আজকের মতো অসভ্য অশ্লীল কলুষিত বাতাস হয়তো পৃথিবীর অজস্র বছরের ইতিহাসে আর কখনো প্রবাহিত হয়নি । পর্নমুভির কথা ছেড়েই দিলাম [১]। টিভির কমার্শিয়াল , বিলবোর্ড, ম্যাগাজিন , মুভি , মিউজিক , আইটেম সং , সাহিত্য , কবিতা সবকিছুই আজ হাইপার সেক্সুয়ালাইজড । সব খানেই কেবল নারীকে পন্য করা , নারীর শরীরকে পূঁজি করা । এই ভয়াবহ অশ্লীল, অসুস্থ সভ্যতার পতাকা বহন করে চলেছে যে পাশ্চাত্য সমাজ তার অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ তা অনেকেই কল্পনাও করতে পারবেননা । শয়তানের বেহেশতের এই কুৎসিত দিকগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরা আমরা আমাদের নৈতিক এবং ঈমানী দায়িত্ব মনে করি ।

আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় থেকে শুরু করে প্রায় সকল স্তরের মানুষের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে অন্ধভাবে পাশ্চাত্যের সবকিছুই অনুকরণ এবং অনুসরণ করা । এই প্রবণতা এবং প্র্যাক্টিস আমাদের যে একটা গভীর জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এই উপলব্ধিটা আমাদের যতো তাড়াতাড়ি হবে আমাদের জন্য তা ততই মঙ্গলজনক ।

পুঁজিবাদী এই শয়তানী সভ্যতা ছোঁ মেরে পাশ্চাত্যের ছেলেমেয়েদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে । পাশ্চাত্যের ছেলেমেয়েরা এক দমকা ঝড়ে হারিয়ে ফেলেছে নানা রঙ , রূপ, রস আর গন্ধে ভরা শৈশবকে ।বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে সাগর কাটা, বনে বাদাড়ে পাহাড়ে দাপিয়ে বেড়ানো তাদেরকে আর আগের মতো টানেনা । আজ তারা বুঁদ হয়ে থাকে পর্নমুভি , সেক্স আর মাদকের নেশায় । অল্প বয়সেই নারী পুরুষের দৈহিক রসায়ন জেনে ফেলাতে নিষ্পাপ , নির্ভাবনাময় শৈশব কৈশোরে আজ এসেছে জটিলতা , জমেছে অবসাদ আর গ্লানির পাহাড় । কতশত কিশোরীদের করতে হয়েছে গর্ভপাত , কত অবুঝ শিশু জন্মের ছাড়পত্র না পেয়ে জায়গা করে নিয়েছে রাস্তার ডাস্টবিন আর পাব্লিক টয়লেটের কমোডে।

পাশ্চাত্যের টিনেজারদের চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী oral sex কোন সেক্সই না। আবার, টেক্সট ম্যাসেজ বা ফেসবুকে ‘উল্টাপাল্টা’ ছবি পাঠানও তেমন আহামরি কোন বিষয় না। অনেক ছেলেই নিয়মিত পর্ন দেখে এবং অনলাইনের সেই ভণ্ড রঙিন জগতে যা কিছু দেখে তা নিজেদের গার্লফ্রেন্ডদের মাধ্যমে উপভোগ করার চেষ্টা করে। লেসবিয়ানিজমও অনেকটা পপুলার হয়ে উঠেছে এসবের মাধ্যমে। একবিংশ শতাব্দীতে সেক্স এডুকেশান পেতে হলে বাবা-মা বা শিক্ষকদের শরণাপন্ন হতে হয় না। দুই চারটা ক্লিকই যথেষ্ট।কিন্তু এইগুলা যে কতোটা বিকৃত ও ভিত্তিহীন ধারনার জন্ম দেয় তা তারা প্রাথমিকভাবে আঁচ করতে পারে না।এ ধরনের কার্যকলাপের গ্লানি সারাজীবন মানসিক ও শারীরিক দুই দিক দিয়েই তাড়া করে বেড়াতে পারে। পূর্বের তুলনায় এখন টিনেজার মেয়েদের উপর সেক্সুয়াল প্রেসার অনেক । এখন মেয়েরা খুব অল্প বয়সেই সেক্সুয়ালি ম্যাচিউর হচ্ছে। এর পেছনেও অনেক কারণ আছে।

প্যারেন্টিং এক্সপার্ট মাইকেল গ্রোস এর মতে, “বাবা-মার সাহচর্যে না থাকলে খুব তাড়াতাড়ি কৈশোরে পা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সেক্সুয়াল অ্যাক্টিভিটিতে জড়িয়ে পড়ার চান্সও বৃদ্ধি পায়।” গত ৬০ বছরে ভার্জিনিটি হারানোর বয়স ১৯ থেকে নেমে ১৬ তে এসেছে।“ডলি ম্যাগাজিন” এর তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালে ৫৬% কিশোরকিশোরী মাত্র ১৩-১৫ বছর বয়সেই নিজেদের দেহকে তুলে দিয়েছে অন্যের হাতে। অস্ট্রেলিয়ান এক গবেষণায় দেখা যায়, মেয়েদের জীবনের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা হয়েছে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে।গড় বয়স ছিল ১৪ এর মত।

