বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

গভীর হাওয়ার রাত ছিল সেদিন । গভীর হাওয়ার রাত ।  আকাশে বিশাল একটা

রুপালী চাঁদ উঠেছিল, কাসার থালার মত গোল । এতবড় চাঁদ আমি আমার জীবনে কখনো  দেখিনি । চাঁদের আলো ধুয়ে দিচ্ছিল চারপাশটাকে। ভার্সিটির  মসজিদটা এমনিতেই সুন্দর । তারওপর এই অপার্থিব  চাঁদের আলোয় লেকের পাশ থেকে মসজিদটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল আমি জান্নাতের কোন প্রাসাদ দেখছি ।

গভীর হাওয়া পামগাছের শাখাগুলোতে দাপাদাপি করছিল । বাতাস আর পাম/নারিকেল গাছের কম্বিনেশন আমাকে চিরকাল উদাস করে তোলে ।  এই রকম পরিবেশে যদি  নিকাবের ভেতর থেকে কুচকুচে কালো একজোড়া চোখ আমার মনের জানালায় উঁকি দিয়ে যায় তাহলে আমার আর কি দোষ ?   হেটার্‌সরা আবার বলবে আমি বিয়ে পাগল  !

ভার্সিটিতে থাকতে এরকম বেশ কিছু  উত্থাল পাতাল   জোস্ন্যা রাত চুটিয়ে উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছিলেন আল্লাহ্‌ সুবঃ । সেই রাত গুলো কোনদিন ভুলতে পারবো কিনা সন্দেহ ।

ভার্সিটির  লাইফটা বিশেষ করে হল লাইফটা মন্দ ছিলনা ।  ফেসবুকিং করার  ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস করা, ক্লাসে বসে ঝিমানো, শর্টপিচ ক্রিকেটে চিতার ক্ষিপ্রতায় ফিল্ডিং করা, মসজিদের বারন্দায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া … শুধু চিল আর চিল ।বাবামার নজরদারি যেহেতু  ছিলনা কাজেই ছোটবেলা থেকে মেনে আসা সান্ধ্য আইনের থোড়াই কেয়ার করে  ইচ্ছেমতো রাত বিরাতে  ঘুরে বেড়ানো যেত ।  আহারে! সেই দিনগুলা , আহা!

তো এই পুরো সেমিস্টার জুড়ে পড়াশোনার সঙ্গে রংবাজি করার ফলে সেমিস্টারের শেষ  সপ্তাহে  আর পরীক্ষা চলাকালীস সময়  পুরো নরক নেমে আসতো । প্রত্যেকটা কোর্সের বিশাল বিশাল সিলেবাস   দুই,একদিনের বন্ধে শেষ করতে  চোখের জল আর  নাকের জল এক হয়ে যেত । নির্ঘুম রাত কাটিয়ে খাটি গাঁজাখোরের চোখের মত রক্তলাল চোখ নিয়ে পোলাপান হাজির হতো পরীক্ষার হলে ।

পরীক্ষা শেষে এক একজন  ঝড়ে বিদ্ধস্ত কাকের চেহারা নিয়ে ফিরতো রুমে । পরীক্ষা খারাপ হলে সেই সঙ্গে থাকতো হতাশা । অমানুষিক পরিশ্রম আর মাত্রাছাড়া টেনশানে উত্তেজিত স্নায়ু  শিথিল করার জন্য এক একজন বেছে নিত এক এক পদ্ধতি । কেউ মড়ার মতো  ঘুমাতো,কেউ গান শুনত,মুভি দেখতো,কেউ আড্ডা দিত আর কেউবা পর্ন দেখতো,মাস্টারবেট করতো ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে  তেমন কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও অন্য দেশের জন্য আছে । আমেরিকার কয়েকটি কলেজে চালানো জরিপ অনুসারে শতকরা ৮৭ জন ছাত্র এবং শতকরা ৩১ জন ছাত্রী স্বীকার করেছেন তারা পর্ন দেখেন । [http://bit.ly/2f0RrFC ]

মানসিক ধকল সামলানোর জন্য অনেকেই  পর্ন দেখে  বা মাস্টারবেট  করে । কিছু চাকুরীজীবিকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন তারা পর্ন দেখেন বা মাস্টারবেট করেন । তাদের উত্তর ছিল কাজের ধকল সামলানোর জন্য ।

