বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

সুনসান রাত ।

অফিস থেকে একাকী বাসায় ফিরছে মারিয়া।

ল্যামপোস্টের ফিকে হলুদ আলোতে তার ছায়া অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে পুরো ফুটপাত দখল করেছে ।সেদিকে তাকিয়ে হাঁটছিল সে । আজ অফিসে প্রচুর খাটাখাটনি হয়েছে । শরীর বিধ্বস্ত।কোনমতে বিছানায় যেতে পারলে বাঁচে ।বাসায় প্রায় চলে এসেছে অবশ্য।এই গলিটার শেষমাথায় পৌঁছে বামে মোড় নিয়ে পঞ্চাশ গজের মতো আগালেই তাঁর এপার্টমেন্ট ।হটাৎ তাঁর ছায়ার ওপর পেছন থেকে  আরেকটা ছায়া পড়াতে ঘুরে দাঁড়ালো মারিয়া । সেই টেকো লোকটাকে দেখলো সে। মারিয়া ঘুরে  দাঁড়াতেই লোকটা তাঁকে একটা হাসি উপহার দিল ।

হাসিটা প্রচন্ড অশ্লীল ।

মারিয়ার কলিজা শুকিয়ে গেল ।এই লোকটা অনেকক্ষন থেকেই তাঁকে অনুসরণ করছে । মতলব খারাপ ।

‘মরার কপাল’! ভাবলো মারিয়া । একটা লোকও নেই এই গলিতে, কিছু হয়ে গেলে তাঁকে সাহায্য করবে । ভাগ্যের বাপ মা তুলে  কষে একটা গালি দিয়ে  মারিয়া হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল । পেছন থেকে লোকটা এক দৌড়ে এসে ধরে ফেলল মারিয়াকে । বুনো দাঁতালো শুয়োরের মতো হাসছে লোকটা । মারিয়ার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো ।

পাঠককে সাস্পেন্সের মধ্যে রেখে দিয়ে কিছু কথা বলে নেই ।

মনে করুন ঘটনাস্থল জার্মানি । টেকো লোকটা যদি মারিয়াকে রেপ না করে, কিন্তু অন্য সম্ভাব্য সব উপায়ে অপমান করে,(লিখতে খুবই অস্বস্তি লাগছে। গ্রাফিক বর্ণনা দেবার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী) তাহলে জার্মানির আইন অনুসারে টেকো লোকটার কোন শাস্তিই হবেনা ।উলটো মারিয়াকেই বিচারের সম্মুখীন হতে হবে যদি লোকটা থেমে যাবার পরেও মারিয়া লোকটার ওপর চড়াও হয় , চড় থাপ্পড় মারে । মারিয়া শুধু ততক্ষণই প্রতিরোধ করতে পারবে যতক্ষন লোকটা তাকে অপমান করবে ।

http://tinyurl.com/nt3u273

কি অবিশ্বাস্য ব্যাপার ! ভাবা যায় !

নারী স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, সকলের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে যারা রোজ রোজ চিৎকার করে গলা ফাটায় তাদের দেশেই এ কোন অদ্ভুত আইন! শুন্য হাড়ি বেশি বাজে প্রবাদটা আসলেই সত্যি ।

[অবশ্য  এবছর (২০১৬) সালে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে জার্মানি সরকার]

প্রিয় পাঠক, পাশ্চাত্যে এবং তাদের দেওয়া ফর্মুলা অনুসরণ করে যে সব দেশ চলছে তার কোনটিতেই নারীরা নিরাপদ নন । অফিস আদালত (http://tinyurl.com/hkaugzs ), স্কুল কলেজ (http://tinyurl.com/jagb8ky ), রাস্তাঘাট (http://tinyurl.com/j8cnl6z )সবখানেই নারীরা অপমান, লাঞ্ছনা , প্রতারনা আর বৈষ্যমের শিকার হন ।

 

গত পর্বে (http://tinyurl.com/hkaugzs ) আমরা আলোচনা করছিলাম বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীরা কত ব্যাপকহারে যৌন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন সে বিষয় নিয়ে।এই পর্বেও আমাদের সে আলোচনা অব্যাহত থাকবে । এই পর্বে মূলত বিশ্বের অর্থনীতিতে যেসব দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে মোটামুটি সে সব দেশের কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপর চালানো সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট এর চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে । এই ছোট্ট পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ যেমন নেই তেমনি সব দেশ কাভার করাও সম্ভব না । ধৈর্য ধরে পড়ার অনুরোধ থাকলো ।

ইতালীঃ

৫১.৮ শতাংশ নারীরা অভিযোগ করেছেন তারা তাদের জীবনে একবার হলেও কর্মক্ষেত্রে  যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন। ISTAT এর তথ্য অনুসারে গত তিনবছরেই কর্মক্ষেত্রে প্রায় ৪ মিলিয়ন যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে । সবচেয়ে বেশী ঝুঁকির মধ্যে থাকেন দেশের দক্ষিণাংশে বসবাস করা সদ্য গ্র্যাজুয়েটরা ।

[http://tinyurl.com/4llqogx ]

জার্মানিঃ

শতকরা ৪৮ জন নারী কর্মক্ষেত্রে তাদের জীবনে একবার হলেও যৌন নির্যাতনের শিকার হন । শতকরা ৭ জন নারী প্রতিনিয়তই যৌন নির্যাতনের শিকার হন ।

http://tinyurl.com/j272oz3

দুঃখজনক ব্যাপার হলো জার্মানিতে যৌন নির্যাতন, বিচারের আওতায় পড়ে না ।অবস্থা খুবই গুরুতর হলে এটাকে ইনসাল্ট হিসেবে চার্জ করা হয়!

