বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

প্রচুর আলো বাতাস আর বিশাল একটা আকাশকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা আমার । কলেজে উঠার পর চলে আসতে হল ইট, পাথর, ধোঁয়া আর যান্ত্রিকতায় ভরা ঢাকা শহরে । হোস্টেলের রুমটা প্রথম দর্শনেই অপছন্দ করে ফেললাম । ভরদুপুরেও  ঘোর অমবস্যার অন্ধকার । জানালা একটা আছে বটে তবে সেটা আলো বাতাস চলাচলের জন্য না; দুর্গন্ধ আর মশা প্রবেশের জন্য ।খাঁচায় রাখা পাখির মতো ছটফট করতো আমার প্রাণ। একটু পা ছড়িয়ে বসার জায়গা নেই,নেই দম ফেলার জায়গা।

কলেজের প্রেসারে রাত দিন এক করে পড়াশোনা করতে হত। তবু বিকেলবেলা কিছুটা হলেও অবসর পাওয়া যেত । কিচ্ছু করার ছিলনা তখন ।  বাতাসের মতো অবাধ ছিল আমার জীবন,মাঠে ঘাটে দৌড়ঝাঁপ করে বড় হয়েছি আমি,  ইলেক্ট্রনিক্স গ্যাজেট আমাকে তেমন টানতো না, সারাদিন ক্লাসের পড়া পড়ার পর গল্পের বইটই পড়তেও ইচ্ছে করতোনা। রুমে মন খারাপ করে আমারই মতো আরেক হতভাগার  সঙ্গে চুপ করে বসে থাকতাম । মাঝে মাঝে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতাম ।

উদ্দেশ্যহীন ভাবে।

রিকশার গোলকধাঁধ,লোকাল বাস, ফুটপাতের ফেরিওয়ালা,স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, অগণিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মানুষ, দীর্ঘশ্বাসের মতো হুইসেল দিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেন, হেমন্তের  বিষন্ন আলো সব কিছু ছাপিয়ে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো ছোট্ট একটা নদীর পাড়, নদীর পাড়ের অলৌকিক একটা গ্রাম ।

একদল কিশোর সরিষাক্ষেতের আইল দিয়ে সারিবেঁধে হেঁটে যাচ্ছে । সরিষাক্ষেতের ওপর হেমন্তের নতুন কুয়াশা গা এলিয়ে দিয়েছে পরম আয়েশে । কিশোরদের কারো হাতে স্ট্যাম্প, কারো কাঁধে বল । সারাবিকেল মাঠে বল পিটিয়েছে ওরা । এখন যে যার বাড়ীতে ফিরে যাচ্ছে । অশত্থ গাছের ওপর দিয়ে পূর্ণিমার বিশাল চাঁদটা  উঁকি দিতে শুরু করেছে । দূরের একটা গ্রাম থেকে করুন সুরে একটা বাছুর হাম্বা করে উঠলো । মাকে ডাকছে বোধহয় ওটা। উত্তরের বাতাসে সেই ডাক ভেসে বেড়ালো অনেকক্ষন । নিজের  শহরের ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো দেখলে ইচ্ছে করতো সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এখনি চেপে বসি ট্রেনে ।

 

ঢাকা শহরের বাচ্চাদের দেখলে খুব কষ্ট হয়। কি করুণ অবস্থা ওদের! এমন এক সিস্টেম বানিয়ে ফেলেছি আমরা যেই সিস্টেম প্রত্যেকটা মুহূর্তে চুষে নিচ্ছে বাচ্চাদের জীবনীশক্তি । বইয়ের ভারে, কোচিং সেন্টারে এ দৌড়াদৌড়ি আর প্রাইভেট টিউটরের উৎপাতে ওদের জীবনটা কেরোসিন। ওদের ওপর এত চাপ দিয়ে কি লাভ? ওদের প্রতি একটু রহম করুন না । ওকে কেনইবা সব বিষয়ে ফুল মার্কস পেতে হবে? ওকে কেনইবা পাশের বাসার ফাইয়াজ বা ফারিহার মতো হতে হবে? আমরা প্রত্যেকেই না আলাদা আলাদা মানুষ ? আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদা একটা সত্তা আছে , আছে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট? কেন আমরা অন্যের কার্বন কপি হতে চাই? কেন?

