ব্রুস

রাইমাররা বিয়ে করেছিল অল্প বয়সে। প্রেগনেন্সির ব্যাপারে যখন জানতে পারলো, তখনো ওরা বিয়ে করেনি। জ্যানেটের বয়স ছিল ১৯, রনাল্ডের ২০। জ্যানেটের সবসময় শখ ছিল যমজ ছেলের যমজ দুই ভাই ব্রুস আর ব্রায়ানের জন্ম ছিল তাই স্বপ্ন সত্য হবার মতো। খুব তাড়াতাড়ি রনাল্ডের দুটো প্রমোশন হল। ছোট্ট এক রুমের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ওরা মোটামুটি বড়সড় একটা ঘরে আসলো। রাইমারদের জীবন সুন্দর ছিল। গৃহিণী মা, পরিশ্রমী বাবা। আর ঘর আলো করে রাখা যমজ দু’ই ভাই। পিকচার পারফেক্ট।

.

ছন্দপতন হল ছ’মাসের মাথায়। ডায়াপার বদলানোর সময় ব্যাপারটা প্রথম চোখে পড়ে। জ্যানেট ভেবেছিল ভেজা ডায়াপারের কারণেই হয়তো ওরা কাঁদতো। কিন্তু দেখা গেল ডায়াপার ছাড়া রাখলেও কান্না থামছে না। প্রস্রাবের সময় সমস্যা হচ্ছে। ডাক্তার জানালেন ওরা দুজনেই ফিমোসিসে ভুগছে। ফিমোসিস গুরুতর কোন সমস্যা না। মোটামুটি কমন। ছেলে বাচ্চারা ফিমোসিসের কারণে ঠিক মতো প্রস্রাব করতে পারে না। খুব বেশি চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ, ক্ষেত্রে ফিমোসিস আপনাআপনিই ঠিক হয়ে যায় তবে সেইফ সাইডে থাকার জন্য সারকামসিশান, অর্থাৎ খৎনা করানোর পরামর্শ দিলেন ডাক্তার। যমজ দু ভাইয়ের ৭ মাস বয়সে তাদের সারকামসিশানের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

.

সারকামসিশান বা খৎনা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা খুব সহজ একটি প্রক্রিয়া। ৯৯% চেয়েও বেশি ক্ষেত্রে এতে বড় ধরণের কোন ঝামেলা দেখা যায় না। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে বাঁশের চিমটা, ক্ষুর আর কাঁচি দিয়েই খোলা আকাশের নিচে পিড়িতে বসিয়ে সুন্নাতে খৎনা করা হয়। কয়েক মিনিটের মামলা। পশ্চিমা বিশ্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়। তবে এয়ার কন্ডিশনড হসপিটালের অপারেশান থিয়েটারে, স্টেরিয়ালাইযড ক্ল্যাম্প আর স্ক্যালপেল দিয়ে। ব্রুস আর ব্রায়ানের ক্ষেত্রেও যদি এমনটা হত তাহলে হয়তো আমাদের এ গল্প অন্য কোন ভাবে শুরু করতে হতো। কিন্তু ব্রুস আর ব্রায়ানের অপারেশনের দায়িত্বে থাকা ৪৬ বছর বয়েসী জেনারেল প্র্যাক্টিশানার ডাঃ য’ন মারি স্ক্যালপ্যালের বদলে সেই দিন বোভি কটারি মেশিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। এ ডিভাইসে একটি ছোট জেনারেটরের মাধ্যমে একটি সূচের মতো ইলেক্ট্রোডের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হয়। বিদ্যুতের প্রবাহের কারণে ইলেক্ট্রোডে যে তাপ উৎপন্ন হয় তার সাহায্যে “কাটা” হয়। একটা ছুরি বা স্ক্যালপেলের সাথে এ ডিভাইসের পার্থক্য হল, এক্ষেত্রে মূলত পোড়ানোর মাধ্যমে “কাঁটা” হয়। এ পদ্ধতির সুবিধা হল তাপের কারণে সৃষ্ট হওয়া ক্ষতের প্রান্তগুলো পুড়ে যেতে থাকে। যার ফলে রক্তনালীগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্লিডিং তুলনামূলক ভাবে কম হয়। পদ্ধতিটিকে ইলেক্ট্রো-কটারাইযেশান (electrocautery) বলা হয়। মূলত আঁচিল জাতীয় গ্রোথ ফেলে দেয়ার জন্য ইলেক্ট্রোকটারাইযেশান বেশ কার্যকরী মনে করা হয়। কিন্তু সারকামসিশান বা খৎনার ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোকটারাইযেশান ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপদজনক।

