বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

.

মাঝে মাঝে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি কীবোর্ড নিয়ে কিন্তু লিখা আসে না। শব্দগুলো বিক্ষিপ্ত ভাবে ছোটাছুটি করে মাথার ভেতর, বহু চেষ্টা সাধনার পরেও ধরা দেয় না।

.

একরাশ হতাশা আর মহা বিরক্তি নিয়ে উঠে আসি টেবিল ছেড়ে। ব্যালকনিতে যেয়ে দাঁড়াই। এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে ঝাপটা মারে মুখে।তিলোত্তমা নগরী তখন গভীর ঘুমে। দু একটা রাতজাগা ক্লান্ত ট্রাক দীর্ঘশ্বাসের মতো হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলে ফাঁকা রাজপথে। ব্যালকনির ওপারেই ইট পাথরের দালানের ফাকে নিভে যেতে বসা শুকতারা।হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যাবে।ক্লান্ত প্রাণে ব্যালকনির গ্রীল ধরে আমি ঠাই দাঁড়িয়ে থাকি। ভোর হতে এখনো অনেক দেরী।

.

Writer’s Block বলে বিদঘুটে একটা রোগ আছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নতুন করে কিছু লিখতে পারেন না বা সৃজনশীল কোন কাজ করতে পারেন না। একধরনের অসহনীয় স্থবিরতা নেমে আসে।অনেক বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। [১]

.

Writer’s Block কেন হয়, কীভাবে Writer’s Block কাটানো যায় সেটা নিয়ে অনেক জল ঘাটাঘাটি করা হয়েছে।আমার ক্ষেত্রে এটা কেন হয় সেটার উত্তর পেলাম এই কয়েকদিন আগে।

..

আল্লাহ (সুবঃ) বলছেন, “তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল”।[২]

“মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে”।[৩] 

“গুরু শাস্তির পূর্বে তাদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাবো,যাতে তারা ফিরে আসে”।[৪]

.

আমার কৃতকর্মের দরুনই আল্লাহ আমার ওপর এই বিপদ পাঠিয়েছেন। Writing Block যখন হয় তার আগের কয়েকটা দিন আমি কী কী করেছি শুকুনের দৃষ্টিতে দেখতে থাকলাম।যেগুলো পেলাম

.

১) ফজরের নামাজ বাদ পড়েছে।

২) বিতরের নামাজ আলসেমি করে পড়া হয়নি।

৩) সুন্নত নামাজ পড়তে দেরী করেছি বা পড়িইনি।

৪) চোখের হেফাযত করিনি

.

এই চারটি পাপের মধ্যে সর্বশেষ পাপটাই সবচেয়ে বেশী করেছি। চোখের হেফাযতের ব্যাপারে চরম মাত্রার উদাসীন ছিলাম।হুড তোলা রিকশায় বসা নিকাবীর দীঘল কালো চোখে চোখ পড়া মাত্রই চোখ নামিয়ে নেইনি, তাকিয়ে থেকেছি যতক্ষন দেখা যায়, ফ্রেন্ড লিস্টের কোন বন্ধুর লাইক দেওয়ার সুবাদে ফেসবুকের হোমপেইজে কোন মেয়ের ছবি আসলে সংগে সংগে সেই বন্ধুকে আনফলো বা আনফ্রেন্ড করে স্ক্রলডাওন করে যাইনি,বরং কিছুটা সময় ছবি দেখে তারপর স্ক্রলডাওন করেছি।

এই পাপগুলোর কারনে আল্লাহ (সুবঃ) আমার লেখনী ভোঁতা করে দিয়েছেন।


.

চোখের হেফাযতের গাফিলতি থেকে Writing Block হয়েছে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো মোটেই অযৌক্তিক কিছু না।

ইমাম আবু আব্দুল্লাহ ইবনু আজলা (রহঃ) বলেন, ” আমি একবার ফুটফুটে এক খৃস্টান বালিকাকে দেখছিলাম। ইমাম আব্দুল্লাহ আল বালখী (রহঃ) আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন,” তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছো”?

