বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

কতই বা বয়স হবে ছেলেটার । বিশের কোঠা হয়তো সবে পেরিয়েছে । মুখটা দেখলে আরো ছোট মনে হত । বাচ্চা ছেলের মতো একধরনের সরলত ছিল সেই মুখে । ছেলেটা জানতো কীভাবে জীবনকে উপভোগ করতে হয় । বন্ধু , আড্ডা ,গান । আজ এর বাসায় বারবিকিউ পার্টি , তো কাল ওর বাসায় লেট নাইট পার্টি , কয়দিন পর পরই বন্ধুদের সঙ্গে হ্যাং আউটে যেত। বাবা মার কেইউ তাকে শাসন করতে পারতো না । পরিবারের ছোট ছেলে ছিল তো । ছিল বলতে এখন আর নেই । হুট করে একদিন সে মরে পড়ে ছিল রাস্তার পাশে ।

ছেলেটা প্রচন্ড ভালবাসতো কার ড্রাইভিং । এই বয়সের ছেলে ছোকরারা যা হয় আরকি । আস্তে গাড়ি  চালাতে জানে না । এই ছেলেটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না । রাস্তায় গাড়ি  নিয়ে নামলে আর হুশ থাকতো না স্পিডোমিটারের কাঁটার দিকে । ধুলো উড়িয়ে, প্রচন্ড শব্দে আশে পাশের মানুষজনকে সচকিত করে ড্রাইভিং করত । তবে খুব একটা ভয়ের কিছু ছিল না । ছেলেটা ‘কার’ বেশ ভালোই চালাতো ।

একদিন বন্ধুদের নিয়ে হ্যাং আউট করার সময় সে মারাত্মক একটা এক্সিডেন্ট করে বসল । তার বন্ধুদের তেমন কোন ক্ষতি হলনা । দুএক যায়গায় সামান্য কেটে গেল আর কারো কারো হাতের চামড়া এক আধটু ছিলে গেল । কিন্তু সে -স্পট ডেড।

 

বন্ধু বান্ধবেরা শোকে একটু বেশি মুষড়ে পড়ল । স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই কান্নাকাটি করল । কবর দিয়ে আসার পরও বেশ কয়েকদিন তাদের শোকের মাত্রা এতটুকুও কমলোনা । বরং কিছুটা যেন বাড়ল ।

সন্দেহ হওয়াতে লোকজন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করল – “কী ব্যাপার তোমাদের ? তোমরা মনে হয় একটু বেশিই কান্নাকাটি করে ফেলছ ?”

কেঁচো খুড়তে যেয়ে বেরিয়ে এলো সাপ ।

… ছেলেটা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ছিল । পর্নমুভি দেখতে দেখতে তার এমন অবস্থা হয়েছিল যে তার আর ইন্টারনেটের ফ্রি পর্ন দিয়ে পোষাত না । তার দরকার ছিল হার্ডকোর পর্ন । তাই সে তার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে পর্নমুভি কিনে নিত । নতুন কোন হার্ডকোর পর্ন মুভি রিলিজ হলেই সেটা তার ইমেইল একাউন্টে চলে আসত । তার বন্ধুরাও ছিল পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত । তার বন্ধুরা তাকে বলেছিল যে, আমরা সবাই টাকা দেওয়ার চেয়ে তোর মেইলে যা আসে তা আমাদের সেন্ড করে দিস। সেইটাই ভাল হবে। ছেলেটা তাতে রাজি হয়। তার মেইলে যা আসত সে সাথে সাথেই তার বন্ধুদের পাঠিয়ে দিত। একটা পর্যায়ে সে নতুন নতুন মেইল পাঠাতে পাঠাতে বিরক্ত হয়ে “অটো ফরোয়ার্ড” সিস্টেম চালু করেছিল। এর ফলে নতুন মেইল আসা মাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বন্ধুদের মেইল একাউন্টে সেগুলো চলে যেত।

তারা বেশি বেশি কাঁদছিল কারণ তাদের মেইল একাউন্টে তখনো সয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নতুন পর্ন এসেই যাচ্ছিল অথচ তাদের প্রিয় বন্ধুটিই ছিল অন্ধকার কবরে।

আল্লাহু আকবার!

ছেলেটার বন্ধুরা এটি বন্ধ করতে চাচ্ছিল কিন্তু তাদের হাতে কোন উপায় ছিলনা । ছেলেটার সাবস্ক্রিপশন শেষ হওয়ার পর তাদের একাউন্টে নতুন নতুন পর্ন আসা বন্ধ হল । তার সব বন্ধুরা তওবা করে একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহ্‌র (সুবঃ) দিকে প্রত্যাবর্তন করল ।

এটা নিছক বানানো কোন ঘটনা নয় । পুরোপুরি সত্য ঘটনা । এক শায়খ এই ঘটনার কথা বর্ণনা করেন । ইউটিউবে এই লিঙ্কে যেয়ে নিজে একবার শায়খের মুখ থেকে শুনুন

দুই.

