বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

সন্ধ্যার মরে আসে রোদ চিরকাল আমার মন খারাপ করে দেয় । মাঝে মাঝে  সারাদিন ঝুম বৃষ্টি হয়।  সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে টিপ টিপ করে পড়ে বা কখনো সম্পূর্ণ থেমে যায় । ধূসর একটা আলোয় ভরে যায় চারপাশ । কেউ  খেয়াল করে , কেউ করে না ।নারিকেল আর গগনশিরীষের বৃষ্টি ভেজা পাতা সেই ধুসর আলোতেও চিকচিক করে । দূরের আকাশে কালো একটা বিন্দুর মতো সোনালী ডানার চিল ভেসে বেড়ায় । করুন সুরে ডেকে ওঠে মাঝে মাঝে । চিরকাল খামখেয়ালী জীবন যাপন করা আমি উদাস হয়ে যায় । হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ইচ্ছে করে ।

কত বেদনা!

কত বিচ্ছেদ!

কত কথা রাখতে না পারা !

Image result for young man crying in salah

কথা দিয়েছিলাম আমার রব্বকে, ইয়া রব্ব! এবারের মতো মাফ করে দাও । আর কোনদিন একা রুমে ল্যাপটপে বসবনা ।

সেই কথা রাখতে পারিনি বহুবার আমার এই ২৩ বছরের জীবনে ।

বহুবার নির্লজ্জের মতো অন্ধকার জগতটাতে ফিরে গেছি । আর তারপর আক্ষেপের অশ্রু আমাকে ঘুম পাড়িয়েছে। অন্ধকার এত কেন টানে আমায়?

রব্বের কাছে দু’হাত তুলে চেয়েছিলাম, “ইয়া রব্ব! ভালো একটা ভার্সিটিতে  চান্স পাইয়ে দাও”

আমার রব্ব আমাকে নিরাশ করেননি ।

ভার্সিটিতে আসার পর ভুলে গেলাম আমার রব্বকে । বন্ধু, আড্ডা,গান, ফেসবুকিং, চ্যাটিং এর ভীড়ে হারিয়ে ফেললাম আমার রব্বকে ।

আমার রব্ব কিছুই বলেননি আমাকে । কোন শাস্তিও দেননি ।

মনে রঙ লাগার বয়সে মনে ধরেছিল এক বালিকাকে । কালো হরিনী চোখের সেই বালিকা যখন সবুজ ওড়না মাথায় দিয়ে আড়চোখে তাকাতো, আমি তখন অভিকর্ষ বলকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে উড়াল দিতাম আকাশে। ভালোবাসা ছুঁয়ে ফেলতো আকাশ । পৃথিবীর সব সুখ  চলে আসতো আমার দখলে ।

রব্বকে কথা দিয়েছিলাম, কখনো হারাম সম্পর্কে জড়াবো না । হারাম সম্পর্কে জড়ায়নি কখনো সেটা ঠিক , কিন্তু চেষ্টা তো কম করিনি ! রব্ব আমাকে দয়া করে প্রত্যেকবার ফিতনা থেকে বাঁচিয়েছেন ।

দুটো সিজদাহ্‌ কি কখনো দিয়েছি রব্বের এই রহমতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য?

চাইলেই কি রব্ব পারেন না, আমার চোখদুটোর আলো কেড়ে নিতে ?

যে চোখ দিয়ে আমি গোগ্রাসে গিলি এক্সরেটেড মুভি গুলো?

যে চোখ দিয়ে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি বালিকার রাঙ্গা রাজকন্যার মতো মুখটা ?

কোন মুখে দাঁড়াবো আমি আমার রব্বের সামনে, যেদিন আমার চোখ, আমার হাত,আমার পা, আমার কান , আমার ত্বক সাক্ষ্য দিবে আমার বিরুদ্ধে ?  আমাকে এমন আমলনামা পড়তে দেওয়া হবে যেটা্তে আমার করা প্রত্যেকটা কাজ খুটিনাটি সহকারে লিখা আছে ?

