বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

(প্রথম পর্বের পর…)

অবসর  কাটানোর খুব চমৎকার এবং আমার অতি প্রিয় একটা উপায় হচ্ছে বই পড়া । কিছু অখন্ড অবসর, এক মগ কফি আর একটা ভালো বই … আহ! জীবনে আর কী চাই !

বিবাহিতরা এখানেও বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন । কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে আরাম করে বসলেন দু’জন । ঝিরি ঝিরি বাতাস বইতে শুরু করলো । হাতে আগুন গরম চা আর প্রিয় কোন বই । আহ! জীবন শান্তি!

বইয়ের কালো  কালির নিষ্প্রাণ হরফগুলোর যে কী শক্তি একবার যদি আমরা উপলব্ধি করতে পারতাম! বাঙ্গালী  ঐতিহাসিকভাবেই  বই কেনার প্রতি তেমন  আগ্রহী ছিল না কখনোই, কিন্তু একটা সময় ছিল বাঙ্গালী ধার করে হোক বা পাঠাগারে যেয়ে হোক টুকটাক বই পড়েছে ।  এই ফেইসবুক,ইউটিউবের যুগে বাঙ্গালী এতোটা বইবিমুখ যে হয়েছে তা অতীতে আর কখনো হয়নি ।  পড়ার কোন বিকল্প নেই ,ভাই। পড়ুন ।

কি বই পড়া যেতে পারে ?

খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ।

জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে জাফর ইকবালদের মতো সস্তা,কপি পেস্ট লেখকদের ছাইপাঁশ পড়ে । এখন আফসোস করে মরি । ইশ! ছাইপাঁশ গাঁজাখুরি লিখা গুলো পড়ে কেন যে সময় নষ্ট করলাম !

বই মানুষের মনোজগত পরিবর্তনের খুবই শক্তিশালী একটি মাধ্যম । দুএকটা হিমু পড়লে ইচ্ছে করবে হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে সারাদিন রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতে । পর্ন/মাস্টারবেশন নিয়ে যারা সমস্যায় আছেন তাদের অবশ্যপালনীয় একটা কাজ হল ন্যাকা প্রেম,ভালোবাসা,এক চিমটি বিজ্ঞান আর এক চিমটি গাঁজা মিশিয়ে লিখা সায়েন্স ফিকশান টাইপের বইগুলো এড়িয়ে চলা । এই বইগুলো যেমন সময় খেয়ে ফেলে ঠিক তেমনি আপনার বুকের ভেতর একধরনের হাহাকার তৈরি করে । ঈশ! নীরা বা তিথির মতো আমার যদি কেউ থাকতো! রূপার মতো কেউ যদি আমার জন্যে অপেক্ষা করত !

অবসরে,বিশেষ করে একা থাকলে এরকম হাজারো চিন্তা ভর করবে আপনার মাথায় । চিন্তা থেকে দুশ্চিন্তা, দুশ্চিন্তা থেকে দুঃখ বিলাস , সেখান থেকে হতাশা , আর হতাশার মুহূর্তেই শয়তান এসে ধরবে ক্যাঁক করে ।

তাহলে কি পড়বো ?

কুরআনের পুরো  অনুবাদ কয়জনের পড়া আছে ? হুমায়ূন,সুনীল, সমরেশের ঢাউস ঢাউস বই পড়ে ফেলেছি, কিন্তু আল্লাহ্‌র বইটার পুরোটা এখনো পড়া হয়নি আমাদের । কি লজ্জা !  লজ্জা আরো বাড়ার আগে এখনই পড়া শুরু করে দেন । মূল আরবি টেক্সট না পড়ে  শুধু অনুবাদ পড়ে যান । প্রথম প্রথম একটু কেমন কেমন লাগতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস করুন একসময় খুবই মজা পাবেন । আল কুরআন একাডেমী,লন্ডন কর্তৃক প্রকাশিত কুরআনের বাংলা অনুবাদটা আমার ভালো লেগেছিল ।

মুহাম্মাদ (সাঃ) এর জীবনীও আমাদের পড়া নেই । পড়তে পারেন এটিও । ‘আর রাহেকুল মাখতুম (https://goo.gl/AqUSkD )’, ‘সীরাহ ইবনে হিশাম’ বা রেইনড্রপসের ‘সীরাহ (http://bit.ly/2nxO6P4)’  পড়া যেতে পারে ।

রিয়াদুস সালেহীন,হায়াতুস সাহাবা বই গুলোও পড়া যেতে পারে । অন্তর নরম করতে এই বই গুলো খুবই কার্যকরী ।

আলহামদুলিল্লাহ্‌! বাংলাদেশে এখন বেশ সুন্দর সুন্দর বই বের হচ্ছে । বই কিনুন। বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়না ।

যারা গাঁটের টাকা খরচ করে বই কিনতে চাননা তাদের জন্যে রয়েছে  Kalamullah.com । ইচ্ছেমতো  পিডিএফ নামিয়ে  পড়ুন এখান থেকে ।