কয়েক বছর আগে আমাদের দেশে একটা মাল্টিলেভেল বিজনেস কোম্পানি “ডেস্টিনি” বেশ দৌরাত্ম বিস্তার করেছিল । এরা যদিও চোর বাটপার ছিল তবে এদের মাল্টিলেভেল বিজনেসের কন্সেপ্টটা অসাধারণ ছিল । আপনি তাদের কোম্পানিতে যতজন লোক ঢুকাবেন আপনি তাদের প্রত্যেকের ইনকাম থেকে কিছু কমিশন পাবেন । আপনার মাধ্যমে যদি খুব বেশি লোক তাদের কোম্পানিতে জয়েন করে তাহলে একসময় এমন অবস্থা হবে , আপনি কিছু না করেই মাসে আরামসে লাখ দুয়েক টাকা কামিয়ে ফেলবেন । বসে বসে পায়ের উপর পা তুলে শুধু খাবেন আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবেন।

সুবহানাল্লাহ , আল্লাহ্‌র (সুবঃ) বান্দার সাথে জান্নাত কেনাবেচার ব্যবসাতেও বান্দার

পাপ পুণ্যের হিসাব অনেকটা এভাবেই করা হয় । মনে করেন – আপনার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ (সুবঃ) যদি কাউকে হেদায়াত দান করলেন । এরপর সেই ব্যক্তি যে যে নেক আমল করবেন সেখান থেকে আপনার সওয়াবের একাউন্টে বেশ কিছু সওয়াব যোগ হয়ে যাবে (আমলকারী ব্যক্তিও তাঁর আমলের পূর্ণ সওয়াব পাবেন । তাঁর ভাগের সওয়াব বিন্দুমাত্র কমবে না )।

আবার আপনার কারণে কোন ব্যক্তি যদি পাপ কাজে লিপ্ত হয়, আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা করে তাহলে সেই পাপ কাজের জন্য সে ব্যক্তিতো শাস্তি পাবেই সেই সাথে আপনাকেও তার সঙ্গে শাস্তি ভাগাভাগি করে নিতে হবে । হাদীসে এরকম বর্ণনায় এসেছে ।

……… যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ভাল পথে আহবান করে, তবে যত মানুষ তার অনুসরণ করবে তাদের সকলের পুরস্কারের সমপরিমাণ পুরস্কার সে ব্যক্তি লাভ করবে, তবে এতে অনুসরণকারীদের পুরস্কারের কোনো ঘাটতি হবে না। আর যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিভ্রান্তির দিকে আহবান করে তবে যত মানুষ তার অনুসরণ করবে তাদের সকলের পাপের সমপরিমাণ পাপ সে ব্যক্তি লাভ করবে, তবে এতে অনুসরণকারীদের পাপের কোনো ঘাটতি হবে না। (মুসলিম)।

আল্লাহ্‌ (সুবঃ) কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় আমাদের নিষেধ করে দিয়েছেন আমরা যেন পাপ কাজে একে অন্যকে সাহায্য না করি । ইরশাদ হচ্ছে

‘……সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।’ (সূরা মায়েদাহ : আয়াত ৫)

ভাই আমার, আপনার নিজের লাইফ স্টাইল সম্পর্কে একটু চিন্তা করে দেখেন কীভাবে পদে পদে আল্লাহ্‌র (সুবঃ) এই আদেশ অমান্য করে চলছেন। জেনে অথবা না জেনে ফ্রেন্ড সার্কেলদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বন্ধুদের হার্ডডিস্ক পর্ন মুভি দিয়ে বোঝায় করে দিচ্ছেন,তাদের সঙ্গে  পর্নমুভির লিঙ্ক শেয়ার করছেন,আইটেম গার্লদের নিয়ে,ক্লাসের মেয়েদের নিয়ে রসালো আলোচনা করে তাদের মন বিষাক্ত করে দিচ্ছেন।

ভাই আমার , বুকে হাত রেখে আজ একটা প্রশ্ন করুন তো নিজেকে । আপনি যে বন্ধুদের মাঝে এইভাবে অশ্লীল জিনিসপত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন এতে আপনার কি লাভ হচ্ছে ? সিরিয়াসলি কি লাভ হচ্ছে আপনার ?