http://tinyurl.com/nt3u273

অস্ট্রেলিয়াঃ

2012 Sexual Harassment National Telephone Survey  এর জরিপ অনুসারে কর্মক্ষেত্রে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ১ জন যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়ে থাকেন ।

http://tinyurl.com/hg4wtub

কানাডাঃ নব্বই শতাংশের কিছু বেশী কানাডিয়ান নারীরা বলেছেন তাঁরা তাদের কর্মক্ষেত্রে অন্তত একবার কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন । নব্বই শতাংশ পুরুষও স্বীকার করেছেন তাঁরা অন্তত একটি কর্মক্ষেত্রে সংঘটিত যৌন নির্যাতনের কথা জানেন বা নিজে সাক্ষী ছিলেন । কর্মক্ষেত্রের এই যৌন হয়রানীই বোধহয় সেই প্রভাবকগুলোর একটা , যেগুলোর কারণে কানাডিয়ান নারীরা খুব ঘন ঘন চাকুরী পরিবর্তন করেন

http://tinyurl.com/ctvwqem

ইংল্যান্ডঃ

Trades Union এবং Everyday Sexism Project এর জরিপ অনুসারে অর্ধেকেরও বেশী (শতকরা ৫২ জন) নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের (ধর্ষণ,কুইঙ্গিত,বাজে মন্তব্য,স্পর্শ) শিকার হন । ১৬-২৪ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে দাড়ায় শতকরা ৬৩ জনে।

প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন বলেছেন তাঁরা তাঁদের বস বা ঊর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তা দ্বারা যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন । অভিযোগ করলে তাঁদের ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বা তাঁদের অভিযোগ হয়তো সিরিয়াসলি নেওয়া হবে না , এই ভয়েই প্রতি চার জন মহিলার মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের ব্যাপারে চুপ করে থাকেন ।

Angela Rayner, Labour’s equalities  এর মুখপাত্র বলেছেন, এই জরিপের ফলাফল দেখে তিনি বিস্মিত”, “এটা মজার কিছু না যে প্রতি তিনজন মহিলার মধ্যে একজন কাজ করার সময় তার শরীর নিয়ে সহকর্মীদের বিকৃত রসিকতার শিকার হবেন”।

http://tinyurl.com/jdcfos4

ইন্ডিয়াঃ

Sisters for Change  এর জরিপ অনুসারে  বেঙ্গালেরু শহরের প্রতি সাত জন গার্মেন্টস নারী কর্মীর মধ্যে একজন ধর্ষণ বা অন্য ধরণের যৌন নির্যাতনের শিকার হন । ৬০ শতাংশ নারীকে প্রতিকূল কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হয় ।

কুইংগিত,কুপ্রস্তাব, জোরপূর্বক পর্ণমুভি দেখতে বাধ্য হওয়া, মারধোরের স্বীকার হওয়া  বেঙ্গালেরু শহরের ১২০০ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির অসংখ্য নারী শ্রমিকের প্রতিদিনকার রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ।

খুবই কম ক্ষেত্রেই নির্যাতনের কথা কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় । নির্যাতনের স্বীকার হওয়া নারীশ্রমিকদের ৮২ শতাংশই পুলিশ বা কর্তৃপক্ষের কাছে কোন অভিযোগ পেশ করেন না , কারণ তারা বিশ্বাস করেন এর বিচার তারা কখনোই পাবেন না ।

Alison Gordon (Executive director of the UK-based Sisters for Change)   মন্তব্য করেন , “ আমরা জরিপ চালানোর সময় নারী কর্মীদের ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের বিভৎসতার মাত্রা দেখে হতবাক  হয়ে গেছি” ।

http://tinyurl.com/glvsy2g

http://tinyurl.com/z55j2ag

জাপানঃ

জাপান সরকারের  চালানো একটা জরিপ অনুযায়ী প্রায় একতৃতীয়াংশ নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের (বাজে মন্তব্য, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ,ধর্ষণ) স্বীকার হন তাদেরই পুরুষ সহকর্মী বা বস’এর হাতে । এদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ নারী মুখ বুজে সব সহ্য করেন । প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন রিপোর্ট করলেও সেটা আমলেই নেওয়া হয়না ।

অফিসের উঁচু পদগুলোতেও  নারীদেরকে খুব একটা দেখা যায়না । [http://tinyurl.com/hgvs6ct ]

জাহেলিয়ায়েত যুগে যখন সমাজের চোখে নারী আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য ছিলনা, নারীরা ছিলই কেবলি ভোগ্যপন্য ,তখন ইসলাম এসে নারীকে দিয়েছিল প্রকৃত মুক্তির স্বাদ ।মুসলিমরা নারীকে দিয়েছিল রাণীর মর্যাদা ।আর স্বাধীনতার মুলো ঝুলিয়ে  পাশ্চাত্য নারীদেরকে ঘর থেকে বের করে এনে  বানিয়েছে যৌন দাসী । এরপরেও পাশ্চাত্য আর তাদের চামচারাই নাকি  নারীদের মুক্তিদাতা ! এরাই নাকি নারীকে দিয়েছে প্রকৃত মর্যাদা !

#নারীস্বাধীনতা

#একেই_বলে_সভ্যতা

চলবে ইনশাআল্লাহ্‌……

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত)

শেয়ার করুনঃ