বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।

 

আমাদের সমাজের অনেক গভীরে পর্ন মুভি শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে । ছেলে, বুড়ো , মধ্য বয়স্ক বিবাহিত, অবিবাহিত এমনকি অনেক মেয়েরাও আজকাল পর্নমুভিতে আসক্ত। কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় এই ভয়ংকর গুনাহ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার প্রয়াস খুব একটা দেখা যায়না আমাদের দেশে । অনেক মানুষের সঠিক ধারনাও নেই পর্নমুভির অপকারিতা সম্পর্কে। আমাদের ব্লগের যাত্রা শুরু হয়েছিল মানুষজনকে পর্ন মুভির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং চোখের হেফাজত করার মাধ্যমে আল্লাহ’র (সুবঃ) আনুগত্য করতে মানুষজনকে সহায়তা করার উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে । আমাদের কাজটা একটু সহজ হত যদি বাংলা ভাষায় পর্ন মুভির ব্যাপার গুলো নিয়ে কোন ম্যাটেরিয়ালস থাকতো । কিন্তু বাংলা ভাষায় পর্নমুভির টপিক নিয়ে খুব কম কাজ হয়েছে । কাজেই ব্লগের আর্টিকেল লিখতে যেয়ে আমাদের বেশীরভাগ সময় সাহায্য নিতে হয় ইংরেজীতে লিখা বিভিন্ন বই কিংবা ওয়েবসাইটের । যেহেতু বাংলা ভাষায় এ ব্যাপার নিয়ে গবেষণা হয়নি আর তেমন কোন রিসোর্সও নেই এবং আমরা টুকটাক কাজ করছি এগুলো নিয়ে , কাজেই আমাদের মনে হয়েছে আমরা যতদূর পারি ইংরেজী ভাষার রিসোর্স গুলো বাংলায় অনুবাদ করে রাখি । কোন একসময় গবেষনা বা অন্য কোন কাজে কেউ এখান থেকে উপকৃত হতে পারেন ।

 

# একবার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসন পর্ন মুভির ব্যাপারে বেশ উদার নীতি গ্রহণ করল । পর্ন মুভি বানানো ,প্রচার , প্রসার পূর্বে আইনত নিষিদ্ধ থাকলেও তারা সেসময় চোখ বুজে রাখতো । দেখেও না দেখার ভান করতো । ফলাফল – ধর্ষণের ঘটনা ২৮৪% বেড়ে গেল একই সময় অস্ট্রেলিয়ায় কুইন্সল্যান্ডে পর্নমুভির বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে খুব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হল । কিছুদিন পর প্রশাসন দেখল ধর্ষণ ঘটনা পূর্বের তুলনায় মাত্র ২৩% বৃদ্ধি পেয়েছে । হাওয়াইতে একবার পর্নমুভির ব্যাপারে উদারনীতি গ্রহণ করা হল , কিছুদিন যাবার পর পর্নমুভির বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে খুব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হল তারপর আবার উদারনীতি । ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যখন পর্ন মুভির ব্যাপারে উদারনীতি নেওয়া হয়েছিল তখন ধর্ষণের মাত্রা অনেক বেশী ছিল , যখন প্রশাসন কঠোরতা অবলম্বন করেছিল তখন ধর্ষণের মাত্রা কমে গিয়েছিল । তারপর আবার উদারনীতি গ্রহণ করার ফলে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল । (১) বাংলাদেশেও ইদানীং ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জরিপ অনুসারে চলতি বছরের (২০১৫) জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৪৯২ টি । ২০১৪ সালের পুরো বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল মোট ৯৩৯ টি । (প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশী। এগুলো কেবল মাত্র রিপোর্ট কৃত কেসের ঘটনা ) বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের ধর্ষণের উচ্চ মাত্রার জন্য দায়ী হতে পারে এ দেশে পর্নমুভি , আইটেম সং নামক সফটকোর পর্ন মুভির ব্যাপক প্রসার । ঢাকা ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর আয়েশা মাহমুদাও মনে করেন পর্নমুভি এবং ড্রাগসের সহজ লভ্যতা বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে ।

 

(২) Porn_fuels_rape:

 

