বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

মানুষ যে কয়টা ফিতরাত নিয়ে জন্মায় তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ফিতরাত হলো যৌনতা। মানুষের শারীরিক এবং মানসিক যৌন চাহিদা রয়েছে এবং এটা এমন এক চাহিদা যার কোন অলটারনেটিভ নেই, তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই চাহিদা চরতার্থ করার প্রয়াস পায়, বৈধ উপায়ে না পারলে অবৈধ উপায়ে। এখন কেউ যদি বলে সে সারাদিন অশ্লীল ছবি দেখছে, পর্ণ দেখছে, বান্ধবীকে সাথে নিয়ে হাটে- মাঠে- ঘাটে, লিটনের ফ্ল্যাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু এটা তার মধ্যে কোন অনুভূতিই তৈরী করছে না তাহলে হয় সে মিথ্যে বলছে না হয় তার মেডিক্যাল সমস্যা আছে।
.
.
যারা আজকের আধুনিক সভ্য মানুষের আদি পিতামাতারা জংলি হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো বলে গাঁজাখুরি থিউরি দিয়ে থাকে তারাও নিজেদের ইজ্জতের বিষয়ে অল্পবিস্তর সচেতন। তাই কিনা তারা অন্তত এতটুকু বলে আদিম মানুষ বনে জঙ্গলে ল্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়াতো না, তারা পশুর চামড়া, ঘাস, লতাপাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখতো, তারপর তাদের থিওরিতে নীতিবাক্য হিসেবে কিছু টীকা থাকে যেমন, মানুষ প্রাকৃতিক ভাবেই সমাজবদ্ধ, লজ্জাশীলতা সেটা আমাদের আদিম যুগ থেকেই মানুষের মধ্যে বাই বর্ন ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব আমরা আমাদের স্কুলের বইতে পড়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে মানুষ দাবি করে এরকম একটা জংলী পূর্বপুরুষদের আদিমতা চাপিয়ে তারা এখন আধুনিক, সভ্য হয়েছে সেই তারাই এখন পোশাক আশাকে, চালচলনে, ভাবাদর্শে সেই আদিমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