.

১৯৬৬ –র এপ্রিলের ঐ সকালে ডাঃ যন মারির হাতের ডিভাইসটি বেশ কয়েকবার ম্যালফাঙ্কশান করে। প্রাথমিকভাবে ইলেক্ট্রো-কটারি মেশিনের হেমোস্ট্যাট ডায়াল ‘মিনিমামে’ সেট করা হয়। কিন্তু প্রথমবার ডাঃ যন মারি চামড়া বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হন। হেমোস্ট্যাট ডায়াল বেশ অনেকদূর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় বার ব্রুসের যৌনাঙ্গের চামড়ার সাথে ইলেক্ট্রোড স্পর্শ করানোর সাথে সাথে রুমের সবাই মাংস পোড়ার শব্দ ও গন্ধ পেলো। ডাক্তাররা বুঝতে পারলেন খুব বড় ধরণের একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। হসপিটালের বেডে ঘুমন্ত ব্রুসের দু’পায়ের মাঝখানে জ্যানেট আর রনাল্ড পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া সুতোর মতো কিছু একটা দেখতে পেল। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে ব্রুসের সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাওয়া লিঙ্গ ধীরে ক্ষয় হতে হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ডাক্তাররা ব্রায়ানের উপর সার্জারি না করার সিদ্ধান্ত নেন। অন্য আরো অনেকের মতোই ব্রায়ানের ফিমোসিসের সমস্যা আপনাআপনিই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু ব্রুসের অপরিমেয় ক্ষতি হয়ে গেল। ১৯৬৬ তে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। রি-কনস্ট্রাকটিভ সার্জারির মাধ্যমে ভুল শুধরে নেয়ারও কোন উপায় ছিলো না।

.

কীভাবে কী হয়ে গেল, জ্যানেট আর রনাল্ড বুঝতে পারছিলো না। যেন মুহূর্তের মাঝে এক ঝড় এসে সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে ফেললো। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করতে বসলে অনেকে সময় জ্যানেটের কাছে অবাস্তব মনে হতো। ব্রুস আর কোনদিনই আর দশটা ছেলের মতো হতে পারবে না, এ চিন্তাটা ভেতরে থেকে ওদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো। ওরা নিজেদের দোষী ভাবছিল।

.

ডঃ জন মানিকে রাইমাররা প্রথম দেখে টিভি পর্দায়। দুর্ঘটনার প্রায় দশ মাস পর। মধ্য ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যায়। This Hour Has Seven Days নামের ক্যানেইডিয়ান ব্রডক্যাস্টিং কর্পোরেশানের জনপ্রিয় টক শো-তে। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার পেছনের শান্ত চোখ দুটোতে বুদ্ধির ছাপ। ডানদিকে সিঁথি করা চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। নীরবতা এবং কথা বলার সময় নিয়ন্ত্রিত আত্মবিশ্বাস ভেতর থেকে ঠিকরে বের হয়। বুদ্ধিমান, ক্যারিযম্যাটিক। মানুষটা খুব ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলেন। দেখে মনে হয় তার উপর আস্থা রাখা যায়।সাইকলোজিস্ট, পিএইচডি, হার্ভার্ড। জ্যানেট আর রনাল্ড রাইমার মনে মনে এমন একজন মানুষকেই খুঁজছিলো। অতিথি হয়ে আসা জন মানি বাল্টিমোরে খোলা জনস হপকিন্স হসপিটালের নতুন একটি ক্লিনিক নিয়ে কথা বলছিলেন। মানির উদ্যোগে খোলা এ ক্লিনিকের উদ্দেশ্য ছিল সার্জারির মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক হিজড়া বা Hermaphrodite/Intersex নারী ও পুরুষদের লিঙ্গ পরিবর্তন করা। এটা ছিল অ্যামেরিকাতে এধরনের প্রথম ক্লিনিক। মানির গবেষণা ছিল মূলত এ বিষয় নিয়েই। রাইমাররা টিভির পর্দায় ডঃ-কে বলতে শুনলেন – “আমাদের কাছে গুরুতর মনে হলেও যেসব মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন, একটা সমাধানের জন্য মরিয়া হয়ে আছে, তাদের জন্য এধরনের সার্জারি সারকামসিশানের চেয়ে এমন আলাদা কিছু না।”