আমি দীর্ঘ দিন যাবত হাজতবাস করছি। আমি এমন অনেক লোকের সংগে মিশেছি যারা এক একজন ছিল ভয়ংকর অপরাধী। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় প্রত্যেকেই ছিল মারাত্মকভাবে পর্নমুভিতে আসক্ত। F.B.I নিজেরা একবার গবেষণা করে দেখেছিল সিরিয়াল কিলারদের সবার একটা বিষয় কমন- সেটা হল পর্ন আসক্তি । এবং আমি মনে করি এটা সত্য”। – Ted Bundy, Serial Killer & Rapist of at least 28 Women & Girls

 

# “…পর্নোগ্রাফি হল থিওরি আর ধর্ষণ হল তার প্র্যাক্টিকাল”। Robin Morgan

 

(৩)Porn fuels violence: Cameron Hooker নামক এক লোকের ফ্যান্টাসী ছিল নারীদের বেঁধে বস্ত্রহীণ করে তার উপর নির্যাতন চালানো । তার এরকম ফ্যান্টাসীর উৎস ছিল এক বিশাল হার্ডকোর পর্নমুভির কালেকশান । একবার সে এক নারীর হাত পা এবং চোখ বেঁধে নির্যাতন করছিল । এক পর্যায়ে সেই নারী তার চোখে বাঁধা কাপড়ের ফাক দিয়ে আবিষ্কার করে বসে যে দেয়ালে একটা নগ্ন মহিলার ছবি ঝোলানো আছে । ছবির সেই মহিলাটা যেভাবে যে পজিশানে ছিল, Cameron ও তাকে ঠিক সেভাবে সেই পজিশানে বেঁধে রেখেছে । অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল সেই ছবি দেখে Cameron এর ভেতরে যে বিকৃত ফ্যান্টাসীর সৃষ্টি হয়েছিল সে সেটাই বাস্তবায়ন করছে এই নারীকে নির্যাতন করার মাধ্যমে ।

 

(৪)  যারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত তাদের পতিতালয়ে যাবার সম্ভাবনা সেই সব লোকদের থেকে বেশী থাকে যাদের পর্নমুভিতে আসক্তি নেই । আবার যেসব লোক নিয়মিতি পতিতালয়ে যায় তারা সেই সব লোকদের থেকে বেশীমাত্রায় পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত যারা হঠাৎ হঠাৎ পতিতালয়ে যায় ।

 

(৫) আপনি হয়তো ভাবতেই পারছেন না আপনার পর্ন আসক্তি একদিন আপনাকে পতিতালয়ে নিয়ে যাবে । কিন্তু এটাই বাস্তবতা । এমন হাজার হাজার পর্ন আসক্ত পাওয়া যাবে যাদের পর্ন আসক্তির শেষ পরিনতি ছিল পতিতালয়ে গমন । পর্নমুভি দেখা এমন একটা ভয়ংকর অভ্যাস যা খুলে দিবে আরো অনেক বড় বড় পাপের পথ ।

 

# “……… আমি আমার চিকিৎসা পেশার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি পর্নমুভি এর দর্শকদের যৌনক্ষমতা নষ্ট করে দেয় । পর্নমুভির ভোক্তাদের খুব বেশী যে সমস্যা হয় সেটা হল অকাল বীর্যপাত কিংবা সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা । স্ক্রীনের ওপারের অবাস্তব যৌন ফ্যান্টাসীতে খুব বেশী সময় ধরে ডুবে থাকার কারণে বাস্তব জীবনে তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে বেডরুমে তারা প্রচন্ড অস্বস্তিতে ভোগে । পর্নমুভি তাদের ভেতরের প্রবৃত্তিটাকে সবসময় উত্তেজিত করে রাখে আরো বেশী বেশী যৌনতার জন্য কিন্তু একই সাথে এটা তাদের যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় , দেখা দেয় অতৃপ্তি ”।– Dr. MaryAnne Layden

 