আপনি নিজে যখন ঐসব নিষিদ্ধ জিনিস পত্র দেখছেন তখন নিজে খুব বড় ধরণের পাপ করছেন কিন্তু “আদিম” মজাটাও তো পাচ্ছেন । কিন্তু আপনার সাপ্লাই করা পর্ন মুভি দেখে আপনার বন্ধু বান্ধবরা যখন তাদের লালসা মেটাচ্ছে তখন আপনার কি লাভ হচ্ছে ? কোন লাভই হচ্ছে না । কিন্তু আপনাকে কাঁধে নিতে হচ্ছে আপনার বন্ধুর করা পাপের ভারও । আপনার বন্ধুদের কাছ থেকে যতজনের কাছে আপনার দেওয়া পর্ন মুভি বা আইটেম সং ছড়িয়ে পড়বে এবং যতজন যতবার তা দেখে ‘মজা’ নিবে আপনার একাঊন্টে তাদের করা পাপের ভাগ যোগ হতেই থাকবে । আপনি মজা টজা কিছুই পেলেননা , কিন্তু শেষ বিচারের দিন দেখা যাবে পাহাড় পরিমাণ পাপের মালিক হয়ে বসে আছেন । কেমন লাগবে তখন ? এটা কি শুধু শুধু পাগলামি করা নয় , নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মারা নয় ?
ভাই আমার , একবার চিন্তা করুন তো পৃথিবীতে শত শত জিবি পর্ন রেখে ধুম করে একদিন মারা গেলেন। তখন কী হবে আপনার ? কবরে গিয়েও পাপ কামাতে থাকবেন ।

এরকম পাগলামি করার কোন মানে আছে ? জীবন তো একটাই , তাই না ? একে নিয়ে জুয়া খেলার কোন মানে হয়? আপনি নিজে পর্ন মুভি দেখা ছাড়তে পারছেন না , চোখের হেফাজত করতে পারছেন না ভালো কথা । নিজে নিজে দেখুন , মজা নিন আর পাপ কামাতে থাকুন নিজ দায়িত্বে । কিন্তু ভুলেও এমন কোন কাজ করবেন না , যাতে আপনার বন্ধু বান্ধব , আপনার চারপাশের সমাজের মানুষ গুলোর মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে । খুব সাবধান ভাই , খুব সাবধান । ফেসবুকের কোন একটা পোস্টে আপনার করা একটা ক্লিক বা কমেন্ট অথবা আপনার কোন শেয়ার দেওয়া লিংকের মাধ্যমে হয়তো আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা মানুষগুলোর মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে অশ্লীলতা । এই ব্যাপারগুলোতেও সাবধান হওয়া দরকার ।

অনেক বোনই  ফেসবুকে  নিজেদের ছবি দেন । আপনারা হয়তো তেমন কিছু না ভেবেই এসব ছবি আপলোড দেন অথচ আপনাদের এইসব ছবি এক একটা ছোট অঙ্গার , যেটা এক সময় আস্তে বড় হয়ে একসময় পুড়িয়ে দিতে পারে কোন বিশাল বন।

তো যা বলছিলাম , পর্ন মুভির ডিলার হিসেবে সুনাম কুড়িয়ে থাকলে আপনার উচিত এখনি , ঠিক এই মুহূর্তে , এই আর্টিকেল পড়া শেষ না করেই ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যাওয়া । দু রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহ্‌র (সুবঃ) কাছে তওবা করুন । আপনার পাপ যদি আকাশ সমান উঁচু হয়ে যায় তাহলেও আল্লাহ্‌’র (সুবঃ) কাছে একনিষ্ঠ ভাবে তওবা করলে এবং ভবিষ্যতে সেই কাজ আর না করলে ইনশা আল্লাহ্‌ আল্লাহ (সুবঃ) আপনার পাপ ক্ষমা করে দিবেন ।

“তারা আল্লাহর কাছে তওবা করে না কেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে না কেন? আল্লাহ যে ক্ষমাশীল, দয়ালু।” ( ৫ঃ৭৪)

“কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (২৫ঃ৭০)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “হে আদম সন্তান! যতক্ষন পর্যন্ত তুমি আমাকে ডাকতে থাক এবং আমার আশা পোষণ করতে থাক সে পর্যন্ত আমি তোমাকে মার্জনা করতে থাকি, তোমার যত পাপই হোক না কেন। আর আমি কোন ভয় করি না। হে আদম সন্তান! যদি তোমার পাপরাশি আসমান পর্যন্তও পৌছে, তারপর তুমি আমার কাছে মাফ চাও, আমি তোমাকে মাফ করে দিই এবং আমি কাউকে গ্রাহ্য করি না।”

শেষ করব কুর’আনের দুটি আয়াত দিয়ে …

“…মুমিন নর ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজের নিষেধ করে।”  (সূরা আত-তাওবা: ৭১ )

“…মুনাফিক নর ও মুনাফিক নারী একে অপরের অনুরূপ,তারা অসৎ কর্মের নির্দেশ দেয় এবং সৎকর্ম নিষেধ করে।” – ( সূরা আত-তাওবা: ৬৭)

আপনি কোন দলে থাকবেন ?

– মুমীনদের দলে (যাদের বাসস্থান জান্নাত) না মুনাফিকের দলে (যাদের বাসস্থান জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর) ?

জীবন আপনার সিদ্ধান্তও আপনার ।

শেয়ার করুনঃ