.

নিঃসন্দেহে ডঃ মানির সাক্ষাৎকার অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং ছিল, তবে রাইমারদের জন্য হয়তো পুরো ব্যাপারটা বিচ্ছিন্নভাবে কৌতূহলজনক একটা স্মৃতি হিসেবেই থাকতো। কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষ দিকে প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন দর্শক ডঃ মানিকে এমন একটি প্রশ্ন করে যা রাইমারদের মনোযোগ দিতে বাধ্য করে। প্রশ্নটি ছিল অসম্পূর্ণ যৌনাঙ্গ নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের সম্ভাব্য চিকিৎসার ব্যাপারে। জবাবে মানি বলেন, জনস হপকিন্স ক্লিনিকে সার্জারি এবং হরমোন ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে এধরনের শিশুদের নারী বা পুরুষে পরিণত করা সম্ভব। ডঃ মানি বলছিলেন – কোন শিশু নারী বা পুরুষ হিসেবে জন্ম নিলো কি না, সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ না। শৈশবে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তন করা সম্ভব। কোন ঝামেলা ছাড়াই ছেলে শিশুকে মেয়ে আর মেয়ে শিশুকে ছেলে হিসেবে বড় করা সম্ভব। রাইমাররা ঠিক করলো ওরা ভুল শুধরে নেয়ার চেষ্টা করবে। অনুষ্ঠান শেষ হওয়া মাত্র জ্যানেট ডঃ মানিকে চিঠি লিখতে বসলো। কয়েক মাসের মধ্যে ওরা বাল্টিমোরে জন মানির অফিসে হাজির হল।

.

ব্রেন্ডাঃ

.

ব্রুসের কেইস হিস্ট্রি শোনার পর, ওর ফিযিকাল চেকআপের পর জন মানি পরামর্শ দিলেন ব্রুসকে মেয়ে হিসেবে বড় করার । প্রথমে castration এর মাধ্যমে ব্রুসের শরীর থেকে পুরুষ যৌনাঙ্গের অবশিষ্ট অংশ বাদ দেয়া হবে। কৈশোরের শুরুতে হরমোন ট্রিটমেন্ট নিতে হবে। আর ট্রিটমেন্টের শেষ পর্যায়ে সার্জারি মাধ্যমে ওর শরীরে কৃত্রিম যোনি স্থাপন করা হবে। ও কখনো মা- হতে পারবে না, কিন্তু একজন সাধারণ নারীর মতো যৌন জীবন যাপন করতে পারবে। একজন অসম্পূর্ণ পুরুষের বদলে ও একজন পরিপূর্ণ নারী হতে পারবে। ডঃ মানি রাইমারদের অভয় দিলেন, প্রথম শোনায় যতোটা গুরুতর মনে হয় আসলে ব্যাপারটা তেমন কিছুই না। একজন মানুষ পুরুষ নাকি নারী এটা পাথরে লেখা কিছু না। জন্মসূত্রে একজন মানুষ নারী বা পুরুষ হয়ে জন্মায় না। বরং পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে একজন মানুষ ‘পুরুষ’ অথবা ‘নারী’ হিসেবে বেড়ে ওঠেন। প্রকৃতি না, পরিবেশ একজন মানুষকে ‘পুরুষ’ অথবা ‘নারী’ বানায়। সুতরাং কেউ কোন ধরণের শরীর নিয়ে জন্মাচ্ছেন তার চাইতে মানসিকভাবে কোন লৈঙ্গিক পরিচয় (Gender Identity/Gender Role) সে গ্রহণ করছে, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের প্রথম দুই বছর একজন মানুষের লৈঙ্গিক পরিচয় ফ্লুয়িড বা পরিবর্তনশীল থাকে। এসময়ের মধ্যে একজন মানুষকে ঠিক কীভাবে বড় করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করবে সে নিজেকে নারী হিসেবে চিনবে নাকি পুরুষ হিসেবে। একই কথা খাটে যৌনতার ক্ষেত্রে। কে নারীর প্রতি আর কে পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হবে, এটা পারিপার্শ্বিকতা আর পরিবেশ ঠিক করে দেয়। প্রকৃতি না। তাই ব্রুসকে মেয়ে হিসেবে বড় করা নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। শুধু এটুকু নিশ্চিত করতে হবে, ব্রুস যেন সবসময় নিজেকে একজন মেয়ে হিসেবে চেনে।