.
দুর্ভাগ্যবশত সেদিন একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম। আর্টিকেলটা যে টপিক নিয়ে হবে ভেবেছিলাম মূলত সেই টপিকে ছিল না তাই কিছুদূর গিয়েই অফ করতে হল। আর্টিকেলটা ছিল একটা কথিত কনজার্ভেটিভ মুসলিম ফ্যামিলিতে জন্ম নেওয়া একজন তরুরী তার মা বাবা, সমাজকে ফাঁকি দিয়ে কি করে ডজনেরও বেশী লোকের সাথে যৌনকর্ম সম্পন্ন করেছে তার খুঁটিনাটি। লেখাটা সেই তরুনী নিজেই লিখেছে এবং বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পত্রিকায় সেটা ছাপা হয়েছে, টুইটারে সেই আর্টিকেল নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে, এবং মাঝখান দিয়ে সেই তরুণী এরকম একটা অসভ্য কাজ করেও সো কলড সভ্য মানুষের আধুনিক দুনিয়াতে একজন সাহসী, উদারপন্থী নারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। লজ্জাশীলতা আদিম যুগ থেকেই মানুষের মধ্যে ছিল এই থিউরিতে বিশ্বাস করা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা আজ লজ্জাহীনতা, যৌনতা, ব্যভিচারের গল্প বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। তসলিমা নাসরিনরা দুই পয়সার বই বিক্রির জন্য নিজের, স্বামীর, মা বাপের, চাচা কাকু চৌদ্দ গোষ্ঠীর আকাম কুকামের ফিরিস্তি বর্ণনা করে যায় নির্দ্বিধায়। অমুক দল বিশ্বকাপ জিতলে তমুক বিবস্ত্র হবেন, বলিউড মাতাচ্ছেন অমুক পর্ণস্টার এসব আজ আমাদের পত্রিকার শিরোনাম হয়। পর্ণস্টারদের নামে বায়ান্ন হাজার টাকা দামে ঈদের পোশাক বিক্রি হয় এই আমাদের মুসলিম দেশে। আর আমাদের বাবা মায়েরাই সেসব পোশাক কিনে দেন তাদের মেয়েদের, জাতে তোলার জন্য, আধুনিক বানানোর জন্য। একটা রিপোর্ট বলছে মাঝে মাঝে তারকারা ইচ্ছে করেই নিজেদের যৌনকর্মের ভিডিও লিক করেন, শুধুমাত্র বিখ্যাত হওয়ার জন্য, মানুষের কাছে পরিচিত পাওয়ার জন্য, আলোচনায় থেকে তাদের আপকামিং মুভির কাটতি বাড়ানোর জন্য!
.
সামরিক আগ্রাসনের চেয়েও মুসলিম একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য কাফেররা যেসব উপকরণ ব্যবহার করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হল অবাধ যৌনতা, অশ্লীলতা। যৌনতা আর অশ্লীলতার এই নব্য জাহিলিয়াত ১৪০০ বছর আগের জাহিলিয়াতকেও হার মানিয়েছে। সেই সময়ের জাহেলী যুগে মুশরিকরা বিবস্ত্র হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করত কারণ তারা বলত যে কাপড় পরিধান করে তারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে সেই কাপড় পরিধান করে আল্লাহর ঘর তাওয়াফ তারা করতে পারবে না। কিন্তু সেই জাহিলিয়াত অজ্ঞতার কারণে ছিল, আজকের কু প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জাহিলিয়াত ছিল না। বিবস্ত্র হলেও মহিলারা তখন রাতের অন্ধকারে তাওাফ করত আর কবিতা আবৃত্তি করত, “আজ শরীরের কিয়দংশ অথবা পুরো শরীর বিবস্ত্র হয়ে যাবে। কিন্তু যে অংশ বিবস্ত্র হবে তা আমি পরপুরুষের জন্য বৈধ করে দিব না”। মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বায়াত দিতে আসলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম কুরআনের আয়াত পাঠ করলেন,
.
“হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না…” [সূরা মুমতাহিনাঃ ১২]
.
তখন সাথে সাথে হিন্দ বেশ বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করল ইয়া রাসূলুল্লাহ! একজন স্বাধীন নারী কি যিনা করতে পারে? তারা মুশরিক ছিল, অজ্ঞ ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে আখলাক ছিল, হায়া ছিল, শালীনতা ছিল। আর আজকের তথাকথিত সভ্যতার উৎকর্ষতার যুগে স্বাধীনতা আর উদারপন্থার মানে হল বেহায়া হওয়া, নির্লজ্জ হওয়া, যতটা পারা যায়!
.
শয়তান চায় আপনি নির্লজ্জ হোন, শয়তানের দোসর কাফের মুশরিকরাও চায় আপনি নির্লজ্জ হোন। কারণ তারা জানে সামরিক আগ্রাসন কিছু মানুষকে হত্যা করতে পারে, বাড়িঘর ধন সম্পদ ধ্বংস করতে পারে কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতর যে অন্তর সেটা সামরিক শক্তি দিয়ে ধ্বংস করা যায় না। তবে হ্যাঁ সেটা খুব ধীরে ধীরে কলুষিত করা যায়, স্লো পয়জনিং করে অন্তরটাকে মেরে ফেলা যায়, পাথরের মত শক্ত করে দেওয়া যায়। আর এই কাজে সবচেয়ে ফলপ্রসূ হল অশ্লীলতা, যৌনতার নোংরামি। এটা একদিকে মানুষকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয় অন্যদিকে এমন এক অন্তর তৈরি করে যা আল্লাহর সাথে কোনভাবেই কানেক্টেড হতে পারে না। আল্লাহর কিতাব শুনে সেই অন্তর থাকে নির্লিপ্ত, নিথর। কারণ সেই অন্তর মরে গেছে। And finally there is a spiritual death! তাই আল্লাহ সুরা আল ইসরায় বলেন,
.
“আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। [সূরা আল ইসরাঃ ৩২]”
.
আল্লাহ কিন্তু “লাতাযিনু” বা ব্যভিচার করো না স্রেফ এটা বলেননি। তিনি বলেছেন ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না, অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেও না। কারণ এটা একটা পথ, وساء سبيلا মন্দ পথ, নিকৃষ্ট পথ। অমুক মুভির ঐ কয় মিনিটের খারাপ দৃশ্যটা, ফেসবুক পেজের মাঝে মধ্যে খারাপ ছবিগুলো, ১৫+, ১৮+ যেভাবেই চিন্তা করুন না কেন একটু একটু করে এসব কাজই আপনাকে ঐ পথে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আল্লাহ শুধু বলেননি ব্যভিচার করো না, বরং তিনি বলেছেন ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না, ঐ পথটাই কখনো মাড়িও না। কারণ এটা আমাদের আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটায়, এর প্রভাব পড়ে আমাদের ঈমানে, আমাদের সালাতে, আমাদের দোয়ায়।
.
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে আল্লাহ এই আয়াতের পরের আয়াতে বলেছেন,

