষণের সাথে জড়িত[৪] ।

#  ইংল্যান্ডের প্রতি তিনজন মহিলা শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন  তাঁর নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ধর্ষণের  শিকার হয় [৫]।

#   আন্ডারগ্র্যাড লেভেলের অর্ধেক মহিলা শিক্ষার্থী  জানিয়েছেন তারা  প্রত্যেকেই এমন কাউকে চিনেন যারা  তাদের নিজেদের  ক্যাম্পাসেই নিজেদের বন্ধুদের  দ্বারা  ধর্ষণের শিকার হয়েছে [৬]।

# প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়, ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে এক ভাষণে বারাক ওবামা বলে – পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অ্যামেরিকান কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে প্রতি ৫ জন নারী শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জন ধর্ষিত হয়েছেন [৭]।

“We know the numbers: one in five of every one of those young women who is dropped off for that first day of school, before they finish school, will be assaulted, will be assaulted in her college years.”

–Vice President Biden, remarks on the release of a White House report on sexual assault, April 29, 2014 [৮]

ফার্স্ট  ইয়ারের ফ্রেশ স্টুডেন্টদের জন্য নবীনবরণ দিন থেকে শুরু করে থ্যাংকসগিভিংডে পর্যন্ত এই ছয় সপ্তাহ সবচেয়ে ভয়াবহ । এই সময় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাদের সংগ্রাম করতে হয় । সেই সাথে সিনিয়রদের “দাদাগিরি” ফলানোতো আছেই ।

Association of American Universities এর নতুন প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়,গ্র্যাজুয়েশান কোর্স শেষ করার পূর্বে প্রতি চার জন্য নারীর মধ্যে একজন ধর্ষণের শিকার হন । এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে গত বসন্তে ২৭ টি টপ ইউনিভার্সিটির প্রায় দেড়লাখ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে ।

এই  প্রতিবেদনে আমেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী নির্যাতনের যে চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা  ২০১৪ সালের আগের প্রতিবেদন (1 in a 5 stats, এই প্রতিবেদন দেখেই ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য  প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন গঠন করেছিল – white house task force to protect students from sexual assault  ) থেকে অনেক ভয়াবহ .

White house task force এর প্রথম রিপোর্টে (not alone) অবশ্য বলা হয়েছিল প্রতি চার জন নারী শিক্ষার্থীর মধ্যে তিন জন ক্যাম্পাসে থাকাকালীন যৌন নির্যাতনের শিকার হন । প্রায় ৮৪ শতাংশ  ক্ষেত্রে ধর্ষক ভিক্টিমের পরিচিত থাকে । বেশীর ভাগক্ষেত্রেই  ধর্ষণের ঘটনা ঘটায় ভিক্টিমের বন্ধু, ক্লাসমেট , এক্স- বয়ফ্রেন্ড অথবা পরিচিত অন্য কেউ । প্রতিবেদনে আরো দেখা যায় – ধর্ষণের সময় অধিকাংশ ভিক্টিম স্বাভাবিক সচেতন অবস্থায় ছিলেন না – তারা হয় মাতাল ছিলেন বা কোন হার্ড ড্রাগস নিয়েছিলেন  অথবা কোন ভাবে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিলেন [৯]।

সারা তার ধর্ষকের  বিরুদ্ধে কোন চার্জ আনেননি এবং  জনসম্মুখে প্রকাশও করেননি ঠিক কে তাকে ধর্ষণ করেছিল । আমেরিকাতে ধর্ষণের ঘটনা চেপে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না । American Civil Liberties Union   এর রিপোর্ট অনুযায়ী ৯৫ শতাংশ ধর্ষণের শতাংশ ধর্ষণের ঘটনার পর কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়না [১০,১১]।

এক্সপার্টদের মতে এর কারণ হতে পারে  ভিক্টিমের মানসম্মান হারানোর ভয় , ধর্ষকদের বিচার না করা বা তাদের প্রতি সমাজের সহানুভূতি । ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট করা হলেও , বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষকের গায়ে ফুলের টোকাটা পর্যন্ত পড়ে না আইনী এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ।   বোঝেন আমেরিকার  এই সমাজ কতটা পচে গেছে ।

অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে তা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে । তবে  সেগুলো খুব একটা ফলপ্রসু হচ্ছে না  কলেজ,ইউনিভার্সটির কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে ।

u.s. senate subcommittee on financial & contracting oversight স্বীকার করেছে  ৪৪০টি কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি স্যাম্পলের মধ্যে  ৪০ শতাংশেরও বেশি কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি গত ৫ বছরে একটা যৌন নিপীড়নের ঘটনার তদন্তও ভালোমতো করেনি ।

বেশিরভাগ  কলেজ , ইউনিভার্সটি কর্তৃপক্ষ  চাচ্ছে না তাদের ক্যাম্পাসে ঘটা নারী নির্যাতনের ঘটনা গুলো বের হয়ে আসুক । কে আর নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে চায় ? কেই বা চাইবে  নিজেদের গোমর ফাঁস করে দিয়ে সরকার বা কোন দাতব্য সংস্থার ফান্ডিং  হারাতে । বাধ্য হয়ে সারা’র  মতো শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো চেষ্টা করছেন ক্যাম্পাসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য । বিভিন্ন সোসাইটি বা মুভমেন্টের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করছেন ধর্ষণের বিরুদ্ধে সবাইকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার [১২]।

সুবহানআল্লাহ !  উপরে যতই মহান , সভ্য , উদার , মানবিক বলে মনে হোক না কেন  এই হল পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতার আসল চেহারা ।   স্বাধীনতা আর নারীর সমানাধিকার বলে চিল্লাপাল্লা করে   গলা ফাটিয়ে ফেললেও দিন শেষে নারীর ইজ্জতের চেয়ে তাদের কাছে ভাবমূর্তি আর ডলারের মূল্য অনেক  বেশি। মদীনাতে একজন মুসলিম মহিলার সম্মানের জন্য মহানবী (সাঃ) ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে ফেলেছিলেন প্রায় । মাত্র একজন মহিলার জন্য । অথচ এই ইসলামকে আজ পুরো বিশ্ব জুড়ে  খুব সুপরিকল্পিত ভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হচ্ছে  নারী স্বাধীনতার হন্তারক হিসেবে । বোরখার আড়ালে মুসলিমরা নারীদের  ঘরের চার দেয়ালে আটকে রাখে ,  সম্পত্তিতে নারীদের সমানাধিকার দেয় না , মুসলিমরা সেক্স  স্টারভড  ব্লা ব্লা ব্লা ……

 

#ডাবলস্ট্যান্ডার্ড

চলবে ইনশা আল্লাহ ………

প্রথম দুই পর্বের লিংক –

মুখোশ উন্মোচনঃ প্রথম পর্ব-  http://bit.ly/2rniAco

মুখোশ উন্মোচনঃ দ্বিতীয় পর্ব – http://bit.ly/2DQZGxg

রেফারেন্সঃ

[১]One of the most dangerous places for women in America -http://cnb.cx/2Dren8S

[২] http://bit.ly/K25kz6

[৩] The Culture of Rape on College Campuses –http://bit.ly/2AMp4Rt

[৪] CAMPUS SEXUAL VIOLENCE: STUDENT RIGHTS, UNIVERSITY RESPONSIBILITIES, & LEGAL LIABILITY PURSUANT TO THE CLERY ACT & TITLE IX – http://bit.ly/2mempuM

[৫] One in three UK female students sexually assaulted or abused on campus -http://bit.ly/1sx4HCR

[৬] One in three UK female students sexually assaulted or abused on campus -http://bit.ly/1sx4HCR

[৭] Women and Girls – http://bit.ly/2CgN3wX

[৮] One in five women in college sexually assaulted: an update on this statistic –http://wapo.st/2DPbvDS

[৯] Not Alone Report, White House Task Force to Protect Students from Sexual

Assault, 2014 – http://bit.ly/2lkEJSl

[১০] One of the most dangerous places for women in America -http://cnb.cx/2Dren8S

[১১] New Report Shows 95% of Campus Rapes Go Unreported -http://bit.ly/2Ch0afa

[১২] One of the most dangerous places for women in America- http://cnb.cx/2Dren8S

 

শেয়ার করুনঃ