ব্রায়ান আর “ব্রেন্ডা”। এসময় ওদের বয়স ৬/৭ এঁর কাছাকাছি।

.

ডঃ মানির তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, তীব্র আত্মবিশ্বাস আর ক্যারিযমার প্রভাব তো ছিলই, সাথে আরো ছিল জনস হপকিন্স আর স্টেইট অফ দি আর্ট ট্রিটমেন্টের নিশ্চয়তা। বিশ্ববিখ্যাত গবেষক ব্যক্তিগতভাবে ব্রুসের কেইস হ্যান্ডেল করছেন, ব্রুস সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসার নিশ্চয়তা পাচ্ছে। মানির কথা না শোনার কোন কারণ উইনিপেগের ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে আসা রনাল্ড আর জ্যানেটের ছিল না। রাইমার দম্পতি যে ব্যাপারটা জানতো না তা হল, যা কিছু জন মানি তাদের বলেছিল তার পুরোটুকুই ছিল অনুমান। অপ্রমাণিত। ডঃ মানি হিজড়াদের উপর করা কিছু অপারেশানের ভিত্তিতে এই উপসংহার টানছিলেন যে স্বাভাবিক অবস্থায় জন্ম নেওয়া একজন ছেলে শিশুকে কোন জটিলতা ছাড়াই মেয়ে হিসেবে বড় করা সম্ভব। এ উপসংহারের মূল ভিত্তি ছিল তার এই বিশ্বাস যে লৈঙ্গিক পরিচয় ও যৌনতা দুটোই পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট নির্ভর। প্রাকৃতিক ভাবে নির্ধারিত, অপরিবর্তনীয় কোন বিষয় না। এটা কেবল হিজড়াদের জন্য না, বরং সব মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দীর্ঘদিন ধরে এ মত প্রচার করলেও বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণের কোন সুযোগ মানি পাচ্ছিলেন না। কারণ কোন বাবা-মাই সুস্থ-স্বাভাবিক সন্তানের ওপর এধরনের পরীক্ষা করার অনুমতি দেবে না। ব্রুস ছিল তাই জন মানির হাইপোথিসিস প্রমাণের পারফেক্ট টেস্ট সাবজেক্ট। দু বছরের কম বয়স। স্বাভাবিক ছেলে সন্তান, দুর্ঘটনার কারণে যার যৌনাঙ্গ নষ্ট হয়ে গেছে। এবং ব্রুসের ছিল একজন আইডেন্টিকাল টুইন। অর্থাৎ বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ে টেস্ট সাবজেক্ট ব্রুসকে, স্বাভাবিক ব্রায়ানের সাথে তুলনা করার সুযোগ ছিল। জন মানির দেওয়া ট্রিটমেন্ট ছিল বিপর্যস্ত রাইমার দম্পতির খড়কুটো ধরে বাচার চেষ্টা। ব্রুস ছিল নিজ থিওরি প্রমাণে মরিয়া জন মানির কল্পনার সোনার হরিণ।

ব্রুস, ১০ বছর বয়সে

.