“সে প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন…” [সূরা আল ইসরাঃ ৩৩]
.
আল্লাহ বলছেন নিরীহ মানুষকে হত্যা করো না, তার মানে ফিজিকাল মার্ডার। কিন্তু তার আগের আয়াতে আল্লাহ স্পিরিচুয়াল মার্ডারের কথা বলেছেন ,فاحشة যা অন্তরকে মেরে ফেলে আর এরপরই এসেছে ফিজিকাল মার্ডারের কথা قتل। আল্লাহ এখানে দুই ধরণের অপরাধের কথা উল্লেখ করেছেন একটি স্পিরিচুয়াল মার্ডার আরেকটি ফিজিক্যাল মার্ডার, কিন্তু স্পিরিচুয়াল মার্ডারের কথা আগে উল্লেখ করেছেন। কারণ যার আত্মা মরে যায় তার রক্ত মাংসের শরীরটার আর কি দাম থাকে। যার আত্মার শক্তি শেষ হয়ে যায় তার সিক্স প্যাক শরীরের শক্তি আর কি কাজে আসে! আর তাই শয়তান প্রথমে এই আত্মাকে শেষ করে দিতে চায়। আর সেটা আপনাকে ফাহেশা কাজে যুক্ত করার মাধ্যমে।
.
তাই যারা রাহমানের বান্দা হতে চায়, যারা এই দ্বীনের ঝাণ্ডা বহন করতে চায় তাদের উচিত শারীরিক এবং মানসিক দুইভাবেই শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি গ্রহণ করা। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক দুর্গ যেমন দরকার তেমনি দরকার আত্মাকে কুলষতা থেকে মুক্তির জন্য নিশ্ছিদ্র দুর্গ। দরকার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। দরকার সমস্ত ফাহেশা এবং মন্দ কাজ থেকে আত্মাকে হেফাজরত করা। আল্লাহ বলেন,

“যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়”। [সূরা আশ শামসঃ ৯-১০]

লিখেছেন –  ইউসুফ আহমেদ

পড়ুন প্রথম চারটি  পর্বঃ

কুড়ানো মুক্তো (প্রথম পর্ব) – https://bit.ly/2oZCWEn
কুড়ানো মুক্তো (দ্বিতীয় পর্ব) – https://bit.ly/2p1YeS2
কুড়ানো মুক্তো (তৃতীয় পর্ব) – https://bit.ly/2x3aGoY
কুড়ানো মুক্তো (চতুর্থ পর্ব) – https://bit.ly/2x8qyWv
শেয়ার করুনঃ