বিসমমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

.

দ্রুতগতি সম্পন্ন নিউট্রন সজোরে ধাক্কা মারলো ইউরোনিয়াম-২৩৫ পরমানুকে। ইউরোনিয়াম-২৩৫ পরমানু ভেঙ্গে হল দু টুকরো। উৎপন্ন হল বিপুল শক্তি এবং নতুন তিনটি নিউট্রন। এই নতুন তিনটি নিউট্রন আবার সজোরে ছুটে গেল নতুন তিনটি ইনট্যাক্ট ইউরোনিয়াম-২৩৫ পরমানুকে আঘাত হানার জন্য। এই তিনটি ইউরোনিয়াম ভেঙ্গে দুটুকরো হল, উৎপন্ন হল পূর্বের চেয়েও অনেকগুন বেশি শক্তি এবং নতুন নয়টি নিউট্রন। এই নিউট্রনগুলো আবার নতুন নয়টি ইউরোনিয়াম-২৩৫ পরমানুকে আঘাত করল। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতোক্ষন পর্যন্ত সেখানে একটি ইউরোনিয়াম-২৩৫ পরমানু অবশিষ্ট থাকে।

.
নিউক্লিয়ার সায়েন্সের খুবই পরিচিত একটি বিক্রিয়া এটি, নিউক্লিয়ার ফিশন রিএকশ্যান নামেই যেটি পরিচিত। এই চেইন রিএকশ্যানই ঘটে ধ্বংসাত্মক পারমানবিক বোমার মধ্যে।অতিক্ষুদ্র এক নিউট্রনের মাধ্যমে যার শুরু হয়, সমাপ্তি ঘটে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরে। [১]

.

চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিকে আমরা তুলনা করতে পারি চেইন রিএকশ্যান শুরু করে দেওয়া অতিক্ষুদ্র সেই নিউট্রনের সংগে। শুধু একটি মাত্র অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির কারনে শুরু হয়ে যেত পারে পাপের চেইন রিএকশ্যান। একটার পর একটা পাপ করে যেতেই থাকে মানুষ। শেষটা হয় দুনিয়া এবং আখিরাত দুটোই হারিয়ে।

.

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের জন্য রাতের গভীরে সালাতে দাঁড়িয়ে কাঁদতেন। দীর্ঘ সিজদায় আল্লাহর কাছে আকুল প্রার্থনা করতেন আমাদের জন্য [https://goo.gl/JhZZrC]। আমাদের সংগে তাঁর গভীর বন্ধনের উদাহরন দিতে যেয়ে তিনি বলেছিলেন,‘ তোমরা হলে পাখাওয়ালা পতঙ্গের মতো। মরুভূমিতে রাতের আধারে মশাল জ্বালানো হয়েছে। সেই আগুনে আকৃষ্ট হয়ে তাতে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য তোমরা সবাই ছুটে চলছো। আর আমি তোমাদেরকে আঁকড়ে ধরে আছি, যেন তোমরা সে আগুনে ঝাঁপ দিতে না পারো’। [২]

.

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে,আমাদের নিজেদের পিতামাতার চেয়েও বেশী ভালোবাসেন।

হাশরের ময়দানে জাহান্নামের ভয়াবহতা দেখে পিতামাতা পর্যন্ত তাদের সন্তানকে অস্বীকার করবেন, চাইবেন যেন তাদের সন্তান, তাদের মা বাবা ,ভাই বোন ,আত্মীয় স্বজন প্রয়োজন পড়লে এই দুনিয়ার সবকিছু জাহান্নামে ফেলে দিক তাও যেন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ না করেন। সেই ভয়াবহ, স্বার্থপরতার দিনেও রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের জন্যেই উদ্বিগ্ন থাকবেন। এতোটাই ভালোবাসেন তিনি (সাঃ) আমাদেরকে। এই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বারবার সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছেন নারীর ফিতনাহর ব্যাপারে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ আমার উম্মাতের উপর অসংখ্য ফিতনাহ আসবে,তারমধ্যে অধিক কষ্টদায়ক ও ক্ষতিকারক হল মহিলাদের ফিতনাহ’।

 

উসমান বিন যায়িদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,‘ আমার মৃত্যুর পরে পুরুষদের জন্য আমি নারীর ফিতনাহকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর মনে করি’।[৩]

আর নারীর ভয়াবহ এই ফিতনার সূচনটা হয় চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির কারনে।

সেই রঙিন কৈশোর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কতোবার আপনি মায়াময়ীদের প্রেমে পড়েছেন! রুপা,মীরা,নীরা,প্রতীতি,সোমা! আর কতোবার আপনার হৃদয় ভেংগেছে! কতোবার শান্ত, নিরুদ্রপ জীবন ছারখার হয়ে গিয়েছে! দীর্ঘ নির্ঘুম রাত,একলা শুকতারা,নিকোটিনের ধোয়া,পুরোনো ইনবক্স, গভীর দীর্ঘশ্বাস, ঝাঁকড়া চুল,শূন্য মানিব্যাগ,শূন্য পরীক্ষার খাতা,চিড় ধরা ভাতৃত্বের মতো বন্ধুত্ব,মায়ের চোখের জল,বাবার ভীষন আক্ষেপ। .

যখন আপনার বন্ধুরা পড়ার টেবিলে ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যস্ত,তখন আপনি নিজ হাতে আপনার ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছেন। বাবার টাকা নষ্ট করেছেন, মায়ের সংগে মিথ্যা বলেছেন। টেনশান,অস্থিরতা আর উদ্বিগ্নতায় কাটিয়েছেন কত দিন,কত রাত। নিজের সংগে একটু সৎ হোন। সত্যি করে বলুনতো আসলেই কি সুখ পেয়েছেন? আর শান্তি?