সোমবার, ৩ জুলাই, ১৯৬৭। বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স হসপিটালে বাইল্যাটারাল অর্কিডেকটমির মাধ্যমে বাইশ মাস বয়েসী ব্রুসের শরীর থেকে অণ্ডকোষ অপসারণ করা হয়। ঠিক হল নিয়মিত চিঠির মাধ্যমে জ্যানেট ডঃ মানিকে ব্রুসের ব্যাপারে আপডেট জানাবে। আর বছরে একবার চেকআপের জন্য বাল্টিমোরে ব্রুসকে নিয়ে যাওয়া হবে। মানি রাইমারদের জানিয়ে দিলেন, এ পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ব্রুস যেন নিজেকে একজন মেয়ে মনে করে বেড়ে ওঠে। ওর জীবনের প্রথম বাইশ মাসের ব্যাপারে দুই যমজকে কিছু না জানানোই ভালো হব। আর হ্যাঁ, ওর একটা নতুন নামের প্রয়োজন হবে। বাড়ি ফিরে তাই জ্যানেট আর রনাল্ড দ্বিতীয়বারের মতো তাদের সন্তানের নামকরণ করলো। ব্রুস পরিণত হল ব্রেন্ডায়।

ব্রুস, ১২ বছর বয়সে

.

ব্রেন্ডার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন থেকে ডঃ মানি তার বক্তব্য, গবেষণা ও বইতে চাঞ্চল্যকর এ কেইসের কথা প্রকাশ করা শুরু করলেন। তবে সংগত কারণেই রাইমারদের পরিচয় প্রকাশ করলেন না। প্রায় রাতারাতি ব্রুস/ব্রেন্ডার কেইসের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। জন মানি প্রচার করা শুরু করলেন – নারী বা পুরুষ হওয়া মানুষের সত্ত্বাগত কোন বৈশিষ্ট্য না। পরিবেশ, প্রেক্ষাপটের দ্বারা একজন মানুষ নারী বা পুরুষ হতে শেখে। আর এর অকাট্য প্রমাণ হল দুই যমজ ভাইয়ের মধ্যে একজন ছেলে হিসেবে এবং অন্যজন সুস্থ সবল মেয়ে হিসেবে বড় হয়ে উঠছে।

.

ব্রুস/ব্রেন্ডার কেইস ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সাইকোলজি, সেক্সোলজি, জেন্ডার স্টাডি ইত্যাদি ডিসিপ্লিনের পাঠ্যবইয়ে এ কেইসের কথা যুক্ত করা হয়। এ কেইস ছিল মানবিক যৌনতা, লিঙ্গ ও মনস্তত্ত্বের ব্যাপারে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচক। এক মাইলফলক। প্রকৃতি বনাম প্রশিক্ষণের (Nature vs Nurture) যুদ্ধে প্রশিক্ষণের বিজয়ের অবিসম্বাদিত প্রমাণ ছিল ব্রুসের সফলভাবে ব্রেন্ডায় পরিণত হওয়া। এ উপসংহার বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানির জন্য এটা ছিল শিশু যৌনতা, লিঙ্গ ও যৌনতার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তার প্রিয় থিওরির প্রমাণ। সমকামী এবং অন্যান্য বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য এ কেইস এবং এর উপসংহার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটের কারণে যদি একজন ছেলে একজন মেয়েতে পরিণত হতে পারে, তাহলে একজন পুরুষ বা নারীর সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে কেন অস্বাভাবিক, বিকৃত বা অসুস্থতা মনে করা হবে? খোদ নারী বা পুরুষ পরিচয়ই যদি পূর্ব-নির্ধারিত না হয়, অপরিবর্তনীয় না হয়, বরং অর্জিত (learned/acquired) হয়, তাহলে কীভাবে যৌনতা পূর্ব নির্ধারিত হতে পারে?