অদ্ভূত একটা দেশ আমেরিকা । যারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী নিরীহ মানুষ মেরে, যুদ্ধবাজী করে নিজেদের  আবার দাবী করে মানবতার অতন্দ্র প্রহরী । এই আমেরিকাতেই আজিব একটা বুথ খোলা হল একবার  । নাম দেওয়া হল মাস্টারবেট বুথ । এই বুথে আছে একটা হাইস্পীড ইন্টারনেট সহ একটা ল্যাপটপ এর আরামদায়ক একটা চেয়ার।  উদ্দেশ্যঃ  কাজের চাপে বিদ্ধস্ত মানুষ এখানে এসে প্রেসার রিলিজ করবে ।  [http://on.mash.to/1OTLgNw]

এটা মনে হওয়া  স্বাভাবিক যে মাস্টারবেট বা পর্নমুভি দেখা মানসিক ধকল কাটিয়ে ওঠার জন্য বড় সহায়ক । কিন্তু আসলে তা নয় । এগুলো সামান্য সময়ের জন্য মেন্টাল স্ট্রেস কে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে  [ তা সে গাঁজা, ইয়াবা কিংবা  হিরোইনও পারে ]  কিন্তু  কিছু সময় পরেই মেন্টাল স্ট্রেস ফিরে আসে আরো শতগুনে শক্তিশালী হয়ে । যেমন –

পর্নোগ্রাফি ও হতাশা :

আসলে ব্যাপারটা অনেকটা মুরগি আগে না ডিম আগে টাইপের।কারো জীবনে ডিপ্রেসান পর্নের জনক আবার কারো ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টা।পর্ন দেখার ফলে শুধুমাত্র কিছুক্ষণের জন্য একঘেয়েমি,বিষণ্ণতা,হতাশা,ভয়,ক্রোধ ইত্যাদির চেহারাকে আড়াল করা যায় কিন্তু কোন চূড়ান্ত সমাধান আসে না।এটা ভোক্তা নিজেও জানে।

অন্যান্য নেশার মত পর্নের নেশাও আমাদের ব্রেইনে ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দেয় ও আমাদের পরিতৃপ্ত বোধ করায়।মাত্রাতিরিক্ত ডোপামিন নির্গমন মূলত পরিতৃপ্তির স্বাভাবিক অনুভুতিকে নষ্ট করে ও ধাবিত করে হার্ডকোর পর্নের দিকে।আমাদের পরিবার,বন্ধুবান্ধব ও সঙ্গীর সাথে মেলামেশার স্বাভাবিক আগ্রহকে কমিয়ে আনে।

মানসিক দুশ্চিন্তা :

পর্নের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে।প্রকৃত ভালবাসা থেকে একসময় ব্যাক্তি নিজেকে বঞ্চিত করে।এ আসক্তির ফলে ধীরে ধীরে নিজের আত্মবিশ্বাস লঘু হতে থাকে বা ভেতর থেকে মন আরও অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে।পর্নের সাথে জড়িত অপরাধবোধ বা লজ্জার কারণে ব্যাক্তি নিজেকে দুর্বলভাবে আত্মমূল্যায়ন করতে উদ্বুদ্ধ হয়।নিজের কাছে নিজের মর্যাদা যদি ছোট হয়ে আসে তাহলে পর্নের মাধ্যমে তুমি  দিনের পর দিন তা আরও ছোট করছ।এই টানেলের কোন শেষ মাথা নেই যতক্ষণ না তুমি নিজে থেকে ইতি টানার চেষ্টা শুরু করবে।

বিচ্ছিন্নতা:

আগেও বলেছি পর্নের ফলে ব্যাক্তি অসামাজিক হয়ে উঠতে থাকে।আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের সাথে হ্যাং আউট করার স্পৃহা কমে যায়।তার চেয়েও ভয়ংকর হল সঙ্গীর সাথে ইন্টিমেট হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে যায়।কারণ স্বাভাবিকটা যে তাকে আর আনন্দ দেয় না।অনেক ফ্যামিলি এভাবেই ভেঙ্গে চলছে।
[http://bit.ly/1PEuC4u ]

পড়া উচিত চোরাবালি সিরিজ [http://bit.ly/2dzgf4I , http://bit.ly/2diRZBJ , http://bit.ly/2h4sMAb  ]

ভয়াবহ একটা ব্যাপার হলো পর্নআসক্তির কারনে একাডেমিক রেজাল্টের বারোটা বেজে যায় ।

২০১৫ সালের এক গবেষণাও এরকমটাই বলে । গবেষকরা বলেন  টিনেজারদের পর্ন দেখা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ছয় মাসের মধ্যেই তারা পরীক্ষায় খুবই খারাপ রেজাল্ট করা শুরু করে ।