অন্যের জীবনের দিকে না তাকিয়ে আমরা যদি আমাদের নিজেদের মতো করে জীবন যাপন করতে পারতাম তাহলে এই পৃথিবীটা অনেক বেশি সুন্দর হতো। এত টেনশান, এত অস্থিরতা,মানসিক অশান্তি, ইনসোমোনিয়া থাকতো না আমাদের। প্রত্যেকেই জীবনে যেটা হতে চেয়েছিল, যেটা ভালোবাসতো সেটাই হতে পারতো । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে রোজ সকালে গোমড়া মুখে ব্যাংকের ডেস্কে বসতে হতো না, লুকিয়ে কবিতা লিখা ছেলেটাকে মনের বিরুদ্ধে পড়তে হতো না বিবিএ ।

ঢাকা শহরের যান্ত্রিক হৃদয়হীন মানুষগুলো টাকা,ক্যারিয়ার আর খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে অখন্ড অবসর পায়না বললেই চলে। তারপরেও যতটুকু অবসর পায়,ততটুকু উপভোগ করাও বিশাল এক সমস্যা । কত দরিদ্র এই ঢাকা শহর! এক চিলতে আকাশ নেই , নিঃশ্বাস নেবার জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই, বাঁশঝাড় নেই ,নেই বাঁশঝাড়ের মাথার ওপরের সেই নির্ভেজাল চাঁদটাও ! এভাবে মুরগীর কুঠিতে, নয়টা-পাঁচটায় বাঁধা ছকে বেঁচে থাকাকে কি বেঁচে থাকা বলে ? এ জীবন তেলাপোকার জীবন! এ জীবন সরীসৃপের জীবন !  তবুও এই সাদাকালো জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে মানুষ লাল নীল সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখে । মা ভালোবাসে তাঁর সন্তানকে , স্ত্রী অপেক্ষা করে থাকে কখন ঘরে ফিরবে তার ভালোবাসার  মানুষটা ।

কি লিখব ভেবে লিখা শুরু করেছিলাম আর অপ্রাসঙ্গিক কতো কি লিখে ফেললাম!

অনেকের ক্ষেত্রেই মাস্টারবেশন বা পর্ন আসক্তি তীব্র আকার ধারণ করে শুধুমাত্র অবসর সময়টাকে ঠিকভাবে কাজে না লাগানোর ফলে ।  এই লিখাতে ইনশা আল্লাহ্‌ চেষ্টা করা হবে শত সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও কীভাবে অবসরকে আনন্দময় করা যায়  সে বিষয়ে আলোকপাত করার।

ঘরে ফেরার পরেঃ

সারাদিন অফিস করে বা ক্লাস করে বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলে ঝুলে বাসার দরজার কলিংবেল টেপার সময়  এক অদ্ভুত শুন্যতা কাজ করে বুকের ভেতর । এই সময়টা,মানে অফিস বা ক্লাস থেকে ফেরার পরের এই সময়টা খুবই নাজুক। যারা মাঝে মধ্যে পর্নমুভি দেখে বা মাস্টারবেট করে  তাদের এই সময় শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়, “যা ব্যাটা পর্ন দেখ বা মাস্টারবেট কর , মেন্টাল স্ট্রেস দূর হয়ে যাবে”।

অনেকেই শয়তানের এই কুমন্ত্রণায় সাড়া দেয় । পর্ন/মাস্টারবেশনের ফ্যান্টাসির জগতে হারিয়ে ভুলতে চায় জীবনের সব অবসাদ । ক্ষণিকের জন্য অবসাদ দূর হলেও একটু পরেই ফিরে আসে শতগুন শক্তিশালী হয়ে ।

ইসলাম কি চমৎকার সমাধানই না দিয়েছে এই সমস্যার !