(৬) ভারত ক্রমাগতভাবে নারীদের জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হচ্ছে । ধর্ষণ সেখানকার নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা । ২০১২ সালে দিল্লীতে চলন্ত বাসে গ্যাং রেপের পাশবিকতা পুরো বিশ্বমিডিয়াতে ঝড় তুলেছিল । পুরো পৃথিবীর মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল – মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারে! ভারতে ধর্ষণের বেশীরভাগ ঘটনাই চাপা পড়ে যায় , লোকলজ্জার ভয়ে খুব কম ধর্ষিতাই থানায় অভিযোগ করে , কিংবা মিডিয়ার কাছে যায় । তবে মাঝে মাঝে যেসব ধর্ষণের খবর মিডিয়াতে আসে সেগুলো এই একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত উন্নত, মহান সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে । ভারতের মতো গনতান্ত্রিক দেশের আধুনিক,মুক্তমনা, সভ্য সেকুল্যার সমাজের অন্তঃসারশুন্যতা প্রকাশ করে দেয় এই ধর্ষণের ঘটনাগুলো । বলিউডের অভিনেতা বিশেষ করে অভিনেত্রীরা ধর্ষণের বিরুদ্ধে বেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান । তীব্র সমালোচনা করেন সেই সব পুরুষদের যারা নারীদের সম্মান করে না । অথচ এইসব অভিনেত্রীদের আয়ের একটা বড় অংশ আসে আইটেম সং এ অর্ধ নগ্ন হয়ে, কামার্ত পুরুষদের সামনে উত্তেজকভাবে নেচে নেচে । টাকার জন্য কাপড় খুলে বেডরুমের দৃশ্যে অভিনয় করতে এরা দ্বিধাবোধ করে না । এরা পুরুষদের বলে নারীদের সম্মান করতে অথচ এরাই আইটেম সঙ্গে পুরুষদের বলে আমি চিকেন তান্দুরী , তুই আমাকে মদ দিয়ে গিলে খা । সিনেমা একটি শক্তিশালী মাধ্যম ।মানুষ সিনেমায় তার প্রিয় নায়ক / নায়িকাকে যা করতে দেখে সেটা সে অনুকরন করতে চাই । কাজেই কারিনা কাপুর যখন আইটেম সং এ উত্তেজকভাবে নেচে নেচে , পুরুষদের কামার্ত করে এই মেসেজটা দেয় যে আমি চিকেন তান্দুরী, তুই আমাকে মদ দিয়ে গিলে খা তখন সেটার প্রতিক্রিয়া যে সমাজে ধর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিবে এটা স্বাভাবিক ।

 

বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ওমপুরিও মনে করেন , ভারতীয় চলচিত্রের আইটেম গানে অশ্লীলতার মাত্রা এত বেড়ে গেছে যে এটা ধর্ষণকে উৎসাহিত করে । পদ্মশী পুরষ্কার জেতা এই গুনী অভিনেতা বলেন , “ এখনকার হিন্দী মুভির আইটেম গানগুলো খুবই অশ্লীল । এই গানগুলোতে এমন সব ড্যান্স মুভমেন্ট আছে যা দেখে মনে হয় তারা বোধহয় সেক্সের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছে । ক্ষমা করবেন এরকম শব্দ ব্যবহার করার জন্য । কিন্তু অবস্থাটা এতটাই ভয়াবহ ।
কেউ যদি তার অবদমিত যৌন আকাংখা পূরন করতে চাই তাহলে এসব গানের সিডি কিনে তা চালিয়ে দেখলেই পারে । পুরোনো দিন গুলোতে এরকমটা ছিল না । ষাট , সত্তর এমনকি আশির দশকের মুভি গুলোতে বার, নাইটক্লাবে চিত্রায়িত যে গানগুলো দেখানো হতো সেগুলো এতটা অশ্লীল ছিল না । পুরোনো দিনগুলোতে এত ধর্ষণের ঘটনাও ছিল না । আমি নিশ্চিত , আইটেম গান গুলো ধর্ষণের ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে ।

 

(লস্ট মডেস্টি অনুবাদ টিম কর্তৃক অনূদিত)
চলবে ইনশা আল্লাহ ……

 

রেফারেন্সঃ
১) Court, J. (1984). Sex and violence a ripple effect. In Malamuth, N & Donnerstein, E (Eds), Pornography and sexual aggression. San Diego, Academic Press.

২) http://www.dhakatribune.com/crime/2015/jul/25/intelligence-100-rapes-six-months-most-unreported

৩) Theory and Practice: Pornography and Rape,” 1974 in “Going Too Far: The Personal Chronicle of a Feminist” (1977)

৪) The Perfect Victim (McGuire & Norton 1988). .” [p. 23 and p. 741] [p.741]

৫) Monto, M. (1999). Focusing on the clients of street prostitutes: a creative approach to reducing violence against women. Final report for the National Institute of Justice. Available at www.ncjrs.org.

৬)Reisman, Sanitover, Layden, and Weaver, “Hearing.”

 

শেয়ার করুনঃ