.

অন্যদিকে ফেমিনিস্টদের জন্য এ কেইস গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছিল নারী ও পুরুষের মধ্য মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। ছেলেরা যা পারে, মেয়েরাও তাই পারে। ছেলেরা যতোটুকু পারে ততোটুকুই পারে। তাই কিছু কাজে, যেমন ম্যাথম্যাটিকস বা শিল্পে (art), ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে দক্ষ – এ কথার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। পুরুষ ম্যাথম্যাটিশিয়ানদের সমান সংখ্যক নারী ম্যাথম্যাটিশিয়ান দেখা যায় না, কিংবা নারীদের মধ্যে কোন বেইতোভেন, মোৎযার্ট কিংবা মাইকেলেঞ্জেলোকে পাওয়া যায় না – এটা জাস্ট শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পুরুষতন্ত্রের প্রভাব।

.

১৯৭৩ এর জানুয়ারি সংখ্যায় টাইম ম্যাগাযিন মন্তব্য করে – “চাঞ্চল্যকর এই কেইস নারীবাদীদের বক্তব্যের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেয়।

.

ডেইভিডঃ

.

কিন্তু মিডিয়ার রঙ্গিন আর অ্যাকাডেমিকদের এলিগ্যান্ট তত্ত্বের জগত থেকে দূরে উইনিপেগের ছবিটা ছিল অন্যরকম। একবারে শুরু থেকেই রাইমাররা অনুভব করতে পারছিলেন কোন একটা জায়গায় হিসেবে মিলছে না। কোথাও কোন একটা সমস্যা রয়ে যাচ্ছে। যদিও ওরা দু’জন এটা স্বীকার করতে চাচ্ছিলো না। একেবারে ছোটবেলা থেকেই ‘ব্রেন্ডা’র আচরণে মেয়েলিপনার কোন ছাপ ছিল না। ওর প্রিয় কাজ ছিল দৌড়ানো, ব্রায়ানের গাড়ি নিয়ে খেলা করা আর ছেলেদের সাথে পুরো দমে মারপিট করা। পুতুল খেলা ছিল দু চোখের বিষ। স্কুলে ও ছিল একা। রাগী, একগুঁয়ে। মেয়েদের সাথে খেলতে চাইতো না। ছেলেরা ওকে খেলায় নিতো না। এমনকি বাসাতেও খেলার সময় ও নেতৃত্ব দিতো। ব্রায়ান ওর অনুসরণ করতো। ওর হাটা, চলা, কথা সবকিছুতে ব্রুসকে দেখতে পাওয়া যেতো, ব্রেন্ডাকে না।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমস্যাগুলো বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, রাগ, কষ্ট। ও বুঝতে পারছিল ও অপরিচিত, অদ্ভুত। ও খাপ খায় না। এসব কিছুর প্রভাব পড়ছিল ওর পড়াশোনায়। প্রথমে গোপন রাখতে চাইলেও স্কুলে ক্রমাগত খারাপ পারফরমেন্সের পর শিক্ষকদের নানা ধরণের প্রশ্নের জবাবে রাইমাররা ওর অতীত সম্পর্কে জানাতে বাধ্য হয়। স্কুল থেকেই ওর জন্য সাইকলোজিস্ট ঠিক করে দেওয়া হয়। কিন্তু একের পর এক সাইকলোজিস্ট এ সিদ্ধান্তেই পৌছাতে বাধ্য হন, যদিও ব্রুস হওয়ার কোন স্মৃতি ওর নেই তবুও ‘ব্রেন্ডা’ কোন এক কারণে – তার রূপান্তরকে মেনে নিচ্ছে না। একের পর এক সাইকলোজিস্ট এবং জ্যানেট তার নিয়মিত চিঠিতে মানিকে ব্যাপারগুলো জানান। কিন্তু বরাবরই ডঃ মানি বিষয়টিকে “টমবয়ের স্বাভাবিক দস্যিপনা” বলে উড়িয়ে দেন।

ডেইভিড, ১৮ বছর বয়সে

.