.

আমি উনার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম,” আপনি ঐ ফুটফুটে মেয়েটিকে দেখেছেন? এমন সুশ্রী চেহারাও কি জাহান্নামের আগুনে পুড়বে”?

.

ইমাম আল বালখী (রহঃ) আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,” এই খৃস্টান বালিকাকে দেখার পরিণতি তোমার জন্য খুব একটা ভালো হবেনা। একদিন না একদিন তোমাকে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে”।

.

ইমাম ইবনু আজলা (রহঃ) বলেন,” ৪০ বছর পর আমি কুরআন ভুলে যাই,আমি বুঝতে পারি যে, এর কারণ ছিল ঐ খৃস্টান বালিকাকে দেখা”। [৫]

.

কি যেন নাম ছিল বালিকার…নামটাও ভুলে গিয়েছি, অথচ একসময় এই বিস্মৃতপ্রায় বালিকাকে দূর থেকে ঠোঁট টিপে হাসতে দেখে কতোবার অংকে ভুল করেছি, ক্লাস এইটের একটা টার্মে কি যাচ্ছেতাই রেজাল্টই না করেছিলাম। বালিকার ইষৎ ভ্রুকুটি কতোবার নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেক্ট্রন বিন্যাস ওলট পালট করে ফেলেছে, থিওরি ওফ রিলেটিভিটির প্রশ্নগুলোর চিন্তা ভুলিয়ে দিয়েছে।

.

ঈল্ম তথা জ্ঞান অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হল চোখের হেফাযত করা। চোখের হেফাযত করলে বিচক্ষণতা বাড়ে, বুদ্ধি দিন দিন ধারালো হয়।

.

শায়খ সুজাউল কারমানী (রহঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার বাহ্যিক অবস্থাকে সুন্নাহর পাবন্দ বানায়, অন্তরকে আল্লাহর চিন্তায় ও স্মরণে ব্যস্ত রাখে, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে থাকে, নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে নজর হেফাজত করে এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করে, সে ব্যক্তির উপলব্ধি এবং দূরদৃষ্টি কখনো ভুল হয় না।” [৬]

.

পড়া মনে থাকে না? অংক মাথায় ঢোকে না? পড়ার টেবিলে মন বসে না? চোখের হেফাযত করুন। সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে নিমিষেই। কসম খোদার!

.

চোখের হেফাযত করতে পারলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায়।

“যে মুসলমান প্রথমবার কোন মহিলার সৌন্দর্য দেখে চোখ নামিয়ে নেয়, আল্লাহ (সুবঃ) তার জন্য ইবাদাতে স্বাদ ও মিষ্টতা সৃষ্টি করে দেন”। [৭] 

.

“কুদৃষ্টি শয়তানের বিষমিশ্রিত তীর সমূহের একটি। যে ব্যক্তি আল্লাহ’র (সুবঃ) ভয়ে উহাকে ছেড়ে দিবে, আল্লাহ (সুবঃ) তার অন্তরে ঈমানের স্বাদ সৃষ্টি করে দিবেন”।[৮]

.

এই ঈমানের স্বাদ যে কতো মিষ্টি হতে পারে তা কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনার কোন চিন্তা নেই,ভাবনা নেই, দুঃখ নেই, হতাশা নেই। মুক্ত,স্বাধীন বাতাসের মতোন অবাধ আপনার জীবন।

কী এক অসহ্য আনন্দ! আমি এই আনন্দটার উদাহরণ দেই এভাবে, দুপুরে গরুর মাংসের ঝাল তরকারী দিয়ে গরম গরম ভাত খেলেন পেটপুরে। তারপর জর্দা ছাড়া একটা পান মুখে দিয়ে কিছুক্ষন চিবুলেন। তারপর চিলেকোঠার ঘরটাতে যেয়ে দখিনা জানালা খুলে দিয়ে শীতল পাটির ওপর জম্পেশ একটা ঘুম দিলেন!