Australian Research Centre in Sex,Health and Society এর ডিরেক্টার অ্যান মিশেল বলেন oral sex এর হার ক্রমাগত বাড়ছে।২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী,বছরে একাধিক(৩ বা ৪) যৌনসঙ্গীকে নিয়ে যৌনতায় মেতে ওঠার সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণে।সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল অনাকাঙ্ক্ষিত সেক্সের সংখ্যাও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে যা নারীদের জীবনে লম্বা সময়ের জন্য প্রভাব ফেলছে। তাদের যৌনতা ও ব্যাক্তিত্ত্বে ফাটল ধরছে।অ্যান মিশেল মনে করেন এসবের জন্য মূলত মদ্যপান, ড্রাগস কিংবা সঙ্গীর পক্ষ হতে প্রবল চাপই দায়ী । তিনি আরও বলেন,“মদ্যপানের প্রচলন আগের চেয়ে অনেক বেশি আর এর সাথে যৌন কার্যকলাপের যোগসূত্র বেশ পাকাপোক্ত।”

আরও হতাশাজনক হল যেসব রোগজীবাণু সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স এর মাধ্যমে ছড়ায় সেগুলোর হারও পূর্বের সীমানা ডিঙ্গিয়ে শিকার করছে ১৫-১৯ বছরের তরতাজা প্রাণগুলোকে।২০০৮ সালে দেখা যায় যে ২৫% এর কিছু বেশি কিশোর-কিশোরী ‘ক্ল্যামিডিয়া’ নামক রোগে আক্রান্ত হয় যাদের অধিকাংশেরই বয়স ১৫ থেকে ১৯ এর মধ্যে ছিল।ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ৩ গুন হারে ডায়াগনোস করা হয়েছে। এগুলো তো কেবল পরিসংখ্যান, বাস্তবতা আরও ক্ষতবিক্ষত ।

টিচাররা এসব ব্যাপার অহরহ ঘটতে দেখছেন স্কুল কলেজগুলোতে। একজন বলেছেন,“আমাদের সময় আমরা অনেক কষ্টে লুকিয়ে সিগারেট টানতাম, যেন কেউ দেখতে না পায়।আর এখন তো ওরাল সেক্স ছেলেমেয়েদের কাছে এর চেয়েও সস্তা হয়ে গেছে।”

১৬ বছর বয়সী অ্যানিদের চোখের সামনে হরহামেশাই এ ধরনের নোংরামি ঘটে চলছে।পাশ্চাত্য সভ্যতায় এগুলো নোংরামি নয় বরং নর্ম বা ট্রেন্ড বা কালচার। নিজেদের কুমারিত্ত্ব হারানোর আগেই নিজেদের মূল্যবোধ হারাচ্ছে হুজুগে মেতে ওঠা এই তরুণ-তরুণীরা। আগে একসময় যারা প্রেম করত তারা অধীর আগ্রহে প্রিয়জনের কণ্ঠ শোনার জন্য ফোনের পাশে বসে থাকত।খেয়াল রাখত কেউ যাতে তাদের এই অবস্থায় ধরে না ফেলে।আজকালকার টিনেজারদের কাছে ওগুলো শুধুই মান্ধাতার আমলের গপ্প।

ফেসবুক,টুইটার,ই-মেইলে তারা কখন কী করছে,কাদের সাথে কি চ্যাট করছে বাবা-মার পক্ষে এতকিছু চেক করা বা মনিটর করা সম্ভব হয় না। ইদানিং অনলাইনে ফ্লার্ট করার চলটা খুব পপুলার টিনদের মাঝে। তারা এতোটাই দিশেহারা হয়ে যায় যে নিজেদের বিবেককে খুব কমই কাজে লাগায়। সম্পূর্ণ অচেনা ও অজানা মানুষের সাথে নিজেদের পার্সোনাল ইনফো ও ফটো শেয়ার করে। অনেক মেয়েরাই এইভাবে অপ্রত্যাশিত যৌন হয়রানির শিকার হয়। উদ্ভট সব ওয়েবসাইট ও অনলাইন গেইমস তাদের চিন্তা-শক্তিকে নামিয়ে আনে পাশবিক পর্যায়ে।

বাচ্চারা ম্যাচিউর হওয়ার আগেই আবেগে মত্ত হয়ে এমন সব করে যার জন্য পরবর্তীতে আফসোস করতে হয়।সাধারণত ফটকা ছেলেরা অনলাইনে মেয়েদের উরাধুরা ছবি পাঠাতে বলে।এই বয়সে অনেক মেয়েই আত্মসম্মানের চেয়ে নিজেদের অসুস্থ উদ্দীপনাকেই প্রাধান্য দেয়। বয়সটা যদি ৭ বা ৮ এ নেমে আসে তাহলে আর বলার কিছু থাকে না। এরা কেনো জানি ওই ইতরদের হাতের পুতুলে পরিণত হয় এবং স্ক্রিনের অপর প্রান্তে থাকা ওই নরপশুদের জন্য প্রায় সব করতে প্রস্তুত থাকে।