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)  বলেছেন স্বামী যখন ঘরে ফিরবে তখন যেন স্ত্রী দরজা খুলে দেয় । পরস্পর সালাম বিনিময় করে ।  স্ত্রী যেন স্বামীর জন্য সুন্দর করে সাজে ।

 

স্ত্রীর হাসিমুখ, মিষ্টি কন্ঠের সালাম বা দুটো নরম কথা , একটু আলতো স্পর্শ,  সারাদিনের  পরিশ্রমে  ক্লান্ত,বিধ্বস্ত স্বামীকে  এক নিমিষেই দিতে পারে দু দন্ড শান্তি, নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা ,চোখকে করে দিতে পারে শীতল । ।

“…… তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গী সঙ্গিনীদের বানিয়েছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছ থেকে সুখ শান্তি লাভ করতে পারো ”

( আল কুরআনঃ ৩০;২১)

পাশ্চাত্যের প্রোপ্যাগান্ডায় ব্রেইন ওয়াশড হয়ে নারী স্বাধীনতার নামে আমরা নারীকে ঘর থেকে বের করে রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি পুরুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে । কর্মক্ষেত্রের কর্কশ,কঠোর পরিবেশ নারীর কোমলতা দূর করে দিচ্ছে । স্বামীর মনের শুন্যতা আর দূর করবে কি, দিনশেষে বেচারী নিজেই ঘরে ফিরছে শূন্য এক মন নিয়ে । কেউই কাউকে পর্যাপ্ত সময় কাছে পাচ্ছে না , দূরত্ব বাড়ছে একটু একটু করে । পরকীয়া,পর্ন আসক্তির দুয়ার খুলে যাচ্ছে ।

অবিবাহিত ভাইরা এখন হাউকাউ শুরু করবেন আমাদের তো বউ নেই, আমাদের কী হবে ?

ভাই,আমাদের সমাজে বিয়েকে করে ফেলা হয়েছে অনেক অনেক কঠিন । হাউকাউ না করে, বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে না ভুগে আপনাদের চেষ্টা করতে হবে বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা । বিয়ে আপনার পর্ন আসক্তি বা মাস্টারবেট আসক্তি একেবারে দূর করবে এটা ভাবলে ভুল করবেন । বিয়ে কিছুটা সমাধান দিতে পারবে কিন্তু পুরোটা না । তাই,লড়াইটা শুরু করতে হবে এই মুহূর্ত থেকেই । বিয়ের জন্য বসে থাকলে চলবে না ।

ঘরে ফেরার পরে খুব দ্রুত ঢুকে পড়বেন বাথরুমে । ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে নিবেন ভালোমতো । স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে যতোটা কম স্পর্শ করা যায় ততোই ভালো । বাথরুমে কাপড় সম্পূর্ণ না খুলে ফেলে কিছু কাপড় শরীরে রেখে গোসল করা উচিত ।

গোসল শেষে বাথরুম থেকে বের হয়ে মোবাইলে বা সাউন্ডসিস্টেমে চালিয়ে দিন সুন্দর সুন্দর এই (http://bit.ly/2lkMIBU) তিলাওয়াত গুলো । আল্লাহ্‌র কালাম আপনাকে ইনশা আল্লাহ্‌ রক্ষা করবে শয়তানের ধোঁকা থেকে আর সেই সঙ্গে মেন্টাল স্ট্রেস কাটিয়ে উঠতেও সাহায্য করবে ।

“…… আমি কুরআনে যা কিছু নাযিল করেছি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্য তাদের রোগের উপশমকারী ও রহমত ”। (আল কুরআনঃ ১৭;৮২)

হালকা একটু ন্যাপ নিন । ছোট ভাইবোন বা পিচ্চিদের সঙ্গে খুনসুটি করতে পারেন । মানসিক চাপ কমাতে এগুলো  খুব সাহায্য করে ।

হোস্টেলে বা হলে পরিবার ছেড়ে দূরে থাকলে এই সময় বাবা মা’কে ফোন করুন । খোঁজ খবর নিন । ইমো,ভাইভার এগুলোর সদ্ব্যবহার করুন । মন খুলে কথা বলুন । মেন্ট্রাল স্ট্রেস দূর হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ্‌ ।

 

চলবে ইনশা আল্লাহ্‌ ……

শেয়ার করুনঃ