তবে এক পর্যায়ে ডঃ মানিও বাধ্য হন ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিতে। কারণ তার পূর্নাঙ্গ থিওরিকে প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ক্রমেই এগিয়ে আসছিলো। মানির থিওরি অনুযায়ী ব্রেন্ডার রূপান্তরকে সম্পূর্ণ করতে কৈশোরের আগেই সার্জারি মাধ্যমে ওর শরীরে যোনি স্থাপন করা আবশ্যক। এটাই হল রূপান্তরের ফাইনাল স্টেপ। কিন্তু ব্রেন্ডাকে কোন ভাবেই সার্জারির জন্য রাজি করানো যাচ্ছিলো না। সার্জারি কথা শুনতেই ও রাজি না। ডঃ মানি বিভিন্ন ভাবে ব্রেন্ডাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। নিজ অফিসের নির্জন রুমে তিনি ব্রেন্ডাকে ছবি দেখান। নারী ও পুরুষের নগ্ন ছবি। যৌনাঙ্গের ছবি। মিলন রত ছবি। প্রসবের ছবি। মানির যুক্তি ছিল, নারীত্ব ও যোনির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ব্রেন্ডাকে মানব যৌনতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ছিল আবশ্যক। যেহেতু মানি বিশ্বাস করতেন জন্ম থেকেই মানবশিশুর মধ্য যৌনতার অনুভূতি থাকে তাই এতে কোন বিপদের আশঙ্কাও ছিল না। ডঃ মানি জ্যানেট এবং রনাল্ডকে বাসায় বাচ্চাদের সামনে, বিশেষ করে ব্রেন্ডার সামনে সঙ্গম করার পরামর্শ দেন, যাতে করে যৌনতা সম্পর্কে ওদের ধারণা আরো পরিষ্কার হয়। ওরা অস্বীকৃতি জানালে, মানি পরামর্শ দেন জ্যানেট যেন অ্যাটলিস্ট গৃহস্থালির কাজ করার সময় নগ্ন থাকে। যাতে করে নারী পুরুষের পার্থক্য এবং নিজের নারীত্ব সম্পর্কে ব্রেন্ডার বিশ্বাস আরো গাঢ় হয়।[1] বিশ্ববিখ্যাত ডঃ-এর এই প্রেসক্রিপশান রাইমাররা মেনে চলার চেষ্টা করে। পুরো ব্যাপারটা ব্রেন্ডাকে আরো বিভ্রান্ত, আরো দিশেহারা করে তোলে। ব্রেন্ডার বয়স ছিল ৭ বছর।

.

ব্রেন্ডার “ট্রিটমেন্ট” চলতে থাকে। কিন্তু সময়ের সাথে সবার কাছে পরিষ্কার হতে থাকে ও আর দশটা মেয়ের মতো। বরং ব্রেন্ডার কোন কিছুই মেয়ের মতো না। ব্রেন্ডার বয়স বারো হলে ডঃ মানির পরামর্শে ওকে হরমোন ট্যাবলেট খেতে বাধ্য করা হয়। বন্ধুহীন, নিরাপত্তাহীন নিষ্ঠুর এক পরিবেশে ব্রেন্ডা বড় হতে থাকে। নিজের মেয়েলি পোশাক, নিজের অস্বাভাবিকতা, ভাঙ্গতে থাকা কণ্ঠস্বর, নিজের শারীরিক অসম্পূর্ণতা, সার্জারির জন্য বাবা-মার চাপাচাপি, একের পর একে সাইকলোজিস্টের সাথে সেশন, বাল্টিমোরের নির্জন রুমের অন্ধকার স্মৃতি, নিজের একাকীত্ব, হঠাৎ ড মানির কথা মতো ওর উপর জোর করে সার্জারি করা হবে – সব কিছু মিলিয়ে ক্রমেই গভীর হতে থাকা রাগ আর হতাশার এক ঘূর্ণিপাকে ব্রেন্ডাকে নিজেকে আবিষ্কার করে। ওর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত লোকাল সাইকলোজিস্টের পরামর্শে, ডঃ জন মানির অমতে রনাল্ড আর জ্যানেট সিদ্ধান্ত নেয় ব্রেন্ডাকে ওর অতীত সম্পর্কে জানাবার।

ডঃ মানি

.