.

.ঢাকা শহরে একটা কথা বেশ চালু ছিল। ঢাকা শহরে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশী।এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে নিশ্চিন্তেই বলা যায় ঢাকা শহরে কাকের চেয়ে মোটিভেশনাল স্পীকারের সংখ্যা বেশী। ইউটিউব,ফেসবুক লাইভ,পাড়ার অলিগলি,চিপা চাপা সবখানেই এদের উৎপাত। স্বপ্ন বেচার এই সব চোরাকারবারিরা ঘ্যানর ঘ্যানর করে অবিরাম- এইভাবে চললে তুমি স্মার্ট হতে হবে,তোমার পোষাক আশাক হতে হবে এইরকম,বিশ্বের সংগে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তোমাকে লীডারশীপ শিখতে হবে,টীম ওয়ার্ক করা শিখতে হবে, শিখতে হবে নেটওয়ার্কিং ,ঠিক এই এই কাজগুলো করলে তোমার আত্মবিশ্বাস ছুঁয়ে ফেলবে ঐ নীলাকাশ। 

.

তবে ব্রেইন ওয়াশিং এর আসল কাজটা করে মিডিয়া- তুমি তখনই প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ হবে যখন তুমি দাঁত ব্রাশ করবে ক্লোজআপ পেস্ট দিয়ে, যখন হুইল পাওয়ার হোয়াইট দিয়ে তোমার কাপড় গুলো ধোয়া হবে, যখন ফেয়ার হ্যান্ডসাম ম্যান থাকবে তোমার কাবার্‌ডে আর  ক্লিয়ার ম্যান স্পোর্টস থাকবে তোমার বাথরুমে। বডি স্প্রে আর চুলে জেলের ব্যবহার তোমাকে করে তুলবে দুর্দান্ত একজন মানুষ। রাফ এন্ড টাফ।যাকে বলে আসল পুরুষ! 

.

ব্রিটিশ অথবা মার্কিন একসেন্টে ইংরেজি বলতে পারে,স্প্যানিশ অথবা ফ্রেঞ্চ ভাষার ওপরেও মোটামুটি দখল আছে, পোশাক আশাকে কেতাদুরস্ত, লীডারশীপ কোর্স করা আছে বেশ কয়েকটা এমন অনেক “কুল গাই” রা যখন ফেসবুকের রঙ্গিন ছবির আড়ালে হতাশার চাষাবাদ করে, বিদেশী লালপানিতে ডুবে নিজেকে ভুলে থাকতে চায় তখন এদের জন্য করুণা হয়। চেনা ট্র‍্যাকটুকু পরিবর্তিত হলেই এরা ডাংগায় তোলা মাছের মতো খাবি খায়, আত্মবিশ্বাসের নাম গন্ধও থাকে না তখন। 

.

নিজের ওপর সামান্য নিয়ন্ত্রণটুকু নেই কর্পোরেট স্লেইভদের।”তেতুল হুজুর” লেবেলিং করতে এরা খুব পটু, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস দুই একজন  বাদে এদের অধিকাংশেরই মেয়ে দেখলে মুখে লালা ঝরে; শুধু দেখতে পাওয়া যায়না আরকি। অফিস আড্ডাগুলোতে চলে নারীদেহ নিয়ে রসালো আলাপ, অফিস পার্টিগুলোতে হয় উৎসব ; কাম,মদ আর মাতসর্যের। পর্ন,মাস্টারবেশন এইগুলোর কথা বলাই বাহুল্য।

.