.

‘হারাম থেকে পাওয়া সুখ অল্পেই শেষ হয়ে যায়

থাকে শুধু গ্লানি আর লজ্জা

দিনশেষে শুধু থাকে শূন্যতা আর পাপের বোঝা

সেই আমোদপ্রমোদে কি লাভ শেষমেশ যার ফলাফল জাহান্নামের আগুনের শাস্তি?’

-শেইখ খালিদ আর রশীদ

.

চিন্তা করে দেখুন একবার,এর কিছুই হতোনা যদি আপনি চোখের হেফাযত করতেন। প্রথমে চুরি করে দেখেছেন, তারপর ইনবক্স আর প্রোফাইল পিকচারে তেল মেরেছেন, দূরালাপনে হেলাল হাফিয আর সুনীলের কবিতাকে নিজের বলে চালিয়েছেন, তারপর ডেটিং,তারপর কিছুক্ষন ভালোবাসার মিথ্যে উৎসবে মেতে থাকা ,তাইতো? চোখের হেফাযত করতে পারলে আপনার জীবনের গল্পটাই অন্যরকম হতো!

.
পূর্বের যামানায় এক ব্যক্তি দরিয়ার তীরে বসবাস করতো। যেখানে সে ৩০০ বছর ধরে আল্লাহর ইবাদাত করেছিল। সে দিনে সিয়াম রাখতো আর রাতে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতো।একদিন এক মেয়ে তার বাসস্থানের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল। সেই মেয়েকে দেখা মাত্রই তার প্রেমে পড়ে যায় ঐ লোক। প্রেমের মোহে ইবাদাত বন্দেগী সব ছেড়ে দিয়ে কাফির হয়ে যায়। একটা সময়ে অবশ্য আল্লাহ তাকে তওবা করার সুযোগ দেন এবং সে তওবা করে। [৪]

.

মিশরে এক যুবক ছিল। সে মসজিদে আযান দিতো,সলাত পড়াতো। তার চেহারা জুড়ে ছিল ইবাদাতের নুর । একদিন সে আযান দেয়ার জন্য মসজিদের মিনারে ওঠে। সেই মসজিদের পাশেই ছিল এক খৃস্টান পরিবারের বাস। অপরুপা এক মেয়ে ছিল তাদের। মিনার থেকে যুবকের চোখ পড়ে সেই রূপসীর ওপর। সংগে সংগেই যুবক প্রেমে পড়ে যায়।ততক্ষনাত হাজির হয় সেই মেয়ের ঘরে। মেয়েটি তাকে জিজ্ঞাসা করল,” তুমি কেন এখানে এসেছ? যুবক উত্তর দিল,” তোমার প্রেম আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই”। “এটা কিভাবে সম্ভব? তুমি মুসলিম আর আমি খৃস্টান। আমার বাবা কখনোই এ বিয়েতে রাজী হবেন না”। ” তোমার জন্য প্রয়োজনে আমি খৃস্টান হয়ে যাব”। “তাহলে বিয়ে হতে পারে”।

.

যুবকটি খৃস্টান হয়ে গেল। তাদের বিয়েও হয়ে গেল। একরাতে যুবকটি ঘুমানোর জন্য ঘরের ছাদে যায়। ঘরের ছাদ থেকে সে পা পিছলে নিচে পড়ে এবং সেখানেই মৃত্যুবরন করে।[৫]

.

সুবহান আল্লাহ ! চিন্তা করুন একবার। যুবকটি খ্রিষ্টান হয়ে গেল যুবতীর প্রেমে পড়ে।যে ইসলাম তাকে বাঁচাতে পারতো ধ্বংসাত্বক পরিণতির হাত থেকে, যে কালিমা এক নিমিষেই হারাম করে ফেলত জাহান্নামের ভীষন আগুন সেই ইসলামকে ছেড়ে, কালিমাকে ভুলে যুবতীর প্রেমে অন্ধ হয়ে সে খৃষ্টান হয়ে গেল। তারপর সেই অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করল! মানব জীবনের কি ভীষণ অপচয়।

চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি এই জমীনের বুকে কতো হাজার বার রক্ত ঝরিয়েছে! জলে,স্থলে আর অন্তরীক্ষে সৃষ্টি করেছে বিপর্যয়।কতো মানব হৃদয়ের মৃত্যু ঘটিয়েছে,জান্নাতের পথ থেকে বিচ্যুত করেছে , আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের (সাঃ) দুশমনেরা মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করার চক্রান্ত করেছে।

আল্লাহ (সুবঃ) আমাদের হেফাযত করুক।

চলবে ইনশা আল্লাহ……

========

পড়ুনঃ প্রথম কিস্তি- https://goo.gl/Zrr498

========

রেফারেন্সঃ

[১] https://goo.gl/jmJbLx

[২] সহীহ বুখারী ,হাদীস নং- ৬১১৮, সহীহ মুসলীম,হাদীস নং- ২২৮৪ । ভাবানুবাদ।

[৩] সহীহ বুখারী,হাদীস নং- ৪৮০৮,মুসলিম হাদীস নং-২৭৪০

[৪] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, ইরশাদুল হক আছরী, পৃষ্ঠা-৫৭

[৫] আদ-দা-উ ওয়া আদ- দাওয়া।

শেয়ার করুনঃ