২০০৮ এ জার্মানির একদল গবেষক বলেন পর্নআসক্তি কলেজ ছাত্রদের একাডেমিক পারফরম্যান্সের উন্নয়নে বড় একটা বাঁধা ।  পর্নমুভি দেখে এমন ছাত্ররা খুব একটা হোম ওয়ার্ক করতে চায়না, ক্লাস পালায়, ঠিকমতো এসাইন্মেন্ট জমা দেয় না । আসলে কেউ যদি পর্ন বা মাস্টারবেশনে আসক্ত হয় তাহলে তাকে অনেক সময় এবং এনার্জি ব্যয় করতে হয় এই অকাম কুকাম গুলো করতে।এগুলো করার পরে আবার খারাপ লাগে । অন্তরের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়। কোন কাজ করতে ইচ্ছে করে না । শুয়ে বসে, ঝিমিয়ে, ঘুমিয়ে দিন পার করতে ইচ্ছে করে ।

পর্ন দেখার সময় ব্রেইনে খুব শক্তিশালী কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। কেউ এতে আসক্ত হলে তার সব মনযোগ এতেই কেন্দ্রীভূত হয়; কবে ম্যাথ এক্সাম হবে বা  কবে কোন  এসাইন্মেন্ট জমা দিতে হবে তার কিছুই মনে থাকে না । তার   পক্ষে পড়াশোনায় মনযোগ দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না । মাথায় পর্নমুভির দৃশ্যগুলো ঘুরতে থাকে । পর্নমুভির ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকতেই সে পছন্দ করে , পড়াশোনা তার কাছে   কাঠখোট্টা, নীরস মনে হয় ।  ফলাফল- পরীক্ষায় ডাব্বু মারা ।

[http://bit.ly/2f0RrFC]

ছাত্রজীবন অসাধারন একটা সময় । এর প্রত্যেকটা সময় চুটিয়ে উপভোগ করা উচিত। ভাই আমার, অন্ধকার রুমে একা একা বসে পর্ন দেখে/ মাস্টারবেট করে হতাশা আর অস্থিরতায় জীবনটা দুর্বিষহ করে তুলোনা । রুম থেকে একটু বের হও তুমি  ।  দেখ কত সুন্দর একটা পৃথিবী তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে ।  বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দাও, দলবেঁধে  ঘুরতে যাও , সবুজ ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটো, শুয়ে থেকে আকাশ দেখ, বৃষ্টিতে ভেজো, মাঠে খেলাধুলা করো, সাইক্লিং করো, দৌড়াও। খুব বেশী হতাশ লাগলে, মন খারাপ হলে মসজিদে যাও । তাক থেকে কুর’আনের একটা কপি  তুলে নাও। যেকোন পেইজ বের করে পড়তে শুরু কর, দেখবে হতাশা,মন খারাপ কোথায় পালিয়ে যাবে ! স্রেফ মসজিদে বসে থাকলেও দেখবে মন ভালো হয়ে যাবে ।

 

নিয়মিত পড়াশোনা তোমাকে করতে হবে এটা বলছি না  । ক্লাসে ফেসবুকিং করার মাঝে মাঝে   লেকচারের দিকে একটা কান খোলা রেখ । ইচ্ছে হলে মাঝে মাঝে লেকচার খাতায় তুলে রেখ । উইকএন্ডের একটা দিন বা ক্লাস টেস্টের আগে টপিক গুলোতে চোখ বুলিয়ে রাখো । যেই বন্ধুর কাছে তুমি পরীক্ষার আগের রাতে পড়া বুঝতে যাও তার কাছে পরীক্ষার আগের রাতে না যেয়ে উইকএন্ড গুলোতে যাও । এই ছোট ছোট কাজগুলোই তোমাকে অনেক এগিয়ে রাখবে ।  ফাইনাল পরীক্ষায় আর চাপ পড়বে না । তোমাকে অমানুষিক পরিশ্রমও করতে হবেনা । হতাশাও আসবে  না ইনশা আল্লাহ্‌। উত্তেজিত স্নায়ুকে শিথিল করার জন্য অকাম,কুকামও করতে হবে না ।

ভালো একটা রেজাল্ট হবে । বের হয়ে খুব ভালো একটা জব পাবে ইনশা আল্লাহ্‌ । তারপর মন মতো একজনকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে  থাকবে ।

…… ইয়া রব্ব! তুমি আমাদেরকে ইহকালীন যাবতীয় সুখ-শান্তি দান কর আর পরকালীন যাবতীয় সুখ শান্তি প্রদান কর । আর দোযখের আগুন থেকে আমাদের রক্ষা কর ।

[লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত]

শেয়ার করুনঃ