চোখের হেফাযত করতে পারলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আশেপাশে কোন রূপবতী থাকলে প্রচন্ড ইচ্ছে করে  তার দিকে তাকাতে। পর্ন দেখার নেশা জাগলে সেটাকে দমিয়ে রাখাও খুবই কষ্টকর।আপনি যদি ঠিক এই মুহূর্তগুলোতে নিজের ইচ্ছেটাকে পায়ের নিচে পিষে ফেলতে পারেন, তাহলে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস জন্ম নিবে আপনার মনে । আপনি হবেন অদম্য,দুরন্ত,দুর্বার। কোনকিছুই অসম্ভব মনে হবেনা। পাহাড়সম বাঁধা,বিপত্তিও বরণ করে নিবেন হাসিমুখে। ‘কুছ পরোয়া নেহি, আমি পারবই ইনশা আল্লাহ’ এই হবে আপনার এপ্রোচ। আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবেন আপনি নিজে,নফস,পর্ন বা মাস্টারবেশনের অন্ধকার পৃথিবী নয়। 

.

চোখের হেফাযত আপনাকে উপহার দিবে ইস্পাত কঠিন এক ব্যক্তিত্ব। পাঁচ দশটা গার্লফ্রেন্ড চালায় এমন ছেলে আসল পুরুষ নয়,আসল পুরুষতো তারাই যারা রূপবতীদের রূপের আকর্ষণ উপেক্ষা করে চোখের হেফাযত করে।মেয়েদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা মানে নিজেকেই অপমান করা এটা কেন আমরা বুঝি না? মনুষ্যত্বের কী ভীষণ অপমান! যেই মেয়েটির দিকে আপনি লুল চোখে তাকিয়ে আছেন,সেই মেয়েটির কাছে আপনি কতোটুকু ছোট হয়ে গিয়েছেন সেটা একবার ভেবে দেখুন। সেই মেয়েটি এটা ধরেই নেবে যে আপনি একটা ক্যাবলাকান্ত, আপনাকে চাইলেই ইচ্ছেমত নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো যায়। রূপবতীদের রূপের দেমাগে যে মাটিতে পা পড়েনা তা কি আর এমনি এমনি? 

.

বিশেষ করে দাড়ি টুপিওয়ালা ভাইয়েরা, এই ব্যাপারে খুব সাবধান। এই জঘন্য কাজটি করার মাধ্যমে আপনি নিজেকে তো সেই মেয়েদের চোখে ছোট করছেনই, সেই সংগে আপনার দ্বীনেরও মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছেন। হুজুররা কিছু করুক বা না করুক দিনশেষে সব দোষ তাদের ওপরই চাপানো হয়। হিন্দু পুরোহিত রাম রহিমও ২০০০ হাজারের অধিক নারীকে ধর্ষন করে, খৃস্টান পাদরীরাও নানদের যৌন নির্যাতন করে, ইউরোপ,আমেরিকার ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, আর্মি, হাসপাতাল,কর্মক্ষেত্র এমনকি নিজ বাসস্থানেও নারীরা যৌন নিপীড়নের হাত থেকে রেহায় পায় না, অথচ দিনশেষে হুজুররাই নাকি সেক্স স্টারভড, স্যাডিস্ট!

.

এই বিরুদ্ধ পরিবেশে মেয়েদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে আর নিজের দ্বীনকে ছোট করবেন না। এই অধিকার আপনার নেই। ওভার এন্ড আউট। 


চলবে ইনশা আল্লাহ…

========

পড়ুনঃ

প্রথম কিস্তিঃ  https://goo.gl/Zrr498

দ্বিতীয় কিস্তিঃ https://goo.gl/tCjzCd

========

 রেফারেন্সঃ

[১] http://tinyurl.com/q8hs7rw

[২]সূরা শুরা,আয়াত ৩০

[৩]সূরা রুম,আয়াত ৪১

[৪] সূরা সাজদাহ,আয়াত ১২৩

[৫]যাম্মুল হাওয়া,পৃষ্ঠা: ১০২

[৬] চোখের আপদ ও প্রতিকার,ইরশাদুল হক আছরী,পৃষ্ঠাঃ ৪৮

[৭]আহমাদ হাঃ ২২৩৩২, তাবারানী,বাইহাকী

[৮] হাকিম,তাবারানী

শেয়ার করুনঃ