সেদিন শুনছিলাম  ইউসুফ (আঃ) এর অসাধারণ কাহিনী । চুড়ান্ত মাত্রার   আল্লাহ্‌ভীতি, পবিত্র থাকার অদম্য ইচ্ছা ! ক্রীতদাস ইউসুফ(আঃ) এর ওপর ক্রাশ খেয়ে ফেললেন তাঁরই মালিকের স্ত্রী । মহিলার অবশ্য করার কিছু  ছিলনা, আল্লাহ্‌,  ইউসুফ (আঃ)কে পৃথিবীর অর্ধেক রূপ যে দিয়েছিলেন । মহিলা,কিভাবে নিজেকে সামলাবে ?  ইউসুফ (আঃ) কে ফাঁদে ফেলার চক্রান্ত আটা শুরু হল । ইউসুফ (আঃ) হাত তুললেন আল্লাহ্‌র কাছে , “ইয়া আল্লাহ্‌ ! এরা আমাকে যেদিকে আহব্বান করে তার চেয়ে কারাগারো আমার অধিক প্রিয়  …’

জুলায়খা, ইউসুফ’র(আঃ) মালিকের স্ত্রী ছিল   সুন্দরী,লাস্যময়ী সেই সঙ্গে তাঁর ওপর প্রভাবশীল।  তারপরেও ইউসুফ (আঃ)  ফিরিয়ে দিয়েছেন জুলায়খাকে । কতভাবেই না ইউসুফ (আঃ) কে প্রলোভন দেখানো হয়েছে । তারপরেও তাঁকে ভুলানো যায়নি ।

আর, আমি সামান্য কোন মেয়ের চাহনিতেই কুপোকাত হয়ে  যায় । জুলায়খাদের এসে আমাকে প্রলোভন দেখাতে হয়না । আমি নিজেই ভার্চুয়াল জুলায়খাদের আড্ডায় হানা দেই । ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকি নীল রঙের সেই জগতটাতে । বাস্তবে উনার মতো অবস্থায় পড়লে কি হাল হতো আমার !

ইউসুফ (আঃ)  তো আমার মতোই রক্ত  মাংসের মানুষ   ছিলেন ।   পুরোপুরি তার মতো হতে নাই’বা পারলাম , কিছুটা যদি হতে পারতাম উনার মতো ! কিছুটা !

জানালার বাহিরের আকাশটা আজ অনেক কালো । মেঘ জমে একাকার  শীতল একটা বাতাসে সজনে গাছের সাদা ফুল গুলো তিরতির করে কাপছে । বোধহয় একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি নামবে  ।

ইশ! আমার বুকের মধ্যেও যদি  অনুতাপের  মেঘ জমতো , অশ্রু হয়ে অঝোরে  ঝরে পড়তো ভারী ভারী  সেই মেঘগুলো ! আমার অন্তর তো কঠিন হয়ে গেছে । অনেক কঠিন । পাথরের চেয়েও কঠিন ।

পাথর ফেটেও তো মাঝে মাঝে ঝরনা বের হয়ে আসে । কিন্ত আমার অন্তর তো আল্লাহর ভয়ে আল্লাহর স্মরনে বিগলিত হয় না । শেষ কবে সলাতে কেঁদেছি  মনে আছে ? শেষ কবে ঐ জঘন্য পাপ কাজটা করার পর জায়নামাজে সিজদাহয় লুটিয়ে পড়ে  ক্ষমা চেয়েছি ?

কতটুকু ভালোবাসেন আল্লাহ আমাদেরকে ? কতটুকু ?

এক মায়ের ছেলে হারিয়ে গিয়েছে । অনেক  খোঁজাখুজির পরেও ছেলেকে পাওয়া গেলনা ।  মায়ের পাগল হতে বাকী । এমন সময়  হারানো ছেলেকে পাওয়া গেল । মা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।  ভালোবাসার অশ্রু তার দুগাল বেয়ে অঝোরে নামছে । রোদ পড়ে চিকচিক করছে মুক্তোর মতো ।  এই মায়ের পক্ষে কি এই অবস্থায় সাত রাজার ধন  এই ছেলেকে  আগুনে ফেলে দেওয়া সম্ভব হবে ?