নাসীম হিজাযী’র অসাধারণ কিছু ঐতিহাসিক উপন্যাস আছে । পড়ে ফেলতে পারেন এগুলোও(http://bit.ly/2mZKHKq) ।

অবসর কাটানোর আরেকটা ভালো উপায় হচ্ছে লেকচার শোনা । এই ইসলামিক রিমাইন্ডারগুলো (http://bit.ly/2ny3VrY) আপনার পর্ন/মাস্টারবেশন আসক্তি দূর করতে সাহায্য তো করবেই, সেই সঙ্গে আল্লাহ্‌ চাইলে আপনার জীবনের গতিপথই পালটে দিতে পারে ।

কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে লেকচার শোনার মধ্যে অন্যরকম একটা মজা আছে, না শুনলে ঠিক বলে বোঝানো যাবে না । অন্য উপকার না হোক, লেকচার শুনতে লাগলে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে  পড়বেন এটা নিশ্চিত 😛

আমাদের মফঃস্বল শহরটা এমনিতে খুবই সুন্দর । ফাগুনের দিন আর ফাগুনের রাতে এই শহরে যেন বেহেশত নেমে আসে; এতো সুন্দর! অর্ধেক নগরী তুমি,অর্ধেক কল্পনা…

ফাগুনের এক দুপুরে এই শহরের একরাস্তায় হাঁটার সময় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম একবার – এই শহরের,এই রাস্তায়,এইরকম ফাগুনের দুপুরে বউয়ের হাতে হাত রেখে হাঁটতে চাই, একবার হলেও । বউকে দেখাতে চাই, “এইযে দেখ জীবনবাবুর সেই ভাঁটফুল,আর ঐযে, যে গাছটাতে আগুন লেগেছে সেটা পলাশ । দুপাশের অতন্দ্রপ্রহরীর মতো যে গাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর তাদের ঝরে পড়া পাতাগুলো তোমার আমার গা ছুঁয়ে পড়ছে পথের ওপর সেগুলো গগণ শিরীষ”।

দুটো কারণে প্রতিজ্ঞাটা এখনো পূরন করে উঠতে পারিনি …

শহরের ঐ রাস্তায় ফাগুনের ঐ সময়ে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি আর আমার বউয়ের দেখাও পাইনি এখনো।

ছুটির দিনে অযথা ফেসবুকিং না করে,টিভিসেটের সামনে না বসে থেকে  স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে বের হোন। কক্সবাজার,বান্দরবন বা দেশের বাহিরে ঘুরতে যেতে হবে সে কথা বলিনি। বাসার পাশের রাস্তাতে দুজনে হাঁটুন, আইস্ক্রীম খান, ঝালমুড়ি খান,রিকশাতে করে আশপাশটা চক্কর দিন। চাঁদনী পসার রাতে একসঙ্গে জ্যোৎস্না দেখুন, শ্রাবণসন্ধ্যায় ঘর অন্ধকার করে জানালার ধারে বসে থাকুন দু’জন ।

একমহাসমুদ্র ভালোবাসা নিয়ে দুজন মানুষ কাছাকাছি আসে বিয়ের মাধ্যমে । সংসার নামের কুখ্যাত কারাগারে ফেঁসে যেয়ে সেই ভালোবাসার মহাসমুদ্র শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগে না। স্ত্রীকে সময় দিন। তাঁর রান্নার প্রশংসা করুন, প্রয়োজনে পাম দিন, মরা খালেও জোয়ার আসবে ইনশাআল্লাহ্‌।

সপ্তাহজুড়ে কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপে পিষ্ট হয়ে আপনার অন্তর হয়ে যায় শূন্য। আপনি থাকেন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।এই সময়  আপনাকে,শয়তান খুব বেশী কুমন্ত্রণা দেয় পর্নমুভি দেখার ।এইসময় আপনার দরকার আপনার স্ত্রীকে । আপনার স্ত্রীরও দরকার আপনাকে । সারা সপ্তাহ জুড়ে বেচারী আপনাকে কাছে পায়না। এই একটা বা দুটোদিন তাঁকে তো কিছুটা সময় দিন। নাহলে কে জানে একদিন দেখবেন কোন সুযোগ সন্ধানী শেয়াল আপনাদের দুজনের মাঝে সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোবে। পরকীয়া,বিবাহ বিচ্ছেদ তো আর এমনি এমনিই বাড়ছে না!

‘বউ’ নিয়ে মাতামাতি করতে যেয়ে আমরা যেন ভুলে না যায় আমাদের মা-বাবার কথা । শুধু টাকা ইনকাম আর রান্না করার জন্যে আমাদের বাবা-মা পৃথিবীতে আসেননি। তাঁদেরও বাহিরে খেতে যেতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে ছেঁড়াদ্বীপ আর নীলগিরি দেখতে । তাঁরাও মানুষ। তাঁদেরকেও সঙ্গে নিন।সময় দিন।

অবিবাহিতরা আবার হাউকাউ শুরু করবেন,“আমাদের তো বউ নেই , আমাদের কী হবে”?

উত্তর পাওয়া যাবে আগামী পর্বে ইনশা আল্লাহ্‌ ……

শেয়ার করুনঃ