১৯৮০-র মার্চের এক পড়ন্ত দুপুরে সাইকলোজিস্টের সাথে সাপ্তাহিক সেশনের পর রনাল্ড সব কিছু ব্রেন্ডাকে খুলে বলে। গাল বেয়ে পড়া পানি আর হাতের গলতে থাকে কোন আইসক্রিমের ফোটা কোলে জমতে থাকে। ও নিজের ভেতর মুক্তির স্বাদ অনুভব করে। বোধশক্তি হবার পর থেকে বিভ্রান্তি আর ওর কাছে দুর্বোধ্য, অজানা এক বাস্তবতার যে বোঝা ওর ওপর চেপে ছিল, মনে হল শেষ পর্যন্ত তা তুলে নেয়া হয়েছে। রনের কথা শেষ হবার প্রায় সাথে সাথেই ব্রুস ওর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। ও একজন ছেলে আর ও ছেলে হিসেবেই জীবন কাটাবে। অতীতের সব চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টায় ও নিজের জন্য নতুন বেছে নেয়। ডেইভিড। বাইবেলের সেই ছেলেটার মতো যে বিশাল দানবকে যুদ্ধ হারিয়েছিল। ডেইভিড রাইমার।

.

ছোটকালে হওয়া দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ হিসেবে হসপিটাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাইমাররা কিছু টাকা পেয়েছিল। এ টাকা ডেইভিড সার্জারির জন্য খরচ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জন মানির প্রস্তাবিত সার্জারি না। বরং তার উল্টো রেসাল্টের জন্য। এই ফ্যালোপ্ল্যাস্টি সার্জারিতে ডেইভিডের ডান কবজি থেকে মাংস, নার্ভ আর আর্টারি এবং ওর বাম বাম পাজড় থেকে কার্টিলেজ নিয়ে ওর শরীরে একটি কৃত্রিম লিঙ্গ স্থাপন করার চেষ্টা করা হবে। বারো ধাপের এ সার্জারি শেষ করতে তিন জন সার্জেনের ১৩ ঘণ্টা সময় লাগে। সার্জারি সফল হয়। সেপ্টেম্বর ২২, ১৯৯০ এ ডেইভিড রাইমার জেইন ফন্টেইনকে বিয়ে করে।

.

গল্পটা এখানে শেষ হলে ভালো হতো। ডেইভিড সুখে-শান্তিতে তার বাকি জীবন কাঁটিয়ে দিল। ক্ষতবিক্ষত, ভ্রমণ ক্লান্ত, কিন্তু সন্তুষ্ট একজন মানুষ হিসেবে – এমন উপসংহার হয়তো সবার জন্যই ভালো হত। কিন্তু বাল্টিমোরে জন মানির সাথে নির্জন সেশনগুলোতে এমন কিছু হয়েছিল যার বীজ ও আর ব্রায়ান ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছিল। এমন এক অন্ধকারে উঁকি দিতে ওরা বাধ্য হয়েছিল, আমৃত্যু যা ওদের তারা করে বেড়াবে। শত চেষ্টার পরও যে অন্ধকারের কবল থেকে ওরা মুক্ত হতে পারেনি।

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ ……

=======

লেখকঃ আসিফ আদনান 

=====

পড়ুনঃ

প্রথম পর্ব- https://goo.gl/vQNVgc

রেফারেন্সঃ

[1] In Sexual Signatures, Money emphasized the importance of such parental genital displays for correct heterosexual child development, and even went so far as to recommend that parents engage in sexual intercourse in front of their children. “With a little calm guidance,” he wrote, “the experience can be integrated into the child’s sex education and serve to reinforce his or her own gender identity/role

শেয়ার করুনঃ