আল্লাহ আমাদেরকে  এই মায়ের চেয়েও অনেক অনেক গুন বেশি ভালোবাসেন । বাবামার অবাধ্য হলে তাদের কথা না শুনলে, তাদের মনে কষ্ট দিলে সন্তান্দের প্রতি তাদের ভালোবাসায় ভাটা পড়ে যায়

কিন্তু  আল্লাহর ভালোবাসায় কখনো ভাটা পড়ে না । আমি যখন আল্লাহকে   স্মরন করি , আল্লাহও আমাকে  স্মরন করেন । যখন তাকে ভুলে যাই, তার অবাধ্যতা করি তখনো তিনি আমাকে মনে করেন ।  আমার জন্য ক্ষুধার খাদ্য পাঠিয়ে দেন , তৃষনার     পানি  পাঠিয়ে দেন , বুক ভরে   শ্বাস  নিতে দেন মুক্ত  বাতাসে ।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন কখন আমি তাকে ডাকবো । মনের অজান্তেই একবার ইয়া রব্ব বলে ডাক দিলেই তিনি আনন্দিত হয়ে সাড়া দেন – ইয়া আবদি! হে আমার বান্দা বলো , বলো তোমার কি চাই ?

আমি যখন আল্লাহর দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায় আল্লাহ আমার দিকে দশ ধাপ এগিয়ে আসেন , আমি  আল্লাহর দিকে হেঁটে গেলে তিনি দৌড়িয়ে আসেন । আল্লাহ সুযোগ খোঁজেন আমাকে ক্ষমা করে দেবার । অজুর পানির মাধ্যমে তিনি আমার পাপগুলো ঝরিয়ে দেন, দুই সলাতের মাধ্যমে মাঝের সময় গুলোতে করা পাপ গুলো ক্ষমা করে দেন । তিনি রাতে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন দিনের পাপীদের জন্য , আর দিনে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন রাতের পাপীদের জন্য ।

তিনি ঘোষনা দিয়ে রেখেছেন কেউ যদি তার সঙ্গে আকাশ সমান উঁচু পাপ নিয়েও দেখা করে কিন্তু শিরক না করে তাহলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন ।  তারপর তিনি প্রবেশ করাবেন এমন এক জান্নাতে [ http://bit.ly/2eXDZPI ]  যা কোন চোখ দেখেনি , কোন  অন্তর চিন্তাও করেনি ।

[http://bit.ly/2f24Adb]

“হে আমার বান্দাগন ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন । তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুনাময় । [আয-যুমারঃ ৫৩]

আমার সলাত, আমার সিজদাহ, আমার তাসবীহ কোন  কিছুরই কি প্রয়োজন আছে  আল্লাহ’র ?  আমি তো ক্ষুদ্র, অতি  নগন্য এক  সৃষ্টি । এই পৃথিবীর তুলনায় আমি কত ক্ষুদ্র । আমাদের এই পৃথিবীর   তুলনায় সূর্‌য প্রায় তের লক্ষগুন বড় । সূরযের পর আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে  কাছে যে নক্ষত্র রয়েছে  তার নাম Proxima Centauri . পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব প্রায় ৪.৫ আলোক বর্‌ষ ।

আলোর বেগ সবচাইতে বেশী । আলো এক সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলে । আর পৃথিবীথেকে এই আলোরই  Proxima Centauri তে যেতে সময়  লাগবে ৪.৫ বছর । ভাবা যায় কতদূরে আছে Proxima Centauri!

এরকম ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে আমরা যে গ্যালাক্সিতে রয়েছি সেই ‘ মিল্কি ওয়েতে’।  মহাবিশ্বে আবার ১০০ বিলিয়নের মতো গ্যালাক্সি রয়েছে ।  ২০০৪ সালে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন । যার নাম তাঁরা দেন ABEL 135 IR 116 .  এই বাবাজি পৃথিবী থেকে ১৩.২ বিলিয়ন দূরে অবস্থিত ।