রেবেকা নামের এক কিশোরী বললো,“একবার আমি ট্রেইনে বসেছিলাম। তখন ব্লুটুথে একটি মেয়ের ছবি পাই। মেয়েটির দেহে কোন কাপড় ছিল না। তার চেহারা বোঝা যাচ্ছিলো না,কিন্তু আমি তাকে চিনতে পেরেছি। সে তার এই ছবিটা একটা ছেলেকে পাঠিয়ে ছিল। তারপর তার থেকে অন্যদের হাতে ছড়াতে থাকে।”

এক জরিপে দেখা গিয়েছে যে, ৯২% ছেলে ১৬ বছর বয়সে পর্নোগ্রাফির জগতে ঢুকেছে । আর পর্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের পপুলারিটি বাড়ানোর জন্য আরও হার্ডকোর উপাদান যোগ করছে নিজেদের “devil shop”এ। এখন এমনসব ক্যাটাগরির দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করছে যেগুলা অত্যন্ত বর্বর। শারীরিক বা মৌখিক সব প্রকার aggression এগুলোর অংশ। নারীদের রীতিমত যাচ্ছেতাই হিসেবে পেশ করা হয়। এমনকি পর্নস্টাররাও বেশি পয়সার লোভে বা কখনো বাধ্য হয়ে এই ধরনের বেহুদাপনায় শামিল হয়। অনেক ছেলের জন্যই পর্ন মুভিই হল একমাত্র সেক্স এডুকেশান।

পর্ন  তাদের মস্তিষ্ককে ড্রাগের মত কাজ করে। এক অবাস্তব ও নোংরা ফ্যান্টাসির জগত তৈরি করতে বাধ্য করে। নিজেদের স্ত্রী বা গার্লফ্রেণ্ডদের সাথে যখন মিলিত হয় তখন তারা ওই ধরনের কাজ কারবার করতে পছন্দ করে যা অনলাইনে দেখে এসেছে। এতে করে তারা তাদের ক্ষুধা মেটালেও তাদের সঙ্গীরা বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হয়। আবার পর্নের এই দূষিত বাতাস যে মেয়েদের মোরালিটির বিশুদ্ধ অক্সিজেনকে বিষাক্ত করছে না তা কিন্তু না।পর্নে অধিকাংশ সময় যা দেখানো হয় তা ফেইক থাকে।কিন্তু কিছু মেয়ে এসবের মোহে আটকে নিজেদের শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গগুলোকে surgically enhance করার ফালতু কম্পিটিশনে মেতে ওঠে। পর্ন স্টাররা অনেকে আসলে “Botox Barbie”(ব্যাঙ্গার্থে) মানে কৃত্তিম সুন্দরী। দুঃখের বিষয় হল তাদের এই নগ্নতাই আত্মমর্যাদাবিহীন মানুষগুলোর কাছে বেশ উন্মাদনাময়। তাই, আজকের সময়ে একজন টিনেজারকে সুস্থ মানসিকতার স্বস্তিতে পরিতৃপ্ত হতে গেলে প্রতিদিন নিজের ভেতরে গোঙানো পশুটার সাথে লড়াই করে যেতে হয়।

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত এবং পরিমার্জিত)

আরো পড়ুন-

ফ্যান্টাসি কিংডম (প্রথম কিস্তি)- https://goo.gl/zwcD4I
ফ্যান্টাসি কিংডম (দ্বিতীয় কিস্তি)- https://goo.gl/2PbcAX

ফ্যান্টাসি কিংডম (শেষ কিস্তি)- http://bit.ly/2Duu82k

রেফারেন্সঃ

[১] দুইজন বিখ্যাত নিউরোসায়েন্টিস্ট – Ogi Ogas এবং Sai Gaddam ২০১০ সালে গবেষণা করে দেখিয়েছেন এক মিলিয়ন মোস্ট ট্রাফিকড ওয়েবসাইটের মধ্যে ৪২, ৩৩৭ টিই যৌনতা সম্পর্কিত । (Ogi Ogasa and Sai Gaddam, A Billion Wicked Thoughts: What the Internet Tell Us About Sexual Relationships.(New York: Plume, 2011)

[২] “Never before in the history of telecommunications media in the United States has so much indecent (and obscene) material been so easily accessible by so many minors in so many American homes with so few restrictions.” – U.S. Department of Justice ( U.S. Department of Justice. Post Hearing Memorandum of Points and Authorities, at l, ACLU v. Reno, 929 F. Supp. 824, 1996)

[৩] https://fightthenewdrug.org/growing-up-fast-why-12-year-old-girls-are-having-sex-rougher-earlier/

[৪] https://fightthenewdrug.org/teens-tech-porn-sex-what-you-need-to-know-now/

[৫] https://fightthenewdrug.org/sex-before-kissing-15-year-old-girls-dealing-with-boys/

[৬] https://fightthenewdrug.org/how-internet-porn-is-sexually-crippling-teenagers/

শেয়ার করুনঃ