আর এই সব কিছুই প্রথম আসমানে  । দ্বিতীয় আসমান প্রথম আসমানের তুলনায় কত বিশাল সেটা ব্যাখ্যা করার জন্য হাদীসে মরুভুমি এবং একটা আংটির কথা বলা হয়েছে । মরুভূমির বিশাল বুকে পড়ে থাকা একটি আংটি মরুভূমির তুলনায় যতটা ক্ষুদ্র । প্রথম আসমান দ্বিতীয় আসমানের তুলনায় ততোটুকুই ক্ষুদ্র । এভাবে  দ্বিতীয় আসমান তৃতীয় আসমানের তুলনায় ক্ষুদ্র , তৃতীয়, চতুর্‌থ আসমানের তুলনায় ক্ষুদ্র । এভাবে চলতে চলতে সপ্তম আসমানে যেয়ে ঠেকে ।

[http://bit.ly/2fpWjUE  ]

সুবহানাল্লাহ্‌! কত বড় এই মহাবিশ্ব । এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণায়, চিপায় চাপায় সবখানে ফিরিশতারা রয়েছেন  আল্লাহকে সিজদাহরত অবস্থায় । আমার সিজদাহ আল্লাহর কি কাজে আসবে ? হাদীসে কুদসীতে এসেছে ,” আল্লাহ বলছেন, “হে  মানুষ এবং জিন! তোমরা শুনে নাও তোমাদের সবাই যদি সবচেয়ে বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি হবে না । যদি তোমরা সবাই সবচেয়ে পাপী হৃদয়ের অধিকারীও হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি হবে না । তোমাদের সবার চাওয়াও যদি পূরন করে দেই, তাহলেও আমার কাছে যা আছে তার কিছুই ফুরাবে না ।

[http://bit.ly/2dQE4XX ]

আমার কোনকিছুরই প্রয়োজন নেই তাঁর। কোনকিছুরই প্রয়োজন নেই । রাজাদের রাজা তিনি, বাদশাহদের বাদশাহ ।  তারপরেও আল্লাহ আমাকে এতোটা ভালোবাসেন , আমাকে ক্ষমা করে দেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকেন, আমার জন্য আরশের ওপর থেকে প্রতি রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন , আমার জন্য জান্নাতে এত এত নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন ।

আর কতকাল  এই আল্লাহর সঙ্গে  দস্যুতা করে বেড়াবো ? আর কতকাল এই  আল্লাহকে ভুলে থাকবো ? আর কতকাল  নিজের নফসের কাছে পরাজিত হব?

আল্লাহর স্মরনে অন্তর বিগলিত হবার সময়  কি এখনো আসে নি  ?

আবু বকর (রাঃ) ছিলেন,  নবীদের (আঃ) পর এই জমীনের বুকে হেঁটে বেড়ানো সবচেয়ে পুন্যবান মানুষ । আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর কাছে বেশ   কয়েকবার জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন তিনি । তারপরেও সলাতে আল্লাহর ভয়ে তিনি কাঁদতেন । উমারের (রাঃ) মতো ক্ষ্যাপাটে লোকও সলাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদতেন । উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তো কাঁদতে কাঁদতে নিজের দাড়ি ভিজিয়ে ফেলতেন । দুইজনেই দুনিয়াতে থাকতে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন ।

আমি কি বিশাল এক পাপী।  সন্ত্রাসী , আল্লাহদ্রোহী । তারপরেও আমার চোখ শুষ্ক ।

অভিশপ্ত আমার দু’চোখ।

অভিশপ্ত ।

উঠো, হে পাপাত্মা উঠে দাঁড়াও তোমার রব্বের সামনে নতমুখে । সব জানেন তিনি , সব । গোপনে রাতের আঁধারে একা একা তুমি যা করেছিলে সব জানেন তিনি । তারপরেও তিনি অপেক্ষা করে আছেন তোমার জন্য ।তিনি তোমাকে তাঁর সামনে নতমুখে দেখতে চান ।  তোমাকে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন । আহ! জান্নাতে ।

হে পাপাত্মা,  উঠে দাঁড়াও । আর একবার তোমার রব্বকে কথা দাও তুমি ভালো হয়ে যাবে । শিশুর মতো অঝোরে কাঁদো , এই চোখের পানি তোমার রব্বের কাছে সব চাইতে প্রিয় ।

কাঁদো হে পাপাত্মা  কাঁদো ।

 

শেয়ার করুনঃ